05/03/2026 সনদ আছে শিক্ষা নেই? উচ্চশিক্ষায় OBE যখন কেবলই ‘কাগজে-কলমে’—ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গন্তব্য কোথায়?
odhikarpatra
৩ May ২০২৬ ১৪:১৩
একুশ শতকের এই সময়টাকে এখন বিশ্বজুড়ে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে 'VUCAD²' [volatility, uncertainty, complexity, ambiguity, diversity, and disruption] তত্ত্বে। যেখানে অস্থিরতা (Volatility), অনিশ্চয়তা (Uncertainty), জটিলতা (Complexity), অস্পষ্টতা (Ambiguity), বৈচিত্র্য (Diversity) এবং বিচ্যুতি (Disruption) প্রতিটি মুহূর্তকে নিয়ন্ত্রণ করছে।আসলে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, জটিলতা, অস্পষ্টতা, বৈচিত্র্য আর বিচ্যুতি—এই ছয়টি উপাদানের ঘূর্ণাবর্তে আমাদের বসবাস। এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রথাগত শিক্ষা কেবল তথ্যের বোঝা বইয়ে দিচ্ছে, কর্মদক্ষতা গড়ছে না। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শিক্ষাক্রম সংস্কার এখন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। এই পটভূমিতেই বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার খোলনলচে বদলে দিতে ‘আউটকাম বেজড এডুকেশন’ বা ওবিই (OBE) মডেলের প্রবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ কতটুকু? সম্প্রতি ১৬টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এক বিশদ গবেষণায় উঠে এসেছে এক করুণ চিত্র।
আজকের দিনে একজন গ্র্যাজুয়েট যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহদুয়ার পেরিয়ে কর্মজগতে পা রাখছেন, তিনি দেখছেন তার চার বছরের মুখস্থ করা তথ্যগুলো এরই মধ্যে বাসি হয়ে গেছে। এই বৈশ্বিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় প্রবর্তিত হয়েছে আউটকাম বেজড এডুকেশন (OBE)। কিন্তু সম্প্রতি ১৬টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পরিচালিত একটি বিশদ মিশ্র-পদ্ধতির (Mixed Method) গবেষণা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা আসলে এক "শিক্ষাগত মরীচিকা"র পেছনে ছুটছি।
অস্পষ্টতার কুয়াশায় উচ্চশিক্ষা
গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, উচ্চশিক্ষার এই নতুন রূপরেখা নিয়ে খোদ কারিগররাই অন্ধকারে। প্রায় ৬৯ শতাংশ শিক্ষক এবং ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থীর কাছে ওবিই বিষয়টি এখনো এক গোলকধাঁধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে ওবিই-এর নাম শোনা গেলেও ক্লাসরুমের চার দেয়ালে এখনো চলছে মান্ধাতা আমলের সেই 'কন্টেন্ট হেভি' বা বিষয়বস্তু-নির্ভর পাঠদান। দেখা গেছে, অনেক বিভাগ ওবিই কাঠামো গ্রহণ করেছে কেবল প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা বা ফরমালিটি রক্ষা করতে। অর্থাৎ, খাতার পাতায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও ক্লাসের লেকচারে রয়ে গেছে সেই পুরনো মরচে।
গবেষণার আয়নায় ব্যবধানের চিত্র
একটি 'কনভারজেন্ট মিক্সড মেথড' বা সমন্বিত পদ্ধতিতে পরিচালিত এই গবেষণায় ৩৮৪ জন শিক্ষক ও ৬২০ জন শিক্ষার্থীর মতামত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৯৬টি কোর্সের রূপরেখা এবং ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক অডিট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের যা শেখানো হচ্ছে এবং যেভাবে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে—তার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। ওবিই-এর মূল লক্ষ্য যেখানে ‘হায়ার অর্ডার থিংকিং’ বা উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা তৈরি করা, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো তথ্য মুখস্থ করিয়ে তা খাতায় উগড়ে দেওয়ার পদ্ধতিতেই আটকে আছে। কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয় দক্ষতার সাথে পাঠ্যক্রমের এই বিচ্ছেদ আমাদের তরুণদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।
কাঠামোগত দুর্বলতা ও মানসিক জড়তা
কেন এই স্থবিরতা? গবেষণায় উঠে আসা কারণগুলো যেমন কাঠামোগত, তেমনি মনস্তাত্ত্বিক। শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এই নতুন পদ্ধতির জন্য কারিগরি সহায়তা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের পুরনো অভ্যাসের কারণে পরিবর্তনের প্রতি এক ধরণের অনীহা বা জড়তাও কাজ করছে। অনেক শিক্ষক মনে করছেন, এটি কেবলই একটি বাড়তি বোঝা। কিন্তু ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা যখন ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে (FGD) অংশ নিলেন, তখন তাদের ক্ষোভ ফুটে উঠল। তারা বলছেন, ডিগ্রি শেষে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে তারা দেখছেন পুঁথিগত বিদ্যার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই।
একটি নতুন দিগন্তের আহ্বান
এই গবেষণার সারমর্ম হলো—একটি আমূল ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা চিন্তার পরিবর্তন। শিক্ষা এখন আর কেবল শিক্ষকের একমুখী বক্তৃতা নয়, বরং এটি হওয়া উচিত শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক। পাঠ্যক্রম হতে হবে প্রবহমান, যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মেলাবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল সনদ বিতরণের কারখানায় পরিণত না করে শিল্পখাত, শিক্ষার্থী এবং কমিউনিটির সাথে যৌথভাবে পাঠ্যক্রম তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
থিওরিটিক্যাল স্ট্যান্ডপয়েন্ট: কেন ওবিই কেবল একটি পদ্ধতি নয়?
তাত্ত্বিকভাবে ওবিই হলো একটি 'লার্নার-সেন্ট্রিক' বা শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক দর্শন। এটি উইলিয়াম স্প্যাডির (William Spady) সেই বিখ্যাত নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে বলা হয়—"শিক্ষক কী পড়ালেন তার চেয়ে বড় কথা শিক্ষার্থী কী শিখল এবং তা সে বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারছে কি না।"
প্রথাগত শিক্ষায় আমরা গুরুত্ব দেই 'ইনপুট'-এ (কত ঘণ্টা ক্লাস হলো, কত বড় সিলেবাস)। কিন্তু ওবিই গুরুত্ব দেয় 'আউটকাম' বা অর্জিত ফলাফলে। এখানে পাঠ্যক্রম একটি 'লিভিং ডকুমেন্ট', যা স্থির নয় বরং সমাজ ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে বিবর্তনশীল। কিন্তু বাংলাদেশে এই তাত্ত্বিক ভিত্তিটিই হোঁচট খাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৪৪ জন ফ্যাকাল্টি মেম্বার এবং ৬২০ জন শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশ এই তাত্ত্বিক রূপান্তরটি ধরতেই পারেননি।
বাস্তব উদাহরণ: শ্রেণিকক্ষ বনাম কর্মক্ষেত্র
গবেষণায় উঠে আসা একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। ৯৬টি কোর্স আউটলাইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে লার্নিং আউটকামে ( CLO) বড় বড় কথা লেখা আছে—যেমন, "শিক্ষার্থী জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে" অথবা "সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking) করতে পারবে।"
কিন্তু যখন সেই কোর্সের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখা হলো, তখন সেখানে পাওয়া গেল কেবল 'সংজ্ঞা দাও' বা 'বর্ণনা করো' জাতীয় প্রশ্ন। একে বলা হয় 'অ্যালাইনমেন্ট গ্যাপ'। অর্থাৎ, আমরা বলছি আমরা সাঁতার শেখাবো, কিন্তু পরীক্ষা নিচ্ছি ডাঙায় বসে সাঁতারের ওপর রচনা লিখতে দিয়ে। ১৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ফোকাস গ্রুপে (FGD) শিক্ষার্থীরা আক্ষেপ করে বলেছেন, "আমাদের জিপিএ-৫ আছে, কিন্তু একটি প্রেজেন্টেশন দেওয়ার আত্মবিশ্বাস বা একটি সমস্যা সমাধানের সৃজনশীলতা নেই।"
গবেষণার নেপথ্যে: সংখ্যা ও বাস্তবের হাহাকার
এই গবেষণার পরিসংখ্যানগুলো রীতিমতো উদ্বেগজনক:
চ্যালেঞ্জ: কেন থমকে আছে এই বিপ্লব?
ইমপ্লিকেশন বা সুদূরপ্রসারী প্রভাব
যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তবে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ:
পথ কোন দিকে?
গবেষণাটি কেবল সমস্যা তুলে ধরেনি, সমাধানের পথও বাতলে দিয়েছে। আমাদের প্রয়োজন একটি 'প্যারাডাইম শিফট'। কেবল সিলেবাস পরিবর্তন করলেই হবে না, শিক্ষকদের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি এবং কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। শিক্ষা হতে হবে একটি ডাইনামিক প্রক্রিয়া, যেখানে ইন্ডাস্ট্রি, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক—তিন পক্ষই হবে পাঠ্যক্রমের অংশীদার।
যদি ওবিই-কে আমরা কেবল একটি দাপ্তরিক নথি হিসেবে দেখি, তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এক গভীর খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াবে। আর যদি একে একটি রূপান্তরমূলক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করি, তবেই আমরা VUCAD² বিশ্বের যোগ্য নাগরিক তৈরি করতে পারবো।
পাল্টাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি
যদি শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মূল্যায়ন পদ্ধতির আমূল সংস্কার এবং কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি নিশ্চিত না করা যায়, তবে ওবিই বাংলাদেশে কেবল একটি ‘কমপ্লায়েন্স এক্সারসাইজ’ বা নিয়ম রক্ষার খেলা হিসেবেই থেকে যাবে। এটি কোনো ম্যাজিক নয় যে চাপিয়ে দিলেই কাজ হবে; বরং একে হতে হবে একটি জীবন্ত চর্চা। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের এই জটিল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমাদের উচ্চশিক্ষাকে যদি প্রকৃতপক্ষেই রূপান্তরমূলক করতে হয়, তবে ওবিই-এর আত্মাকে ধারণ করতে হবে, শুধু খোলসটুকু নয়।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
হ্যাশট্যাগ ও কিওয়ার্ড:
#উচ্চশিক্ষা #OBE #বাংলাদেশ #শিক্ষাক্রম_সংস্কার #VUCAD #বিশ্ববিদ্যালয় #শিক্ষা_গবেষণা #দক্ষতা_উন্নয়ন #অধিকারপত্র
কিওয়ার্ড: আউটকাম বেজড এডুকেশন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, ওবিই কাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয় কারিকুলাম, লার্নিং আউটকাম, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, ওবিই চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশ।