06/12/2026 ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর
odhikarpatra
১১ June ২০২৬ ২৩:৫১
অধিকার পত্র ডটকম
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক
অধিকার পত্র ডটকম
ঢাকা, ১১ জুন : মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তার এবং অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনমুখী ও বিকেন্দ্রীভূত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এ বাজেট উপস্থাপন করেন। ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রণীত বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
গত অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারেরও প্রথম জাতীয় বাজেট হওয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রায় ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও দেশের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়েই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্যতাকে ভিত্তি করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেটে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগের ফলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন, লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের আশা, এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। করজাল সম্প্রসারণ, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
করদাতাদের সুবিধার্থে আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন জমা দিলে কর ছাড়ের ব্যবস্থাও থাকবে।
উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে মোট ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়ের অনুপাত কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
বাজেট বক্তব্যের শেষাংশে অর্থমন্ত্রী কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ, পেশাজীবী ও প্রবাসীদের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, জনগণের সৃজনশীলতা, উদ্যোগ ও কর্মশক্তিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বনির্ভর, মর্যাদাবান ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এ বাজেটকে আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হিসেবে দেখা হচ্ছে।