05/06/2026 শিক্ষার আয়নায় ইরান ও বাংলাদেশ: শিক্ষানীতির ভিন্ন দুই মানচিত্রে আদর্শ, রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎ নাগরিকের সন্ধান —শিক্ষাযাত্রার তুলনামূলক পাঠ │ইরান সিরিজ পর্ব -০৩
odhikarpatra
৬ May ২০২৬ ১৬:২৯
অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │ইরান সিরিজ পর্ব -০৩
তেহরানের শ্রেণিকক্ষে বিপ্লবের প্রতিধ্বনি, ঢাকার শ্রেণিকক্ষে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি—দুই দেশের শিক্ষা যেন দুই রাষ্ট্রের আত্মার আয়না। ইরান শিক্ষাকে করেছে আদর্শিক রাষ্ট্রগঠনের হাতিয়ার; বাংলাদেশ শিক্ষাকে দেখেছে ভাষা, স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ ও মানবিক জাতিগঠনের পথ হিসেবে। কিন্তু শেষ প্রশ্ন একটাই—আমরা শিশুদের কী শেখাচ্ছি: আনুগত্য, প্রতিযোগিতা, নাকি চিন্তা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ?
শিক্ষা কোনো রাষ্ট্রের কেবল প্রশাসনিক খাত নয়; এটি জাতির আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ, চিন্তার ধরন এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির গভীর সামাজিক প্রক্রিয়া। এই বিশ্লেষণধর্মী ফিচারে ১৯৭৯-পরবর্তী ইরান ও ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে তুলনামূলকভাবে দেখা হয়েছে ধর্ম, রাষ্ট্র, পাঠ্যক্রম, মাননিশ্চয়তা, জ্ঞানসৃষ্টি, অর্থায়ন ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আলোকে। ইরান যেখানে ধর্মীয় আদর্শ, বিপ্লবী রাষ্ট্রদর্শন ও আত্মনির্ভর জ্ঞানচর্চার পথে এগিয়েছে, বাংলাদেশ সেখানে ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, বহুত্ববাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও শিক্ষাবিস্তারের এক ভিন্ন পথ নির্মাণ করেছে। শেষ পর্যন্ত প্রবন্ধটি প্রশ্ন তোলে—শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু কর্মী তৈরি, নাকি চিন্তাশীল, মানবিক ও দায়িত্ববান নাগরিক গড়ে তোলা?
ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ধর্ম, রাষ্ট্র, পাঠ্যক্রম, জ্ঞানসৃষ্টি, মাননিশ্চয়তা, অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ নাগরিক নির্মাণের প্রশ্নে দুই দেশের ভিন্ন শিক্ষা দর্শনের পাঠ।
শিক্ষা কোনো রাষ্ট্রের কেবল প্রশাসনিক খাত নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ, চিন্তার ধরন এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির সবচেয়ে গভীর সামাজিক প্রক্রিয়া। ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে এই সত্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুটি দেশই ইতিহাসের বড় বাঁকবদলের মধ্য দিয়ে নিজেদের শিক্ষা কাঠামো পুনর্গঠন করেছে। ইরান ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর শিক্ষাকে ধর্মীয় আদর্শ, জাতীয় স্বনির্ভরতা ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর শিক্ষাকে ভাষা, স্বাধীনতা, মানবিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও জাতিগঠনের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ফলে দুই দেশের শিক্ষার ইতিহাস শুধু পাঠ্যক্রমের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রগঠনেরও ইতিহাস।
এই প্রবন্ধের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম, ধর্মীয় চিন্তা, মাননিশ্চয়তা, জ্ঞানসৃষ্টি, অর্থায়ন এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা। আলোচনাটি দেখাতে চায়, কীভাবে দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দুই ধরনের শিক্ষা দর্শন তৈরি করেছে। ইরানে শিক্ষা অনেক বেশি আদর্শকেন্দ্রিক ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত; সেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ, বিপ্লবী চেতনা এবং জাতীয় আত্মনির্ভরতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে শিক্ষা তুলনামূলকভাবে বহুত্ববাদী ও সামাজিক বাস্তবতানির্ভর; এখানে ধর্মীয় শিক্ষা থাকলেও ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রবন্ধটির গঠন ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছে। প্রথম অংশে আলোচিত হয়েছে ১৯৭৯-পরবর্তী ইরানের শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম। সেখানে দেখা হয়েছে, বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করেছে এবং ধর্মীয় আদর্শ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে চেয়েছে। দ্বিতীয় অংশে আলোচনায় এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের শিক্ষানীতি। সেখানে জাতীয় শিক্ষানীতি, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, নারী শিক্ষার প্রসার, প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ, দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম এবং গবেষণা-সংকটের মতো বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তৃতীয় অংশে দুই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় চিন্তা ও আদর্শের প্রতিফলন তুলনা করা হয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে ধর্ম রাষ্ট্রীয় আদর্শের কেন্দ্রে; বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধর্ম সমাজ ও নৈতিক শিক্ষার অংশ হলেও শিক্ষা কাঠামোর একমাত্র নিয়ন্ত্রক নয়। চতুর্থ অংশে এই সব আলোচনার ভিত্তিতে দুই দেশের তুলনামূলক পাঠ ও ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্মাণ করা হয়েছে।
এই আলোচনার অগ্রগতি মূলত ইতিহাস থেকে নীতিতে, নীতি থেকে পাঠ্যক্রমে, পাঠ্যক্রম থেকে সমাজে এবং সমাজ থেকে ভবিষ্যতের দিকে। প্রথমে দুই দেশের পৃথক শিক্ষাযাত্রা বোঝানো হয়েছে, তারপর তাদের মিল-অমিল শনাক্ত করা হয়েছে। এরপর ধর্ম, রাষ্ট্র, জ্ঞানসৃষ্টি ও শিক্ষার মানের প্রশ্নে তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আলোচনাটি এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে শিক্ষা শুধু অতীতের উত্তরাধিকার নয়, ভবিষ্যৎ নির্মাণের নকশা হিসেবে দেখা যায়।
প্রবন্ধটির তাৎপর্য এখানেই যে, এটি ইরান ও বাংলাদেশকে কেবল দুইটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে দেখে না; বরং তাদের ভিন্ন ইতিহাস, রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক কাঠামো এবং শিক্ষাগত অগ্রাধিকারের আলোকে বিচার করে। এতে বোঝা যায়, একই অঞ্চলের বাইরের হলেও দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় পরিচয় নির্মাণে কত গভীর ভূমিকা রাখে। ইরান আমাদের দেখায়, আদর্শিক ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা শিক্ষাকে কীভাবে শক্তিশালী কিন্তু নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ দেখায়, সীমিত সম্পদ, জনসংখ্যার চাপ এবং সামাজিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও শিক্ষা বিস্তার কীভাবে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান সোপান হতে পারে।
সবশেষে, এই প্রবন্ধ আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: শিক্ষা কি শুধু দক্ষ কর্মী তৈরি করবে, নাকি চিন্তাশীল, মানবিক ও দায়িত্ববান নাগরিকও তৈরি করবে? ইরান ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ অনেক ক্ষেত্রে এক। উভয় দেশেরই প্রয়োজন এমন শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে জ্ঞান ও মূল্যবোধ, রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, প্রযুক্তি ও মানবিকতা একসঙ্গে বিকশিত হতে পারে। এই কারণেই প্রবন্ধটির আলোচনা কেবল অতীত বা বর্তমানের মূল্যায়ন নয়; এটি ভবিষ্যৎ শিক্ষাচিন্তার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশ।
এই প্রবন্ধে মোট চারটিপ অংশ রয়েছে, যা নিচে আলোচিত হয়েছে। এই অংশসমূহ হলো:
প্রথম অংশ: ১৯৭৯ বিপ্লবোত্তর ইরানের শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম—সংস্কার, মাননিশ্চয়তা, জ্ঞানসৃষ্টি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার এক বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব একটি যুগান্তকারী বাঁকবদল—যার অভিঘাত রাজনীতি ছাড়িয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে পৌঁছায়। বিপ্লব-পরবর্তী ইরান তার শিক্ষানীতিকে পুনর্গঠন করে এমন এক কাঠামোয়, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন লক্ষ্য একসূত্রে গাঁথা। শিক্ষা আর কেবল জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া নয়; বরং তা হয়ে ওঠে একটি আদর্শিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
দ্বিতীয় অংশ: ১৯৭১ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম— সংস্কার, মাননিশ্চয়তা, জ্ঞানসৃষ্টি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বিবর্তন
বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রীয় এজেন্ডা। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নতুন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতে হলে প্রয়োজন ছিল একটি মানবিক, বৈজ্ঞানিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, সীমিত সম্পদ, বিপুল নিরক্ষরতা—এই বাস্তবতার ভেতর দিয়েই বাংলাদেশের শিক্ষানীতির প্রথম রেখাচিত্র আঁকা হয়। শিক্ষা তখন কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়; এটি হয়ে ওঠে জাতীয় চেতনা, ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক।
তৃতীয় অংশ: শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় চিন্তা ও আদর্শের প্রতিফলন—ইরান ও বাংলাদেশের তুলনামূলক প্রেক্ষিত
এই অংশে দেশ দুটির শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘ধর্ম, রাষ্ট্র ও শিক্ষার আন্তঃসম্পর্কের’ ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ধর্ম, রাষ্ট্র ও শিক্ষা—এই তিনটি ধারণা মানবসমাজের বৌদ্ধিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক বিনির্মাণের ক্ষেত্রে গভীরভাবে পরস্পর-সম্পর্কিত। শিক্ষা কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বা শূন্যস্থানে অবস্থানকারী কোনো প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি একটি সমাজের ইতিহাস, রাষ্ট্রদর্শন, সংস্কৃতি, ধর্মীয় চেতনা, ক্ষমতার বিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। রাষ্ট্র শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে কেবল দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে না; বরং নাগরিকের চিন্তা, মূল্যবোধ, আনুগত্য, পরিচয়বোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধও নির্মাণ করে। অন্যদিকে ধর্ম মানুষের নৈতিকতা, জীবনদর্শন, আত্মপরিচয়, কর্তব্যবোধ এবং সামাজিক আচরণের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। ফলে শিক্ষা হয়ে ওঠে এমন এক জটিল ক্ষেত্র, যেখানে জ্ঞান, বিশ্বাস, আদর্শ, ক্ষমতা ও সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় চিন্তা ও রাষ্ট্রীয় আদর্শের প্রতিফলন তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করলে দুটি ভিন্ন পথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা একটি গভীর ধর্মভিত্তিক আদর্শিক কাঠামোর ওপর পুনর্গঠিত হয়। সেখানে শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জন বা পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়নি; বরং তা ইসলামি রাষ্ট্রদর্শন, শিয়া ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনার ধারক ও বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাঠ্যক্রমে কোরআন, ইসলামি শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন, শহীদত্ব, আত্মত্যাগ, বিপ্লবী আনুগত্য এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শকে একত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয়-রাজনৈতিক বিশ্বদৃষ্টির মধ্যে সমাজায়িত হয়।
ইরানের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাষ্ট্র যখন ধর্মীয় আদর্শকে তার রাজনৈতিক বৈধতা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে স্থাপন করে, তখন শিক্ষা ব্যবস্থা সেই আদর্শ পুনরুৎপাদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। পাঠ্যবই রচনা, শিক্ষক নির্বাচন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, সহশিক্ষা কার্যক্রম—সবকিছুই তখন রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়। এর ইতিবাচক দিক হিসেবে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, ধর্মীয় পরিচয় এবং সমষ্টিগত আদর্শের প্রতি আনুগত্য গড়ে ওঠে। কিন্তু এর বিপরীত দিকে রয়েছে একমাত্রিক চিন্তার ঝুঁকি। যখন শিক্ষা অত্যধিক আদর্শিক নিয়ন্ত্রণের অধীন হয়, তখন বহুত্ববাদ, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা এবং মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্র সংকুচিত হতে পারে। তাই ইরানের শিক্ষা ব্যবস্থা ধর্মীয় আদর্শ ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার মধ্যে এক জটিল টানাপোড়েনের প্রতীক।
অন্যদিকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে ভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিতে আত্মপ্রকাশ করলেও সমাজের ধর্মীয় বাস্তবতা কখনো শিক্ষার বাইরে থাকেনি। বাংলাদেশের জাতীয় পাঠ্যক্রমে ইসলাম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের সুযোগ পায়। তবে এই ধর্মীয় শিক্ষা সাধারণত পৃথক বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে; রাষ্ট্রীয় শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করে না। মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা বিজ্ঞান, মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান, ভাষা, প্রযুক্তি ও নাগরিক শিক্ষার ওপর বেশি নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো বহুত্ববাদ ও সহাবস্থানের ধারণা। একই জাতীয় কাঠামোর ভেতরে বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করে, যা সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহনশীলতার একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে বাস্তবে এই আদর্শ সবসময় পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয় না। শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব, পাঠ্যপুস্তকের সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং কখনো কখনো সামাজিক পক্ষপাতের কারণে ধর্মীয় বহুত্ববাদ কাগজে যতটা সুন্দর, শ্রেণিকক্ষে তা ততটা কার্যকর হয় না। পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি সমান্তরাল ধারা হিসেবে বিদ্যমান, যেখানে ধর্মীয় জ্ঞান ও নৈতিকতার ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়। এই দ্বৈততা কখনো শিক্ষাব্যবস্থায় বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে, আবার কখনো মূলধারা ও ধর্মীয় ধারার মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত দূরত্বও তৈরি করে।
ইরান ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায় যে ধর্ম, রাষ্ট্র ও শিক্ষার সম্পর্ক কোনো একক সূত্রে ব্যাখ্যা করা যায় না। ইরানে ধর্ম রাষ্ট্রীয় আদর্শের কেন্দ্রে অবস্থান করে এবং শিক্ষা সেই আদর্শের সক্রিয় বাহক। বাংলাদেশে ধর্ম সামাজিক বাস্তবতার অংশ, কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে না। ইরান আদর্শিক ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেয়; বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বহুত্ববাদী সহাবস্থানের পথ অনুসরণ করে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই প্রশ্ন থেকে যায়—শিক্ষার লক্ষ্য কি কেবল আনুগত্যশীল নাগরিক তৈরি করা, নাকি নৈতিক, যুক্তিবাদী, মানবিক, সহনশীল ও সৃজনশীল মানুষ গড়ে তোলা?
সুতরাং ধর্ম, রাষ্ট্র ও শিক্ষার আন্তঃসম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে যে শিক্ষা একই সঙ্গে আদর্শ নির্মাণের ক্ষেত্র, ক্ষমতার অনুশীলনের ক্ষেত্র এবং মুক্তির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। ধর্ম শিক্ষা ব্যবস্থাকে নৈতিক ভিত্তি দিতে পারে, রাষ্ট্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে পারে, কিন্তু উভয়ের প্রভাব যদি প্রশ্নহীন নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়, তবে শিক্ষা তার মুক্ত মানবিক চরিত্র হারাতে পারে। ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন এমন এক শিক্ষাদর্শন, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ নৈতিকতা ও মানবিকতার উৎস হবে, রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের রক্ষক হবে, আর শিক্ষা হবে মুক্তচিন্তা, সহাবস্থান, বৈচিত্র্য ও জ্ঞানভিত্তিক মানবিক বিকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী পথ।
সার্বিক অর্থে উপ রের এই তুলনা আমাদের দেখায়, শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মের ভূমিকা নির্ভর করে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক বাস্তবতার ওপর। একদিকে আদর্শিক ঐক্য, অন্যদিকে বহুত্ববাদ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা।
চতুর্থ অংশ: বইয়ের পাতায় দুই রাষ্ট্রের আয়না—ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ কোন পথে
এই অংশে দুই দেশের শিক্ষার একটি তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। একইসাথে ভবিষ্যতের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
