নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে আবারও তীব্র সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সীমান্তজুড়ে গোলাবর্ষণ ও মর্টার হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ঘোষণা দিয়েছেন ধৈর্য শেষ এটি এখন খোলা যুদ্ধ। এই সর্বশেষ সংঘর্ষ দুই দেশের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একদিকে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সুসজ্জিত সেনাবাহিনী। অন্যদিকে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীকে পরাজিত করে ক্ষমতায় ফেরা তালেবান যোদ্ধারা।
গত ২৪ ঘণ্টায় কী ঘটেছে?
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আফগান তালেবান সীমান্তের বিভিন্ন সেক্টরে পাকিস্তানি অবস্থানে হামলা চালায়। কাবুলের দাবি গত সপ্তাহান্তে পাকিস্তানের বিমান হামলায় আফগানিস্তানে কথিত জঙ্গি শিবিরে অন্তত ১৮ জন নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবেই এ আক্রমণ। শুক্রবার ভোরে পাকিস্তান গজব লিল হক (Operation Righteous Fury) নামে পাল্টা অভিযান শুরু করে। পাকিস্তানি বিমান হামলা কাবুল, পাকতিয়া প্রদেশ এবং কান্দাহারে আঘাত হানে যা তালেবানের আধ্যাত্মিক জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এবং যেখানে গোষ্ঠীর সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়। পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র দাবি করেন সীমান্তজুড়ে ৭৩টি তালেবান পোস্ট ধ্বংস করা হয়েছে এবং একাধিক অবস্থান দখল করা হয়েছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার অভিযোগ করেন, আফগান তালেবান সরকার সরাসরি পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে মদদ দিচ্ছে। অন্যদিকে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেন আফগান বাহিনী ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং কয়েকজনকে আটক করেছে। তবে দুর্গম সীমান্ত এলাকায় স্বাধীনভাবে এসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বেসামরিক আতঙ্ক
কাবুলের এক বাসিন্দা জানান রাতের বিস্ফোরণে তার পরিবার ঘুম থেকে জেগে ওঠে। আমরা আকাশে আগুনের শিখা দেখেছি। ভোর পর্যন্ত ঘুমাতে পারিনি। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাজাউর জেলায় মর্টার শেল বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। ইতালীয় মানবিক সংস্থা Emergency জানায় বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের পর নারী-শিশুসহ অন্তত নয়জন বেসামরিক আহতকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
পুরোনো উত্তেজনার নতুন অধ্যায়
আফগান তালেবান ২০০১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ দুই দশক পাকিস্তানে আশ্রয় ও সমর্থন পেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানে জঙ্গি হামলা বেড়ে যায়। ইসলামাবাদ বরাবরই দাবি করে আসছে, পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় পাচ্ছে যা কাবুল অস্বীকার করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে জঙ্গি হামলায় ১,২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে যা ২০২১ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।
সামরিক শক্তির তুলনা
আন্তর্জাতিক কৌশল বিশ্লেষণ সংস্থা International Institute for Strategic Studies–এর ‘মিলিটারি ব্যালান্স ২০২৫’ অনুযায়ী, পাকিস্তানের সক্রিয় সেনাসদস্য প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার, সঙ্গে আধাসামরিক বাহিনীর আরও প্রায় ৩ লাখ সদস্য রয়েছে। পাকিস্তানের হাতে মার্কিন নির্মিত F-16, ফরাসি মিরাজ এবং চীনের সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদিত JF-17 যুদ্ধবিমান রয়েছে। বিপরীতে আফগান তালেবান বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দুই লাখের কম এবং কার্যকর বিমানবাহিনী নেই বললেই চলে। তবে গেরিলা কৌশল, ড্রোন ও আত্মঘাতী হামলায় তাদের দক্ষতা রয়েছে।
সামনে কী?
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে তা পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। অতীতের মতো সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় উত্তেজনা প্রশমিত হতে পারে তবে আপাতত দুই পক্ষই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে জরুরি সংলাপ শুরু না হলে সীমান্ত সংঘর্ষ বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। যার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে।
---মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: