08/10/2026 বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জন্মদিন আজ: কৃষকের পেশিতে সভ্যতার শক্তি দেখেছিলেন যে শিল্পী
Special Correspondent
১০ August ২০২৬ ১৬:১০
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মদিন আজ। ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল শহরের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী বাংলা চিত্রকলায় কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও বাংলার প্রকৃতিকে এক অনন্য শিল্পভাষায় তুলে ধরেছেন। তাঁর ক্যানভাসে কৃষক কখনো কৃশকায় বা দুর্বল নয়; বরং মহাকায়, বলিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত। শ্রমজীবী মানুষের পেশিতে তিনি দেখেছিলেন একটি দেশ ও সভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শক্তি।
জন্মদিন উপলক্ষে নড়াইলে এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন, জেলা প্রশাসন, জেলা শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পবিত্র কোরআন খতম, শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি, দোয়া মাহফিল, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিশুদের আঁকা চিত্রকর্ম প্রদর্শনী, পুরস্কার বিতরণ ও আলোচনা সভা।
শৈশবেই প্রতিভার বিকাশ
এস এম সুলতানের শৈশবের নাম ছিল লাল মিয়া। বাবা মেছের আলী ছিলেন রাজমিস্ত্রি। বাবার নির্মাণকাজের নান্দনিকতা ও কারুকাজের মধ্য দিয়েই ছোটবেলায় তাঁর চিত্রকলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় নড়াইলের তৎকালীন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের নজরে আসেন লাল মিয়া। তাঁর সহযোগিতায় কলকাতায় গিয়ে খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও শিল্প-সমালোচক অধ্যাপক সায়েদ সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। পরে ১৯৪১ সালে বিশেষ ব্যবস্থায় অষ্টম শ্রেণি পাস অবস্থায় তিনি কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হন।
১৯৪৪ সালে কলেজের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে চতুর্থ বর্ষে উত্তীর্ণ হন সুলতান। তবে প্রথাগত শিল্পশিক্ষার গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখেননি তিনি। ছাত্রাবস্থাতেই কলেজ ছেড়ে কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চলে গিয়ে উপজাতীয় মানুষের জীবন ও জীবিকা নিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করেন। এরপর তাঁর জীবনে শুরু হয় দীর্ঘ ভ্রমণ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে তিনি ভ্রমণ করেন। এসব দেশে খ্যাতিমান শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। ১৯৪৬ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তাঁর শিল্পকর্ম ভারতের সিমলা, পাকিস্তানের লাহোর ও করাচি, নিউইয়র্ক, বোস্টন, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রদর্শিত হয়েছে।
মাটির টানে ফিরে এলেন নড়াইলে
দেশ-বিদেশ ঘুরে ১৯৫৫-৫৬ সালের দিকে সুলতান ফিরে আসেন নিজের মাটিতে। জন্মস্থান নড়াইলের মাছিমদিয়ায় নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন ফাইন আর্ট স্কুল ও শিশুদের জন্য ‘শিশুস্বর্গ’। শিশুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর। ১৯৮০ সালে নিজ বাড়িতে শিশুস্বর্গ নির্মাণের কাজ শুরু করেন তিনি। পরে ১৯৯২ সালে প্রায় ৯ থেকে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেন ৬০ ফুট দীর্ঘ ও ১৫ ফুট প্রশস্ত দ্বিতল নৌকা ‘ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ’। শিশুদের নিয়ে সেই নৌকায় চিত্রানদীতে ভ্রমণ করতেন এবং নৌকাতেই তাদের ছবি আঁকা শেখাতেন।
কৃষকই ছিলেন সুলতানের শিল্পদর্শনের কেন্দ্র
এস এম সুলতানের শিল্পকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলার সাধারণ মানুষ। কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, শ্রমজীবী মানুষ, মাঠ, নদী, হাওর-বাঁওড়, জঙ্গল ও সবুজ প্রান্তর তাঁর ক্যানভাসে বারবার ফিরে এসেছে। তবে কৃষককে তিনি প্রচলিত দুর্বল বা কৃশকায় অবয়বে আঁকেননি। তাঁর ক্যানভাসের কৃষক মহাকায় ও পেশিবহুল। এর মধ্য দিয়ে তিনি কৃষকের শ্রম, শক্তি এবং সমাজে তাঁর অবদানকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরেছেন।
সুলতানের নিজের ভাষায়, বাংলাদেশের কৃষক ও তাদের গবাদিপশু বাস্তবে অনেক সময় কৃশকায় হলেও তাঁর ছবিতে তাদের বলিষ্ঠ করে দেখানো ছিল তাঁর কল্পনা ও ভালোবাসার প্রকাশ। কারণ, যে কৃষক দেশের মানুষের অন্ন জোগায়, তার শরীর দুর্বল হওয়ার কথা নয় এই প্রশ্নই তাঁর শিল্পচিন্তার অন্যতম ভিত্তি।
তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, “ওরা এত রুগ্ন কেন, যারা আমাদের অন্ন জোগায়?”
এই প্রশ্নের মধ্যেই সুলতানের শিল্পদর্শনের গভীরতা ধরা পড়ে। তাঁর কাছে কৃষক শুধু একজন শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন না; কৃষক ছিলেন উৎপাদনের শক্তি, সভ্যতার ভিত্তি এবং মানুষের জীবন টিকিয়ে রাখার প্রধান কারিগর। সুলতান মনে করতেন, কৃষকের শরীরে যে শক্তি রয়েছে, তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে সমাজ ও সভ্যতা। তাঁর দৃষ্টিতে কৃষকের পেশি কেবল শারীরিক শক্তির প্রতীক নয়, এটি মাটি, শ্রম ও সৃষ্টির শক্তির প্রতীক। তাই তাঁর বিশালাকৃতির কৃষকেরা যেন ক্যানভাসের সীমা ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন ছুড়ে দেয় যারা পৃথিবীর মানুষের খাদ্য উৎপাদন করে, সমাজকে বাঁচিয়ে রাখে, তাদের জীবন কেন এত দুর্বল ও বঞ্চিত?
শিল্পের বাইরে অন্য এক সুলতান
চিত্রকলার পাশাপাশি এস এম সুলতানের জীবনযাপনও ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি বাঁশি বাজাতে পারতেন এবং প্রায়ই তাঁর হাতে বাঁশি দেখা যেত। পশু-পাখির প্রতিও তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসা। সাপ, ভল্লুক, বানর, খরগোশ, ষাঁড়সহ নানা প্রাণী তিনি পুষতেন। নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন এক ধরনের মিনি জ্যু। এমনকি হিংস্র প্রাণীকেও বশে আনার ক্ষমতা ছিল তাঁর। এই বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন তাঁর শিল্পীসত্তাকেও আলাদা মাত্রা দিয়েছিল। প্রকৃতি, মানুষ ও প্রাণীর প্রতি তাঁর গভীর টান তাঁর শিল্পকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
বাংলাদেশের শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এস এম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট এবং ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সম্মাননাতেও ভূষিত হন। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে নড়াইলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা। শিল্পীর জন্মভিটা ও শিশুস্বর্গও তাঁর জীবন ও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে আছে। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টে ভোগার পর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এস এম সুলতান। পরে নড়াইলে তাঁর নিজ বাড়ির আঙিনায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
আজও প্রাসঙ্গিক সুলতানের প্রশ্ন
এস এম সুলতান নেই, কিন্তু তাঁর ক্যানভাসের কৃষকেরা আজও জীবন্ত। তাঁদের বিশাল পেশি, দৃঢ় শরীর আর মাটির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার দৃশ্য আজও দর্শককে ভাবায়। সুলতানের কৃষক আসলে শুধু একটি চরিত্র নয় এটি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতীক। তাঁর তুলিতে কৃষকের শরীর হয়ে উঠেছে শ্রমের সৌন্দর্য, উৎপাদনের শক্তি এবং সভ্যতার ভিত্তির প্রতীক।
তাই তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন মহান চিত্রশিল্পীকে স্মরণ করা নয়; একই সঙ্গে স্মরণ করা বাংলার সেই মানুষকে, যার ঘাম ও শ্রমে দেশের অর্থনীতি, খাদ্য ও সভ্যতা টিকে থাকে। এস এম সুলতানের শিল্পদর্শনের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই তিনি ক্যানভাসে কৃষককে শুধু আঁকেননি, কৃষকের পেশির ভেতর দিয়ে একটি দেশের শক্তিকে দৃশ্যমান করে তুলেছিলেন।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র