05/11/2026 ডিগ্রির চকচকে মোড়ক, ভেতরে মানের শূন্যতা: সোনার হরিণের নয় বছর–অ্যাক্রেডিটেশনের গোলকধাঁধায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা
Dr Mahbub
১১ May ২০২৬ ১৩:২৮
BAC আইনের ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় গুণগত মান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা এখনো স্বপ্ন দেখে—তাদের ডিগ্রি বিশ্বদরবারে স্বীকৃতি পাবে; কিন্তু অ্যাক্রেডিটেশন ও BNQF-এর বহু নির্দেশনা আজও ফাইলবন্দি। Outcome-Based Education-এর প্রতিশ্রুতি কেন বাস্তবায়িত হলো না? কেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো পুরনো কারিকুলাম, দুর্বল গবেষণা সংস্কৃতি ও দক্ষতার ঘাটতিতে আটকে? এই সাহিত্যঘন অনুসন্ধানী ফিচারে উঠে এসেছে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৭, BNQF বাস্তবায়নের সংকট, শিক্ষক প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা, শিল্পের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা এবং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন। আইন আছে, কাঠামো আছে—কিন্তু মান কি সত্যিই আছে?
ঢাকার এক নামী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে দুপুরের আলো ঢুকছে কাঁচের জানালা পেরিয়ে। বাইরে রিকশার ঘণ্টা, গাড়ির হর্ন, ভর্তি পরীক্ষার পোস্টার, কোচিং সেন্টারের ব্যানার। ভেতরে দামি কাঠের টেবিল, আন্তর্জাতিক জার্নালের ফোল্ডার, দেয়ালে টাঙানো মিশন-ভিশন, আর প্রজেক্টরে ভেসে উঠছে “গ্লোবাল র্যাঙ্কিং”, “রিসার্চ আউটপুট”, “ইন্টারন্যাশনালাইজেশন”। বক্তারা বলছেন, কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের তালিকায় পিছিয়ে। শ্রোতারা মাথা নাড়ছেন, কেউ কেউ নোট নিচ্ছেন। অথচ সেই টেবিলের এক কোণে যেন অদৃশ্য হয়ে পড়ে আছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি—বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৭।
নয়টি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। আইনের পাতায় লেখা আছে অ্যাক্রেডিটেশন, স্বীকৃতি, গুণগত মান ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু দেশের শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী আজও এক প্রশ্নের উত্তর খোঁজে: “আমার ডিগ্রি কি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে যথার্থ মর্যাদা পাবে?”
২০১৭ সালের মার্চে জাতীয় সংসদে যখন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন পাস হয়, তখন উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল, এবার মানহীন ডিগ্রির বাজারে জবাবদিহির কাঠামো তৈরি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে আর শুধু ভবন, ব্যানার, সেমিস্টার ফি বা সমাবর্তনের গাউন দিয়ে বিচার করা হবে না। বিচার হবে শিক্ষার্থী আসলে কী শিখল, কী করতে পারল, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে কী অবদান রাখতে পারল।
আইনের ১৫(১) ধারায় উচ্চশিক্ষাকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্ক বা BNQF-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার যে নির্দেশনা আছে, তা ছিল গুণগত উচ্চশিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। এর অর্থ হলো, মুখস্থনির্ভর পাঠ নয়; বরং শিক্ষার্থী কী জানবে, কী বুঝবে, কী বিশ্লেষণ করতে পারবে এবং বাস্তব জীবনে কী প্রয়োগ করতে পারবে, সেটাই হবে শিক্ষার কষ্টিপাথর।
২০২১ সালে BNQF Part-B উচ্চশিক্ষার জন্য লেভেল ৭ থেকে ১০ পর্যন্ত কাঠামো নির্ধারণ করে। ব্যাচেলর, মাস্টার্স, পিএইচডি, ক্রেডিট, লার্নিং আউটকাম, দক্ষতা, মূল্যায়ন, ক্রেডিট ট্রান্সফার, prior learning recognition—সবকিছুর একটি সমন্বিত ভাষা তৈরি হলো। BNQF বলল, শিক্ষা হবে outcome-based; অর্থাৎ শিক্ষার্থী কী জানে, তার চেয়েও বড় কথা সে কী বোঝে, কী বিশ্লেষণ করতে পারে এবং কী প্রয়োগ করতে পারে।
কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল পেরিয়ে মে মাসের এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে: সেই স্বপ্নের আলো শ্রেণিকক্ষে কতটা পৌঁছেছে?
একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিভাগের কারিকুলাম কমিটির এক অধ্যাপক, পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে, আক্ষেপের সুরে বলছিলেন,
“BNQF আসলে একটি আধুনিক ও প্রয়োজনীয় ফ্রেমওয়ার্ক। এখানে লেভেল ডেসক্রিপ্টর আছে, লার্নিং আউটকাম আছে, ক্রেডিট ট্রান্সফারের ধারণা আছে। কিন্তু আমাদের পাঠ্যক্রম এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। আমরা এখনো অধ্যায় শেষ করার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছি। শিক্ষার্থী শেখে ঠিকই, কিন্তু অনেক সময় শেখে শুধু কীভাবে পরীক্ষার খাতায় নির্দিষ্ট উত্তরটি পুনরুৎপাদন করতে হয়।”
তার এই কথার মধ্যেই ধরা পড়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার গভীর সংকট। BNQF যেখানে শিক্ষার কেন্দ্রে বসাতে চায় শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতাকে, সেখানে বহু প্রতিষ্ঠান এখনো ডিগ্রি প্রদানকেই সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখছে। Outcome-based education-এর ভাষায় competency বা যোগ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণক্ষমতা কিংবা বাস্তব সমস্যার সমাধান দক্ষতার চেয়ে পরীক্ষার নম্বর ও CGPA-ই অধিক গুরুত্ব পায়।
২০২৬ সালের চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের বিপুল সংখ্যক অনার্স ও মাস্টার্স প্রোগ্রামের তুলনায় BAC-এর পূর্ণাঙ্গ অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়া প্রোগ্রামের সংখ্যা এখনো সীমিত। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট বিভাগ অগ্রগতি দেখালেও সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত মান নিশ্চিত করার যাত্রা এখনো ধীর ও অসম্পূর্ণ।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান সংকটকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে তাকাতে হয় একটি মৌলিক বৈপরীত্যের দিকে—নীতিপত্রের ভাষা এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার মধ্যকার গভীর দূরত্বের দিকে। একদিকে আছে ফ্রেমওয়ার্ক, কৌশলপত্র, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, সেমিনারের ঝলমলে উপস্থাপনা এবং “Outcome-Based Education”, “Learning Outcome”, “Competency”, “Quality Assurance”-এর মতো আধুনিক পরিভাষা; অন্যদিকে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব শ্রেণিকক্ষে এখনো টিকে আছে পুরোনো পরীক্ষানির্ভর, মুখস্থকেন্দ্রিক এবং শিক্ষক-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা।
অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো সিলেবাস মানে অধ্যায়ের তালিকা শেষ করা, পাঠদান মানে স্লাইড পড়ে শোনানো, আর মূল্যায়ন মানে নির্দিষ্ট প্রশ্নের মুখস্থ উত্তর লিখে নম্বর পাওয়া। শিক্ষার্থী সেমিস্টার শেষে CGPA অর্জন করে, সার্টিফিকেট পায়, সমাবর্তনের গাউন পরে ছবি তোলে। কিন্তু সেই ডিগ্রির ভেতরে কতটা বাস্তব দক্ষতা তৈরি হয়—সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একজন শিক্ষার্থী কি সত্যিই সমস্যা বিশ্লেষণ করতে শেখে? গবেষণার ভাষা বোঝে? তথ্য যাচাই করতে পারে? দলগতভাবে কাজ করতে পারে? বাস্তব জীবনের জটিল পরিস্থিতিতে নিজের জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারে? সমাজ, শিল্প ও মানবিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজের শিক্ষাকে সংযুক্ত করতে পারে?
BNQF-এর দর্শনে এই প্রশ্নগুলোই শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে শিক্ষার সাফল্য নির্ধারিত হয় কেবল একজন শিক্ষার্থী কত তথ্য মুখস্থ করেছে তা দিয়ে নয়, বরং সে কতটা চিন্তা করতে পারে, কতটা বিশ্লেষণ করতে পারে এবং কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে—তা দিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো এই পরিবর্তনকে একটি অতিরিক্ত চাপ বা “অতিরিক্ত কাজ” হিসেবেই দেখা হয়। ফলে outcome mapping, curriculum alignment কিংবা competency-based assessment-এর মতো ধারণাগুলো অনেক সময় নথিপত্রের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে; শ্রেণিকক্ষে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
বাংলাদেশে অ্যাক্রেডিটেশনকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে কেবল প্রশাসনিক অনুমোদন বা একটি আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেট হিসেবে দেখা হয়। অথচ বাস্তবে অ্যাক্রেডিটেশন একটি প্রতিষ্ঠানের আত্মসমালোচনার আয়না। সেই আয়নায় ধরা পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত একাডেমিক অবস্থা—শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গবেষণার পরিবেশ, ল্যাবরেটরি ও লাইব্রেরির মান, কারিকুলামের আধুনিকতা, মূল্যায়ন পদ্ধতির কার্যকারিতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যবস্থা, শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ এবং স্নাতকদের বাস্তব দক্ষতা।
এই আয়নার সামনে দাঁড়ানো সহজ নয়। কারণ সেখানে বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, প্রকৃত সক্ষমতা প্রকাশ পায়। সেখানে বোঝা যায় বিশ্ববিদ্যালয়টি সত্যিই জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, নাকি কেবল ডিগ্রি বিতরণের কাঠামোয় সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয় এখনো সেই আয়নার সামনে পুরোপুরি দাঁড়ানোর মতো প্রস্তুত নয়। কোথাও অর্থের সীমাবদ্ধতা, কোথাও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, কোথাও দক্ষ মানবসম্পদের অভাব, আবার কোথাও পরিবর্তনের প্রতি মানসিক অনীহা। অনেক প্রতিষ্ঠানে IQAC সেল রয়েছে, কিন্তু সেগুলো এখনো জীবন্ত গুণগত সংস্কৃতিতে রূপ নিতে পারেনি। ফাইল আছে, কমিটি আছে, কর্মশালা আছে; কিন্তু শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি দুর্বল, গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে, আর শিক্ষকদের হাতে outcome mapping বা curriculum alignment করার মতো পর্যাপ্ত সময়, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেই।
ফলে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। নীতিপত্রে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন; কিন্তু বাস্তব শ্রেণিকক্ষে এখনো বহু জায়গায় অতীতের শিক্ষাপদ্ধতিই ঘুরেফিরে চলছে। এখানেই শুরু হয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সেই জটিল গোলকধাঁধা—যেখানে আইন এগোতে চায় একদিকে, আর প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা তাকে বারবার টেনে ধরে অন্যদিকে।
আইন বলছে, উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। BNQF বলছে, শিক্ষা হতে হবে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, দক্ষতাভিত্তিক এবং outcome-based। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (BAC) বলছে, প্রতিটি প্রোগ্রামকে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতার মঞ্চে এসে প্রতিটি পক্ষ যেন ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, গবেষণার বাজেট নেই, আধুনিক ল্যাব নেই, প্রশিক্ষিত জনবল নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন তোলে; প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় খরচ, বাজার ও টিকে থাকার হিসাব সামনে আনে। শিক্ষার্থী জানতে চায়, “চাকরি কোথায়?” আর নিয়োগদাতার পাল্টা প্রশ্ন, “দক্ষতা কোথায়?”
এই প্রশ্ন ও পাল্টা প্রশ্নের ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরো প্রজন্ম—যারা ডিগ্রি অর্জন করছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারছে না।
তাদের হাতে সার্টিফিকেট আছে, সিভিতে আছে আকর্ষণীয় CGPA, কিন্তু বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হলে অনেকে থমকে যায়। কেউ ইংরেজিতে একটি বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট লিখতে হিমশিম খায়, কেউ গবেষণা পদ্ধতির মৌলিক ধারণা বোঝে না, কেউ তথ্য বিশ্লেষণে দুর্বল, আবার কেউ পেশাগত আচরণ ও যোগাযোগ দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে। সবাই নয়, অবশ্যই নয়; দেশের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়, কিছু বিভাগ এবং কিছু শিক্ষার্থী সত্যিই আন্তর্জাতিক মানের সক্ষমতা অর্জন করছে। কিছু প্রোগ্রাম ইতোমধ্যে অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় এসেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের কারিকুলাম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি সংস্কারের চেষ্টা করছে। BAC-এর প্রকাশিত তালিকায়ও ২০২৬ সালে স্বীকৃত কয়েকটি প্রোগ্রামের নাম দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বিশাল পরিসরের তুলনায় এই অগ্রগতি এখনো সীমিত, বিচ্ছিন্ন এবং ধীর।
প্রশ্ন তাই আরও গভীর হয়ে ওঠে—সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যা কেবল অর্থের নয়, কেবল অবকাঠামোরও নয়। সমস্যার বড় অংশ লুকিয়ে আছে শিক্ষাদর্শন, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং মানসিক প্রস্তুতির ভেতরে। আমরা এখনো এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার ভার বহন করছি, যেখানে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা ও CGPA-কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়; অথচ BNQF যে দক্ষতা, বিশ্লেষণক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং বাস্তবজীবনভিত্তিক শিক্ষার কথা বলে, সেই সংস্কৃতি এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রান্তিক। ফলে আইন ও বাস্তবতার মাঝখানে তৈরি হয়েছে এক জটিল গোলকধাঁধা—যেখানে নীতিপত্র সামনে এগোয়, কিন্তু শ্রেণিকক্ষ পেছনে পড়ে থাকে।
সমস্যাটা এখানেই—গুণগত উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতায় খুব কম ক্ষেত্রেই একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। কোথাও আইন আছে কিন্তু দক্ষ জনবল নেই, কোথাও অবকাঠামো আছে কিন্তু গবেষণা সংস্কৃতি নেই, কোথাও শিক্ষক আছেন কিন্তু প্রশিক্ষণ নেই, আবার কোথাও উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। অথচ স্বপ্নটি ছিল অমূল্য। একটি কার্যকর অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়কে মূল্যায়ন করে না; এটি শিক্ষার্থীকে সুরক্ষা দেয়, অভিভাবককে আস্থা দেয়, নিয়োগদাতাকে জানায় কোন প্রোগ্রামের স্নাতক কতটা প্রস্তুত, এবং রাষ্ট্রকে বুঝতে সাহায্য করে কোথায় বিনিয়োগ জরুরি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এটি একটি দেশের ডিগ্রির মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। BNQF-এর প্রয়োজনীয়তাও ঠিক এখানেই। এটি ডিগ্রিকে কেবল নাম বা সময়ের হিসাব দিয়ে নয়, দক্ষতা, জ্ঞান ও সক্ষমতার ভাষায় মূল্যায়ন করতে শেখায়।
একজন ব্যাচেলর ডিগ্রিধারী কী জানবে? একজন মাস্টার্স শিক্ষার্থী কতটা স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণ করতে পারবে? একজন পিএইচডি গবেষক নতুন জ্ঞান তৈরিতে কী ধরনের অবদান রাখবে? BNQF এই প্রশ্নগুলোর একটি কাঠামোগত ও জাতীয় ভাষা তৈরি করেছে। চার বছর মেয়াদি ব্যাচেলর ডিগ্রির জন্য ১৪০ ক্রেডিট, পাঁচ বছর মেয়াদির জন্য ১৬০ ক্রেডিট, coursework-ভিত্তিক মাস্টার্সের জন্য নির্দিষ্ট ক্রেডিট কাঠামো, mixed-mode পিএইচডির জন্য গবেষণা ও থিসিসভিত্তিক মানদণ্ড—সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষাকে একটি সমন্বিত গুণগত কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো কাঠামো নিজে নিজে পরিবর্তন আনে না। নীতিপত্র কখনো শ্রেণিকক্ষ বদলায় না, যদি না মানুষ বদলায়। বিশ্ববিদ্যালয়কে বদলাতে হয় ভেতর থেকে। শিক্ষককে নতুনভাবে শিখতে হয়, পরীক্ষাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের হতে হয়, লাইব্রেরিকে জীবন্ত করতে হয়, গবেষণাগারকে সক্রিয় রাখতে হয়, কারিকুলামকে নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হয়। শিক্ষার্থীর মতামত শুনতে হয়, অ্যালামনাই ও নিয়োগদাতার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করতে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় সেই আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি এখনো দুর্বল। কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের ঐতিহ্য বা ব্র্যান্ডমূল্যের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে তারা মনে করে অ্যাক্রেডিটেশন তাদের জন্য জরুরি নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার আশঙ্কা করে, মানদণ্ড পূরণ করতে না পারলে তাদের বাজারসুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার অনেকের কাছে অ্যাক্রেডিটেশন মানে উন্নয়নের সুযোগ নয়, বরং বাড়তি প্রশাসনিক ঝামেলা। অন্যদিকে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিই পরিবর্তন চায়, কিন্তু তাদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ, দক্ষ মানবসম্পদ, সময় বা কারিগরি সহায়তা নেই।
এই বাস্তবতা বুঝে এগোতে না পারলে শুধু কঠোরতা দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। আবার শুধু সহানুভূতিও কার্যকর হবে না। প্রয়োজন জবাবদিহি ও সহায়তার ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়। রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে—মানের বাইরে উচ্চশিক্ষা চলতে পারে না। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রযুক্তিগত ও একাডেমিক সহায়তা দিতে হবে। BAC-এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে, দক্ষ মূল্যায়নকারী তৈরি করতে হবে, বিষয়ভিত্তিক মানদণ্ড আরও সুস্পষ্ট করতে হবে। নবীন ও ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ধাপে ধাপে প্রস্তুতির সুযোগ দিতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান জানিয়েও জবাবদিহির কাঠামো তৈরি করতে হবে, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যিক চাপে শিক্ষার মান যেন বিসর্জিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অ্যাক্রেডিটেশনকে ভয় বা শাস্তির ভাষা থেকে বের করে উন্নয়ন ও আত্মসংশোধনের ভাষায় নিয়ে আসা। যে বিশ্ববিদ্যালয় নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করবে, তাকে ব্যর্থ নয়, বরং উন্নয়নশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান সচেতনভাবে মানের প্রশ্ন এড়িয়ে কেবল ডিগ্রি-বাণিজ্যে মনোযোগী থাকবে, তাকে ছাড় দিলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থী, সমাজ এবং রাষ্ট্র।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে তরুণ জনসংখ্যার সম্ভাবনা, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ, গবেষণা ও উদ্ভাবনের নতুন ক্ষেত্র। অন্যদিকে রয়েছে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, দুর্বল গবেষণা সংস্কৃতি, অপর্যাপ্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সীমিত একাডেমিক স্বাধীনতা এবং দ্রুত ডিগ্রি উৎপাদনের প্রবণতা। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে BAC ও BNQF একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে উঠতে পারত—এখনো পারে। কিন্তু সেতু কেবল নকশায় থাকলে নদী পার হওয়া যায় না; সেটিকে বাস্তবে নির্মাণ করতে হয়।
নয় বছর পর প্রশ্নটি তাই আরও তীব্র হয়ে ফিরে আসে: আমরা কি সত্যিই গুণগত মান চাই, নাকি শুধু মানের ভাষা ব্যবহার করতে চাই? কারণ প্রকৃত মান নিশ্চিত করতে গেলে অস্বস্তি আছে, পরিবর্তনের চাপ আছে। পুরোনো সিলেবাস বদলাতে হবে, শিক্ষককে নতুনভাবে প্রশিক্ষিত হতে হবে, প্রশাসনকে তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ হতে হবে, মালিকপক্ষকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীকেও মুখস্থের নিরাপদ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বিশ্লেষণ, গবেষণা ও সৃজনশীলতার চর্চায় যেতে হবে। একইসঙ্গে সরকারকে ধারাবাহিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে এবং সমাজকে বুঝতে হবে—বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি বিতরণের স্থান নয়; এটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের কর্মশালা।
ঢাকার সেই সেমিনার কক্ষে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে। বক্তৃতা শেষ হয়, চায়ের কাপ খালি হয়, অতিথিরা একে একে বেরিয়ে যান। কিন্তু টেবিলের কোণে পড়ে থাকে সেই পুরোনো প্রশ্ন: আইন আছে, ফ্রেমওয়ার্ক আছে, তাহলে মান কোথায়?
সম্ভবত উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ফাইল খুললেই হবে না। খুলতে হবে শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার এবং মননের দরজা। কারণ উচ্চশিক্ষার প্রকৃত অ্যাক্রেডিটেশন দেয় কেবল কাগজ নয়—সময়, সততা এবং জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি। আর সময় কখনো মুখস্থ উত্তর মেনে নেয় না।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় অ্যাক্রেডিটেশন ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণের প্রশ্নে এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—আইন আছে, কাঠামো আছে, নীতিপত্র আছে; কিন্তু সেই কাঠামোকে চালানোর মতো মানসিক প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং একাডেমিক সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। ফলে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (BAC), BNQF কিংবা Outcome-Based Education-এর মতো ধারণাগুলো অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষের জীবন্ত বাস্তবতায় রূপ নেওয়ার আগেই প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতার স্তরে আটকে যাচ্ছে। কাগজে আধুনিকতার ভাষা লেখা হচ্ছে, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে এখনো বহু জায়গায় পুরোনো পরীক্ষানির্ভর ও মুখস্থকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাই প্রভাব বিস্তার করে আছে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে গুণগত, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং ভবিষ্যতমুখী করতে হলে এখন আর শুধু নীতিমালা প্রণয়ন, কর্মশালা আয়োজন কিংবা আন্তর্জাতিক পরিভাষা মুখস্থ করলেই চলবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক এবং সাহসী সংস্কার। কারণ গত নয় বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে—আইন প্রণয়ন তুলনামূলক সহজ, কিন্তু মান-সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। BAC আইন এবং BNQF একটি কাঠামো দিয়েছে, কিন্তু সেই কাঠামোর ভেতরে প্রাণ সঞ্চার করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বদলাতে হবে ভেতর থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে “কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স” এখনো অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতার খাতায় বন্দি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি একাডেমিক সংস্কৃতির অংশ না হয়ে প্রশাসনিক প্রতিবেদন তৈরির একটি আলাদা দপ্তরে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন অর্থ ও মানবসম্পদে বাস্তব বিনিয়োগ। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি (IQAC) সেলকে কেবল নামমাত্র অফিস হিসেবে রাখলে হবে না; সেখানে দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং পূর্ণকালীন জনবল নিয়োগ দিতে হবে। সেই সেলের হাতে বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষমতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করতে হবে। কারণ গুণগত মান নিশ্চিতকরণ কোনো অতিরিক্ত কাগুজে কাজ নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক হৃদস্পন্দন। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠানে আইকিউএসি আছে ঠিকই, কিন্তু তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। নানা প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, অনীহা এবং ক্ষমতার সংকোচনের মধ্যে তারা অনেক সময় কেবল রিপোর্ট তৈরির যান্ত্রিক দপ্তরে পরিণত হয়।
একইসঙ্গে প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণে এক নীরব কিন্তু মৌলিক বিপ্লব। BNQF-এর ভাষা, Outcome-Based Education (OBE), Learning Outcome Mapping, Bloom’s Taxonomy কিংবা competency-based assessment—এসব কেবল নতুন কিছু শব্দ নয়; এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের শিক্ষাদর্শন। এই দর্শন কেবল একদিনের কর্মশালা বা সনদ দিয়ে আয়ত্ত করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নতুনভাবে শিখতে হবে, নতুনভাবে ক্লাস নিতে হবে, নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। একজন শিক্ষককে শুধু বক্তা নয়, facilitator, mentor এবং learning designer হিসেবেও গড়ে উঠতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের এখন আরও কঠোর ও সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। যেসব শিক্ষক Outcome-Based মূল্যায়ন, competency mapping কিংবা আধুনিক মূল্যায়ন কাঠামোয় পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত নন, তাদের হাতে এই নতুন শিক্ষাপদ্ধতির বাস্তবায়ন ছেড়ে দিলে কাঠামো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কারণ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান সংকটের বড় অংশই তৈরি হয়েছে পুরোনো মানসিকতা ও নতুন কাঠামোর সংঘাত থেকে। আমরা এখনো মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে দাঁড়িয়ে আধুনিক শিক্ষার অভিনয় করছি।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন প্রণোদনা এবং শাস্তির সমন্বিত ব্যবস্থা। অ্যাক্রেডিটেড প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি, আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ সুযোগ, গবেষণা সহায়তা এবং শিক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত গবেষণা তহবিল চালু করা যেতে পারে। অন্যদিকে, যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অ্যাক্রেডিটেশন ছাড়া ভর্তি বিজ্ঞাপন, নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি কিংবা নতুন প্রোগ্রাম চালুর ক্ষেত্রে বাস্তব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হবে। কারণ মানহীন উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় মূল্য শেষ পর্যন্ত দেয় শিক্ষার্থী ও রাষ্ট্র—প্রতিষ্ঠান নয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই সংকটের সমাধান কেবল প্রশাসনিক নির্দেশে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন গভীর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, ধারাবাহিক নীতিগত অঙ্গীকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইনের ৮ নম্বর ধারায় অডিট কমিটি সক্রিয় করার যে সুযোগ রয়েছে, সেটিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে শক্তিশালী “পিয়ার রিভিউ” সংস্কৃতি গড়ে তোলা গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব সংকট, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনাকে সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ই।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত নয় বছরে সেই প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিকতা খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। ফলে আইন আছে, কাঠামো আছে, নীতিপত্র আছে—কিন্তু উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের যে সমন্বিত ও সাহসী যাত্রা প্রয়োজন ছিল, তা এখনো পূর্ণতা পায়নি।
তবু প্রশ্নটি থেকে যায়—গুণগত উচ্চশিক্ষার সেই বহুল প্রতীক্ষিত “সোনার হরিণ” কি আদৌ ধরা পড়বে? নাকি অ্যাক্রেডিটেশন, BNQF, Quality Assurance—এসব কেবল সেমিনারের ব্যানার, নীতিপত্রের ভাষা এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উপস্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
আশার আলো অবশ্য পুরোপুরি নিভে যায়নি। দীর্ঘদিনের ধীরগতি, অসংখ্য কর্মশালা, সুপারিশ এবং অন্তহীন আলোচনার পর অবশেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যত দ্রুত সম্ভব অ্যাক্রেডিটেশনকে বাধ্যতামূলক করার জন্য নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। সেই সিদ্ধান্তের পর শিক্ষাঙ্গনে আবারও এক ধরনের সতর্ক আশাবাদ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, হয়তো এবার রাষ্ট্র উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে মানহীন উচ্চশিক্ষা কেবল শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নয়, দেশের অর্থনীতি, গবেষণা সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।
কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষানীতির ইতিহাস একই সঙ্গে আরেকটি কঠিন সত্যও মনে করিয়ে দেয়—এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে বাস্তবায়ন অনেক বেশি দুরূহ। এই দেশে বহু নীতিমালা ধুমধাম করে ঘোষণা হয়, কিন্তু সময়ের করিডরে ধীরে ধীরে ফাইলের নিচে চাপা পড়ে যায়। ফলে প্রশ্নটি এখনো ঝুলে আছে: বাধ্যতামূলক অ্যাক্রেডিটেশনের বাস্তব রূপ আমরা কি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেখব, নাকি আরও এক দশক অপেক্ষা করতে হবে?
