07/09/2026 ভাঙা আয়নার দেশে বড় হওয়া: কুয়ো থেকে মহাসমুদ্র—বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অদেখা মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা│বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের...মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (Part-02)
Dr Mahbub
৮ July ২০২৬ ০৬:৫৪
অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক│শিক্ষা জীবন—২য় অংশ
প্রাক-প্রাথমিকের সোনার খাঁচা থেকে কলেজের বিভ্রান্ত স্বাধীনতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাহীন আকাশ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীর নীরব ঝরে পড়া—এই দীর্ঘ ফিচার নিবন্ধটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত বিবর্তনের এক ব্যতিক্রমধর্মী বিশ্লেষণ। কুয়ো, বিল, মহাসমুদ্র এবং ভাঙা আয়নার শক্তিশালী রূপকের মাধ্যমে এখানে উঠে এসেছে পরিচয় সংকট, পারিবারিক শাসন, স্বাধীনতার দায়, কোচিং সংস্কৃতি, পরীক্ষা-ব্যাধি, ডিজিটাল একাকীত্ব, ড্রপআউট সংকট এবং শিক্ষাদর্শনের গভীর অসুখ। গবেষণা, মনোবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, সাহিত্যিক বর্ণনা ও রম্য-ব্যঙ্গের সমন্বয়ে এটি শুধু একটি ফিচার নয়; বরং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অভিভাবকত্ব এবং তরুণ প্রজন্মকে নতুনভাবে দেখার একটি আমন্ত্রণ।
একটি মানুষের জীবনকে যদি একখানা মানচিত্র ধরা যায়, তবে শিক্ষাজীবন সেই মানচিত্রের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে আঁকাবাঁকা এবং সবচেয়ে রহস্যময় পথ। দূর থেকে তাকালে পথটি খুব সোজা মনে হয়—প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয়; যেন কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ, কয়েকটি পরীক্ষার খাতা আর কয়েকটি সনদের মধ্য দিয়েই মানুষের জীবন শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু একটু কাছে গিয়ে তাকালেই বোঝা যায়, এই পথ আসলে কোনো সরল রাস্তা নয়; এটি একেকটি বাঁক, একেকটি ঝড়, একেকটি ভাঙন, একেকটি পুনর্জন্মের গল্প।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় একজন শিক্ষার্থীর বেড়ে ওঠা কেবল পাঠ্যবই শেষ করার কাহিনি নয়, বরং এক মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে আবিষ্কার করার দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক অভিযাত্রা। এখানে প্রতিটি শ্রেণি পরিবর্তনের সঙ্গে শুধু বইয়ের মলাট বদলায় না; বদলে যায় তার পৃথিবী দেখার চোখ, সম্পর্কের ভাষা, স্বপ্নের রঙ, ভয়ের আকার, স্বাধীনতার সংজ্ঞা এবং নিজের পরিচয় সম্পর্কে ধারণাও। শিশুর ছোট্ট হাত ধরে যে যাত্রা শুরু হয় মায়ের আঙুল আঁকড়ে, সেটি একসময় এসে দাঁড়ায় এমন এক মোড়ে, যেখানে সেই হাত ছেড়ে দিয়েই তাকে নিজের আকাশ খুঁজে নিতে হয়।
এই দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এর কোনো পরিবর্তন একদিনে ঘটে না। মানুষ হঠাৎ বড় হয়ে যায় না; যেমন নদী হঠাৎ সমুদ্র হয় না। একটু একটু করে বদলে যায় তার ভেতরের স্রোত, চিন্তার ঢেউ, সম্পর্কের মানচিত্র, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস এবং দায়িত্ব বহনের সক্ষমতা। কোথাও পরিবার তাকে শক্ত করে ধরে রাখে, কোথাও বন্ধুরা তার নতুন পৃথিবী হয়ে ওঠে, কোথাও আবার জীবনের নির্মম বাস্তবতা তাকে শেখায়—স্বাধীনতা মানে শুধু ডানা মেলা নয়, ঝড়ের ভেতরেও ভারসাম্য ধরে রাখা।

এই রূপান্তরকে একটিমাত্র ছবিতে ধরা যায় না। এটি অনেকটা ভেঙে যাওয়া একটি আয়নার মতো। কোনো খণ্ডে দেখা যায় শিশুর নিষ্পাপ মুখ, কোনো খণ্ডে কৈশোরের অস্থিরতা, কোনো খণ্ডে স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস, আবার কোনো খণ্ডে ব্যর্থতার নীরব কান্না। আলাদা আলাদা টুকরোয় ছবিটি অসম্পূর্ণ মনে হলেও, সবগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে দিলে ফুটে ওঠে একজন চেনা বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীর পূর্ণ প্রতিকৃতি—যার ভেতরে আছে স্বপ্ন, সংগ্রাম, বিভ্রান্তি, সাহস, ব্যর্থতা, পুনর্জাগরণ এবং মানুষ হয়ে ওঠার নিরন্তর সাধনা।
মজার বিষয় হলো, আমরা সাধারণত এই গল্পের শেষ পাতাটিই বেশি পড়ি। কেউ জিপিএ-৫ পেল কি না, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, চাকরি পেল কি না—এসব নিয়ে আমাদের উৎসাহের শেষ নেই। অথচ সেই ফলাফলের পেছনে কত শত অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন, কত অপ্রকাশিত ভয়, কত অদেখা দ্বন্দ্ব, কত অশ্রু আর কত নিঃশব্দ বিজয়ের ইতিহাস জমে আছে, সেদিকে খুব কমই চোখ ফেরাই। আমরা ফলাফল দেখি, কিন্তু মানুষটিকে দেখি না; সনদ গুনি, কিন্তু তার ভেতরের দীর্ঘ যাত্রাপথটি পড়ি না।
এই নিবন্ধ সেই অদেখা যাত্রাপথেরই গল্প। এটি কোনো শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণের গল্প নয়; বরং একজন মানুষ কীভাবে কুয়োর নিরাপদ জল থেকে বিলের বিভ্রান্ত ঢেউ পেরিয়ে মহাসমুদ্রের অনিশ্চিত স্বাধীনতায় পৌঁছায়, সেই মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক অভিযাত্রার গল্প। আসুন, ভাঙা আয়নার প্রতিটি কাচখণ্ড একে একে হাতে তুলে দেখি। হয়তো শেষ পর্যন্ত সেখানে আমরা কেবল একজন শিক্ষার্থীর মুখই দেখব না; দেখতে পাব আমাদের পরিবার, আমাদের সমাজ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই প্রতিচ্ছবি।
একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জীবনকে যদি দূর থেকে দেখা যায়, তবে মনে হবে সে যেন জন্মের পর থেকেই এক অদৃশ্য রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনটি কোথায় থামবে, কখন ছাড়বে, কোন বাঁকে কতটা ধীরে চলবে—সবই আগে থেকে নির্ধারিত। জীবনের প্রথম অধ্যায়ে তার নিজের মতামতের মূল্য অনেকটা সংসারের সবচেয়ে ছোট শিশুর মতো; সবাই তাকে খুব ভালোবাসে, কিন্তু কেউ তার পরামর্শ চায় না। কখন ঘুম থেকে উঠবে, কী খাবে, কোন পোশাক পরবে, কখন খেলবে, কখন পড়বে, এমনকি কখন হাঁচি দিলেও ‘ওষুধ খাও’—সবকিছুর জন্য চারদিক থেকে নির্দেশনা বর্ষিত হতে থাকে। শিশুটি তখন পরিবার নামের সোনার খাঁচার ভেতরে বেড়ে ওঠে। খাঁচাটি সোনার বলেই সেখানে ভালোবাসার অভাব থাকে না; কিন্তু সোনার হলেও সেটি যে শেষ পর্যন্ত খাঁচাই, সে উপলব্ধি তার হয় অনেক পরে।
আমাদের সমাজে অভিভাবকেরা সন্তানকে এত যত্নে বড় করেন যে, কখনো কখনো মনে হয় তাঁরা মানুষ নয়, একটি বিরল প্রজাতির কাঁচের ফুলদানি বহন করছেন। ধুলো লাগতে দেওয়া যাবে না, রোদে বেশি দাঁড়ানো যাবে না, ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া তো দূরের কথা—নিজের মতো করে ভুল করার অধিকারও যেন তার নেই। ফলে শিশুটি নিরাপত্তা পায়, স্নেহ পায়, শৃঙ্খলা পায়; কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসটি অনেক সময় ধার করেই বড় হয়। সে শেখে কীভাবে নির্দেশ মেনে চলতে হয়, কিন্তু খুব কমই শেখে নির্দেশ ছাড়াও কীভাবে সঠিক পথ বেছে নিতে হয়।
মাধ্যমিক পর্যন্ত এই নিয়ন্ত্রণের বলয় প্রায় অটুট থাকে। কিন্তু এসএসসির শেষ ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে যেন জীবনের মঞ্চে নতুন দৃশ্য শুরু হয়। কলেজের ফটক পেরিয়ে কিশোরটি প্রথমবারের মতো আবিষ্কার করে, পৃথিবীতে এমনও দিন আছে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে না, “আজ সব ক্লাস করেছ তো?” ইউনিফর্মের বাধ্যবাধকতা হালকা হয়ে আসে, প্রতিদিনের হাজিরার কঠোরতা শিথিল হয়, আর সময় হঠাৎ করে নিজের বলে মনে হতে শুরু করে। এতদিন যে আকাশটি জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যেত, সেটি হঠাৎ মাথার ওপর পুরোটা খুলে যায়।
এই পরিবর্তনটি যতটা বাহ্যিক, তার চেয়েও অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক। কারণ কৈশোরের এই সন্ধিক্ষণে কিশোরটি প্রথমবারের মতো নিজের ভেতরে আরেকজন মানুষকে আবিষ্কার করে। একদিকে পরিবার এখনো তাকে আগের মতোই আগলে রাখতে চায়, অন্যদিকে তার নিজের মন স্বাধীনতার দিকে টানতে থাকে। এই টানাপোড়েন অনেকটা ঘুড়ির মতো। একদিকে মায়ের হাতে লাটাই, অন্যদিকে আকাশের ডাকে উড়ে যাওয়ার আকুলতা। সুতো যদি খুব শক্ত করে ধরা হয়, ঘুড়ি উড়তে পারে না; আবার একেবারে ছেড়ে দিলে বাতাসের খেয়ালে কোথায় যে হারিয়ে যাবে, তারও ঠিক নেই। উচ্চমাধ্যমিকের এই দুই বছর আসলে সেই সুতো সামলানোর শিল্প শেখার সময়।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয় আসে—আর সেই সঙ্গে জীবনের মহাসমুদ্র। বিশেষ করে যারা ঘর ছেড়ে অন্য শহরের হল, মেস কিংবা ভাড়া বাসায় ওঠে, তাদের কাছে এই পরিবর্তনটি যেন একেবারে ঋতু বদলের মতো। এতদিন যে প্রতিটি সিদ্ধান্তে পরিবারের ছায়া ছিল, এখন সেই ছায়া অনেক দূরে। কখন ঘুমাবে, কী খাবে, কার সঙ্গে চলবে, কত টাকা খরচ করবে, রাত কখন ফিরবে, এমনকি নিজের ভবিষ্যৎ কোন দিকে নিয়ে যাবে—সব প্রশ্নের উত্তর এবার নিজেকেই লিখতে হবে। জীবনে এই প্রথম সে সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ পায়।
তবে স্বাধীনতা বড় বিচিত্র জিনিস। দূর থেকে তাকে নীল আকাশের মতো সীমাহীন মনে হয়, কিন্তু খুব কাছে গেলে বোঝা যায়, তার সঙ্গে দায়িত্বও সমান বড় হয়ে আসে। আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখা না থাকলে এই স্বাধীনতা অনেক সময় আশীর্বাদের চেয়ে বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমুদ্র যেমন দক্ষ নাবিককে নতুন মহাদেশে পৌঁছে দেয়, তেমনি অনভিজ্ঞ মাঝিকে দিকহীনও করে ফেলতে পারে।
আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই। সন্তান যখন ছোট থাকে, তখন আমরা তাকে এত বেশি নিয়ন্ত্রণ করি যে নিজের ওপর ভরসা করার অনুশীলনই সে করতে পারে না। আবার যখন সত্যিই তার পাশে একজন পরামর্শদাতা, একজন সহযাত্রী কিংবা একজন নীরব শ্রোতা দরকার হয়, তখন ধরে নিই—সে তো এখন বড় হয়ে গেছে। অথচ মানুষ বড় হয় বয়সে নয়, ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাসে। তাই অভিভাবকত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য শাসনে নয়, সময়মতো শাসন থেকে আস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার মধ্যেই। যে পরিবার এই রূপান্তরের শিল্পটি আয়ত্ত করতে পারে, সেই পরিবারের সন্তানই কুয়ো থেকে বিলে, আর বিল থেকে মহাসমুদ্রে গিয়েও নিজের দিক হারায় না।
একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জীবনে যদি এমন একটি মুহূর্ত খুঁজতে বলা হয়, যেখানে সে সবচেয়ে বেশি বদলে যায়, তাহলে উত্তরটি সম্ভবত এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনেই গিয়ে ঠেকবে। ফলাফল প্রকাশের পর আত্মীয়স্বজনের অভিনন্দন, মিষ্টির বাক্স, ফেসবুকে রঙিন শুভেচ্ছাবার্তা আর পাড়ার চাচাদের চিরচেনা প্রশ্ন—“কোন কলেজে ভর্তি হচ্ছ?”—এসবের আড়ালে নীরবে ঘটে যায় এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকম্প। বাইরে থেকে সবাই শুধু দেখে একটি স্কুলপড়ুয়া ছেলে বা মেয়ে কলেজে উঠেছে; অথচ ভেতরে ভেতরে তার সমগ্র মানসিক ভূগোল নতুন করে আঁকা শুরু হয়েছে।
মানব বিকাশবিদ্যা বলে, ষোলো থেকে আঠারো বছরের এই ক্ষুদ্র সময়খণ্ডটি মানুষের জীবনের সবচেয়ে ঝড়ো ঋতু। এই বয়সেই শরীরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যায় মন, প্রশ্ন করতে শেখে বিবেক, নিজের পরিচয়কে নতুন করে আবিষ্কার করতে চায় আত্মা। গতকাল পর্যন্ত পৃথিবীর সব সত্য মা-বাবা আর শিক্ষকের মুখে লেখা ছিল; আজ হঠাৎ মনে হয়, “যদি তাদের কথাই শেষ কথা না হয়?” এই একটি প্রশ্নই কৈশোরের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। মনোবিজ্ঞানীরা একে পরিচয় নির্মাণের যুগ বলেন; আমাদের সমাজে অবশ্য এর আরেকটি সহজ নাম আছে—“ছেলেটা কেমন যেন বেয়াড়া হয়ে গেছে!”
আসলে বেয়াড়া হয় না ছেলেটি, বদলে যায় তার আকাশ। এতদিন সে ছিল একটি সযত্নে বানানো খাঁচার ভেতর। সেই খাঁচায় বাতাসও ছিল, আলোও ছিল, নিরাপত্তাও ছিল। ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসে ঢুকতে হতো, ইউনিফর্মের বোতাম খুলে গেলে শিক্ষক চোখ রাঙাতেন, হাজিরা খাতায় লাল কালি পড়ার আগেই বাড়িতে খবর পৌঁছে যেত। বাড়িতে ফিরলে মা জিজ্ঞেস করতেন, “সব ক্লাস করেছ তো?”, আর বাবা সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলের দিকে তাকিয়ে বুঝে ফেলতেন গণিতের বইটি সত্যিই খোলা, নাকি শুধু অভিনয়ের জন্য রাখা। জীবনটি যেন রেললাইনের ওপর চলা ট্রেন—বাঁক আছে, কিন্তু পথ পরিবর্তনের অধিকার নেই।
তারপর একদিন এসএসসি নামের সেই বহুল আলোচিত বৈতরণী পার হতেই কেমন যেন সব বদলে যায়। কলেজ যেন প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীর হাতে স্বাধীনতার একটি বিশাল চাবির গোছা ধরিয়ে দিয়ে বলে, “এবার নিজেই নিজের পাহারাদার হও।” এখানে ইউনিফর্মের বাঁধন নেই, প্রতিদিনের কড়া হাজিরার ভয় নেই, প্রতিটি পদক্ষেপে শিক্ষক কিংবা অভিভাবকের দীর্ঘ ছায়াও নেই। এতদিন যে কিশোরটি নিয়ন্ত্রণের ভেতর নিজেকে চিনেছিল, সে হঠাৎ আবিষ্কার করে—তার সামনে আকাশের কোনো ছাদ নেই। আর ঠিক সেখানেই শুরু হয় সবচেয়ে বড় পরীক্ষা; পরীক্ষার প্রশ্নপত্রটি এবার বোর্ড দেয় না, জীবন দেয়।
স্বাধীনতা বড় অদ্ভুত জিনিস। দূর থেকে তাকে খুব সুন্দর লাগে, কিন্তু খুব কাছে এলে বোঝা যায়, তার ওজনও কম নয়। এতদিন যে সিদ্ধান্তগুলো মা-বাবা নিয়ে দিতেন, এখন সেগুলো নিজেকেই নিতে হয়। কোন বন্ধুর সঙ্গে চলবে, কোন সম্পর্ক বিশ্বাস করবে, কোন প্রলোভন এড়াবে, কোন স্বপ্নের পেছনে ছুটবে—এসবের উত্তর আর কোনো গাইডবইয়ের শেষ পাতায় লেখা থাকে না। ফলে কৈশোরের মনটি অনেকটা বর্ষার নদীর মতো হয়ে ওঠে—কখন শান্ত, কখন উত্তাল, কখন গভীর, কখন আবার নিজের দিকনির্দেশনাই হারিয়ে ফেলে।
এই সময়ে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, অভিভাবকেরাও এক অদ্ভুত দ্বিধায় পড়ে যান। এতদিন যে সন্তানকে প্রতিটি পদক্ষেপে ধরে ধরে হাঁটিয়েছেন, হঠাৎ তাকেই বলেন, “এখন থেকে নিজের ভালো-মন্দ নিজেই বুঝবে।” যেন গতকাল পর্যন্ত যার হাত ধরে রাস্তা পার করানো হয়েছে, আজ তাকে বলা হচ্ছে, “এই নাও, বিমান চালিয়ে দেখো!” সন্তান যেমন বিভ্রান্ত হয়, তেমনি বিভ্রান্ত হন অভিভাবকেরাও। একজন ভাবেন, “ছেলে আর আগের মতো কথা শোনে না।” অন্যজন মনে মনে বলে, “আমাকে তো কখনো নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানোই হয়নি।”
সমস্যাটা এখানেই। আমরা সন্তানকে নিয়ম মেনে চলতে শেখাই, কিন্তু নিয়ম ছাড়া বাঁচতে শেখাই না। আমরা তাকে শাসনের ভাষা শিখাই, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণের অভিধান হাতে তুলে দিই না। ফলে স্কুলের চার দেয়াল ভেঙে যখন সে মুক্ত আকাশে দাঁড়ায়, তখন অনেকেই প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে—ডানা থাকা আর উড়তে পারা এক জিনিস নয়।
কখনো কি পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের লাল ইটের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকেছেন? বিকেলের শেষ রোদ যখন কার্জন হল কিংবা উডবার্নের শতবর্ষী দেয়ালে এসে পড়ে, তখন মনে হয় ইতিহাস যেন এখনো সেখানে নীরবে বসে আছে। কল্পনা করলে যেন শোনা যায় এক দীর্ঘশ্বাস—এ কি লর্ড মেকলের প্রেতাত্মা, নাকি ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার সেই পুরোনো ছায়া, যে এখনো আমাদের শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে চুপচাপ বসে উপস্থিতি দিচ্ছে?
