আন্তর্জাতিক ডেস্ক | অধিকার পত্র ডটকম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কাতারের রাজধানী দোহায় টানা তৃতীয় দিনের মতো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন ইরানের প্রতিনিধিরা। কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান এই কূটনৈতিক তৎপরতায় যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
রোববার (১ নভেম্বর) আলোচনার বিষয়ে অবগত এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ সমন্বয় রেখেই কাতার এই আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, কাতারের সঙ্গে চলমান আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তেহরান কূটনীতি ও আত্মরক্ষা—উভয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলতে প্রস্তাব
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচির বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, সম্ভাব্য সমঝোতা হলে দুই দিনের মধ্যে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে ইরান ও কাতারের আলোচকরা।
তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই দিনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের বড় একটি অংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ বা সীমিত থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের পর হামলার আশঙ্কা
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে নির্বাচনের পর সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি নাকচ করেননি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষ যোগাযোগ চলছে। তাঁর ভাষায়, আলোচনা কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
রুবিও আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কূটনৈতিকভাবে সংকট সমাধান করতে চান। তবে প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক প্রস্তুতির নির্দেশ
কূটনৈতিক আলোচনা চললেও ইরান সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে যেকোনো হামলার জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
তাঁর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেকোনো ধরনের হুমকির তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দিতে হবে। পারস্য উপসাগরীয় উপকূল, হরমুজ প্রণালি, ওমান উপসাগর এবং দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতির বিষয়েও তিনি উল্লেখ করেছেন।
এরপর ইরানের সামরিক বাহিনীও নিজেদের প্রস্তুতি জোরদারের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
কাতারের সাত দিনের প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নয় তেহরান
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা প্রায় এক সপ্তাহ আগে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আস্থা তৈরির জন্য সাত দিনের একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৃহত্তর শান্তি আলোচনার আগে দুই পক্ষ প্রতিদিন কিছু আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ নেবে।
তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান ওই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট হয়নি।
অন্যদিকে ইরানও গত সেপ্টেম্বর থেকে নিজস্ব সাত দিনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করে আসছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরান-সমর্থিত নৌপথ অনুমোদনের দাবি জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপের পর প্রণালিটি পুনরায় চালুর কথা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে ইরানের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ইরানের প্রভাবশালী নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই জানিয়েছেন, সংঘাত আবার শুরু হলে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে তেহরানে আলোচনা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দাবি মেনে না নিলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়।
এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা রেজাইকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিটিকে আলোচনার পথ পুনরায় চালুর একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ট্রাম্প বলেছেন, চিঠির বিষয়ে তাঁর অনুমোদন মূলত ইরানে চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশের সুযোগ নিয়ে আলোচনার জন্য ছিল।
কূটনীতি নাকি নতুন সংঘাত?
দোহায় আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। একদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি চালুর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে উভয় পক্ষের সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টা হামলার হুমকি অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষ করে ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ওয়াশিংটনের অবস্থান কী হয়, তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
এ মুহূর্তে কোনো যুদ্ধবিরতি বা চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দোহায় চলমান আলোচনা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে দুই পক্ষের শর্ত, হরমুজ প্রণালি এবং সামরিক উত্তেজনা প্রশমনের বিষয়ে সমঝোতার ওপর।
