অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় / সমাজ মনস্তাত্ত্বিক ফিচার
এই নিবন্ধটি সমকালীন বাংলাদেশের সমাজ ও মনস্তত্ত্বের এক রূপক বিশ্লেষণ। আদিম ইতিহাসে আজাজিল ছিল আকাশের ধ্রুবতারা, যার ইবাদতে মুখর ছিল সাত আসমান। কিন্তু একটি মাত্র 'অহংকার' তাকে পরিণত করেছিল অভিশপ্ত ইবলিশে। এই রূপক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে আয়না হিসেবে ব্যবহার করে এই বিশেষ ফিচারে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে গত দুই বছরে বাংলাদেশের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের চিত্র। প্রশ্ন ওঠে, কেন হঠাৎ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি শয়তানের প্ররোচনায় এক অশান্তির লীলাভূমিতে পরিণত হলো? কেন শিক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা হচ্ছে? কেন 'মব জাস্টিস'-এর নামে এক পৈশাচিক উল্লাসে মেতেছে জনতা? এই নিবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে কীভাবে ধর্মের শান্ত বাণীকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে বন্দি করা হয়েছে এবং কেন শয়তান তার বিভাজনের রাজনীতির জন্য গত দুই বছর এই বদ্বীপকেই প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছিল। রয়েছে এক নিবিঢ় বিশ্লেষণ। তাই এটি কেবল একটি প্রবন্ধ নয়, বরং আমাদের সামাজিক পতনের এক নিবিড় ময়নাতদন্ত। আগুনের ঊর্ধ্বমুখী শিখা যেমন সব পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, আমাদের ভেতরের 'ইবলিশী অহংকার' কি তবে আমাদের প্রিয় দেশকেও সেই ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে? উত্তরের খোঁজে পড়ুন এই সুদীর্ঘ ও চিন্তাশীল ফিচারটি।
আলো থেকে নির্বাসন: আজাজিলের আকাশযাত্রা ও অহংকারের আগুন
সৃষ্টির প্রারম্ভিক বিস্ময়ময় নীরবতায়, যখন সময়ের শরীরে ইতিহাসের প্রথম রেখাগুলো আঁকা হচ্ছিল, তখন আসমানি জগতের এক উজ্জ্বল চরিত্রের নাম ছিল আজাজিল। সে ছিল ইবাদতের দীপ্তিতে আলোকিত, সাধনার গভীরতায় বিস্ময়কর, আর আনুগত্যের বাহ্যিক সৌন্দর্যে প্রায় অতুলনীয়। ধর্মীয় বয়ানে তার অতীত যেন এক দীর্ঘ আলোকময় মহাকাব্য—ফেরেশতাদের সাহচর্যে হাজার বছরের পরিক্রমা, আরশের চারপাশে ভক্তিপূর্ণ তাওয়াফ, জান্নাতের প্রহরী হিসেবে অবস্থান, মুকাররাবিনদের সর্দার হিসেবে মর্যাদার উঁচু আসন। সে কেবল এক উপাসক ছিল না; সে ছিল এমন এক সত্তা, যার দীর্ঘ সাধনা তাকে সাধারণ অস্তিত্বের সীমা ছাড়িয়ে আসমানি মর্যাদার এক বিস্ময়কর উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।
তার আধ্যাত্মিক যাত্রা যেন স্তর থেকে স্তরে উত্তরণের এক প্রতীকী মানচিত্র। প্রথম আকাশে সে ছিল ‘আবেদ’—নিবেদিত উপাসক; দ্বিতীয় আকাশে ‘জাহেদ’—সংযমী ও নির্লোভ সাধক; তৃতীয় আকাশে ‘আরেফ’—জ্ঞান ও উপলব্ধির অধিকারী; চতুর্থ আকাশে ‘ওলি’—ঘনিষ্ঠতার মর্যাদায় ভূষিত; পঞ্চম আকাশে ‘তকি’—পরহেজগারির প্রতীক; ষষ্ঠ আকাশে ‘খাজিন’—রক্ষকের সম্মানে অভিষিক্ত; আর সপ্তম আকাশে সে পরিচিত হলো ‘আজাজিল’ নামে। প্রতিটি নাম ছিল যেন তার সাধনার একেকটি সোপান, একেকটি গুণের ভাষ্য, একেকটি উত্থানের চিহ্ন। কিন্তু এই উত্থানের ভেতরেই নীরবে জন্ম নিচ্ছিল এক অদৃশ্য বিপর্যয়—অহংকারের বীজ, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, অথচ একদিন সমগ্র অস্তিত্বকে গ্রাস করে ফেলে।
আজাজিলের ট্র্যাজেডি এখানেই যে, তার পতন দীর্ঘ অবাধ্যতার ফল নয়; বরং দীর্ঘ ইবাদতের পর এক মুহূর্তের আত্মম্ভরিতার বিস্ফোরণ। আদম (আ.)-কে সিজদার ঐশ্বরিক নির্দেশ যখন এল, তখন তার অন্তরের সুপ্ত আগুন জ্বলে উঠল শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে। সে মাটির সামনে নত হতে অস্বীকার করল, কারণ সে নিজেকে আগুনের সন্তান বলে ভাবল; আর সেই আগুনের ঊর্ধ্বমুখী স্বভাবই তাকে বিনয়ের মাটিতে মাথা রাখতে দিল না। তার যুক্তি ছিল উপাদানের, কিন্তু অপরাধ ছিল আদেশ অমান্যের। তার ভাষা ছিল শ্রেষ্ঠত্বের, কিন্তু পরিণতি হলো অপমানের। যে সত্তা আলোয় উজ্জ্বল ছিল, সে মুহূর্তেই নির্বাসিত হলো অন্ধকারে; আজাজিল থেকে সে হয়ে উঠল ইবলিস—বিতাড়িত, অভিশপ্ত, অহংকারের চূড়ান্ত পরিণতির এক চিরস্থায়ী প্রতীক।
এই আখ্যান তাই কেবল ধর্মীয় অতীতের কোনো ভয়াবহ গল্প নয়; এটি মানুষের মনস্তত্ত্বেরও এক গভীর আয়না। মানুষও জ্ঞান অর্জন করে, ক্ষমতার আসনে বসে, নৈতিকতার ভাষা মুখস্থ করে, সভ্যতার নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে; কিন্তু সেই সব অর্জনের ভেতরে যদি বিনয় না থাকে, তবে সভ্যতার মুখোশের আড়ালেই জন্ম নেয় ইবলিসীয় প্রবৃত্তি। যে অহংকার বলে—আমি শ্রেষ্ঠ, আমার দল শ্রেষ্ঠ, আমার মত শ্রেষ্ঠ, আমার আগুনই সত্য—সেই অহংকার একদিন মানুষকে মানুষের সামনে দাঁড় করায় না, বরং মানুষকে মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শেখায়।
এই কারণেই আজাজিলের পতনের পুরোনো কাহিনি আজও সমকালীন বাংলাদেশের সামাজিক আয়নায় নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। গত দুই বছরে জনজীবনের নানা স্তরে যে উগ্রতা, অপমান, শিক্ষক নিপীড়ন, মব সন্ত্রাস, ভার্চুয়াল বিদ্বেষ ও সামাজিক বিচারের নামে উন্মত্ততার দৃশ্য দেখা গেছে, সেখানে আমরা যেন সেই আগুনেরই আধুনিক ভাষ্য শুনি। এখানে মানুষ কখনো যুক্তির বদলে চিৎকারকে বেছে নিচ্ছে, কখনো সত্যের বদলে গুজবকে, কখনো ন্যায়ের বদলে দলবদ্ধ প্রতিশোধকে। যে সমাজে জ্ঞানের আসন অপমানিত হয়, শিক্ষক ভীত হয়ে পড়েন, দুর্বল মানুষ জনতার ক্রোধের সামনে একা হয়ে যায়, সেখানে আজাজিলের আগুন নতুন পোশাকে ফিরে আসে—কখনো ধর্মের নামে, কখনো রাজনীতির নামে, কখনো নৈতিকতার নামে, কখনো জনতার বিচারের নামে।
ইবলিসের ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে, পতন সবসময় বাইরে থেকে শুরু হয় না; অনেক সময় তা শুরু হয় অন্তরের অদৃশ্য উচ্চাসন থেকে। যে মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, যে সমাজ নিজের ক্রোধকে পবিত্রতা মনে করে, যে জনপদ বিনয় হারিয়ে শক্তিকেই ন্যায় বলে ঘোষণা করে—সেই জনপদ ধীরে ধীরে আগুনের দম্ভে পুড়ে যায়। আজাজিলের পতন তাই আমাদের জন্য শুধু ধর্মীয় স্মরণ নয়, এক সামাজিক সতর্কবার্তা: ইবাদত, জ্ঞান, ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা কিংবা সংখ্যার জোর—কোনোটিই মানুষকে রক্ষা করতে পারে না, যদি তার ভেতরে বিনয়, ন্যায়বোধ ও আত্মসমালোচনার আলো নিভে যায়।
প্রারম্ভিক কথন: আজাজিল থেকে ইবলিশ—এক ট্র্যাজিক রূপান্তর
উপরের আলোচনায় দেখা যায়, সৃষ্টির আদি লগ্নে যখন মহাকালের চাকা মাত্র ঘুরতে শুরু করেছে, তখন এই মহাবিশ্বের ইতিহাসে এক বিচিত্র চরিত্রের উন্মেষ ঘটে। তার নাম ছিল আজাজিল। আকাশমন্ডলীর সপ্তম স্তরে যার অবস্থান ছিল নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল। আপনার দেওয়া তথ্যানুসারেই আমরা দেখি, তার সেই সোনালী অতীতের খতিয়ান কত বিস্ময়কর: ৮০ হাজার বছর ফেরেশতাদের সাহচর্য, ৩০ হাজার বছর মুকাররাবিনদের সর্দার হিসেবে নেতৃত্ব এবং ১৪ হাজার বছর আরশের তাওয়াফ। প্রথম আকাশ থেকে সপ্তম আকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তার নাম ছিল ভিন্ন ভিন্ন গুণের পরিচায়ক—আবেদ, জাহেদ, আরেফ থেকে ওলি কিংবা তকি।
সে ছিল একনিষ্ঠ উপাসক, কিন্তু তার ভেতরে সুপ্ত ছিল এক অদৃশ্য ‘অহং’ বা ‘Ego’। যে আগুন দিয়ে তাকে গড়া হয়েছিল, সেই আগুনের ঊর্ধ্বমুখী স্বভাবই তাকে ধুলোর তৈরি মানুষের সামনে নত হতে বাধা দিল। ফলে এক নিমেষে আজাজিল থেকে সে হয়ে গেল ‘ইবলিশ’—বা বিতাড়িত। এই আদি ইতিহাস কেবল একটি ধর্মীয় কাহিনী নয়, বরং এটি মানুষের মনস্তত্ত্বের এক গভীর রূপক। গত দুই বছরে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভার্চুয়াল জীবনে আমরা এই ‘ইবলিশীয়’ প্রবৃত্তি বা অহংকারের এক অদ্ভুত পুনর্জাগরণ লক্ষ্য করেছি।
প্রথম খণ্ড: জ্ঞানের দম্ভ ও সহনশীলতার আকাল
ইবলিশের পতনের মূল কারণ ছিল তার ‘জ্ঞানের দম্ভ’—নিজেকে বেশি অভিজ্ঞ, বেশি শ্রেষ্ঠ, বেশি বিশুদ্ধ ভাবার সেই আত্মবিভ্রম। সে আদম (আ.)-কে দেখেছিল কেবল বাহ্যিক উপাদানের চোখে; মাটিকে দেখেছিল হীন, আর আগুনকে ভেবেছিল উচ্চতর। এই একরৈখিক বিচারবোধই তাকে আনুগত্যের সৌন্দর্য থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। আজকের বাংলাদেশেও গত দুই বছরে আমরা যেন সেই একই মানসিকতার সামাজিক পুনরাবৃত্তি দেখছি—যেখানে মানুষকে তার পূর্ণ মানবিক সত্তা দিয়ে নয়, বরং তার ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক দুর্বলতা, পেশা কিংবা কথিত একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ত্বরিত উত্তেজনা, অর্ধসত্যের প্রচার, গুজবের আগুন এবং জনতার তাৎক্ষণিক রায়—সব মিলিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের ‘তথ্যের দম্ভ’ জেঁকে বসেছে। সামান্য কিছু জানা মাত্রই অনেকে নিজেকে সত্যের শেষ বিচারক ভাবতে শুরু করছে; অথচ সত্য, ন্যায় ও বিচার—কোনোটিই জনতার হুঙ্কারে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
এই অসহিষ্ণুতার ভয়াবহ উদাহরণ দেখা যায় ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এক কথিত পীরের আস্তানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়; এ ঘটনায় আব্দুর রহমান ওরফে শামীম নামে একজন নিহত হন, যাঁকে কিছু প্রতিবেদনে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটির ভয়াবহতা শুধু একটি প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অভিযোগ প্রমাণের আগেই জনতা কীভাবে আদালত, আইন, তদন্ত ও মানবিক বিবেচনার সব দরজা ভেঙে নিজেরাই শাস্তিদাতা হয়ে উঠতে পারে।
আরও নির্মম উদাহরণ ময়মনসিংহের ভালুকা। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়; পরে তাঁর মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কথাও গণমাধ্যমে উঠে আসে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযোগের প্রকৃতি নিয়েও ধোঁয়াশা ছিল, আর র্যাব জানায়, ধর্ম অবমাননার বিষয়টি “অস্পষ্ট”। তবু অস্পষ্ট অভিযোগের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জীবন জনতার নিষ্ঠুরতার কাছে সমর্পিত হয়ে গেল।
এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে ভয়াবহ এক সামাজিক আয়না তুলে ধরে। ইবলিশ যেমন আদমের ভেতরের মর্যাদা দেখতে ব্যর্থ হয়েছিল, তেমনি আমরা ক্রমশ মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমরা অভিযোগ শুনেই রায় দিচ্ছি, পরিচয় দেখেই ঘৃণা তৈরি করছি, মতভেদ দেখেই শত্রু বানাচ্ছি। ‘আমি জানি’, ‘আমরাই সত্য’, ‘আমরাই ধর্মরক্ষক’, ‘আমরাই ন্যায়বিচারক’—এই সম্মিলিত দম্ভই আজকের জনপদে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ সভ্য সমাজে ন্যায়বিচার মানে প্রতিশোধ নয়; বিচার মানে আইন, প্রমাণ, প্রক্রিয়া ও মানবমর্যাদার সুরক্ষা। যেখানে এই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে, সেখানে কেবল একজন মানুষ নিহত হন না—সেখানে রাষ্ট্রের নৈতিক মেরুদণ্ড, সমাজের সহনশীলতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা একসঙ্গে দগ্ধ হয়ে যায়।
অতএব, ইবলিশের কাহিনি আজ আমাদের জন্য কেবল ধর্মীয় রূপক নয়; এটি আমাদের সময়ের সামাজিক সতর্কবার্তা। জ্ঞান যখন বিনয় হারায়, তথ্য যখন প্রজ্ঞাহীন উত্তেজনায় রূপ নেয়, ধর্মীয় আবেগ যখন ন্যায়বিচারের বদলে উন্মত্ততার হাতিয়ার হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে ইবলিশীয় দম্ভের দিকে অগ্রসর হয়। আগুন তখন শুধু ঘরবাড়ি পোড়ায় না; পোড়ায় বিবেক, পোড়ায় সহনশীলতা, পোড়ায় মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই ক্ষতগুলো তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি সমাজের পতন শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ আইনকে অপেক্ষা করতে শেখে না, সত্যকে যাচাই করতে চায় না, আর অন্য মানুষের জীবনকে নিজের ক্রোধের চেয়ে কম মূল্যবান মনে করে।
দ্বিতীয় খণ্ড: বিভাজনের রাজনীতি ও ইবলিশের ছায়া
ইবলিশের অন্যতম কৌশল হলো বিভাজন—মানুষকে মানুষ থেকে আলাদা করা, পরিচয়কে সম্পর্কের ওপর বসিয়ে দেওয়া, আর মতভেদকে ঘৃণার ভাষায় অনুবাদ করা। জান্নাত থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তার প্রতিশোধপরায়ণ অঙ্গীকারের কেন্দ্রে ছিল মানুষের ভেতরে সন্দেহ, অহংকার ও বিরোধের আগুন ছড়িয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের গত দুই বছরের অস্থির সময়গুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, সেই বিভাজনের ছায়া যেন আমাদের সামাজিক শরীরের ভেতর ক্রমশ গভীর হয়েছে। রাজনীতি, ধর্ম, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, পেশা, এমনকি ভার্চুয়াল পরিচয়—সবকিছুই এখন কখনো কখনো মানুষকে কাছাকাছি আনার বদলে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর উপাদানে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের গত দুই বছরের অস্থির সময়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের সমাজ কতটা খণ্ড-বিখণ্ড হয়েছে।
ইবিলিশের সবচেয়ে বড় ইন্টারভেনশন ছিল ধর্মীয় বিভাজন তৈরিতে । ধর্মের নামে উগ্রতা এবং একে অপরকে ‘বাতিল’ বলে ঘোষণা করার যে প্রবণতা বেড়েছে, তা মূলত সেই আদি শয়তানি প্রবৃত্তিরই প্রতিফলন। এরপরেই তৈরি করতে চেয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। এখানে একদল মানুষ আকাশচুম্বী সম্পদের পাহাড় গড়ছে (আগুনের মতো ঊর্ধ্বমুখী), আর একদল মানুষ দারিদ্র্যের ধুলোয় মিশে আছে। এই যে বৈষম্য এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ, একে পুঁজি করেই ইবলিশের আদর্শ বা বিশৃঙ্খলা সমাজে প্রভাব বিস্তার করছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সামাজিক অস্থিরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ এবং সত্যের চেয়ে গুজবের দাপট বেশি ছিল। ইবলিশ যেমন মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে গন্ধম ফল খাইয়েছিল, গত দুই বছরে সাইবার জগতের ‘গুজব’ ও ‘ভুয়া তথ্য’ আমাদের সাধারণ মানুষকে সেভাবেই বিভ্রান্ত করেছে।
ধর্মীয় বিভাজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় হলো, অভিযোগ প্রমাণের আগেই জনতার একাংশ নিজেকে বিচারক ও শাস্তিদাতা ভাবতে শুরু করেছে। এই বিভাজন শুধু সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু সম্পর্কের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধর্মের ভেতরেও ধর্মীয় ভিন্নচর্চার বিরুদ্ধে আক্রমণে রূপ নিচ্ছে। সুফি মাজার, দরবার, বাউল ও লোকধর্মীয় সংস্কৃতির ওপর হামলার ধারাবাহিকতা দেখায়, সহনশীলতার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে মাজারে হামলার ঘটনা বিভিন্ন বিভাগে ছড়িয়ে পড়ে; পরবর্তী প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৯৭টি মাজার-দরবারে হামলার তথ্যও উঠে আসে, যেখানে প্রাণহানি ও শত শত আহতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মানিকগঞ্জে বাউল শিল্পী ও তাঁদের অনুসারীদের ওপর হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও এই সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতারই আরেক রূপ। এখানে ইবলিশীয় বিভাজন কাজ করে ধর্মের নামে, অথচ তার ফল হয় ধর্মেরই মানবিক আত্মাকে আঘাত করা।
রাজনৈতিক বিভাজনও গত দুই বছরে সামাজিক অস্থিরতাকে গভীর করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার ও সহিংসতার স্মৃতি এখনও জনমনে দগদগে ক্ষত। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের প্রতিবেদনে ওই সময়ের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, হত্যাকাণ্ড ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতার কথা উঠে আসে; ইউনিসেফও তখন সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশুর মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। আন্দোলনের ন্যায্যতা বা রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে ভিন্ন মত থাকতে পারে, কিন্তু যখন রাষ্ট্র, দল, জনতা ও প্রতিশোধের ভাষা একে অপরকে গ্রাস করে, তখন সমাজে যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় প্রতিহিংসা।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সংযোগও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তার ও জামিন প্রত্যাখ্যানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের মধ্যে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ নিহত হন। এ ঘটনায় প্রতিবাদ, গ্রেপ্তার, তদন্ত ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একটি ঘটনা কীভাবে মুহূর্তে সাম্প্রদায়িক উদ্বেগ, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আইনশৃঙ্খলার সংকটে রূপ নিতে পারে। এখানে অপরাধী কে, বিচার কীভাবে হবে—সেটি আদালতের বিষয়; কিন্তু সমাজের জন্য শিক্ষা হলো, উত্তেজিত পরিচয়-রাজনীতি মানুষের জীবনকে খুব দ্রুত বিপন্ন করে তোলে।
অর্থনৈতিক বৈষম্যের ক্ষেত্রেও বিভাজনের আগুন কম ভয়াবহ নয়। একদিকে অল্পসংখ্যক মানুষের সম্পদের পাহাড় আকাশমুখী আগুনের মতো উঁচুতে উঠছে, অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের জীবন দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও বকেয়া মজুরির ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। আশুলিয়ায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মজুরি ও কর্মপরিবেশের দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে একজন নিহত হওয়ার ঘটনা, কিংবা ২০২৫ সালে গাজীপুর-সাভারে বকেয়া বেতন ও কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে শ্রমিকদের বিক্ষোভ—এসব শুধু শ্রম অস্থিরতা নয়; এগুলো সামাজিক অসমতার জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। ক্ষুধার্ত মানুষের কান্না যখন প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার পায় না, তখন রাস্তাই হয়ে ওঠে তার শেষ ভাষা।
এই সব ঘটনার ভেতর দিয়ে একটি সাধারণ সূত্র দেখা যায়—যুক্তির চেয়ে আবেগ, প্রমাণের চেয়ে গুজব, বিচারের চেয়ে প্রতিশোধ, আর মানুষের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠছে। ইবলিশ যেমন প্রলোভন, সন্দেহ ও আত্মগরিমার ভাষায় মানুষকে বিচ্যুত করেছিল, তেমনি আজকের সাইবার জগতে ভুয়া তথ্য, পুরোনো ভিডিও, বিকৃত পোস্ট, ধর্মীয় উত্তেজনা ও রাজনৈতিক প্রচারণা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটি পোস্ট, একটি সম্পাদিত ভিডিও, একটি অসম্পূর্ণ বাক্য—এসব এখন কখনো কখনো মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি, উপাসনালয়, পেশা ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত নামিয়ে আনছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক অস্থিরতা তাই কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি গভীর সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংকট। আমরা ক্রমশ ‘আমরা’ ও ‘ওরা’-র ভাষায় বন্দী হয়ে পড়ছি। ধর্মে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, সংস্কৃতিতে, ভার্চুয়াল পরিসরে—সবখানে বিভাজনের রেখা মোটা হচ্ছে, আর মানবিকতার রেখা ক্ষীণ হচ্ছে। ইবলিশের ছায়া এখানেই—সে মানুষকে সরাসরি অমানুষ বানায় না; সে আগে তাকে নিজের অহংকারে নিশ্চিত করে, তারপর অন্য মানুষকে সন্দেহ করতে শেখায়, শেষে তাকে ঘৃণা করতে শেখায়। আর ঘৃণা যখন সামাজিক শক্তি হয়ে ওঠে, তখন একটি জনপদ আগুনে পুড়ে যায়, অথচ আগুনধারীরা ভাবতে থাকে—তারা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করছে।
তৃতীয় খণ্ড: নৈতিক অবক্ষয় ও ভোগের সংস্কৃতি
শয়তানের ইতিহাসের শেষ অংশটি অত্যন্ত করুণ—সে অভিশপ্ত হওয়ার পর থেকে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষকে বিভ্রান্ত করার ছাড়পত্র পেয়েছে। এই ‘বিভ্রান্তি’র আধুনিক রূপ হলো চরম ভোগবাদিতা (Consumerism)।
গত দুই বছরে বাংলাদেশে আমরা কিশোর গ্যাং-এর উত্থান, মাদকের বিস্তার এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে যাওয়ার এক চরম চিত্র দেখেছি। মানুষ এখন ত্যাগের চেয়ে ভোগে বেশি বিশ্বাসী। ইবলিশের সেই ‘অহং’ আজ মানুষের মনে এমনভাবে বাসা বেঁধেছে যে, নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করতে আমরা দ্বিধা করছি না। দুর্নীতি যখন শিষ্টাচারের রূপ নেয়, তখন বুঝতে হবে ইবলিশের এজেন্ডা সফল হচ্ছে।
চতুর্থ খণ্ড: শিক্ষক নিপীড়ন ও শয়তানের ইন্ধন
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মাটিতে শিক্ষক নিপীড়নের যে বীভৎস চিত্র আমরা দেখেছি, তা যেন ইবলিশের সেই আদি দম্ভেরই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ইবলিশ যখন জ্ঞানের দোহাই দিয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করেছিল, তখন সে ভুলে গিয়েছিল যে সত্যিকারের জ্ঞান বিনয় অবাধ্যতা নয়। শিক্ষকেরা হলেন সমাজের আলোকবর্তিকা, যাদের হাত ধরে একটি জাতি অন্ধকার থেকে আলোর পথে অগ্রসর হয়। কিন্তু গত দুই বছরে দেখা গেছে, তুচ্ছ অজুহাতে কিংবা রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভিন্নতার দোহাই দিয়ে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে, গলায় জুতার মালা পরানো হয়েছে কিংবা তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এই যে গুরুজনকে অসম্মান করার সংস্কৃতি, এটি সরাসরি ইবলিশের সেই 'অহং' থেকে উদ্ভূত, যা মানুষকে অন্ধ করে দেয় এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তোলে।
শয়তানের চিরকালীন লক্ষ্য হলো সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। শিক্ষক যখন অপমানিত হন, তখন কেবল একজন ব্যক্তি লাঞ্ছিত হন না, বরং একটি প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়ে। গত দুই বছরে বাংলাদেশে শিক্ষকদের ওপর এই পরিকল্পিত বা স্বতঃস্ফূর্ত আক্রমণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে এক ধরণের 'পৈশাচিক উল্লাস' কাজ করেছে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীককে পদদলিত করে ক্ষমতার আস্ফালন দেখানোই ছিল সেই ইন্ধনের মূল মন্ত্র। ইবলিশ যেমন আদমের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে পারেনি, তেমনি আজকের প্রজন্মের একটি অংশ গুরুজনের শ্রেষ্ঠত্ব বা তাদের শাসনের অধিকারকে মেনে নিতে অস্বীকার করছে। এই অবাধ্যতা ও অশ্রদ্ধার বীজ বপন করে শয়তান আসলে একটি লক্ষ্যহীন ও নীতিহীন সমাজ বিনির্মাণ করতে চাইছে, যেখানে জ্ঞানের চেয়ে পেশিশক্তি আর সম্মানের চেয়ে দম্ভ বড় হয়ে দাঁড়ায়।
পঞ্চম খণ্ড: শয়তানের থাবায় মব সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্যে বাংলাদেশ
বিগত দুই বছরে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর ওপর শয়তানের সবচেয়ে ভয়ংকর থাবাটি পড়েছে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির নামে ছড়ানো এক আদিম উল্লাসের মাধ্যমে। ইবলিশের ইতিহাসে আমরা দেখি, সে সর্বদা বিশৃঙ্খলা বা ‘ফিতনা’র এক চোরাবালি তৈরি করে, যেখানে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। মব সন্ত্রাস হলো ঠিক সেই ধরণের এক পৈশাচিক পরিস্থিতি, যেখানে আইন ও বিচারব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদল মানুষ উন্মত্ত হয়ে ওঠে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তুচ্ছ চুরির অভিযোগ থেকে শুরু করে নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার যে মহোৎসব দেখা গেছে, তা ইবলিশের সেই আদিম হিংস্রতারই আধুনিক সংস্করণ। সেখানে কোনো আদালত নেই, কোনো সাক্ষ্য নেই—আছে শুধু অন্ধ আক্রোশ আর ইবলিশী প্ররোচনা।
শয়তান মানুষকে প্ররোচিত করে ‘বিচারক’ সেজে যাওয়ার অহংকারে। মব সন্ত্রাসে লিপ্ত হওয়া প্রতিটি ব্যক্তি মুহূর্তের জন্য নিজেকে পরম ক্ষমতাধর মনে করে, যা সরাসরি আজাজিলের সেই দম্ভের সাথে তুলনীয়। যখন একদল মানুষ মিলে একজন অসহায় মানুষকে ঘিরে ধরে আঘাত করে, তখন সেখানে মানবিকতা বিদায় নেয় এবং পশুত্ব জেঁকে বসে। গত দুই বছরের পরিসংখ্যান বলছে, এই মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে বহু নিরপরাধ প্রাণ ঝরে গেছে। ইবলিশ যেমন চেয়েছিল আদম সন্তানরা নিজেদের রক্তে হাত রাঙাবে, মব জাস্টিস ঠিক সেই পথটিই প্রশস্ত করে দিচ্ছে। এই অরাজকতা কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং সমাজকে এক আদিম অরণ্যতন্ত্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিই শেষ কথা। শয়তানের এই জয়োল্লাস রুখতে না পারলে, আইন ও বিবেকের শাসন হারিয়ে বাংলাদেশ এক অন্ধকার বৃত্তে আটকা পড়বে।
ষষ্ঠ খণ্ড: শয়তানের প্ররোচনায় ধর্মের বাণী—নীরবে কেঁদে হওয়া অসহায়
ইবলিশের ইতিহাসের সবচেয়ে চতুর অধ্যায়টি হলো তার ‘ধার্মিকতার ছদ্মবেশ’। আপনার দেওয়া চিত্রে আমরা দেখি, সে হাজার বছর ধরে ‘আবেদ’ ও ‘তকি’ নামে খ্যাত ছিল। অর্থাৎ, সে ধর্মকে খুব ভালো করেই চেনে এবং ধর্মের লেবাস পরেই সে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ছড়ায়। গত দুই বছরে বাংলাদেশে আমরা এক অদ্ভুত ও বেদনাদায়ক বাস্তবতা লক্ষ্য করেছি—যেখানে ধর্মের পবিত্র বাণীগুলোকে স্বার্থসিদ্ধি, ঘৃণা ছড়ানো এবং ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ধর্মের মূল কথা যেখানে ছিল শান্তি, ক্ষমা ও সহমর্মিতা; শয়তানের সূক্ষ্ম প্ররোচনায় সেই ধর্মকেই আজ মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে লেলিয়ে দেওয়ার ঢাল বানানো হয়েছে। ফলে ধর্মের প্রকৃত আধ্যাত্মিক নির্যাস যেন আজ লোকলজ্জার ভয়ে কোণে বসে নীরবে অশ্রুপাত করছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে এক ধরণের ‘উগ্র নৈতিকতা’র জন্ম হয়েছে, যা ধর্মের মূল সুরকে ছাপিয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মের দোহাই দিয়ে যেভাবে মানুষকে বিচার করা হচ্ছে (Moral Policing), তাতে ধর্মের সেই মমতাময়ী রূপটি ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। শয়তান চায় মানুষ যেন স্রষ্টার চেয়ে ধর্মের বাহ্যিক আচার আর বিদ্বেষকে বেশি আঁকড়ে ধরে। গত দুই বছরে সাম্প্রদায়িক উস্কানি কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ধর্মের নামে যে আঘাতগুলো এসেছে, তার পেছনে ধর্মের কোনো হাত নেই; বরং ছিল ইবলিশের সেই বিভাজনমুখী চক্রান্ত। যখন কেউ ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সহিংসতাকে জায়েজ করে, তখন স্রষ্টার বাণী তার কাছে গুরুত্ব হারায় এবং ইবলিশের প্ররোচনা জয়ী হয়। ফলে মজিদ বা মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষিত হলেও মানুষের হৃদয়ে ধর্মের যে মায়া ও দয়া থাকার কথা ছিল, তা আজ এক ভীষণ শূন্যতায় পরিণত হয়েছে। ধর্মের বাণী আজ অসহায়, কারণ তার ধারক-বাহকরাই আজ তাকে ঘৃণার ভাষায় অনুবাদ করছে।
সপ্তম খণ্ড: প্রশ্ন জাগে—তবে শয়তান কেন শেষ দুই বছর বাংলাদেশকেই বেছে নিয়েছিল?
প্রবন্ধের এই পর্যায়ে এসে একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন আমাদের মগজে হাতুড়ি পেটায়—হাজার বছরের ইতিহাসের এই কুশলী কারিগর, ইবলিশ, কেন গত দুই বছর ধরে এই বদ্বীপের মানচিত্রকেই তার বিশৃঙ্খলার প্রধান বিচরণক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিল? এর উত্তর কোনো অতিপ্রাকৃত রহস্যে নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ফাটলগুলোর মধ্যেই নিহিত। বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক ক্রান্তিকাল পার করছে যেখানে পুরনো মূল্যবোধ ভেঙে পড়ছে কিন্তু নতুন কোনো সুসংহত নৈতিক কাঠামো দাঁড়ায়নি। ইবলিশ বা শয়তানী প্রবৃত্তি সবসময় সেই জমিনকেই বেছে নেয় যা উর্বর কিন্তু আগাছায় ভরা। গত দুই বছরে বাংলাদেশের মানুষ একদিকে যেমন অর্থনৈতিক অস্থিরতায় দিশেহারা হয়েছে, অন্যদিকে ডিজিটাল বিপ্লবের জোয়ারে ভেসে গিয়ে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়েছে। এই ‘অস্থিতিশীলতা’ এবং ‘অনিশ্চয়তা’ই হলো শয়তানের শ্রেষ্ঠ খেলার মাঠ।
শয়তান কেন বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে, তার আরও একটি গভীর কারণ হলো আমাদের ‘আবেগপ্রবণতা’। আমরা যেমন খুব সহজে ভালোবাসতে জানি, তেমনই খুব সহজে ঘৃণা করতেও শিখি। গত দুই বছরে আমাদের এই আবেগকেই পুঁজি করেছে ইবলিশের ছায়া। যখন একটি সমাজ যুক্তির চেয়ে হুজুগের পেছনে দৌড়ায়, যখন সহনশীলতার চেয়ে অন্যের বিনাশে বেশি আনন্দ পায়, তখন সেই ভূখণ্ডটি শয়তানের জন্য এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। আমাদের ভঙ্গুর বিচারব্যবস্থা, সামাজিক আস্থার সংকট এবং একে অপরকে দমনের তীব্র বাসনা শয়তানকে সুযোগ করে দিয়েছে ‘মব জাস্টিস’ বা ‘শিক্ষক নিপীড়নে’র মতো ঘৃণ্য উৎসব আয়োজন করতে। বাংলাদেশ আজ এক ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে—যেখানে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর বাউলিয়ানা সহজিয়া দর্শনের টুঁটি চেপে ধরেছে এক উগ্র ও পরশ্রীকাতর মানসিকতা। শয়তান এই ফাটলগুলোকেই বড় করে দেখিয়েছে যাতে আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াই।
অষ্টাম খণ্ড: আত্মশুদ্ধির পথ
আজাজিল কেন ইবলিশ হলো? কারণ তার আনুগত্য ছিল শর্তযুক্ত। সে স্রষ্টাকে মানত কিন্তু স্রষ্টার সৃষ্টিকে শ্রদ্ধা করত না। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের এই শিক্ষাটি অত্যন্ত জরুরি। আমরা মুখে নীতির কথা বলি, কিন্তু আচরণে তা প্রতিফলন করি না।
উপরের ধর্মীয় বয়ান থেকে দেখা যায়, শয়তান কত স্তরের ইবাদত ও সম্মান পেয়েছিল। কিন্তু একটি মাত্র ‘অহংকার’ তার কয়েক হাজার বছরের অর্জন ধুলোয় মিশিয়ে দিল। ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশ যদি উন্নয়নের শিখরেও পৌঁছায়, কিন্তু আমাদের মধ্যে যদি নৈতিকতা, বিনয় এবং সহনশীলতা না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না।
চূড়ান্ত প্রতিফলন
শয়তানের ইতিহাস আমাদের জন্য এক সতর্কবার্তা। এটি আমাদের শেখায় যে জ্ঞান বা পদমর্যাদা মানুষকে বড় করে না, বরং বড় করে তার বিনয়। গত দুই বছরের অস্থিরতা কাটিয়ে যদি আমাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে হয়, তবে আমাদের ভেতরকার সেই ‘ইবলিশী’ দম্ভকে বিসর্জন দিতে হবে। আগুনের দহন নয়, বরং মাটির সহনশীলতাই হতে পারে আমাদের মুক্তির পথ।
শয়তান কেবল এক পৌরাণিক চরিত্র নয়, সে আমাদের ভেতরের কুপ্রবৃত্তির নাম। তাই শয়তানকে চেনার চেয়েও জরুরি হলো নিজের ভেতরের অহংকারকে চেনা—যা গত দুই বছরে আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে।
শেষ কথা: অন্ধকারের বুক চিরে আলোর প্রতিক্ষা
শয়তানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তার পতন হয়েছিল একটি মাত্র ‘না’ (অবাধ্যতা) এবং একটি ‘অহংকার’ থেকে। গত দুই বছরে বাংলাদেশের সমাজেও সেই একই অহংকারের বীজ ডালপালা মেলেছে। আমরা একে অপরের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে পারছি না, অন্যের ভিন্ন মতকে সম্মান করতে পারছি না। কিন্তু ইতিহাসের চাকা সবসময় এক জায়গায় থেমে থাকে না। আজাজিল থেকে ইবলিশ হওয়ার যে করুণ ট্র্যাজেডি আমরা শুরুতে দেখেছিলাম, তা আমাদের জন্য এক চূড়ান্ত শিক্ষা।
যদি আমরা আমাদের ভেতরের সেই আদিম হিংস্রতা, পরনিন্দা এবং দম্ভকে বিসর্জন দিতে না পারি, তবে শয়তানের এই প্রভাব কেবল দুই বছরে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও গ্রাস করবে। বাংলাদেশকে আবার সেই ‘আবেদ’ ও ‘তকি’র (জ্ঞানী ও সংযমী) শান্ত ভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি। আগুনের ধর্ম পুড়িয়ে ছাই করা, কিন্তু মাটির ধর্ম হলো প্রাণ দেওয়া। এখন সময় এসেছে আগুনের সেই ইবলিশী দম্ভ ত্যাগ করে মাটির মতো বিনয়ী হওয়া। তবেই হয়তো এই অভিশপ্ত ছায়া থেকে মুক্তি পাবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
–লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
পড়ুন, শেয়ার করুন ও মতামত জানান
#কেন_বাংলাদেশ #রাডারের_বাইরে_ইবলিস #শয়তানের_চক্রান্ত #শয়তানের_ইতিহাস #আজাজিল #ইবলিশ #মানুষরূপী_ইবলিস #সামাজিক_অবক্ষয় #সমকালীন_বাংলাদেশ #নৈতিকতা #নৈতিক_জাগরণ #আত্মশুদ্ধি #অহংকার_বনাম_বিনয় #বিনয় #বিপন্ন_বিবেক #বিবেক #ধর্মীয়_শিক্ষা #মনস্তত্ত্ব #রূপক_প্রবন্ধ #শিক্ষক_নিপীড়ন #শিক্ষা_ও_শ্রদ্ধা #মব_সন্ত্রাস #MobJustice #সামাজিক_বিপর্যয় #আইনহীনতা #মানবাধিকার #JusticeSystem #SocialChaos #DigitalEthics #Sociology #ReflectiveWriting #HistoryOfSatan #SocioPsychology #ভবিষ্যৎ_বাংলাদেশ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: