odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 1st June 2026, ১st June ২০২৬
জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক অপমানিত বউয়ের একশো টাকা ছুড়ে মারে

কর্মহীন মিস্টার এক্সের ঈদ-পরবর্তী মহাকাব্য

odhikarpatra | প্রকাশিত: ১ June ২০২৬ ২০:০৪

odhikarpatra
প্রকাশিত: ১ June ২০২৬ ২০:০৪

কর্মহীন মিস্টার এক্সের ঈদ-পরবর্তী মহাকাব্য

একটি রম্য বাস্তবতা অধিকার পত্র ডটকম এর রম্যরচনা:

বর্তমানে কর্মহীন। তবে স্বপ্নে তিনি এখনো বহুজাতিক কোম্পানির সিইও। বাস্তবে তিনি আমাদের গল্পের নায়ক—মিস্টার এক্স

এক ছেলে, এক মেয়ে, এক স্ত্রী এবং অসংখ্য পাওনাদার নিয়ে তার সুখী সংসার। সুখী বললাম কারণ দুঃখী বললে দুঃখ কষ্ট পেতে পারে।

ঈদের পরের ঘটনা। মিস্টার এক্সের পকেটে এমন অবস্থা, বাতাস ঢুকলেও বের হওয়ার সময় ভাড়া চাইবে। কিন্তু বন্ধুদের আপ্যায়ন তো করতেই হবে! তাই তিনি তার এক মামার কাছ থেকে ১৫০০ টাকা ধার নিয়ে বন্ধুদের খাওয়ালেন। কারণ বাঙালির সম্মান পকেটে নয়, আপ্যায়নে।

এর আগে অবশ্য স্ত্রী মহোদয়ার কাছ থেকেও ১৫০০ টাকা নিয়েছিলেন এই শর্তে যে, পরে ২০০০ টাকা ফেরত দেবেন। কীভাবে দেবেন, সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি। কারণ স্বপ্ন দেখার ওপর এখনো ট্যাক্স বসেনি।

এদিকে বড় ভাইয়ের কাছে পাঁচ হাজার না হোক, দুই হাজার টাকা চাইলেন। কিন্তু বড় ভাই সম্ভবত দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আবেদনটি নাকচ করে দিলেন।

তবে পৃথিবীতে এখনো কিছু মানুষ আছেন যারা কর্মহীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল। মিস্টার এক্সের জীবনেও এমন দু-একজন আছেন। তাদের একজন, ধরা যাক মিস্টার এম

ঈদের সালামি হিসেবে মিস্টার এক্স তার কাছে কিছু চাইলেন। মিস্টার এম রাজধানীর বাইরে ছিলেন। কিন্তু ভালোবাসার কোনো দূরত্ব নেই। তিনি বিকাশে ১০০০ টাকা পাঠিয়ে দিলেন।

টাকা হাতে পেয়েই মিস্টার এক্স মহান দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলেন। মামার ১৫০০ টাকার দেনা থেকে ১০০০ টাকা পরিশোধ করে দিলেন।

ফলাফল?

পকেট আবার শূন্য।

শূন্য বলতে গণিতের শূন্য নয়, অর্থনীতির শূন্য।

ঠিক তখনই স্ত্রীর ফোন।

—"মেয়ের শরীর আরও খারাপ। ডাক্তার দেখিয়েছি, কিছু টেস্ট দিয়েছে।"

মিস্টার এক্স গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

—"১০ মিনিটের মধ্যে আসছি।"

যে আত্মবিশ্বাসে তিনি কথাটি বললেন, তা শুনে মনে হতে পারে তার ব্যাংকে অন্তত কয়েক কোটি টাকা আছে।

ফোন কেটে তিনি পরিচিত কয়েকজনকে কল দিলেন। উদ্দেশ্য—ঋণ।

ফলাফল—নীরবতা।

কারও ফোন বন্ধ, কেউ ব্যস্ত, কেউ কল দেখেই সম্ভবত তওবা পড়ে ফেলেছে।

শেষে স্ত্রীকে ফোন করলেন।

—"রিকশা ভাড়ার জন্য কিছু আছে?"