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সাম্রাজ্য গেছে, পতাকা বদলেছে, শাসকের ভাষা বদলেছে, পাঠ্যবইয়ের প্রচ্ছদ বদলেছে; কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, শিক্ষার অন্তর্লীন দর্শনটি যেন খুব বেশি বদলায়নি। আজও আমরা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরাধিকার বহন করছি, যেখানে প্রশ্ন করার চেয়ে উত্তর মুখস্থ করা নিরাপদ, কৌতূহলের চেয়ে অনুকরণ লাভজনক, আর সৃজনশীলতার চেয়ে পরীক্ষার নম্বর অধিক সম্মানজনক। মনে হয়, মেকলের প্রেতাত্মা আর কোনো পুরোনো ভবনের করিডরে ঘোরে না; সে আজকাল অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করে কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনে, মডেল টেস্টের খাতায়, আর জিপিএ-নির্ভর সামাজিক গৌরবের আয়নায়।
আধুনিকতার বড়ই অদ্ভুত প্রহসন! আমরা হাতে স্মার্টফোন নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছি, অথচ বহু ক্ষেত্রে এখনো এমন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন দেখি, যে সুন্দর করে মুখস্থ করবে, নির্ভুলভাবে লিখবে, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাবে, তারপর সমাজের আরেকটি নিখুঁত চাকা হয়ে ঘুরতে থাকবে। যেন শিক্ষার উদ্দেশ্য স্বাধীন চিন্তার মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আরও দক্ষ পরীক্ষার্থী উৎপাদন করা। আর সেখানেই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে—আমরা কি সত্যিই একবিংশ শতাব্দীতে বাস করছি, নাকি শুধু একবিংশ শতাব্দীর পোশাক পরে উনিশ শতকের শিক্ষাদর্শকেই নতুন রঙে রাঙিয়ে চলেছি?
ভাঙা আয়নার টুকরোগুলো একে একে হাতে তুলে নিতে নিতে আমরা এমন এক দৃশ্যের সামনে এসে দাঁড়াই, যেখানে শব্দের চেয়ে নীরবতার আওয়াজ অনেক বেশি তীব্র। পরিসংখ্যানের খাতায় সংখ্যাটি মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ। সংখ্যাবিদদের কাছে এটি একটি অঙ্ক, প্রশাসনের কাছে একটি প্রতিবেদন, সভা-সেমিনারের পাওয়ারপয়েন্টে একটি রঙিন গ্রাফ। কিন্তু এই সংখ্যার ভেতরে যদি কান পেতে শোনা যায়, তবে সেখানে শোনা যাবে সাড়ে পাঁচ লাখ অসমাপ্ত সকালের গল্প, সাড়ে পাঁচ লাখ অর্ধেক লেখা খাতার ইতিহাস, সাড়ে পাঁচ লাখ অপূর্ণ স্বপ্নের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস। একটি সমাজ যখন তার তরুণদের হারায়, তখন তারা সবাই একসঙ্গে হারিয়ে যায় না; তারা প্রতিদিন একটু একটু করে শিক্ষার বেঞ্চ থেকে সরে যায়, লাইব্রেরির চেয়ার ছেড়ে দেয়, কলেজের করিডর থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। একসময় আমরা শুধু লক্ষ্য করি—বেঞ্চটি খালি, কিন্তু সেই শূন্যতার ইতিহাস কেউ আর লিখে রাখে না।
এই অদৃশ্য প্রস্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্রটি অনেক সময় রাজনীতি নয়, কোনো আন্তর্জাতিক চক্রান্তও নয়; বরং ভাতের হাঁড়ি। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা যায় ক্রয়ক্ষমতার সংকট, কিন্তু গ্রামের একজন বাবার ভাষায় এর নাম, “সংসার আর চলে না।” মহামারির পর দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি যেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের পড়ার টেবিলগুলোর ওপর অদৃশ্য খরা নামিয়ে দিয়েছে। একসময় যে টেবিলে বইয়ের স্তূপ ছিল, সেখানে এখন হিসাবের খাতা। চালের দাম, ডালের দাম, তেলের দাম, বাড়িভাড়া—সবাই মিলে যেন পড়াশোনার বিরুদ্ধে এক নীরব জোট বেঁধেছে।
নরসিংদীর রায়পুরার এক তাঁতশ্রমিক বাবার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মনে হলো, অর্থনীতির সবচেয়ে নির্মম সংজ্ঞাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে নয়, মানুষের চোখেই লেখা থাকে। তিনি পুরোনো চশমার কাচ মুছতে মুছতে বলছিলেন, “ছেলেটা এসএসসিতে ভালো ফল করছিল। ভাবছিলাম কলেজে পড়ামু। পরে শুনলাম, কলেজে ভর্তি করাই শেষ কথা না—প্রাইভেট লাগবে, কোচিং লাগবে, নোট লাগবে, বই লাগবে। তখন ভাবলাম, আগে চাল কিনব, না ছেলেকে কোচিং পড়াব? শেষে বইয়ের ব্যাগটা নামিয়ে ওর হাতে কাপড়ের দোকানের চাবিটাই তুলে দিতে হলো।” কথাগুলো বলতে বলতে মানুষটি চোখ মুছছিলেন, কিন্তু আসলে তিনি চোখ নয়, নিজের ভাঙা স্বপ্নই মুছছিলেন।
অথচ ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন এক অদ্ভুত অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কলেজে ভর্তি হওয়া মানেই যেন আর শিক্ষার নিশ্চয়তা নয়; বরং নতুন এক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রবেশপত্র। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কলেজের শ্রেণিকক্ষের চেয়ে কোচিং সেন্টারের সিঁড়িগুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন এক সময় এসেছে, যখন অনেক অভিভাবক রসিকতা করে বলেন, “কলেজে ভর্তি হওয়া তো আসল ব্যাপার না, আসল কলেজ তো সন্ধ্যায় শুরু হয়!” কথাটি শুনে হাসি পেলেও, হাসির ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম সত্য। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত কিংবা জীববিজ্ঞানের পাঠ যেন আর শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সম্পূর্ণ হয় না; সেগুলোর পরিণতি নির্ভর করে সন্ধ্যার কোচিং ব্যাচে আসন পাওয়ার ওপর। যার পরিবারের সামর্থ্য আছে, সে বাড়তি ব্যাখ্যা, বাড়তি নোট, বাড়তি পরীক্ষার সুযোগ পায়; আর যার নেই, সে ধীরে ধীরে নিজের অযোগ্যতার ওপরই বিশ্বাস করতে শুরু করে। দারিদ্র্য অনেক সময় পেটের ক্ষুধার চেয়ে আগে আত্মবিশ্বাসকে খেয়ে ফেলে।
এরপর আসে আরেকটি নীরব প্রতিপক্ষ, যার হাতে কোনো লাঠি নেই, কোনো অস্ত্র নেই, অথচ তার প্রভাব সবচেয়ে গভীর। সেটি হলো স্মার্টফোনের সেই নীল আলো। দিনের শেষে ক্লান্ত একটি কিশোর পড়ার টেবিলে বসে বই খুলে, কিন্তু তার আগে আরেকটি পর্দা খুলে যায়। একটি নোটিফিকেশন, আরেকটি ভিডিও, আরেকটি রিল, আরেকটি অন্তহীন স্ক্রোল। সময় যেন অদৃশ্যভাবে আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যেতে থাকে। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষকে পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করেছে, কিন্তু অনেক তরুণকে নিজের ভেতর থেকে বিচ্ছিন্নও করে ফেলেছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে মনোযোগের পরিধি বলা হয়, সেই পরিধি যেন প্রতিদিন একটু একটু করে সংকুচিত হচ্ছে। পাঁচ মিনিট মনোযোগ দিয়ে একটি অধ্যায় পড়া কঠিন হয়ে উঠছে, অথচ টানা দুই ঘণ্টা পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা কোনো সমস্যাই মনে হচ্ছে না।
এই ডিজিটাল বিভ্রান্তির সঙ্গে যখন যোগ হয় সমাজের অলীক প্রত্যাশা, তখন কিশোরটির কাঁধে অদৃশ্য এক হিমালয় চাপিয়ে দেওয়া হয়। সবাই তাকে বলে, “জিপিএ-৫ পেতেই হবে”, “ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেই হবে”, “জীবনে সফল হতেই হবে।” কিন্তু খুব কম মানুষই জিজ্ঞেস করে, “তুমি কেমন আছ?” আমরা ফলাফলের জন্য অসংখ্য কোচিং খুলেছি, কিন্তু ভেঙে পড়া মনকে জোড়া লাগানোর জন্য কতগুলো কক্ষ বানিয়েছি? আমরা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য হাজারো মডেল টেস্টের ব্যবস্থা করেছি, কিন্তু হতাশা, উদ্বেগ, ব্যর্থতার ভয় কিংবা আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলা একজন শিক্ষার্থীর পাশে বসে শোনার মতো একজন কাউন্সেলরও কি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রেখেছি?
ফলে অনেক তরুণের পরাজয় পরীক্ষার হলে শুরু হয় না; অনেক আগেই শুরু হয়ে যায় নিজের ভেতরে। উত্তরপত্রে কলম থেমে যাওয়ার আগেই তার স্বপ্ন থেমে যায়। সে হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে কলেজ ছাড়ে আজ, কিন্তু মানসিকভাবে সে শিক্ষাজীবন থেকে বিদায় নিয়েছিল আরও কয়েক মাস আগে। আমরা শুধু তার নামটি উপস্থিতির খাতা থেকে মুছে যেতে দেখি; তার ভেতরের দীর্ঘ নীরব আর্তনাদটি আর শুনতে পাই না।
সমাজবিজ্ঞানীরা একে ঝরে পড়া বলেন, অর্থনীতিবিদেরা বলেন মানবসম্পদের অপচয়, নীতিনির্ধারকেরা বলেন ড্রপআউট। কিন্তু একজন বাবা কিংবা মায়ের কাছে এর আরেকটি নাম আছে—“আমার ছেলেটা আর পড়তে পারল না।” এই একটি বাক্যের ভেতরেই হয়তো সাড়ে পাঁচ লাখ পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি ইতিহাস, অনেক বেশি বেদনা এবং একটি জাতির অদৃশ্য ভবিষ্যতের ভাঙা আয়নাটি লুকিয়ে আছে।
একটি আয়না ভেঙে গেলে আমরা সাধারণত দুটি কাজ করি—হয় সেটিকে ফেলে দিই, নয়তো নতুন আয়না কিনে আনি। কিন্তু একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে গেলে সেই সহজ সমাধান নেই। সেখানে নতুন কাচ কিনে বসিয়ে দিলেই প্রতিচ্ছবি বদলে যায় না; বদলাতে হয় প্রতিচ্ছবি দেখার দর্শনটিকেই। তাই সাড়ে পাঁচ লাখ হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীর গল্প শুনে যদি আমরা কেবল পরীক্ষার রুটিন বদলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তবে তা হবে জ্বরের রোগীকে নতুন জামা পরিয়ে সুস্থ ঘোষণা করার মতোই এক অদ্ভুত চিকিৎসা। অসুখ শরীরে নয়, আমাদের শিক্ষাচিন্তার শিরায়-উপশিরায়।
আমরা বহুদিন ধরেই এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে বাস করছি, যেখানে দুই বছরের হাসি-কান্না, পরিশ্রম, কৌতূহল, ব্যর্থতা, সৃজনশীলতা আর মানুষ হয়ে ওঠার সমগ্র ইতিহাসকে শেষ পর্যন্ত বিচার করা হয় মাত্র কয়েক ঘণ্টার একটি পরীক্ষার টেবিলে। যেন একজন মানুষকে বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তাকে তিন ঘণ্টা চুপচাপ বসিয়ে রাখা, কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর লিখিয়ে নেওয়া, তারপর নম্বরের দাঁড়িপাল্লায় তার ভবিষ্যৎ ওজন করা। পৃথিবীর আর কোনো আদালতে এত অল্প সময়ে এত বড় রায় দেওয়া হয় কি না, জানা নেই; কিন্তু আমাদের পরীক্ষার হলগুলো সেই বিচারে বেশ দক্ষ। অথচ শিক্ষা কোনো একদিনের দৌড় নয়, এটি প্রতিদিন একটু একটু করে মানুষ হয়ে ওঠার দীর্ঘ অনুশীলন। তাই মূল্যায়নের কেন্দ্রেও ফিরে আসতে হবে সেই দীর্ঘ যাত্রাপথ। শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ, নিয়মিত পড়াশোনা, দলগত কাজ, গবেষণার কৌতূহল, নতুন ধারণা তৈরি করার ক্ষমতা, বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার দক্ষতা—এসবও যেন নম্বরের ভাষায় কথা বলতে শেখে। পরীক্ষার খাতা যেন জীবনের একমাত্র সাক্ষী না হয়ে ওঠে।
তবে শুধু মূল্যায়নের ধরন পাল্টালেই চলবে না। কারণ মানুষের ভাঙন শুরু হয় খাতায় নয়, অনেক আগেই মনের ভেতরে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক আছেন, রসায়নের শিক্ষক আছেন, গণিতের শিক্ষক আছেন, এমনকি কখনো কখনো উপস্থিতির খাতা দেখার জন্যও আলাদা কর্মকর্তা আছেন; কিন্তু যে শিক্ষার্থীর মন নীরবে ভেঙে যাচ্ছে, তার পাশে বসে পাঁচ মিনিট শুনবেন—এমন একজন পেশাদার মানুষ অনেক প্রতিষ্ঠানেই নেই। মনে হয় আমরা শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কের যত্ন নিতে শিখেছি, কিন্তু হৃদয়ের খবর নেওয়া এখনো শেখা হয়নি। অথচ একটি বিষণ্ণ মন কোনো পরীক্ষায় প্রথম হতে পারে না, কোনো স্বপ্নও দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে না।
আবার বাস্তবতার আরেকটি মুখও আছে। দেশের হাজারো মেধাবী ছেলে-মেয়ে প্রতিদিন পড়াশোনার সঙ্গে সংসারের হিসাব মেলায়। সকালে ক্লাস, বিকেলে টিউশনি, রাতে দোকানে কাজ, ভোরে আবার বই—এই জীবনকে আমরা অনেক সময় সংগ্রাম বলে বাহবা দিই, কিন্তু খুব কমই ভাবি, এই সংগ্রামকে একটু সহজ করে দেওয়ার দায় রাষ্ট্রেরও আছে। পৃথিবীর বহু দেশে শিক্ষার্থীরা সম্মানের সঙ্গে পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করে নিজেদের শিক্ষার ব্যয় বহন করে। আমাদের এখানেও যদি এমন কর্ম-অধ্যয়নের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তবে দরিদ্র ঘরের কোনো সন্তানকে হয়তো আর বই আর ভাতের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে না।
একই সঙ্গে আমাদের শিক্ষার আরেকটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণাও ভাঙতে হবে। আমরা এখনো এমনভাবে ডিগ্রি বিতরণ করি, যেন কাগজের সনদই জীবনের সবচেয়ে বড় পাসপোর্ট। অথচ এই যুগে কেবল মুখস্থবিদ্যা দিয়ে চাকরির বাজারে টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একজন শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে বেরিয়ে আসবে—তার হাতে যদি তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল দক্ষতা, প্রোগ্রামিং, নকশা নির্মাণ, যোগাযোগ, উদ্যোক্তা-চিন্তা কিংবা কোনো একটি কারিগরি সক্ষমতা না থাকে, তবে তাকে আমরা ডিগ্রি দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু জীবনের অস্ত্র দিইনি। শিক্ষার প্রকৃত সনদ কেবল দেয়ালে ঝোলানো ফ্রেম নয়; প্রয়োজনে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার আত্মবিশ্বাস।
আর সবচেয়ে বড় পুনর্জন্ম ঘটতে হবে শ্রেণিকক্ষে। আমাদের অনেক কলেজ আজ এমন এক পরীক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে জ্ঞানচর্চার চেয়ে প্রশ্নপত্রের সম্ভাব্য উত্তর বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষ অনেক সময় কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনের অপেক্ষাকক্ষ বলে ভুল হতে পারে। শিক্ষক ক্লাসে বলেন, “বিস্তারিতটা কোচিংয়ে বুঝিয়ে দেব।” শিক্ষার্থীও বুঝে যায়, আসল পাঠ্যবইটি যেন কলেজে নয়, সন্ধ্যার ব্যাচেই খোলে। এই সংস্কৃতি যতদিন চলবে, ততদিন শ্রেণিকক্ষের জানালা দিয়ে জ্ঞানের আলো নয়, বাণিজ্যের ছায়াই বেশি ঢুকবে। তাই কলেজকে আবার আলোচনার, বিতর্কের, প্রশ্ন করার, ভুল করার, শেখার এবং একসঙ্গে বেড়ে ওঠার প্রাণবন্ত অঙ্গনে ফিরিয়ে আনতেই হবে।
বাংলা সাহিত্যের সেই অমর দীর্ঘশ্বাস—“ছাত্রজীবন সুখের জীবন, যদি না থাকত পরীক্ষা”—যিনি প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন, তাঁকে নোবেল না দিলেও অন্তত প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার আগে জাতীয়ভাবে স্মরণ করা উচিত। কারণ এমন নির্ভুল বাণী কেবল কবি লেখেন না, কখনো কখনো জাতির সম্মিলিত কান্নাও লিখে ফেলে। পরীক্ষা না থাকলে ছাত্রজীবন সত্যিই সুখের জীবন হতে পারত—সকালে ঘুম, দুপুরে আড্ডা, বিকেলে প্রেম-প্রকৃতি-প্রজাপতি, রাতে মোবাইলের নীল আলোয় বিশ্বজয়। কিন্তু বিধাতা যেমন গোলাপের সঙ্গে কাঁটা, আমের সঙ্গে আঁটি, আর বিরিয়ানির সঙ্গে এলাচ দিয়েছেন, তেমনি কলেজের নীল আকাশের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন এইচএসসি নামের এক কঠোর জল্লাদ।
স্কুল নামক শৃঙ্খলাবদ্ধ দুর্গ থেকে পাস করে নীলয় বাবুরা যখন কলেজের বিশাল বিলে ঝাঁপ দেন, তখন তাঁদের ভাবভঙ্গি দেখার মতো হয়। চুলে জেলের জ্যামিতিক স্থাপত্য, শার্টের ওপরের বোতামে স্বাধীনতার হাওয়া, পকেটে স্মার্টফোন নামের আধুনিক যুগের পরমাত্মা, আর মুখে এমন হাসি—যেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যক্তিগতভাবে ঘোষণা করেছে, “তোমার আর পড়াশোনা লাগবে না।” কলেজের ফ্লেক্সিবল রুটিন তখন আশীর্বাদ নয়, অলসতার সরকারি লাইসেন্স হয়ে ওঠে। সকালের ক্লাস বাংক দিয়ে মোড়ের দোকানে চা-সিগারেটের ধোঁয়ায় জীবনদর্শন তৈরি হয়, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে ওঠে—“ফিলিং ফ্রিডম উইথ ৪৪ আদার্স।” তখন তাদের কাছে জীবন মানেই ‘দিল তো পাগল হ্যায়’; পড়ালেখা নামের দুর্ভাগা বস্তুটি পরীক্ষার আগের রাতের লং মার্চে উদ্ধার হয়ে যাবে—এই বিশ্বাসে তারা দিব্যি বেঁচে থাকে।
কিন্তু সময় কলেজ ক্যান্টিনের আড্ডা নয় যে চায়ের কাপ হাতে থেমে থাকবে। সে নিজের গতিতে এগিয়ে যায়। একদিন হঠাৎ পরীক্ষার রুটিন দেয়ালে টিকটিকির মতো ঝুলে পড়ে। তখনই নীলয়দের ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ মুহূর্তে শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এ রূপান্তরিত হয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে জেলের বদলে হাত চালাতে চালাতে তারা আবিষ্কার করে—ফিজিক্সের গতিবিদ্যা পড়তে গিয়ে নিজের জীবনের গতিই যে স্তব্ধ হয়ে গেছে, তা তো আগে টের পাওয়া যায়নি! কেমিস্ট্রির জৈব যৌগ বুঝতে গিয়ে নিজের মগজ যে অজৈব কয়লায় পরিণত হয়েছে, সে খবরও কেউ দেয়নি!
পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে তখন এক অলৌকিক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো মোটা বইয়ে এর নাম নেই, কিন্তু বাঙালি ছাত্রসমাজ যুগে যুগে একে চেনে—পরীক্ষা-ব্যাধি। যে ছেলেটি সারা বছর রাত দুটো পর্যন্ত অনলাইন গেম খেলে ঘোড়ার মতো সুস্থ ছিল, পরীক্ষার রুটিন দেখামাত্র তার পেটব্যথা শুরু হয়। কারও মাথা ঘোরে, কারও বুক ধড়ফড় করে, কারও বই খুললেই চোখের পাতা এমন ভারী হয় যেন বালিশ নিজেই ডাকছে—“এসো, তোমার প্রকৃত গন্তব্য আমি।” আবার প্রবেশপত্র হাতে পেলেই কারও কারও বাথরুমের সঙ্গে এক গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
এই সময়ে শিক্ষার্থীর অবচেতন মনও কম যায় না। সারা বছর যার সঙ্গে পড়াশোনার সম্পর্ক ছিল দূরসম্পর্কের ফুফাতো ভাইয়ের মতো, সে পরীক্ষার আগে হঠাৎ আধ্যাত্মিক নবজাগরণে আক্রান্ত হয়। ফেসবুক ওয়ালে জ্বলজ্বল করে—“দোয়া চাই বন্ধুরা, আল্লাহ ভরসা।” কেউ কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অলৌকিক সন্ধানে মেসেঞ্জার ও টেলিগ্রামের অন্ধকার গলিতে এমনভাবে ছুটে বেড়ায়, যেন সেখানে জ্ঞানের গুহাধন লুকিয়ে আছে। আর পরীক্ষার হলে প্রশ্ন হাতে পেয়ে প্রথম পাঁচ মিনিট মনে হয়—সবই তো চেনা! তারপরই মগজের ভেতর বিদ্যুৎ চলে যায়। উত্তরপত্রে তখন নাম, রোল নম্বর, মাঝে সামান্য দীর্ঘশ্বাস, আর শেষে পরীক্ষকের প্রতি নীরব মানবিক আবেদন ছাড়া বিশেষ কিছু থাকে না।
এই ট্র্যাজিক কমেডির আরেক প্রধান চরিত্র অভিভাবক। সারা বছর যারা সন্তানকে স্বাধীনতা দিয়ে আধুনিক মা-বাবার মহড়া দিয়েছেন, পরীক্ষার মাসে তারা আচমকা সামরিক শাসকের রূপ ধারণ করেন। ড্রয়িংরুমের টিভি বন্ধ, ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড বদল, মোবাইল বাজেয়াপ্ত, এমনকি বাড়ির বিড়াল একটু জোরে ম্যাঁও করলেও ধমক—“চুপ! ছেলের পরীক্ষা!” কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। যে পাখি সারা বছর বিলের জলে ডানা ভিজিয়ে বেড়িয়েছে, তাকে পরীক্ষার আগের রাতে খাঁচায় পুরে জিপিএ-৫ নামের সোনার ডিম পাড়তে বললে সে ডিম পাড়বে না; উল্টো গোল্লা নামের এক শিল্পবস্তু নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে।
এই হাসির ভেতরেই তাই লুকিয়ে আছে গভীর ট্র্যাজেডি। স্বাধীনতা অবশ্যই দরকার, কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে যদি আত্মনিয়ন্ত্রণের লাগাম না থাকে, তবে পাবলিক পরীক্ষার মঞ্চে এসে অনেক কিশোর-কিশোরী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। পরীক্ষার হল তখন আর শুধু মেধা যাচাইয়ের স্থান থাকে না; হয়ে ওঠে আতঙ্ক, অনুশোচনা, চাপ আর অসম্পূর্ণ প্রস্তুতির এক মনস্তাত্ত্বিক জেরা-কক্ষ। তাই হে কলেজের স্বাধীন পাখিরা, ডানা মেলো, আকাশে উড়ো, প্রেম-আড্ডা-স্বপ্ন সবই থাকুক; কিন্তু মনে রেখো, আকাশে শুধু মেঘ নয়, বাজপাখিও ওড়ে। সেই বাজপাখির নাম পরীক্ষা। তাকে অবহেলা করলে জিপিএ-র স্বপ্ন কর্পূরের মতো উড়ে যেতে বেশি সময় লাগে না।
দেখতে দেখতেই কলেজের দুই বছর ফুরিয়ে যায়। আঠারো কিংবা উনিশ বছর বয়সে নীলয় একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ফটকের সামনে দাঁড়ায়। কেউ দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ দূর শহরের একটি ক্যাম্পাসে, কেউ আবার নতুন এক মেস কিংবা আবাসিক হলে জীবনের দ্বিতীয় জন্ম নিতে যায়। এতদিন যে ছেলেটি বাড়ি ফিরতে দশ মিনিট দেরি হলে ফোনের পর ফোন পেত, আজ সে রাত বারোটায় ফিরলেও কেউ দরজা খুলে অপেক্ষা করে থাকে না। নিজের টাকা নিজে খরচ করা, নিজের সময় নিজে ভাগ করা, নিজের ভুলের মূল্য নিজেই দেওয়া—এই প্রথম সে সত্যিকার অর্থে নিজের জীবনের চালকের আসনে বসে।
কুয়ো আর বিল পেরিয়ে এবার সে মহাসমুদ্রে। সমুদ্রের যেমন কোনো বেড়া নেই, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের স্বাধীনতারও তেমনি কোনো দৃশ্যমান সীমানা নেই। কিন্তু সমুদ্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্যও আছে—এখানে সাঁতার না জানলে স্বাধীনতা নয়, বিপদই বেশি।
মনোবিজ্ঞানী জেফরি আরনেট এই সময়টিকে বলেছিলেন ‘উদীয়মান প্রাপ্তবয়স্কতা’। নামটি যত শান্ত, সময়টি ততটাই অস্থির। জীবনের এই অধ্যায়ে মানুষ প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করে, নিজের ব্যর্থতার জন্য বাবা-মা, শিক্ষক কিংবা সমাজকে আর খুব সহজে দোষ দেওয়া যায় না। নিজের জীবনের মালিক হওয়া যত আনন্দের, তার দায়ও তত ভারী। স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় মূল্য অনেক সময় একাকীত্ব। হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যেও তরুণটি অনুভব করে—তার সিদ্ধান্ত তাকে একাই নিতে হবে, তার ব্যর্থতার রাতও তাকে একাই পার করতে হবে।
এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়জীবন সম্ভাবনার যেমন সুবিশাল দরজা খুলে দেয়, তেমনি বিপথে যাওয়ার পথও বহুগুণ বেড়ে যায়। এতদিন যে কিশোরটি সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ি ফিরত, সেই হয়তো এখন রাতভর অনলাইন দুনিয়ার অন্ধকার গলিতে ঘুরে বেড়ায়। কেউ ভুল সঙ্গের মোহে আটকে যায়, কেউ মাদকের নেশাকে স্বাধীনতার অন্য নাম মনে করে, কেউ ক্ষমতার রাজনীতিকে নেতৃত্বের শর্টকাট ভাবে, আবার কেউ ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তায় এমনভাবে ভেঙে পড়ে যে নিজের প্রতিচ্ছবিকেও চিনতে পারে না। মহাসমুদ্র কারও জন্য নতুন মহাদেশের পথ খুলে দেয়, আবার কারও জাহাজও নিঃশব্দে গিলে ফেলে।
আসলে এই তিনটি স্তর—কুয়ো, বিল আর মহাসমুদ্র—তিনটি ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গল্প নয়; তিনটি ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক জগতের গল্প। প্রথমটিতে মানুষ বড়দের অনুমোদন খোঁজে, দ্বিতীয়টিতে বন্ধুদের স্বীকৃতি, আর তৃতীয়টিতে নিজের পরিচয়। প্রথমটিতে নিয়ন্ত্রণ বেশি, দ্বিতীয়টিতে বিভ্রান্তি বেশি, তৃতীয়টিতে স্বাধীনতা বেশি। আর এই তিনটির মাঝখানেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ—অথবা কখনো কখনো, অদৃশ্যভাবে হারিয়েও যায়।
এই কারণেই অভিভাবকদের ভূমিকাও সময়ের সঙ্গে বদলাতে হয়। কিন্তু আমরা প্রায়ই উল্টো কাজ করি। সন্তান যখন ছোট থাকে, তখন তাকে এত শক্ত করে ধরে রাখি যে সে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলনই করতে পারে না। আবার যখন সে সত্যিই আমাদের হাতের বদলে আমাদের কাঁধ চায়, তখন আমরা দূরে সরে যাই। অথচ অভিভাবকত্বের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি হলো ঋতুর মতো বদলে যেতে জানা। ছোটবেলায় তিনি হবেন মালি—গাছটিকে যত্নে বড় করবেন, কিন্তু শিকড়কে নিজের মাটি খুঁজে নিতে দেবেন। কৈশোরে তিনি হবেন পরামর্শদাতা—গোয়েন্দা নন, বিশ্বাসের মানুষ। সন্তানের ফোন গোপনে তল্লাশি করার চেয়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে এক কাপ চা খাওয়া অনেক বেশি কার্যকর। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে তিনি হবেন সহযাত্রী। প্রতিদিনের কথোপকথনে ফলাফল নয়, জানতে চাইবেন—“আজ তোমার মন কেমন?” কারণ পৃথিবীতে যদি একজন তরুণ নিশ্চিতভাবে জানে, সব দরজা বন্ধ হলেও একটি দরজা তার জন্য খোলা থাকবে, তবে সেই দরজার নামই পরিবার।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, কুয়োর ব্যাঙকে যদি কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া একদিন হঠাৎ মহাসমুদ্রে ছুড়ে দেওয়া হয়, তবে তার পরিণতি খুব সুখকর হয় না। আমাদের বহু তরুণের জীবনেও আজ সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। স্কুলের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবারিত স্বাধীনতার মাঝখানে যে সেতুটি থাকার কথা, সেই সেতুর নাম উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা। সেই সেতুকে যদি আমরা শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির কারখানা বানিয়ে ফেলি, তবে ওপারে পৌঁছানোর আগেই অনেক স্বপ্ন নদীতে ভেসে যাবে।
তাই আসুন, আমরা সন্তানদের শুধু খাঁচার ভদ্র পাখি বানানোর চেষ্টা না করে, তাদের ডানায় এমন আত্মবিশ্বাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ, মূল্যবোধ আর মানবিকতার পালক জুড়ে দিই, যাতে তারা কুয়ো ছেড়ে বিলে এলেও পথ না হারায়, আর বিল পেরিয়ে যখন মহাসমুদ্রের অনন্ত আকাশে উড়ে যায়, তখন ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও শান্ত কণ্ঠে বলতে পারে—“আমি শুধু উড়তে শিখিনি; আমি আকাশ পড়তেও শিখেছি, আর নিজের দিকও চিনতে শিখেছি।”
একজন মানুষের জীবনকে যদি জল দিয়ে মাপা যেত, তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ সন্তানের বেড়ে ওঠার গল্পটি তিনটি জলাশয়ের ইতিহাস হয়ে দাঁড়াত—একটি কুয়ো, একটি বিল, আর শেষে এক সীমাহীন মহাসমুদ্র। জন্মের পর থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সে বাস করে কুয়োর ভেতর। চারদিকে নিরাপত্তার উঁচু দেয়াল, মাথার ওপর সামান্য আকাশের টুকরো, আর সেই আকাশকেই পৃথিবীর সম্পূর্ণ মানচিত্র বলে বিশ্বাস করার এক নির্ভেজাল সরলতা। এরপর একদিন এসএসসির ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যেন ভাগ্যের রাজমিস্ত্রিরা রাতারাতি সেই কুয়োর দেয়াল ভেঙে দেয়। ছেলেটি বা মেয়েটি হঠাৎ এসে পড়ে এক বিস্তৃত বিলে—যেখানে জলও আছে, ঢেউও আছে, কচুরিপানার মোহও আছে, আবার কোথাও কোথাও এমন গভীর খাদও আছে, যেখানে অসতর্ক পা মুহূর্তেই তলিয়ে যেতে পারে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই বিলও শেষ হয়। সামনে খুলে যায় এক অন্তহীন মহাসমুদ্র—যেখানে স্বাধীনতার কোনো সীমারেখা নেই, অথচ নিরাপত্তার কোনো তটরেখাও নেই।
মজার বিষয় হলো, আমাদের অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানকে এই তিন জলাশয়ের কথা কখনো শেখান না। তাঁরা শুধু কুয়োর ভেতর সাঁতার শেখান, তারপর এক শুভ সকালে ঘোষণা করেন, “বাবা, এখন থেকে তুমি স্বাধীন।” যেন গতকাল পর্যন্ত যে ছেলেটি নিজের মোজার জোড়া খুঁজে পেত না, আজ থেকেই সে জীবনের সব সিদ্ধান্ত নেবে! এই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, আমরা সন্তান লালন করি কম, বরং ছোট্ট একটি প্রকল্প পরিচালনা করি বেশি—প্রকল্পের নাম, ‘নিয়ন্ত্রণে থাকো, মানুষ হয়ে যাও।’
সকাল সাড়ে সাতটার অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে নীলয়ের যুদ্ধ শুরু হয়। মা ইতিমধ্যে ইউনিফর্ম ইস্ত্রি করে রেখেছেন, বাবা স্কুলব্যাগের ওজন দেখে মনে মনে ভাবছেন, ছেলে মানুষ হচ্ছে নাকি পাহাড়ে অভিযান চালাতে যাচ্ছে। জুতোর ফিতা বাঁধা থেকে শুরু করে টিফিন বক্সের ঢাকনা পর্যন্ত সবকিছুর ওপর অভিভাবকীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একপ্রকার সাংবিধানিক জরুরি অবস্থা জারি থাকে। স্কুল শেষে বাসায় ফেরা, বিকেলে গৃহশিক্ষক, সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসা, রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি—জীবনের প্রতিটি মিনিট যেন অদৃশ্য কোনো টাইমকিপারের বাঁশির আওয়াজে পরিচালিত হয়। এই সময়ে সন্তানের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এতটাই সীমিত যে, কখনো কখনো মনে হয় সে পরিবারের সদস্য নয়, বরং একটি সুচারুভাবে পরিচালিত সময়সূচির অস্থায়ী কর্মচারী।
তবু এই কুয়োর জীবনকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এখানেই নিরাপত্তা আছে, পরিচিতি আছে, নিয়ম আছে, স্নেহ আছে। কুয়োর ব্যাঙ যেমন বাইরের পৃথিবী না দেখেও নিজের ছোট্ট জলকেই সমুদ্র মনে করে সুখে থাকে, তেমনি শিশুটিও পরিবার ও বিদ্যালয়ের তৈরি সীমানার মধ্যেই নিজের নিরাপত্তার সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। মানব বিকাশবিদ্যার ভাষায় এটি সেই সময়, যখন শিশুর কর্মদক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং পরিচয়ের ভিত্তি ধীরে ধীরে নির্মিত হয়। কিন্তু সমস্যাটি অন্য জায়গায়। আমরা তাকে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখাই না; শেখাই নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে। আমরা তাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুশীলন দিই না; বরং তার হয়ে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। ফলে সে শিখে যায়—জীবন মানেই নির্দেশ পালন। নিজের বিবেচনায় ভুল করার সুযোগও তার থাকে না, ঠিক করার অভিজ্ঞতাও হয় না।
এই কারণেই কুয়োর শান্ত জলের নিচে অদৃশ্যভাবে জমতে থাকে আরেকটি স্রোত—স্বাধীনতার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা। বাইরে থেকে তাকে যতই শান্ত মনে হোক, ভেতরে ভেতরে সে প্রতিদিন একটু একটু করে ভাবতে শেখে, “যদি একদিন কেউ আমাকে না দেখে?” এই প্রশ্নের উত্তর সে তখনও জানে না, কিন্তু প্রশ্নটি নিঃশব্দে বড় হতে থাকে।
এরপর আসে সেই বহুল আলোচিত ‘সুইট সিক্সটিন’। এসএসসির ফল বেরোয়। পরিবারে মিষ্টি বিতরণ হয়। আত্মীয়স্বজন অভিনন্দনের বন্যা বইয়ে দেন। নীলয় একটি নামী কলেজে ভর্তি হয়। আর ঠিক সেদিন থেকেই তার জীবনের ভূগোল বদলে যায়। স্কুলের সেই সকালবেলার অ্যাসেম্বলি নেই, ইউনিফর্মের বাধ্যবাধকতা নেই, ক্লাসে না গেলে ডায়েরিতে লাল কালির অভিযোগও নেই। কলেজ যেন প্রথম দিনেই তাকে কানে কানে বলে, “স্বাগতম, এখন থেকে তুমি নিজেই নিজের অভিভাবক।”
এই মুহূর্তটিই সবচেয়ে নাটকীয়। কারণ ছেলেটি কুয়ো থেকে সরাসরি মহাসমুদ্রে পড়ে না; সে আগে এসে নামে এক বিশাল বিলে। এই বিলের জল শান্তও, আবার বিভ্রান্তিকরও। এখানে স্বাধীনতা আছে, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বের পাঠ এখনো পুরোপুরি শেখা হয়নি। পরিবারও আর আগের মতো প্রতি মুহূর্তে পাহারা দেয় না, আবার পুরোপুরি ছেড়েও দিতে পারে না। ফলে শুরু হয় এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন। একদিকে কিশোর মনে হয়, “আমি বড় হয়ে গেছি”; অন্যদিকে বাড়িতে ফিরতেই মা জিজ্ঞেস করেন, “আজ টিফিন ঠিকমতো খেয়েছ তো?” এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিশোরটি অনেকটা সেই নৌকার মতো, যার এক দড়ি এখনো ঘাটে বাঁধা, আর অন্য দড়ি খুলে ভাটির স্রোতে ভেসে যেতে চাইছে।
আমাদের সমাজে এই বয়সটিই সবচেয়ে ভুল বোঝাবুঝির বয়স। অভিভাবক ভাবেন, সন্তান হঠাৎ বদলে গেছে। সন্তান ভাবে, বাবা-মা তাকে বোঝেন না। অথচ বাস্তবতা হলো, বদলে যায়নি কেউই; বদলে গেছে শুধু জলাশয়। কুয়োর নিয়ম বিলে চলে না, আর বিলের ঢেউ কুয়োর দেয়াল মানে না। এই রূপান্তরের জন্য মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে স্বাধীনতা আশীর্বাদের চেয়ে বিভ্রান্তির কারণ হয়ে ওঠে।
এরপর একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পেরিয়ে শুরু হয় জীবনের মহাসমুদ্র। যারা দূরের শহরে হল বা মেসে ওঠে, তাদের জন্য তো এই পরিবর্তন আরও আকস্মিক। এতদিন যাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে পরিবারের ছায়া ছিল, তারা হঠাৎ করেই আবিষ্কার করে—এখন কখন ঘুমাবে, কী খাবে, কোথায় যাবে, কার সঙ্গে চলবে, কোন স্বপ্ন বেছে নেবে—সবকিছুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তার নিজের। স্বাধীনতার এমন বিপুল বিস্তার প্রথমে রোমাঞ্চ জাগায়, পরে বিস্ময় সৃষ্টি করে, আর শেষ পর্যন্ত শেখায়—স্বাধীনতা আসলে কোনো পুরস্কার নয়; এটি একটি দায়িত্ব, যার ভার বহন করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে অর্জন করতে হয়।
সমস্যা এখানেই। আমরা সন্তানকে কুয়োর ভেতরে বাঁচতে শিখিয়েছি, কিন্তু বিলে সাঁতার কাটতে শেখাইনি; মহাসমুদ্রে দিক নির্ণয়ের কম্পাসও হাতে তুলে দিইনি। তারপর যখন সে ঢেউয়ের ধাক্কায় টালমাটাল হয়, তখন বিস্মিত হয়ে বলি, “এত ভালো ছেলে হঠাৎ এমন হলো কেন?” আসলে ছেলেটি হঠাৎ বদলায়নি; বদলে গেছে তার চারপাশের জল, আর সেই জলের জন্য প্রয়োজনীয় সাঁতার শেখানোর দায়িত্বটি আমরা সময়মতো পালন করিনি।
মানব বিকাশবিদ্যার অভিধানে এই সময়টির একটি ভদ্র নাম আছে—‘আইডেন্টিটি ফরমেশন’ বা আত্মপরিচয় নির্মাণের পর্যায়। কিন্তু আমাদের গ্রামের চায়ের দোকানে কিংবা শহরের অলিগলিতে এর আরও জনপ্রিয় নাম—“বয়সটা খারাপ!” কথাটি শুনলে অনেক মনোবিজ্ঞানী হয়তো ভ্রু কুঁচকাবেন, কিন্তু অভিজ্ঞ মায়েরা মৃদু হেসে বলবেন, “বইয়ে যা-ই লিখুক, এই বয়সে সবাই একটু অন্যরকম হয়।” সত্যি বলতে কী, এই দুই ব্যাখ্যার মাঝখানেই লুকিয়ে আছে কৈশোরের আসল গল্প।
স্কুলজীবনে এতদিন যে পরিবার ছিল পৃথিবীর কেন্দ্র, কলেজে উঠতেই সেই কেন্দ্রটি নিঃশব্দে একটু একটু করে সরে যেতে থাকে। তার জায়গা দখল করে সমবয়সী বন্ধুরা। হঠাৎ করেই বন্ধুদের মতামত বাবার উপদেশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, বন্ধুর প্রশংসা পরীক্ষার নম্বরের চেয়েও মূল্যবান মনে হয়, আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো বিকেলটি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি কাজ। এই সময়েই প্রথম ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার রোমাঞ্চ জন্ম নেয়, রাস্তার মোড়ের চায়ের কাপে পৃথিবী বদলে দেওয়ার বিপ্লবের পরিকল্পনা হয়, লুকিয়ে প্রথম সিগারেটের ধোঁয়াকে কেউ কেউ স্বাধীনতার মেঘ বলে ভুল করে, আবার কারও কারও মনে প্রথম ভালো লাগার অদ্ভুত কাঁপুনি নেমে আসে। কৈশোরের এই বিলে নামলে সবাই সাঁতার শেখে না; অনেকে ঢেউকেই সমুদ্র ভেবে বসে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় কলেজজীবনের আরেকটি অদ্ভুত উপহার—ফাঁকা সময়। স্কুলে ঘণ্টা ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় শাসক। ঘণ্টা বাজলে ক্লাসে ঢুকতে হতো, ঘণ্টা বাজলে বেরোতে হতো। মনে হতো, ঘড়ির কাঁটাই যেন শিক্ষার্থীর অভিভাবক। কিন্তু কলেজে এসে সেই কাঁটাও যেন একটু আলসে হয়ে যায়। কোনো দিন ল্যাব, কোনো দিন অর্ধেক ক্লাস, কোনো দিন আবার অপ্রত্যাশিত ছুটি। জীবনে প্রথমবারের মতো কিশোর-কিশোরীরা আবিষ্কার করে, সময় নামের একটি বিশাল নদী তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নদী পেলে সবাই যে নৌকা চালাতে পারে, এমন তো নয়। কেউ বইয়ের পাতা উল্টায়, কেউ নতুন দক্ষতা শেখে, কেউ খেলাধুলায় মন দেয়, আবার কেউ সময়কে এমন অবহেলায় নষ্ট করে, যেন সময়েরও কোনো মূল্য নেই। পরে অবশ্য সেই সময়ই সবচেয়ে কঠোর সুদে তার হিসাব বুঝে নেয়।
আর স্বাধীনতা? স্বাধীনতা এমন এক ফল, যা কাঁচা অবস্থায় খেলে অনেক সময় পেটব্যথা হয়। কৈশোরে এসে সবাই স্বাধীন হতে চায়, কিন্তু দায়িত্বশীল হতে শেখে খুব কম মানুষই। মনে হয়, স্বাধীনতা মানেই যেন কেউ আর কিছু বলবে না, কেউ আর প্রশ্ন করবে না, পৃথিবীটা এখন নিজের। অথচ স্বাধীনতার আসল অর্থ হলো নিজের ভুলের দায়ও নিজেকেই নিতে হবে। এই পাঠটি সবচেয়ে কঠিন। তাই এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চকচকে মায়াজাল, হুজুগের সংস্কৃতি, ভুল বন্ধুত্ব, ক্ষণিকের সম্পর্ক কিংবা গ্যাং সংস্কৃতির মতো অসংখ্য কচুরিপানা বিলের শান্ত জলের নিচে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে। দূর থেকে সবুজ দেখায়, কাছে গেলে বোঝা যায়—সেখানে পা আটকে যাওয়ার ঝুঁকিই বেশি।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনের সেই খালি বেঞ্চগুলোকে কেউ প্রশাসনিক ভাষায় “অনুপস্থিত পরীক্ষার্থী” বলে লিখে রাখবেন, কেউ পরিসংখ্যানের প্রতিবেদনে একটি সংখ্যা হিসেবে ছাপাবেন। কিন্তু সেই শূন্য বেঞ্চগুলো আসলে বেঞ্চ নয়; তারা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক হাজার প্রশ্নচিহ্ন। আর সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীর নিয়মিত পড়াশোনা থেকে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক তথ্য নয়; এটি আমাদের জাতীয় বিবেকের ওপর জমে থাকা এক দীর্ঘ ছায়া।
আমরা ফল প্রকাশের দিন আনন্দ করতে জানি। জিপিএ-৫ পাওয়া সন্তানকে নিয়ে ব্যান্ডপার্টি বাজে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রঙিন অভিনন্দনে ভরে যায়, মিষ্টির বাক্স হাতে ছবি তোলা হয়। সাফল্য উদ্যাপন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই আলোকোজ্জ্বল উৎসবের ঠিক পাশেই যে আরেকটি অন্ধকার প্রাঙ্গণ আছে, সেখানে কি আমরা কখনো উঁকি দিই? সেখানে হয়তো একটি ছেলেও আছে, যে কলেজে ভর্তি হয়েও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারেনি; একটি মেয়েও আছে, যে সংসারের চাপে বই বন্ধ করে সেলাই মেশিনের সামনে বসেছে; আরেকজন আছে, যে নম্বরের ভয়ে নিজের স্বপ্নটাকেই ধীরে ধীরে কবর দিয়েছে। বিজয়মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, মঞ্চের বাইরে কত মানুষ নীরবে অন্ধকারে রয়ে গেছে।
কখনো কখনো মনে হয়, স্কুলের সেই পরিচিত খাঁচা ভেঙে যে চঞ্চল পাখিগুলো একদিন মুক্ত আকাশে উড়তে চেয়েছিল, তাদের ডানা মাঝপথে কে কেটে দিল? পরিবার? রাষ্ট্র? শিক্ষাব্যবস্থা? সমাজ? নাকি আমরা সবাই মিলে? এই প্রশ্নের উত্তর যতক্ষণ না আমরা সম্মিলিতভাবে খুঁজব, ততক্ষণ নতুন নতুন পরিসংখ্যান তৈরি হবে, নতুন নতুন ড্রপআউট রিপোর্ট প্রকাশিত হবে, নতুন নতুন কমিশন বসবে—কিন্তু ভাঙা আয়নার ফাটল থেকে যাবে আগের মতোই।
সময় এসেছে শিক্ষাকে নম্বরের প্রতিযোগিতা থেকে মানুষের বিকাশের অভিযাত্রায় ফিরিয়ে আনার। সময় এসেছে জিপিএ গোনার পাশাপাশি হাসি গোনার, ফলাফল দেখার পাশাপাশি সম্ভাবনা দেখার, মেধা মাপার পাশাপাশি মানবিকতাকেও মূল্য দেওয়ার। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উচ্চতা তার আকাশচুম্বী ভবন দিয়ে নয়, তার সবচেয়ে প্রান্তিক শিক্ষার্থীর চোখের আত্মবিশ্বাস দিয়ে মাপা যায়। যে দিন বাংলাদেশের শেষ সারির, দরিদ্রতম, সবচেয়ে অবহেলিত ছেলেটি বা মেয়েটিও কোনো ভয়, হীনমন্যতা কিংবা অদৃশ্য বাধা ছাড়াই পরীক্ষার খাতায় নিজের নাম লিখতে পারবে—শুধু একজন পরীক্ষার্থী হিসেবে নয়, বরং মর্যাদাসম্পন্ন, স্বাধীন ও সম্ভাবনাময় একজন মানুষ হিসেবে—সেদিনই হয়তো আমরা বলতে পারব, ভাঙা আয়নার সব কাচখণ্ড আবার একত্রিত হয়ে একটি সম্পূর্ণ জাতির মুখচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
শেষ পর্যন্ত এই দীর্ঘ আলোচনাটি কোনো পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণের প্রতিবেদন নয়, কোনো জিপিএ-র বিজয়গাথা নয়, কোনো ড্রপআউট পরিসংখ্যানের শুষ্ক হিসাবও নয়। এটি আসলে আমাদের নিজেদের গল্প—একটি জাতি হিসেবে আমরা আমাদের সন্তানদের কীভাবে বড় করি, কীভাবে তাদের হাত শক্ত করে ধরে রাখি, আবার কখন কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই বিশাল আকাশের নিচে একা দাঁড় করিয়ে দিই, সেই আত্মজিজ্ঞাসার গল্প। এটি একটি ভাঙা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মুখ দেখার সাহসের গল্প। আয়নাটি ভাঙা বটে, কিন্তু প্রতিটি কাচখণ্ডে প্রতিফলিত হচ্ছে আমাদের পরিবার, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের সামাজিক মানসিকতা এবং আমাদের নীরব ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
আমরা বড় অদ্ভুত জাতি। সন্তান যখন ছোট থাকে, তখন তার হয়ে নিঃশ্বাসটুকুও যেন আমরা নিয়ে দিতে চাই; আবার যখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটি বিশ্বাসী কাঁধ, একটি মনোযোগী শ্রোতা কিংবা একটি আশ্বাসের বাক্য, তখন আমরা অনেকেই শুধু জিজ্ঞেস করি, “কত নম্বর পেলে?” মনে হয়, নম্বরের অঙ্কটি যেন মানুষটির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। অথচ পরীক্ষার খাতায় কেবল উত্তর লেখা যায়; একজন মানুষের চরিত্র, সাহস, স্বপ্ন, ভয় কিংবা ভাঙা মন সেখানে লেখা যায় না।
যদি এই নিবন্ধটি পড়ে কোনো মা রাতের খাবারের টেবিলে বসে সন্তানের ফলাফলের আগে তার মুখের ক্লান্তিটুকু পড়তে শেখেন; যদি কোনো বাবা বুঝতে পারেন, শাসনেরও একটি মেয়াদ আছে, এরপর দরকার আস্থা; যদি কোনো শিক্ষক উপলব্ধি করেন, পাঠ্যবই শেষ করাই শিক্ষা নয়, একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলাও শিক্ষারই অংশ; যদি কোনো নীতিনির্ধারক ভাবতে শুরু করেন, শিক্ষা সংস্কার মানে শুধু সিলেবাস বদলানো নয়, শিক্ষার দর্শনকেও নতুন করে লেখা; কিংবা যদি কোনো কিশোর বা তরুণ নিজের ভেতরে এই বিশ্বাসটুকু খুঁজে পায় যে স্বাধীনতা মানে নিয়ম ভাঙা নয়, বরং নিজের জীবনকে নিজেই সুন্দরভাবে পরিচালনা করার শক্তি অর্জন—তবে এই দীর্ঘ লেখার প্রতিটি শব্দ তার গন্তব্য খুঁজে পাবে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, একটি জাতির ভবিষ্যৎ পরীক্ষার ফলাফলে নির্ধারিত হয়। বাস্তবতা হয়তো আরও গভীর। একটি জাতির ভবিষ্যৎ লেখা হয় তার শ্রেণিকক্ষের পরিবেশে, তার পরিবারের কথোপকথনে, তার শিক্ষকের চোখের মমতায়, তার অভিভাবকের আস্থায়, তার তরুণের আত্মমর্যাদায় এবং তার স্বপ্ন দেখার সাহসে। পরীক্ষার খাতা কেবল কয়েকটি উত্তর সংরক্ষণ করে; কিন্তু একটি সমাজ তার ভবিষ্যৎ লিখে তার সন্তানের মনোজগতে।
তাই আজও প্রশ্নটি রয়ে যায়—আমরা কি কেবল আরও কিছু জিপিএ-৫ তৈরি করতে চাই, নাকি আরও কিছু সুস্থ, সাহসী, মানবিক এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ? কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতি শুধু মেধাবীদের কাঁধে নয়, মানুষদের কাঁধেই দাঁড়িয়ে বড় হয়।
আসুন, আমরা সন্তানদের খাঁচায় বন্দি পাখি বানিয়ে রাখার প্রতিযোগিতা বন্ধ করি, আবার তাদের হঠাৎ করে সীমাহীন আকাশেও ছুড়ে না দিই। বরং তাদের ডানায় এমন মূল্যবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা ও প্রজ্ঞার পালক জুড়ে দিই, যাতে তারা কুয়ো থেকে বিলে, বিল থেকে মহাসমুদ্রে, আর মহাসমুদ্র থেকে জীবনের অনন্ত আকাশে উড়ে গিয়েও পথ না হারায়। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন তার সবচেয়ে প্রান্তিক, সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে অবহেলিত সন্তানটিও বুক ভরে বলতে পারে—“আমি শুধু পরীক্ষার্থী নই; আমি একজন মানুষ, আর এই দেশেও আমার জন্য একটি সম্মানজনক জায়গা আছে।”
(চলবে...)
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#বাংলাদেশের_শিক্ষাব্যবস্থা #শিক্ষাসংস্কার #এইচএসসি২০২৬ #শিক্ষার্থীর_মনোবিজ্ঞান #কৈশোর #অভিভাবকত্ব #মানসিক_স্বাস্থ্য #ড্রপআউট_সংকট #শিক্ষানীতি #কুয়ো_বিল_মহাসমুদ্র #পরীক্ষা_ব্যাধি #IdentityFormation #StudentMentalHealth #EducationReform #Odhikarpatra #HigherEducation #StudentMentalHealth #IdentityFormation #EducationReform
#Odhikarpatra #অধিকারপত্র_শিক্ষা_সংস্কার_ধারাবাহিক