03/25/2026 সাবেক এমপি ও সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার: ৫ মামলায় দেখানো হলো গ্রেপ্তার
Special Correspondent
২৪ March ২০২৬ ২২:৫০
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় ওয়ান-ইলেভেন-এর অন্যতম নেপথ্য কারিগর এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। গতকাল সোমবার (২৩ মার্চ) গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ১৫৩ নম্বর বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। আজ মঙ্গলবার সকালে ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেপ্তারের কারণ ও মামলা
ডিবি প্রধান জানান, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে অন্তত ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মানবপাচার, অর্থ আত্মসাৎ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ফেনীর মহিপালে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে সিআইডির দায়ের করা একটি মামলায়ও তিনি আসামি। ডিবি জানিয়েছে, তাকে পল্টন থানার একটি মানবপাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
ওয়ান-ইলেভেনের ক্ষমতাধর সেই জেনারেল
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পেছনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে অন্যতম প্রধান কুশীলব মনে করা হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ঘনিষ্ঠ এই কর্মকর্তা তখন সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন।
জাতীয় সমন্বয় কমিটি: জরুরি অবস্থার সময় তিনি গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী হন। এই কমিটির নেতৃত্বেই তৎকালীন শীর্ষ রাজনীতিক শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অসংখ্য ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তারেক রহমান প্রসঙ্গ: রিমান্ড মঞ্জুরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তারেক রহমানের ওপর তৎকালীন অমানবিক নির্যাতনের বিষয়টি সামনে আনছেন। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এই গ্রেপ্তারকে গণতন্ত্র হত্যাকারীদের বিচারের শুরু হিসেবে দেখছেন।
সেনাজীবন থেকে রাজনীতি: এক বিচিত্র সফর
১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী পরে সেনাবাহিনীতে আত্তীকৃত হন। তিনি রক্ষীবাহিনী থেকে এসে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল হওয়া একমাত্র কর্মকর্তা। ১/১১ সরকারের পর ২০০৮ সালে তাকে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার করে পাঠানো হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিন দফায় তার মেয়াদ বৃদ্ধি করে। ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণের পর তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন। ২০১৮ সালে নাটকীয়ভাবে রাজনীতিতে নামেন তিনি। প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইলেও পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ফেনী-৩ আসন থেকে দুইবার (২০১৮ ও ২০২৪) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ওয়ান-ইলেভেনের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন। তার এই গ্রেপ্তার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওই সময়ের ভূমিকার জন্য জবাবদিহিতার একটি নতুন পথ তৈরি করতে পারে। তবে এটি কেবল আইনি প্রক্রিয়া নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, তা মামলার তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হবে।
এক নজরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী:
জন্ম ও ক্যারিয়ার: ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী দিয়ে শুরু পরে সেনাবাহিনীর ৩-তারকা জেনারেল।
১/১১ ভূমিকা: নবম ডিভিশনের জিওসি এবং বঙ্গভবন নিয়ন্ত্রণের নেপথ্য নায়ক।
কূটনীতি: ২০০৮-২০১৪ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার।
রাজনীতি: জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য (ফেনী-৩)।
বর্তমান অবস্থা: মানবপাচার ও হত্যাসহ একাধিক মামলায় ৫ দিনের পুলিশি রিমান্ডে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের পর রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বইছে আলোচনার ঝড়। বিশেষ করে বিগত ড. ইউনূস সরকারের বেশ কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার ফেসবুক স্ট্যাটাসের বিপরিতে সাধারন জনগণ স্যোসাল মিডিয়ায় বিষ্ময়, কৌতুক ও কৌতুহল প্রকাশ করছে। সাবেক সরকার ও উপদেষ্টাদের অতি-উৎসাহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই মামলা কেবল আইনি গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। শেষ পর্যন্ত আদালতের কাঠগড়ায় এই ক্ষমতাধর জেনারেলের অপরাধ প্রমাণিত হয় কি না নাকি এটি কেবলই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতা হিসেবে গণ্য হয়। তা দেখার জন্য দেশবাসীকে আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র