05/13/2026 “আসমানীর বাড়ি” এখন পুরো ঢাকা: সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় রাজধানী
Dr Mahbub
১৩ May ২০২৬ ১৯:৩৮
অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা। মতিঝিলসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় ভয়াবহ দুর্ভোগ। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের “আসমানী” কবিতার প্রেক্ষাপটে ঢাকার বর্তমান বাস্তবতা, কারণ ও নগর ব্যবস্থাপনার সংকট নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
“আসমানীর বাড়ি” এখন ঢাকার
“আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও…”
১৯৪৬ সালে লেখা পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সেই বিখ্যাত কবিতায় “আসমানী” ছিল গ্রামীণ দারিদ্র্য, ভাঙাচোরা বসতি ও মানুষের অসহায় জীবনের প্রতীক। কাঁচা ঘরের ভেন্না পাতার ছাউনি দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার যে বেদনাময় ছবি কবি এঁকেছিলেন, প্রায় আট দশক পরে এসে সেই চিত্র যেন অন্য রূপে ফিরে এসেছে রাজধানী ঢাকায়।
আজ আর আসমানীকে দেখতে রসুলপুর যেতে হয় না। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঢাকার রাজপথ, অলিগলি, বাণিজ্যিক এলাকা, এমনকি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মতিঝিলও ডুবে যায় জলাবদ্ধতায়।
১৩ মে ২০২৬, মঙ্গলবারের সামান্য বৃষ্টির পর মতিঝিল, পুরানা পল্টন, শান্তিনগর, ফকিরাপুল, মুগদা, মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে যায়। অফিসফেরত মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে।
রাজধানীর ব্যাংকপাড়া হিসেবে পরিচিত মতিঝিল, যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়, সেই এলাকাও কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সড়কে যানবাহন বিকল, ফুটপাত পানির নিচে, ড্রেন উপচে ময়লা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে।
কেন এমন পরিস্থিতি?
১. অপরিকল্পিত নগরায়ণ: বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন পথ দখল ও ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও আবাসন প্রকল্প। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যাওয়ার সুযোগ কমে গেছে।
২. অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা: ঢাকার ড্রেনেজ অবকাঠামোর বড় অংশই পুরোনো ও অপ্রতুল। অনেক এলাকায় ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় প্লাস্টিক ও বর্জ্যে বন্ধ হয়ে থাকে পানি প্রবাহের পথ।
৩. খাল ও জলাশয় দখল: একসময় ঢাকায় অসংখ্য খাল ও জলাশয় ছিল, যা প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশনে সহায়তা করত। কিন্তু বছরের পর বছর দখল, ভরাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেগুলোর বড় অংশ হারিয়ে গেছে।
৪. সমন্বয়হীন নগর ব্যবস্থাপনা: রাজধানীর পানি নিষ্কাশন, সড়ক, ড্রেন ও নগর ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থা কাজ করলেও তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
৫. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, অনিয়মিত বর্ষণ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনও নগর জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ঢাকার অবকাঠামো এখনো পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত নয়।
জলাবদ্ধতার পেছনে যে তিনটি বড় কারণ
বিশেষজ্ঞ ও নগর বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার বর্তমান জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ সবচেয়ে বেশি দায়ী। এগুলো শুধু অবকাঠামোগত সংকট নয়; বরং নগর ব্যবস্থাপনা, নাগরিক আচরণ এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতির গভীর সমস্যাকেও সামনে নিয়ে আসে।
১. পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ব্যর্থতা: ঢাকাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও বাস্তবতায় তার কার্যকর প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। নগর পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের অসামঞ্জস্য, সমন্বয়হীন উন্নয়ন কাজ, খাল ও জলাধার সংরক্ষণে ব্যর্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন সড়ক নির্মাণ করা হলেও সমান্তরাল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে পড়ে পুরো এলাকা অচল হয়ে যায়।
২. জনগণের অসচেতনতায় পলিথিন ও রাবিশে ব্লক ড্রেনেজ সিস্টেম: নগর জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে ড্রেন ও খালে পলিথিন, প্লাস্টিক, বোতল, নির্মাণসামগ্রীর বর্জ্য (রাবিশ) এবং গৃহস্থালি আবর্জনা ফেলে দেওয়ার প্রবণতা। অনেক এলাকায় ড্রেনের মুখ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে থাকে পলিথিন ও ময়লায়। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যেতে পারে না। নাগরিক অসচেতনতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা একসঙ্গে মিলে পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
৩. দুর্নীতি ও জবাবদিহির সংকট: জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তব পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায় না। বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ, তদারকির অভাব এবং দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।অনেক সময় একই এলাকায় বারবার খোঁড়াখুঁড়ি ও সংস্কার কাজ হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। ফলে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—সমস্যা সমাধানের চেয়ে প্রকল্পনির্ভর ব্যয়ই কি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং সমন্বিত নগর প্রশাসন ছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকট থেকে উত্তরণ
নাগরিক জীবনে প্রভাব
জলাবদ্ধতা এখন ঢাকার মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে শুধু যানজট বা যাতায়াত সমস্যা তৈরি হয় না; বরং অর্থনৈতিক ক্ষতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশগত সংকটও বাড়ে।
পানি জমে থাকায় ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি কমছে এবং নগরবাসীর কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি নগর অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এর দায় কার? জনগণের ট্যাক্সের বিপরীতে এ কেমন নগর সেবা!
রাজধানী ঢাকার নাগরিকরা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ফি, ভ্যাটসহ নানাভাবে রাষ্ট্র ও সিটি কর্পোরেশনকে অর্থ দিচ্ছেন। সেই অর্থের বিনিময়ে নাগরিকদের মৌলিক প্রত্যাশা—চলাচলযোগ্য সড়ক, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন নগর পরিবেশ এবং নিরাপদ নগরজীবন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সামান্য বৃষ্টিতেই যদি রাজধানীর প্রধান সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়, ব্যাংকপাড়া অচল হয়ে পড়ে, মানুষ যদি অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে আটকে থাকে, তবে জনগণের ট্যাক্সের বিপরীতে তারা আসলে কী ধরনের নগর সেবা পাচ্ছেন?
দায় কি শুধু প্রকৃতির?
প্রতিবার জলাবদ্ধতার পর প্রায় একই ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসে—“অস্বাভাবিক বৃষ্টি”, “জলবায়ু পরিবর্তন”, “স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি” ইত্যাদি। কিন্তু নাগরিকদের প্রশ্ন, পৃথিবীর বহু দেশে ভারী বৃষ্টি হলেও কেন পুরো শহর অচল হয়ে পড়ে না?
সমস্যা শুধু বৃষ্টিতে নয়; বরং সেই বৃষ্টি মোকাবিলার সক্ষমতায়। আর সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার দায়িত্ব নগর প্রশাসনের।
নাগরিকদের টাকায় প্রকল্প, কিন্তু ভোগান্তি কমে না কেন?
প্রতি বছর জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ড্রেন খনন, খাল উদ্ধার, পাম্প স্থাপন, সড়ক উন্নয়ন—বিভিন্ন নামে উন্নয়ন কাজ চলে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, একই এলাকায় বারবার খোঁড়াখুঁড়ি হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।
ফলে নাগরিকদের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক—
এই প্রকল্পগুলো কি সত্যিই জনস্বার্থে, নাকি কেবল কাগুজে উন্নয়নের প্রদর্শনী?
সমন্বয়হীনতা নাকি দায় এড়ানোর সংস্কৃতি?
ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থা কাজ করে—সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, রাজউক, সড়ক বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলেই প্রায়শই এক সংস্থা অন্য সংস্থার দিকে দায় ঠেলে দেয়।
ফলে নাগরিকরা বুঝতেই পারেন না, শেষ পর্যন্ত দায় নেবে কে। অথচ নাগরিক দুর্ভোগের সময় মানুষ কোনো সংস্থার নাম জানতে চায় না; তারা চায় কার্যকর সমাধান।
নাগরিক দায়ও কি নেই?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরো দায় শুধু প্রশাসনের নয়; নাগরিক অসচেতনতাও বড় কারণ। ড্রেনে পলিথিন, প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট, নির্মাণবর্জ্য ফেলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর করে তোলার পেছনে সাধারণ মানুষের ভূমিকাও রয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো—সচেতনতা তৈরি, আইন প্রয়োগ এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তো প্রশাসনেরই অংশ।
জবাবদিহি ছাড়া উন্নয়ন টেকসই নয়
একটি আধুনিক নগরে নাগরিক সেবা কেবল উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না; বরং মাপা হয় নাগরিকের জীবন কতটা সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর হয়েছে তার মাধ্যমে।
যদি সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী স্থবির হয়ে যায়, তবে উন্নয়নের বড় বড় প্রচারণা নাগরিক বাস্তবতার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবেই। জনগণের ট্যাক্সের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং তার বাস্তব ফলাফল কী—এসব বিষয়ে কার্যকর জবাবদিহি এখন সময়ের দাবি।
উত্তরণের উপায়: স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয়
ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন আর মৌসুমি দুর্ভোগের সাধারণ সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পরিকল্পনা ও নাগরিক জীবনের এক বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। তাই এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক এবং দীর্ঘস্থায়ী। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর উত্তরণের জন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের উদ্যোগই জরুরি।
স্বল্পমেয়াদি করণীয়
১. জরুরি ভিত্তিতে ড্রেন ও খাল পরিষ্কার: বর্ষা মৌসুমের আগে রাজধানীর ড্রেন, খাল ও পানি নিষ্কাশন পথ নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। পলিথিন, প্লাস্টিক ও জমে থাকা ময়লা দ্রুত অপসারণের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা জরুরি।
