03/15/2026 ফিরে দেখা শাস্তিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালার ১৪ বছর: উদ্দেশ্য, বাস্তবতা ও অনুত্তরিত প্রশ্ন
Dr Mahbub
১৪ March ২০২৬ ১৫:৩৯
— অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
২০১১ সালে প্রণীত “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিতকরণ নীতিমালা” শিশু অধিকার ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। তবে প্রায় ১৪ বছর পর এই নীতিমালার কার্যকারিতা, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ পরিচালনায় প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। এই নিবন্ধে শিক্ষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, গবেষণালব্ধ ধারণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে নীতিমালার শক্তি, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব প্রয়োগের সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইতিবাচক শৃঙ্খলা পদ্ধতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণাভিত্তিক নীতিমালা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার দিকেও আলোকপাত করা হয়েছে। বাস্তবিক অর্থেই সমসয়ের পরিক্রমায় শিশু অধিকার রক্ষার মানবিক লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত শাস্তিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালা এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ নতুন প্রশ্নের মুখে। নীতিমালার উদ্দেশ্য, বাস্তব প্রয়োগ, শিক্ষকদের কর্তৃত্ব সংকোচন এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—এসব বিষয় নতুন করে ভাবনার দাবি তুলছে।
২০১১ সালের ২১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিতকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা–২০১১"” শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্র জারি করে (নং–৩৭.০৩১.০০৪.০২.০০.১৩৪.২০১০–১৫১, ০৮ বৈশাখ ১৪১৮ বঙ্গাব্দ)। পরিপত্রে বলা হয়, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু অধিকার সংরক্ষণ এবং শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য একটি নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি একদিকে যেমন শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক বিকাশ এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার পথেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সম্পূর্ণভাবে রহিত করার লক্ষ্যে এই নীতিমালা প্রণয়ন করে।
নীতিমালার ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, এই নীতিমালার কঠোর প্রয়োগের ফলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে পড়াশোনায় আরও আগ্রহী ও উৎসাহিত হবে, তাদের মেধার বিকাশ ঘটবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর এই নীতিমালার বাস্তব ফলাফল কতটুকু অর্জিত হয়েছে? আজকের দিন পর্যন্ত হিসাব করলে নীতিমালাটি কার্যকর হওয়ার প্রায় ১৪ বছর ১০ মাসেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কি কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন হয়েছে? শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি নিশ্চিতভাবে বলতে পারে, এই নীতিমালার ফলে শিক্ষার্থীরা কতটা উপকৃত হয়েছে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কি সত্যিই একটি আনন্দঘন ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়েছে?
উন্নত বিশ্বে শিক্ষা সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা প্রণয়নের পর নিয়মিত বিরতিতে তা পর্যালোচনা করা হয়। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে গবেষণা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে নীতিমালার শক্তি ও দুর্বলতা নির্ধারণ করা হয় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়। অর্থাৎ নীতিমালার উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের দেশে নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও তার কার্যকারিতা মূল্যায়নের সংস্কৃতি খুব বেশি দেখা যায় না। একবার কোনো নীতিমালা প্রণীত হলে তা দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত অবস্থায় থেকে যায়, যেন সেটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
এই নীতিমালা দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মাদ্রাসাসহ (আলিম পর্যন্ত) অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। এতে শিক্ষার্থীদের প্রতি শারীরিক বা মানসিক শাস্তি প্রদানকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রয়োজনবোধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর আওতায় অসদাচরণ হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নীতিমালায় শাস্তির সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীকে দেওয়া এমন শারীরিক বা মানসিক দণ্ডকে শাস্তি বলা হবে, যা তার মর্যাদা, নিরাপত্তা বা মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শারীরিক শাস্তির মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীর শরীরে আঘাত করা, ধাক্কা দেওয়া, চুল টানা, চিমটি কাটা, কান ধরে ওঠবস করানো কিংবা অস্বস্তিকর অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা ইত্যাদি। অন্যদিকে মানসিক শাস্তির মধ্যে পড়েছে এমন মন্তব্য বা আচরণ, যা শিক্ষার্থীর আত্মসম্মানকে আঘাত করে বা তার মনে ভয়, লজ্জা কিংবা অপমানের অনুভূতি সৃষ্টি করে।
এখানে প্রশ্ন হলো, শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার বিকল্প কী—সে বিষয়ে নীতিমালায় স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। শিক্ষকরা কীভাবে শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন বা অনিয়মকারী শিক্ষার্থীদের কীভাবে ইতিবাচকভাবে পরিচালনা করবেন, সে বিষয়ে কার্যকর কোনো কাঠামো নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নীতিমালার ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী সময়ে সময়ে এই নীতিমালায় পরিবর্ধন, সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে গত এক যুগেরও বেশি সময়ে এ ধরনের কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—নীতিমালাটি কি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যালোচনা করা হয়েছে?
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নীতিমালার ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের একটি উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও আকর্ষণীয় ও আনন্দময় করার জন্য পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের সংস্কার করার ক্ষমতা কোনো একক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে না। পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন সাধারণত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধ করার লক্ষ্য নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। তার কার্যকারিতা মূল্যায়ন, বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সংশোধন এবং শিক্ষকদের জন্য বাস্তবসম্মত নির্দেশনা প্রদান—এসব বিষয় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নয়, বরং গবেষণা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।
প্রথমত, নীতিমালাটি মানবিক ও শিশু-অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও এর কাঠামোগত দুর্বলতা হলো—এটি শাস্তি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করলেও বিকল্প শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার কার্যকর মডেল উপস্থাপন করেনি। নীতিমালার প্রথম অংশে শারীরিক শাস্তির বিভিন্ন উদাহরণ যেমন চড়-থাপ্পড়, কান ধরে ওঠবস করানো বা দাঁড় করিয়ে রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে (পৃষ্ঠা ১–২)। কিন্তু শিক্ষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কার্যকর আচরণ ব্যবস্থাপনা (behavior management) বা পুনর্গঠনমূলক শৃঙ্খলা (restorative discipline) সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত নির্দেশনা নেই। আচরণবাদী শিক্ষা তত্ত্ব অনুযায়ী (Skinner-এর reinforcement theory) শিক্ষার্থীর আচরণ পরিবর্তনে ইতিবাচক পুরস্কার ও গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু নীতিমালায় এসব কৌশল বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত কাঠামো নেই।
দ্বিতীয়ত, নীতিমালাটি শিক্ষক-কেন্দ্রিক বাস্তব পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা একটি জটিল প্রক্রিয়া যেখানে শিক্ষককে একই সঙ্গে শিক্ষাদান, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। গবেষণায় দেখা যায়, অনেক শিক্ষক মনে করেন যে হঠাৎ করে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করার ফলে বিকল্প শৃঙ্খলা কৌশল না থাকলে শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে (Lwo & Yuan, 2011; Maphosa & Shumba, 2010)। নীতিমালার ৫ ও ৬ নম্বর ধারায় প্রতিষ্ঠান প্রধান ও ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে (পৃষ্ঠা ২), কিন্তু শিক্ষককে কীভাবে বাস্তবিকভাবে বিকল্প শৃঙ্খলা কৌশল প্রয়োগ করতে হবে তার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা সহায়ক কাঠামো উল্লেখ করা হয়নি। ফলে নীতিমালাটি বাস্তব প্রয়োগে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তৃতীয়ত, নীতিমালায় শাস্তি নিষিদ্ধকরণের ওপর অতিরিক্ত জোর থাকলেও শিক্ষার্থীর আচরণগত সমস্যার মনস্তাত্ত্বিক বা সামাজিক কারণ বিশ্লেষণ অনুপস্থিত। আধুনিক শিক্ষাতত্ত্ব—বিশেষ করে constructivist learning theory (Piaget, Vygotsky)—জোর দেয় শিক্ষার্থীর সামাজিক ও মানসিক প্রেক্ষাপট বোঝার ওপর। কিন্তু এই নীতিমালায় শিক্ষার্থীর আচরণগত সমস্যার মূল কারণ (যেমন পারিবারিক পরিবেশ, মানসিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য) মোকাবিলার জন্য কাউন্সেলিং বা মনোসামাজিক সহায়তা কাঠামোর স্পষ্ট উল্লেখ নেই। ফলে এটি সমস্যা-কেন্দ্রিক না হয়ে কেবল নিষেধাজ্ঞা-কেন্দ্রিক নীতি হিসেবে রয়ে গেছে।
চতুর্থত, নীতিমালায় শাস্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে (পৃষ্ঠা ২), কিন্তু জবাবদিহি ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার স্পষ্ট কাঠামো অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, অভিযোগ তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ, বা শিক্ষার্থীর নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা নেই। শিক্ষা প্রশাসন ও স্কুল ব্যবস্থাপনায় accountability framework অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু নীতিমালাটি প্রশাসনিকভাবে কীভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা হবে তা স্পষ্ট করেনি। এর ফলে বাস্তবায়নে অসামঞ্জস্য বা অনিয়মের সম্ভাবনা থাকে।
পঞ্চমত, নীতিমালাটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে আংশিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অনেক সমাজে দীর্ঘদিন ধরে শৃঙ্খলা রক্ষার একটি প্রথাগত পদ্ধতি হিসেবে শারীরিক শাস্তি ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও তা মানবাধিকার ও আধুনিক শিক্ষাদর্শনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তবুও হঠাৎ করে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা যায় যে শিক্ষকরা প্রায়ই বিকল্প শৃঙ্খলা পদ্ধতির দক্ষতা না থাকায় নীতিমালা বাস্তবায়নে সমস্যার সম্মুখীন হন (Busienei, 2012; Obadire & Sinthumule, 2021)। কিন্তু এই নীতিমালায় সামাজিক পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর কৌশল স্পষ্ট নয়।
ষষ্ঠত, নীতিমালাটি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক ভূমিকা বা গণতান্ত্রিক শিক্ষা নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। John Dewey-এর গণতান্ত্রিক শিক্ষা দর্শন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণমূলক নিয়ম প্রণয়ন ও সহপাঠী সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নীতিমালায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কোনো কাঠামো নেই; বরং এটি প্রধানত প্রশাসনিক নির্দেশনার উপর নির্ভরশীল। ফলে শিক্ষার্থীর স্ব-নিয়ন্ত্রণ (self-regulation) বা সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার সুযোগ সীমিত।
সপ্তমত, নীতিমালায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও তা খুব সাধারণভাবে বলা হয়েছে এবং এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি অস্পষ্ট। শিক্ষা ব্যবস্থায় কার্যকর নীতিমালা প্রয়োগের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, মনিটরিং ও মূল্যায়ন অপরিহার্য। গবেষণা অনুযায়ী, শারীরিক শাস্তির বিকল্প পদ্ধতি কার্যকর করতে শিক্ষককে আচরণ ব্যবস্থাপনা, কাউন্সেলিং ও শ্রেণিকক্ষ নেতৃত্ব বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হয় (Tiwari, 2019; Heekes et al., 2022)। কিন্তু নীতিমালায় এসব প্রশিক্ষণের কাঠামো বা অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই।
অষ্টমত, নীতিমালার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো—এটি মূলত শাস্তি নিষিদ্ধ করার প্রশাসনিক দলিল হলেও শিক্ষার্থীর ইতিবাচক আচরণ বিকাশের জন্য সমন্বিত শিক্ষা নীতি বা কর্মসূচি প্রদান করে না। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় positive discipline বা restorative practices গুরুত্বপূর্ণ; যেখানে শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে আচরণের কারণ বোঝা ও সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু এই নীতিমালায় সেই ধরনের পুনর্বাসনমূলক পদ্ধতির উল্লেখ সীমিত।
চৌদ্দ বছর আগে প্রণীত শাস্তিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালার মূল লক্ষ্য ছিল মানবিক, নিরাপদ ও শিশু-বান্ধব শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে একটি প্রগতিশীল ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু একটি নীতিমালার সাফল্য কেবল তার ঘোষিত লক্ষ্য বা নৈতিক অবস্থানে নয়; বরং তা নির্ভর করে বাস্তব প্রয়োগ, ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কারের ওপর। এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, নীতিমালাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিলেও তার বাস্তবায়ন কাঠামো, বিকল্প শৃঙ্খলা পদ্ধতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মনিটরিং ব্যবস্থা এবং গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে।
শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা একটি প্রয়োজনীয় নৈতিক অবস্থান হলেও কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জটিল সামাজিক ও আচরণগত বাস্তবতা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক শৃঙ্খলা পদ্ধতি, শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক আচরণ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষককে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের মনোসামাজিক সহায়তার সমন্বিত কাঠামো। একই সঙ্গে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গবেষণা, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন এবং অংশগ্রহণমূলক আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
অতএব, শাস্তিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারণাকে কার্যকর করতে হলে নীতিমালাটিকে নতুনভাবে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু নিষেধাজ্ঞামূলক কাঠামো নয়, বরং ইতিবাচক আচরণ বিকাশ, শিক্ষক সহায়তা, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয়ে একটি সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করা দরকার। শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য কেবল শাস্তি বন্ধ করা নয়; বরং এমন একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই মর্যাদা, আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে শিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকেই হয়তো এখন সময় এসেছে নীতিমালাটিকে কেবল অতীতের একটি প্রশাসনিক দলিল হিসেবে না দেখে, বরং অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত শিক্ষা নীতিতে রূপান্তর করার।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করার নীতিমালা মানবিক উদ্দেশ্য থেকে প্রণীত হলেও এর বাস্তব প্রয়োগে কিছু গুরুতর প্রশ্ন ও উদ্বেগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে নীতিমালার বর্তমান কাঠামো শিক্ষকদের পেশাগত কর্তৃত্ব বা শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার সক্ষমতাকে অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শাস্তি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হলেও শিক্ষার্থীদের অনিয়ম, অবাধ্যতা বা আচরণগত সমস্যার ক্ষেত্রে শিক্ষক কী ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন—সে বিষয়ে নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে অনেক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়েন। এতে কখনো কখনো শিক্ষাদান প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয় এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও কার্যকর নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
একই সঙ্গে দেখা যায়, নীতিমালায় শাস্তির সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক যোগাযোগ বা শৃঙ্খলাজনিত নির্দেশনাকেও অনেক সময় ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় শাসন বা নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় তাদের নেতৃত্বকে দুর্বল করতে পারে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় এখন প্রয়োজন নীতিমালাটির একটি সমন্বিত পুনর্মূল্যায়ন। শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ রাখার মূল নৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেই নীতিমালায় ইতিবাচক শৃঙ্খলা পদ্ধতি, আচরণ ব্যবস্থাপনা কৌশল, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীর মনোসামাজিক সহায়তার সুস্পষ্ট কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত কর্তৃত্ব ও শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার সক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টিও নীতিমালায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
অতএব, এক দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকে এই নীতিমালার শক্তি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে একটি গবেষণাভিত্তিক পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। নীতিমালার লক্ষ্য যদি সত্যিই একটি মানবিক, কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে এর কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শাস্তিমুক্তশিক্ষা #শিক্ষানীতিবিশ্লেষণ #শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাননীতিমালা২০১১ #শিক্ষাব্যবস্থাবাংলাদেশ #শিক্ষকঅথরিটি
#শিক্ষানীতিসংস্কার
#শিক্ষাতত্ত্ব
#শিক্ষাব্যবস্থাপনা
#PositiveDiscipline
#EducationPolicyBD
#CorporalPunishmentBan
#TeacherAuthority
#EducationReform
#ChildRightsEducation