odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 9th October 2026, ৯th October ২০২৬
গিটার হাতে মঞ্চ মাতানো জেমস ব্যক্তিজীবনে বরাবরই নিভৃতচারী। নদীতে সাঁতার কাটা দুরন্ত শৈশব থেকে আজিজ বোর্ডিংয়ের ছোট্ট ঘর, সংগীতের প্রতি টান, ফটোগ্রাফির নেশা আর নির্জন জীবনের স্বপ্ন—সব মিলিয়ে মঞ্চের বাইরের মানুষ ফারুক মাহফুজ আনামও কম বৈচিত্র্যময় নন।

মঞ্চে ‘গুরু’, আড়ালে ফারুক মাহফুজ: জেমসের জীবনের গল্প

odhikarpatra | প্রকাশিত: ২ October ২০২৬ ১৭:০৪

odhikarpatra
প্রকাশিত: ২ October ২০২৬ ১৭:০৪

অধিকারপত্র ডটকম বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী মাহফুজ আনাম জেমস। মঞ্চে উঠলেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘গুরু’। গিটার হাতে তাঁর উপস্থিতিতে হাজারো দর্শক একসঙ্গে গেয়ে ওঠেন তাঁর জনপ্রিয় গান। কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার কাছে তাঁর গান হয়ে উঠেছে স্মৃতির অংশ।

তবে মঞ্চের আলো নিভে গেলে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষকে দেখা যায়। ব্যক্তিজীবন নিয়ে বরাবরই আড়ালে থাকা জেমস নিজের সময় কাটান বই পড়ে, সিনেমা দেখে, ছবি তুলে কিংবা নির্জন কোনো জায়গায় হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে।

দুরন্ত শৈশব ও নদীর টান

জেমসের জন্ম ১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁয়। তাঁর পুরো নাম ফারুক মাহফুজ আনাম। শৈশবে ছিলেন অত্যন্ত দুরন্ত ও বহির্মুখী। ছোটবেলায় পানির প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ আকর্ষণ।

নওগাঁয় ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে নদীতে সাঁতার কাটতেন তিনি। কখনো কখনো সাঁতরে মাঝনদীতেও চলে যেতেন। সেই নদীর স্মৃতি পরবর্তী সময়ে তাঁর সংগীতেও নানা ভাবে ফিরে এসেছে।

আজিজ বোর্ডিংয়ের ছোট্ট ঘর

জেমসের বাবা মোজাম্মেল হক চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। বাবার সরকারি চাকরির কারণে বিভিন্ন জায়গায় তাঁর পড়াশোনা হয়েছে। সিলেটের ব্লু-বার্ড স্কুল থেকে শুরু করে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল, পরে নীলফামারী ও সিরাজগঞ্জে কেটেছে তাঁর কলেজজীবনের একটি অংশ।

কলেজজীবনের পর সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে গানই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান আগ্রহ। কিন্তু পরিবারের কেউ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় মা-বাবা বড় ছেলে জেমসকে পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে দেখতে চাননি।

একপর্যায়ে অভিমান করে ঘর ছাড়েন তিনি। সেই সময় চট্টগ্রামের কদমতলীর পাঠানটুলি রোডের আজিজ বোর্ডিং হয়ে ওঠে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়।

আজিজ বোর্ডিংয়ের ৩৬ নম্বর কক্ষেই কেটেছে তাঁর জীবনের সংগ্রামী সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছোট্ট ঘর, একটি খাট, টেবিল, পানির জগ আর প্রিয় গিটার—এসব নিয়েই ছিল তাঁর পৃথিবী। আড্ডা, গান ও স্বপ্নের সেই দিনগুলো পরবর্তী সময়ে ‘আজিজ বোর্ডিং’ গানেও জায়গা করে নেয়।

কাছের মানুষ হারানোর বেদনা

জেমসের সংগীতজীবনের উত্থানের সময়ই তিনি হারান তাঁর মা-বাবাকে। মা জাহানারা খাতুনের স্মৃতি তাঁর গানেও গভীরভাবে উঠে এসেছে।

ব্যক্তিজীবন নিয়ে বরাবরই নীরব জেমস। তাঁর চার সন্তান—বড় ছেলে দানিশ এবং তিন সন্তান জান্নাত, জাহান ও জিবরান আনাম। নিজের পারিবারিক জীবনকে প্রচারের বাইরে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।

সংগীতের বাইরে ফটোগ্রাফির নেশা

মঞ্চের ব্যস্ততার বাইরে জেমসের অন্যতম আগ্রহ ফটোগ্রাফি। বিশেষ করে বিদেশে স্টেজ শো করতে গেলে অবসর সময়ে ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়ান তিনি।

ল্যান্ডস্কেপ বা প্রাকৃতিক দৃশ্য তাঁর বিশেষ পছন্দ। কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেছেন। ইতালি ও অস্ট্রেলিয়া সফরেও তাঁর সঙ্গী ছিল ক্যামেরা।

ভবিষ্যতে নিজের তোলা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

পুরোনো বন্ধুত্ব এখনো অটুট

জেমসের বন্ধুদের তালিকায় রয়েছেন স্কুল-কলেজ জীবনের পুরোনো বন্ধুরা। পাশাপাশি সংগীতজগতের সহযোদ্ধাদের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।

আইয়ুব বাচ্চু, হামিন আহমেদ, মাকসুদ ও পার্থ বড়ুয়াসহ ব্যান্ড সংগীতের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের শিকড় বহু পুরোনো। সংগীত ও ব্যান্ড সংগঠন নিয়ে আলোচনার সময় এখনো তাঁদের একসঙ্গে আড্ডা দিতে দেখা যায়।

বই, সিনেমা ও দেশি খাবারে পছন্দ

সংগীতের পাশাপাশি বই পড়া ও সিনেমা দেখা জেমসের অবসরের অন্যতম অনুষঙ্গ। ক্ল্যাসিক সিনেমার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। সাহিত্যে তাঁর পছন্দের লেখকদের মধ্যে রয়েছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ও নাগিব মাহফুজ।

খাবারের ক্ষেত্রেও তাঁর পছন্দে রয়েছে দেশীয় স্বাদ। ভাত, ডাল, গরুর মাংস ও বিভিন্ন ধরনের মাছ তাঁর পছন্দের খাবারের তালিকায় রয়েছে। দেশের বাইরে কোরিয়ান ও জাপানি খাবারও পছন্দ করেন তিনি।

ফিটনেসের ব্যাপারেও সচেতন জেমস। নিয়মিত জিমে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ব্যায়াম করেন।

নির্দিষ্ট লক্ষ্য নয়, আনন্দই তাঁর পথ

দীর্ঘ সংগীতজীবনেও নিজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঠিক করে এগোনোর কথা বলেননি জেমস। তাঁর কাছে নিজের পছন্দের কাজ করাই গুরুত্বপূর্ণ।

গান তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, আনন্দ ও ভালোবাসার জায়গা। জনপ্রিয়তা কিংবা সাফল্যের হিসাবের বাইরে গিয়ে তাঁর দর্শন—গান করার আনন্দটাই সবচেয়ে বড়।

শহরের কোলাহল ছেড়ে নির্জন জীবনের স্বপ্ন

মঞ্চে হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়ানো মানুষটি ব্যক্তিজীবনে আবার একাকিত্ব ও নীরবতা পছন্দ করেন। নিজের মতো করে চিন্তা করা এবং কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়ার জন্য নির্জনতা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতে ঢাকার কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে, গাড়িতে দুই থেকে তিন ঘণ্টার পথের কোনো নিরিবিলি জায়গায় বসতি গড়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। প্রয়োজন হলে কাজের জন্য ঢাকায় আসবেন, কাজ শেষে আবার ফিরে যাবেন সেই নির্জন ঠিকানায়।

মঞ্চের জেমস, আড়ালের ফারুক মাহফুজ

দীর্ঘ কয়েক দশকের সংগীতজীবনে জেমস তৈরি করেছেন নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়। মঞ্চে তিনি হাজারো মানুষের ‘গুরু’, আর মঞ্চের বাইরে ব্যক্তিগত পরিসরে তিনি অনেকটাই নিভৃতচারী ফারুক মাহফুজ আনাম।

১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁয় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী আজ ৬২ বছরে পা দিলেন। তাঁর গানের সঙ্গে বেড়ে ওঠা অসংখ্য শ্রোতার কাছে জেমস শুধু একজন শিল্পী নন, বরং বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের নাম।

মঞ্চের আলোয় যাঁকে সবাই চেনে, সেই জেমসের আড়ালের মানুষটি তাই এখনো অনেকের কাছে কৌতূহলের বিষয়। আর সেই আড়ালই হয়তো তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও আলাদা করে তুলেছে।


#জেমস #মাহফুজআনামজেমস #বাংলাদেশেরব্যান্ডসংগীত #অধিকারপত্র