নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাতের জেরে বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার। দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স প্রবাহ ও জনশক্তি রপ্তানি এখন খাদের কিনারে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধস নামার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আতঙ্কে ৬০ লাখ প্রবাসী, স্থবির আকাশপথ
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা এবং আকাশসীমা বন্ধ থাকার কারণে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে দুই বাংলাদেশি নিহতের খবর পাওয়া গেছে, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দিনে মধ্যপ্রাচ্যগামী অন্তত ৭৪টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে হাজার হাজার প্রবাসী কর্মী ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ পর্যায়ে থাকায় তারা কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
অর্থনীতির দুই স্তম্ভে আঘাত
২০২৫ সালে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রভাবে কেবল শ্রমবাজার নয় বরং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে দেশে তীব্র মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার ডোমিনো ইফেক্ট তৈরি হতে পারে।
এককেন্দ্রিক শ্রমবাজারের ঝুঁকি
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদ এবং বায়রা (BAIRA) নেতারা মনে করেন বাংলাদেশের শ্রমবাজার অতিরিক্ত মাত্রায় মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়াটাই এখন বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের শ্রমিকরা মূলত অদক্ষ বা আধা-দক্ষ। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া তাদের বিকল্প বাজার নেই। এখন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা পূর্ব ইউরোপের মতো স্কিলড ওয়ার্কার-নির্ভর বাজারের দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে।
সরকারের পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিশেষ সেল ও হটলাইন চালু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কর্মস্থলে ফেরা নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের মাধ্যমে তা বাড়ানোর জোর প্রচেষ্টা চলছে। এছাড়া আটকা পড়া শ্রমিকদের আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা করছে মন্ত্রণালয়।
সংকটের মুখে বিকল্পের সন্ধান
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামানো বাংলাদেশের হাতে নেই তবে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি বাড়ানো সম্ভব।
স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা: আটকা পড়া প্রবাসীদের টিকিট রি-ইস্যু ও ভিসা নবায়ন।
মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা: জ্বালানি সংকটের জন্য বিকল্প উৎস (চীন, রাশিয়া, ভারত) খোঁজা।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বাজার ধরা।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা যদি দুই সপ্তাহের মধ্যে নিরসন না হয়, তবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে এর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হবে। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই সংকট এখন কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয় জাতীয় অর্থনীতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: