07/13/2026 ফিরে দেখা: নজরুলকে আমরা কতটুকুই বুঝতে পেরেছি — ১২৭ বছর পরও কেন অপঠিত রয়ে গেলেন বিদ্রোহী কবি?
odhikarpatra
২২ May ২০২৬ ২৩:১৪
অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
জাতীয় কবিকে আমরা মঞ্চে উদযাপন করি, কিন্তু তাঁর কান্না, প্রেম, ভাঙন আর মানবিকতার গভীর আর্তিকে কতটা ধারণ করেছি? নজরুলের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে এক নির্মোহ ফিরে দেখা। এই বিশেষ ফিচারে উঠে এসেছে বিদ্রোহী কবির এক অনালোচিত মানবিক মুখ। আমরা তাঁকে কেবল দ্রোহ, সাম্য আর অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক হিসেবে স্মরণ করি, অথচ তাঁর ব্যক্তিগত বেদনা, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা, ভঙ্গুরতা ও দীর্ঘ নৈঃশব্দ্যের ইতিহাসকে কতটা বুঝি? চুরুলিয়ার ধুলোমাখা পথ থেকে জাতীয় কবির আসনে পৌঁছানো নজরুল আজও আমাদের সমাজ, রাজনীতি ও মানবিক সংকটের আয়না। এই লেখায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে: আমরা কি সত্যিই নজরুলকে ধারণ করেছি, নাকি শুধু তাঁকে অনুষ্ঠানের মঞ্চে বন্দি করে রেখেছি?
এক.
চুরুলিয়ার ধুলোমাখা পথে একদিন যে ছেলেটি লেটোর দলে গান বেঁধেছিল, তাকে আমরা পরে ‘বিদ্রোহী কবি’ নামে বাঁধাই করে ফেলেছি। অথচ নজরুল নিজে কোনো ফ্রেমে আটকে থাকতে চাননি। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে ফুলের মালা, আলোচনা সভা আর আবৃত্তির ঢেউ ওঠে। মঞ্চে বাজে ‘চল্ চল্ চল্’, মাইকে গর্জে ওঠে ‘বল বীর’। তবু অনুষ্ঠান শেষে ফিরতি পথে প্রশ্নটা থেকেই যায়: আমরা কি কেবল তাঁর কণ্ঠের উচ্চগ্রামটুকুই শুনেছি, নাকি সেই কণ্ঠের ভেতর লুকিয়ে থাকা কান্না, প্রেম, আর অসহায় এক মানুষের দীর্ঘশ্বাসও ছুঁতে পেরেছি?
দুই.
নজরুলকে আমরা চিনেছি মূলত দুটি পরিচয়ে। এক, তিনি ব্রিটিশবিরোধী কবি, জালিমের বিরুদ্ধে খড়গকৃপাণ। দুই, তিনি সাম্যের গান গাওয়া বুলবুল, হিন্দু-মুসলমানের মিলনের দূত। এই দুই পরিচয়ই সত্য, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। তাঁর গজলে যে সুফি বিরহ লুকিয়ে আছে, শ্যামাসংগীতে যে মাতৃভক্তি কাঁপে, কিংবা ‘দোলনচাঁপা’র পাতায় যে কিশোর প্রেমিক অভিমান করে, তাকে আমরা কতবার পাঠ্য করেছি? বিদ্রোহের আগুন সহজে চোখে পড়ে। কিন্তু যে আগুন নিজেকে পুড়িয়ে আলো দেয়, তার উত্তাপ মাপতে আমরা খুব কমই থেমেছি। ফলে নজরুল রয়ে গেছেন আমাদের সভা-সমিতির বক্তৃতার নায়ক, অথচ ব্যক্তিগত নির্জনতায় তিনি প্রায় অনুপস্থিত।
তিন.
তাঁর জীবনটাই ছিল একটানা ভাঙাগড়ার কাব্য। দারিদ্র্য, পুত্রশোক, প্রেমে প্রত্যাখ্যান, রাষ্ট্রের রোষ, শেষে নির্বাক হয়ে যাওয়া চল্লিশ বছরের দীর্ঘ নৈঃশব্দ্য। আমরা তাঁর ‘আমি সেই দিন হব শান্ত’ পড়ি, কিন্তু যে মানুষটি লিখেছিলেন ‘আমার কৈশোরের প্রিয়া আজও আসেনি’, তাঁর অপেক্ষার ভার বুঝি না। আমরা ‘নারী’ কবিতার তেজ মুখস্থ করি, অথচ নার্গিসকে লেখা চিঠির কাতরতা এড়িয়ে যাই। নজরুলকে বুঝতে হলে তাঁর শক্তির পাশাপাশি তাঁর ভঙ্গুরতাকেও পড়তে হয়। যে মানুষ নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি কবি, আমি আঘাত হেনে হেনে বীণা বানাই’, তাঁকে কেবল আঘাতের শব্দে চিনলে বীণার সুরটুকু অধরাই থেকে যায়।
চার.
ধর্ম নিয়ে নজরুলের অবস্থানকে আমরা আজও স্বস্তির সাথে নিতে পারি না। তিনি মসজিদের পাশে মন্দিরের বাঁশি বাজাতে চেয়েছেন, আবার শ্যামাসংগীত লিখে শ্যামাকে ‘মা’ ডেকেছেন। একদল তাঁকে ‘কাফের’ বলেছে, আরেকদল ‘বিধর্মী-ঘেঁষা’। অথচ নজরুলের কাছে ধর্ম ছিল নদীর মতো। নদী যেমন দুই তীরকেই ছুঁয়ে যায়, তিনিও তেমনি মানুষের হৃদয়ের তীর ছুঁতে চেয়েছেন। আমরা অসাম্প্রদায়িকতার বুলি আওড়াই, কিন্তু নজরুলের মতো প্রথার দেয়াল ভাঙার সাহস দেখাই কই? তাঁর ‘মানুষ’ কবিতাটি আজও স্কুলের দেয়ালে ঝোলে, কিন্তু বাস্তবে মানুষকে মানুষ হিসেবে মেনে নিতে আমাদের হাজারো শর্ত। এখানেই আমাদের বোঝার দৈন্যটা প্রকট হয়ে ওঠে।
পাঁচ.
নজরুলকে আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছি, ১৯৭২ সালে সসম্মানে ঢাকায় এনেছি। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠান, সড়ক, বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। তবু তাঁর স্বপ্নের কতটা পূরণ হলো? তিনি লিখেছিলেন, ‘গাহি সাম্যের গান, যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান।’ আজ শতবর্ষ পরেও ধনী-গরিবের ব্যবধান, ধর্মের নামে বিভেদ, মত প্রকাশের ভয়, সবই আছে। আমরা নজরুলকে মঞ্চে তুলি, কিন্তু জীবনের মঞ্চে তাঁকে নামাই না। তাঁর গান আমাদের রিংটোন হয়, কিন্তু তাঁর চেতনা আমাদের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে বাজে না।
ছয়.
তাহলে নজরুলকে বোঝার পথ কী? সম্ভবত পথটা শুরু হয় তাঁকে ‘মহামানব’ বানানো বন্ধ করা দিয়ে। তিনি রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন। ভুল করেছেন, কেঁদেছেন, ভালোবেসে পুড়েছেন। তাঁর গানের স্বরলিপির পাশে তাঁর না-পাওয়ার হিসাবটাও রাখতে হবে। ‘বিদ্রোহী’ পড়ার পর ‘সর্বহারা’ পড়তে হবে, ‘আনন্দময়ীর আগমনে’র পর ‘ব্যথার দান’ খুলতে হবে। নজরুলকে বুঝতে হলে তাঁর দ্রোহের পাশে তাঁর দরদকেও জায়গা দিতে হবে। কারণ শুধু তলোয়ার দিয়ে মানুষের মুক্তি আসে না, বাঁশির সুরও লাগে।
শেষ.
চুরুলিয়ার সেই ধুলো আজও ওড়ে। ১২৭ বছর পরেও নজরুল আমাদের দরজায় কড়া নাড়েন। কখনো বিদ্রোহী হয়ে, কখনো বিরহী হয়ে। আমরা দরজা খুলি, মালা দিই, আবার ব্যস্ত হয়ে দরজা বন্ধ করি। এবারের জন্মবার্ষিকীতে না হয় দরজাটা একটু বেশিক্ষণ খোলা রাখি। তাঁকে কেবল শুনব না, একটু বুঝতেও চেষ্টা করব। কারণ জাতীয় কবিকে সম্মান জানানো মানে শুধু তাঁর ছবিতে ফুল দেওয়া নয়, তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোকে নিজের ভেতর একটু একটু করে বাঁচিয়ে রাখা।
নজরুলকে আমরা পুরোটা বুঝিনি। হয়তো পুরোটা বোঝা যায়ও না। কিন্তু যতটুকু বুঝেছি, ততটুকুও যদি ধারণ করতে পারতাম, তাহলে এই সময়টা এত রুক্ষ হতো না। তাঁর জন্মদিনে আমাদের বিনম্র স্বীকারোক্তি হোক: হে কবি, তোমাকে পড়েছি অনেক, বুঝেছি কম। ক্ষমা কোরো।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)\
#নজরুল #কাজীনজরুলইসলাম #বিদ্রোহীকবি #নজরুলজন্মবার্ষিকী #বাংলাসাহিত্য #অসাম্প্রদায়িকতা #মানবিকনজরুল #ফিরেদেখা #সম্পাদকীয় #বাংলাফিচার