07/01/2026 গবেষণায় মিলল আশার আলো: অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ বেড়েছে, তবে আরও লক্ষ্যভিত্তিক নীতির আহ্বান
Odhikarpatra News Desk
৩০ June ২০২৬ ১৩:৫৭
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পরিচালিত সমন্বিত অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কর্মসূচি ‘শিখবো সবাই’ বিদ্যালয়ে ভর্তি, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং শিক্ষাজীবনে টিকে থাকার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। তবে প্রতিবন্ধিতার ধরনভেদে পৃথক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আরও সূক্ষ্ম গবেষণা ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন আলোচকরা।
আজ রাজধানীতে BRAC সেন্টারে অনুষ্ঠিত “Beyond Just Cash Transfers: New Evidence on Inclusive Education and Livelihood Interventions” শীর্ষক আন্তর্জাতিক গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশন (Inclusive Education)-এ এই গবেষণা উপস্থাপন এবং প্রাণবন্ত একাডেমিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ড. শাইলা আহমেদ। শুরুতে Sightsavers-এর শিক্ষা প্রকল্প ব্যবস্থাপক আওয়ানা মারজিয়া ‘শিখবো সবাই’ কর্মসূচির সার্বিক কাঠামো ও বাস্তবায়ন কৌশল তুলে ধরেন।
এরপর ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BIGD)-এর অধ্যাপক ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো অধ্যাপক ড. নারায়ণ সি. দাস “Effectiveness of a Holistic Educational Intervention for Children with Disabilities: Evidence from Bangladesh” শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, ১২২টি স্কুল ক্যাচমেন্ট এলাকা, প্রায় দুই হাজার শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালিত Cluster Randomized Controlled Trial (RCT)-এর মাধ্যমে তিন বছর ধরে এই কর্মসূচির প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, কর্মসূচিটি প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে এবং তিন বছর পরও সেই ইতিবাচক প্রভাব বজায় রয়েছে। বিশেষ করে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে ভর্তি, বাড়িতে পড়াশোনার সময় বৃদ্ধি এবং চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। একই সঙ্গে সহায়ক উপকরণ, ফিজিওথেরাপি ও বাড়িভিত্তিক সহায়তার সুযোগও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণা উপস্থাপনার নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ডিজঅ্যাবিলিটি প্রফেশনালস (BNADP)-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তিনি গবেষণাটিকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রে একটি “উল্লেখযোগ্য মাইলফলক” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, দেশে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিয়ে প্রমাণভিত্তিক গবেষণার সংখ্যা এখনও খুবই সীমিত। সেই প্রেক্ষাপটে এই গবেষণা কেবল নীতিনির্ধারণেই নয়, ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্যও একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, গবেষণার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর কঠোর বৈজ্ঞানিক গবেষণা নকশা। বাংলাদেশের শিক্ষা গবেষণায় যেখানে অধিকাংশ গবেষণা পর্যবেক্ষণমূলক বা ক্রস-সেকশনাল, সেখানে এই গবেষণায় Cluster Randomized Controlled Trial, দীর্ঘ তিন বছরের অনুসরণ (Longitudinal Follow-up) এবং বৃহৎ নমুনা ব্যবহার করা হয়েছে, যা ফলাফলের কার্যকারণ সম্পর্ককে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য করেছে।
ড. মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, এই কর্মসূচির বিশেষত্ব হলো এটি কেবল শিশুকে কেন্দ্র করে নয়; বরং পরিবার, শিক্ষক, বিদ্যালয়, সম্প্রদায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন (OPDs), সহায়ক প্রযুক্তি, ফিজিওথেরাপি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা (IEP)—সবকিছুকে একত্রে নিয়ে একটি সমন্বিত বা Holistic Intervention বাস্তবায়ন করেছে। তাঁর ভাষায়, এই বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবে Bronfenbrenner-এর Ecological Systems Theory-এর প্রতিফলন, যদিও গবেষণাপত্রে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
তবে প্রশংসার পাশাপাশি তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক প্রশ্নও উত্থাপন করেন। তাঁর মতে, গবেষণায় ‘Holistic Intervention’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও এর সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক কাঠামো (Conceptual Framework) উপস্থাপন করা হয়নি। বাড়ি, বিদ্যালয় এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক হস্তক্ষেপ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল সৃষ্টি করেছে—তা একটি Theory of Change বা Logic Model-এর মাধ্যমে দেখানো হলে গবেষণাটি আরও শক্তিশালী হতো।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে তিনি বলেন, গবেষণায় UNICEF Child Functioning Module ব্যবহার করে প্রতিবন্ধী শিশুদের শনাক্ত করা হলেও কোন প্রতিবন্ধিতা তত্ত্ব (Disability Model)—মেডিকেল, সামাজিক, বায়োসাইকোসোশ্যাল নাকি মানবাধিকারভিত্তিক মডেল—এই কর্মসূচির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। তাঁর মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের জন্য এই তাত্ত্বিক অবস্থান পরিষ্কার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ড. মাহবুবুর রহমান আরও উল্লেখ করেন, গবেষণাটি সকল প্রতিবন্ধী শিশুকে একটি একক গোষ্ঠী হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে। অথচ অটিজম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি কিংবা বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা—প্রতিটি গোষ্ঠীর শিক্ষাগত চাহিদা ভিন্ন। তাই কোন ধরনের প্রতিবন্ধী শিশু সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে এবং কোন গোষ্ঠীর জন্য কী ধরনের সহায়তা সবচেয়ে কার্যকর—এ ধরনের উপগোষ্ঠীভিত্তিক বিশ্লেষণ ভবিষ্যৎ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, “One-size-fits-all” নীতি দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা সফল করা সম্ভব নয়। প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সহায়ক প্রযুক্তি, পাঠ্যক্রম অভিযোজন এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষণ কৌশল আলাদাভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।
আলোচনার শেষাংশে তিনি মন্তব্য করেন, গবেষণাটি ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে সমন্বিত অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম। তবে ভবিষ্যতে প্রতিবন্ধিতা তত্ত্বকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, প্রতিবন্ধিতার ধরনভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ এবং আরও সূক্ষ্ম নীতিগত সুপারিশ যুক্ত করা গেলে এই গবেষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও নীতিগত প্রভাব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
পরে উপস্থিত গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা গবেষণার ফলাফলকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণভিত্তিক দলিল হিসেবে অভিহিত করেন এবং শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও স্বাস্থ্য খাতের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।