odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Saturday, 6th June 2026, ৬th June ২০২৬
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে যমুনার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের সন্ধানে—জামালপুরের সমাজকর্মী শামস ছোটনের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ঝিনাই নদীর বুক থেকে উঠে আসা বাংলাদেশের শত শত মৃতপ্রায় নদীর সম্মিলিত আর্তনাদ

“নদীর নাম ঝিনাই, কিন্তু নদী কোথায়?” — শামস ছোটনের চোখে ঝিনাই নদীর মৃত্যুকাব্য │বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এক মৃত্যুপথযাত্রী নদীর আর্তনাদ — কেন মানুষ আজ নদীই খেয়ে ফেলছে?

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৫ June ২০২৬ ২৩:৩৪

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৫ June ২০২৬ ২৩:৩৪

অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে জামালপুরের কস্মাপুরে দাঁড়িয়ে দেখা যায় এক নির্মম বাস্তবতা। সাইনবোর্ডে এখনও লেখা আছে “ঝিনাই নদী”, কিন্তু নদীটি যেন হারিয়ে গেছে কচুরিপানা, দখল এবং অবহেলার স্তূপের নিচে। একসময় যমুনার প্রাণবন্ত সন্তান হিসেবে পরিচিত ঝিনাই ছিল কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। আজ সেই নদী মৃত্যুপথযাত্রী। স্থানীয় সমাজকর্মী রাজনীতি সচেতন শামস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ছোটন (শামস ছোটন) স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “নদী হারালে শুধু পানি হারায় না, হারিয়ে যায় মানুষের শিকড়, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।” এই অনুসন্ধানী ফিচারে উঠে এসেছে ঝিনাই নদীর ইতিহাস, বর্তমান পরিবেশগত সংকট, নদী ধ্বংসের দায়, শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা এবং পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা। ঝিনাই কেবল একটি নদীর গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের হারিয়ে যেতে বসা শত শত নদীর সম্মিলিত আর্তনাদ।

ঈদের ছুটির এক অলস বিকেলে ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যাই জামালপুরে। উদ্দেশ্য ছিল প্রখ্যাত আউলিয়া হযরত শাহ জামাল (রহ.)-এর দরগাহ জিয়ারত এবং জেলার কিছু প্রাকৃতিক নিদর্শন ঘুরে দেখা। পথের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে হতে একসময় এসে দাঁড়াই জামালপুর সদর উপজেলার কম্পপুর এলাকার একটি বড় সেতুর ওপর। সেতুটির মাঝখানে এসে হঠাৎই আমাদের পদচারণা থেমে যায়। কারণ, নিচে তাকিয়ে যা দেখলাম, তা শুধু বিস্ময়ের নয়—গভীর বেদনা ও শঙ্কারও।

সেতুর রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে যখন ঝিনাই নদীর দিকে চোখ মেললাম, তখন নিজের দৃষ্টিশক্তিকেই যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। নদী দেখার প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়েছিলাম, অথচ চোখে পড়ল না কোনো নদী। দেখা গেল সবুজের বিস্তীর্ণ এক চাদর—কোথাও কচুরিপানার ঘন আস্তরণ, কোথাও ভুট্টাক্ষেত, কোথাও ধানের সবুজ আবাদ। দূর থেকে মনে হয় যেন এটি একটি উর্বর কৃষিজমি, প্রকৃতির আশীর্বাদে ভরপুর কোনো মাঠ। কিন্তু সেই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য। এই ভূমির বুকের নিচেই নিঃশব্দে শুয়ে আছে এক মৃতপ্রায় নদী—ঝিনাই; যে নদী একসময় যমুনার সঙ্গে প্রাণের বন্ধনে যুক্ত ছিল, যার বুকে বইত জীবনের স্রোত।

কৌতূহল আর বিস্ময়ের টানে সেতুর একপ্রান্তে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি বিশাল সাইনবোর্ড। সময়ের ধুলো জমলেও সেখানে এখনও স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—“নদীর নাম: ঝিনাই নদী”। নাম আছে, পরিচয় আছে, সরকারি নথিতে অস্তিত্বও আছে; অথচ নদী যেন নেই। যেন নামটি টিকে আছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে তার প্রাণ।

একসময় এই নদী বর্ষার জল বহন করত, ছিল মাছের নিরাপদ আবাস, কৃষকের জীবিকা ও গ্রামীণ যোগাযোগের অন্যতম ভরসাস্থল। আজ সেই নদীর বুক দখল করে গড়ে উঠেছে চাষের জমি। থেমে গেছে প্রবাহ, সংকুচিত হয়েছে নদীর শরীর, আর মানুষের স্মৃতি থেকেও ধীরে ধীরে মুছে যেতে বসেছে তার অস্তিত্ব। বর্তমান প্রচ্ছদ ছবিটিও সেই নির্মম বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করছে। সেখানে দেখা যায়, একটি পুরোনো লোহার রেলসেতু এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে—সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে। যে সেতুর নিচ দিয়ে একদিন প্রবাহিত হতো ঝিনাইয়ের স্রোতধারা, আজ সেখানে কচুরিপানার একচ্ছত্র রাজত্ব। কোথাও কোথাও সামান্য জলরেখা এখনও টিকে আছে; যেন মৃত্যুপথযাত্রী কোনো মানুষের শেষ নিঃশ্বাস, নিভে যাওয়ার আগে জীবনের শেষ সংকেত।

সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে অনিবার্যভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে—নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষ কি ধীরে ধীরে নদীখেকো জাতিতে পরিণত হচ্ছে? আমরা কি আমাদের সভ্যতার উৎসকেই গ্রাস করছি? এমনই এক বেদনাভারাক্রান্ত মুহূর্তে চোখে পড়ল আরেকজন দর্শনার্থীকে। আমাদের মতো তিনিও সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে খুঁজছিলেন নদীর চিহ্ন। আলাপ হলো তাঁর সঙ্গে। স্থানীয় সমাজসেবী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক জনাব শামস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ছোটনের কণ্ঠে ফুটে উঠল নদী হারানোর গভীর হাহাকার। তাঁর কথাগুলো যেন ঝিনাইয়ের বুক থেকে উঠে আসা আর্তনাদ —তাঁর এই বেদনা কেবল একজন ব্যক্তির নয়। এটি ঝিনাইয়ের আর্তনাদ, এটি বাংলাদেশের হারিয়ে যেতে বসা শত শত নদীর পক্ষে উচ্চারিত এক নাগরিক শোকগাথা। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সেই প্রশ্নই আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—নদীর নাম এখনও ঝিনাই, কিন্তু নদী কোথায়?

নদীর জন্য মানব মনের হাহাকারের রূপরেখা: সমাজকর্মী শামস ছোটনের চোখে ঝিনাই

ঝিনাই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্থানীয় সমাজকর্মী ও পরিবেশ-সচেতন নাগরিক জনাব শামস ছোটনের চোখে যে হাহাকার দেখা যায়, সেটি আসলে কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা নয়। এটি বাংলাদেশের হাজারো নদীপাড়ের মানুষের হৃদয়ের আর্তনাদ। জামালপুরের শামস ছোটনের মতো দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও গ্রামের অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যারা শৈশবের নদী হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে আজও নদীর পুনর্জন্মের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই মানুষগুলো এখনো সমাজে ব্যতিক্রম, মূলধারার অংশ নয়। অথচ একটি নদীমাতৃক দেশের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল হাজার হাজার শামস ছোটন তৈরি করা—যারা নদীকে শুধু জলধারা হিসেবে নয়, জীবন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উত্তরাধিকার হিসেবে দেখবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, সহশিক্ষা কার্যক্রম, স্থানীয় ইতিহাসচর্চা, পরিবেশ শিক্ষা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে যদি শিক্ষার্থীদের নিজেদের এলাকার নদী, খাল ও জলাভূমির সঙ্গে পরিচিত করা যেত, তাহলে হয়তো আজ নদী দখল ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠত। নদী রক্ষার জন্য আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নদীপ্রেমী নাগরিক। আর সেই নাগরিক তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো শিক্ষা। তাই বাংলাদেশের নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে শুধু নদী খনন নয়, শামস ছোটনের মতো পরিবেশ-সচেতন, দায়িত্বশীল এবং নদীপ্রেমী নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাব্যবস্থারও গভীর সংস্কার প্রয়োজন।

প্রকৃতপক্ষেই জামালপুরের পরিচিত সমাজকর্মী শামস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরি ছোটন (শামস ছোটন) ঝিনাই নদীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক উন্নয়ন, মানবকল্যাণ এবং পরিবেশ-সচেতনতা নিয়ে কাজ করা এই সমাজকর্মীর কাছে ঝিনাই নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি অর্থনীতি এবং মানুষের অস্তিত্বের অংশ। শৈশব থেকে নদীটিকে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত অবস্থায় দেখেছেন তিনি। নদীর বুকে নৌকার চলাচল, মাছ ধরার দৃশ্য, বর্ষার উচ্ছ্বসিত স্রোত এবং নদীকেন্দ্রিক গ্রামীণ জীবন তাঁর স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজ যখন তিনি ঝিনাই নদীর বুকজুড়ে ফসলের ক্ষেত, কচুরিপানার স্তূপ এবং দখলদারিত্বের চিহ্ন দেখতে পান, তখন তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভের পাশাপাশি বেদনা ঝরে পড়ে। তিনি মনে করেন, একটি নদীর মৃত্যু আসলে একটি সমাজের স্মৃতিহানি। সমাজকর্মী শামস ছোটনের এই বেদনা আসলে একার নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অসংখ্য সচেতন মানুষ রয়েছেন, যারা নিজ নিজ এলাকার নদী, খাল, বিল ও জলাভূমির অবক্ষয় দেখে উদ্বিগ্ন। কিন্তু তাদের সংখ্যা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। শামস ছোটন বিশ্বাস করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে নদী রক্ষার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাঁর স্বপ্ন—একদিন ঝিনাই নদী আবারও তার হারানো প্রবাহ ফিরে পাবে এবং নতুন প্রজন্ম বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবেই একটি জীবন্ত নদীকে দেখতে পাবে। তিঁনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “নদীকে রক্ষা করা পরিবেশবাদীদের একার দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। নদী বাঁচলে কৃষক বাঁচবে, প্রকৃতি বাঁচবে, বাংলাদেশ বাঁচবে।”

একটি জাতির আত্মসমালোচনার গল্প: আমরা কি সত্যিই নদী খেয়ে ফেলছি?

ঝিনাই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্থানীয় সমাজকর্মী শামস ছোটনের সঙ্গে কথোপকথন করতে করতে বহু বছর আগের একটি স্মৃতি হঠাৎ মনে পড়ে গেল। নিউজিল্যান্ডে পিএইচডি গবেষণার সময় এক বিদেশি অধ্যাপক মজা করে বলেছিলেন, “তোমাদের দেশের মানুষ নাকি নদীও খেয়ে ফেলে!” তখন কথাটি শুনে আমরা হেসেছিলাম। কিন্তু আজ ঝিনাই নদীর শুকিয়ে যাওয়া বুকের দিকে তাকিয়ে সেই মন্তব্য আর রসিকতা বলে মনে হয় না; বরং এটি এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

কারণ আমরা সত্যিই আমাদের নদীগুলোকে গ্রাস করছি। কোথাও নদীর বুক দখল করে গড়ে উঠছে বসতি, কোথাও কৃষিজমি, কোথাও আবার ভরাট হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ। মানচিত্রে নদীর নাম রয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তবে অনেক নদীর অস্তিত্ব আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

একসময় বাংলার নদীপথে ভেসেছে রবীন্দ্রনাথের বজরা, মাঝির কণ্ঠে উঠেছে ভাটিয়ালি, নদীর ঢেউ ও আকাশকে ঘিরে জন্ম নিয়েছে সাহিত্য, সংগীত, প্রেম এবং সভ্যতার অসংখ্য গল্প। নদী ছিল কেবল জলধারা নয়; এটি ছিল বাঙালির জীবনবোধ, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু আজ নদীর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেই স্মৃতি, সেই সংস্কৃতি এবং সেই জীবনধারা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে এই বিপর্যয়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করেছি। নদী হারাচ্ছে, নৌপথ হারাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে—কিন্তু আমাদের উদ্বেগ প্রায়ই সীমাবদ্ধ থাকছে দিবসভিত্তিক আলোচনা, সেমিনার কিংবা প্রতীকী কর্মসূচিতে। প্রশ্ন হলো, আমরা কতগুলো নদীকে সত্যিকার অর্থে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি? কতগুলো নদীর মৃত্যু ঠেকাতে পেরেছি?

