অধিকারপত্র ডটকম অনলাইন ডেক্স।অধিকারপত্র ডেস্ক:বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের একটি অংশ ছোট বয়সেই নিজের অর্থ উপার্জন করছে। কেউ লেমনেড বিক্রি করছে, কেউ অনলাইনে পণ্য কেনাবেচা করছে, আবার কেউ ভাতা, ঘরের কাজ কিংবা ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে অর্থ আয় করছে। ফলে সন্তানদের অর্থ ব্যবস্থাপনা, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ শেখানোর বিষয়টি অভিভাবকদের কাছেও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের বড় একটি অংশের নিজস্ব অর্থ রয়েছে। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্সের (PwC) এক জরিপ অনুযায়ী, এ বয়সী শিশুদের ৮৬ শতাংশের নিজের অর্থ রয়েছে। তাদের ৯৭ শতাংশ অন্তত কিছু ক্ষেত্রে নিজেরাই অর্থ খরচের সিদ্ধান্ত নেয়।
জরিপে ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১ হাজার ৪ শিশুকে এবং একই বয়সী শিশুদের ১ হাজার ৯ জন অভিভাবককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। জরিপটি ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত হয়।
PwC-এর ভোক্তা বাজারবিষয়ক নেতা আলি ফারম্যান বলেন, জেন আলফার শিশুরা পুনর্বিক্রয় বা ‘রিসেল’ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তারা অনলাইন নিলামে অংশ নিচ্ছে, পণ্য কিনে আবার বিক্রি করছে এবং এভাবে অর্থ উপার্জন করছে। অন্যদিকে কেউ কেউ ভাতা, ঘরের কাজ কিংবা বিভিন্ন ছোটখাটো কাজের বিনিময়ে অর্থ পাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর ডিজিটাল ওয়ালেটে হাজার হাজার ডলার থাকার বিষয়টি জানতে পেরে তার বাবা অবাক হয়েছিলেন। ওই কিশোরী লেমনেড বিক্রি করে এক শনিবারেই ৪০০ থেকে ৫০০ ডলার পর্যন্ত আয় করত। অথচ অন্যদিকে কফি কিনতে বাবার কাছে ১০ ডলার চাইত।
ছোট বয়সেই অর্থ ব্যবস্থাপনার শিক্ষা
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা শুধু অর্থ আয় করছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; তারা সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের উচিত ছোট বয়স থেকেই সন্তানদের অর্থের মূল্য, সঞ্চয়, ব্যয় এবং বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য বোঝানো।
অ্যাকর্নসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নোয়াহ কার্নার বলেন, অর্থ ব্যবস্থাপনার মূল বিষয় হলো বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। বেশি অর্থ খরচ করলে সঞ্চয়ের পরিমাণ কমবে, আবার বেশি সঞ্চয় করলে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ বৃদ্ধির সুযোগ কমতে পারে—শিশুদের এসব বিষয় ধীরে ধীরে বোঝানো দরকার।
শিশুদের আর্থিক শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের নিজেদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক পরিকল্পনাবিদ ব্রিটনি কাস্ত্রোর মতে, শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেই অর্থ সম্পর্কে অনেক কিছু শেখে। তাই অভিভাবকদের নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ নিয়ে কথাবার্তার ধরন সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
শিশুদের জন্য কী ধরনের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ব্যবস্থা রয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য অর্থ জমা ও বিনিয়োগের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যৌথ সঞ্চয়ী হিসাব, উচ্চ সুদের সঞ্চয়ী হিসাব, ৫২৯ সেভিংস প্ল্যান, ৫৩০এ বা ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট’, কাস্টডিয়াল ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্ট এবং কাস্টডিয়াল আইআরএ বা রথ আইআরএ।
শিক্ষার খরচের জন্য ৫২৯ সেভিংস প্ল্যান ব্যবহার করা যায়। যোগ্য শিক্ষাগত ব্যয়ে অর্থ ব্যবহার করলে এতে কর-সুবিধা পাওয়া যায়। প্রাপ্তবয়স্ককে অ্যাকাউন্টটি খুলে পরিচালনা করতে হলেও শিশু নিজের অর্থ এতে জমা দিতে পারে।
অন্যদিকে নতুন ৫৩০এ বা ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আরেকটি ব্যবস্থা। ২০২৬ ও ২০২৭ সালে এসব অ্যাকাউন্টে বছরে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ জমা দেওয়া যেতে পারে। সাধারণভাবে শিশুর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নেই।
শিশুর অর্থ বিনিয়োগের জন্য UTMA ও UGMA ধরনের কাস্টডিয়াল ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্টও রয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টে স্টক, মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ডে বিনিয়োগ করা যায়। তবে নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছালে—রাজ্যভেদে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে—শিশুই অ্যাকাউন্টটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পায়।
আয় করা শিশুদের জন্য অবসরকালীন অ্যাকাউন্ট
যেসব শিশু বাস্তবে আয় করে, তাদের জন্য অভিভাবকরা কাস্টডিয়াল IRA অথবা Roth IRA খুলে দিতে পারেন। ২০২৬ সালে নিয়মিত সর্বোচ্চ অবদান সীমা ৭ হাজার ৫০০ ডলার হলেও সন্তানের প্রকৃত বার্ষিক আয় এর চেয়ে কম হলে সেই কম পরিমাণ পর্যন্তই অবদান রাখা যাবে।
এ ছাড়া কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিশোরদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ অ্যাকাউন্টও পরিচালনা করছে। এসব অ্যাকাউন্টে অভিভাবক অ্যাকাউন্ট খুলে দিলেও কিশোররা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নিজেরাই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
লক্ষ্য অনুযায়ী অ্যাকাউন্ট বেছে নেওয়া জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি পরিবারের জন্য একই ধরনের সঞ্চয় বা বিনিয়োগ ব্যবস্থা উপযুক্ত নয়। সন্তানের বয়স, আয়, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য এবং অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
শিশুদের বিনিয়োগ শেখানোর ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে শুরু করাই মূল বিষয় নয়। বরং অল্প বয়স থেকে নিয়মিত সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অভ্যাস তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ। এতে তারা সময়ের সঙ্গে চক্রবৃদ্ধি হারের সুবিধা বুঝতে এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে শিখতে পারে।
অর্থাৎ, শিশুদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি সেই অর্থের দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানোই হতে পারে তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি।
