odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 28th April 2026, ২৮th April ২০২৬
যে দেশের শিক্ষকেরাই জালিয়াত, সে দেশের ভবিষ্যৎ কে গড়ে? ১ হাজার ১৫৬ শিক্ষকের সনদ জাল, ফেরত দিতে হবে কোটি কোটি টাকা — অথচ দায় কেউ নেয় না!

দায়ী কে? যুগ যুগ ধরে শিক্ষা ব্যবস্থায় রসিকতা —দুই পর্বে জাল সনদে শিক্ষকতা-এর প্রথম পর্ব

odhikarpatra | প্রকাশিত: ২৮ April ২০২৬ ১৭:৩৯

odhikarpatra
প্রকাশিত: ২৮ April ২০২৬ ১৭:৩৯

দুই পর্বে জাল সনদে শিক্ষকতা-এর প্রথম পর্ব

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক

এমন দেশটি কেউ পাবে না খুঁজে, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।" — এই গান গাইতে গাইতে আজ বুক ফেটে কাঁদে। কেননা, সেই রানীর ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে আছেন জাল সনদধারী শিক্ষকরা! শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডিআইএ বলছে, ২০১৩ সাল থেকে ১ হাজার ১৫৬ শিক্ষকের সনদ জাল! ৭৯৩ জন এনটিআরসিএর ভুয়া সনদ ব্যবহার করেছেন, ২৯৬ জন কম্পিউটার শিক্ষার জাল সনদ দেখিয়েছেন। গল্পটা শুনুন: হবিগঞ্জের স্নিগ্ধা রানী দাস ২০১২ সাল থেকে জাল সনদে শিক্ষকতা করে এসেছেন — ১০ লাখ টাকার বেশি বেতন নিয়েছেন। আবু সুফিয়ান চাঁদপুরে ১১ লাখ টাকা বেতন নিয়েছেন জাল সনদে। তাদের মতো আরও কতো শত! সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ক্ষমতা্ ছাড়ার পূর্বে বলেছেন, "জালিয়াতিতে বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।" আর এই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে দায় সবার — যে সিস্টেম জালিয়াতি ধরে না, যে নীতি কেবল কাগজে পড়ে থাকে, যে আমলাতন্ত্র ৪ বছরেও রিপোর্ট দিতে পারে না। কিন্তু ইউনস সময় থাকতে ব্যবস্থা নেননি। তাইতো মগানে বলা হয়েছে, সময় থাকতে মাওলা হুশিয়ার। ন্যাশনাল ইনটিগ্রিটি স্ট্র্যাটেজি আছে, আইএপএ ব্রত আছে — কিন্তু বাস্তবায়ন কোথায়? এই প্রতারণা এখন থামাতে হবে। শুধু চিঠি দিয়ে হবে না, দরকার কঠোর আইনি ব্যবস্থা। সময় এসেছে দায় স্বীকারের। বিস্তারিত জানতে পুরো আর্টিকেলটি পড়ুন।

বি.দ্র. এদেশে জাল সনদ যে কেবল শিক্ষকদের ক্ষেত্রেই ধরা পড়েছে তা নয়; এর আগে উচ্চ আদালতের বিচারক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও সরকারি আমলাসহ প্রায় সর্বমহলেই জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। তবে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অধিক উদ্বেগ ও চিন্তার।

প্রস্তাবনা: হাসির আড়ালে বিষাদের ছবি

আমাদের এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন এক অদ্ভুত এক মজলিশ। যেখানে ক্লাসরুমের দেয়ালে লেখা থাকে "শিক্ষাই আলো", আর খাতায় লেখা হয় "পরীক্ষাই জীবন"। ঠিক যেমনটা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, "শিক্ষা কখনোই বইয়ের পাতায় আটকে থাকা নাম্বারের খোঁয়াড়ে সীমাবদ্ধ থাকে না"—কিন্তু আমাদের বাস্তবতা যেন উল্টো পথের পথিক। সাম্প্রতিক এক ঘটনা সেই চিরায়ত হাসি-কান্নার গল্পকেই যেন নতুন মাত্রা দিল।

২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৫৬ জন শিক্ষকের সনদ জাল! শুধু সংখ্যাটাই বলছে—এটা আর রসিকতা নয়, এ এক মহামারী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) সম্প্রতি চিঠি দিয়ে জানিয়েছে—কারিগরি ও মাদ্রাসার ২৬২ জন শিক্ষকের সনদ জাল। তার আগে বেসরকারি স্কুল ও কলেজের আরও ৪৭১ জন। সব মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩৩টি মামলা। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে হিসাব করলে সংখ্যাটা আরও ভয়ংকর—১ হাজার ১৫৬।

চলুন, সেই গল্পেই ডুব দিই। কিন্তু গল্পের শুরু অনেক পুরোনো।

গল্পের প্রথম আঁচড়: কবে থেকে এই রসিকতা

আমাদের গ্রামের স্কুলটার নাম ছিল "আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়"। হেডস্যার আব্দুল করিম সাহেবের হাতে বইটা নিস্তেজ হয়ে যেত—অসম্ভব মজার মানুষ তিনি। তাঁর একটা বাণী ছিল: "বাপু, সার্টিফিকেট যদি বড় কথা হতো, তা হলে ছাগলেরও নাম্বার পেতে দেরি হতো না। ছাগলও পারে ঘাস চিবুতে চিবুতে বইয়ের পাতায় দাগ কাটতে!"

আমরা হাসতাম। এখন হাসি আটকাতে পারি না, কারণ দেখছি সেই রসিকতা যেন বাস্তবতার পালকে বসেছে। ডিআইএর প্রতিবেদন বলছে, ১ হাজার ১৫৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৯৩ জন এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধনের ভুয়া সনদ দেখিয়েছেন। অর্থাৎ, যে সংস্থা শিক্ষক নিবন্ধন করায়, সেই সনদই জাল! ২৯৬ জন কম্পিউটার শিক্ষার ভুয়া সনদ দেখিয়েছেন। আর ৬৭ জনের বিএড, গ্রন্থাগার, সাচিবিক বিদ্যা ও অন্যান্য বিষয়ের সনদ জাল।

স্কুল খুলছে, পড়াচ্ছেন ‘শিক্ষক’—কিন্তু যাঁর নিজের সনদই জাল, তিনি কীভাবে জাতির ভবিষ্যৎ গড়বেন? যেন পাগলের হাতে রসুইখানা।

কেস স্টাডি স্নিগ্ধা রানী দাসের গল্পদশ বছরের প্রতারণা: হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজটি বেসরকারি। এই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক স্নিগ্ধা রানী দাস সরকারি বেতনভুক্ত (এমপিও) হন ২০১২ সালে। এরপর থেকে তিনি সরকারের কাছ থেকে মাসে মাসে বেতন পেয়ে আসছেন। প্রায় এক দশক ধরে। অথচ তিনি শিক্ষক হওয়ার জন্য এনটিআরসিএর যে শিক্ষক নিবন্ধন সনদ দিয়েছেন, সেটি ভুয়া। ডিআইএ এনটিআরসিএর মাধ্যমে যাচাই করে জানতে পারে—স্নিগ্ধা রানী দাসের সনদে যে নম্বর লেখা, সেটির বিপরীতে প্রকৃত সনদধারী হলেন দেলোয়ার হোসাইন চৌধুরী। একজন নারী শিক্ষিকা হয়ে উঠলেন এক পুরুষের সনদ ব্যবহারকারী। কত বড় রসিকতা! ডিআইএ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্কুলটি পরিদর্শন করলেও যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন জমা দেয় গত জানুয়ারিতে। সময় লেগেছে প্রায় চার বছর। সেই চার বছরে স্নিগ্ধা রানী দাস বেতন নিয়েছেন আরও কত টাকা? হিসাব বলছে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি বেতন-ভাতা নিয়েছিলেন ১০ লাখ টাকার কিছু বেশি। তার পরের চার বছরের বেতন তো আছেই।

ডিআইএর সুপারিশ অনুযায়ী, স্নিগ্ধা রানীকে এখন সরকারের কাছ থেকে নেওয়া সমুদয় বেতন-ভাতা ফেরত দিতে হবে। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হারুনুর রশীদ বলছেন, তিনি আর বেতন তুলতে পারছেন না, প্রতিষ্ঠানেও আসছেন না। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এত বছর ধরে তিনি শিক্ষকতা করেছেন; তাঁর হাতে যারা পড়েছেন, সেই শিক্ষার্থীদের কী হবে? তাদের শিক্ষকের সনদ জাল জেনে কী লাভ?

কেস স্টাডি আবু সুফিয়ানের ১১ লাখ টাকার কাহিনি: চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার নিশ্চিন্তপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু সুফিয়ান। ২০১২ সালের নভেম্বরে ভুয়া সনদ দেখিয়ে চাকরি পান তিনি। গত বছরের অক্টোবরে ডিআইএর প্রতিবেদনে বিষয়টি ধরা পড়ে। এনটিআরসিএ জানায়, ‘সনদটি জাল ও ভুয়া।’

ডিআইএর সুপারিশ অনুযায়ী, আবু সুফিয়ান ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১১ লাখ টাকার বেশি বেতন-ভাতা নিয়েছেন। এর পরের বছরগুলো মিলিয়ে হয়ত আরও ৩-৪ লাখ টাকা হয়ে যাবে। এখন তাঁকে সেই সব টাকা ফেরত দিতে হবে। ২০১২ সালে চাকরি শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময় মাত্র ৭ বছর। আর ডিআইএর প্রতিবেদন জমা পড়লো গত বছরের অক্টোবরে। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের অক্টোবরে এসে জানা গেল, ২০১২ সালের আবু সুফিয়ান মিথ্যুক ছিলেন। —একই গল্প সিরাজগঞ্জের হরিণাহাটা মহিলা দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মো. মোশফেক ফারুকীর। একই গল্প হবিগঞ্জের ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) মনির আহমেদ চৌধুরীর। তাঁর কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সনদ ভুয়া। কী রসিকতা!

সুতোয় বাঁধা অন্ধকারের পরিসংখ্যান

শুধু কয়েকজন নয়, ডিআইএ ২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে মোট ১ হাজার ১৫৬ জন শিক্ষকের শিক্ষাগত ও যোগ্যতার সনদ ভুয়া বলে তথ্য পেয়েছে। দুঃখের বিষয়, এই সংখ্যা নিশ্চয়ই চূড়ান্ত নয়; এর বাইরেও অনেক জালিয়াত রয়ে গেছেন অন্ধকারে।

আঞ্চলিক চিত্রটা দেখুন:

  • রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ৪৪৩ জন
  • ঢাকা ও ময়মনসিংহে ৩৬৬ জন
  • খুলনা ও বরিশালে ২৫১ জন
  • চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ৯৬ জন

খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জাল সনদধারী শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। মাত্র দুই বিভাগে ১৫ কোটি টাকা! দেশব্যাপী এই টাকার পরিমাণ নিশ্চয়ই শত কোটি টাকা ছাড়াবে।

জালিয়াতির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: সাবেক সরকারের মুখ ফসকে বলে ফেলা সত্যি

ড. ইউনূস ক্ষমতা ছাড়ার কয়েকদিন আগে দেশের গোমর ফাস করেছেন। ঠোর বক্তব্য: 'বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জালিয়াতিতে'। সাবেক এই প্রধান উপদেষ্টা ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে 'ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬' উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এক বক্তৃতায় বলেছেন, "বাংলাদেশ একটি বিষয়ে এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন—তা হলো জালিয়াতি।" তিনি আরও বলেন, "আমাদের সবকিছুতেই জাল। বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না। ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। এমনকি আমেরিকান ভিসাও জাল হচ্ছে। আমরা একটা জালিয়াতির কারখানা বানিয়ে ফেলেছি।"

এখন প্রশ্ন—শিক্ষক সনদ জালিয়াতির ঘটনা কীভাবে ড. ইউনূসের এই বক্তব্যের সঙ্গে যায়? সরাসরি। কারণ শিক্ষক সনদ জালিয়াতি এই 'জালিয়াতির কারখানা'র এক বিশাল অংশ। এক হাজারের বেশি শিক্ষক যখন জাল সনদ নিয়ে শিক্ষকতা করছেন, তখন পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই একটা জাল সার্টিফিকেটের বাজারে পরিণত হয়। ড. ইউনূসের কথায় পরিষ্কার—"টপ ও বটম জালিয়াতি, জালিয়াতিতে ফ্রি জগতে।" মানে জালিয়াতি এতটাই ব্যাপক যে তা সমাজের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে—শিক্ষক, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা—সব পেশায়ই জালিয়াতি বিদ্যমান।

যখন দেশের গান মনে পড়ে: 'সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি'

এই ঘটনার পর একটি গান মনে আসছে—"এমন দেশটি কেউ পাবে না খুঁজে, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।" গানটি গাইতে গাইতে আজ বুকের ভেতর দহন জাগে। কেননা পৃথিবীতে এমন দেশ আর কোথাও আছে কি, যেখানে এত ব্যাপকভাবে শিক্ষকই সনদ জাল করেন? যেখানে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার ক্লাসরুমে দাঁড়ানো শিক্ষকদের অনেকে জালিয়াত? কল্পনা করুন, এক শিশু প্রথম দিন স্কুলে যায়। শিক্ষককে সে দেখে ভগবানের মতো। অথচ সেই শিক্ষকটি আসলে জাল সনদধারী—প্রতারক। শিশুটি সততার প্রথম পাঠ পায় এক প্রতারকের কাছ থেকে। এ কী বিডম্বনা!

আসনেই পৃথিবীতে কোথাও এরূপ জালি শিক্ষক অসম্ভব। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষক সনদ যাচাই এত কঠোর যে ভাবার উপায় নেই কেউ জাল সনদ নিয়ে চাকরি করতে পারে। সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বিশ্বাস ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে। কিন্তু আমাদের দেশে সেই দৃশ্য উল্টো। যেখানে শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে 'শিক্ষাই আলো' লেখা, সেখানে শিক্ষকরাই অন্ধকারের বাহক হয়ে দাঁড়িয়ে। "সকল দেশের রানী" আমরা বলে গর্ব করি, কিন্তু সেই রানীর মুকুটে জাল শিক্ষকের কলঙ্কই যেন গেঁথে আছে।

বিষয়টি কারো একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। স্নিগ্ধা রানী একা সনদ জাল করতে পারেননি, আবু সুফিয়ান একা পারেননি, মোশফেক ফারুকী একা পারেননি। তাঁদের পেছনে ছিল একটি ব্যবস্থা। ছিল এমন কিছু দেওয়াল, যা তাঁদের জাল সনদ কভার করেছে। ছিল কিছু মানুষের চোখ-বোজা, কিছু অফিসের উদাসীনতা, কিছু সুপারিশের বিনিময়ে ফাইল পাস করিয়ে দেওয়ার অদৃশ্য শৃঙ্খল। এটা একক অপরাধ নয়—এটা পুরো ব্যবস্থার অপরাধ। আর সেই অপরাধী ব্যবস্থাকে এখন প্রশ্ন করতে হবে।

জালিয়াতির ক্রমবৃদ্ধির পেছনের কারণগুলো কী কী?

এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন—শিক্ষা ব্যবস্থায় এত ব্যাপক জালিয়াতি কেন? পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়।

  • . দুর্বল যাচাই প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা: যাচাই প্রক্রিয়া এতটাই দুর্বল যে কেউ সহজেই জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি পেতে পারে। এক সময় স্থানীয় কমিটি নিয়োগ দিত, এখন এনটিআরসিএ সনদ বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই সনদের সত্যতা যাচাই করা হয় না বললেই চলে। ৭৯৩ শিক্ষক এনটিআরসিএ সনদ জাল করেছেন মানে—এনটিআরসিএ নিজেই ব্যর্থ। তারা কীভাবে সনদ ইস্যু করে যাচাই করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
  • . স্বল্প ঝুঁকি উচ্চ মুনাফা: অপরাধমূলক চিন্তাধারায়—”খরচ কম, লাভ অনেক”—এই সূত্র কাজ করে। এই জালিয়াতদের শাস্তি প্রায় নেই বললেই চলে। কাউকে জেলে যেতে হয়নি, কাউকে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়নি। শুধু চাকরি যায়, এবং ফেরত নেওয়া হয় বেতন—অথচ বেতন ফেরত আদায়ের হার নগণ্য। অপরাধের ঝুঁকি কম হওয়ায় লোকেরা সহজেই জালিয়াতির পথ বেছে নেয়।
  • . বেকারত্ব চরম প্রতিযোগিতা: দেশে বেকারত্বের হার উচ্চ। একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য লাখ লাখ প্রার্থী প্রতিযোগিতা করে। সেই চরম প্রতিযোগিতায় কেউ কেউ অসৎ উপায় বেছে নেয়। তারা ভাবে—সনদ জাল করেও যদি চাকরি পাওয়া যায়, তাহলে কেন নয়? বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সরকারি চাকরি জীবনের একমাত্র ভরসা। সেই ভরসার আশায় তারা জালিয়াতি করে বসে।
  • . অনৈতিক মূল্যবোধের সংকট: সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের সংকট প্রকট। শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে সততা, নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধের চেয়ে নম্বর, সার্টিফিকেট, বেতনকে বেশি গুরুত্ব দেয়, সেখানে জালিয়াতি বেড়ে যায়। আমরা শিক্ষার্থীকে শেখাই—"যাই করো, নম্বর নিয়ে এসো।" কিন্তু কখনো শেখাই না—"সৎ হও।" ফলে যারা বড় হয়, তারা নম্বর ও সার্টিফিকেটের জন্য যেকোনো অন্যায় করতে পারে।

পুরো সিস্টেমের দুর্বলতাএক চোখে আঙুল

জাল সার্টিফিকেট দিয়ে এতদিন পুরো সিস্টেমকে বোকা বানিয়ে ক্লাস নিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—সিস্টেম কতটা দুর্বল! তারা যেন এক ভয়ংকর বাস্তবতা সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। স্নিগ্ধা রানী দাস ২০১২ থেকে প্রায় এক দশক ধরে জাল সনদ নিয়ে শিক্ষকতা করছেন—কেউ কিছু জানতে পারেনি। আবু সুফিয়ান ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১১ লাখ টাকার বেশি বেতন নিয়ে ফেলছেন—কেউ টের পায়নি। এই লম্বা সময় ধরে তারা প্রশ্নের সম্মুখীন হননি। কারণ সিস্টেমে সে প্রশ্ন করার কেউ ছিল না।

এখানে নতুন করে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক ও কারিগরি তথা আমলাতন্ত্রে অনেক ফাঁকফোকরসহ বিশাল দুর্বলতা ফুটে ওঠেছে। দেখুন—ডিআইএ তো আছে, কিন্তু তারা ২০১৯ সালে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিচ্ছে ২০২৩ সালে—চার বছর পর! মানে চার বছর ধরে ফাইল ঘুরছে। এর মধ্যে কত শিক্ষক আরও জালিয়াতি করেছেন, কত টাকা লোপাট করেছেন—তার কোনো হিসাব নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আছে, মাউশি আছে, এনটিআরসিএ আছে—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে যাচাই করা। কিন্তু সবাই মিলে যেন এক অনুষ্ঠান করছে—কেউ দায় নিতে রাজি নয়।

আমলাতন্ত্রের এই ফাঁকফোকরই জালিয়াতদের বীর বানিয়েছে। তারা জানে—ধরা পড়লেও শাস্তি পাবে না, হয়ত চাকরি যাবে কিন্তু টাকা ফেরত দিতে পারবেন না। আর ধরা না পড়লে তো স্বর্গসুখ। তাই ঝুঁকি নিতে তাদের বাধে না। এটি একটি ভয়ংকর সত্য—যে ব্যবস্থা আলো দেখানোর কথা, সেই ব্যবস্থা নিজেই অন্ধকারে ডুবে আছে।

কাগজে-কলমে নীতি বনাম বাস্তবায়নের শূন্যতা: ন্যাশনাল ইনটিগ্রিটি স্ট্র্যাটেজির ফাঁকফোকর

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—আমাদের কি নীতি নেই? আমাদের কি আইন নেই? অবশ্যই আছে। বাংলাদেশে ন্যাশনাল ইনটিগ্রিটি স্ট্র্যাটেজি (এনআইএস) প্রণয়ন করা হয়েছে। ইন্টিগ্রিটি অ্যাকশন প্ল্যান (আইএপিএ) বাধ্যতামূলকভাবে সব কর্মকর্তাকে প্রতিবছর জমা দিতে হয়। ব্রত হিসেবে বলা হয়—"আমরা সততা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী।" অথচ ঘটনার প্রেক্ষাপট দেখে মনে হয়—এসব যেন কেবল কাগজে আর পেনসিলে সীমাবদ্ধ।

ভেবে দেখুন—যে দেশের জাতীয় নীতি বলছে, "আমরা দুর্নীতি মুক্ত হব", সেই দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ১ হাজার ১৫৬ শিক্ষকের সনদ জাল ধরা পড়েছে। মানে, এনআইএস বলে কেবল মুখে, কাগজে। বাস্তবে কর্মকর্তারা নীতি মানতে বাধ্য নন, অথবা মানার তাগিদ নেই। বাংলাদেশ ইন্টিগ্রিটি পলিসি অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আইএপএ বাধ্যতামূলক। সেখানে কর্মকর্তারা ব্রত দেন—"আমি দুর্নীতি করব না, সততা পালন করব।" কিন্তু এই ব্রত কি কেউ ভাঙলে শাস্তি দেয়? না, কখনো না।

তাই তো জালিয়াতি এত সহজে হচ্ছে। কারণ—কেউ ব্রত ভাঙলে তার কোনো দায় নেই। আইএপএ জমা দেওয়াটা যেন ফাইলিংয়ের অংশ—মানে কিছু কাগজপত্র প্রস্তুত করে অফিসে জমা দিলে হয়। কিন্তু সেটা আত্মার কণ্ঠ হওয়া দরকার, কেবল ফাইলের কাগজ না। একজন শিক্ষক নিয়োগের সময় যদি বলা হয়—"আপনার আইএপএ ব্রত অনুযায়ী আপনি কি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ?" তাহলে দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। কিন্তু সে তো নেই। বাস্তবে ব্রত মানুষকে কিছু মনে করায় না। তাই জালিয়াতি চলছে দেদার।

