—একজন মাওলানার গল্প থেকে শিক্ষা সংস্কারের রূপরেখা-২ । অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক (পর্ব ৫/২)
অধিকারপত্রের শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের পর্ব ৫/২-এ উঠে এসেছে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষা দর্শনের গভীর বিশ্লেষণ। তিনি শিক্ষা দেখেছিলেন মানসিক মুক্তির প্রকল্প হিসেবে—যেখানে ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পরের পরিপূরক, প্রাথমিক শিক্ষা নাগরিকের জন্মগত অধিকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় সত্য অনুসন্ধানের কেন্দ্র। রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়ে কেন মানসিক স্বাধীনতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? কীভাবে সমন্বিত মানবিক শিক্ষা সামাজিক ন্যায় ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে? বাংলাদেশের মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার বিভাজন দূর করে একটি সমন্বিত পাঠ্যক্রম গঠনে আজাদের দর্শন কতটা প্রাসঙ্গিক—জানুন বিশ্লেষণধর্মী এই পর্বে।
ফিরে দেখা গত পর্ব একজন মাওলানার গল্প (রিক্যাপ)
গত পর্বে (৫/১) আমরা এক অনন্য মাওলানার গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম শিক্ষা সংস্কারের নতুন আলাপ। সেখানে দেখানো হয়েছে—কীভাবে মক্কায় জন্ম নেওয়া, প্রথাগত স্কুলশিক্ষা ছাড়াই বেড়ে ওঠা এক আলেম পরবর্তীকালে আধুনিক ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার স্থপতি হয়ে উঠলেন। আলোচনার মূল সুর ছিল—শিক্ষা কেবল ডিগ্রি নয়; শিক্ষা হলো চিন্তার মুক্তি, মানসিক জাগরণ এবং জাতি গঠনের প্রকল্প। প গত পর্বে (৫/১) দেখানো হয়েছে যে শিক্ষা বিপ্লব আসলে ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই শুরু হয়, এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তার জীবনে প্রমাণ করেছেন—ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক শক্তি; প্রাতিষ্ঠানিক সনদ ছাড়াই পারিবারিক ও আত্মশিক্ষার মাধ্যমে আরবি, ফারসি, দর্শন, গণিত ও ইতিহাসে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করে এবং মাত্র ১৫ বছর বয়সে শিক্ষকতা শুরু করে তিনি দেখিয়েছেন, শিক্ষার আসল ভিত্তি প্রতিষ্ঠানের দেয়াল নয়, জিজ্ঞাসু মন। তাঁর দর্শনে বিজ্ঞান মানুষকে প্রকৃতিকে জয় করতে শেখায়, ধর্ম শেখায় নিজেকে জয় করতে, আর এই সমন্বয় ছাড়া পূর্ণ মানুষ গড়ে ওঠে না—যা আজকের বাংলাদেশে “মাদরাসা বনাম আধুনিক শিক্ষা” বিভাজনের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রাথমিক শিক্ষা দয়া নয়, নাগরিকের জন্মগত অধিকার; অশিক্ষিত জাতি গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারে না, তাই শিক্ষা ছিল তাঁর কাছে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার আত্মা। বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি কেবল চাকরির প্রস্তুতিমঞ্চ হিসেবে নয়, মানবতাবাদ, সহনশীলতা, যুক্তিবাদ ও সত্য অনুসন্ধানের কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যেখানে ডিগ্রি নয়, চিন্তাশীল নাগরিক গড়ে ওঠে। ‘কালি ও কলমের জিহাদ’-এর মাধ্যমে আল-হিলাল পত্রিকাকে হাতিয়ার বানিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়; সংবাদপত্র, সাহিত্য ও জনচেতনার মাধ্যমেও জাতিকে জাগানো যায়। শেষে একটি কঠিন প্রশ্ন তোলা হয়েছে—আমরা কেমন মাওলানা চাই: ভয় নয় আলো দেবেন, বিভাজন নয় সংলাপ গড়বেন, বেত নয় স্বপ্নের কলম তুলে দেবেন—এবং সেখানেই স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবিক ও সংস্কারক আলেম নেতৃত্ব।
পড়ুন গত পর্বের (৫/১) রিক্যাপের সারাংশ: পর্ব ৫/১ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে— একজন “মাওলানা” কেবল মিম্বারের বক্তা নন; তিনি হতে পারেন জাতির শিক্ষা-দর্শনের স্থপতি। ধর্ম ও বিজ্ঞান, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, নৈতিকতা ও যুক্তিবাদ—এই সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে নতুন বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের রূপরেখা। পড়ুন “একজন মাওলানার গল্প থেকে শিক্ষা সংস্কারের রূপরেখা—ধর্ম ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভাবনা। বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন
—পূর্ব প্রকাশের পরে:
আজকের ‘স্কুল চয়েস’ বিতর্কে আজাদের শিক্ষা: ঐতিহ্য, আস্থা ও অভিভাবকের উদ্বেগের ইতিহাস
মাওলানা সাহেরে বাল্যকালের শিক্ষার ইতিহাসটিা আমাদের চোখে আঙ্গুলি দিয়ে দেখিয়ে দেয়, এই উপমহাদেশের অভিজাত শ্রেণি তাদের সন্তানদের শিক্ষার সিদ্ধান্তগ্রহণে যেন একই জায়গায় আটকে রয়েছে। তাঁর পরিবার ছিল গভীরভাবে ধর্মীয় ও রক্ষণশীল। তাঁর পিতা মাওলানা খৈরুদ্দীন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত প্রচলিত স্কুল বা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতেন না। তিনি মনে করতেন, উপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত ও নৈতিক ভিত্তিসম্পন্ন শিক্ষাই সন্তানের জন্য শ্রেয়। ফলে আজাদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঘরোয়া পরিবেশে, পারিবারিক তত্ত্বাবধানে। বাড়িতেই তিনি আরবি ভাষায় গণিত, জ্যামিতি, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের পাঠ গ্রহণ করেন। কুরআন, হাদিস ও ফিকহের পাশাপাশি যুক্তিচর্চা ও দার্শনিক আলোচনাও তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার অংশ ছিল। অর্থাৎ ধর্মীয় শিক্ষার ভেতরেই ছিল এক ধরনের বৌদ্ধিক বিস্তার, যা কেবল আচারভিত্তিক ছিল না।
উপনিবেশিক সময়ে যেমন অভিজাত ও সচেতন মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সংশয় ছিল, তেমনি আজও অনেক অভিজাত পরিবার মাদ্রাসা শিক্ষার মান ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সেই সময়ে খৈরুদ্দীন যে আস্থার সংকটে ব্রিটিশ শিক্ষাকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন, আজকের সময়ে অনেক অভিভাবক উল্টো কারণে মাদ্রাসা শিক্ষাকে এড়িয়ে চলেন—তাঁদের আশঙ্কা, সেখানে আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এই দুই প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও একটি বিষয় অভিন্ন: অভিভাবকেরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং এমন শিক্ষা চান, যা তাকে মর্যাদাপূর্ণ ও সক্ষম নাগরিকে পরিণত করবে।
আজাদের শিক্ষাজীবন প্রমাণ করে, ঘরোয়া ধর্মীয় শিক্ষাও যদি যুক্তিবোধ, ভাষাগত দক্ষতা ও বৌদ্ধিক বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা সংকীর্ণতার জন্ম দেয় না; বরং সৃজনশীল মনন গড়ে তোলে। তাঁর ক্ষেত্রে আমরা দেখি, ঐতিহ্যগত শিক্ষার ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই তিনি পরবর্তীকালে আধুনিক বিজ্ঞান, ইতিহাস ও রাজনৈতিক চিন্তার দিকে অগ্রসর হন। অর্থাৎ সমস্যা ধর্মীয় শিক্ষায় নয়; সমস্যা তার সীমাবদ্ধতা ও একমুখী কাঠামোয়।
