নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ এক দশক পর প্রথমবারের মতো তিন সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম প্রকাশ্যে এসেছে। সোমবার (৬ এপ্রিল, ২০২৬) কুমিল্লার আদালতে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই তিন সাবেক সেনা সদস্যের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের আবেদন জানালে এই নতুন মোড় তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার অন্ধকারে এই ঘটনাকে আশার আলো হিসেবে দেখছেন তনুর পরিবার ও সচেতন নাগরিক সমাজ।
আদালতে পিবিআই-এর আবেদন
সোমবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতে হাজির হন মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম। তিনি আদালতকে জানান ২০১৭ সালে তনুর পোশাক থেকে তিনজন পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হলেও দীর্ঘ সময়ে তা কারো নমুনার সাথে মিলিয়ে দেখা হয়নি। তদন্তের স্বার্থে তিনি তিন সন্দেহভাজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের অনুমতি চাইলে আদালত তাতে সম্মতি প্রদান করেন।
সন্দেহভাজন যারা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সন্দেহভাজন এই তিনজন হলেন ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত:
সার্জেন্ট জাহিদ (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত)
ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত)
সৈনিক শাহীন আলম (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত)
তবে তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের দাবি ওই সৈনিকের নাম শাহীন আলম নয় বরং জাহিদ হবে। তিনি শুরু থেকেই এই নামগুলো বলে আসছিলেন।
পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও প্রতিক্রিয়া
মেয়ের খুনিদের নাম প্রকাশ্যে আসায় আবেগাপ্লুত তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, সার্জেন্ট জাহিদ বড় খুনি। তারে গ্রেপ্তারের কথা কতবার কইছি কেউ কথা শোনে নাই। এখন নাম আদালতে গেছে, আমি মরার আগে বিচার দেইখা যাইতে চাই। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন শুধু এই তিনজনই নন, ঘটনার সাথে আরও অনেকে জড়িত থাকতে পারেন। বিশেষ করে সার্জেন্ট জাহিদের স্ত্রীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুরো সত্য বেরিয়ে আসবে বলে তিনি মনে করেন। তনুর ভাই আনোয়ার হোসেনের শঙ্কা, কোনো অদৃশ্য চাপে যেন মামলাটি আবার অন্ধকারে তলিয়ে না যায়।
তদন্তের দীর্ঘ পথ ও স্থবিরতা
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতর তনুর লাশ পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন। থানা পুলিশ, ডিবি ও সিআইডি হয়ে বর্তমানে মামলাটি পিবিআই-এর হাতে রয়েছে। গত আট বছরে সিআইডি ও পিবিআই-এর আগের কর্মকর্তারা মামলার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি করতে পারেননি। সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, তারা ডিএনএ ম্যাচিংয়ের চেষ্টা করলেও "বিভিন্ন কারণে" তা সম্ভব হয়নি।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি কাইমুল হক জানান, এই উদ্যোগ ২০১৭ সালেই নেওয়া উচিত ছিল। দেরি হলেও এটি ইতিবাচক। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, তনুর পরিবার শুরু থেকেই এই নামগুলো বলে আসছিল। অদৃশ্য চাপে এতোদিন যা ধামাচাপা ছিল, তা এখন স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। তনুর পরিবারের চাওয়া এখন একটাই ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে যেন প্রকৃত খুনিরা শনাক্ত হয় এবং দীর্ঘ ১০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: