05/24/2026 নজরুলের সাম্যদর্শন ও বাংলাদেশের শিক্ষা: বিদ্রোহ থেকে মানবমুক্তির পাঠ
Dr Mahbub
২৩ May ২০২৬ ২০:৩৭
অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবমুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্রোহের দর্শনের আলোকে বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য, মুখস্থনির্ভরতা, অন্তর্ভুক্তির সংকট এবং মানবিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী সাহিত্যধর্মী ফিচার। শিক্ষা সংস্কার, সৃজনশীলতা, মুক্তচিন্তা, নারীসমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনা।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশা মাখা গ্রামের সরু পথ ধরে এক শিশু খালি পায়ে স্কুলের দিকে হাঁটছে। তার ব্যাগ নেই, নেই দামি বই কিংবা ডিজিটাল ডিভাইস। অন্যদিকে রাজধানীর এক অভিজাত বিদ্যালয়ের সামনে চকচকে গাড়ি থামে; আরেক শিশু ট্যাব হাতে নেমে যায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শ্রেণিকক্ষে। দু’জনই বাংলাদেশের নাগরিক, দু’জনই “শিক্ষার অধিকার”-এর অংশ, অথচ তাদের বাস্তবতা যেন দুই ভিন্ন দেশের গল্প। এই বিভক্ত বাস্তবতার মাঝখানে বারবার ফিরে আসে এক কবির কণ্ঠ—“গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই।”
আজও বিদ্যালয়ের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শিশুরা আবৃত্তি করে—“আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী।” কণ্ঠে কাঁপুনি থাকে, চোখে বিস্ময় থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নজরুল কি কেবল আবৃত্তির কবি হয়ে আছেন? নাকি তাঁর দর্শন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার এক মৌলিক ভিত্তি হতে পারে?
কাজী নজরুল ইসলাম কখনও কেবল সাহিত্যিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক নৈতিক শক্তি। তাঁর বিদ্রোহ ছিল না অন্ধ ধ্বংসের আহ্বান; বরং অন্যায়, বৈষম্য, সংকীর্ণতা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে মুক্ত মানুষের ঘোষণা। তিনি ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে লিখেছেন, নারী-পুরুষের সমতার কথা বলেছেন, শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর শিক্ষা-ভাবনার কেন্দ্রেও ছিল মানুষ—শুধু পরীক্ষার্থী নয়, শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং স্বাধীনচেতা, মানবিক ও সৃজনশীল মানুষ।
বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় এক গভীর সংকট। এখানে শিক্ষা অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং প্রতিযোগিতামুখী। শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার চেয়ে উত্তর মুখস্থ করাই বেশি মূল্যবান। জিপিএ-৫ যেন জীবনের একমাত্র সাফল্য। সন্ধ্যায় কোনো কোচিং সেন্টারের সামনে দাঁড়ালে দেখা যায়, কিশোরদের চোখে ভয়—পিছিয়ে পড়ার ভয়, ব্যর্থ হওয়ার ভয়, “ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে” সুযোগ না পাওয়ার ভয়। অথচ শিক্ষা তো ভয় নয়; শিক্ষা হওয়ার কথা মুক্তির পথ।
নজরুলের শিক্ষা-দর্শন ঠিক এই জায়গাতেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি চাইতেন এমন শিক্ষা, যা মানুষকে চিন্তা করতে শেখাবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাবে, নিজের অস্তিত্বকে আবিষ্কার করতে শেখাবে। তাঁর ‘দারিদ্র্য’ কবিতা কেবল সাহিত্য নয়; এটি বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানবিক চেতনার পাঠ। তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কেবল সুরেলা উচ্চারণ নয়; এটি সমাজের প্রতিটি মানুষকে সমান মর্যাদায় দেখার শিক্ষা।\
কল্পনা করা যায়, এক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করতে বলছেন না; বরং প্রশ্ন করছেন—“তোমার চারপাশের বৈষম্য কমাতে তুমি কী করতে পারো?” তখন নজরুলের কবিতা হয়ে উঠতে পারে সামাজিক সচেতনতার পাঠ্য, মানবিকতার অনুশীলন, ন্যায়বোধের বীজ।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো বৈষম্য। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, মানসিক এবং কাঠামোগতও। শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ের পার্থক্য, বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি মাধ্যমের বিভাজন, মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার দূরত্ব, আদিবাসী শিশুদের ভাষাগত বঞ্চনা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অপ্রতুল সুযোগ—সব মিলিয়ে শিক্ষা যেন সমাজের বিদ্যমান অসমতাকেই পুনরুৎপাদন করছে।
একটি শিশু কোথায় জন্মেছে, তার পরিবার কত আয় করে, সে ছেলে না মেয়ে, সে প্রতিবন্ধী কি না—এসবই অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয় সে কী ধরনের শিক্ষা পাবে। কেউ রোবটিক্স শেখে, কেউ বেঞ্চ ছাড়াই ক্লাস করে। কেউ আন্তর্জাতিক স্বপ্ন দেখে, কেউ বই কেনার টাকাও জোগাড় করতে পারে না।
এই বাস্তবতার বিপরীতে নজরুল দাঁড় করান সাম্যের দর্শন। তিনি লিখেছিলেন—“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” নারীকে তিনি করুণার পাত্র হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন শক্তি, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে। আজ যখন নারীশিক্ষা নিয়ে এখনও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে, তখন নজরুলের চিন্তা শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রশ্নেও নজরুল অত্যন্ত আধুনিক। আজও বাংলাদেশের বহু বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। কোনো অটিস্টিক শিশুকে “ঝামেলা” মনে করা হয়, কোনো পাহাড়ি শিশু মাতৃভাষায় শিক্ষা পায় না, কোনো দরিদ্র শিশু শ্রমবাজারে হারিয়ে যায়। অথচ নজরুলের মানবিক দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষা কখনও কেবল সুবিধাভোগীদের জন্য হতে পারে না।
নজরুল নিজেও দারিদ্র্যের সন্তান ছিলেন। মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, লেটো দলে গান গেয়েছেন, রুটির দোকানে শ্রম দিয়েছেন। তাঁর জীবন তাঁকে শিখিয়েছিল, দারিদ্র্য প্রতিভাকে স্তব্ধ করে দেয়। তাই তিনি শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন, হয়তো প্রশ্ন করতেন—কেন এখনও অর্থের অভাবে হাজারো শিশু স্কুল ছাড়ে? কেন উচ্চশিক্ষা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে? কেন শিক্ষা পণ্য হয়ে উঠছে?
শিক্ষা যদি কেবল সনদ উৎপাদনের যন্ত্র হয়ে যায়, তাহলে সেখানে মানবিকতা হারিয়ে যায়। আজ প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নৈতিকতা ও সহমর্মিতা ছাড়া দক্ষতা বিপজ্জনক হতে পারে। একজন প্রযুক্তিবিদ যদি মানবিকতা না শেখে, একজন প্রশাসক যদি বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়, তাহলে শিক্ষা সমাজকে মুক্ত না করে আরও বিভক্ত করবে।
নজরুল শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিকে মানুষের আত্মিক বিকাশের অংশ হিসেবে দেখতেন। অথচ আজ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগীত, নাটক, সাহিত্যচর্চা কিংবা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে “অপ্রয়োজনীয়” ভাবা হয়। শিক্ষা যেন শুধুই চাকরির প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সৃজনশীলতা ছাড়া শিক্ষা মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করতে পারে।
এ কারণেই নজরুলের শিক্ষাদর্শন কেবল পাঠ্যবইয়ে কয়েকটি কবিতা যুক্ত করার বিষয় নয়। এটি মূলত শিক্ষার দর্শন বদলে দেওয়ার আহ্বান। এমন শিক্ষা, যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়; যেখানে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা শ্রেণি দিয়ে মানুষকে বিচার করা হয় না; যেখানে শিক্ষার্থীকে কেবল নম্বরের খাঁচায় আটকে রাখা হয় না; যেখানে বিদ্যালয় হয়ে ওঠে মুক্তচিন্তা, সহনশীলতা ও মানবিকতার অনুশীলনক্ষেত্র।
আজ যখন সমাজে ঘৃণা, মেরুকরণ ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন নজরুলের অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা-ভাবনা নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি হতে পারে। তিনি মসজিদের আজান আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিকে একই মানবিক সুরে মিলিয়ে দেখেছিলেন। তাঁর শিক্ষা আমাদের শেখায়—ভিন্নতা বিভেদ নয়; ভিন্নতা সৌন্দর্য।
তবে শিক্ষা সংস্কার শুধু কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। নতুন ভবন, স্মার্ট ক্লাসরুম বা ডিজিটাল প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষার আত্মা যদি মানবিক না হয়, তাহলে সেই সংস্কার অপূর্ণ থেকে যাবে। প্রয়োজন এমন এক দর্শন, যা শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
আশার জায়গাও আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও এমন শিক্ষক আছেন, যারা নিজের অর্থে দরিদ্র শিক্ষার্থীর বই কিনে দেন। এমন বিদ্যালয় আছে, যেখানে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। এমন তরুণও আছে, যারা কোচিংনির্ভর শিক্ষার বাইরে গিয়ে সৃজনশীল শিক্ষার আন্দোলন গড়ে তুলছে। এই ছোট ছোট আলোগুলোই হয়তো নজরুলের স্বপ্নকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, “মানুষকে মুক্ত করো।” এই মুক্তি শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি চিন্তার মুক্তি, বৈষম্য থেকে মুক্তি, ভয় থেকে মুক্তি, অন্ধ অনুকরণ থেকে মুক্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থা যদি সত্যিই মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে চায়, তাহলে নজরুলের সাম্যদর্শনকে কেবল সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; তাকে পৌঁছে দিতে হবে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে, প্রতিটি পাঠে, প্রতিটি শিশুর স্বপ্নে।
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষার মাধ্যমে। আর সেই শিক্ষা যদি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে না শেখায়, তবে কোনো উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন নয়। আজ যখন কোনো শিশু স্কুলের পথে হাঁটে, তখন তার পায়ে যেন দারিদ্র্যের শিকল না থাকে; তার কণ্ঠে যেন ভয় নয়, স্বপ্ন থাকে। সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার পথেই নজরুল আজও আমাদের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক শিক্ষক।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#কাজীনজরুলইসলাম #নজরুল #শিক্ষাসংস্কার #মানবিকশিক্ষা #অন্তর্ভুক্তিমূলকশিক্ষা #সাম্য #মুক্তচিন্তা #বাংলাদেশেরশিক্ষা #বৈষম্যমুক্তশিক্ষা #নারীসমতা #সৃজনশীলশিক্ষা #অসাম্প্রদায়িকতা