10/20/2026 ফ্রান্সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সহিংসতা, গ্রেপ্তার ২ হাজার ৪০০
odhikarpatra
১৯ October ২০২৬ ১৯:১৫
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | অধিকারপত্র ডটকম
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট, গাড়িতে আগুন এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত শহরগুলোতে স্থানীয়ভাবে কারফিউ জারির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশজুড়ে অন্তত ৩ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ
বিক্ষোভে উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠন, ইউনিয়নকর্মী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ অংশ নেন। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ঘাটতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি ছিল, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। রাজধানী প্যারিসে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে যোগ দেন বলে বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়।
শুরুতে অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু এলাকায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মুখোশধারী কয়েকটি দল দোকানপাট ভাঙচুর, লুটপাট এবং পুলিশের দিকে বোতল ও অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপ করে। বিভিন্ন স্থানে গাড়ি ও স্থাপনায় আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
সরকারি স্থাপনায় আগুন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
বিক্ষোভের সময় লিমোজ শহরের ১৯ শতকের সিটি হলের ভেতরে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। মার্সেইয়ে সিটি হল এলাকায় অনুপ্রবেশ ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া যায়। লিয়ঁ শহরেও পর্যটন কার্যালয়ে আগুন এবং বিভিন্ন দোকানপাটে ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলো। এসব ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেছেন, সহিংসতা দমনে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতে সীমিত পরিসরে ও নির্দিষ্ট এলাকায় কারফিউ জারির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে সমালোচনার মুখে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তাঁর পদত্যাগ গ্রহণ করেননি।
ম্যাক্রোঁর হুঁশিয়ারি, পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। সরকার বলছে, বিক্ষোভের নামে সহিংসতা ও সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের সুযোগ দেওয়া হবে না।
তবে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে বহু পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্র ও বলপ্রয়োগের মাত্রা নিয়ে তদন্ত এবং জবাবদিহির দাবিও উঠেছে।
আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা
শিক্ষার্থীদের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন শিক্ষা খাতের সংকটের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি সেবার মান এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর অসন্তোষের প্রকাশ হয়ে উঠেছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোও আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্সের অন্যতম বড় শ্রমিক সংগঠন সিজিটি ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে নতুন ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার কথা জানিয়েছে বলে বিবিসির লাইভ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, সহিংসতা বন্ধ করে জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা এবং বিক্ষোভকারীদের অভিযোগের জবাব দেওয়া—দুই চাপের মুখে রয়েছে ফরাসি সরকার। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ, আন্দোলনকারীদের পরবর্তী কর্মসূচি এবং সরকারের আলোচনার উদ্যোগের ওপর।
সূত্র: বিবিসি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), রয়টার্স এবং লে মোঁদ।