উদাহরণ: ধরুন, একজন এনটিআরসিএ কর্মকর্তা তার আইএপএ-তে লিখলেন—"আমি সততার সঙ্গে সনদ যাচাই করব।" অথচ বাস্তবে তিনি ঘুষ নিয়ে জাল সনদ পাস করে দেন। এই দ্বিচারিতা ধরা পড়ার কোনো ব্যবস্থা কি এনআইএস-এ আছে? না। তিনি শুধু ব্রত দেন, কিন্তু ব্রত ভাঙার শাস্তি নেই। তাই তিনি নির্বিঘ্নে জালিয়াতি চালিয়ে যান। আইএপএ যেন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা।

এক সাবেক সচিব বলেছেন, "আমাদের দেশে নীতি প্রণয়নে আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কিন্তু নীতি বাস্তবায়নে আমরা নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।" প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার নীতি প্রণয়ন করা হয়, কমিটি গঠন করা হয়, সভা হয়, রিপোর্ট লেখা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব কিছু কাগজেই রয়ে যায়। শিক্ষক সনদ জালিয়াতিও তেমন—উপরে নীতি আছে, নিচে বাস্তবতা ভিন্ন।

নৈতিক আইনি বাধ্যবাধকতা: কাগজের নীতি থেকে বাস্তবে রূপান্তরের তাগিদ

প্রশ্নটা এখন পরিষ্কার—আমাদের কেবল নীতি প্রণয়ন করলেই হবে না, প্রয়োজন কঠোর নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা বাস্তব পর্যায়ে কার্যকর করা। প্রতিটি নীতি, প্রতিটি আইন, প্রতিটি ব্রত যদি কেবল কাগজ ও পেনসিলেই থেকে যায়, তাহলে সিস্টেমের উন্নতি কখনো হবে না। শিক্ষক সনদ জালিয়াতির ঘটনা প্রমাণ করল—আমাদের এনআইএস, আইএপিএ সব কাগজে-কলমে চমৎকার, কিন্তু বাস্তব মাঠপর্যায়ে সেগুলোর কোনো প্রতিফলন নেই।

এক শিক্ষা বিশ্লেষক বলেছেন, "একটি দেশের সংবিধান যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই সংবিধানের বাস্তবায়ন। আমাদের ক্ষেত্রে সংবিধান ও নীতি আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। এই ব্যবধানই সব জালিয়াতির উৎস।"

তাই এখন যা দরকার:

  • প্রথমত, প্রতিটি নীতিকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনা। আইএপএ ব্রত ভাঙলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যেন কেউ আর কাগুজে ব্রতে সন্তুষ্ট না থাকে। শিক্ষক নিয়োগের আগে তার আইএপএ যাচাই করতে হবে এবং নিয়োগের সময় শপথ নিতে হবে—"আমি জানি, আমার সনদ জাল প্রমাণিত হলে আমার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হবে, জেল হবে, জরিমানা হবে।" এই ভয়-শ্রদ্ধা তৈরি করতে হবে।
  • দ্বিতীয়ত, সনদ যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল স্বাক্ষর ও ব্লক চেইন প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা। এনটিআরসিএ-র প্রতিটি সনদ হবে ব্লক চেইনে নথিবদ্ধ, যাতে কেউ পরিবর্তন করতে না পারে। আর যাচাই হবে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে, যাতে মানবিক কারসাজির সুযোগ না থাকে।
  • তৃতীয়ত, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যদি কোনো শিক্ষকের সনদ জাল ধরা পড়ে, তাহলে যিনি সেই শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ নিয়োগের সময় সনদ যাচাই না করাটা বড় অবহেলা। ডিআইএর প্রতিবেদন দেরিতে আসার জন্যও ডিআইএর কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
  • চতুর্থত, শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বাধীন অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা চালু করা। এখন জালিয়াতি ধরা পড়লে মন্ত্রণালয় বলে—আমরা চিঠি দিয়েছি। মাউশি বলে—আমরা ব্যবস্থা নেব। স্কুল বলে—আমরা নির্দেশনার অপেক্ষায়। এই বৃত্ত ভাঙতে হবে। একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করতে হবে, যারা সরাসরি শিক্ষকের সনদ যাচাই করবে এবং কোনো জালিয়াতি পেলে ৩০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেবে।
  • পঞ্চমত, নৈতিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ থেকে শুরু করে চাকরির শপথ পর্যন্ত নৈতিকতার পাঠ বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাংলাদেশ ইন্টিগ্রিটি পলিসির আওতায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইন্টিগ্রিটি ক্লাব গঠন করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে ইন্টিগ্রিটি ও নৈতিকতা বিষয়ক কোর্স বাধ্যতামূলক করতে হবে।

শিক্ষা নিয়ে উদসীন থাকা সাবেক অন্তবর্তীকালীনর সরকার প্রধান হিসেবে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনূস যেমন বলেছেন, "আমরা যদি আগে থেকেই নিজেদের সংশোধন না করি, তাহলে এই আধুনিক প্রযুক্তিকেও আমরা জালিয়াতির কাজে লাগাব। গোড়া থেকেই এই জালিয়াতির শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে।" এই শেকড় উপড়ে ফেলতে হলে নীতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান ঘুচাতে হবে।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চরমভাবে অপ্রস্তুত

যে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকেরাই সনদ জাল করেন, সেই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমরা কীভাবে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার স্মার্ট, সৃজনশীল, নৈতিক মানবসম্পদ তৈরি করব? জাতীয় ও সরকারের আকাঙ্খা অনুযায়ী, আমরা স্বপ্ন দেখি ডিজিটাল বাংলাদেশের, স্মার্ট বাংলাদেশের। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—ক্লাসরুমে যারা দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের সনদই জাল। তারা যদি ডিজিটাল দক্ষতা না রাখে, সৃজনশীলতা না রাখে, সততা না রাখে, তাহলে সেই শিক্ষার্থীরা কীভাবে একবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে?

ভাবুন তো—একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রয়োজন সৃজনশীল ও নৈতিক মানবসম্পদ। কিন্তু আমাদের শিক্ষকেরা যদি প্রতারণার মাধ্যমেই চাকরি পান, তাহলে তারা শিক্ষার্থীদের কী শিক্ষা দেবেন? তারা তো শিক্ষার্থীদের বলবেন না—"তোমরা সৎ হও।" কারণ নিজেরা সৎ নন। তারা বলবেন—"যেকোনো উপায়ে সফল হও।" শিক্ষার্থীরাও শিখবে জালিয়াতি, প্রতারণা, অসততা। এভাবে আমরা এক প্রজন্মকে তৈরি করছি, যারা হবে অসৎ, সুযোগসন্ধানী, নীতিহীন।

একবিংশ শতাব্দীর আরেক চ্যালেঞ্জ হলো ক্রিটিক্যাল থিংকিং ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। কিন্তু একজন জালিয়াত শিক্ষক যিনি নিজে প্রতারণার পথ বেছে নিয়েছেন, তিনি কখনো শিক্ষার্থীদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং শেখাবেন? তিনি তো ভয় পাবেন—যদি শিক্ষার্থীরা ক্রিটিক্যাল থিংকিং করে প্রশ্ন তোলে, তাহলে তাঁর জালিয়াতি ধরা পড়ে যেতে পারে! তাই তিনি শিক্ষার্থীদের চুপ থাকতে শেখাবেন, প্রশ্ন না করতে শেখাবেন। তার মানে আমরা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ পঙ্গু করে দিচ্ছি।

তাই বলতে বাধ্য হচ্ছি—আমরা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চরমভাবে অপ্রস্তুত। আর এই অপ্রস্তুততার দায় কার? যারা জালিয়াতি করেছে, নাকি যারা তা প্রতিরোধ করতে পারেনি? নাকি যারা এসব দেখেও চুপ করেছে? নাকি সেই নীতি প্রণেতারা, যারা কাগজে শুধু নীতি লিখে রেখে দিয়েছেন, বাস্তবায়ন করেননি? দায় সবাই মিলিয়ে নিচ্ছে।

সুযোগের জানালাপুরো সিস্টেম পরিবর্তনের সময় এসেছে

অন্ধকার থাকলেই বলে না যে আলো আসবে না। এই ঘটনার পেছনে একটি ইতিবাচক সম্ভাবনাও লুকিয়ে আছে। এখন এই ঘটনা পুরো সিস্টেমের পরিবর্তন করার সুযোগ তৈরি করেছে। যেমনটি এক শিক্ষাবিদ বলেছেন—"কোনো সিস্টেমের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।"

কল্পনা করুন—যদি এই জালিয়াতি আরও পরে ধরা পড়ত, তাহলে ক্ষতি আরও বেশি হতো। আরও কত শিক্ষক আরও কত বছর জাল সনদ নিয়ে ক্লাস নিতেন, আরও কত টাকা বেতন নিয়ে ফেলতেন, আরও কত শিক্ষার্থী ভুল পথে চালিত হতো। স্নিগ্ধা রানী দাসের ঘটনা ধরা পড়েছে ২০২৪ সালে—তিনি ২০১২ সাল থেকে শিক্ষকতা করছেন। যদি আরও ৫ বছর পরে ধরা পড়ত, তাহলে তিনি আরও ৫ বছরের বেতন নিয়ে ফেলতেন, আরও ৫০০ শিক্ষার্থীকে ভুল শিক্ষা দিতেন। তাই এটিকে পজিটিভ হিসেবে দেখা যায়—এখনই ধরা পড়েছে, এখনই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

এক সাবেক শিক্ষা সচিব বলেছেন, "প্রতিটি সংকটের মধ্যেই সুযোগ লুকিয়ে থাকে। এই জালিয়াতির ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এখন আমরা যদি সঠিক ব্যবস্থা নেই, তাহলে এই জালিয়াতি আর কখনো হবে না।"

এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। অনলাইন সনদ যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন একটি সিস্টেম তৈরি করতে হবে যেখানে সনদ জাল করা অসম্ভব হবে। শিক্ষক নিয়োগের আগে প্রতিটি সনদ তিনস্তর যাচাই করতে হবে। ডিআইএর কাজকে ডিজিটালাইজ করতে হবে যাতে পরিদর্শনের পর দেরি না হয়। সনদ জালিয়াতির শাস্তি কঠোর করতে হবে—শুধু চাকরি বাতিল আর টাকা ফেরত নয়, বরং জেল ও অর্থদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।

বুদ্ধিমান জালিয়াতিরা আর শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা

এই জালিয়াতিকারীদের একটি বিষয় স্বীকার করতেই হয়—তারা নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমান। কারণ জাল সনদ তৈরি করা, সেটি এনটিআরসিএর যাচাই এড়ানো, স্কুল কর্তৃপক্ষকে বোঝানো, দশ বছর ধরে চাকরি চালিয়ে যাওয়া—এসবের জন্য প্রয়োজন চরম বুদ্ধি, সৃজনশীলতা ও কৌশলী মন। স্নিগ্ধা রানী দাস এক পুরুষের সনদ ব্যবহার করে নারীরূপে চাকরি পেয়েছেন—এর জন্য লাগে অসাধারণ উদ্যোগ ও মস্তিষ্কপ্রসূত কৌশল। আবু সুফিয়ান ২০১২ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত টানা সাত বছর প্রশ্নের মুখে পড়েননি—এর মানে তিনি জানতেন কীভাবে সিস্টেমকে এড়িয়ে যেতে হয়।

অথচ, এই বুদ্ধি যদি সঠিক কাজে লাগানো যেত, তাহলে হয়ত তারা প্রকৃত শিক্ষক হতেন, গবেষক হতেন, উদ্ভাবক হতেন। তাদের সেই ক্রিয়েটিভিটি যদি সমাজের কল্যাণে কাজ করত, তাহলে বাংলাদেশ আজ অন্য জায়গায় থাকত। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বুদ্ধির ইতিবাচক প্রয়োগ শেখাতে ব্যর্থ। শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে মুখস্থবিদ্যার উপরে জোর দেয়, সেখানে সৃজনশীল বুদ্ধির কোনো মূল্য নেই। যার বুদ্ধি আছে, সে সেই বুদ্ধিকে অন্য পথে চালিত করে—যেমন জালিয়াতি।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা নিজেকে দেখেই বলেছেন, ড. ইউনূস যেমন বলেছেন, "যে জাল করতে পারে, তার মধ্যে ক্রিয়েটিভিটি আছে, কিন্তু তা ধ্বংসাত্মক পথে যাচ্ছে।" এই ধ্বংসাত্মক পথ বন্ধ করতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষার্থীকে শেখাতে হবে—তোমার বুদ্ধি তুমি কোথায় প্রয়োগ করবে, সেটাই আসল।

প্রভাব: যখন প্রতারণা ছড়ায় ক্লাসরুমের দেয়াল পেরিয়ে

এই জাল সনদের ঘটনা শুধু অর্থনৈতিক অপচয় নয়; এর প্রভাব বহুগুণে গভীর। প্রথমত, শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন অযোগ্য শিক্ষক। যিনি নিজেই জালিয়াতি করে চাকরি পেয়েছেন, তিনি কীভাবে শিশুদের সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেবেন? এক সাবেক শিক্ষক বলেছিলেন, "যে গাছ নিজেই বাঁকা, সে গাছ আরেকটিকে সোজা করতে পারে না।" এই জাল সনদধারী শিক্ষকরা সেই বাঁকা গাছের মতো—তাঁরা নিজেরাই প্রতারণার ফসল, অথচ তাঁদের হাতে অর্পণ করা হয়েছে জাতির ভবিষ্যৎ।

  • দ্বিতীয়ত, এটি শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানকে ধ্বংস করে। একটি শ্রেণিকক্ষে যদি একজন ভুয়া সনদধারী শিক্ষক পড়ান, তবে সেই ক্লাসের শিক্ষার্থীরা সঠিক জ্ঞান পায় না। পরীক্ষায় ভালো ফল হয় না। তারা উচ্চশিক্ষায় গিয়েও ব্যর্থ হয়। এভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জড়তা, অসততা ও অযোগ্যতার বীজ বপন হয়।
  • তৃতীয়ত, এই প্রতারণা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সরকারি বেতনভুক্ত (এমপিও) এসব ভুয়া শিক্ষক প্রতি মাসে বেতন নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। টাকাটা আসছে জাতীয় বাজেট থেকে—সাধারণ করদাতার ঘাম থেকে। অথচ সেই টাকা যাচ্ছে অযোগ্য ও প্রতারকদের হাতে।
  • চতুর্থত, এটি সমাজে অসততার সংস্কৃতি তৈরি করে। যখন একজন শিক্ষক—যিনি সমাজের কাছে এক আদর্শ ব্যক্তি—ভুয়া সনদ নিয়ে শিক্ষকতা করতে পারেন এবং তা এত বছর ধরে ধরা পড়ে না, তখন সমাজের অন্যান্য পেশার লোকেরাও উৎসাহিত হন প্রতারণায়। শিক্ষকই যখন অসৎ, তখন সমাজের আর কার মুখে দোষ দেওয়া যায়?
  • পঞ্চমত, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করে। বাংলাদেশ শিক্ষাক্ষেত্রে নানা উন্নয়নের কথা বলে। কিন্তু যখন জানা যায়, এখানে শিক্ষকরাই সনদ জাল করেন, তখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব বিশ্বদরবারে কমে যায়। ড. ইউনূসের ভাষায়—"বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না।"

দায় এড়ানোর নৈপুণ্য: মন্ত্রণালয়ের কৌশল

  • প্রশ্ন হচ্ছে—এত বড় জালিয়াতির পর দায় কে নিচ্ছে? মন্ত্রণালয় কীভাবে দায় এড়িয়ে চলছে? দেখুন না চমৎকার কৌশল। যখন ডিআইএ প্রতিবেদন দেয়, তখন মন্ত্রণালয় বলে, "আমরা চিঠি দিয়েছি, ব্যবস্থা নিতে বলেছি।" মানে, দায়িত্বটা অন্য কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া। যেমন—ডিআইএ চিহ্নিত করে, মন্ত্রণালয় ব্যবস্থার কথা বলে, মাউশিকে চিঠি দেয়, মাউশি আবার স্কুল কর্তৃপক্ষকে বলে, স্কুল কর্তৃপক্ষ বলে "আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায়।" এভাবে দায় এড়ানোর এক মলাটবদ্ধ শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে।
  • দ্বিতীয় কৌশল—সময়ক্ষেপণ। ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের উদাহরণ দেখুন। ডিআইএ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরিদর্শন করে। প্রতিবেদন জমা দেয় গত জানুয়ারিতে—মানে প্রায় চার বছর পর! এই চার বছরে ওই শিক্ষক আরও লাখ লাখ টাকা বেতন নিয়ে ফেলেছেন।
  • তৃতীয় কৌশল—আইনি জটিলতা তৈরি। অনেক সময় মন্ত্রণালয় বলে, "আইনগত মতামত প্রয়োজন", "নীতি নির্ধারণী সভা ডাকা হবে", "মন্ত্রণালয়ের জটিলতা রয়েছে"। অথচ এই অজুহাতে বছরের পর বছর কেটে যায়।
  • চতুর্থ কৌশল—কাগুজে ব্যবস্থা। মন্ত্রণালয় চিঠি দেয়, ফাইল করে, প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু বাস্তবে কিছু হয় না।
  • পঞ্চম কৌশল—কাউকে প্রকৃত শাস্তি না দেওয়া। শুধু টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু কখনো জেল-জরিমানা হয় না।

উপসংহার: নীতি থেকে বাস্তবায়নঅঙ্গীকার পালনের সময়

শেষ প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে—দায়ী কে? শুধু কি ওই ১ হাজার ১৫৬ জন শিক্ষক? নাকি তাদের সঙ্গে পুরো সিস্টেম, যেখানে ন্যাশনাল ইনটিগ্রিটি স্ট্র্যাটেজি কাগজে পড়ে আছে, আইএপএ ফাইলে বন্দি, বাংলাদেশ ইন্টিগ্রিটি পলিসি কেবল মন্ত্রণালয়ের দেওয়ালে টানানো?

আমরা অঙ্গীকার করি, ব্রত গ্রহণ করি, পরিকল্পনা করি—কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। শিক্ষক সনদ জালিয়াতির ঘটনা প্রমাণ করল—কাগজে যা লেখা আর বাস্তবে যা ঘটে, তার ব্যবধান আকাশ-পাতাল। যদি ইন্টিগ্রিটি পলিসি বাস্তবায়িত হতো, তাহলে এনটিআরসিএ কি ঘুষ নিয়ে জাল সনদ পাস করাতে পারত? ডিআইএ কি ৪ বছর ধরে প্রতিবেদন জমা দিতে দেরি করতে পারত? মন্ত্রণালয় কি 'চিঠি দিয়েছি' বলে দায় এড়াতে পারত? কখনো না।

এক সাবেক আমলা বলেছেন—"আমরা নীতি প্রণয়নে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, কিন্তু বাস্তবায়নে আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।" এই বাস্তবায়নের শূন্যতা পূরণ করার সময় এসেছে। নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা কেবল কাগজের নীতি না থেকে বাস্তব পর্যায়ে চালু করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে সনদ যাচাই, বেতন দেওয়া, পরিদর্শন করা—প্রতিটি স্তরে ইন্টিগ্রিটি পলিসির প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

ঠিক এইখানেই আটকে যায় হাসি। বুকের ভেতর তখন হাজার প্রশ্ন—দায়ী কে? শুধু কি ওই ১ হাজার ১৫৬ জন, না পুরো ব্যবস্থা? যুগ যুগ ধরে চলে আসা ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় রসিকতা’ কি এবার থামবে, নাকি আবার নতুন পালক গজাবে? অনলাইন সনদ যাচাই শুরু হয়েছে। কিন্তু সেটি কাজে লাগানোর মানসিকতা, দায়িত্ববোধ আর জবাবদিহিতা—এই তিনটি স্তম্ভ ছাড়া কেবল প্রযুক্তি দিয়ে হবে না। তবুও আশা—এই সংকটই আমাদের জাগিয়ে তুলবে। নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এখনই।

আমরা নীরব দর্শক। হাসি আর কান্নার স্রোতে ভাসি। কিন্তু দায় তো কারও না কারও থাকবেই। সময় এসেছে সত্যি সত্যি সেই দায়ীকে খুঁজে বের করার। হাসি থামিয়ে। কারণ, এ রসিকতা আর পৌঁছায় না শ্রোণীতে। পৌঁছায় ক্লাসরুমে—সেখানকার শিশুদের অজানা চোখে। যারা এখনও জানে না, তাদের সামনে দাঁড়ানো ‘শিক্ষক’টি আসলে এক প্রতারক। আর সেই প্রতারণার দায় কার? শিক্ষকের? নাকি সেই ব্যবস্থার—যে এই শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েছে, যাচাই করেনি, বছরের পর বছর বেতন দিয়েছে, এবং আজ এসে বলে, "আমরা তো চিঠি দিয়েছি"?

[চলবে]

অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#দায়ীকে #জালসনদ #শিক্ষাব্যবস্থা #শিক্ষাসংস্কার #ভুয়াসনদ #শিক্ষকনিয়োগ #এনটিআরসিএ #ডিআইএ #দুর্নীতি #জবাবদিহিতা #ইন্টিগ্রিটিপলিসি #ন্যাশনালইনটিগ্রিটিস্ট্র্যাটেজি #সনদযাচাই #অনলাইনভেরিফিকেশন #শিক্ষামন্ত্রণালয় #এমপিও #শিক্ষকজালিয়াতি #বাংলাদেশশিক্ষা #অধিকারপত্র #শিক্ষাধারাবাহিক #দুইপর্বে_জালসনদে_শিক্ষকতা #দুর্নীতিরভূত #কাগুজেনীতি #বাস্তবায়নকোথায় #জাতিরভবিষ্যৎ #দায়স্বীকার #শিক্ষায়স্বচ্ছতা #প্রতারণারদায় #সনদজালিয়াতি #বাংলাদেশ

Keywords: জাল সনদে শিক্ষকতা, শিক্ষক সনদ জালিয়াতি, শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি, এনটিআরসিএ ভুয়া সনদ



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: