নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
“A gasp of wonderment escaped our lips” বিস্ময়ে থমকে গিয়েছিল সবার নিঃশ্বাস। ঠিক এমন অনুভূতিই বর্ণনা করেছিলেন বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার যখন তিনি ১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রাচীন মিশরের কিংবদন্তি রাজা টুটানখামুনের পাথরের কফিনের মুখোমুখি হন। কার্টারের ভাষায়, Thirty-three centuries had passed since human feet last trod the floor on which we stood অর্থাৎ প্রায় ৩৩ শতাব্দী ধরে যে মাটিতে মানুষের পা পড়েনি সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি অনুভব করেছিলেন এক অদ্ভুত শিহরণ। তবুও সেখানে পড়ে ছিল সাম্প্রতিক জীবনের চিহ্ন আধা ভর্তি মর্টারের বাটি, কালো হয়ে যাওয়া বাতি কিংবা কাঠের টুকরো।
BBC রেডিওতে কার্টারের ঐতিহাসিক বর্ণনা
১৯৩৬ সালে BBC রেডিওতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাওয়ার্ড কার্টার টুটানখামুনের সমাধি আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। যদিও তখন আবিষ্কারের ঘটনার প্রায় ১৪ বছর পার হয়ে গেছে, তার কণ্ঠে বিস্ময়ের অনুভূতি ছিল যেন এখনও জীবন্ত। তিনি বলেন, তারা যখন দুটি চেম্বার পেরিয়ে সোনালি দরজা বন্ধ ও সিল করা এক বিশাল স্বর্ণমন্দিরের সামনে পৌঁছান তখনই বুঝতে পারেন ইতিহাসের এক অভাবনীয় মুহূর্ত সামনে অপেক্ষা করছে।
সারকোফাগাস উন্মোচনের মুহূর্ত
সিল ভেঙে দরজা খুলতেই সামনে দেখা যায় আরেকটি স্বর্ণমন্দির, যা আগেরটির চেয়েও বেশি ঝলমলে। এরপর ধীরে ধীরে সামনে প্রকাশ পায় এক বিশাল হলুদ কোয়ার্টজাইট পাথরের সারকোফাগাস। তবে সামনে এগোনোর জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ১,১৩০ কেজি (২,৫০০ পাউন্ড) ওজনের পাথরের ঢাকনা তুলে ফেলা। বিশেষ পুলি সিস্টেম দিয়ে ঢাকনা তোলা হয়, আর আলো ঢুকতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্বর্ণে মোড়া এক অপূর্ব দৃশ্য। A golden effigy of the young king রাজা টুটানখামুনের সোনালি অবয়ব পুরো কফিনজুড়ে ছিল। এটি ছিল তিনটি কফিনের প্রথম স্তর, যার ভেতরে ছিল আরও দুটি কফিন, একটির ভেতরে আরেকটি।
শিক্ষা ছাড়াই ইতিহাস গড়েছিলেন কার্টার
আশ্চর্যের বিষয় হাওয়ার্ড কার্টার মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্কুল ছেড়েছিলেন এবং তার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্নতত্ত্ব শিক্ষা ছিল না। তবে অসাধারণ আঁকার দক্ষতার কারণে তিনি মিশরে কাজের সুযোগ পান এবং ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করে হয়ে ওঠেন ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ।
ভ্যালি অব দ্য কিংস: লুকানো ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী
কার্টার বহু বছর ধরে মিশরের Valley of the Kings এলাকায় খনন করছিলেন। এই অঞ্চলেই প্রাচীন মিশরের বহু ফারাওকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। টুটানখামুনের সমাধির প্রবেশপথ দীর্ঘদিন ধরে ধ্বংসাবশেষ ও মাটির স্তরের নিচে চাপা পড়ে থাকায় তা লুটেরাদের চোখ এড়িয়ে যায়। ১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে কার্টার একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে মোমবাতির আলো ফেলে অন্ধকার ভেতরে তাকান। তখন তার পৃষ্ঠপোষক লর্ড কার্নারভন প্রশ্ন করেন তিনি কি কিছু দেখতে পাচ্ছেন?
রাজা টুটানখামুন: কম বয়সেই মৃত্যু
টুটানখামুন ছিলেন মিশরের ১৮তম রাজবংশের ১১তম ফারাও। ধারণা করা হয় তিনি মাত্র ১৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এবং সিংহাসনে বসেছিলেন প্রায় ৮ বা ৯ বছর বয়সে। তার মৃত্যুর কারণ এখনও রহস্য। কেউ বলেন হত্যাকাণ্ড, কেউ বলেন দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু কিংবা শিকারে আহত হওয়া।
বিশ্বজুড়ে ‘টুটম্যানিয়া’
টুটানখামুনের সমাধির খবর ছড়িয়ে পড়তেই ১৯২০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় Egyptomania। ফ্যাশন, সিনেমা, শিল্পকলায় মিশরীয় নকশা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। Art Deco ডিজাইনে পিরামিড, পদ্মফুল ও হায়ারোগ্লিফ মোটিফ দেখা যেতে থাকে।
মমির অভিশাপ এবং কার্নারভনের মৃত্যু
সমাধি উন্মোচনের কয়েক মাস পরই লর্ড কার্নারভন একটি পোকা কামড়ের সংক্রমণে মারা যান। এরপরই জনপ্রিয় হয় ‘মমির অভিশাপ’ বা ‘Tutankhamun’s Curse’ নিয়ে নানা গুজব ও রহস্যকাহিনি, যা আবিষ্কারকে আরও নাটকীয় করে তোলে। এই আবিষ্কারের সময় মিশর ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ দখলদারিত্ব থেকে দেশটি সদ্য আংশিক স্বাধীনতা পেয়েছিল। ফলে টুটানখামুন হয়ে ওঠেন এক ধরনের জাতীয় প্রতীক। তবে এই আবিষ্কারে স্থানীয় শ্রমিক ও দক্ষ কর্মীদের ভূমিকা অনেক সময়ই ইতিহাসে যথাযথভাবে উঠে আসেনি। কার্টারের সঙ্গে কাজ করেছিলেন Ahmed Gerigar, Gad Hassan, Hussein Abu Awad এবং Hussein Ahmed Said-এর মতো দক্ষ ফোরম্যানরা।
৩,০০০ বছরের ট্রাম্পেট বাজিয়েছিল BBC
টুটানখামুনের সমাধি থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ট্রাম্পেট একটি রূপার, একটি ব্রোঞ্জের— ১৯৩৯ সালে BBC একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে বাজানোর অনুমতি পায়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ কোটি শ্রোতা সেই সম্প্রচার শুনেছিলেন। ১৯৭২ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে অনুষ্ঠিত Treasures of Tutankhamun প্রদর্শনীতে টুটানখামুনের স্বর্ণমুখোশ দেখতে দর্শনার্থীর ঢল নামে। প্রদর্শনীটি তখন ১৬ লাখের বেশি দর্শক টেনেছিল, যা আজও ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অন্যতম রেকর্ড। এরপর প্রদর্শনীটি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ায়। ২০২৫ সালে প্রথমবার পুরো সমাধির সব বস্তু প্রদর্শনে সবচেয়ে বড় খবর হলো ২০২৫ সালে মিশরের নতুন Grand Egyptian Museum-এ টুটানখামুনের সমাধির প্রায় সব সামগ্রী একসঙ্গে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। এতদিন প্রায় ৫,৫০০ বস্তু থেকে মাত্র ১,৮০০টির মতো প্রদর্শিত ছিল।মিউজিয়ামের সাবেক প্রধান ড. তারেক তাওফিক বলেন, এবার আমরা পুরো সমাধির অভিজ্ঞতা দর্শকদের দিতে চাই যেন তারা কার্টারের মতো করেই সবকিছু একসঙ্গে দেখতে পারে।
কিন্তু টুটানখামুনের মমি এখনও ভ্যালি অব দ্য কিংসে
যদিও স্বর্ণমুখোশ ও অন্যান্য ধনসম্পদ এখন মিউজিয়ামে, টুটানখামুনের মমি এখনও Valley of the Kings-এ তার সমাধিতেই রয়ে গেছে। কার্টারের বর্ণনায় সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল কফিনের ওপর রাখা একটি শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মালা। তিনি মনে করেছিলেন এটি হয়তো ছিল রাজার স্ত্রী রানির শেষ বিদায় উপহার। কার্টার বলেন, রাজকীয় ঐশ্বর্যের ভেতর ওই কয়েকটি শুকনো ফুলই ছিল সবচেয়ে সুন্দর। কারণ তা মনে করিয়ে দিয়েছিল ৩,৩০০ বছর আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী সময়।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: