09/17/2026 টিকটকের ঝাং ইমিং এশিয়ার শীর্ষ ধনী, পেছনে গৌতম আদানি
Special Correspondent
১৭ September ২০২৬ ১৬:৪৫
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
টিকটকের মূল প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা ঝাং ইমিং এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে উঠে এসেছেন। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্সের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ৪৩ বছর বয়সী এই চীনা প্রযুক্তি উদ্যোক্তার সম্পদের পরিমাণ ১০৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর মাধ্যমে তিনি ভারতীয় শিল্পপতি গৌতম আদানিকে পেছনে ফেলেছেন।
১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসেই ঝাং ইমিংয়ের সম্পদ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে। বাইটড্যান্সের মূল্যায়ন নিয়ে ব্ল্যাকরক, ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টস এবং টি. রো প্রাইসের মতো বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য ব্লুমবার্গের হিসাবেও প্রভাব ফেলেছে।
২০১৯ সালের পর সম্পদ বেড়েছে আট গুণেরও বেশি
ঝাং ইমিংয়ের সম্পদের উত্থান গত কয়েক বছরে কতটা দ্রুত হয়েছে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় ব্লুমবার্গের পুরোনো হিসাব থেকে। ২০১৯ সালের মার্চে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার হিসেবে ধরা হয়েছিল। বর্তমানে তা ১০৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে—অর্থাৎ সাত বছরে সম্পদ আট গুণেরও বেশি বেড়েছে।
এই উত্থানের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বাইটড্যান্সের বৈশ্বিক ব্যবসা, বিশেষ করে টিকটকের জনপ্রিয়তা এবং সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে কোম্পানিটির বড় ধরনের সম্প্রসারণ।
টিকটক থেকে এআই—বাইটড্যান্সের নতুন দিগন্ত
বাইটড্যান্স বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিত টিকটকের জন্য। স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্ল্যাটফর্মটি বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী তৈরি করার পাশাপাশি কোম্পানিটির জন্য বড় একটি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে বাইটড্যান্স এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায় নির্ভর করছে না। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে দ্রুত বিনিয়োগ ও পণ্য উন্নয়ন করছে।
এর মধ্যে রয়েছে Doubao এআই চ্যাটবট এবং Seedance ভিডিও তৈরির প্রযুক্তি। এআইকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে বাইটড্যান্স।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বাইটড্যান্সের বিশাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ডেটা এআই মডেল উন্নয়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সুবিধা দিতে পারে। তবে চীনের এআই বাজারে প্রতিযোগিতা দ্রুত বাড়ছে, ফলে এই খাতেও কোম্পানিটিকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
গৌতম আদানির সম্পদ কমেছে
অন্যদিকে, ভারতের শিল্পপতি গৌতম আদানির সম্পদ সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। পরে শেয়ারবাজারের ওঠানামা, MSCI সূচকের পরিবর্তন এবং তেলের দাম ও বন্ড ইল্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বাজারের চাপের কারণে তার সম্পদ কমে আসে।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ঝাং ইমিংয়ের সম্পদ আদানির চেয়ে কিছুটা বেশি। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঝাংয়ের সম্পদ প্রায় ১০৫.৫ বিলিয়ন এবং আদানির সম্পদ প্রায় ১০৪.৮ বিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ব্যবধান খুব বেশি নয় এবং বিলিয়নিয়ারদের সম্পদের হিসাব বাজার ও কোম্পানির মূল্যায়নের সঙ্গে নিয়মিত পরিবর্তিত হতে পারে।
ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানি হওয়ায় হিসাবেও পার্থক্য
ঝাং ইমিংয়ের সম্পদের হিসাবের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাইটড্যান্স এখনো একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ফলে কোম্পানিটির মূল্যায়ন সরাসরি শেয়ারবাজারে প্রতিদিন নির্ধারিত হয় না। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্স বাইটড্যান্সের মূল্যায়ন হিসাব করার সময় ১০ শতাংশ ঝুঁকি-ছাড় বা রিস্ক ডিসকাউন্ট ব্যবহার করে। এ কারণে বিভিন্ন সম্পদ তালিকায় ঝাং ইমিংয়ের সম্পদের পরিমাণ এক নাও হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, একই সময়ে অন্য একটি সম্পদ তালিকায় ঝাংয়ের সম্পদ ব্লুমবার্গের হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখানো হয়েছে। এর মূল কারণ ব্যক্তিমালিকানাধীন বাইটড্যান্সের মূল্যায়ন পদ্ধতির পার্থক্য।
যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও এআই বিনিয়োগ
ঝাং ইমিংয়ের নতুন উত্থান আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ গত কয়েক বছর ধরে টিকটক যুক্তরাষ্ট্রে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রক ও ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে ছিল।চলতি বছর বাইটড্যান্স টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমের কিছু অংশ মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তর করেছে। এর ফলে টিকটককে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা সামলানোর পাশাপাশি বাইটড্যান্স তার বৃহত্তর প্রযুক্তি ও এআই ব্যবসার দিকে আরও মনোযোগ দিতে পেরেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এশিয়ার ধনীদের তালিকায় প্রযুক্তির প্রভাব
ঝাং ইমিংয়ের এশিয়ার শীর্ষ ধনী হয়ে ওঠা শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের পরিবর্তন নয়; এটি এশিয়ার অর্থনীতিতে প্রযুক্তি ও এআই খাতের বাড়তে থাকা প্রভাবেরও একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ার বড় সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তৈরি হয়েছে জ্বালানি, অবকাঠামো, শিল্প, খুচরা ব্যবসা ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খাত থেকে। আদানির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যও জ্বালানি, অবকাঠামো ও বিভিন্ন শিল্পখাতে বিস্তৃত।
অন্যদিকে ঝাং ইমিংয়ের সম্পদের মূল উৎস একটি প্রযুক্তি কোম্পানি, যার ব্যবসা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে এখন এআই পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। ব্লুমবার্গের তালিকায় ঝাংয়ের উত্থান তাই এশিয়ার শীর্ষ ধনীদের সম্পদের উৎসে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বও তুলে ধরছে।
ঝাং ইমিং কে?
ঝাং ইমিং বাইটড্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা এবং টিকটকের মূল প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। বাইটড্যান্সের বৈশ্বিক সাফল্যের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ টিকটক হলেও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বর্তমানে আরও বিস্তৃত।
২০২১ সালে ঝাং বাইটড্যান্সের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপরও কোম্পানিটির মালিকানা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে তার সম্পদে বাইটড্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চীনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে তিনি আগেই পরিচিত ছিলেন। এবার এশিয়ার শীর্ষ ধনী হওয়ার মাধ্যমে তার সম্পদের উত্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সামনে কী?
বাইটড্যান্সের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো—এআই ব্যবসা কতটা দ্রুত কোম্পানির আয়ের নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারে। Doubao ও Seedance-এর মতো পণ্যের বিস্তার কোম্পানিটির প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে চীনের এআই বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র এবং টিকটককে ঘিরে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে ঝাং ইমিংয়ের সম্পদের বর্তমান অবস্থান ভবিষ্যতেও একই থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে বাইটড্যান্সের মূল্যায়ন, প্রযুক্তি ব্যবসার অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির ওপর।
এই মুহূর্তে অবশ্য ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্সের হিসাবে ঝাং ইমিংয়ের সম্পদ ১০৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠে তাকে এশিয়ার শীর্ষ ধনী ব্যক্তির অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র