02/01/2026 বগুড়া–সিরাজগঞ্জ রেলপথ: ভারত সরে, এআইআইবির অর্থায়নে নতুন গতি — কিন্তু খরচ বাড়ার আশঙ্কা
odhikarpatra
৯ December ২০২৫ ২৩:৫৯
ঢাকা—বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ (শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন) পর্যন্ত নতুন ডুয়েল–গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে বাংলাদেশ রেলওয়ে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) থেকে অর্থায়ন নেওয়ার প্রস্তাবের প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামও বলেন—এআইআইবি এই প্রকল্পে অর্থায়ন করতে আগ্রহী; ইআরডিকে (ERD) এ বিষয়ে মতামত জানাতে বলা হয়েছে এবং এখন এ বিষয়ে ইআরডি কাজ করছে।
প্রকল্প দীর্ঘদিন ধীরগতিতে গেলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ভারতীয় ‘লাইন অব ক্রেডিট’(LOC) থেকে প্রকল্পটি 'ডি-লিস্ট' করা হয়েছে; এর ফলে আর্থিক সূত্র পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে এবং বিকল্প অর্থায়ন হিসেবে এআইআইবি–র সম্ভাব্য ঋণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পপ-ওভার (policy) পরিবর্তন নিয়ে রেলওয়ের পক্ষ থেকে নোটিশ ও পিডিপিপি পাঠানো হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে।
প্রকৌশল ও বাস্তবায়নগত অবস্থা: ২০১০ সালে এ প্রস্তাব প্রথম প্রাক-সমীক্ষায় (pre-feasibility) যাওয়া, ২০১৭-২০১৮ সময়কালে ভারতের এলওসি-ভিত্তিক উদ্যোগ ও একনেক অনুমোদনের ইতিহাস থাকার পর প্রকল্পটি নানা কারণে বারবার পেছালো। প্রস্তাবিত ব্যয় যখন প্রথম ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা; পরে বাস্তবতা পরিবর্তিত হওয়ায় এবং ভারতীয় অর্থায়ন না-mature হওয়ায় বর্তমানে ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত অক্টোবর পর্যন্ত মোট ভৌত কাজ হয়েছে প্রায় ২৪.৮০ শতাংশ এবং এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১,৯৪৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা—যার অধিকাংশই (প্রায় ১,৯২৮ কোটি ৭৩ লাখ) সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন।
ভূমি অধিগ্রহণ ও রাজস্ব সরবরাহ: প্রকল্প অনুমোদনের আট বছরের মাথায় ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে—অর্থ মন্ত্রণালয় ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ মোট ১,৯২০ কোটি ১০ লাখ টাকা ছাড় করেছে এবং ২৪ জুন বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলাকে যথাক্রমে ৯৬০ কোটি ১০ লাখ ও ৯৬০ কোটি টাকার চেক দেয়া হয়েছে বলে সরকারি নথি ও বার্তায় উল্লেখ আছে। ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হলে প্রকল্পের নির্মাণ কাজে গতি আসার প্রত্যাশা দেখানো হচ্ছে।
প্রকল্পে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো: প্রস্তাব অনুযায়ী মোট প্রায় ৮৫.৬ কিমি মূল লাইনের সঙ্গে ৩৭.৪৯ কিমি লুপ লাইন নির্মাণ করা হবে; করতোয়া ও ইছামতী নদীতে দুটি বড় সেতু, মোট ২৫টি মূল রেলসেতু, ৯১টি আরসিসি বক্স কালভার্ট, একটী সড়ক ওভারপাস, একটী রেল উড়াল ও একটী সড়ক আন্ডারপাস নির্মাণসহ পথের একাধিক স্টেশন-সংযোজন কাজ রয়েছে।
নতুন রুটে সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছোনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রাণীরহাটে মোট আটটি স্টেশন, কাহালু স্টেশন পুনর্নির্মাণ ও শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। এছাড়া ১১টি স্টেশনে কম্পিউটার ভিত্তিক সিগন্যালিং স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও বিশ্লেষণ: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হকের মত—প্রথমেই দেখতে হবে প্রকল্পটি 'রিকোয়েস্ট-ভিত্তিক' (demand-driven) কি না; ২০১৮ সালের তুলনায় বর্তমানে নির্মাণ ব্যয় দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়লে প্রকল্পটি এখনও ফিজিবল কি না, সেটা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ সময় দেরি, মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে অতিরিক্ত খরচ ৩–৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ওঠার সম্ভবনা নিয়েও সংবাদ, বিশ্লেষণ ও জনমত উঠে এসেছে। এ কারণে আর্থিক ব্যাকআপ ও কস্ট–রিভিউ (cost review) জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা দেখেন।
বগুড়া–সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পটি উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ—তবে ভারতীয় এলওসি-র বাইরে এসে নতুন অর্থায়ন (যেমন: AIIB) নেওয়া হলে প্রকল্প ব্যয়, সমস্যা ও বাস্তবায়ন সময়রেখা সম্পর্কে সরকারি এবং স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক পর্যায় থেকে পুনরায় যাচাই-নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন। রেলওয়ে বলছে—তারা সম্মতি দিয়েছে এবং এখন ইআরডি ও সংশ্লিষ্ট দফতর এ বিষয়ে কাজ করছে; জনসাধারণ জানতে চাইবে—কোন শর্তে, কীভাবে এবং কখন টাকা আসবে এবং প্রকল্পটা কবে শেষ হবে।