২. রাবিশ ও নির্মাণবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি: অনেক এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের বর্জ্য সরাসরি ড্রেন ও খালে ফেলা হয়। এটি বন্ধে কঠোর মনিটরিং, জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় দ্রুত পাম্পিং ব্যবস্থা: অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আধুনিক পাম্পিং স্টেশন ও মোবাইল পানি অপসারণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে স্বল্প সময়ে জমে থাকা পানি সরানো যায়।
৪. নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি: পলিথিন ও আবর্জনা ড্রেনে ফেলার ক্ষতি সম্পর্কে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে। স্কুল, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
৫. সংস্থাগুলোর সমন্বিত জরুরি সেল: সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় “র্যাপিড রেসপন্স সেল” গঠন করা যেতে পারে, যাতে বৃষ্টির সময় দ্রুত সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
দীর্ঘমেয়াদি করণীয়
১. সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানভিত্তিক নগর উন্নয়ন: ঢাকার জন্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। সড়ক, ড্রেনেজ, খাল, জলাধার ও আবাসন—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে পরিকল্পনা করতে হবে।
২. খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার: ঢাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে দখল হওয়া খাল, জলাধার ও জলপথ পুনরুদ্ধার জরুরি। জলাশয় ভরাট বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
৩. আধুনিক ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণ: বর্তমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঢাকার জনসংখ্যা ও জলবায়ুগত বাস্তবতার তুলনায় অনেক দুর্বল। তাই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আধুনিক ও জলবায়ু-সহনশীল ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।
৪. জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক নগর পরিকল্পনা: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় “Climate Resilient City” ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
৫. দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা কমাতে জবাবদিহি: জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বাধীন তদারকি, নাগরিক পর্যবেক্ষণ এবং ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা যেতে পারে।
৬. বিকেন্দ্রীকরণ ও পরিকল্পিত নগরায়ণ
সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিল্পায়ন বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমবে এবং নগর ব্যবস্থাপনাও কার্যকর হবে।
শেষকথা
ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো একদিনে তৈরি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অব্যবস্থাপনা, নাগরিক অসচেতনতা ও দুর্নীতির সম্মিলিত ফল। তাই এর সমাধানও রাতারাতি সম্ভব নয়।
তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা আবারও একটি বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় সামান্য বৃষ্টিই ভবিষ্যতের ঢাকা শহরকে আরও বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
ঢাকা শুধু দেশের রাজধানী নয়; এটি অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা ও নাগরিক জীবনের কেন্দ্র। এই শহর যদি সামান্য বৃষ্টিতে অসহায় হয়ে পড়ে, তবে তা শুধু অবকাঠামোগত ব্যর্থতা নয়—এটি নগর শাসনের সংকট, পরিকল্পনার সংকট এবং জবাবদিহির সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।
জনগণ ট্যাক্স দেয় উন্নত নগরসেবার প্রত্যাশায়, জলাবদ্ধতার নগরীতে বসবাসের জন্য নয়।
চূড়ান্ত প্রতিফলন
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের “আসমানী” একসময় ছিল দরিদ্র গ্রামের প্রতীক। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই আসমানীর প্রতিচ্ছবি যেন পুরো ঢাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পার্থক্য শুধু ঘরের উপকরণে—তখন ছিল কাঁচা ঘর, এখন কংক্রিটের নগরী; কিন্তু মানুষের অসহায়ত্বের দৃশ্য যেন একই রয়ে গেছে।
উন্নয়নের বড় বড় প্রকল্প, উঁচু ভবন আর চকচকে সড়কের আড়ালে যদি সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী অচল হয়ে পড়ে, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই নগর উন্নয়ন আসলে কতটা টেকসই?
ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক নগর প্রশাসন। অন্যথায় ভবিষ্যতের ঢাকা আরও বড় জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#ঢাকা #জলাবদ্ধতা #মতিঝিল #আসমানী #জসীমউদ্দীন #নগরসংকট #ঢাকার_বৃষ্টি #UrbanFlooding #Bangladesh #ClimateChange #নগরায়ণ #বাংলাদেশ #সিটি_ম্যানেজমেন্ট