odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 9th February 2026, ৯th February ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতির দাবার চাল আর সাধারণের হাহাকার: মুদ্রাস্ফীতির করাল গ্রাসে আমাদের অস্তিত্ব—পণ্যের অগ্নিমূল্য বনাম ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ — মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ও আগামীর সংকট

দিব্যমূল্যের দহন: বিশ্ব রাজনীতির দাবার চাল ও আমাদের অস্তিত্বের লড়াই

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৯ February ২০২৬ ০১:৩৫

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৯ February ২০২৬ ০১:৩৫

বিশেষ সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ

"বিশ্ব রাজনীতির জটিল দাবার চালে কীভাবে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন? ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট এবং সোনার আকাশচুম্বী দাম—দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে থাকা নেপথ্য কারণ এবং আমাদের লাভ-ক্ষতির এক গভীর সাহিত্যিক বিশ্লেষণ। জানুন কীভাবে বিশ্বায়ন আমাদের রান্নাঘর থেকে বিয়ের আসর পর্যন্ত সবকিছুকে বদলে দিচ্ছে।"

শহরের এক কোণে ঝাপসা হয়ে আসা নিয়ন আলোর নিচে দাঁড়িয়ে ষাটোর্ধ্ব রহমত আলী যখন বাজারের থলেটা হাতে ঝোলান, তখন তার মনে হয় থলেটা যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি হালকা, অথচ বুকটা বড্ড ভারী। এই যে ভারী হয়ে ওঠা বুকের ভেতরকার দীর্ঘশ্বাস, এটাই আজকের বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় ‘বাই-প্রোডাক্ট’ বা উপজাত। আমরা যখন খবরের কাগজে বড় বড় হরফে পড়ি ‘জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে’ কিংবা ‘ডলারের বিপরীতে টাকার মান পড়েছে’, তখন সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের চুলা থেকে উৎসবের আনন্দ—সবকিছুই এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে যায়। আজকের পৃথিবীটা যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, যেখানে ইউক্রেনের গমের খেতে আগুনের ফুলকি লাগলে তার তাপ এসে লাগে ঢাকার কারওয়ান বাজারের ভাতের হাঁড়িতে। এই সংযোগটা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি নির্মম। দ্রব্যমূল্য এখন আর কেবল বাজারের কোনো সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব নয়, এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অলৌকিক বা ‘দিব্যমূল্য’, যা সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য যেন কোনো এক অদৃশ্য অশরীরী শক্তির ইশারায় প্রতি মুহূর্তে লাফিয়ে ওপরে উঠছে।

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যখন পরাশক্তিরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নেশায় মত্ত থাকে, তখন ছোট ছোট দেশগুলোর সাধারণ মানুষ সেই প্রমত্ত হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়া দূর্বাঘাসের মতো হয়ে পড়ে। দাবার বোর্ডে যেমন প্রতিটি চালের পেছনে থাকে সুদূরপ্রসারী কোনো নীল নকশা, তেমনি ভূ-রাজনীতিতে প্রতিটি যুদ্ধের হুঙ্কার বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার পেছনে লুকিয়ে থাকে কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য। কৃষ্ণসাগর দিয়ে যখন শস্যবাহী জাহাজগুলো চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তখন পৃথিবীর অপর প্রান্তের কোনো এক নিম্নবিত্ত বাবার কপালে ভাঁজ পড়ে, কারণ তিনি জানেন কাল সকালে তার সন্তানের দুধের প্যাকেটটা কিনতে তাকে আরও দশটা টাকা বেশি গুনতে হবে। এই যে এক অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্য অঞ্চলের মানুষের থালায় টান ফেলে, এটাই বিংশ শতাব্দী পরবর্তী গ্লোবালাইজেশনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। মুনাফালোভী কর্পোরেট দুনিয়া আর ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ শাসকরা যখন তাদের চাল চেলে যান, তখন মাঝখান থেকে ফতুর হয়ে যায় সেই মধ্যবিত্ত সমাজ, যারা না পারে হাত পেতে সাহায্য চাইতে, না পারে নিজেদের হাহাকার কাউকে বোঝাতে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই অস্থিরতা আবার নতুন এক মাত্রা পায় ‘অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট’ নামক এক মরীচিকার কারণে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব পড়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলে সেই সুফল সাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে মাস পেরিয়ে যায়—কখনও বা পৌঁছায়ই না। এই যে একদল মানুষের লোভ যখন বাজার ব্যবস্থাকে জিম্মি করে ফেলে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে জীবনটা কেবল টিকে থাকার এক অসম লড়াইয়ে পরিণত হয়। বাজারের অলিগলিতে ঘুরলে দেখা যায়, মানুষের চোখে এখন আর কেনাকাটার আনন্দ নেই, আছে কেবল হিসেব মেলানোর এক ক্লান্তি। যে সবজি একসময় ডাল-ভাতের সঙ্গী ছিল, তা এখন মহার্ঘ্য অলঙ্কার। মাছের বাজার বা মাংসের দোকানগুলো এখন অনেকের কাছে কেবলই দূর থেকে দেখার প্রদর্শনী। এই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের কেবল পকেট কাটছে না, কাটছে তাদের আত্মসম্মান আর পুষ্টির নিরাপত্তা। একসময়ের ‘দিব্য’ বা সুন্দর জীবনযাত্রা এখন কেবল বেঁচে থাকার এক নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতায় পর্যবসিত হয়েছে।

এরই মাঝে যে সোনা একসময় বাঙালির বিবাহ-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, জীবনের প্রতিটি শুভ লগ্নে যা ছিল আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের স্মারক, আজ কোনো এক অজানা ইশারায় তা সাধারণের কাছে এক পরিত্যক্ত স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সোনার দাম এখন আর কেবল বাড়ছে না, বরং তা যেন প্রতিটি ভোরে একেকটি নতুন উচ্চতাকে স্পর্শ করার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। অথচ বিচিত্র এক বৈপরীত্য দেখা যায় আমাদের এই সমাজে—দামের গ্রাফ যত ওপরের দিকে ছুটছে, এক শ্রেণির মানুষের কেনার আগ্রহ যেন ততই বাড়ছে। মুদ্রাস্ফীতির এই ঘোড়দৌড়ে যারা বিত্তের পাহাড় গড়েছেন, তাদের কাছে সোনা হয়তো কেবলই সম্পদ জমানোর মাধ্যম; আর তাদের সেই প্রতিযোগিতার আগুনেই পুড়ে ছাই হচ্ছে সাধারণের স্বপ্ন। যারা কিনছে তারা কিনছেই, তাদের সেই আকাশচুম্বী চাহিদার কারণেই দামের পারদ নামছে না। কিন্তু এই মরুময় মূলকে সোনা আজ বড্ড অচেনা, বড্ড বিজাতীয়। মধ্যবিত্তের বিয়ের আসরে এখন সোনার গহনার সেই চিরায়ত ঔজ্জ্বল্যের জায়গা দখল করে নিচ্ছে কৃত্রিম পাথর বা ইমিটেশন, আর আড়ালে রয়ে যাচ্ছে এক রাশ দীর্ঘশ্বাস—সোনার হরিণ ধরার সাধ্য নেই যাদের, তাদের কাছে এই ধাতব হলুদ আভা এখন শুধুই দীর্ঘ প্রতীক্ষার দীর্ঘচ্ছায়া।

এই দ্রব্যমূল্যের মহাযজ্ঞে সোনা বা চাল-ডালের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় অদৃশ্য ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের জীবনযাপনের যান্ত্রিক উপাদানগুলো। বিশ্ব রাজনীতির যে দাবার চাল নিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম, তার সবচেয়ে জটিল কিস্তিমাতটি ঘটেছে তথ্যপ্রযুক্তির অন্দরমহলে। যে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ একসময় বিলাসিতা ছিল, আজ তা বেঁচে থাকার অপরিহার্য অনুষঙ্গ—অথচ তার দামও এখন সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সিলিকন ভ্যালি থেকে তাইওয়ানের চিপ কারখানা পর্যন্ত যে অস্থিরতা বিরাজমান, তার মূল্য চুকাতে হচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়ের কোনো এক শিক্ষার্থীকে, যার পড়াশোনার জন্য একটি যন্ত্র কেনা এখন দুঃসাধ্য সাধনা। মুদ্রাস্ফীতির এই রাহুগ্রাস কেবল পাকস্থলীতে টান দিচ্ছে না, তা কেড়ে নিচ্ছে আগামীর মেধা আর স্বপ্নের রসদও। বাজারের প্রতিটি কোণ থেকে ভেসে আসা হাহাকার যেন এক ঐক্যতান তৈরি করেছে, যেখানে মানুষ কেবল কেনা-বেচার হিসেব মেলাতে গিয়ে ভুলে যাচ্ছে প্রাণের স্বাভাবিক ছন্দ।

তবে কি এই আঁধার কাটবে না? দাবার বোর্ডে যেমন শেষ চাল বলে কিছু নেই, রাজনীতির মাঠেও তেমনি পরিবর্তনের হাওয়া সবসময় বইতে থাকে। মানুষ যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন তারা ঐক্যবদ্ধ হতে শেখে। আজকের এই ‘অগ্নিমূল্যের’ দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আত্মনির্ভরশীলতা আর নৈতিকতার জাগরণ। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের যেমন বাজার তদারকিতে কঠোর হতে হবে, তেমনি আমাদেরও হতে হবে মিতব্যয়ী। বিশ্ব রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত থেকে নিজেকে বাঁচাতে হলে মাটির কাছাকাছি ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কৃষকের ঘাম আর প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয়ই পারে আমাদের থালাকে আবার পূর্ণ করতে। যেদিন বাজারের থলে হাতে নিয়ে রহমত আলীদের আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে না, যেদিন ‘দিব্যমূল্য’ শব্দটি তার অলৌকিক দাপট হারিয়ে আবার মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফিরে আসবে, সেদিনই হয়তো আমরা বলতে পারব যে আমরা কেবল টিকে নেই, আমরা আসলে বেঁচে আছি। এই প্রত্যাশাটুকুই আজ আমাদের আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পাথেয়।

✍️ অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা্ সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#দ্রব্যমূল্য #মুদ্রাস্ফীতি #বিশ্বরাজনীতি #মধ্যবিত্তেরহাহাকার #অর্থনীতি২০২৬ #বাজারদর #ভূরাজনীতি #সোনারদাম #বাংলাদেশীঅর্থনীতি #ফিচারআর্টিকেল

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: