03/01/2026 লাঞ্ছিত বিবেক: বাংলাদেশের শ্রেণিকক্ষে বিষণ্ণতার দেড় বছর, মব-যন্ত্রণায় বিপন্ন মশালবাহীদের মাঝে আস্থা পুনরুদ্ধারের পাঁচ দফা
Dr Mahbub
১ March ২০২৬ ০৪:৪৪
—শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক (পর্ব ৭)
শিক্ষক অপমানের উন্মত্ততায় দেড় বছরের স্থবিরতা
শ্রেণিকক্ষ একসময় ছিল আলো জ্বালানোর জায়গা। সেখানে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা অক্ষর মানে ছিল ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি, যেখানে সেই শ্রেণিকক্ষের ভেতরেই অস্থিরতা, সন্দেহ আর ভয়ের ছায়া নেমে এসেছে। শিক্ষক অপমান যেন এক ধরনের সামাজিক উন্মত্ততায় পরিণত হয়েছে। আর এই উন্মত্ততার অভিঘাতে স্থবির হয়ে পড়ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা।
গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস যেন এক অদ্ভূত ভারী মেঘে ঢাকা। ২০২৪-এর উত্তাল সময় থেকে ২০২৬-এর আজকের এই দিন পর্যন্ত—ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো উল্টালে কেবল তারিখ মেলে না, মেলে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামল শুরু হয়েছিল এক নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়, এক বৈষম্যহীন শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতিতে। কিন্তু সেই সূর্যোদয়ের আলো সবখানে পৌঁছালেও, আমাদের জ্ঞানপিপাসু শ্রেণিকক্ষগুলো যেন ক্রমশ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে শিক্ষকদের কান্নার সুর, অপমানের আর্তনাদ আর মব-ভায়োলেন্সের পৈশাচিক উল্লাস। যে শিক্ষক একসময় ছিলেন গ্রামের ‘গুরুজন’, শহরের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’—আজ তিনি পরিস্থিতির শিকার এক অসহায় মানুষ।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়। ঢাকার এক স্বনামধন্য সরকারি কলেজের করিডোরগুলো তখন ছাত্র-ছাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকার কথা। কিন্তু সেদিন পরিবেশ ছিল ভিন্ন। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে একদল শিক্ষার্থীর ক্ষোভ যখন চরমে, তখন সেই ক্ষোভকে পুঁজি করে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষ ছড়াতে শুরু করে। বিকেলের ম্লান আলোয় দেখা গেল এক বীভৎস দৃশ্য। এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, যিনি নিজের জীবনের অর্ধেকটা সময় বিলিয়ে দিয়েছেন এই কলেজেরই ছাত্রদের পেছনে, তাঁকে ঘিরে ধরেছে একদল কিশোর ও যুবক।
সেদিন তাঁর গায়ে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল, তাঁর সাদা পাঞ্জাবিটা ধুলোয় মলিন হয়ে গিয়েছিল। সেই শিক্ষকের অপরাধ? তিনি কেবল সঠিক নিয়ম মেনে ফলাফল দিতে চেয়েছিলেন। সেই ঘটনার ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হলো। ডিজিটাল স্ক্রিনে মানুষ দেখল একজন শিক্ষকের লাঞ্ছনা, কিন্তু কেউ দেখল না সেই রাতে তাঁর বাড়ির অন্ধকার ঘরে বসে থাকা এক বৃদ্ধের নীরব অশ্রু। তাঁর পরিবারের স্বপ্নগুলো সেদিন ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে খবর এলো ছোট এক কলামে, কিন্তু সেই শিক্ষকের আত্মার যে মৃত্যু ঘটল, তার দায়ভার কে নেবে?
গাজীপুরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সেই সকালটির কথা ভাবলে আজও বুক কেঁপে ওঠে। ২০২৪-এর সেপ্টেম্বর মাস। ক্লাসে হয়তো তখন জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ানো হচ্ছিল, কিংবা বিজ্ঞানের কোনো জটিল সূত্র। হঠাৎ একদল উন্মত্ত যুবক বিদ্যালয়ে ঢুকে পড়ে। কোনো কথা নেই, কোনো বার্তা নেই—সরাসরি প্রধান শিক্ষকের কক্ষে হানা। অভিযোগ? একটি বিকৃত ভিডিও। কেউ যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেনি ভিডিওটি আসল না কি আই প্রযুক্তিতে তৈরি ‘ডিপফেক’।
সহকর্মী আর আদরের ছাত্রদের সামনে সেই বৃদ্ধ শিক্ষককে টেনে-হিঁচড়ে স্কুল প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হলো। তাঁকে বাধ্য করা হলো কানে ধরে ওঠবোস করতে, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে। শিক্ষকটি বারবার বলছিলেন, “আমি তো কিছু জানি না বাবা, আমাকে ক্ষমা করো।” কিন্তু মব-সন্ত্রাস কোনো যুক্তি শোনে না। তারা চেনে কেবল গলার স্বর আর গায়ের জোর। পরবর্তীতে প্রমাণ হলো ভিডিওটি সাজানো ছিল, কিন্তু ততদিনে সেই শিক্ষকের সারাজীবনের অর্জিত সম্মানটুকু মাটিতে মিশে গেছে।
একই চিত্র দেখা গেল খুলনায়। সেখানে এক কলেজ শিক্ষককে ধর্মীয় অবমাননার ভিত্তিহীন তকমা দিয়ে তাঁর বাড়ির সামনে ‘জনতার আদালত’ বসানো হলো। পুলিশের উপস্থিতিতেও জনতা ক্ষান্ত হয়নি। সেই শিক্ষকের ছোট মেয়েটি, যে হয়তো তার বাবাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ মনে করত, সে দেখল তার বাবাকে অপরাধীর মতো কুঁকড়ে থাকতে। সেই কিশোরীর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, প্রতিবেশীদের বাঁকা দৃষ্টি তাকে আজ ঘরবন্দি করে ফেলেছে। এটি কেবল একজন শিক্ষকের অপমান নয়, এটি একটি প্রজন্মের বিশ্বাসের মৃত্যু।
গত দেড় বছরে আমরা একটি নতুন এবং ভয়ংকর শব্দের সাথে পরিচিত হয়েছি—‘মব’ (Mob)। যখন একদল মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং বিচারের আগেই রায় ঘোষণা করে দেয়। ২০২৫ সালের শুরুতে দেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এর সংক্রামক ছোঁয়া লাগে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এক প্রবীণ অধ্যাপকের কক্ষ ঘেরাও করে রাখা হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যে শিক্ষক একসময় মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্রদের অধিকারের জন্য, তাঁকেই আজ ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে গালি দেওয়া হচ্ছে।
এক অধ্যাপক তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি বললেন, “আমি চশমা ছাড়া চোখে দেখি না। সেদিন ভিড়ের ধাক্কায় আমার চশমাটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল। আমি হাত দিয়ে চশমাটা খুঁজছিলাম, আর চারপাশ থেকে তখন স্লোগান আসছিল আমার বিরুদ্ধে। আমি সেদিন চশমা খুঁজছিলাম না, আমি আমাদের নৈতিকতা খুঁজছিলাম।” এই চশমা ভাঙার শব্দ আসলে আমাদের শিক্ষা-কাঠামো ভেঙে পড়ার শব্দ।
বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের এই নজিরবিহীন টানাপোড়েন আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক চরম অশনি সংকেত। শিক্ষা কেবল কিছু তথ্যের আদান-প্রদান নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আত্মিক গঠন প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মূলে রয়েছে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা আর শিক্ষার্থীর প্রতি স্নেহ। যখন ভয় বা মব-ভায়োলেন্সের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে কর্তৃত্ব স্থাপনের চেষ্টা করা হয়, তখন সেখানে মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়।
শিক্ষকরা আজ আতঙ্কিত। তাঁরা শ্রেণিকক্ষে পা রাখতে ভয় পান। তাঁরা ভাবেন, কোনো একটি শব্দ বা বাক্য যদি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে কি কাল আমার কলার ধরে টান দেওয়া হবে? এই ভীতিকর পরিবেশে সৃজনশীলতা জন্ম নিতে পারে না। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরা যখন দেখে তাদের ‘গুরু’দের এভাবে লাঞ্ছিত করা যায়, তখন তাদের মনে এক ধরনের নেতিবাচক ঔদ্ধত্য বা ‘সুপারিওরিটি কমপ্লেক্স’ তৈরি হয়। এটি তাদের ভবিষ্যতে অপরাধপ্রবণ করে তুলবে। একটি জাতি যদি তার শিক্ষকদের সম্মান করতে না শেখে, তবে সেই জাতি অন্ধকার অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে বাধ্য।
বরিশালের সেই প্রধান শিক্ষিকার কথা ভাবুন, যিনি মিড-ডে মিলের স্রেফ বরাদ্দের অভাবে ছাত্রদের খাবার দিতে না পারায় অবরুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে ওদের খাওয়াই মাঝেমধ্যে, আজ পারিনি বলে ওরা আমার গায়ে হাত তুলল?” তাঁর এই দীর্ঘশ্বাস আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয়।
শিক্ষকরা হলেন সেই মশালবাহী, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলো দিয়ে যান। কিন্তু গত দেড় বছরে আমরা সেই মশালের ওপর বারবার কালি লেপে দিয়েছি। আমরা ভুলে গেছি যে, শিক্ষক অপমানিত হওয়া মানে আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অপমানিত হওয়া। যখন একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের বদলে আদালতে হাজিরা দেন কিংবা মবের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন আসলে পরাজয় ঘটে আমাদের সবার।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বিশাল জনম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশ আজ এক নতুন দিগন্তের অপেক্ষায়। গত দেড় বছরে রাষ্ট্র সংস্কারের নানাবিধ ডামাডোলে অসংখ্য কমিটি গঠিত হয়েছে, বিভিন্ন খাতে অঢেল অর্থ ব্যয় হয়েছে—কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি যে শিক্ষা ব্যবস্থা, তার মৌলিক সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো সাহসী পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। উল্টো ‘মব’ নামক এক বিষাক্ত অপসংস্কৃতিকে শিক্ষাঙ্গনে শিকড় গেড়ে বসতে দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত মূল্যবোধকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
এই সংকটময় মুহূর্তে নবনির্বাচিত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষক সমাজের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কারণ, শিক্ষকরাই হলেন একটি রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক মেরুদণ্ড। একটি শিক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও মেধাভিত্তিক জাতি গঠন করতে হলে সবার আগে শিক্ষকদের পেশাগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। মাঠপর্যায়ে সরকারের যেকোনো নীতি বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সফল করতে শিক্ষকদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া গত্যন্তর নেই। শিক্ষকরা যদি আজ নিজেদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ কিংবা ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেন, তবে তাঁরা রাষ্ট্রের অর্পিত গুরুদায়িত্ব পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন—যা একটি জাতির জন্য চরম অশনি সংকেত।
তাই নতুন সরকারকে কেবল কাগুজে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলে চলবে না; বরং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। যারা শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলেছে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণ্য উসকানি ছড়িয়ে মব-সন্ত্রাসকে উসকে দিয়েছে, তাদের বিচার করতে হবে দ্রুততম সময়ে। মনে রাখা প্রয়োজন, যে সরকার তার দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে রক্ষা করতে পারে না, সেই সরকারের নৈতিক ভিত্তি তাসের ঘরের মতোই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। শিক্ষকদের সম্মান রক্ষা করা মানেই আসলে রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষা করা।
একটি জাতির মেরুদণ্ড যদি ভেঙে পড়ে, তবে তার আকাশছোঁয়া দালানকোঠা আর বাহ্যিক উন্নয়ন স্রেফ বালির বাঁধের মতো নড়বড়ে হয়ে যায়। গত দেড় বছরে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে যে অস্থিরতার ঝড় বয়ে গেছে, তাতে আমাদের সেই বৌদ্ধিক মেরুদণ্ড—অর্থাৎ শিক্ষক সমাজ—আজ চরমভাবে বিপর্যস্ত। মব-ভায়োলেন্স, জোরপূর্বক পদত্যাগ আর প্রকাশ্য লাঞ্ছনার যে ক্ষতগুলো তৈরি হয়েছে, তা কেবল ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর এক বিরাট কলঙ্ক। এই ঘোর অমানিশা কাটিয়ে শিক্ষকদের মনে নিরাপত্তার বোধ ফিরিয়ে আনা এবং শ্রেণিকক্ষে তাঁদের হারানো গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এখন আর কেবল সদিচ্ছার বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থায় পরিণত হয়েছে। এই ভেঙে পড়া আস্থার ভিত পুনরায় গড়ে তুলতে এবং একটি বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও মর্যাদাশীল শিক্ষা ব্যবস্থা বিনির্মাণে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এজন্য পাঁচদফা প্রস্তাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে:
গত দেড় বছরে শিক্ষকদের ওপর ঘটে যাওয়া এই নির্মমতার বিচার কেবল মৌখিক আশ্বাস বা বিভাগীয় ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রতিটি লাঞ্ছনা, প্রতিটি চোখের জল আর প্রতিটি অপমানের হিসাব নেওয়ার সময় এসেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের 'বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি' গঠন করা। এই কমিটি কেবল বড় ঘটনাগুলো নয়, বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া প্রতিটি নিগ্রহের ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অনুসন্ধান করবে। একজন বিচারকের নেতৃত্বে এই কমিটিতে শিক্ষাবিদ, মানবাধিকার কর্মী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এই তদন্ত কমিটির মূল কাজ হবে প্রতিটি ঘটনার নেপথ্য কারণ খুঁজে বের করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষকদের ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে সেই কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে যারা পর্দার আড়ালে থেকে 'মব' বা উত্তেজিত জনতাকে উসকে দিয়েছে। যখন অপরাধীরা জানবে যে প্রতিটি ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে এবং পার পাওয়ার কোনো পথ নেই, তখনই কেবল ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য মব-কালচার থামানো সম্ভব হবে।
দফা-২. প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান: ন্যায়বিচারের শেষ ভরসা
একটি স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ সমাজ বিনির্মাণের জন্য প্রয়োজন প্রতিটি ঘটনার ‘কেস-বাই-কেস’ অনুসন্ধান। অনেক সময় দেখা যায়, স্রেফ একটি অভিযোগ তুলেই শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয় কিংবা তাঁর সামাজিক সম্মান কেড়ে নেওয়া হয়। বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটিকে এই ধারা ভাঙতে হবে। প্রতিটি ঘটনার ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট (যেমন সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওর সত্যতা যাচাই), প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং অভিযুক্তদের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখতে হবে। কেবল আইনগত বিচার নয়, বরং যে শিক্ষকরা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছেন, তাঁদের সম্মান পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘সম্মাননা পত্র’ বা ‘প্রকাশ্য পুনর্বাসন’ নিশ্চিত করতে হবে।
যদি প্রতিটি ঘটনার সঠিক বিচার না হয়, তবে এটি সমাজে একটি ভয়াবহ বার্তা দেবে যে—শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা একটি সস্তা এবং শাস্তিহীন অপরাধ। একটি শক্তিশালী বিচারিক কাঠামোর মাধ্যমেই কেবল শিক্ষকদের মনে হারানো নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। যখন রাষ্ট্র একজন নিগৃহীত শিক্ষকের পাশে এসে দাঁড়াবে এবং অপরাধীকে কাঠগড়ায় তুলবে, তখনই কেবল শ্রেণিকক্ষে আবারও জ্ঞানের প্রকৃত আলো ছড়িয়ে পড়বে।
গত দেড় বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে, প্রচলিত আইন দিয়ে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা এখন আর যথেষ্ট নয়। তাই সময়ের দাবি হলো—‘শিক্ষক সুরক্ষা ও মর্যাদা আইন’ নামক একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করা। এই আইনের অধীনে শিক্ষকদের ওপর যেকোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক নিগ্রহকে ‘অজামিনযোগ্য অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করতে হবে। বিশেষ করে শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক অপপ্রচার চালানোকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এই আইনের মূল লক্ষ্য হবে এমন একটি রক্ষাকবচ তৈরি করা, যাতে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা উন্মত্ত জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শিক্ষকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার সাহস না পায়।
একটি স্বাধীন বিচারিক কাঠামো বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এই আইন দ্রুত কার্যকর করতে হবে, যাতে শিক্ষক নিগ্রহের মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে না থাকে। যদি রাষ্ট্র আইনগতভাবে শিক্ষকদের অভয়ারণ্য নিশ্চিত করতে না পারে, তবে আগামীর মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে বিমুখ হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষককে সুরক্ষা দেওয়ার অর্থ কেবল একজন ব্যক্তিকে রক্ষা করা নয়, বরং একটি জাতির নৈতিক মেরুদণ্ডকে সোজা করে রাখা। নতুন আইনের মাধ্যমে এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষকরা ভয়হীন চিত্তে জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করতে পারবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে একটি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে।
শিক্ষাঙ্গনে মব-সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলার ফলে সবচেয়ে বড় যে অবিচারটি করা হয়েছে, তা হলো অসংখ্য শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা কিংবা বিনা তদন্তে সাময়িক বরখাস্ত (Suspend) ও চাকরিচ্যুত (Dismiss) করা। একটি সভ্য রাষ্ট্রে এটি কেবল অমানবিক নয়, বরং আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ও শিক্ষকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতি আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবি:
যাঁরা জীবনভর মশাল জ্বেলেছেন, তাঁদের এভাবে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া মানে জাতিকে অন্ধ করে দেওয়া। এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া কেবল শিক্ষকদের প্রতি করুণা নয়, বরং এটি তাঁদের আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে কেবল আইনের শাসনই যথেষ্ট নয়, বরং এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। গত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি, দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানোর এক আত্মঘাতী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে—প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত—অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদদের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। যখন একজন প্রকৃত জ্ঞানতপস্বী তাঁর যোগ্য আসনে বসেন, তখন সেখানে মব-ভায়োলেন্স বা বিশৃঙ্খলার সুযোগ থাকে না। রাজনীতির চোরাবালিতে যখন মেধা হার মেনে যায়, তখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ধস নামে এবং শিক্ষকরা অসহায় হয়ে পড়েন।
একটি আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে শিক্ষা প্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। বদলি, পদোন্নতি কিংবা নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে কেবল মেধা, জ্যেষ্ঠতা এবং অভিজ্ঞতাকে মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। একইসাথে, শিক্ষা খাতে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করা প্রয়োজন। যখন প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে যৌক্তিক স্বচ্ছতা থাকবে, তখন কোনো অশুভ শক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে শিক্ষকদের জনরোষের মুখে ঠেলে দিতে পারবে না। সঠিক স্থানে সঠিক মানুষকে বসানোর মাধ্যমেই কেবল শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলার সুবাতাস ফেরানো সম্ভব। কারণ, যে শিক্ষার নেতৃত্বে কোনো অভিজ্ঞ কাণ্ডারি থাকে না, সেই শিক্ষা ব্যবস্থা দিশেহারা হয়ে পড়তে বাধ্য।
সময় এসেছে গভীর আত্মোপলব্ধির। আমরা কি সত্যিই এমন এক বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, যেখানে শিক্ষকের সাদা পাঞ্জাবি ধুলোয় মলিন হবে আর গুরুর চশমা লুটোপুটি খাবে উন্মত্ত জনতার পায়ের নিচে? অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের এই অস্থিরতা হয়তো একদিন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় রূপ নেবে, ক্ষমতার পালাবদল হবে, রাজপথ শান্ত হবে; কিন্তু শিক্ষকদের মনে অপমানের যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা স্রেফ সময়ের প্রলেপে শুকাবে না। আমাদের মনে রাখা উচিত, ইট-পাথর বা বিশাল দালান দিয়ে কোনো বিদ্যাপীঠ হয় না; একটি প্রকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পবিত্র আর আস্থার সম্পর্কের ওপর। সেই পবিত্রতা আজ ভূলুণ্ঠিত, সেই বিশ্বাস আজ খাদের কিনারায়।
আসুন, আমরা দল-মত নির্বিশেষে সম্মিলিতভাবে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াই। তাঁদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা মানে কেবল একদল মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া নয়, বরং একটি জাতির নৈতিক অস্তিত্বকে রক্ষা করা। রাষ্ট্রকে আজ বুক দিয়ে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আগলে রাখতে হবে। আজকের এই বিচারহীনতা আর ভয়ের অন্ধকার কেটে যাক; প্রতিটি শিক্ষক যেন আবার নির্ভয়ে, সগৌরবে এবং সম্মানের সাথে শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেন—এই হোক আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না। কারণ, যে সমাজ তার শিক্ষকদের সম্মান দিতে জানে না, সেই সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারের গহ্বরে নিক্ষেপ করে।
আজকের এই অন্ধকার কেটে যাক, প্রতিটি শিক্ষক আবার মাথা উঁচু করে শ্রেণিকক্ষে ফিরুন—এই হোক আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
বিশেষ ঘোষণা: আগামী কাল অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকেনর পরবর্তী পর্বে (পর্ব ৮) আমরা আলোচনা কর : ”২ মার্চ — পতাকার মান ও উচ্চশিক্ষার বিপন্ন গরিমা: স্মৃতির আয়নায় সেই ফাগুন ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা (সম্পাদকীয়)”
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংস্কার #শিক্ষক_অপমান #মব_সন্ত্রাস #শিক্ষার_নিরাপত্তা #শিক্ষকের_সম্মান #শ্রেণিকক্ষের_নিরাপত্তা #আইনের_শাসন #শিক্ষা_ব্যবস্থার_সংকট #সম্মান_ও_দায়বদ্ধতা #জাতির_ভবিষ্যৎ