ভোরের আলো যখন তেহরানের পাহাড় ছুঁয়ে নামে, তখন কোনো এক শ্রেণিকক্ষে শিশুরা পাঠ্যবই খুলে বসে। বইয়ের পাতায় আছে ধর্ম, রাষ্ট্র, বিপ্লব, বিজ্ঞান, আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন। প্রায় একই সময়ে, ঢাকার কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, কিংবা নদীভাঙা চরাঞ্চলের টিনের ঘরের স্কুলে, আরেকদল শিশু উচ্চস্বরে পড়ছে বাংলা, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস। তাদের বইয়ে আছে ভাষা, স্বাধীনতা, নাগরিকতা, দক্ষতা, জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা। দুই দেশ, দুই জন্মকথা, দুই রাজনৈতিক স্মৃতি। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের দৃশ্য এক জায়গায় এসে মিলে যায়। উভয় রাষ্ট্রই শিক্ষাকে শুধু বই পড়া বলে দেখেনি; দেখেছে জাতি গড়ার নীরব কারখানা হিসেবে।
ইরান ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা করতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে তাদের জন্মগত ভিন্নতা। ইরানের শিক্ষা নতুন বাঁক নেয় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর। সেই বিপ্লব রাষ্ট্রকে একটি ধর্মভিত্তিক আদর্শিক কাঠামোয় পুনর্গঠন করে। ফলে শিক্ষা হয়ে ওঠে ইসলামি মূল্যবোধ, জাতীয় আত্মপরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় আনুগত্য গঠনের প্রধান ক্ষেত্র। অন্যদিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই রাষ্ট্রের শিক্ষাচিন্তার কেন্দ্রে ছিল ভাষা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সর্বজনীন শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা। এক দেশে বিপ্লব রাষ্ট্রকে ধর্মীয় আদর্শে নতুন অর্থ দেয়; অন্য দেশে স্বাধীনতা শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতিগত মুক্তি ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ভাষা দেয়।
পাঠ্যক্রমের দিকে তাকালে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। ইরানের পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্রীয়। কোরআন, ইসলামী ইতিহাস, নৈতিকতা এবং বিপ্লব-উত্তর রাষ্ট্রদর্শন শিক্ষার্থীর মানসগঠনে বড় ভূমিকা রাখে। সেখানে শিক্ষা যেন একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক নদীপথে প্রবাহিত হয়। তার জলধারায় শৃঙ্খলা আছে, বিশ্বাস আছে, রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর আছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষা আছে, কিন্তু তা মূল কাঠামোর একমাত্র নিয়ন্ত্রক শক্তি নয়। এখানে ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টধর্মের শিক্ষাকে পৃথক বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে। মূল পাঠ্যক্রমে বাংলা, বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, আইসিটি, পরিবেশ ও জীবনদক্ষতার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশি শ্রেণিকক্ষের চরিত্র তুলনামূলকভাবে বহুস্বরিক। সেখানে ধর্ম আছে, কিন্তু তার পাশে ভাষা আছে, মুক্তিযুদ্ধ আছে, নাগরিকতা আছে, বাজারের দক্ষতার দাবিও আছে।
তবে এই তুলনা সরলভাবে একটিকে কঠোর আর অন্যটিকে মুক্ত বলে শেষ করা যায় না। ইরান রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিক্ষায় অভিন্নতা, শৃঙ্খলা ও গবেষণাকেন্দ্রিক আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য এগিয়ে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপের ভেতরেও বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্র যখন গবেষণাকে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত করে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান থাকে না; তা হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার মেধাব্যূহ। বাংলাদেশের গল্প অন্যরকম। এখানে শিক্ষা বিস্তারের প্রধান সাফল্য এসেছে জনসম্পৃক্ততা, সরকারি সহায়তা, এনজিও কার্যক্রম, নারী শিক্ষার প্রসার, উপবৃত্তি এবং বিনামূল্যে বই বিতরণের ভেতর দিয়ে। বাংলাদেশের স্কুল অনেক সময় রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজের যৌথ উদ্যোগে দাঁড়িয়ে থাকে; কোনোটি পাকা ভবনে, কোনোটি বাঁশের বেড়ায়, কিন্তু প্রত্যাশার আলো সেখানে একরকম।