—"১০০ টাকা আছে।"

মিস্টার এক্স হিসাব করলেন। যাওয়া-আসার ভাড়া প্রায় ২৫০ টাকা।

হিসাব মেলেনি।

তখন  তিনি পৃথিবীর  কোটি মানুষের পরীক্ষিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হলেন,তাওয়াককালতু আল্লাহ মানে 

আল্লাহর উপর ভরসা।

হাসপাতালে পৌঁছে স্ত্রী তার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেলেন, স্বামীর পকেটের অবস্থা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চেয়েও সংকটাপন্ন।

মিস্টার এক্সের দিকে  ১০০ টাকার নোট ছুড়ে মেরে, টাকা উঠিয়ে মিস্টার এক্সে রিকশা ভাড়া  মিটিয়ে দিলেন এটাই ছিল তার জীবনে সবচেয়ে বড় অপমান।

সেই মুহূর্তে মিস্টার এক্স জীবনের এক গভীর সত্য উপলব্ধি করলেন—

যে মানুষ একসময় হাজার হাজার টাকা অন্যদের জন্য খরচ করেছে, আজ সে নিজের রিকশা ভাড়া দেওয়ার অবস্থায় নেই।

কষ্টটা টাকার ছিল না।

অক্ষমতার ছিল।

এরপর রক্ত পরীক্ষার কাউন্টারে গিয়ে জানা গেল বিল—৩ হাজার টাকা।

মিস্টার এক্সের আত্মা কয়েক সেকেন্ডের জন্য শরীর ত্যাগ করে পুনরায় ফিরে এলো।

ঠিক তখনই আল্লাহর রহমত।

তার মনে পড়ল আরেক ভাইয়ের কথা। ফোন দিতেই তিনি বললেন,

—"বিলটা আমি দিয়ে দিচ্ছি।"

আলহামদুলিল্লাহ।

রক্ত পরীক্ষা সম্পন্ন হলো।

কিন্তু নতুন বিপদ।

আরেকটি স্যাম্পল লাগবে।

মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,

—"এখন হবে?"

—"না।"

—"জুস খেলে হবে?"

—"ম্যাঙ্গো জুস।"

পাশ থেকে ছেলে বলল,

—"আমি মজো খাব।"

মিস্টার এক্সের বুক কেঁপে উঠল।

তিনি কূটনৈতিকভাবে বললেন,

—"তুমি আপুরটা একটু ভাগ করে খেও।"

সৌভাগ্যবশত ছেলে জাতিসংঘের মতো সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখাল।

এদিকে রিকশাওয়ালার সঙ্গে দরকষাকষি করে ১০০ টাকা থেকে ৭০ টাকা ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। বাকি ছিল ৩০ টাকা।

এই ৩০ টাকাই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

কিন্তু বিপদ হলো, কোথাও ৩০ টাকায় জুস নেই।

সর্বনিম্ন ৩৫ টাকা।

সেই মুহূর্তে পাঁচ টাকার মূল্য মিস্টার এক্সের কাছে পাঁচ লাখ টাকার চেয়েও বেশি মনে হলো।

ঠিক তখনই আবার রহমত।

মেয়ে বলল,

—"বাবা, আমি দই খাব।"

দোকানদার বলল,

—"৩০ টাকা।"

মিস্টার এক্সের মনে হলো ফেরেশতারা হয়তো এই দইয়ের দোকানের ঠিকানা জানিয়ে দিয়েছেন।

দুই ভাইবোন ভাগ করে দই খেল।

কাজও হয়ে গেল।

এর মধ্যেই মোবাইলের চার্জ শেষ।

ফোন বন্ধ।

অর্থাৎ আর্থিক সংকটের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সংকটও শুরু।

সব কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পালা।

স্ত্রী বললেন,

—"রিকশা নেন।"

মিস্টার এক্স শান্ত গলায় বললেন,

—"ভাড়া নেই। হেঁটেই যাই।"

ছেলে হাঁটতে রাজি নয়।

তাই তাকে কাঁধে তুলে নিলেন।

মেয়ের হাত ধরলেন।

স্ত্রী পাশে।

চারজনের ছোট্ট পরিবার হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পথে রওনা দিল।

সেদিন মিস্টার এক্সের পকেটে টাকা ছিল না।

মোবাইলে চার্জ ছিল না।

ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা ছিল না।

কিন্তু ছিল স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে আর আল্লাহর উপর ভরসা।

জীবনের হিসাব-নিকাশে অনেক সময় এটুকুই সবচেয়ে বড় সম্পদ।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: