নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা (Genocide) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান। প্রস্তাবটি বর্তমানে পর্যালোচনার জন্য মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তু
প্রস্তাবনায় ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে শুরু হওয়া অপারেশন সার্চলাইট এবং পরবর্তী নয় মাস জুড়ে চালানো নৃশংসতাকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে:
বর্বরতা ও ক্ষয়ক্ষতি: পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের ইসলামপন্থী সহযোগীরা (বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী) পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এবং সাধারণ বাঙালিদের হত্যা করেছে।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিধন: বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো পদ্ধতিগত হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘর লুণ্ঠন এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণকে গণহত্যার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
যৌন সহিংসতা: দুই লাখের বেশি নারীর ওপর চালানো পাশবিক যৌন নির্যাতন ও যুদ্ধাপরাধের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক দলিলের প্রতিফলন
প্রস্তাবটিতে ১৯৭১ সালের তৎকালীন মার্কিন কূটনীতিকদের ভাষ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের সেই বিখ্যাত ব্লাড টেলিগ্রাম এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তিনি এই নৃশংসতাকে নির্বাচিত গণহত্যা (Selective Genocide) বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। এছাড়া সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদন এবং সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির ঐতিহাসিক রিপোর্টের প্রসঙ্গও এতে এসেছে।
কংগ্রেসের কাছে চারটি দাবি
প্রস্তাবটিতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের কাছে প্রধান চারটি দাবি জানানো হয়েছে:
১. ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে শুরু হওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার তীব্র নিন্দা জানানো।
২. এই ভয়াবহ ঘটনাগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
৩. কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সমষ্টিগতভাবে দায়ী না করার নীতি গ্রহণ করা।
৪. মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ১৯৭১ সালের এই বর্বরতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
এই প্রস্তাবটি এমন এক সময়ে এলো যখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ১৯৭১-এর অপরাধীদের বিচারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসছে। প্রস্তাবক গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এবং সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সত্য তুলে ধরতে এবং ভবিষ্যতে এমন নৃশংসতা রোধ করতে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি। এর আগেও মার্কিন কংগ্রেসে একাধিকবার এই স্বীকৃতির দাবি উঠলেও এবারের প্রস্তাবটি তথ্য ও দালিলিক প্রমাণের দিক থেকে অত্যন্ত জোরালো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রস্তাব পাস হলে তা বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথকে অনেক বেশি প্রশস্ত করবে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: