নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
দীর্ঘ দুই দশক ধরে লাতিন আমেরিকায় চীন তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শেকড় শক্ত করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডনরো ডকট্রিন সেই আধিপত্যের সামনে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩ জানুয়ারি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দী করার ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নয় বরং বেইজিংয়ের জন্য এটি একটি সরাসরি সতর্কবার্তা।
ডনরো ডকট্রিন কী?
১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক মনরো ডকট্রিন এর আদলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নতুন নীতিকে বিশ্লেষকরা বলছেন ডনরো ডকট্রিন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিম গোলার্ধ থেকে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিযোগী শক্তিগুলোকে বিতাড়িত করা। ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল স্পষ্ট করে দিয়েছে এ অঞ্চলে কৌশলগত সম্পদের ওপর কোনো বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ আর বরদাস্ত করা হবে না।
ভেনিজুয়েলা: চীনের বড় ধাক্কা
মাদুরোর পতন চীনের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের ঋণের ঝুঁকি তৈরি করেছে। ভেনিজুয়েলার তেল খনি ও অবকাঠামোতে চীনের বিনিয়োগ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমরা না থাকলে এখানে চীন বা রাশিয়া থাকত কিন্তু এখন আর তারা থাকতে পারবে না।
পানামা থেকে চিলিতে মার্কিন চাপ
কেবল ভেনিজুয়েলা নয়, পানামা খালের বন্দরে চীনের অপারেশন বন্ধ করতে গত কয়েক মাস ধরে ব্যাপক চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। ডিসেম্বরে পানামায় চীন-পানামা বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে পরিচিত মিরাডোর দে লাস আমেরিকা স্মৃতিস্তম্ভটি বিতর্কিতভাবে ভেঙে ফেলা হয়, যা এই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্যের নতুন ইঙ্গিত।
চীনের ৩-১ পালটা কৌশল
তবে চীনও পিছু হটতে নারাজ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেইজিং লাতিন আমেরিকার জন্য তাদের তৃতীয় পলিসি পেপার প্রকাশ করেছে। তাদের কৌশল হলো:
বিনিয়োগের রূপান্তর: বড় বড় অবকাঠামোর বদলে এখন গ্রিন এনার্জি, ইভি (EV) কারখানা (ব্রাজিলে BYD-এর মতো) এবং ডিজিটাল অবকাঠামোতে নজর দিচ্ছে চীন।
সফট পাওয়ার: মার্কিন সামরিক শক্তির বিপরীতে চীন তাদের 'সিল্ক রোড আর্ক' (Silk Road Ark) নামক হাসপাতাল জাহাজ পাঠিয়ে মানবিক কূটনীতি চালাচ্ছে।
বাণিজ্যিক নির্ভরতা: চীন এখনো দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য তাদের হাতে একটি শক্তিশালী কার্ড।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
সাবেক চিলীয় রাষ্ট্রদূত হোর্হে হেইনে মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো উন্নত বিকল্প না দিয়ে দেশগুলোকে চীনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাপ দিচ্ছে। এটি দেশগুলোকে "উন্নয়নহীন" রাখতে চাওয়ার সমান। অন্যদিকে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সান চেংহাও-এর মতে, চীন এখান থেকে পিছু হটবে না, বরং তার কাজের ধরন পুনর্মূল্যায়ন (Recalibration) করবে। লাতিন আমেরিকা এখন দুই পরাশক্তির রশি টানাটানির কেন্দ্রে। একদিকে মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ, অন্যদিকে চীনের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। ডনরো ডকট্রিন চীনকে পুরোপুরি হঠাতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে ওয়াশিংটন দেশগুলোকে টেকসই কোনো অর্থনৈতিক বিকল্প দিতে পারে কি না তার ওপর।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: