06/02/2026 ইতিহাসের সাক্ষী তোফায়েল আহমেদ আর নেই, অবসান এক গৌরবময় অধ্যায়ের
Special Correspondent
১ June ২০২৬ ১৭:৪৫
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা, সাবেক মন্ত্রী, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং তোফায়েল আহমেদের পরিবার গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। মৃত্যুকালে তিনি এক মেয়ে, জামাতা ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। উল্লেখ্য, গত বছরের ২০ নভেম্বর তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম মারা যান। তোফায়েল আহমেদের একমাত্র সন্তান ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী এবং জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন পেশায় চিকিৎসক।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন ছিল এ দেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবার নাম মৌলভী আজহার আলী এবং মায়ের নাম ফাতেমা বেগম। ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন ছাত্রলীগের মাধ্যমে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়।
ডাকসুর ভিপি ও গণ-অভ্যুত্থান: ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ছিলেন। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলনে তিনি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে দেশজুড়ে পরিচিতি পান। বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান: ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের অন্যতম একজন ছিলেন।
সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রীত্ব
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ভোলা জেলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৩-২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা সর্বশেষ দলটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে বহুবার কারাবরণ করা এই নেতা ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর টানা ৩৩ মাস কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার এই প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। বর্ষীয়ান এই নেতার মৃত্যুতে বিভিন্ন political ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হচ্ছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র