শিক্ষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে আজাদের প্রাথমিক শিক্ষা ছিল “হোম-বেইজড ইন্টিগ্রেটেড লার্নিং”-এর একটি উদাহরণ। এখানে পরিবার ছিল প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর শিক্ষক ছিলেন নৈতিক ও বৌদ্ধিক আদর্শ। ভিগোৎস্কির সামাজিক নির্মাণবাদ (social constructivism) অনুসারে, জ্ঞান গড়ে ওঠে সামাজিক ও পারস্পরিক সংলাপের মাধ্যমে। আজাদের ক্ষেত্রে পরিবার সেই সামাজিক পরিবেশ সরবরাহ করেছিল, যেখানে ধর্মীয় জ্ঞান ও যুক্তিচর্চা একত্রে বিকশিত হয়েছে।
একই সঙ্গে তাঁর শিক্ষাজীবন প্রমাণ করে যে, শিক্ষা যদি ভাষাগত ও বৌদ্ধিক গভীরতার ওপর দাঁড়ায়, তবে তা পরবর্তীকালে বহুমাত্রিক জ্ঞান অর্জনের সক্ষমতা তৈরি করে। বর্তমান বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে যে তাত্ত্বিক শিক্ষা নেওয়া যায় তা হলো—মাদ্রাসা শিক্ষা কিংবা সাধারণ শিক্ষা, কোনো ধারাই এককভাবে যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বহুমাত্রিক ও প্রাসঙ্গিক শিক্ষা কাঠামো, যা ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে পাশাপাশি ধারণ করতে পারে। তবেই অভিভাবকদের আস্থার সংকট দূর হবে এবং শিক্ষা হবে সত্যিকার অর্থে মানুষ গড়ার প্রকল্প।
স্কুল পছন্দের সংকট ও ঘরোয়া শিক্ষার শক্তি: আজাদের শিক্ষাজীবন থেকে শিক্ষাতাত্ত্বিক পাঠ
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষাজীবন শিক্ষাতাত্ত্বিক লেন্সের নীচে নিয়ে বিশ্লেষণ করলে অনেকগুলো তত্ত্বের এবং একইসাথে কাউন্টার থটের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তাঁর পরিবার ছিল ধর্মীয়ভাবে গভীর রক্ষণশীল। তাঁর পিতা মাওলানা খৈরুদ্দীন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত প্রচলিত স্কুল কিংবা মাদ্রাসা শিক্ষার ওপর আস্থা রাখতেন না। উপনিবেশিক প্রভাব, মূল্যবোধের বিচ্যুতি এবং জ্ঞানচর্চার সীমাবদ্ধতা নিয়ে তাঁর সংশয় ছিল প্রবল। ফলে ছোটবেলায় আজাদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঘরোয়া পরিবেশে, পিতার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। বাড়িতেই তিনি আরবি ভাষায় গণিত, জ্যামিতি, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন শিক্ষা লাভ করেন। ধর্মীয় পাঠ ছিল তাঁর শিক্ষার ভিত্তি, কিন্তু সেই ভিত্তির ভেতরেই ছিল বিশ্লেষণী বোধ ও বৌদ্ধিক শৃঙ্খলা। এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আজ যেমন অনেক অভিজাত পরিবার মাদ্রাসা শিক্ষার মান নিয়ে আস্থাহীনতায় ভোগেন, তেমনি তখন খৈরুদ্দীন প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। অভিভাবকের এই আস্থার সংকট নতুন নয়; প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু উদ্বেগ একই রয়ে গেছে—সন্তানের ভবিষ্যৎ।
আজাদের শিক্ষা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক উসকে দেয়—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অপরিহার্যতা নিয়ে প্রশ্ন। তাঁর ঘরোয়া শিক্ষার অভিজ্ঞতা অনেকাংশে ইভান ইলিচের ‘ডিস্কুলিং সোসাইটি’ তত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত Deschooling Society গ্রন্থে Ivan Illich যুক্তি দেন যে বাধ্যতামূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকৃত শেখার পথে বাধা সৃষ্টি করে, মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে এবং সামাজিক বৈষম্য টিকিয়ে রাখে। তিনি কেন্দ্রীভূত বিদ্যালয়ব্যবস্থার পরিবর্তে বিকেন্দ্রীভূত “learning webs”-এর ধারণা দেন, যেখানে ব্যক্তি নিজেই তার শিক্ষার চালিকাশক্তি। আজাদের পিতা যেন বাস্তব জীবনে সেই ধারণার একটি প্রাথমিক উদাহরণ তুলে ধরেছিলেন—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও যদি পরিবার জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে প্রকৃত শিক্ষা সম্ভব।
একই সঙ্গে আজাদের শিক্ষাজীবন আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানী জন ব্রডাস ওয়াটসনের বিখ্যাত উক্তিকেও নতুন আলোয় দেখায়। ওয়াটসন বলেছিলেন—সঠিক পরিবেশ ও নিয়ন্ত্রিত সামাজিক শর্ত পেলে তিনি যেকোনো শিশুকে নির্দিষ্ট পেশায় গড়ে তুলতে পারবেন। যদিও বাস্তবে তিনি তার তত্ত্ব প্রমাণ করে দেখাতে পারেননি, কিন্তু আজাদের ক্ষেত্রে তাঁর পিতা যে পরিবেশ নির্মাণ করেছিলেন—ভাষা, শৃঙ্খলা, পাঠাভ্যাস ও বৌদ্ধিক অনুশীলনের মাধ্যমে—তা আচরণবাদী তত্ত্বের একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। পারিবারিক শিক্ষার সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও নিয়মিত অনুশীলন আজাদকে অল্প বয়সেই বহুভাষাবিদ ও জ্ঞানান্বেষী হিসেবে গড়ে তোলে।
তবে আজাদের শিক্ষাজীবন কেবল ঘরোয়া সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ ছিল না। তরুণ বয়সে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের লেখা পড়ে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তাঁর চিন্তায় পরিবর্তন আসে; তিনি উপলব্ধি করেন আধুনিক শিক্ষার গুরুত্ব। তখন তিনি ইংরেজি শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন এবং স্বশিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করেন। এভাবে আমরা দেখি, ঘরোয়া ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি আধুনিক জ্ঞানের দিকে অগ্রসর হন।
রক্ষণশীল পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁকে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়েছিল। আরবি ও ফারসি দিয়ে শুরু করে দর্শন, গণিত, বীজগণিত—সবই তিনি বাড়িতে শিখেছেন। পরে নিজ উদ্যোগে ইংরেজি, বিশ্ব ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে অধ্যয়ন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিক শিক্ষা না পেলেও ব্যক্তিগত অধ্যবসায় ও পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে তিনি উর্দু, ফারসি, হিন্দি ও ইংরেজিতে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি কোরআনের ব্যাখ্যামূলক রচনা লিখেছেন, ছিলেন দক্ষ বিতার্কিক, বাগ্মী ও চিন্তাবিদ।
আজাদের শিক্ষাজীবন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাতাত্ত্বিক আলোচনাকে সামনে আনে। প্রথমত, পারিবারিক পরিবেশ শিক্ষার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সামাজিক নির্মাণবাদ (Social Constructivism) অনুযায়ী, জ্ঞান সামাজিক আন্তঃক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে। আজাদের ক্ষেত্রে পরিবারই ছিল সেই প্রথম সামাজিক-শিক্ষাগত পরিসর। দ্বিতীয়ত, ইভান ইলিচের ‘ডিস্কুলিং’ তত্ত্বের আলোকে বলা যায়—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একমাত্র পথ নয়; শেখার পরিবেশ ও অভ্যন্তরীণ প্রেরণা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিও সত্য যে, আজাদ পরে আধুনিক শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করেছিলেন—অর্থাৎ তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে অস্বীকার করেননি, বরং সমন্বয়ের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তৃতীয়ত, আচরণবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ ও নিয়মিত অনুশীলনের ভূমিকা তাঁর জীবনে স্পষ্ট।
সুতরাং আজাদের শিক্ষাজীবন আমাদের শেখায়—প্রকৃত শিক্ষা কোনো একমুখী কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, ব্যক্তিগত সাধনা, ভাষাগত দক্ষতা, সমকালীন জ্ঞানের প্রতি উন্মুক্ততা—এসবের সমন্বয়েই একজন শিক্ষার্থী পূর্ণতা পায়। আজকের বাংলাদেশে স্কুল পছন্দের বিতর্কে তাঁর জীবন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন, কিন্তু তা তখনই কার্যকর, যখন পরিবার ও সমাজ মিলে একটি সমন্বিত বৌদ্ধিক পরিবেশ গড়ে তোলে।
প্রকৃতিবাদ, আত্মমুক্তি ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা: মাওলানার শিক্ষা জীবনের সম্প্রসারিত শিক্ষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
আজাদের শিক্ষাজীবন কেবল ঘরোয়া সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। তরুণ বয়সে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের রচনা পড়ে তাঁর চিন্তায় এক গভীর পরিবর্তন আসে। তিনি উপলব্ধি করেন, আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানচিন্তা থেকে দূরে থাকলে মুসলিম সমাজ পিছিয়ে পড়বে। ফলে তিনি নিজ উদ্যোগে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে মনোনিবেশ করেন এবং স্বশিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করেন। এখানে আমরা শিক্ষার ব্যাপক অর্থে জঁ জাক রুশোর প্রকৃতিবাদী দর্শনের প্রতিফলন দেখতে পাই। রুশো বলেছিলেন, প্রকৃত শিক্ষা হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যক্তি সামাজিক কৃত্রিমতার বন্ধন ভেঙে নিজের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ও বোধের অনুসরণে এগিয়ে যায়। আজাদও একসময় উপলব্ধি করেন যে প্রচলিত রীতি, পদ্ধতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর মন-মানসিকতা খাপ খাচ্ছে না। পরিবারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে তাঁর ভেতরে জন্ম নেয় এক নতুন বিদ্রোহী চেতনা। নিজের নামের শেষে তিনি যুক্ত করেন “আজাদ”—অর্থাৎ মুক্ত। যদিও মাওলানা সাহেবের জন্মের পরে রক্ষণশীল পিতামাতা আকীকা দিয়ে নাম রাখেন সৈয়দ গোলাম মুহিউদ্দীন আহমেদ বিন খায়েরুদ্দীন আল হুসায়নি। পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে এই আত্মনামকরণ ছিল কেবল একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত নয়; এটি ছিল তাঁর বৌদ্ধিক মুক্তির ঘোষণা। কেননা তিনি মনে করতেন পরাধীনতা তথা দাসত্বই সবচেয়ে বড় অভিশাপ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সুন্দর নামেও দাসত্ব সবচেয়ে খারাপ। তাইতো তিনি প্রায়শই বলতেন, "দাসত্ব সবচেয়ে খারাপ, এমনকি যদি এর নাম সুন্দর হয়" । তাই তাঁর এই স্বপ্রণোদিত 'আজাদ' ছদ্মনাম গ্রহণ নিজেকে 'মুক্ত' বা 'স্বাধীন' করার একটি প্রয়াস। এটি তাঁর কাছে সংকীর্ণ ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার এবং স্বাধীন চিন্তার অধিকারী হওয়ার প্রতীক ছিল। অপরদিকে তিনি প্রায়শই মনে করিয়ে দিতেন, "আমরা কি উপলব্ধি করি না যে আত্মসম্মান আসে আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে?"
এই মুক্তচিন্তার ধারা তাঁকে বিপ্লবী রাজনীতির দিকেও নিয়ে যায়। শ্রী অরবিন্দ ঘোষ ও শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর মতো নেতাদের সংস্পর্শে এসে তিনি বুঝতে পারেন, স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি মানসিক মুক্তিরও সংগ্রাম। পরবর্তীকালে মিশর, তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাক ভ্রমণ তাঁর দৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করে। ভ্রমণ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করেন, জ্ঞান কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। অভিজ্ঞতা, সংলাপ ও বাস্তবতা থেকে শেখার মধ্যেই প্রকৃত শিক্ষা নিহিত। দেশে ফিরে তিনি ‘আল হিলাল’ পত্রিকা প্রকাশ করে জনগণকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন—যা ছিল তাঁর অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষারই ফল।
এই পর্যায়ে আজাদের জীবনকে আমরা তিনটি শিক্ষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে পারি। প্রথমত, রুশোর প্রকৃতিবাদ (Naturalism) অনুসারে শিক্ষা ব্যক্তির স্বাভাবিক বিকাশের পথ প্রশস্ত করে, সমাজের কৃত্রিম কাঠামো ভেঙে তাকে নিজের বোধের ওপর দাঁড়াতে শেখায়। আজাদের “আজাদ” নাম গ্রহণ এবং পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বৌদ্ধিক মুক্তি এই প্রকৃতিবাদী আত্ম-উন্নয়নের উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা (Experiential Learning)—ডেভিড কোল্বের তত্ত্ব অনুযায়ী, জ্ঞান অর্জনের প্রধান উৎস হলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, প্রতিফলন ও প্রয়োগ। আজাদের বিদেশ ভ্রমণ, বিপ্লবীদের সঙ্গে আলাপ এবং সাংবাদিকতা ছিল অভিজ্ঞতাকে শিক্ষায় রূপান্তরের প্রক্রিয়া। তিনি দেখিয়েছেন, “পুথিগত বিদ্যা আর পরহস্ত ধন, নাহি বিদ্যা নাহি ধন”—অর্থাৎ কেবল বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়; বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করতে না পারলে শিক্ষা পূর্ণতা পায় না।
তৃতীয়ত, স্বশিক্ষা (Self-directed Learning) ধারণা—ম্যালকম নোলসের প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষাতত্ত্ব অনুযায়ী, শিক্ষার্থী যখন নিজেই শেখার দায়িত্ব নেয়, তখন শেখা গভীর ও স্থায়ী হয়। আজাদের ইংরেজি শিক্ষা, বিশ্ব ইতিহাস ও রাজনীতি অধ্যয়ন ছিল সম্পূর্ণ আত্মপ্রণোদিত।
অতএব, আজাদের শিক্ষাজীবন আমাদের একটি সমন্বিত শিক্ষামডেলের কথা বলে—যেখানে পারিবারিক ভিত্তি, আত্মমুক্তি, অভিজ্ঞতা ও আধুনিক জ্ঞানের প্রতি উন্মুক্ততা একত্রে কাজ করে। আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা বিতর্কে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃত শিক্ষা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পদ নয়; এটি শিকড়ে প্রোথিত থেকে মুক্ত আকাশের দিকে যাত্রা।
মাওলানার শিক্ষা চিন্তা থেকে আধুনিক শিক্ষার স্বরূপের সন্ধান
মৌলানা আবুল কালাম আজাদ স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী এবং একজন গভীর মননশীল চিন্তাবিদ। তাঁর আত্মকথামূলক রাজনৈতিক গ্রন্থ India Wins Freedom-এ রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রে যে বিষয়টি বারবার উঠে আসে, তা হলো শিক্ষা—জাতির মানসিক মুক্তি ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রধান শর্ত।
মাওলানার শিক্ষা দর্শন বৃঝতে তার চিন্তার গভীনরতা বুঝতে হরেব। মাওলানা আজাদের চিন্তার গভীরতা অনুধাবন করতে হলে তাঁর রচনা, বিশেষত ‘ছেঁড়াপাতা’ ও ‘গুবার-ই-খাতির’—এর কিছু অংশ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখায় যে মুক্তচিন্তার দীপ্ত উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছে, তা কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান নয়, বরং এক বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের ঘোষণা। তিনি লিখেছেন—“আমি কোনো বাঁধা ধরা পথের অনুসারী হতে শিখিনি। আমি নিজেই নিজের পথ তৈরি করেছি এবং সেই পথেই হেঁটেছি। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভেতরের সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলা, যা তাকে অন্ধ অনুসরণ থেকে মুক্তি দেয়।” এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, তাঁর কাছে শিক্ষা মানে ছিল না নিছক অনুকরণ; বরং ছিল আত্মজাগরণ, চিন্তার স্বাধীনতা এবং বোধের মুক্তি।
ধর্ম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অসাধারণ ভারসাম্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী। তিনি বলেন—“বিজ্ঞান আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতিকে জয় করতে হয়, আর ধর্ম আমাদের শেখায় কীভাবে নিজেকে জয় করতে হয়। এই দুয়ের মিলন ছাড়া পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।” এই উপলব্ধি তাঁর সমন্বয়বাদী মননের পরিচায়ক। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ও ধর্ম পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক—একটি বাহ্যজগতের উন্নয়ন ঘটায়, অন্যটি অন্তর্জগতকে শুদ্ধ করে।
সংকীর্ণতা বর্জনের প্রশ্নে আজাদের অবস্থান ছিল আরও স্পষ্ট ও বিশ্বজনীন। ‘গুবার-ই-খাতির’-এ তিনি লিখেছেন—“একটি নদী যেমন সাগরে মিশে নিজেকে পূর্ণতা দেয়, তেমনি সত্যিকারের জ্ঞানীর জ্ঞানও দেশ, কাল ও ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে।” এই রূপক তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল নিদর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান কখনো সীমারেখায় আবদ্ধ থাকে না; তা প্রবাহমান, প্রসারমান এবং সার্বজনীন।
এইসব উচ্চারণে আমরা এক মুক্তমনা, প্রগতিশীল ও সমন্বিত চিন্তার মাওলানাকে দেখতে পাই—যিনি ধর্মকে সংকীর্ণতার নয়, মুক্তি ও মানবতার আলোয় ব্যাখ্যা করেছেন; আর শিক্ষাকে দেখেছেন মানুষ গড়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে।
অপরদিকে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর স্মৃতিকথামূলক রাজনৈতিক গ্রন্থ India Wins Freedom-এ কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘটনাই বর্ণনা করেননি; তিনি স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণের বৌদ্ধিক ভিত নিয়েও গভীরভাবে ভাবনা প্রকাশ করেছেন। এই ভাবনার কেন্দ্রে ছিল শিক্ষা—যাকে তিনি জাতির আত্মা গঠনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা যদি মানুষের চিন্তা, যুক্তি ও মানবিকতার বিকাশ ঘটাতে না পারে, তবে সেই স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
১) শিক্ষা ও মানসিক মুক্তি: মাওলানা আজাদের চিন্তায় শিক্ষা ছিল স্বাধীনতার প্রকৃত ভিত্তি—কেবল রাজনৈতিক পরাধীনতার অবসান নয়, বরং মানসিক মুক্তির এক গভীর প্রক্রিয়া। তিনি স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের চিন্তা, বিবেক ও নৈতিক বোধের স্বাধীনতায় রূপ নেয়। India Wins Freedom–এ তিনি লিখেছেন: “Freedom is indivisible. If India wins freedom but loses her soul in communal hatred, then freedom will have no meaning.” — Azad, India Wins Freedom (1959) —এই উক্তিতে সরাসরি শিক্ষার প্রসঙ্গ না থাকলেও তাঁর মূল বক্তব্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট—যে স্বাধীনতা সাম্প্রদায়িক ঘৃণায় কলুষিত হয়, তা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। আর সেই ঘৃণা থেকে মুক্তির প্রধান উপায় হলো শিক্ষা। তাঁর মতে, উপনিবেশিক শাসন মানুষের শরীরকে যতটা দাসত্বে আবদ্ধ করে, তার চেয়েও গভীরভাবে বন্দী করে মন ও চিন্তাকে। তাই শিক্ষা এমন এক শক্তি, যা মানুষের আত্মমর্যাদা, যুক্তিবোধ ও নাগরিক চেতনা জাগ্রত করে তাকে অন্ধ আনুগত্য ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে।
আজাদের দৃষ্টিতে শিক্ষা ছিল না কেবল একটি প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কর্মসূচি; বরং ছিল সভ্যতার পুনর্গঠনের প্রকল্প। তিনি দৃঢ়ভাবে মনে করতেন, অশিক্ষিত জনগণ কখনো গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারে না। সুতরাং স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সর্বজনীন শিক্ষার বিস্তার—যাতে স্বাধীনতা কেবল শাসকের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের অন্তরে প্রোথিত এক স্থায়ী মূল্যবোধে পরিণত হয়।
২) ধর্মনিরপেক্ষ ও সমন্বিত মানবিক শিক্ষা: আজাদ ছিলেন ধর্মতাত্ত্বিক পণ্ডিত; কিন্তু রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় তিনি সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে অগ্রাহ্য করেন। তাঁর বক্তব্য: “I have throughout my life stood for composite nationalism.” — Azad, India Wins Freedom
এই “composite nationalism”-এর বাস্তব রূপ তিনি শিক্ষায় দেখতে চেয়েছিলেন—যেখানে হিন্দু-মুসলিম, বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থীরা একই পাঠশালায় বেড়ে উঠবে। শিক্ষা হবে মিলনের ক্ষেত্র, বিভেদের নয়। — এ দৃষ্টিভঙ্গির শিকড় পাওয়া যায় তাঁর আগের রচনা ও ভাষণে, বিশেষত তাঁর পত্রিকা Al-Hilal-এ, যেখানে তিনি লিখেছিলেন: “Islam does not teach us to narrow our sympathies… We are Indians first and Muslims afterwards.” — Azad, Al-Hilal (1912–1914 writings)
এই বক্তব্য তাঁর শিক্ষাদর্শকে ব্যাখ্যা করে—জাতীয় সংহতি ও মানবিকতা শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। মৌলানা আজাদ ছিলেন ধর্মপ্রাণ আলেম, কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্টভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মতে—ক) “শিক্ষা কোনো ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ হতে পারে না”; খ) জ্ঞান মানবজাতির অভিন্ন সম্পদ; এবং গ) বিদ্যালয় হবে মিলনের স্থান, বিভেদের নয়। তাঁর শিক্ষা-দর্শনের উপরোক্ত তিনটি মৌলিক প্রস্তাবনা তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে আধুনিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ উন্মোচিত হয়। যথা:
প্রথমত, তাঁর মতে শিক্ষা কোনো ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ হতে পারে না। অর্থাৎ শিক্ষা যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিশ্বাস বা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে তা জ্ঞানের সার্বজনীনতা হারায়। এই ধারণা মূলত উদার মানবতাবাদী শিক্ষাতত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে শিক্ষা মানুষকে বৃহত্তর মানবসমাজের অংশ হিসেবে গড়ে তোলে, কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ধারক হিসেবে নয়।
দ্বিতীয়ত, তিনি মনে করতেন জ্ঞান মানবজাতির অভিন্ন সম্পদ। এই প্রস্তাবনাটি জ্ঞানের সার্বজনীনতাবাদ (Universalism of Knowledge)-এর তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। এখানে জ্ঞানকে কোনো জাতি, ধর্ম বা ভাষার একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয় না; বরং তা মানবসভ্যতার যৌথ সঞ্চয়। ফলে গ্রিক দর্শন, ইসলামী স্বর্ণযুগের বিজ্ঞান, পাশ্চাত্য আধুনিক বিজ্ঞান—সবই একই ধারাবাহিকতার অংশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞান-বিনিময়, অনুবাদ আন্দোলন এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপকে উৎসাহিত করে।
তৃতীয়ত, তাঁর ধারণা ছিল—বিদ্যালয় হবে মিলনের স্থান, বিভেদের নয়। এই বক্তব্য সামাজিক সংহতি তত্ত্ব (Social Cohesion Theory) এবং নাগরিক শিক্ষার (Civic Education) মূল দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদ্যালয় কেবল পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সামাজিক ক্ষেত্র, যেখানে ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একত্রে বেড়ে ওঠে। সেখানে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক আচরণ শেখা হয়।
এই তিনটি প্রস্তাবনা একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, তাঁর শিক্ষা-চিন্তা কেবল নীতিগত বক্তব্য ছিল না; বরং একটি সুসংহত তাত্ত্বিক কাঠামো, যার লক্ষ্য ছিল মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র নির্মাণ।
তাঁর শিক্ষা-বিশ্বাসে আধুনিক একীভূত শিক্ষাদর্শনের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি মনে করতেন, শিশুকে যদি শৈশব থেকেই ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সামাজিক পটভূমির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একত্রে শিক্ষালাভের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে পারস্পরিক ভীতি ও বিদ্বেষ স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পাবে এবং নাগরিক সংহতি গড়ে উঠবে। এই ধারণাটি সমকালীন শিক্ষাতত্ত্বে ‘ইন্টিগ্রেটেড এডুকেশন’ এবং ‘সোশ্যাল কোহেশন থিওরি’র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে বিদ্যালয়কে একটি সামাজিকীকরণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়—যেখানে সহাবস্থান, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা হয়।
তাত্ত্বিকভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গি নৈতিক মানবতাবাদ (Ethical Humanism)-এর ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। এখানে মানুষের প্রাথমিক পরিচয় তার ধর্মীয় বা জাতিগত সত্তা নয়; বরং তার মানবিক সত্তা। ধর্ম, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়কে অস্বীকার নয়, বরং বৃহত্তর মানবিক পরিচয়ের অধীনস্থ হিসেবে দেখা—এই ছিল তাঁর অবস্থান। শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিক চেতনা ও নৈতিক বোধ গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা, তা জন ডিউইয়ের গণতান্ত্রিক শিক্ষাদর্শের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বিদ্যালয়কে ক্ষুদ্র সমাজ (miniature society) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অতএব, তাঁর শিক্ষাদর্শ কেবল সহনশীলতার আহ্বান নয়; এটি একটি সুসংহত তাত্ত্বিক অবস্থান—যেখানে একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে বহুত্ববাদী সমাজে স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক ঐক্য নির্মাণের পথ রচিত হয়।
আজাদের যুক্তি ছিল সুস্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক। তাঁর মতে, অশিক্ষা দারিদ্র্যকে স্থায়ী করে, কুসংস্কারকে লালন করে এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। একটি অশিক্ষিত সমাজ অর্থনৈতিক উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিকভাবে সহজেই প্রভাবিত হয়। ফলে স্বাধীনতার ভিত হয়ে ওঠে ভঙ্গুর।
তবে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে কেবল বর্ণমালা শিক্ষা হিসেবে দেখেননি। তাঁর দৃষ্টিতে এটি ছিল নাগরিক গঠনের প্রাথমিক পর্ব—যেখানে শিশু যুক্তিবোধ, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ শেখে। অর্থাৎ শিক্ষা তাঁর কাছে কেবল জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া নয়; এটি ছিল সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং গণতান্ত্রিক চেতনা প্রতিষ্ঠার মৌলিক হাতিয়ার।
তাঁর বিশ্বাস ছিল—সত্যিকার শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পরস্পরকে সমৃদ্ধ করবে। তিনি ‘মাদ্রাসা বনাম আধুনিক শিক্ষা’—এই কৃত্রিম দ্বন্দ্ব মানতেন না। বরং তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী একইসঙ্গে বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও নৈতিকতা অর্জন করবে। তাঁর দৃষ্টিতে জ্ঞানের সব শাখা মিলেই গড়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ মানুষ; আর সেই পূর্ণাঙ্গ মানুষই হতে পারে একটি শক্তিশালী ও মানবিক জাতির ভিত্তি।
৬) শিক্ষার সামাজিক লক্ষ্য: মৌলানা আজাদের শিক্ষাচিন্তার একটি বড় দিক ছিল সামাজিক ন্যায়। তিনি মনে করতেন— শিক্ষা ধনীদের একচেটিয়া অধিকার হলে সমাজে বৈষম্য বাড়বে। অতএব রাষ্ট্রীয় শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ০৪ টি। যথা: ১) দরিদ্রের ক্ষমতায়ন; ২) নারীর শিক্ষার প্রসার; ৩) গ্রামীণ উন্নয়ন; এবং ৪) সামাজিক সমতা। তার কাছে শিক্ষা ছিল উন্নয়নের অর্থনৈতিক উপায়ই নয়, সামাজিক ন্যায়বিচারের হাতিয়ার। ঠিক একই চিন্তা করতে দেখা যায় স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে। ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি স্বদেশে এস তিনি রেঘাষণা করেন, শিক্ষাই হবে মুক্তির হাতিয়ার। এই মুক্তি হবে সমাজিত মুক্তি, এই মুক্তি হবে সাংস্কৃতিক মুক্তি, এই মুক্তি হবে বৈষম্য থেকে মুক্তি।
৭) নৈতিকতা ও চরিত্রগঠন: : তাঁর শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রে ছিল একটি স্পষ্ট ও গভীর ধারণা—“মানুষ তৈরির প্রকল্প”। শিক্ষা কেবল দক্ষতা অর্জনের উপায় নয়; এটি চরিত্র গঠন ও মানবিক বিকাশের প্রক্রিয়া। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা-ঘোষণায়ও একই প্রতিধ্বনি শোনা যায়—“সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষ লাগবে।” এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত দর্শন আজাদের চিন্তার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আজাদ বারবার সতর্ক করেছেন, জ্ঞান যদি চরিত্র গঠন না করে, তবে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ জ্ঞান ও নৈতিকতার বিচ্ছেদ সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তাঁর শিক্ষাদর্শে তাই তিনটি মৌলিক স্তম্ভ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়—১) জ্ঞান (Knowledge), ২) নৈতিকতা (Morality), এবং ৩) দায়িত্ববোধ (Responsibility)। এই ত্রিমাত্রিক কাঠামো আসলে একটি সমন্বিত মানবিক শিক্ষাতত্ত্বের প্রতিফলন। জ্ঞান মানুষকে দক্ষ করে, নৈতিকতা তাকে সৎ করে, আর দায়িত্ববোধ তাকে সমাজের প্রতি জবাবদিহিমূলক নাগরিকে পরিণত করে। তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষিত ব্যক্তি কেবল পেশাগতভাবে সফল না হয়ে ন্যায়পরায়ণ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হোক।
আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বের আলোকে এই ধারণাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আজাদের “মানুষ তৈরির প্রকল্প” সমকালীন হোলিস্টিক এডুকেশন বা সামগ্রিক শিক্ষাদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ২০০৩ সালে এল. ডি. ফিঙ্ক তাঁর Creating Significant Learning Experiences গ্রন্থে যে Fink’s Taxonomy of Significant Learning প্রবর্তন করেন, সেখানে শিক্ষার ছয়টি আন্তঃসম্পর্কিত ডোমেইনের কথা বলা হয়েছে—যার মধ্যে “Human Dimension” এবং “Caring” বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শেখা কেবল জ্ঞানীয় (cognitive) উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও মানবিক সংবেদনশীলতার বিকাশের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এখানেই ফিঙ্কের ট্যাক্সোনমি ব্লুমের ১৯৫৬-এর দশকের ট্যাক্সোনমি থেকে ভিন্ন। ব্লুমের শ্রেণিবিন্যাস মূলত জ্ঞানীয় বিকাশের ধাপভিত্তিক কাঠামো উপস্থাপন করে—যেখানে চিন্তার স্তরক্রমিক অগ্রগতি গুরুত্ব পায়। কিন্তু ফিঙ্কের মডেলটি বৃত্তাকার, পারস্পরিক-নির্ভরশীল এবং সম্পর্কভিত্তিক। এখানে শেখার প্রতিটি উপাদান অন্যটির সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে এটি একটি সামগ্রিক (holistic) দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা শিক্ষার্থীকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে।
আজাদের শিক্ষাদর্শ এই আধুনিক তাত্ত্বিক কাঠামোর পূর্বাভাস যেন বহন করে। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে রূপ দিতে চেয়েছিলেন, যেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে ছিল না কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বা পেশাগত সাফল্য; বরং এমন এক নাগরিক গড়ে তোলা, যে নৈতিকভাবে দৃঢ়, সামাজিকভাবে সংবেদনশীল এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল।
অতএব, “মানুষ তৈরির প্রকল্প” কেবল একটি আবেগপ্রবণ স্লোগান নয়; এটি একটি সুসংহত শিক্ষাতাত্ত্বিক অবস্থান। আজকের বাংলাদেশে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে মানবিক ও টেকসই সমাজ গড়তে চাই, তবে শিক্ষাকে জ্ঞানকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে এনে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে। কারণ দক্ষতা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে, কিন্তু চরিত্র রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে।
মাওলানার শিক্ষা দর্শনে সংস্কার: শিক্ষা—স্বাধীনতা ও মানবিক রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি
কাকতালীয় হোক আর শিক্ষা-সম্পর্কিত খাঁটি তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই হোক না কেন, মাওলানার শিক্ষা দর্শনে সংস্কার-ধারণার প্রতিফলন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনেও পরিলক্ষিত হয়। আসলে শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর যে মানবিক, গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রনির্মাণমূলক ভাবনা, তা সময় ও ভূগোল অতিক্রম করে এক ধরনের সার্বজনীন তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে—যার প্রতিধ্বনি আমরা পরবর্তী জাতীয় শিক্ষানীতির আলোচনাতেও দেখতে পাই।
India Wins Freedom এবং তাঁর অন্যান্য রচনায় মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষাদর্শের যে সারমর্ম প্রতিফলিত হয়, তা মূলত একটি মানবিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের নকশা। তাঁর কাছে শিক্ষা কেবল তথ্য আহরণের প্রক্রিয়া নয়; এটি মানসিক মুক্তির পথ, সাম্প্রদায়িকতার প্রতিষেধক, গণতন্ত্রের ভিত্তি এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার কার্যকর মাধ্যম। তিনি বিশ্বাস করতেন—শিক্ষা মানুষকে সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ ও অন্ধ আনুগত্যের ঊর্ধ্বে তুলে যুক্তিবাদী, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করে। বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষাই বহুত্ববাদী সমাজকে স্থিতিশীল ও সহনশীল রাখতে পারে। তাঁর দৃষ্টিতে স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ ও টেকসই হয়, যখন তা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের প্রত্যাশার সঙ্গেও গভীরভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। কমিশন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের এবং ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার সংস্কার অপরিহার্য—এ কথা সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়। দেশের কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তসহ সব শ্রেণির মানুষের জীবনে বাস্তব চাহিদার উপলব্ধি সৃষ্টি, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং একটি বাঞ্ছিত নতুন সমাজ নির্মাণের প্রেরণা জাগানো—এসবই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল।
কমিশনের ভূমিকায় আরও বলা হয়, সুষ্ঠু জাতি গঠন এবং দেশকে আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান করার উদ্দেশ্যে বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি ও ত্রুটি দূর করার জন্যই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ১৯৭২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় শিক্ষা কমিশনের উদ্বোধনী ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান—বাংলাদেশের জনগণের কাঙ্ক্ষিত সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে একটি পুনর্গঠিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং বাস্তবসম্মত শিক্ষার রূপরেখা প্রণয়ন করতে। সীমিত সম্পদের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়নের কথা তিনি বলেন, যা শিক্ষাক্ষেত্রে কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার নিশ্চিত করবে।
এই প্রেক্ষাপটে আজাদের শিক্ষাচিন্তা আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যিকার স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক ঘোষণায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে, পাঠাগারের নীরবতায় এবং চিন্তার স্বাধীনতায়। শিক্ষা যদি মানবিকতা, যুক্তিবোধ ও নৈতিক সাহস জাগিয়ে তোলে, তবেই রাষ্ট্র তার আত্মা রক্ষা করতে সক্ষম হয়। বন্দুক সাময়িক স্বাধীনতা এনে দিতে পারে, কিন্তু শিক্ষাই সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ, স্থায়ী এবং ন্যায়ভিত্তিক করে তোলে।
কালি ও কলমের জিহাদ: ‘আল-হিলাল’ ও মাওলানা আজাদের গণশিক্ষা আন্দোলন
বইয়ের মলাট আর চারদেয়ালের শ্রেণিকক্ষই কি শিক্ষার শেষ সীমানা? মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বিশ্বাস ছিল—শিক্ষা তার চেয়ে বহুগুণ বিস্তৃত। ১৯১২ সালে যখন তিনি ‘আল-হিলাল’ প্রকাশ করেন, সেটি কেবল একটি সংবাদপত্র ছিল না; বরং পরাধীন ভারতবর্ষের জন্য এক চলমান বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর কলম ছিল না মগজ ধোলাইয়ের অস্ত্র, বরং মগজ সংস্কারের হাতিয়ার—যার মাধ্যমে তিনি জাতিকে আত্মমর্যাদা, রাজনৈতিক সচেতনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার পাঠ দিয়েছিলেন।
আল-হিলাল—যখন সংবাদপত্র হয়ে ওঠে পাঠ্যপুস্তক: ‘আল-হিলাল’–এর সূচনায় মুসলিম সমাজের একাংশ ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ বা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তোষণনীতিতে আবদ্ধ ছিল। আজাদ তাঁর ক্ষুরধার ও সাহিত্যগুণসম্পন্ন লেখনীর মাধ্যমে দুইটি মৌলিক রূপান্তরের সূচনা করেন। প্রথমত, তিনি ধর্মীয় শিক্ষাকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুনর্ব্যাখ্যা করেন—কুরআন ও সুন্নাহর আলোচনাকে কেবল আচারনির্ভর পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজনীতি, সমাজনীতি ও সমসাময়িক বিশ্বচিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেন। দ্বিতীয়ত, তিনি রাজনৈতিক সচেতনতাকেই প্রকৃত শিক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল স্পষ্ট—পরাধীন মানসিকতায় প্রকৃত পাণ্ডিত্য বিকশিত হতে পারে না। ফলে ‘আল-হিলাল’ হয়ে ওঠে গণশিক্ষার এক শক্তিশালী মাধ্যম, যা সাধারণ পাঠককে চিন্তা করতে শেখায়।
সাংবাদিকতা থেকে সমাজসংস্কার— বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিকতা: আজাদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন আমাদের বর্তমান বাস্তবতায়ও গভীর তাৎপর্য বহন করে। প্রথমত, তিনি পক্ষপাতহীন প্রজ্ঞার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। বিভাজনের যুগেও তাঁর ‘আল-হিলাল’ বা ‘আল-বালাগ’ কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মুখপাত্রে পরিণত হয়নি; বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। আজকের প্রেক্ষাপটে, যেখানে অনেক তথাকথিত শিক্ষিত বা আলেমগোষ্ঠী নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, আজাদের আদর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বুদ্ধিজীবীর প্রথম দায় সত্যের প্রতি। দ্বিতীয়ত, তিনি ভাষা ও সাহিত্যের শক্তিকে জাতীয় জাগরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। কোনো প্রথাগত পাশ্চাত্য ডিগ্রি ছাড়াই তিনি উর্দু সাহিত্যে নতুন প্রাণসঞ্চার করেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—মাতৃভাষায় দক্ষতা ও চিন্তার স্বচ্ছতা ছাড়া জাতির মেধা বিকাশ সম্ভব নয়। অতএব, আজাদের “কালি ও কলমের জিহাদ” আমাদের শেখায়—শিক্ষা কেবল প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; তা গণমাধ্যম, সাহিত্য ও জনচেতনার মধ্য দিয়েও বিকশিত হতে পারে। যখন কলম সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন সেটিই হয়ে ওঠে জাতির প্রকৃত শিক্ষালয়।
ভারতের শিক্ষা সংস্কারে আজাদের দর্শন: বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক পাঠ
ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের সময় মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সামনে ছিল ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এক অসম, সীমাবদ্ধ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শিক্ষাব্যবস্থা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্র একটি সার্বজনীন, বৈষম্যহীন ও মানবিক শিক্ষানীতি গড়ে তুলতে পারবে। এই উপলব্ধি থেকে তিনি যে সংস্কার-দর্শন নির্মাণ করেন, তা কেবল ভারতের জন্য নয়; আজও বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
আজাদের সংস্কারচিন্তার কেন্দ্রে ছিল সমন্বয়—সাংস্কৃতিক ও কারিগরি শিক্ষার সৃজনশীল মেলবন্ধন। তাঁর দৃষ্টিতে শিক্ষা কেবল ধর্মীয় বা কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ যেমন জরুরি, তেমনি মানবিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইআইটি (IIT) ও ইউজিসি (UGC)-এর মতো প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও একাডেমিক মাননিয়ন্ত্রণকে জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষা স্পষ্ট—মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার দ্বৈত কাঠামো অতিক্রম করে একটি সমন্বিত, গবেষণাভিত্তিক ও মূল্যবোধসমৃদ্ধ কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি উচ্চতর গবেষণা ও সৃজনশীল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়েছিলেন। সাহিত্য একাডেমি ও ললিত কলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা প্রমাণ করে—অর্থনৈতিক উন্নয়নই সব নয়; সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক বিকাশও রাষ্ট্রের শক্তি। বাংলাদেশেও শিক্ষা সংস্কার যদি কেবল কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা অসম্পূর্ণ হবে। জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার পরিসর সম্প্রসারণ ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাকে রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—শিক্ষার শিকড় যত গভীরে প্রোথিত হবে, জাতির কাঠামো তত দৃঢ় হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক স্তরে মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন শিক্ষা নিশ্চিত না করলে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা শিক্ষা সংস্কারের আরেকটি সাহসী অধ্যায়। ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতির প্রভাবমুক্ত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও স্বনির্ভর একটি শিক্ষা মডেল গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন—চিন্তার স্বাধীনতা অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাব ও রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে মুক্ত রেখে স্বায়ত্তশাসিত, গবেষণাকেন্দ্রিক ও নৈতিক ভিত্তিসম্পন্ন কাঠামোতে রূপান্তর করা জরুরি।
আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের প্রসঙ্গ উঠলেই মাওলানা আজাদের মতো দূরদর্শী ও সমন্বয়ী ব্যক্তিত্বের অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা এমন এক বাস্তবতায় অবস্থান করছি, যেখানে একাংশ ‘মাওলানা’ বা শিক্ষিত সমাজ দলীয় রাজনীতির বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। ফলে শিক্ষা হয়ে ওঠে মতাদর্শের হাতিয়ার, জাতি গঠনের মাধ্যম নয়। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন এমন আলেম ও পণ্ডিত, যারা ব্যক্তিস্বার্থ বা রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির দীর্ঘমেয়াদি মেধা বিকাশকে অগ্রাধিকার দেবেন।
আসলে, আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা অনেক সময় রাজনৈতিক মতাদর্শের বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষা হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার, জাতি গঠনের মাধ্যম নয়। এই বাস্তবতায় আজাদের দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষানেতৃত্ব হতে হবে হবেন। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে, integrative thinking-এ সমৃদ্ধ এবং সংস্কারক মানসিকতায় দৃঢ়। তাই শিক্ষা সংস্কারে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিশ্চিত করা না গেলে সকল চেষ্টাই মাঠে মারা যাবে, আর এই বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে গত ৫৪ বছরে সব সরকারই শিক্ষা সংস্কারের নামে িস্বীয দলীয আর্দশ চাপিয়ে দেওয়াার এবং পাঠ্য বইয়ে ইতহাসে ছুরি চালিয়ে ভ্রান্ত পাঠ্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের সাথে জোর পূর্বক বুদ্ধিভিত্তিক অসততার প্রতারণা চালোনোর প্রয়াস দেখা গেছে, যা বর্তমানেও চলমান রয়েছে। তাই নিচের তিনটি বিষয় শিক্ষা সংস্কারের নেতৃত্বের প্রয়োজন: তাই শিক্ষা সংস্কারে তিনটি মৌলিক দিক নিশ্চিত করা না গেলে সব প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারই শিক্ষা সংস্কারের নামে নিজস্ব দলীয় আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বিকৃতি, আংশিক সত্য উপস্থাপন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা—এই প্রবণতা বারবার প্রত্যক্ষ হয়েছে এবং দুঃখজনকভাবে তা এখনো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়নি, উপরন্তু চলমান রয়েছে। এর ফলে শিক্ষা জাতি গঠনের নিরপেক্ষ ভিত্তি না হয়ে বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বাস্তবতা হলো—অসৎ উদ্দেশ্য থেকে কখনোই কল্যাণকর ফল আসে না। মহানবী (সা.)-এর বাণী, “ইন্নামাল আ’মালু বিন্ নিয়্যাত”—কর্মের মূল্যায়ন নিয়তের ওপর নির্ভরশীল—আমাদের এই মৌলিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়। শিক্ষা সংস্কার যদি সত্যিই জাতির কল্যাণের উদ্দেশ্যে না হয়, তবে তার ফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
অতএব, একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদের নিয়ত হতে হবে শুদ্ধ ও কল্যাণকামী। বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তকে বিকৃত বা আংশিক সত্য উপস্থাপনের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের চেতনায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কখনোই টেকসই হয় না। অসত্যের ওপর দাঁড়ানো শিক্ষা ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত নিজেই ভেঙে পড়ে এবং সমাজে অবিশ্বাস ও বিভ্রান্তি তৈরি করে। নৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি আত্মঘাতী। .তাই শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে সততা, সত্যনিষ্ঠা এবং বৌদ্ধিক স্বচ্ছতা অপরিহার্য। শিক্ষা যদি সত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে তা জাতিকে আলোকিত করার পরিবর্তে বিভ্রান্ত করবে। এই বাস্তবতায় শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে নিচের তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা অপরিহার্য:
প্রথমত, আমাদের দরকার দলীয় সংকীর্ণতামুক্ত নেতৃত্ব—যারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয়, বরং শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জ্ঞানচর্চার প্রসারের জন্য কাজ করবেন। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন সংশ্লেষী চিন্তা বা integrative thinking—যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে বিরোধে নয়, বরং পারস্পরিক সমৃদ্ধিতে যুক্ত হবে। তৃতীয়ত, দরকার সংস্কারক মনস্তত্ত্ব—যারা অতীতের গৌরবকে সম্মান করলেও তাতে আবদ্ধ থাকবেন না; বরং আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাঠ্যক্রম, পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গির সাহসী পুনর্বিন্যাসে উদ্যোগী আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে বিরোধে নয়; বরং পারস্পরিক সমৃদ্ধিতে যুক্ত হবে—এই বিশ্বাসই হতে পারে ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে রূপান্তরিত করতে হলে এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে, যারা সার্টিফিকেটের চেয়ে জ্ঞানকে, রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বৌদ্ধিক সততাকে, আর ক্ষমতার নৈকট্যের চেয়ে সংস্কারক চেতনাকে বেশি মূল্য দেবে। মাওলানা আজাদের জন্মদিন আজও ভারতে ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়—কারণ তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন শিক্ষক, চিন্তাবিদ ও জাতির বৌদ্ধিক স্থপতি হিসেবে। বাংলাদেশের আজ প্রয়োজন তেমনি শিক্ষানেতৃত্ব—যারা রাজনীতির চেয়ে শিক্ষাকে বড় করে দেখবেন, আর জ্ঞানকে জাতির মুক্তির প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবেন।
অতএব, শিক্ষা সংস্কারে আজাদের দর্শন কেবল ইতিহাসের বা ভারতেরই বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও এক জীবন্ত পাঠ। যদি আমরা সার্টিফিকেটকেন্দ্রিকতার বদলে জ্ঞানকেন্দ্রিকতা, রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে বৌদ্ধিক সততা, এবং ক্ষমতানির্ভরতার বদলে সংস্কারক চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে পারি—তবে শিক্ষাই হতে পারে আমাদের জাতীয় পুনর্গঠনের প্রধান শক্তি। শিক্ষা কেবল উন্নয়নের উপাদান নয়; এটি জাতির আত্মার নির্মাতা।
শেষ কথা
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষাচিন্তা আমাদের সামনে এক গভীর সত্য উন্মোচন করে—শিক্ষা কেবল তথ্য অর্জনের প্রক্রিয়া নয়; এটি জাতির আত্মা নির্মাণের সাধনা। তিনি দেখিয়েছেন, স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের চিন্তা, বিবেক ও নৈতিক সাহসে প্রতিফলিত হয়। ধর্ম ও বিজ্ঞানের সৃজনশীল সমন্বয়, সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে মানবিক শিক্ষা, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে সত্য অনুসন্ধানের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা—এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি একটি মুক্ত, যুক্তিনিষ্ঠ ও সহনশীল সমাজের স্বপ্ন এঁকেছিলেন।
আজ যখন শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে সনদকেন্দ্রিকতা, বিভাজন ও প্রতিযোগিতার সংকীর্ণতায় আবদ্ধ, তখন আজাদের দর্শন আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যিকার শিক্ষা মানুষ গড়ে, সমাজ গড়ে, রাষ্ট্রকে নৈতিক ভিত্তি দেয়। তাঁর চিন্তা শুধু ইতিহাসের অধ্যায় নয়; বরং ভবিষ্যতের পথনকশা। প্রশ্ন এখন আমাদের—আমরা কি শিক্ষাকে কেবল পেশার সোপান হিসেবে দেখব, নাকি জাতির মানসিক মুক্তি ও মানবিক পুনর্জাগরণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করব?
চলবে
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংস্কার #মাওলানা_আবুল_কালাম_আজাদ #মানসিক_মুক্তি #ধর্ম_ও_বিজ্ঞান #সমন্বিত_শিক্ষা #মাদরাসা_সংস্কার #বাংলাদেশের_শিক্ষা #শিক্ষা_ও_গণতন্ত্র #সামাজিক_ন্যায় #প্রাথমিক_শিক্ষা #বিশ্ববিদ্যালয়_দর্শন #নৈতিক_শিক্ষা #বিজ্ঞানমনস্কতা #EducationReform #Azad #IntegratedEducation #BangladeshEducation

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: