05/27/2026 গরুর সাইজ বনাম গুষ্টির ইজ্জত: কুরবানি বিলাস নাকি ভক্তি বিলাস?
Dr Mahbub
২৭ May ২০২৬ ০১:০২
অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
ঈদুল আজহার কুরবানি কি আজ আত্মশুদ্ধির ইবাদত, নাকি সামাজিক স্ট্যাটাস প্রদর্শনের উৎসব? “গরুর সাইজ বনাম গুষ্টির ইজ্জত” শীর্ষক এই ব্যঙ্গাত্মক অথচ গভীর সামাজিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কুরবানিকে ঘিরে বাংলাদেশের ভোগবাদ, ফেসবুক সংস্কৃতি, লোকদেখানো ধর্মীয়তা, দুর্নীতি, এবং সামাজিক প্রতিযোগিতার নির্মম বাস্তবতা। বিশাল দামের গরু, সেলফি-বিলাস, আমলাতান্ত্রিক বিত্তের প্রশ্ন, এবং ‘রিয়া’ বা লোকদেখানো ইবাদতের বিপরীতে লেখাটি স্মরণ করিয়ে দেয়—কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা নিহিত রয়েছে নিয়ত, বিনয়, তাকওয়া ও প্রতিবেশীর অধিকারে। হাস্যরস, বিদ্রূপ ও সামাজিক সমালোচনার মিশেলে এটি সমকালীন বাংলাদেশের কুরবানি সংস্কৃতির এক তীক্ষ্ণ নৈতিক প্রতিচ্ছবি।
পাঠক মহোদয়গণের অবগতির জন্য একটি বিনীত নিবেদন (Disclaimer):
রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কুরবানির ঈদ। এবারের এই সংক্ষিপ্ত সময়ের গরু-ছাগলের হাটে আমাদের অধম উপদেষ্টা সম্পাদক মহোদয় স্বশরীরে হাজির হয়েছিলেন। হাটের চড়া দামের উত্তাপ এবং সেখানে উপস্থিত কিছু ক্রেতার ‘দাঁত-কপাল খিলানো’ অহংকারী চালচলন দেখে তিনি নিজেই নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন— আসলে কুরবানির মূল উদ্দেশ্যটা কী? আর আমাদের এই চেনা সমাজে আদতে হচ্ছেটা কী?আসলে ত্যাগের ইবাদত যখন সামাজিক প্রতিযোগিতা, ফেসবুক-শোঅফ ও বিত্তের প্রদর্শনীতে রূপ নেয়—তখন কুরবানির হাট শুধু পশুর বাজার থাকে না, তা যেনো আমাদের নৈতিকতারও আয়নায় পরিণত হয়।এই বিশেষ রম্য ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবেদনটির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বিনোদনের ছলে সমাজের কিছু চরম অসঙ্গতি, লোকদেখানো সংস্কৃতি এবং নীতিবিচ্যুতিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া; কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করা, হেয় প্রতিপন্ন করা কিংবা কারও মনে কষ্ট দেওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।সবাইকে পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা— ঈদ মোবারক! আসুন, পশুর সাথে সাথে আমাদের ভেতরের অহংকারকেও কুরবানি দিই। —তাহলে এবার খোলা মন নিয়ে পড়ুন এই বিশেষ ধরনের ফিচার আর হাসুন এবং আল্লাহর কথা চিন্তা করুন।
কুরবানির হাটে এখন আর ‘সুস্থ-সবল’ পশু খোঁজা হয় না, খোঁজা হয় ‘দানব’। যে গরুর নাম ‘কালা তুফান’, ‘রাজাবাবু’ কিংবা ‘পদ্মার সুইটি’, সেটির পেছনেই ধাবিত হচ্ছে আমাদের আমজনতা থেকে ভিআইপি ক্রেতারা। হাটে গিয়ে একজন ক্রেতার সংলাপ শুনলে আপনার ঈমানদণ্ড নড়ে উঠতে পারে: "ভাই, চার লাখ টাকার নিচে কোনো গরু নিয়েন না। পাশের বাসার মতিন সাহেব সাড়ে তিন লাখের লাল বলদ কিনে অলরেডি ফেসবুকে তিনবার লাইভ করে ফেলছে। আমারে অন্তত চার লাখ বিশ হাজারি ‘টাইটানিক’ কিনতে হবে, নইলে সমাজে মুখ দেখাব কেমনে?"
এখানেই লুকিয়ে আছে আসল ‘কুরবানি বিলাস’। আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিমাপ যেখানে নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে আমাদের পরিমাপক হয়ে দাঁড়িয়েছে পশুর লাইভ ওয়েট (Live Weight) আর দামের ফর্দ।
গরু কেনার পর আসল খেলা শুরু হয় পাড়ায়। সেখানে চলে এক অদ্ভুত ‘দাঁত পরীক্ষা’র উৎসব। মহল্লার উঠতি যুবকেরা গরুর মুখ টেনে ধরে দাঁত গুনতে ব্যস্ত, যেন তারা সবাই ডেন্টাল কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র! দুই দাঁত, চার দাঁত— এই নিয়ে চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এর পরের ধাপ হলো ‘সেলফি থেরাপি’।
গরুর খড়ের চেয়ে সেখানে লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের সংখ্যা বেশি উড়ে। মনের অজান্তেই পশু কুরবানির চেয়ে নিজের ‘অহংকার’ জবেহ করার বিষয়টি হাওয়া হয়ে যায়।
একটি প্রচলিত রসিকতা এখন প্রায়ই সত্য হয়ে ধরা দেয়। এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "ভাই, আপনার কুরবানির উদ্দেশ্য কী?" তিনি বুক ফুলিয়ে উত্তর দিলেন, "কেন? সমাজে একটা রেপুটেশন আছে না! পাঁচ লাখ টাকার গরু না কাটলে পাড়ার লোক ভাববে আমার ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে।"
অথচ ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছে, পশুর রক্ত বা মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল বান্দার ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি। কিন্তু আমাদের আধুনিক তাকওয়া যেন আটকে গেছে গরুর চর্বির স্তরে আর ফ্রিজের ধারণক্ষমতায়! ঈদের দিন সকাল হতেই কার ফ্রিজ কত দ্রুত মাংস দিয়ে ঠাসা হলো, সেই প্রতিযোগিতাও কিন্তু কম হাস্যকর নয়।
তাহলে কি বড় গরু কেনা অপরাধ? একদমই না। সামর্থ্য থাকলে অবশ্যই ভালো এবং সুস্থ পশু কুরবানি দেওয়া উচিত। কিন্তু গলদটা রয়ে গেছে আমাদের ‘নিয়তে’ আর ‘অহংকারে’। যখন কুরবানির পশুটি আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম না হয়ে, পাশের বাড়ির ভাবিকে হিংসা করানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখনই বুঝতে হবে— আমরা ত্যাগের উৎসবকে ‘বিলাসিতা’র মেলায় রূপান্তর করেছি।
ঈদের দিন সকালে যখন চকচকে নতুন পাঞ্জাবি পরে আমরা কুরবানির ছুরিটা হাতে নেব, তখন একটু থমকে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার— আমরা কি সত্যিই পশুর গলায় ছুরি চালাচ্ছি, নাকি নিজের ভেতরের অহংকার আর লোকদেখানো মানসিকতার ওপর? উত্তরটা যার যার নিজের কাছে। তবে এবারের হাটে যাওয়ার আগে পকেটের জোরের চেয়ে মনের নিয়তটা একটু বেশি পরিষ্কার করে নিলে কেমন হয়? অন্তত গরুটা যেন মানুষের খোটা দেওয়ার ভয়ে নয়, আল্লাহর ভয়ে কেনা হয়!
সম্প্রতি এক বড় সরকারি মন্ত্রকের অতি বড় এক কর্তাব্যক্তির হলফনামা বা ট্যাক্স ফাইলের খতিয়ান ফাঁস হয়েছে। সেখানে দেখা গেল, ওনার বৈধ বার্ষিক আয় মোটে ৪৭ লাখ টাকা। কিন্তু কুরবানির হাটে গিয়ে তিনি যে ‘রাজাবাবু’ মার্কার ষাঁড়টি পছন্দ করলেন, সেটির দাম হাঁকা হলো ৩৭ লাখ টাকা!
নগদ টাকা বুঝিয়ে দিয়ে যখন তিনি গরুর দড়ি ধরে টান দিলেন, তখন উপস্থিত পাবলিকের মনে গণিতের এক জটিল সমীকরণ ঘুরপাক খেতে লাগল।
সারা বছরের ‘ডায়েট চার্ট’—বাকি ১০ লাখে সংসার চলবে কেমনে?: ৪৭ লাখ টাকা বার্ষিক আয় থেকে ৩৭ লাখ টাকার গরু কিনলে পকেটে অবশিষ্ট থাকে মাত্র ১০ লাখ টাকা। এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগের পর ওই ভিআইপি কর্তার আগামী ১২ মাসের সম্ভাব্য জীবনযুদ্ধ কেমন হতে পারে, তা নিয়ে পাড়ার চায়ের দোকানে বসেছে এক জরুরি সালিশি বৈঠক।
আসুন দেখে নিই, বাকি ১০ লাখে সারা বছর টিকে থাকতে ওনার ‘কুরবানি-পরবর্তী ডায়েট চার্ট’ কেমন হতে পারে:
হলফনামার ‘মিরাকল’ ও পাবলিকের চোখ কপালে: তবে আমজনতা যতই ওনার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হোক না কেন, ভেতরের খবর কিন্তু অন্য। বুদ্ধিমান বাঙালি ভালো করেই জানে, এই ৩৭ লাখ টাকার পেছনে বার্ষিক আয়ের ওই ১০ লাখ টাকা খরচ হবে না। কারণ, হলফনামার ৪৭ লাখ হলো কেবল ‘কাগজি বাঘ’। টেবিলের নিচ দিয়ে যে ‘অদৃশ্য নদীর ধারা’ বয়ে যায়, তার হিসাব কোনো হলফনামায় থাকে না। তাই বছর শেষে দেখা যাবে— কর্তাবাবুর স্বাস্থ্যের কোনো কমতি হয়নি, গাড়িও চলছে, এসিও চলছে। শুধু মাঝখান থেকে কুরবানির পবিত্র হাটে গিয়ে সততার হলফনামাটি ওই ৩৭ লাখি গরুর পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে গেছে। সমাজের চোখে নিজেকে ‘বড়’ প্রমাণ করার এই যে অন্ধ মোহ, তা যে কত বড় নৈতিক দেউলিয়াত্ব— এই সরকারি কর্তার ‘গরু বিলাস’ তারই এক জীবন্ত প্রমাণ!
ইতিহাসে রোম পুড়লে নাকি সম্রাট নিরো বাঁশি বাজাতেন, আর আধুনিক যুগে আমলানিকেতনের পকেটের জোর বাড়লে ওনাদের সুপুত্ররা ১৫ লাখ টাকার ছাগলের সাথে সেলফি তোলেন! ৪৭ লাখের মন্ত্রক আর ৩৭ লাখের ‘রাজাবাবু’র রেশ কাটতে না কাটতেই এবার হাটে ঝড় তুলল এক রাজকীয় ছাগল। গত ঈদে উচ্চপদস্থ এক আমলার আদরের ধন, রাজপুত্র সমতুল্য ছেলেটি হাটে গিয়ে এক ছাগলের প্রেমে মজে গেলেন, যার দাম নাকি মাত্র ১৫ লাখ টাকা! ছাগলের রাজকীয় শিং আর চকচকে চামড়া দেখে যুবকের দিল চাঙ্গা হয়ে উঠল। ব্যাস, আর যায় কোথায়? পকেট থেকে আইফোন বের করে ছাগলের গলায় হাত দিয়ে একখানা দাঁত-কেলানো সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দিলেন। ক্যাপশন ছিল: "এবারের কুরবানির বেস্ট পারচেজ, মিট মাই নিউ ফ্রেন্ড!" ---
নেটিজেনদের ‘ডিটেকটিভ’ মোড ও দুদকের ঘুম ভাঙা: যুবক হয়তো ভেবেছিলেন লাইক-কমেন্টের বন্যায় ভেসে যাবেন। কিন্তু বাঙালি নেটিজেনরা যে ইদানীং সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের চেয়েও দ্রুত তদন্ত করতে পারে, তা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে পোস্টের নিচে কমেন্টের ঝড় ধেয়ে এলো: "ভাই, আপনার আব্বাজানের অফিশিয়াল বেতন স্কেল তো গ্রেড-১ হলেও মাসে বড়জোর ৭৮,০০০ টাকা। তো এই ১৫ লাখ টাকার ছাগল কি ওনার তিন বছরের জমানো প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দিয়ে কেনা, নাকি টেবিলের তলার ‘স্পিড মানি’র অবদান?"
