05/04/2026 রাশিয়ার নর্দান সি রুট: বরফ ও রাজনীতির বেড়াজালে এক বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা
Special Correspondent
৪ May ২০২৬ ০১:০০
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
রাশিয়া তাদের উত্তর উপকূল দিয়ে যাওয়া নর্দান সি রুট (NSR)-কে বিশ্ব বাণিজ্যের একটি প্রধান ধমনী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে এই আর্কটিক শর্টকাটকে সামনে আনছেন রুশ কর্মকর্তারা। তবে মস্কোর এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এখন পরিবেশগত বিপর্যয়, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অসারতার মুখে পড়েছে।
দূরত্ব কমলেও বাধা অনেক
সুয়েজ খালের তুলনায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাতায়াতের দূরত্ব প্রায় ৪০% কমিয়ে দেয় এই রুট। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একে সবচেয়ে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং দক্ষ পথ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বছরের অধিকাংশ সময় এই পথ বরফে ঢাকা থাকে। ফলে রাশিয়ার নিজস্ব পারমাণবিক বরফ ভাঙার জাহাজ (Icebreaker) ছাড়া এই পথে চলাচল অসম্ভব।
যুদ্ধের প্রভাব ও লক্ষ্যমাত্রায় ধস
২০২৪ সালের মধ্যে এই রুট দিয়ে ৮০ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল মস্কো। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণ এবং পরবর্তীতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকের নিচে (৩৮ মিলিয়ন টন) নেমে আসে। বর্তমানে এই রুট দিয়ে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১ শতাংশেরও কম পণ্য পরিবাহিত হয়, যেখানে সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচল করে প্রায় ১৫%। বেলোনা এনভায়রনমেন্টাল ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রুটের ৮০ শতাংশেরও বেশি পণ্য হলো রাশিয়ার নিজস্ব অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG)। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুট হিসেবে এটি এখনো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি
পরিবেশবাদীরা সতর্ক করছেন যে, পথ ছোট হলেও এটি মোটেও পরিবেশবান্ধব নয়।
অতিরিক্ত জ্বালানি: বরফে চলার উপযোগী ভারী জাহাজগুলো সাধারণ জাহাজের চেয়ে মাইলপ্রতি বেশি জ্বালানি পোড়ায়।
ব্ল্যাক কার্বন: জাহাজের ইঞ্জিন থেকে নির্গত কালি বরফের ওপর পড়ে সূর্যের আলো প্রতিফলনের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা আর্কটিকের বরফ গলে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
উদ্ধার তৎপরতার অভাব: এই জনশূন্য অঞ্চলে কোনো দুর্ঘটনা বা তেল নিঃসরণ ঘটলে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো রাশিয়ার নেই।
এশিয়ার দোদুল্যমান অবস্থান
চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়া এই রুট নিয়ে পরীক্ষামূলক কিছু জাহাজ পাঠালেও বড় ধরনের বিনিয়োগে এখনো অনাগ্রহী। চীনের পোলার সিল্ক রোড পরিকল্পনা থাকলেও তারা রাশিয়ার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে চাইছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন চীনের এই আগ্রহ যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০২৬ সাল নাগাদ দক্ষিণ কোরিয়া এই পথে নতুন করে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করেছে। এমনকি কিছু গবেষণায় বলা হচ্ছে, ২১০০ সাল নাগাদ এই পথ সারাবছর চলাচলের উপযোগী হতে পারে। তবে বেলোনা ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ক্সেনিয়া ভাখরুশেভা প্রশ্ন তুলেছেন ততদিনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর চেহারা কী হবে? তখন কি আদতেও আমাদের এই রুটের প্রয়োজন পড়বে? রাশিয়া ২০৩৫ সাল পর্যন্ত এই রুটের উন্নয়নে ২.৪ ট্রিলিয়ন রুবল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করলেও, আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এই রুটকে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাজি হিসেবেই টিকিয়ে রেখেছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র