এর উত্তর শুধু কোনো আইন বা কমিটির হাতে নেই। উত্তরটি নির্ভর করছে রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সমাজ—সব পক্ষের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির ওপর। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় যদি কেবল সনদ বিতরণের প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকে, তাহলে অ্যাক্রেডিটেশনও কাগজের অলংকার হয়েই থাকবে। কিন্তু যদি বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিই জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা এবং মানবিক সক্ষমতা তৈরির কেন্দ্র হয়ে উঠতে চায়, তাহলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

অর্থাৎ সমাধান আছে। কিন্তু সেই সমাধানের পথে হাঁটার সাহস এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। আর তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে ভবিষ্যতের দরজা খোলা, কিন্তু ভেতরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত এখনো অসম্পূর্ণ।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় অ্যাক্রেডিটেশন আইন ও বিএনকিউএফের নয় বছরের যাত্রা যেন এক অদ্ভুত অন্তর্লীনের বেলাভূমি তৈরি করেছে। একদিকে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে—আউটকাম বেসড এডুকেশন, কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স, লার্নিং আউটকাম, গ্লোবাল কম্পিটেন্সি, গবেষণা-নির্ভর শিক্ষা। অন্যদিকে বালুর চরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বহু পুরোনো পরীক্ষানির্ভর, মুখস্থকেন্দ্রিক ও সনদমুখী শিক্ষার সংস্কৃতি। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে প্রতিদিন হাঁটছে বাংলাদেশের প্রায় ত্রিশ লাখ উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থী—স্বপ্ন, অনিশ্চয়তা আর অদৃশ্য এক মানসিক দ্বন্দ্ব বুকে নিয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের বারান্দায় বসে আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলছিলেন, “আমি যখন আইন পড়তে আসি, তখন ভাবি মানবাধিকারের জন্য কাজ করব, আদালতে দাঁড়িয়ে মানুষের পক্ষে কথা বলব। কিন্তু চার বছর শেষে যখন দেখি আমার ব্যবহারিক জ্ঞান বলতে কয়েকটি মামলার নাম আর মুখস্থ কিছু তত্ত্ব, তখন ভয় লাগে। মনে হয়, আমি কি সত্যিই প্রস্তুত?” কথাগুলো বলার সময় তার চোখে ছিল হতাশা, আবার একই সঙ্গে এক ধরনের কৌতূহলও। সেই কৌতূহলই হয়তো এখনো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।
কারণ সংকট যত গভীরই হোক, সম্পূর্ণ অন্ধকার এখনো নেমে আসেনি। অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থার বীজ অন্তত বপন হয়েছে। আইন তৈরি হয়েছে, কাঠামো দাঁড়িয়েছে, নীতিপত্র লেখা হয়েছে। কিন্তু বীজ মাটিতে ফেললেই তো ফসল জন্মায় না। প্রয়োজন নিয়মিত সেচ, পরিচর্যা, শ্রম ও সততা। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এখন সেই পরিচর্যার সময়। শুধু নতুন কমিটি গঠন বা কর্মশালা আয়োজন করলেই হবে না; প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে গুণগত মানকে সত্যিকারের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে পরিণত করা। প্রয়োজন এমন এক একাডেমিক পরিবেশ, যেখানে শিক্ষক নতুনভাবে শিখতে লজ্জা পাবেন না, শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না, আর প্রশাসন কেবল কাগজের রিপোর্ট নয়, বাস্তব পরিবর্তনের হিসাব চাইবে।
নইলে ‘গুণগত উচ্চশিক্ষা’ নামের এই সোনার হরিণ আরও নয় বছর পরেও দূর থেকে হাতছানি দিয়ে যাবে। আমরা হয়তো নতুন নতুন নীতিপত্র লিখব, আন্তর্জাতিক পরিভাষা উচ্চারণ করব, সেমিনারে বক্তৃতা দেব; কিন্তু শিক্ষার্থীর বাস্তব দক্ষতা, গবেষণার মান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা একই জায়গায় ঘুরপাক খাবে। তখন ইতিহাস হয়তো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু একটি কথাই বলবে—“তোমরা কাঠামো বানিয়েছিলে, কিন্তু পরিবর্তনের সাহস দেখাওনি।”
কারণ শেষ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার সংকট কেবল আইনের সংকট নয়; এটি দৃষ্টিভঙ্গির সংকট, সততার সংকট এবং বাস্তবায়নের সংকট। আর সেই কারণেই এই প্রতীক্ষার নাটক থামানোর সময় এখনই। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি শুধু ডিগ্রি বিতরণের প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক সক্ষমতা তৈরির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আর কেবল নতুন ভবন, ঝকঝকে ক্যাম্পাস, আন্তর্জাতিক সেমিনার কিংবা রঙিন সমাবর্তনের ছবি দিয়ে বাস্তবতাকে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। কারণ প্রশ্নটা এখন ভবনের নয়, ভবিষ্যতের। প্রশ্নটা কেবল ডিগ্রির নয়, সেই ডিগ্রির বিশ্বাসযোগ্যতার। প্রশ্নটা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিংয়ের নয়, বরং একজন শিক্ষার্থী চার বছর বা পাঁচ বছর শেষে সত্যিই কী শিখল, কীভাবে চিন্তা করতে শিখল, সমাজ ও বিশ্বের সামনে নিজেকে কতটা সক্ষমভাবে তুলে ধরতে পারল—সেই মৌলিক প্রশ্নের।
বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৭ এবং BNQF একসময় এই দেশের উচ্চশিক্ষায় নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি হয়ে এসেছিল। সেই প্রতিশ্রুতি বলেছিল, বিশ্ববিদ্যালয় হবে কেবল পরীক্ষার নম্বর তৈরির কারখানা নয়; হবে জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা ও মানবিক সক্ষমতা তৈরির প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু নয় বছর পর বাস্তবতা আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর আয়না তুলে ধরেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল; কাঠামো আছে কিন্তু সংস্কৃতি নেই; নীতিপত্র আছে কিন্তু শ্রেণিকক্ষ বদলায়নি। আমরা Outcome-Based Education-এর ভাষা শিখেছি, কিন্তু এখনো বহু জায়গায় মুখস্থনির্ভর শিক্ষার নিরাপদ দেয়াল ভাঙতে পারিনি।
তবু হতাশ হওয়ার পুরো কারণ নেই। কারণ সংকট যত গভীর, পরিবর্তনের প্রয়োজনও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, বেশি সচেতন, বেশি প্রতিযোগিতামুখী। তারা শুধু সার্টিফিকেট নয়, দক্ষতা চায়; শুধু CGPA নয়, বৈশ্বিক সক্ষমতা চায়। এই নতুন প্রজন্মই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বদলাতে বাধ্য করবে। রাষ্ট্র যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখায়, বিশ্ববিদ্যালয় যদি আত্মসমালোচনার সাহস পায়, শিক্ষক যদি নতুনভাবে শেখার প্রস্তুতি নেন, আর শিক্ষার্থী যদি প্রশ্ন করার অধিকার ফিরে পায়—তবে এখনো দেরি হয়ে যায়নি।
কারণ উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সংস্কার কখনো কেবল আইনের ভাষায় আসে না; আসে শ্রেণিকক্ষের ভেতর থেকে। আসে সেই মুহূর্তে, যখন শিক্ষক মুখস্থ উত্তরের বদলে চিন্তা করতে শেখান; যখন বিশ্ববিদ্যালয় নিজের দুর্বলতা আড়াল না করে স্বীকার করে; যখন ডিগ্রির চেয়ে শেখাকে বড় মনে করা হয়।
ঢাকার সেই সেমিনার কক্ষে হয়তো আগামী দিনেও “গ্লোবাল র্যাঙ্কিং” নিয়ে আলোচনা হবে। প্রজেক্টরের আলো জ্বলবে, নতুন নীতিপত্র প্রকাশ হবে, নতুন কমিটি গঠিত হবে। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে অন্য এক দৃশ্য—একটি শ্রেণিকক্ষ, যেখানে একজন শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো মুখস্থের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করতে শেখে।
সেদিনই হয়তো অ্যাক্রেডিটেশন কাগজের সনদ থাকবে না; হয়ে উঠবে সত্যিকারের মানের প্রতিশ্রুতি। আর সেদিনই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা হয়তো সত্যিই বিশ্বমানের পথে হাঁটা শুরু করবে।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#নয়_বছরের_ফাঁকফোকর #BAC_আইন_ব্যর্থতা #BNQF_বাস্তবায়ন_নাই #উচ্চশিক্ষার_গুণগতমান #অ্যাক্রেডিটেশনের_গোলকধাঁধা #Bangladesh_Education_Crisis #উচ্চশিক্ষা #অ্যাক্রেডিটেশন #BNQF #বাংলাদেশ_অ্যাক্রেডিটেশন_কাউন্সিল #শিক্ষার_মান #বিশ্ববিদ্যালয় #OutcomeBasedEducation #HigherEducationBangladesh