ফেসবুক, টিকটক আর এক্স (টুইটার)-এ ট্রোলের বন্যা বয়ে গেল। মিমের পর মিমে ছেয়ে গেল নিউজফিড। গণমাধ্যমের কল্যাণে সেই ‘ছাগল-সেলফি’ যখন ভাইরাল, তখন টনক নড়ল দুর্নীতি দমন ব্যুরোর (দুদক)। এতকাল যে ফাইলগুলো লাল ফিতার নিচে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, মিডিয়ার তোপের মুখে সেগুলো রাতারাতি টেবিলের ওপরে চলে এলো।
ঈদের স্পেশাল মেন্যু - শ্রীঘরের ডাল-ভাত: দুদকের বিশেষ টিম যখন ঈদের ঠিক আগের রাতে ওই আমলার আলিশান প্রাসাদে হানা দিল, তখন ড্রয়িংরুমে কেবলই ছাগলের খড় আর দানাদার খাবারের সুবাস ভাসছিল। কিন্তু হায়! সেই ছাগলের মাংস মুখে তোলার সৌভাগ্য আর আমলা পরিবারের হলো না। আয়ের সাথে সম্পত্তির আকাশ-পাতাল অমিল দেখে ঈদের চাঁদ ওঠার আগেই আমলা এবং ওনার সেলফি-বিলাসী সুপুত্রকে সোজা চালান করে দেওয়া হলো ‘শ্রীঘরে’ তথা জেলখানায়। এবার ওনাদের ঈদ কাটবে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন আমেজে:
প্রতিফল: অহংকার আর দুর্নীতির টাকা যখন ছাগলের রূপ ধরে ঘাস খেতে শুরু করে, তখন পতন অনিবার্য। আমলার ছেলে ভেবেছিলেন ছাগলের সাথে সেলফি তুলে সমাজে নিজের ‘স্ট্যাটাস’ বাড়াবেন, কিন্তু নিয়তির পরিহাসে সেই ছাগলই ওনাদের টেনে নামাল জেলখানার কয়েদির স্তরে। এবারের কুরবানি অন্তত এই আমলা পরিবারকে চিরকাল মনে করিয়ে দেবে— পশুর দাম দিয়ে নয়, সততার দাম দিয়েই আল্লাহর সন্তুষ্টি আর সমাজের সম্মান কেনা যায়!
শেষ কথা: গল্পের আসল মরাল (Moral of the Story)
হাঁস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের খোলসটা যদি একটু সরিয়ে রাখি, তবে এই ‘কুরবানি বিলাস’-এর ভেতরে একটা বড়সড় নৈতিক শিক্ষা লুকিয়ে আছে। গল্পটার আসল মরাল কিন্তু গরুর সাইজে নয়, লুকিয়ে আছে আমাদের মনের সাইজে।
মূল কথা হলো: বাজার থেকে সবচেয়ে দামি ‘কালা তুফান’ বা ‘রাজাবাবু’ কিনে এনে আপনি হয়তো সমাজের বাহবা পেতে পারেন, কিন্তু স্রষ্টার দরবারে তার মূল্য শূন্য— যদি না নিয়ত খাঁটি হয়। তাই পশুর গলায় ছুরি চালানোর আগে আমাদের ভেতরের ‘লোকদেখানো’ স্বভাব আর ‘অহংকার’ নামক পশুটিকে কুরবানি দেওয়াটাই এবারের ঈদের আসল শিক্ষা হওয়া উচিত।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#কুরবানি_বিলাস #ত্যাগ_নাকি_প্রদর্শনী #ঈদুলআজহা #লোকদেখানো_ধর্মীয়তা #সামাজিক_ব্যঙ্গ #গরুর_সাইজ_ও_সমাজ #তাকওয়া_ও_ত্যাগ #বাংলাদেশের_সমাজবাস্তবতা #ফেসবুক_সংস্কৃতি #নৈতিকতার_আয়না #ঈদের_সামাজিক_বিশ্লেষণ #অহংকার_বনাম_বিনয়