মাননিশ্চয়তার প্রশ্নে দুই দেশের সংকট ভিন্ন হলেও শেকড় কোথাও এক। ইরানে কেন্দ্রীয় পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রতিযোগিতা এবং নিয়ন্ত্রিত মূল্যায়ন কাঠামো শিক্ষার মান ধরে রাখার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত পরীক্ষানির্ভরতা সৃজনশীলতা ও প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে সংকুচিত করতে পারে। বাংলাদেশেও একই ছায়া দেখা যায়। সৃজনশীল প্রশ্ন, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম, বাস্তবজীবনমুখী পাঠের কথা বলা হলেও সমাজের বড় অংশ এখনো পরীক্ষার নম্বরকে শিক্ষার একমাত্র মুদ্রা মনে করে। ফলে শ্রেণিকক্ষ অনেক সময় শেখার জায়গা না হয়ে প্রস্তুতির ঘর হয়ে ওঠে। শিশুর চোখে তখন পৃথিবী নয়, প্রশ্নপত্র ভাসে।
জ্ঞানসৃষ্টির ক্ষেত্রেও তুলনাটি তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান সীমাবদ্ধতার ভেতর গবেষণাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার করেছে। বাংলাদেশে গবেষণার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বিনিয়োগ, ল্যাব, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের ঘাটতি তাকে বারবার আটকে দেয়। বাংলাদেশের মেধাবী তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে প্রায়ই বিদেশে চলে যায়, কারণ ঘরে তাদের জন্য পর্যাপ্ত গবেষণার পরিসর নেই। অথচ এই দেশেই স্টার্টআপ, আইসিটি, কৃষি উদ্ভাবন, জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়ন গবেষণার অসাধারণ ক্ষেত্র রয়েছে। দরকার শুধু পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সংকোচন থেকে কিছুটা মুক্ত বাতাস দেওয়া।
অর্থায়নের প্রশ্নে দুই দেশই রাষ্ট্রনির্ভর, কিন্তু চাপ আলাদা। ইরান নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার ভেতর শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ধরে রাখতে চেয়েছে। বাংলাদেশ জনসংখ্যার চাপ, অবকাঠামোগত বৈষম্য, শিক্ষক সংকট ও সীমিত বাজেটের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ শুধু স্কুলে ভর্তি বাড়ানোর মধ্যে আটকে থাকলে চলবে না। আগামী দিনের শিক্ষা চাই ল্যাব, গ্রন্থাগার, দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তি, গবেষণা তহবিল, স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত পাঠ্যক্রম এবং মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরির পরিবেশ।
ভবিষ্যতের রূপরেখা
তাই দুই দেশের জন্যই এক ধরনের ভারসাম্যের ডাক। ইরানের সামনে বড় প্রশ্ন, আদর্শিক ভিত্তি বজায় রেখেও কীভাবে মুক্তচিন্তা, বহুত্ববাদ ও বৈশ্বিক জ্ঞানপ্রবাহের সঙ্গে আরও উন্মুক্ত সংলাপ তৈরি করা যায়। বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন, শিক্ষার বিস্তারকে কীভাবে গুণগত শিক্ষায় রূপান্তর করা যায়; কীভাবে মুখস্থবিদ্যার বদলে অনুসন্ধানী মন, পরীক্ষার ভয়ের বদলে শেখার আনন্দ, সার্টিফিকেটের বদলে সক্ষমতা তৈরি করা যায়।
দুই দেশের শিক্ষাযাত্রা আমাদের একটি বড় সত্য শেখায়। শিক্ষা কখনো নিরপেক্ষ শূন্যস্থান নয়। সেখানে রাষ্ট্র কথা বলে, ইতিহাস কথা বলে, ধর্ম কথা বলে, বাজার কথা বলে, মানুষের স্বপ্নও কথা বলে। ইরানের শ্রেণিকক্ষে বিপ্লবের প্রতিধ্বনি শোনা যায়; বাংলাদেশের শ্রেণিকক্ষে স্বাধীনতার দীর্ঘশ্বাস ও ভবিষ্যতের তাড়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিশুর হাতের পেন্সিলই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তোলে: আমরা তাকে কেমন মানুষ হতে শেখাচ্ছি?
যদি সে শুধু আনুগত্য শেখে, তবে তার কল্পনা শুকিয়ে যাবে। যদি সে শুধু প্রতিযোগিতা শেখে, তবে তার মানবিকতা ক্ষয়ে যাবে। যদি সে শুধু তথ্য মুখস্থ করে, তবে জ্ঞান জন্মাবে না। তাই ইরান হোক বা বাংলাদেশ, আগামী দিনের শিক্ষার আসল কাজ হবে বিশ্বাস ও যুক্তি, পরিচয় ও বহুত্ব, রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, দক্ষতা ও মানবিকতার মধ্যে নতুন সেতু তৈরি করা। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ সংসদ ভবনে যেমন লেখা হয়, তেমনি লেখা হয় স্কুলের বেঞ্চে, চকধুলোর গন্ধে, শিক্ষকের কণ্ঠে, আর শিশুর সেই প্রথম প্রশ্নে: “কেন?”
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#ইরান_বাংলাদেশ_শিক্ষা #তুলনামূলক_শিক্ষানীতি #ধর্ম_রাষ্ট্র_ও_শিক্ষা #শিক্ষার_আয়নায়_রাষ্ট্র #ইরানের_শিক্ষাব্যবস্থা #বাংলাদেশের_শিক্ষানীতি #ভবিষ্যতের_শ্রেণিকক্ষ #জাতিগঠন_ও_শিক্ষা #মুক্তিযুদ্ধ_ও_শিক্ষা #ইসলামি_বিপ্লব_ও_শিক্ষা #জ্ঞানসৃষ্টি #মাননিশ্চয়তা #শিক্ষা_সংস্কার #বাংলা_ফিচার #অধিকারপত্র_বিশেষ_ফিচার