11/07/2026 সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: নবদম্পতির দাবি ভিত্তিহীন, জবাবদিহি চায় বাংলাদেশ
odhikarpatra
২০ October ২০২৬ ২৩:৫০
সম্পাদকীয় | অধিকারপত্র ডটকম :
সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর দেশে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কিন্তু ঘটনাটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা বর্ণনার সবকিছু সত্য নয়। কোথাও তাঁদের নবদম্পতি বলা হচ্ছে, কোথাও দাবি করা হচ্ছে—হানিমুনে ওমরাহ করতে গিয়ে স্ত্রীকে চুমু দেওয়ার কারণে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। অথচ এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং একজনের পরিবার তাঁদের স্বামী-স্ত্রী হওয়ার দাবিই নাকচ করেছে।
এখানে আবেগের চেয়ে সত্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ বিষয়টি শুধু দুটি প্রাণ হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় কনস্যুলার সেবার কার্যকারিতা।
কী ঘটেছিল: নিশ্চিত তথ্য কী বলছে?
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাছির ও সিতি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড ১৪ অক্টোবর ২০২৬ মক্কা অঞ্চলে কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালত তাজিরের আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেন; পরে রায় চূড়ান্ত হয় এবং তা কার্যকরের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে প্রকাশিত বিবৃতিতে কথিত কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি
সৌদি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত গল্প এক নয়।
কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে ‘চুমু দেওয়ার’ কথা নির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি। তাই শুধু চুম্বনের কারণে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে—এমন দাবি তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হবে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিহত নজরুল ইসলামের মা রহিমা বেগম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে অবিবাহিত ছিলেন এবং সিতি আক্তারকে তাঁদের পরিবার চিনত না। তাঁর অভিযোগ, ছেলে পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা পাননি। এগুলো পরিবারের বক্তব্য; স্বাধীনভাবে যাচাই করা আদালতের নথি নয়। তবু এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘নবদম্পতি’ বর্ণনাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সৌদি আরবের কাছে প্রশ্ন: বিচারপ্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য কোথায়?
সৌদি আরব একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সে দেশের আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে বিদেশি নাগরিকদেরও সে দেশের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের অধিকার থাকলেই বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না—এমন নয়।
এ ঘটনায় এখনো জনসমক্ষে আসেনি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়, অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ, প্রমাণের প্রকৃতি, অভিযুক্তদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন কি না, তাঁরা আরবি ভাষায় বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে পেরেছিলেন কি না এবং আপিলের সুযোগ কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা কঠিন। *দ্য ডেইলি স্টার*–এর সম্পাদকীয়তেও এসব তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
আমাদের বক্তব্য, সৌদি কর্তৃপক্ষের উচিত মামলার আইনগত ভিত্তি ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশের সরকারকে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া। অভিযোগ গুরুতর হলে তার প্রমাণ ও বিচারপ্রক্রিয়াও যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের দূতাবাসের দায়িত্ব কোথায়?
এ ঘটনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বাংলাদেশের কনস্যুলার সেবা নিয়ে। *দ্য ডেইলি স্টার*–এর ১৭ অক্টোবরের সম্পাদকীয় অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের খবর প্রকাশের পর জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় ও ঘটনার তথ্য নিশ্চিত করার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে যোগাযোগ করেছিল; সে সময় চাওয়া তথ্যের উত্তর পাওয়া যায়নি বলে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, নজরুলের পরিবার অভিযোগ করেছে, সৌদিতে বাংলাদেশের দূতাবাস তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। পরিবারটি বলেছে, নজরুল কারাগারে ছিলেন—এ কথা জানার পরও তাঁরা কীভাবে সহায়তা চাইবেন, তা বুঝতে পারেননি। এটি পরিবারের বক্তব্য; দূতাবাসের সম্পূর্ণ যোগাযোগ-রেকর্ড না দেখে একে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অবহেলা বলা যাবে না।
তবে প্রশ্নগুলো যথার্থ: দূতাবাস কখন নজরুল ও সিতির আটক থাকার খবর পেয়েছিল? তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল কি? তাঁদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি? সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ করা হয়েছিল? মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে আগাম কোনো তথ্য পাওয়া গিয়েছিল কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ করা প্রয়োজন। দায়িত্বে অবহেলা হয়ে থাকলে তা তদন্ত করতে হবে; আর দূতাবাস যথাসাধ্য পদক্ষেপ নিয়ে থাকলে সেই তথ্যও জনগণকে জানাতে হবে। জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি দাবি করা নাগরিকের অধিকার।
কনস্যুলার অধিকার শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়
বিদেশে আটক কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রে দূতাবাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদে আটক বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগের বিষয়টি রয়েছে। ৩৭ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুর ক্ষেত্রে কনস্যুলেটকে অবহিত করার বিধানও রয়েছে। এ বিষয়ে *দ্য ডেইলি স্টার*–এর সম্পাদকীয়তে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রাসঙ্গিক বিধান তুলে ধরা হয়েছে।
তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চাওয়া—কবে তাঁদের আটক করা হয়েছিল, কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, কী প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেওয়া হয়েছিল, আইনি সহায়তা ও অনুবাদের ব্যবস্থা ছিল কি না এবং কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।
পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা অথবা দাফনের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া এবং শোকাহত পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় পবিত্রতা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এক বিষয় নয়
মক্কা ও মদিনা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্থান। সেই শ্রদ্ধার সঙ্গে সৌদি আরবের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা সাংঘর্ষিক নয়। কোনো রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা মানেই ধর্মীয় স্থানকে অসম্মান করা নয়।
একইভাবে, ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে অযাচাইকৃত অভিযোগ ছড়ানোও গ্রহণযোগ্য নয়। ‘মক্কায় গেলেই জান্নাত নিশ্চিত নয়’—এ ধরনের আবেগনির্ভর বক্তব্যের চেয়ে বেশি জরুরি হলো, নির্দিষ্ট ঘটনায় কী ঘটেছে, কোন আইন প্রয়োগ করা হয়েছে এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের অধিকার রক্ষিত হয়েছিল কি না—তার উত্তর খোঁজা।
ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও মানবিক দায়িত্বকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। বরং সত্য, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে দায়িত্বশীল অবস্থানই গুরুত্বপূর্ণ।
গুজব নয়, সত্য চাই; প্রতিশোধ নয়, জবাবদিহি চাই
বাংলাদেশি দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সত্য। কিন্তু তাঁরা নবদম্পতি ছিলেন, হানিমুনে ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন কিংবা কেবল চুমু দেওয়ার কারণে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন—এসব দাবি প্রমাণিত নয়। নজরুলের পরিবারও তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কের দাবি অস্বীকার করেছে।
সুতরাং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অপ্রমাণিত অভিযোগ ছড়ানো বা কোনো বাংলাদেশি কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণের আহ্বান জানানো সমাধান নয়। দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তদন্ত, তথ্য প্রকাশ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক জবাবদিহির পথেই এগোতে হবে।
আমরা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা চাই। বাংলাদেশের সরকারের কাছে চাই কার্যকর কনস্যুলার পদক্ষেপ, নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত দাবি যাচাই না করে সত্য হিসেবে ছড়িয়ে না দেওয়ার দায়িত্বও সবার।
মানুষের জীবন নিয়ে কোনো গুজব নয়। মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর বিষয়ে কোনো অন্ধ অনুমান নয়। আমরা চাই সত্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি—যাতে নিহতদের পরিবার অন্তত জানতে পারে, তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং রাষ্ট্র তাঁদের অধিকার রক্ষায় কী করেছে।
**— সম্পাদকীয় বিভাগ, অধিকার পত্র ডটকম**
সম্পাদক ও প্রকাশ
মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান
অধিকারপত্র ডটকম।