05/22/2026 প্রতিবন্ধিতা নয়, প্রতিভার পূজা হোক — গ্লোবাল অ্যাক্সেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে ২০২৬-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির লড়াইয়ে শিক্ষা সংস্কারের মহাপরিকল্পনা এবং BNADP-এর আহ্বান
odhikarpatra
২১ May ২০২৬ ২৩:৫৬
অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
গ্লোবাল অ্যাক্সেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের (PWDs) জীবনসংগ্রাম, ডিজিটাল ও ফিজিক্যাল অ্যাক্সেসিবিলিটির সংকট, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ এবং BNADP-এর উদ্যোগ নিয়ে এই বিশেষ ফিচার। ঢাকার ভাঙা ফুটপাত, অপ্রবেশযোগ্য গণপরিবহন, স্ক্রিন রিডার-বান্ধব নয় এমন ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে প্রযুক্তিনির্ভর সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত—সবকিছু উঠে এসেছে সাহিত্যধর্মী বর্ণনায়। প্রতিবন্ধিতা নয়, প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই প্রতিবেদন প্রশ্ন তোলে: স্মার্ট বাংলাদেশ কি সত্যিই সবার জন্য প্রস্তুত?
১৫তম Global Accessibility Awareness Day (GAAD) ও এক আলোকিত সকালের কল্পচিত্র
প্রতিবছর মে মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় “গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে (GAAD)”। ২০২৬ সালে দিবসটির ১৫তম আয়োজন পালিত হয় ২১ মে। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে দিবসটি শুধু ডিজিটাল প্রবেশগম্যতার গুরুত্ব তুলে ধরে না; বরং এটি আমাদের সভ্যতা, মানবিকতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। পৃথিবী যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি মৌলিক সত্য—প্রবেশগম্যতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।
GAAD মূলত সেই মানুষগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়, যারা প্রতিদিন অদৃশ্য বাধার মুখোমুখি হন। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধ মানুষ যখন স্ক্রিন রিডারবিহীন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারেন না, একজন বধির শিক্ষার্থী যখন অনলাইন ক্লাসে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ সুবিধা পান না, কিংবা একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী তরুণ যখন একটি ভবনের সামনে এসে থেমে যান শুধুমাত্র র্যাম্প না থাকার কারণে—তখন উন্নয়নের আলো সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। GAAD সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সচেতনতার এক মানবিক আহ্বান।
ঢাকার আকাশে গ্রীষ্মের সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে। সকালবেলার বাতাসে বৈশাখের শেষ দমকা হাওয়া। রাজধানীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে শুরু হয়েছে “অ্যাকসেস ফর অল” মেলা। প্রবেশপথে রঙিন ব্যানারের পাশে তৈরি করা হয়েছে ঢালুপথ, যাতে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা সহজেই ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। হলঘরের এক পাশে প্রদর্শিত হচ্ছে সহায়ক প্রযুক্তি, অন্য পাশে চলছে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজভিত্তিক কর্মশালা। মানুষের মুখে কৌতূহল, অংশগ্রহণ আর একধরনের নীরব আশাবাদ।
হুইলচেয়ারে বসা এক তরুণী নিশ্চিন্ত হাতে তুলে নিচ্ছেন ব্রেইল পুস্তিকা। তাঁর চোখে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি, যেন তিনি করুণার নয়, অধিকারের ভাষায় নিজের অবস্থান ঘোষণা করছেন। পাশেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক তরুণ স্মার্টফোনের স্ক্রিন রিডার ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করছেন অনুষ্ঠানের দৃশ্য। শব্দ শুনে, স্পর্শ অনুভব করে এবং প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে তিনি যুক্ত হচ্ছেন পৃথিবীর সঙ্গে। আরেক কোণে কিছু তরুণ-তরুণী ভয়েস নেভিগেশন সফটওয়্যার, অ্যাকসেসিবল অ্যাপ এবং ডিজিটাল সহায়ক প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করছেন। পুরো পরিবেশটিই যেন বলে দিচ্ছে—অন্তর্ভুক্তি কল্পনা নয়; সঠিক পরিকল্পনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এটি বাস্তব।
এই দৃশ্য কেবল একটি কল্পনা নয়; বরং এমন এক বাংলাদেশের প্রতীক, যেখানে প্রযুক্তি ও মানবিকতা মিলেমিশে গড়ে তোলে সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ। এমন একটি সমাজ, যেখানে একজন মানুষ তার শারীরিক বা সংবেদনগত ভিন্নতার কারণে পিছিয়ে পড়বেন না; বরং সমান মর্যাদা নিয়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির জগতে অংশ নিতে পারবেন।
কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ এখনও দীর্ঘ। কারণ প্রবেশগম্যতা শুধু অবকাঠামো নির্মাণের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতি, প্রযুক্তির নকশা, শিক্ষা ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি এবং নাগরিক চেতনারও প্রশ্ন। GAAD তাই আমাদের শুধু উদযাপন করতে শেখায় না; বরং জিজ্ঞেস করে—আমাদের উন্নয়নের দরজা কি সত্যিই সবার জন্য খোলা?
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় তিন কোটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বসবাস করেন বলে বিভিন্ন অধিকারভিত্তিক সংগঠনের ধারণা। কিন্তু তাঁদের জীবন কেবল কোনো পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। প্রতিটি সংখ্যা আসলে একেকটি পরিবার, একেকটি সংগ্রাম, একেকটি অপূর্ণ স্বপ্ন এবং আত্মমর্যাদার দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। কোনো সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন এক মায়ের নির্ঘুম রাত, যিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিন শঙ্কায় থাকেন। কোথাও আছে এমন এক তরুণের গল্প, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু ক্যাম্পাসে ওঠার মতো র্যাম্প নেই। আবার কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট মেয়েটি হুইলচেয়ারে বসেই আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে—একদিন সেও হয়তো চিকিৎসক হবে, শিক্ষক হবে, কিংবা প্রযুক্তিবিদ হয়ে পৃথিবীকে বদলে দেবে।
কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় সেই স্বপ্নের চেয়েও কঠিন। ঢাকার ব্যস্ত ফুটপাথে এখনও রিকশা, হকার ও অবৈধ দখলের ভিড়ে হারিয়ে যায় হুইলচেয়ারের পথ। মানুষের ভিড়ে গমগম করা শহরে একজন প্রতিবন্ধী মানুষের চলার জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য জায়গাটুকুও যেন অনুপস্থিত। ফুটপাতের ভাঙা ইট, হঠাৎ উঁচু হয়ে থাকা ড্রেনের ঢাকনা কিংবা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি প্রতিদিন তাদের জন্য নতুন নতুন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। যে পথ অন্যদের কাছে সাধারণ হাঁটার রাস্তা, সেটিই কারও জন্য পরিণত হয় এক অনিশ্চিত অভিযাত্রায়।
বৃষ্টিভেজা দিনে নিম্নআয়ের এলাকায় কাঠের তৈরি অস্থায়ী র্যাম্পগুলো পিচ্ছিল হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদে। কখনও কোনো শিশু হুইলচেয়ারসহ পিছলে পড়ে যায়, কখনও একজন বৃদ্ধ ক্রাচে ভর দিয়ে উঠতে গিয়ে ভারসাম্য হারান। নগরের উঁচু বাসের সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী যাত্রীর অসহায়তা আজও আমাদের নগর সভ্যতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। বাস থামে, মানুষ দ্রুত উঠে যায়, আবার নেমেও পড়ে। কিন্তু একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ বা চলাচলে সীমাবদ্ধ কোনো যাত্রীর জন্য সেই কয়েক সেকেন্ড যেন হয়ে ওঠে অপমান, আতঙ্ক ও অপেক্ষার এক দীর্ঘ সময়।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত কিছু এলাকায় হুইলচেয়ারবান্ধব জেব্রা ক্রসিং, ঢালুপথ (র্যাম্প) এবং কিছু অ্যাকসেসিবল অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, বাস্তবতার সঙ্গে সেই অগ্রগতির দূরত্ব এখনো বিস্তর। চকচকে উন্নয়নের ভাষণের ভেতরেও বহু মানুষ প্রতিদিন অনুভব করেন অদৃশ্য বঞ্চনার ভার। কারণ প্রবেশগম্যতা কেবল অবকাঠামোর প্রশ্ন নয়; এটি একজন মানুষকে সমাজ কতটা মর্যাদার সঙ্গে স্বীকৃতি দেয়, তারও প্রশ্ন।
এই মানুষগুলো করুণার নয়, অধিকারের ভাষা চান। তাঁরা দয়া নয়, অংশগ্রহণ চান। তাঁরা সমাজের বোঝা নন; বরং সুযোগ পেলে দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। অথচ বাস্তবতার দেয়াল তাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়নের গল্পে তাদের নাম এখনও পুরোপুরি লেখা হয়নি।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিকতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন সে তার সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের জন্য পথ তৈরি করে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ সুউচ্চ ভবন, ফ্লাইওভার বা ডিজিটাল স্লোগানে নয়; বরং সেই সমাজে, যেখানে একজন প্রতিবন্ধী মানুষও নির্ভয়ে, সম্মানের সঙ্গে এবং স্বাধীনভাবে চলতে পারেন।
গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—প্রবেশগম্যতা শুধু র্যাম্প, লিফট কিংবা সংরক্ষিত আসনের প্রশ্ন নয়। এটি মূলত এমন এক সামাজিক দর্শনের নাম, যেখানে প্রতিটি মানুষ, তার শারীরিক, মানসিক, সংবেদনগত কিংবা যোগাযোগগত ভিন্নতা সত্ত্বেও, সমানভাবে শিক্ষা, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। অর্থাৎ প্রবেশগম্যতা কেবল স্থাপত্যের নকশা নয়; এটি মানবিকতা, সমঅধিকার এবং মর্যাদার ভাষা।
একটি শহর তখনই সত্যিকার অর্থে আধুনিক হয়, যখন সেখানে হাঁটার পথ শুধু দ্রুত চলতে পারা মানুষের জন্য নয়, বরং হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিশুর জন্যও নিরাপদ হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যখন একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীও সমান স্বাচ্ছন্দ্যে লাইব্রেরির বই পড়তে পারেন। একটি রাষ্ট্র তখনই অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন প্রযুক্তি কেবল সুবিধাভোগী মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এখনো সেই স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের মাত্র ১৫ শতাংশ সরকারি ওয়েবসাইট দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডারবান্ধব। বাকি ওয়েবসাইটগুলো যেন এক অদৃশ্য ডিজিটাল দেয়াল তৈরি করে রেখেছে, যেখানে অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণ প্রবেশের আগেই আটকে যায়। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি পড়তে পারেন না, একজন চাকরিপ্রার্থী সরকারি আবেদনপত্র পূরণ করতে গিয়ে প্রযুক্তিগত বাধার মুখে পড়েন, আবার অনেকেই জরুরি নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হন শুধুমাত্র ডিজিটাল প্রবেশগম্যতার অভাবে।
এই বাস্তবতা শুধু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার গল্প নয়; এটি সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিফলন। কারণ ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক অধিকার থেকেও পিছিয়ে পড়া। “স্মার্ট বাংলাদেশ” গঠনের স্বপ্ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন ডিজিটাল জগতও হবে সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত। প্রযুক্তি যদি কিছু মানুষের জন্য সহজ হয় আর অন্যদের জন্য অদৃশ্য দেয়ালে পরিণত হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন কখনোই সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না।
প্রবেশগম্যতার প্রশ্ন তাই কেবল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একক সমস্যা নয়; এটি একটি সমাজ কতটা ন্যায়ভিত্তিক, কতটা মানবিক এবং কতটা দূরদর্শী—তারও পরীক্ষা। একটি স্ক্রিন রিডারবান্ধব ওয়েবসাইট, একটি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজসমৃদ্ধ ভিডিও, একটি র্যাম্প বা একটি অ্যাকসেসিবল বাস শুধু অবকাঠামো নয়; এগুলো মানুষের মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতীক। কারণ সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি তখনই ঘটে, যখন উন্নয়নের প্রতিটি দরজা সবার জন্য সমানভাবে খোলা থাকে।
সব গল্প হতাশার নয়। অন্ধকারের ভেতরেও কিছু আলো জ্বলে থাকে, যা সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। বাংলাদেশের নানা প্রান্তে নীরবে গড়ে উঠছে এমন কিছু পরিবর্তনের গল্প, যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা করুণার নয়, বরং সক্ষমতা, শ্রম ও আত্মমর্যাদার পরিচয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। এই গল্পগুলো শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের সম্ভাবনারও প্রতিচ্ছবি।
গাজীপুরের একটি গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত জন্মগতভাবে বধির রুনা বেগমের গল্প তেমনই এক অনুপ্রেরণার নাম। একসময় পরিবারের অনেকেই ভাবতেন, তিনি হয়তো কখনো স্বাভাবিক কর্মজীবনে যুক্ত হতে পারবেন না। কিন্তু আজ সেই রুনাই নিজের আয়ে সংসার চালান, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ দেন, এমনকি বৃদ্ধ মায়ের চিকিৎসার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দোভাষীর সহায়তায় প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি কর্মক্ষেত্রে এমন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন যে সহকর্মীরাও এখন তাঁকে সম্মানের চোখে দেখেন। কারখানাটিতে স্থাপন করা হয়েছে ভিজুয়াল অ্যালার্ট সিস্টেম, যাতে জরুরি সংকেত বা নিরাপত্তা সতর্কতা তিনি সহজেই বুঝতে পারেন। শব্দহীন পৃথিবীতেও রুনার আত্মবিশ্বাস যেন স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়—সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধকতা কোনো মানুষের সম্ভাবনাকে থামিয়ে রাখতে পারে না।
একইভাবে কুমিল্লার একটি ছোট আইটি ফার্মে কাজ করছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কয়েকজন তরুণ। স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার ব্যবহার করে তাঁরা ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ করছেন দক্ষতার সঙ্গে। অফিসের সহকর্মীরা প্রথমে অবাক হলেও পরে বুঝতে শিখেছেন, প্রযুক্তি যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, তাহলে সীমাবদ্ধতার সংজ্ঞাও বদলে যায়। প্রতিদিন কীবোর্ডের শব্দের ভেতর তারা লিখে চলেছেন আত্মনির্ভরতার নতুন ইতিহাস।
খুলনার একটি কমিউনিটি রেডিও স্টেশনেও দেখা যায় আরেকটি ভিন্ন ছবি। সেখানে শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীরা অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, কনটেন্ট তৈরি এবং সামাজিক সচেতনতা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কেউ স্ক্রিপ্ট লিখছেন, কেউ ডিজিটাল এডিটিং করছেন, কেউ আবার স্থানীয় মানুষের সমস্যা নিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণ করছেন। তাঁদের উপস্থিতি শুধু কর্মক্ষেত্রের বৈচিত্র্য বাড়ায়নি; বরং সমাজের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
এসব গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিবন্ধকতা মানুষের ভেতরের শক্তিকে থামিয়ে রাখতে পারে না; সমাজের বৈষম্যমূলক কাঠামোই আসল বাধা। যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত হয়, যখন প্রযুক্তি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়, যখন মানুষ করুণার বদলে সম্মানের চোখে দেখতে শেখে, তখন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শুধু অংশগ্রহণই করেন না, বরং নেতৃত্বও দেন। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এই নীরব সাফল্যের গল্পগুলো আসলে ভবিষ্যতের এক নতুন সমাজের ইঙ্গিত দেয়—যেখানে মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা দিয়ে নয়, তার সম্ভাবনা দিয়ে মূল্যায়ন করা হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আজ আর করুণার পাত্র নন। তাঁরা সমাজের বোঝা নন, দয়ার প্রত্যাশীও নন; বরং তাঁরা দক্ষ, উদ্যমী, সৃজনশীল এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধিতাকে দুর্বলতা, অসহায়ত্ব কিংবা নির্ভরশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বদলাচ্ছে। আজ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিল্প, সাহিত্য, উদ্যোক্তা উদ্যোগ এবং কর্মক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতার শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। তাঁরা প্রমাণ করছেন, সীমাবদ্ধতা মানুষের শরীরে নয়; বরং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও কাঠামোগত বৈষম্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত বাধা।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের হুইলচেয়ারে বসা এক মেধাবী কিশোরীও স্বপ্ন দেখে চিকিৎসক হওয়ার, প্রযুক্তিবিদ হওয়ার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। সন্ধ্যায় গ্রামের বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে ছোট্ট একটি বাতির নিচে বসে সে বই পড়ে, অনলাইনে ক্লাস করার চেষ্টা করে, কিংবা পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন আঁকে নিজের মতো করে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে যায় ভাঙা ফুটপাত, অপ্রবেশযোগ্য বিদ্যালয়, র্যাম্পহীন কলেজ ভবন কিংবা সমাজের তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক সময় তার মেধা নয়, বরং সমাজের নির্মিত বাধাগুলোই তাকে পিছিয়ে দেয়।
একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণ যখন স্ক্রিন রিডারের সাহায্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেন, একজন বধির তরুণী যখন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন, কিংবা একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী উদ্যোক্তা যখন নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, তখন তারা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প লেখেন না; বরং সমাজের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁরা দেখিয়ে দেন, সুযোগ ও সহায়তা পেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সমান অংশীদার হতে পারেন।
আমাদের সমাজে “প্রতিবন্ধী” শব্দটির সঙ্গে তাই নতুন এক ধারণা যুক্ত হওয়া জরুরি—“সক্ষম নাগরিক”। কারণ একজন মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা দিয়ে নয়, তার সম্ভাবনা দিয়ে মূল্যায়ন করাই একটি মানবিক সমাজের বৈশিষ্ট্য। করুণার দৃষ্টি মানুষকে ছোট করে, কিন্তু অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে মর্যাদা দেয়। একটি র্যাম্প, একটি ব্রেইল বই, একটি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দোভাষী কিংবা একটি অ্যাকসেসিবল ওয়েবসাইট কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এগুলো একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অংশ।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় তার সুউচ্চ ভবন, ঝলমলে নগরায়ণ বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; বরং সে কতটা সম্মানের সঙ্গে তার প্রান্তিক মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পারে, সেখানেই নিহিত থাকে মানবতার আসল মানচিত্র। যে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল ও অবহেলিত মানুষদের জন্য পথ তৈরি করতে শেখে, সেই সমাজই সত্যিকার অর্থে উন্নত ও মানবিক হয়ে ওঠে।
তাই এখন সময় এসেছে করুণার ভাষা থেকে বেরিয়ে অধিকারের ভাষায় কথা বলার। কারণ একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মানুষ নন; তিনি এই সমাজ, এই রাষ্ট্র এবং এই ভবিষ্যতেরই সমান অংশীদার।
গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে-র আলো যখন ম্লান হয়ে যায়, তখন বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা যেন এক কঠিন হিসাব দাঁড় করায়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রতিদিন যেসব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, তার অনেকটাই ‘অদৃশ্য’। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো নগর ও গ্রামীণ পরিকাঠামোর নৃশংস উদাসীনতা। রাজধানীর অধিকাংশ ভবনের প্রবেশপথে সিঁড়ি, কিন্তু কোনো র্যাম্প নেই। আছে বললেও সেটির ঢাল এত খাড়া যে হুইলচেয়ার নিয়ে ওঠা দুরূহ। আর লিফট থাকলেও বোতামে ব্রেইল লিপি নেই, জরুরি নির্দেশনাও নেই দৃশ্য ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের উপযোগী করে। গণপরিবহন তো আরও কঠিন বাস্তবতা—বাসের ধাপ উঁচু, দরজা সংকীর্ণ, ভেতরে ঘুরে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। রেলস্টেশনগুলোর প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে গেলেই হোঁচট খেতে হয় নানান অবকাঠামোগত বাধায়।
দ্বিতীয় ও আরও গভীর চ্যালেঞ্জ হলো ‘যুক্তিসঙ্গত সুবিধা’র ধারণাটি আমাদের আইন ও মননে এখনো পরিষ্কার নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ বলছে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সরকারি সেবাকেন্দ্রে যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা নিতে হবে—যেমন শ্রবণযন্ত্রের ব্যবস্থা, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দোভাষী, নমনীয় কর্মঘণ্টা, কিংবা চাকরির পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময়। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যবস্থাগুলো প্রায় অস্তিত্বহীন। একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি পাওয়া শ্রবণপ্রতিবন্ধী এক তরুণ জানালেন, তাঁকে সহকর্মীরা ‘বোঝা’ মনে করেন, কারণ সভার সময় কেউ লিখে দিতে চান না। ‘যুক্তিসঙ্গত সুবিধা’ শব্দটি যেন এক অলঙ্কার হয়ে থাকে নীতিমালার পাতায়।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি অতি সূক্ষ্ম কিন্তু অতি ভয়ংকর—সামাজিক কলঙ্ক ও মানসিকতার বাধা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যখন হুইলচেয়ার নিয়ে রাস্তায় নামেন, চারপাশের কৌতুহলী দৃষ্টি, করুণার ছলে দেওয়া উপদেশ, কিংবা ‘ওরা দিয়ে কী হবে’—এই বাক্যগুলো যেকোনো শারীরিক বাধার চেয়ে বেশি আঘাত করে। বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তিক বা মানসিক প্রতিবন্ধীদের তো প্রায় ‘অদৃশ্য’ করে রাখা হয়। গ্রামাঞ্চলে তো প্রতিবন্ধী শিশুকে ঘরের কোণে গুঁজে রাখার দৃশ্য এখনো নিত্যদিনের। ডিজিটাল বাংলাদেশের বিজয়গাথা এসব ঘরে ঘরে পৌঁছায় না কারণ স্ক্রিন রিডারবান্ধব অ্যাপ, বিকল্প টেক্সট, ক্যাপশন—এসব অভিজ্ঞান এখনো অনেক দূরে।
তাহলে উত্তরণের পথ কোথায়? প্রথমত, আইন বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’-এর তফসিলভুক্ত সব ভবন ও পরিবহনে অ্যাকসেসিবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে সময়বদ্ধ পরিকল্পনায়। ইতিমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কিছু জেব্রা ক্রসিংয়ে শব্দ সংকেত ও টেকসই ঢালুপথ বসিয়েছে, যাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘অ্যাকসেসিবিলিটি অডিট’ বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো ভবন বা ওয়েবসাইট যদি প্রবেশযোগ্য না হয়, তবে তার নিবন্ধন বাতিলের বিধান রাখা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সমন্বয় ঘটাতে হবে। সস্তায় ও স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল ডিসপ্লে, ওয়াকিটকি সিস্টেম; কিংবা অটোরিকশাকে হুইলচেয়ারবান্ধব করার নকশা—এসব উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে। ইতিমধ্যে কিছু তরুণ উদ্যোক্তা ‘অ্যাকসেস বাংলাদেশ’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছেন, যাতে ব্যবহারকারীরা প্রতিবন্ধীবান্ধব স্থানগুলো চিহ্নিত করতে পারেন। এই উদ্যোগগুলোর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, দরকার সামাজিক আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির, বাজার, সিনেমাহল—প্রত্যেকটি স্থানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করতে হলে দরকার গণসচেতনতা। গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি চিরন্তন প্রত্যয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন রাস্তায়, পড়তে পারেন স্কুলে, কাজ করতে পারেন অফিসে, ভোট দিতে পারেন কেন্দ্রে— সেই অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশকে এখন পেরোতে হবে দৃষ্টিভঙ্গির দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। আমরা যদি সত্যিই ‘সবার বাংলাদেশ’ গড়তে চাই, তবে চলার পথের প্রতিটি ইঁট গেঁথে দিতে হবে সমতার মশালে।
এমন এক প্রহরে যখন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বাংলাদেশের বুকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছেন দিনরাত, তখন তাদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে বিএনএডিপি। বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ডিজঅ্যাবল্ড পিপল—এই নামটি শুধু কোনো সংগঠনের নাম নয়; এটি এক মর্মস্পর্শী স্বপ্নের নাম। যারা জন্ম থেকেই শুনেছেন ‘তুই পারবি না’, যাদের পদে পদে বাধা দিয়েছে শারীরিক অবকাঠামো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আর বৈষম্যের অদৃশ্য প্রাচীর—তারাই এখন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গড়ে তুলেছেন এই মঞ্চ। বিএনএডিপি-র স্বপ্ন একটাই: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেন কোনো করুণার পাত্র না হন, বরং হয়ে ওঠেন সমাজের মূলস্রোতের চালিকাশক্তি।
সংগঠনটির নেতৃত্বে থাকা প্রতিবন্ধী অ্যাকটিভিস্টরা স্বপ্ন দেখেন এক এমন বাংলাদেশের, যেখানে প্রতিটি স্কুলের দ্বার খোলা থাকে অটিজম বা সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত শিশুর জন্য; যেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার হলে বসে শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পায় সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দোভাষীর সেবা; যেখানে চাকরির ইন্টারভিউতে কোনো তরুণকে লুকাতে হয় না তার হুইলচেয়ার। বিএনএডিপি-র স্বপ্নের ভিত্তি হলো ‘যুক্তিসঙ্গত সুবিধা’র নিশ্চয়তা—এমন ব্যবস্থা যা কোনো ব্যক্তিকে তার শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য পিছিয়ে দেয় না, বরং তাকে এগিয়ে যেতে সক্ষম করে তোলে।
বিগত এক দশকে বিএনএডিপি যেসব দাবি জানিয়েছে, তার অনেকটাই এখন আইনের পাতায় স্থান পেয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের পথ এখনো অতিক্রম করা বাকি। তারা চায়, সরকারি সব তথ্যসেবা যেন ‘অ্যাকসেসিবিলিটি গাইডলাইন ২০২০’-এর আওতায় আসে; সব বেসরকারি বাণিজ্যিক ভবন যেন প্রতিবন্ধীদের জন্য খোলা থাকে নির্দ্বিধায়। তাদের আরেকটি বড় স্বপ্ন হলো ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর প্রতিটি ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ যেন স্ক্রিন রিডার এবং ভয়েস কমান্ডের সুবিধা দেয়। পাশাপাশি, গণপরিবহনের প্রতিটি ইউনিটে হুইলচেয়ার লকিং সিস্টেম, ভিজুয়্যাল ও অডিও অ্যানাউন্সমেন্ট—এসব তাদের কাছে কোনো বিলাসিতা নয়, মৌলিক অধিকার।
বিএনএডিপি স্বপ্ন দেখে এক ভিন্ন ভোরের, যখন কুমিল্লার এক প্রতিবন্ধী কিশোরী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রবেশ করতে গেলে তাকে আর কাঁধে করে উঠতে হবে না—থাকবে স্বয়ংক্রিয় র্যাম্প। যখন চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ব্যাংকে কোটার বাইরে পদোন্নতি পাবে শ্রবণপ্রতিবন্ধী এক কর্মী, শুধু যোগ্যতার জোরে। সংগঠনটি চায় ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটি ধীরে ধীরে মুছে যাক, বদলে আসুক ‘সক্ষমতা বৈচিত্র্য’। তাদের বিশ্বাস, সমাজ যদি একবার বুঝতে পারে যে র্যাম্প তৈরির খরচ মূল্যহীন, কিন্তু প্রতিভা হারানোর মূল্য অসীম—তবে বদলে যাবে সব হিসাব।
দিবসটি উপলক্ষে BNADP সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিশেষ প্রচারণা চালায়। “Nothing About Us Without Us” স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম এবং সাফল্যের গল্প তুলে ধরা হয় ভিডিও বার্তা, অনলাইন ক্যাম্পেইন ও উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কারণ নতুন প্রজন্ম বুঝতে শুরু করেছে, অন্তর্ভুক্তি শুধু নীতিমালার বিষয় নয়; এটি সংস্কৃতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবিক চেতনার প্রশ্ন।
গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে-র ২০২৬ সালের সূর্যাস্তে বিএনএডিপি-র স্বপ্নযাত্রীরা যখন ফিরে তাকায় পথচলায়, তারা দেখে কিছু আলো জ্বলেছে, কিছু জ্বলেনি। তথাপি হাল ছাড়ার পাত্র নয় তারা। মাইক্রোফোন ধরে চিৎকার না করে, তারা গড়ে তুলছে বটম-আপ আন্দোলন: কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশনের বাজেট মিটিং—সব জায়গায় এখন তাদের দাবি উচ্চারিত হয় এক কণ্ঠে। ‘আমরা চাই না দয়া, চাই সুযোগ’—এই ব্রত নিয়ে বিএনএডিপি-র স্বপ্ন বেড়ে ওঠে প্রতিটি প্রতিবন্ধী শিশুর চোখের মণিতে, প্রতিটি হুইলচেয়ারে বসা বুড়োর নীরব অশ্রুতে। বাংলাদেশের আগামী দিন যেন সেই স্বপ্নের দিন হয়—যেখানে প্রতিবন্ধকতা হার মানবে মানবিকতাবোধের কাছে, আর প্রতিটি প্রান্তিক মানুষ পাবে তার প্রাপ্য মর্যাদা।
প্রতি বছর মে মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্ব যখন গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে পালন করে, তার মূল শিক্ষাটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও গভীর: প্রবেশযোগ্যতা কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়—এটি মৌলিক মানবাধিকার। দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে সভ্য হয় যখন তার প্রতিটি নাগরিক, শারীরিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা নির্বিশেষে, তথ্য, সেবা ও পরিবেশে সমান সুযোগ পায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষা যেন এক খোলা চিঠি—আমাদের সকল স্থাপনা, প্রযুক্তি, আইন ও মনমানসের মূল্যায়নের। আর এই মূল্যায়নের সবচেয়ে জটিল ও আশাপ্রদ ক্ষেত্র হলো শিক্ষাব্যবস্থা।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ বহু সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য এই ব্যবস্থা প্রায়শই হয় এক অচল দারুণ প্রাচীর। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা’র কথা বললেও, বাস্তবতার মাঠে তা এখনো অঙ্কুরেই রয়েছে। গ্রামগঞ্জের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই হুইলচেয়ারবান্ধব র্যাম্প; নেই আলাদা টয়লেট; নেই ব্রেইল বোর্ড বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে পাঠদানের ব্যবস্থা। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে তো ব্যপার আরও করুণ। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী একজন ছাত্রকে পরীক্ষার সময় কোনো ‘লিখক’ (scribe) দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু সেই লিখক বহু ক্ষেত্রেই অপ্রশিক্ষিত; উত্তরে নিজের বানানভুল বসিয়ে দেন। শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বসে শুধু ঠোঁট নড়াচড়া দেখে বোঝার চেষ্টা করেন, কারণ শিক্ষকের মুখে কোনো ক্যাপশন বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের ব্যবস্থা নেই।
তাহলে গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে আমাদের কী শিক্ষা দেয়? প্রথম শিক্ষা: ‘সর্বজনীন নকশা’ (Universal Design)-এর প্রয়োগ জরুরি। অর্থাৎ, কোনো বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের সময় যেন প্রথম পরিকল্পনাতেই রাখা হয় ঢালুপথ, প্রশস্ত দরজা, ব্রেইল চিহ্ন ও ভিজুয়্যাল অ্যালার্ট। দ্বিতীয় শিক্ষা: প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার। বর্তমানে সস্তায় তৈরি স্ক্রিন রিডার, টেক্সট-টু-স্পিচ সফটওয়্যার, ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিজিটাল ব্রেইল প্যাড—এসব বাংলাদেশের জন্য আর কল্পকাহিনি নয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) যদি সব পাঠ্যপুস্তক ‘অ্যাকসেসিবিলি ফরম্যাটে’ (ডিজিটাল, অডিও, ব্রেইল) প্রকাশ করতে বাধ্য হয়, তবে কয়েক লাখ প্রতিবন্ধী শিশু উপকৃত হবে। তৃতীয় শিক্ষা: শিক্ষক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের গবেষণা বলছে, মাত্র ২০ শতাংশ সাধারণ শিক্ষক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করতে পারেন। তাই শিক্ষকের সার্টিফিকেট কোর্সে ‘ইনক্লুসিভ ক্লাসরুম ম্যানেজমেন্ট’ আবশ্যক করা দরকার।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার মানে শুধু ভবন বা বই নয়; এটি একটি আত্মিক পরিবর্তন। কল্পনা করুন—রাজশাহীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অটিজম আক্রান্ত এক কিশোরী বসে আছে ক্লাসের এক কোণে। সহপাঠীরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, শিক্ষক নিরুপায়। এক বছর পর সেই বিদ্যালয়টিতেই তৈরি হলো ‘রিসোর্স রুম’—যেখানে বিশেষ প্রশিক্ষিত শিক্ষিকা প্রতিদিন এক ঘণ্টা তাকে পড়ান। পুরো ক্যাম্পাসে লাগানো হলো পিকচার এক্সচেঞ্জ কমিউনিকেশন সিস্টেম (PECS)। ছেলেমেয়েরা এখন বুঝতে শিখেছে, বৈচিত্র্যই সৌন্দর্য। এটি কোনো গল্পকথা নয়; এটি গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে-র শিক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ারই নাম।
বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের বাস্তবায়নে এখন প্রয়োজন মাল্টি-স্টেকহোল্ডার জোট। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন (বিএনএডিপি-র মতো), আইটি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ‘অ্যাকসেসিবল এডুকেশন ফ্রেমওয়ার্ক ২০২৫’ নামে একটি খসড়া ইতিমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে; এখন দরকার সময়বদ্ধ অ্যাকশন প্ল্যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনক্লুসিভ এডুকেশন রিসার্চ সেল’ ইতিমধ্যে ৫০টি স্কুলে পাইলট প্রকল্প চালিয়েছে, যেখানে ৮৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী নিয়মিত উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এটাই প্রমাণ করে—উপায় আছে, বাজেট আছে, স্বল্প ইচ্ছাশক্তির অভাবেই থমকে আছে আমরা।
গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে-র সবচেয়ে বড় পাঠটি সম্ভবত এই: ‘কেউ পিছিয়ে থাকবে না’—এই ব্রতকে কেবল স্লোগান না রেখে প্রতিটি পাঠ্যক্রম, প্রতিটি আসনবিন্যাস, প্রতিটি মূল্যায়ন ব্যবস্থায় ছড়িয়ে দিতে হবে। যখন কোনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহজেই লাইব্রেরির ডিজিটাল বই অ্যাকসেস করতে পারবে, যখন কোনো মোটর নিউরন ডিজঅর্ডার রোগী বিশেষ কিবোর্ডের সাহায্যে পরীক্ষার উত্তর লিখতে পারবে, তখনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে ‘সবার শিক্ষা’র দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। আমাদের অপেক্ষা করার সময় নেই। প্রতিটি ‘গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে’ উজ্জীবনের শিখা হিসেবে কাজ করুক—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি সংস্কারের অভিযানে। কারণ, যে দেশের স্কুলে অ্যাকসেসিবিলিটি নেই, সেই দেশের ভবিষ্যৎ স্বপ্নও অচল। আর আজকের প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষিত করতে না পারলে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে এক পঙ্গু প্রজন্মের দেশ। সুতরাং পাঠ চিরকালীন: শিক্ষায় অ্যাকসেসিবিলিটিই প্রকৃত সমতার বীজ।
গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে কেবল একটি দিবস নয়; এটি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করার দিন। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, যেখানে প্রতিটি ফুটপাথ, প্রতিটি বাসের দরজা, প্রতিটি ওয়েবপেজ এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত?
যদি না হয়ে থাকে, তাহলে এখনই সময় পরিবর্তনের। রূপকথার মতো নয়, বাস্তবের মতো একটি বাংলাদেশ গড়তে হবে। এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে কোনো শিশু তার স্বপ্নের কাছে হেরে যাবে না শুধু প্রবেশগম্যতার অভাবে। যেখানে প্রযুক্তি হবে মানবিকতার সেতুবন্ধন। যেখানে ভিন্নতা হবে বৈচিত্র্যের আরেক নাম। সেই পৃথিবী অপেক্ষা করে আছে আমাদের সিদ্ধান্তের জন্য।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, President, Bangladesh National Alliance of Disability Professionals (BNADP)
#Accessibility #GlobalAccessibilityAwarenessDay2026 #AccessibilityBangladesh #BNADP #DisabilityRightsBangladesh #DigitalAccessibility #InclusiveBangladesh #SmartBangladesh #প্রতিবন্ধীঅধিকার