ঝিনাই নদীর বর্তমান অবস্থা তাই শুধু একটি নদীর সংকট নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, পরিবেশ-সচেতনতা এবং উন্নয়ন দর্শনের সংকট। নদী হারালে শুধু পানি হারায় না; হারিয়ে যায় কৃষকের জীবিকা, গ্রামীণ সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার।

এখনই সময় আমাদের থামার, আত্মসমালোচনা করার এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের। কারণ নদীকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জলধারাকে রক্ষা করা নয়; নদীকে বাঁচানো মানে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। অন্যথায় হয়তো একদিন ইতিহাস লিখবে—একটি নদীমাতৃক জাতি নিজের হাতেই তার নদীগুলোকে হারিয়ে ফেলেছিল।

শামুক-ঝিনুকের নদী থেকে মৃত্যুপথযাত্রী জলধারা: ঝিনাইয়ের হারানো ইতিহাস, বর্তমান সংকট পুনর্জন্মের সম্ভাবনা

ঝিনাই নদীর গল্প আসলে একটি নদীর গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের নদীমাতৃক সভ্যতার উত্থান, বিকাশ, অবক্ষয় এবং পুনর্জাগরণের সম্ভাবনার গল্প। শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইলের বিস্তীর্ণ জনপদের বুক চিরে প্রবাহিত এই নদী একসময় উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রাণরেখা ছিল। স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, নদীটিতে একসময় বিপুল পরিমাণ শামুক ও ঝিনুক পাওয়া যেত। সেই শামুক-ঝিনুকের প্রাচুর্য থেকেই এর নামকরণ হয় “ঝিনাই”—একটি নাম, যার মধ্যেই লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্যের স্মৃতি।

ভূ-প্রাকৃতিক বিবর্তনের ইতিহাস বলছে, বৃহত্তর ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহপথ পরিবর্তন, যমুনা নদীর সৃষ্টি এবং উত্তরাঞ্চলের নদী ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়েই ঝিনাই নদীর জন্ম ও বিকাশ। শেরপুর জেলার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ১৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও গড়ে ৭৬ মিটার প্রশস্ত এই নদী জামালপুর সদর, মেলান্দহ ও সরিষাবাড়ী অতিক্রম করে টাঙ্গাইলের বংশী নদীতে মিলিত হয়েছে। একসময় সারা বছর নদীর বুকে পানি থাকত, পালতোলা নৌকা চলত, মাছ ধরার জাল ভাসত, আর নদীতীরের হাজার হাজার একর কৃষিজমি সেচের জন্য নির্ভর করত ঝিনাইয়ের ওপর। কৃষকের ফসল, জেলের জাল, মাঝির বৈঠা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্পন্দন—সবকিছুই এই নদীকে ঘিরে আবর্তিত হতো।

আজও কম্পপুরের পুরোনো লোহার রেলসেতু নীরবে সাক্ষ্য দেয় সেই সময়ের, যখন ঝিনাই ছিল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ঔপনিবেশিক আমলে তার ওপর স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হয়েছিল। সেতুটি যেন অতীতের এক জীবন্ত দলিল, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই নদী একসময় শুধু জলধারা নয়, যোগাযোগ, বাণিজ্য, কৃষি এবং বন্যা ব্যবস্থাপনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

কিন্তু সময়ের প্রবাহে নদীর প্রাকৃতিক সংযোগ ক্ষীণ হতে থাকে। উজানে পলি জমা, জলপ্রবাহ হ্রাস, অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ, অবৈধ দখল, ভরাট এবং নিয়মিত খননের অভাবে ঝিনাই ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়েছে। আজ নদীর বিশাল অংশ কচুরিপানায় আচ্ছাদিত। বহু স্থানে নদীর বুক কৃষিজমিতে পরিণত হয়েছে। কোথাও ধান, কোথাও ভুট্টা, কোথাও আবার ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদীর জায়গা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে। যে নদী একসময় প্রবাহমান ছিল, তার অনেক অংশ আজ কার্যত মৃত নদীতে পরিণত হয়েছে।

পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কেবল একটি নদীর সংকট নয়; এটি একটি বৃহত্তর বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হয়, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্য কমে যায়, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আশপাশের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে নদী দখল ও ভরাটের কারণে অতিবৃষ্টি বা বন্যার সময় জলাবদ্ধতা, আকস্মিক প্লাবন এবং পরিবেশগত দুর্যোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।

স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে এক অন্য ঝিনাইয়ের গল্প। তারা বলেন, কয়েক দশক আগেও নদীতে সারাবছর পানি থাকত, বর্ষায় নৌকা চলত, মাছ ধরা হতো, আর নদীর স্রোত ছিল প্রাণবন্ত। আজ সেই স্রোতের জায়গায় দেখা যায় ফসলের ক্ষেত, আর মাঝির গানের জায়গায় শোনা যায় জমি দখলের প্রতিযোগিতার গল্প। ফলে ঝিনাইয়ের সংকট শুধু পরিবেশগত নয়; এটি স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাস হারানোরও গল্প।

তবুও আশার আলো নিভে যায়নি। নদী বিশেষজ্ঞ, পরিবেশকর্মী এবং নদী রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, বৈজ্ঞানিক খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, যমুনার সঙ্গে প্রাকৃতিক সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ঝিনাইকে আবারও জীবন্ত করা সম্ভব। কারণ ঝিনাই শুধু অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি অমূল্য প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ।

যদি আমরা আজ ঝিনাইকে ফিরিয়ে আনতে পারি, তবে সেটি শুধু একটি নদীর পুনর্জন্ম হবে না; বরং একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য, কৃষি অর্থনীতি এবং মানুষের সম্মিলিত স্মৃতিরও পুনর্জাগরণ ঘটবে। ঝিনাইয়ের পুনরুদ্ধার তাই কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের কর্মসূচি নয়; এটি একটি হারিয়ে যেতে বসা সভ্যতাকে পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম।

ঝিনাই শুধু একটি নদী নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া নদীর প্রতীক

মনে রাখতে হবে, এই নিবন্ধে আলোচিত ঝিনাই নদী আসলে একটি কেস স্টাডি মাত্র। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কিংবা উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে তাকালেই দেখা যায়—এমন শত শত নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে। কোথাও নদী ভরাট হয়ে কৃষিজমিতে পরিণত হয়েছে, কোথাও দখলদারিত্বের শিকার, কোথাও পলি জমে প্রবাহ হারিয়েছে, আবার কোথাও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে নদীর প্রাণপ্রবাহ। চিত্রা, কপোতাক্ষ, মরাগাঙ, বারাল, নাগর, আত্রাই, গড়াই, ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, কুমার, করতোয়া—নাম ভিন্ন হলেও তাদের আর্তনাদ প্রায় একই।

একসময় নদীর পানি ছিল কৃষকের আশীর্বাদ। আজ দেশের বহু অঞ্চলের কৃষক সেচের পানির জন্য হাহাকার করছেন। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে, খাল-বিল শুকিয়ে যাচ্ছে, নদীগুলো হারাচ্ছে তাদের ধারণক্ষমতা। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, জীববৈচিত্র্য কমছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। নদী হারানো মানে কেবল পানি হারানো নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি হারানো।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নদীর মৃত্যু বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে মরুকরণ (Desertification)-এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। নদী ও জলাভূমি হারিয়ে যাওয়ার ফলে মাটির আর্দ্রতা কমছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। একদিকে বন্যা, অন্যদিকে খরা—এই দ্বৈত বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নদীভিত্তিক সভ্যতা।

জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং পরিবেশবিদদের বিশ্লেষণ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে নদী সংরক্ষণ আর কেবল পরিবেশগত কর্মসূচি নয়; এটি এখন টিকে থাকার প্রশ্ন। নদী বাঁচানো মানে কৃষি বাঁচানো, খাদ্য নিরাপত্তা বাঁচানো, জীববৈচিত্র্য বাঁচানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষা করা। অথচ আমরা প্রায়শই নদীর কান্না শুনতে পাই তখনই, যখন নদীটি মানচিত্রে নাম হয়ে যায়, বাস্তবে আর নদী থাকে না।

ঝিনাই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই নদীর কান্না শুনতে পাই? নাকি উন্নয়নের কোলাহলে সেই কান্না হারিয়ে যায়? যদি আমরা আজও না জাগি, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্মের কাছে নদী হবে ইতিহাসের একটি অধ্যায়, ভূগোল বইয়ের একটি সংজ্ঞা, অথবা প্রবীণদের স্মৃতিচারণের একটি বিষণ্ন গল্প।

বাংলাদেশের নদীগুলো আজ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঝিনাইয়ের মতো প্রতিটি নদী যেন নীরবে বলছে—“আমাকে বাঁচাও, কারণ আমিই তোমাদের জীবন, তোমাদের ইতিহাস, তোমাদের ভবিষ্যৎ বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—নদীকে বাঁচানো মানে নিজেদের বাঁচানো।

এই পরিণতির দায় কার? ঝিনাই নদীর মৃত্যুর নেপথ্যের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

ঝিনাই নদীর বর্তমান করুণ অবস্থার জন্য কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা কঠিন। বরং এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, পরিকল্পনাহীনতা এবং সমষ্টিগত ব্যর্থতার ফল। নদী রক্ষার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং সাধারণ জনগণেরও। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন নদীর তীরে অবৈধ দখল হয়েছে, নদীর বুক ভরাট করে কৃষিকাজ শুরু হয়েছে, কচুরিপানা ও পলিতে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, তখন কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই দেখা গেছে। ফলে ধীরে ধীরে নদী তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব হারিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ঝিনাই নদীর সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। নদীর সঙ্গে যমুনার প্রাকৃতিক সংযোগ রক্ষা, প্রয়োজনীয় খনন, দখলমুক্তকরণ এবং জলপ্রবাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় নদী ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে নদীকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে ব্যবহার করা, নদীর তলদেশে চাষাবাদ, মাটি ফেলা এবং অবৈধ দখলও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

তবে দায় নির্ধারণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষা গ্রহণ। ঝিনাই নদীর বর্তমান অবস্থা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি নদীকে কেবল তখনই মনে করি, যখন সেটি আর নদী থাকে না? পরিবেশবিদদের মতে, নদীর মৃত্যুর জন্য শুধু প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়, নাগরিক সমাজের নীরবতাও দায়ী। কারণ একটি নদী ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, আর সেই হারিয়ে যাওয়ার প্রতিটি ধাপ সমাজের চোখের সামনেই ঘটে।

অতএব, ঝিনাই নদীর সংকটকে শুধুমাত্র অতীতের ভুলের গল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দায় কার, সেই বিতর্কের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন দায় স্বীকারের সংস্কৃতি এবং পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার। কারণ ইতিহাস আমাদের শেখায়—একটি নদীকে ধ্বংস করতে বহু বছরের অবহেলা লাগে, কিন্তু তাকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সম্মিলিত সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতি। ঝিনাই নদী আজ সেই প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় আছে।

স্থানীয় সমাজকর্মী জনাব শামস ছোটন ঝিনাই নদীর কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর ভাষায়,আমাদের শৈশবের ঝিনাই আর আজকের ঝিনাই এক নয়।” তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে নদীতে সাঁতার কাটা, বর্ষাকালে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, নদীর পাড়ে মাছ ধরা, আর বিকেলের সোনালি আলোয় নদীর তীরে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতি আজও তাঁর হৃদয়ে অম্লান। নদী ছিল তাদের আনন্দ, সাহসিকতা ও প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার এক অনন্য বিদ্যালয়। তিনি স্মরণ করেন, বর্ষার সময় ঝিনাইয়ের বুক জুড়ে পানি আর ঢেউয়ের খেলা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত। নদীর দুই তীর ছিল প্রাণবন্ত, জেলেদের গান, নৌকার বৈঠার ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ এবং গ্রামীণ জীবনের স্পন্দনে মুখর।

কিন্তু আজ যখন তিনি একই স্থানে দাঁড়িয়ে কচুরিপানায় ঢাকা, দখল ও ভরাটে সংকুচিত ঝিনাই নদীকে দেখেন, তখন গভীর বেদনায় জেনাব ছোটনের কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, “যে নদী আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে, আজ আমরা সেই নদীকেই ভুলে গেছি। নদীর বুকজুড়ে এখন ফসলের ক্ষেত, অথচ একসময় এখানে ছিল স্বচ্ছ জল আর জীবনের প্রবাহ।” তবে হতাশার মাঝেও তিনি আশাবাদী। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ এবং পরিবেশপ্রেমীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঝিনাই নদীকে আবারও জীবন্ত করে তোলা সম্ভব। তিনি স্বপ্ন দেখেন এমন এক দিনের, যেদিন তাঁর নাতি-নাতনিরাও ঝিনাই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে প্রবহমান জলধারা দেখবে, নদীর গল্প শুনবে না—নদীকে নিজের চোখে দেখবে। তাঁর আহ্বান,

“ঝিনাইকে বাঁচানো মানে শুধু একটি নদীকে বাঁচানো নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারকে রক্ষা করার সংগ্রাম।”

নদী হারানোর পেছনে কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থারও দায় আছে?

এক কথায় উত্তর দিতে হলে বলতে হয়—হ্যাঁ, অবশ্যই আছে।

কারণ নদীর অপমৃত্যুর পেছনে শুধু দখলদার, দূষণকারী কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতাই দায়ী নয়; দায় আছে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থারও, যা মানুষকে পেশাজীবী বানাতে শিখিয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির অভিভাবক হতে শেখাতে পারেনি। যে শিক্ষা আমাদের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে সাহায্য করে, কিন্তু নিজের এলাকার নদী, খাল বা জলাভূমির আর্তনাদ শুনতে শেখায় না।

ঝিনাই নদীর শুকিয়ে যাওয়া বুকের দিকে তাকালে তাই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত হচ্ছি, নাকি শুধু সনদধারী হয়ে উঠছি?

বাংলাদেশকে আমরা গর্ব করে নদীমাতৃক দেশ বলি। অথচ এই দেশের বহু উচ্চশিক্ষিত মানুষও নিজেদের এলাকার নদীর নাম, ইতিহাস, সংকট কিংবা অস্তিত্ব সম্পর্কে খুব কম জানেন। নদী হারিয়ে গেলে তারা দুঃখিত হন, কিন্তু সেই দুঃখ খুব কমই সামাজিক দায়বদ্ধতা কিংবা নাগরিক আন্দোলনে রূপ নেয়। ফলে নদী হারানোর গল্প ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে যায়; জাতীয় উদ্বেগ হয়ে উঠতে পারে না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবেশ বিষয়ে কিছু পাঠ রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার জন্য। শিক্ষার্থীরা নদীর সংজ্ঞা মুখস্থ করে, নদীর প্রকারভেদ লিখতে পারে, কিন্তু একটি নদী কেন মরে যায়, নদী দখলের ফলে কৃষি, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের কী ক্ষতি হয়, কিংবা একজন নাগরিক হিসেবে নদী রক্ষায় তার ভূমিকা কী—এসব বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা খুব কমই পায়। ফলে পরিবেশ সংকটকে আমরা প্রায়ই নিজেদের সমস্যা হিসেবে দেখি না; বরং অন্য কারও দায়িত্ব বলে মনে করি।

এই বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে Education for Sustainable Development (ESD) বা টেকসই উন্নয়ন শিক্ষা। এর মূল দর্শন হলো—এমন নাগরিক তৈরি করা, যারা শুধু চাকরি বা পেশার জন্য নয়, বরং পৃথিবী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। যারা বুঝবে যে নদী, বন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি টিকে থাকার শর্ত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নদী সংরক্ষণে শিক্ষার ভূমিকা আরও কার্যকর করতে অন্তত চারটি বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

  • প্রথমত, শিক্ষার্থীদের বইয়ের পাতার বাইরে নিয়ে গিয়ে নিজেদের এলাকার নদী, খাল, বিল ও জলাভূমির সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। প্রকৃতিকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে একটি জীবন্ত পাঠশালা হিসেবে দেখতে শেখাতে হবে।
  • দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রমে স্থানীয় পরিবেশ, নদী ও জলবায়ু বাস্তবতাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ যে শিশু নিজের এলাকার নদীর গল্প জানে না, সে নদী রক্ষার দায়িত্বও অনুভব করবে না।
  • তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণে পরিবেশ নাগরিকত্ব, টেকসই উন্নয়ন এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের মূল্যবোধকে আরও শক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষক শুধু তথ্যের বাহক নন; তিনি মূল্যবোধেরও নির্মাতা।
  • চতুর্থত, বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থানীয় পরিবেশ সংরক্ষণের সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা, সচেতনতা, স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ এবং সামাজিক নেতৃত্বের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

ঝিনাই নদীর বর্তমান অবস্থা তাই শুধু একটি নদীর মৃত্যুকাহিনি নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনেও একটি কঠিন আত্মসমালোচনার আয়না তুলে ধরে। কারণ যে সমাজ তার সন্তানদের নদীকে ভালোবাসতে শেখাতে পারে না, সে সমাজ একদিন তার নদীগুলোও হারায়। আর নদী হারানো মানে শুধু একটি জলধারা হারানো নয়; হারিয়ে ফেলা একটি জাতির স্মৃতি, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হয়তো সময় এসেছে নতুন করে প্রশ্ন করার—আমরা কি এমন শিক্ষা চাই, যা শুধু কর্মজীবন গড়ে দেয়, নাকি এমন শিক্ষা চাই, যা মানুষকে তার নদী, প্রকৃতি এবং ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবেও গড়ে তোলে?

শেষ কথা: তবুও আমরা আশাবাদী

ঝিনাই নদীর বর্তমান অবস্থা আমাদের সামনে একটি সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ যদি আমরা ঝিনাইকে বাঁচাতে না পারি, তবে কাল হয়তো আরও অনেক নদীর জন্য একই শোকগাথা লিখতে হবে। আর যদি আমরা নদীগুলোকে পুনর্জীবিত করতে পারি, তবে সেটি হবে শুধু পরিবেশ রক্ষার সাফল্য নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও টেকসই করার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। কারণ সত্যটি খুবই সহজ—

নদী বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ;
নদী মরলে হারাবে বাংলাদেশ

ঝিনাই নদীর শুকিয়ে যাওয়া বুকের দিকে তাকালে হতাশা গ্রাস করতেই পারে। কখনও মনে হয়, আমরা যেন এমন এক জাতিতে পরিণত হচ্ছি, যারা নিজেদের নদী, খাল, বিল, জলাভূমি—সবকিছুই ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলছে। এই দেশে নদী দখলকারী আছে, পরিবেশ ধ্বংসকারী আছে, দায়িত্বহীন প্রশাসন আছে, সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালোভী পরিবেশবাদীরও অভাব নেই। অনেক সময় মনে হয়, নদীর চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থই যেন বড় হয়ে উঠেছে।

তবুও আমরা আশাবাদী। কারণ এই দেশেই এখনও শামস ছোটনের মতো মানুষ আছেন। এমন মানুষ, যিনি একটি মৃতপ্রায় নদীর সামনে দাঁড়িয়ে কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ করেন না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদীকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখেন। জামালপুরবাসীর সৌভাগ্য যে, ঝিনাই নদীর এমন ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেও সেখানে শামস ছোটনের মতো সমাজসচেতন, পরিবেশপ্রেমী মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের অনেক জেলা ও উপজেলায় আজও এমন কণ্ঠ খুব দুর্লভ। অথচ একটি নদীমাতৃক দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হওয়া উচিত এমন মানুষ, যারা নদীকে কেবল জলধারা নয়, জাতির অস্তিত্বের অংশ হিসেবে দেখতে শেখে।

আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি প্রকৃতি, নদী ও পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধ নাগরিক গড়ে তোলার দিকে আরও মনোযোগী হয়, তাহলে আগামী দিনে হাজার হাজার শামস ছোটনের জন্ম হবে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় উদ্যোগ থেকে উঠে আসবে নতুন এক প্রজন্ম, যারা নদীকে দখল করবে না, রক্ষা করবে; যারা প্রকৃতিকে ভোগের বস্তু নয়, উত্তরাধিকার হিসেবে দেখবে।

সেদিন হয়তো ঝিনাই আবার জেগে উঠবে। ফিরে আসবে তার হারানো স্রোত। নদীর বুকে আবার ভাসবে নৌকা, জেলের জালে ধরা পড়বে মাছ, শিশুরা নদীর তীরে খেলবে, কৃষকের জমি পাবে জীবনের জল। নদীর সঙ্গে ফিরবে মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই আমাদের শেষ উচ্চারণ হতাশার নয়, প্রত্যয়ের। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের নদীগুলোর ভাগ্য এখনও পুরোপুরি নির্ধারিত হয়ে যায়নি। কারণ যতদিন এই দেশে নদীর জন্য কাঁদতে জানে এমন মানুষ থাকবে, যতদিন শামস ছোটনের মতো নাগরিকরা স্বপ্ন দেখতে সাহস করবেন, ততদিন নদীর পুনর্জন্মের সম্ভাবনাও বেঁচে থাকবে।

তাই আজকের এই পরিবেশ দিবসে উদাত্ত আহ্বান জানাই, আসুন ঝিনাইয়ের লেন্সে বাংলাদেশ দেখি —নদীর কান্না শুনতে চেষ্টা করি। আর এই দিবসের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটির মোকাবেলা করি—যে দেশে নদীগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে, সেই দেশে টেকসই ভবিষ্যতের স্বপ্ন কতটা বাস্তব? ঝিনাইয়ের শুকিয়ে যাওয়া জলরেখা যেন আজ সমগ্র বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলার শেষ আহ্বান।

নদী আবার হাসুক। নদী আবার বাঁচুক।
আর নদীর সঙ্গেই বেঁচে থাকুক বাংলাদেশ।

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#ঝিনাই_নদী #ShamsChoton #শামস_ছোটন #বিশ্ব_পরিবেশ_দিবস #নদী_বাঁচাও #SaveJhenaiRiver #SaveOurRivers #নদীর_কান্না #অধিকারপত্র #জামালপুর #পরিবেশ_সংরক্ষণ #RiverRights #ClimateJustice #বাংলাদেশের_নদী #নদী_মরলে_হারাবে_বাংলাদেশ #নদী_বাঁচলে_বাঁচবে_বাংলাদেশ #EnvironmentalAwareness #NatureConservation #WaterJustice #RiverRestoration



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: