অধিকারপত্র বিশেষ ফিচার│শারদীয় দুর্গোৎসব
যে কবি শৃঙ্খল ভাঙার ডাক দিয়েছেন, তিনিই দেবী কালীর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন, কৃষ্ণপ্রেমের গান লিখেছেন, শিবের বন্দনায় সুর তুলেছেন। নজরুলের এই বহুমাত্রিক সংগীতভুবনে বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখেই মিলিত হয়েছে মানুষের বেদনা, প্রেম, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনা আমাদের সাহিত্যপাঠ ও সাংস্কৃতিক সহিষ্ণুতার সামনে কী প্রশ্ন রাখে? কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামাসংগীত, দুর্গাবন্দনা, আগমনী ও বিজয়ার গান এবং ‘আমার কৈফিয়ৎ’-এর আলোকে এই ফিচার অনুসন্ধান করেছে কবির সৃষ্টিস্বাধীনতা, ধর্মীয় বহুত্ব, বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও মানবমুক্তির দর্শন। দেবীর কাছে ভক্তের আকুতি থেকে ক্ষুধার্ত শিশুর অন্নের দাবি—নজরুলের রচনায় বিশ্বাস, সংশয়, প্রেম ও প্রতিবাদ কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে, তার সাহিত্যিক বিশ্লেষণ। কবিকে খণ্ডিত উদ্ধৃতি ও সম্প্রদায়ের সীমানায় আটকে দেওয়ার বিপরীতে সম্পূর্ণ সৃষ্টিভুবন পাঠের আহ্বান।
উৎসর্গ
মহালয়ার আগমনী সুর থেকে বিজয়ার বিদায়বেদনা—আশ্বিনের শিউলি, শরতের শুভ্র মেঘ আর ঢাকের ধ্বনিতে জেগে ওঠা আবহমান বাংলার শারদীয় দুর্গোৎসবকে এই ফিচার উৎসর্গ করা হলো।দুর্গাপূজার নিজস্ব ধর্মীয় মর্যাদাকে সম্মান জানিয়ে এই উৎসর্গ বাংলার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি—যেখানে বিশ্বাসের ভিন্নতা নিয়েও মানুষ উৎসবের আনন্দে মিলিত হয়, শিল্প ও সংগীতে পরস্পরের অনুভূতিকে চিনতে শেখে। কোনো একটি ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এই নিবেদন; এটি বাংলার মাটি, বাঙালির বহুবর্ণ সংস্কৃতি এবং সম্প্রীতি ধরে রাখার মানবিক আকাঙ্ক্ষার উদ্দেশে।নজরুলের গান ও কবিতার আলোয় সেই বাংলাকেই স্মরণ করি—যেখানে নিজের বিশ্বাসে অবিচল থেকেও অন্যের আনন্দে অংশ নেওয়া যায়, অন্যের বেদনায় সাড়া দেওয়া যায়।
লেখাটির বিষয় ও বক্তব্য সম্পর্কে স্পষ্টীকরণ
রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়ার প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে নজরুলের শ্যামাসংগীত, দুর্গাবন্দনা, ইসলামী গান এবং ‘আমার কৈফিয়ৎ’-এর আলোকে এই ফিচার অনুসন্ধান করেছে—কবিকে কি ধর্মপরিচয়ের সীমানায় বিচার করা যায়, আর তাঁর সৃষ্টির একটি অংশ গ্রহণ করে অন্য অংশ মুছে দিলে তাঁকে কতটা বোঝা যায়? একই কলমে ইসলামী গান ও শ্যামাবন্দনা, দেবীর কাছে প্রার্থনা ও মানুষের মুক্তির জন্য বিদ্রোহ কীভাবে জায়গা পেয়েছে, সেই বহুমাত্রিক নজরুলই এ লেখার কেন্দ্র। এটি কোনো ধর্মবিশ্বাসের সত্যতা নির্ধারণ, কোনো সম্প্রদায়কে হেয় করা কিংবা কবিকে আস্তিক বা নাস্তিক হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার প্রয়াস নয়। ধর্মীয় অনুভবের স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান রেখেই এখানে ভক্তি, সংশয়, সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও মানবমর্যাদার সম্পর্ক পাঠ করা হয়েছে; সাহিত্যিক ব্যাখ্যাগুলোকে ধর্মীয় বিধান বা কবির ব্যক্তিগত বিশ্বাসের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন—তবে তাঁদের বিচার হোক তথ্য, যুক্তি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সম্পূর্ণ রচনাপাঠের ভিত্তিতে। লেখাটির মূল আহ্বান তাই কবিকে ভাগ করার আগে তাঁর সৃষ্টির বহুবর্ণ জগৎকে জানা; সেই আহ্বানের তাৎপর্য সবচেয়ে স্পষ্ট হবে ‘আমার কৈফিয়ৎ’ ও শেষ কথাসহ পুরো ফিচারটি পড়লে।
প্রারম্ভিকা: কালি ছবিতে লাগে, প্রশ্ন ওঠে আমাদের পাঠে
কিছুদিন আগে ঢাকার একটি দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি পড়ল। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ২০২৬ রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আঁকা তাঁর গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় চারজনকে আটক করে পুলিশ। ঘটনাটি একটি প্রতিকৃতি বিকৃত করার খবর হয়ে আমাদের সামনে এসেছে; তার পরিসর অবশ্য দেয়ালের চেয়েও বড়। কারণ, একটি মুখ ঢেকে দেওয়ার এই চেষ্টার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয়—আমরা কি কোনো কবির সঙ্গে তর্ক করছি, নাকি তাঁকে পড়ার দরজাটিই বন্ধ করে দিতে চাইছি?
কালি মাখানোর ফলে রবীন্দ্রনাথ কতটুকু ছোট হলেন? দেয়ালের ছবিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; তাঁর কবিতা, গান, গল্প কিংবা মানুষের অন্তর্জীবনকে প্রকাশ করার ক্ষমতা তাতে ক্ষয়ে যায় না। ক্ষতটি অন্যখানেও তৈরি হয়—আমাদের কথোপকথনের পরিসরে, ভিন্নমত সহ্য করার সামর্থ্যে, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে প্রশ্ন করেও ধারণ করার অভ্যাসে। রবীন্দ্রনাথ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তাঁর সাহিত্য, সমাজচিন্তা কিংবা ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, গবেষণা হবে, যুক্তির বিরোধে যুক্তি আসবে। কিন্তু একটি ছবির মুখ ঢেকে দেওয়া সেই বিচারকে কত দূর এগিয়ে নেয়?
এখানেই আমাদের পুরোনো একটি প্রবণতা ফিরে আসে। কবির লেখা পড়তে বসে আমরা কখনো কখনো তাঁর জন্মপরিচয়ের হিসাব খুলে বসি। কোন ধর্মের মানুষ তিনি, কোন দেবতার নাম লিখেছেন, কোন প্রার্থনার ভাষা ব্যবহার করেছেন—এসব দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করতে চাই। অথচ সাহিত্যে ধর্মের উপস্থিতি নিয়ে অনুসন্ধান এবং ধর্মপরিচয়ের কারণে সাহিত্যিককে গ্রহণ বা বর্জন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ। প্রথমটি আমাদের পাঠ সমৃদ্ধ করতে পারে; দ্বিতীয়টি পাঠের আগেই রায় লিখে রাখে।
সাহিত্যিকের প্রথম দায় তাঁর সৃষ্টির প্রতি—ভাষার প্রতি সততা, অভিজ্ঞতার গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা এবং মানুষের জটিল জীবনকে প্রকাশ করা। সেই অর্থে সাহিত্যসাধনাই তাঁর সৃষ্টিধর্ম। এর অর্থ এই নয় যে তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস গুরুত্বহীন, কিংবা সাহিত্য থেকে ধর্মকে সরিয়ে দিতে হবে। বিশ্বাস, সংশয়, উপাসনা ও আধ্যাত্মিকতা মানুষের অভিজ্ঞতারই অংশ। কিন্তু জন্মসূত্রে পাওয়া পরিচয় দিয়ে একজন কবি কাদের আনন্দ অনুভব করতে পারবেন, কাদের বেদনা লিখতে পারবেন, কোন পুরাণে প্রবেশ করতে পারবেন—সেই সীমানা বেঁধে দেওয়া যায় কি?
এই প্রশ্নটি কাজী নজরুল ইসলামের সামনে নিয়ে রাখলেই আমাদের বিচারপদ্ধতির সংকট স্পষ্ট হয়। যে কবিকে আমরা বিদ্রোহী বলে ভালোবাসি, তাঁর শ্যামাসংগীতের সামনে দাঁড়িয়ে কী বলব? যাঁর কণ্ঠে ইসলামী গানের নিবিড় আবেগ, তাঁরই কলমে দুর্গার আবাহন, উমার জন্য মেনকার আকুলতা, শ্যামার কাছে সন্তানের অভিমান। ধর্মপরিচয়ের অনুমতিপত্র নিয়ে যদি সাহিত্য পড়তে হয়, তবে নজরুলের এই বিপুল সৃষ্টিসংসারের কতখানি আমরা নিজেদের হাতেই বন্ধ করে দেব?
নজরুল মানুষের বন্দনার কবি; তাঁর মানবতার পরিসর বিশ্বমানবের দিকে প্রসারিত। সেই বিস্তারের মধ্যেই রয়েছে বাংলার নিজস্ব ঋতু, উৎসব, লোকস্মৃতি ও পৌরাণিক কল্পনার অন্তরঙ্গ উপস্থিতি। তাঁর দুর্গাবিষয়ক গানে মা আসেন, কন্যা ঘরে ফেরে, সন্তান আশ্রয় চায়; আবার ক্ষুধা, অপমান ও শক্তিহীনতার প্রশ্নও ওঠে। পূজার আয়োজনের পাশে তিনি মানুষের জীবনের হিসাব রাখেন। দেবীর জয়ধ্বনির মধ্যেও শুনতে পান সেই সন্তানের কান্না, যার দুর্গতি এখনো কাটেনি।
তাঁর এই ভক্তিভুবনকে শুধু অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি সৌজন্য বলে দেখলে গানের আবেগ ও শিল্পসৌন্দর্য অধরা থেকে যায়। আবার মানবতার কথা বলতে গিয়ে গানের ধর্মীয় অনুভব মুছে দিলেও নজরুলকে সম্পূর্ণ পাওয়া যায় না। তাঁর রচনায় ভক্তি আছে, অভিমান আছে, আত্মসমর্পণ আছে, প্রশ্নও আছে। সেই বহুস্বরকে ধারণ করার জন্য পাঠকেরও কিছুটা উদারতা প্রয়োজন—নিজের পরিচয় ত্যাগের নয়, অন্যের অনুভূতির অস্তিত্ব স্বীকার করার উদারতা।
এই ফিচার সেই পাঠেরই আমন্ত্রণ। শ্যামার গান থেকে দুর্গার আগমনী, মাতৃবন্দনা থেকে মানুষের আত্মশক্তি—এই যাত্রার শেষে রয়েছে নজরুলের নিজের কাব্যিক জবাব, ‘আমার কৈফিয়ৎ’, এবং শেষ কথায় আমাদের পাঠাভ্যাসের প্রতি ফিরে আসা প্রশ্ন। কবিকে কারা কী নামে ডেকেছিল, আর মানুষের কোন যন্ত্রণা তাঁকে লিখতে বাধ্য করেছিল—সেই ব্যবধান সেখানে বিশেষভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
তাই পাঠককে অনুরোধ, লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন। কোনো একটি দেবতার নাম, একটি গানের শিরোনাম কিংবা প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন পঙ্ক্তিতে থেমে গেলে এই নজরুলকে পাওয়া কঠিন। ছবির ওপর কালি দিয়ে মুখ আড়াল করা যায়; কবির বহুবর্ণ সৃষ্টির সামনে দাঁড়াতে হলে আমাদের চোখ খোলা রাখতে হয়।
নজরুলের দুর্গা: আগমনীর আনন্দ থেকে বিসর্জনের প্রশ্ন
শরতের আকাশে সাদা মেঘ, ভোরের ঘাসে শিউলি, দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ—বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে দুর্গাপূজার আবহ বহু অনুভূতির সমাবেশ। সেখানে দেবীর আরাধনার সঙ্গে মিশে থাকে ঘরে ফেরার আনন্দ, সন্তানকে কাছে পাওয়ার আকুলতা এবং বিদায়ের বেদনা। কাজী নজরুল ইসলাম এই অনুভূতির জগতে প্রবেশ করেছিলেন একজন সংবেদনশীল কবি হিসেবে। তাঁর দুর্গাবিষয়ক গানে দেবী কখনো বিশ্বজননী, কখনো মেনকার আদরের কন্যা উমা, কখনো নিপীড়িত মানুষের শক্তির উৎস। পূজার আয়োজন ও উপাচারও তাঁর কল্পনায় নতুন অর্থ পেয়েছে—শঙ্খধ্বনি হয়ে উঠেছে সমবেত আহ্বান, মঙ্গলঘট হয়েছে সবার অংশগ্রহণের প্রতীক, আর বিসর্জন সামনে এনেছে মানুষের জীবনে দেবীর কল্যাণ ধরে রাখার প্রশ্ন।
নজরুলের এসব গান পড়তে গেলে একটি পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। দুর্গার বন্দনা, আগমনী গান, বিজয়ার গান এবং নির্দিষ্ট পূজাচারের জন্য রচিত সংগীত এক বিষয় নয়। তাঁর গানে মহালয়া, দেবীর আবাহন, জাগরণ, উপাসনা ও বিসর্জনের অনুষঙ্গ পাওয়া যায়; কিন্তু তাই বলে প্রতিটি গানকে বোধন, পুষ্পাঞ্জলি, সন্ধিপূজা কিংবা আরতির বিধিবদ্ধ সংগীত বলা যায় না। এগুলোর অনেকটাই পূজাকে ঘিরে রচিত গীতিকবিতা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের গান। তাদের মূল্য বুঝতে হলে আচারগত ব্যবহার এবং কাব্যিক অর্থকে পাশাপাশি, কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে দেখতে হয়।
আগমনীর সবচেয়ে কোমল মুখটি ধরা পড়ে ‘বরষ গেল, আশ্বিন এলো, উমা এলো কই’ গানে। এখানে উৎসব এসেছে, কিন্তু মেনকার ঘর শূন্য। চারপাশের আনন্দ তাঁর কাছে অসম্পূর্ণ, কারণ কন্যা এখনো ফিরে আসেনি। গিরিরাজের কাছে তাঁর অভিমান, উমার যত্ন নিয়ে উদ্বেগ এবং মেয়েকে আদর করে ফিরিয়ে আনার আকুতি পুরাণকে পরিচিত পারিবারিক অনুভূতিতে রূপ দেয়। নজরুল সঙ্গীতকোষের রেকর্ডতথ্য অনুযায়ী, গানটি ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে কে মল্লিকের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়; গীতিকার নজরুল, সুরকার কমল দাশগুপ্ত।
এই গানে দুর্গাপূজার ঘরে ফেরার কল্পনা বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। দেবীকে কন্যারূপে ভাবার মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গে দূরত্ব কমে আসে। মেনকার উদ্বেগে পাঠক চিনতে পারেন নিজের পরিবারের কোনো মায়ের অপেক্ষা। তবে এই অনুভূতি থেকে সব নারীর জীবনকে একই পারিবারিক ছকে ব্যাখ্যা করা চলে না। গানটির শক্তি তার নির্দিষ্ট নাটকীয় পরিস্থিতিতে: মেয়ে অনুপস্থিত, মা অপেক্ষমাণ, উৎসবের আলোতেও একটি ঘর অন্ধকার। নজরুল সেই অন্ধকারের ভাষা শুনেছেন বলেই তাঁর আগমনী শুধু আনন্দের ঘোষণা হয়ে থাকেনি।
মহালয়ার আবহ অন্যভাবে উপস্থিত ‘ওরে আলয়ে আজ মহালয়া’ গানে। এখানে উলুধ্বনি, শঙ্খ বাজানো এবং প্রদীপ তুলে ধরার আহ্বান রয়েছে। এই পরিচিত শুভধ্বনি ও আলোর অনুষঙ্গ দেবীকে স্বাগত জানানোর সমবেত দৃশ্য নির্মাণ করে। কিন্তু গানের ভেতরে রয়েছে আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের ভয় কাটানোর আকাঙ্ক্ষাও। দেবী অভয়ারূপে আসেন, তাঁর উপস্থিতিতে সন্তান আশ্বাস খোঁজে। মহালয়াতেই দেবীর আনুষ্ঠানিক পূজাগমন ঘটে—এমন আচারগত সিদ্ধান্ত এই কাব্যিক আগমনবর্ণনা থেকে টানা উচিত নয়; গানটি উৎসবের প্রত্যাশা ও মাতৃআশ্রয়ের অনুভূতিকে একত্র করেছে।
দেবীর আবাহন আরও বিস্তৃত কল্যাণকামনা হয়ে ওঠে ‘এলো রে শ্রী দুর্গা’ গানে। নজরুল এখানে মাতৃস্নেহ, শান্তি ও করুণার সঙ্গে দুর্বলের শক্তিলাভ এবং ক্ষুধার্ত মানুষের অন্নপ্রাপ্তিকে যুক্ত করেছেন। দেবীর আগমন হৃদয়ের পরিবর্তন ও বন্ধনমুক্তির সম্ভাবনা বহন করে। ফলে উৎসবের সার্থকতা বিচার করার একটি মানবিক মানদণ্ডও তৈরি হয়: আনন্দ কি কেবল আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি মানুষের দুঃখ ও দৈন্য লাঘবের আকাঙ্ক্ষাও তার অংশ? এই প্রশ্ন গানের বাণী থেকেই উঠে আসে।
দেবীকে জাগানোর আহ্বান নজরুলের হাতে আরও তীব্র হয় ‘জাগো যোগমায়া জাগো মৃন্ময়ী’ গানে। বারবার আগমনী গেয়েও পৃথিবীর কান্না থামছে না—এই বেদনা থেকে ভক্ত দেবীর সক্রিয় কল্যাণময় উপস্থিতি কামনা করে। মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী হয়ে ওঠার আহ্বানে মাটির প্রতিমা ও জীবন্ত চৈতন্যের সম্পর্ক সামনে আসে। রামায়ণ-সংশ্লিষ্ট পূজাকল্পনার স্মৃতিও গানে রয়েছে, বিশেষত নয়ন ও নীলপদ্মের অনুষঙ্গে। এগুলো পূজার উপাচারকে আত্মনিবেদনের গভীরতায় পৌঁছে দেয়; শেষ পর্যন্ত প্রার্থনা হয় অন্ধকার কাটিয়ে কল্যাণের ভোর আসার জন্য।
এই জাগরণকে সাহিত্যিক অর্থে মানুষের বিবেক জাগানোর আহ্বান হিসেবেও পড়া যায়। সমাজে অন্যায় থাকলে কেবল বার্ষিক উৎসব আয়োজন করে নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই—গানের অভিমান এমন ভাবনার পথ খুলে দেয়। তবে এটি একটি ব্যাখ্যা; দেবীর প্রতি ভক্তের প্রত্যক্ষ আর্তিকে সরিয়ে দিয়ে গানটিকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিণত করা যথাযথ নয়। নজরুলের বিশেষত্ব হলো, ভক্তির ভাষার মধ্যেই তিনি প্রশ্ন করার জায়গা তৈরি করেন। তাঁর উপাসক দেবীর কাছে ভালোবাসা জানায়, আবার পৃথিবীর দুর্দশার কথাও নির্ভয়ে বলে।
‘জয় দুর্গা জননী দাও শক্তি’ গানে প্রার্থনার বিষয়গুলোও লক্ষণীয়। শক্তির পাশাপাশি জ্ঞান, প্রেম, ভক্তি, ঘরে ঘরে শান্তি এবং কাজে অবিরাম উৎসাহ চাওয়া হয়েছে। এখানে শক্তি নিছক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; জীবনকে সচল ও কল্যাণময় করার সামর্থ্যও তার অন্তর্ভুক্ত। নজরুল সঙ্গীতকোষে উদ্ধৃত বেতারসূচি অনুযায়ী, গানটি ১৯৪০ সালের ৬ অক্টোবর কলকাতা বেতারের ‘আগমনী’ সংগীতানুষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই তথ্য তাঁর দুর্গাবিষয়ক রচনার সঙ্গে শারদীয় বেতার অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সম্পর্কও দেখায়।
পূজার উপাচারকে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ভাষায় রূপ দেওয়ার সাহসী উদাহরণ ‘ওরে আয় অশুচি আয়রে পতিত’। সমাজ যাদের অশুচি বা পতিত বলে দূরে সরিয়েছে, তাদেরই কবি মায়ের কাছে আহ্বান করেন। গানে দেবী সিংহাসন ছেড়ে ধূলির কাছে নেমে আসেন; মঙ্গলঘট পূর্ণ হওয়ার কল্পনায় যুক্ত হয় সবার স্পর্শ। এখানে স্পর্শ নিষেধের বিষয় হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে সম্মিলিত পবিত্রতার উপাদান। পূজার পরিচিত প্রতীক ব্যবহার করেই নজরুল মানুষের মধ্যে উচ্চ-নীচের বিভাজনকে প্রশ্ন করেছেন।
একই আকাঙ্ক্ষা আরও বিস্তৃত রূপ পায় ‘এবার নবীন-মন্ত্রে হবে জননী তোর উদ্বোধন’ গানে। কবির কল্পনায় সকল জাতির নারী-পুরুষের প্রাণ হয়ে ওঠে দেবীর পূজাবেদি। সেখানে ছোঁয়াছুঁয়ির বাধা, উচ্চ-নীচের ভেদ এবং হানাহানি দূর করার প্রত্যয় রয়েছে; দারিদ্র্যহীন, সমমর্যাদার সমাজের স্বপ্নও স্পষ্ট। দেবীর উদ্বোধন তাই নতুন সামাজিক সম্পর্কের সূচনা হিসেবে অর্থ পায়। বিসর্জন না হওয়ার কাব্যিক আকাঙ্ক্ষাটি বোঝায়, মাতৃশক্তির কল্যাণ যেন উৎসবশেষে হারিয়ে না যায়। এটিকে পূজার বিধিবদ্ধ নিয়ম পরিবর্তনের নির্দেশ হিসেবে পড়ার প্রয়োজন নেই।
এই চিন্তার আরও তীক্ষ্ণ প্রকাশ ‘মাগো চিন্ময়ী রূপ ধ’রে আয়’ গানে। দুর্গার পূজা হয়, অথচ মানুষের দুর্গতি কাটে না—এই ব্যবধান কবিকে অস্থির করে। তিনি এমন শক্তি চান, যা মন্দিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, মানুষের হাতেও কর্মক্ষমতা জাগাবে। আড়ম্বর তখনই প্রশ্নের মুখে পড়ে, যখন তা সন্তানকে শক্তি দিতে ব্যর্থ হয়। গানটিকে সব প্রতিমাপূজার প্রতি নজরুলের চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান বলা অতিসরলীকরণ হবে; এর নির্দিষ্ট তাগিদ হলো উপাসনার সঙ্গে জীবনের পরিবর্তনের সম্পর্ক স্থাপন করা। ১৯৪১ সালে জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর কণ্ঠে গানটির রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল।
বিজয়ার বিদায়েও নজরুল এই প্রশ্ন ছেড়ে দেন না। ‘যাস্নে মা ফিরে যাস্নে’ গানে দেবীকে ধরে রাখার আকুতি কেবল বিচ্ছেদবেদনার জন্য নয়; পৃথিবীতে অসুরের তাণ্ডব এখনো শেষ হয়নি। ভক্ত নিজের মরণশীলতা ও অসহায়তার কথা বলে দেবীর করুণায় অধিকার দাবি করে। বিজয়া নাটিকার এই গান বিদায়ের মুহূর্তকে নৈতিক প্রশ্নে পরিণত করে: যে পৃথিবীতে দুর্দশা রয়ে গেছে, সেখানে বিজয়ের অর্থ কী? উৎসবের সমাপ্তি এবং অকল্যাণের অবসান যে একই ঘটনা নয়, গানের আর্তি সেই ব্যবধান স্পষ্ট করে।
নজরুলের দুর্গাবিষয়ক সংগীতে তাই একটি দীর্ঘ আবেগযাত্রা দেখা যায়। প্রথমে কন্যার জন্য মায়ের অপেক্ষা, তারপর দেবীকে স্বাগত জানানোর আনন্দ, জাগরণের প্রার্থনা, সবার জন্য পূজার দ্বার উন্মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা এবং শেষে বিদায়ের সামনে দাঁড়িয়ে কল্যাণের হিসাব চাওয়া। এই যাত্রায় দুর্গার ধর্মীয় মহিমা অক্ষুণ্ণ থাকে, আবার মানুষের জীবনের প্রশ্নও প্রবল হয়ে ওঠে। আজ দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসব গান প্রেক্ষাপটসহ পরিবেশিত হলে শ্রোতা উৎসবের সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার মানবিক তাৎপর্য নিয়েও ভাবতে পারেন। নজরুলের কাছে মাতৃবন্দনার গভীরতা বোঝা যায় তখনই, যখন মায়ের সন্তানদের ক্ষুধা, ভয়, অপমান ও বঞ্চনার কথাও সেই বন্দনায় উচ্চারিত হয়।
দুর্গাবন্দনায় নজরুলের স্মরণীয় গান
নজরুলের দুর্গাবিষয়ক গানে ভক্তি ও বিদ্রোহ পাশাপাশি প্রবাহিত। কোথাও উমার জন্য মায়ের অপেক্ষা, কোথাও দেবীর আগমন উপলক্ষে শঙ্খ ও প্রদীপের আয়োজন, আবার কোথাও পূজার মধ্য দিয়েই মানুষের মুক্তি ও সমতার দাবি। তাঁর কয়েকটি স্মরণীয় গানের বাণীতে এই বহুমাত্রিক ভাবনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘বরষ গেল, আশ্বিন এলো, উমা এলো কই’—এই প্রশ্নে আগমনীর আনন্দের মধ্যে প্রবেশ করে কন্যাবিরহের বেদনা। আশ্বিন এসেছে, অথচ মেনকার ঘর এখনো শূন্য। দেবী এখানে আপন কন্যা; তাঁর জন্য মায়ের অপেক্ষা পুরাণের কাহিনিকে বাঙালির পরিচিত পারিবারিক অনুভূতির কাছে নিয়ে আসে। নজরুল উৎসবের সমবেত আনন্দের পাশাপাশি একটি মায়ের ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতাও শুনতে পান।
‘ওরে আলয়ে আজ মহালয়া’ গানে দেবীকে বরণের প্রস্তুতি জীবন্ত হয়ে ওঠে এই আহ্বানে: “তোরা উলু দে রে, শঙ্খ বাজা, প্রদীপ তুলে ধর্।”
উলুধ্বনি, শঙ্খ ও প্রদীপ—এই উপাচারগুলো গানে সমবেত আনন্দের দৃশ্য নির্মাণ করে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় অভয়ার আশ্রয়ে ভয় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা। এটি মহালয়ার আবহে রচিত কাব্যিক আহ্বান; পূজার আনুষ্ঠানিক সময়সূচির বিবরণ নয়।
‘এলো রে শ্রী দুর্গা’ গানে দেবীর আগমন মানবকল্যাণের প্রত্যাশা হয়ে ওঠে। সেই প্রত্যাশার একটি উজ্জ্বল প্রকাশ: “দুর্বলে দুর্জয় করিতে নিরন্নে অন্ন দিতে।”
দুর্গার শক্তি এখানে দুর্বলকে সাহস দেওয়ার এবং ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। ফলে মাতৃবন্দনা মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে না। দেবীর কল্যাণময় উপস্থিতি বোঝার জন্য কবি আমাদের মানুষের দুঃখ ও দৈন্যের দিকে তাকাতে বলেন।
‘জাগো যোগমায়া জাগো মৃন্ময়ী’ গানের সূচনাতেই রয়েছে গভীর জাগরণের প্রার্থনা: “জাগো যোগমায়া জাগো মৃন্ময়ী চিন্ময়ী রূপে জাগো।”
মৃন্ময়ী প্রতিমা থেকে চিন্ময়ী উপস্থিতির এই আহ্বানে ভক্ত জীবন্ত কল্যাণের প্রত্যাশা জানায়। পৃথিবীর কান্না ও অন্ধকারের মধ্যে দেবীর শক্তি সক্রিয় হোক—গানের আকুতি সেই দিকে প্রবাহিত। সাহিত্যিক পাঠে এটি মানুষের বিবেক ও কর্মশক্তি জাগানোর আহ্বান হিসেবেও অর্থবহ।
‘ওরে আয় অশুচি আয়রে পতিত’ গানে পূজার পরিসর হয়ে ওঠে সামাজিক বিভাজন অতিক্রম করার স্থান। নজরুলের কল্পনায়: “মার মঙ্গল ঘট পূর্ণ হবে সবার ছোঁওয়া তীর্থ জলে।”
যাদের স্পর্শ সমাজ প্রত্যাখ্যান করেছে, তাদের অংশগ্রহণেই এখানে মঙ্গলঘট পূর্ণ হয়। পূজার পরিচিত প্রতীক ব্যবহার করে কবি অস্পৃশ্যতা ও মানুষের মধ্যে উচ্চ-নীচের ভেদকে প্রশ্ন করেছেন। মাতৃআরাধনার মধ্যে তিনি সবার সমান মর্যাদার জায়গা খুঁজেছেন।
‘এবার নবীন-মন্ত্রে হবে জননী তোর উদ্বোধন’ গানেও মাতৃবন্দনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমতার প্রত্যয়: “দীন-দরিদ্র রইবে না কেউ সমান হবে সর্বজন।”
এই বাণীতে দেবীর উদ্বোধন একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন বহন করে। পূজার আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন মানুষের মধ্যে বঞ্চনা, বিভেদ ও হানাহানি কমবে। নজরুলের ভক্তি তাই সামাজিক দায়িত্ববোধকেও জাগিয়ে তোলে।
‘মাগো চিন্ময়ী রূপ ধ’রে আয়’ গানে পূজার বাহ্যিক আয়োজন ও মানুষের বাস্তব দুর্গতির ব্যবধান সামনে আসে। কবি এমন মাতৃশক্তি চান, যা মানুষের অন্তরে সাহস এবং হাতে কর্মক্ষমতা জাগাবে। এই গান থেকে সব প্রতিমাপূজার প্রতি তাঁর চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না; এখানে প্রধান প্রশ্ন হলো, উপাসনা মানুষের জীবনে কতটা কল্যাণ আনছে।
‘যাস্নে মা ফিরে যাস্নে’ গানে বিজয়ার বিদায় হয়ে ওঠে গভীর আর্তি। পৃথিবীতে অকল্যাণ এখনো রয়ে গেছে বলে ভক্ত দেবীকে ধরে রাখতে চায়। বিজয়া নাটিকার এই গান আমাদের ভাবায়—উৎসব শেষ হলেও মানুষের দুর্দশা দূর করার দায়িত্ব শেষ হয় না। নজরুলের দুর্গাবন্দনার মানবিক শক্তি এখানেই: দেবীর জয়ধ্বনির সঙ্গে তিনি অসহায় মানুষের কথাও উচ্চারণ করেন।
বিদ্রোহীর কণ্ঠে শ্যামার গান: নজরুলের গানে দেবদেবী, ভক্তি ও মানুষের দর্শন
একটি গান বাজছে। সন্ধ্যার আলো ম্লান হয়ে এসেছে, চারপাশের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তিমিত। গানের কেন্দ্রে আছেন কালী—যাঁর পরিচিত প্রতিমায় মুণ্ডমালা, মুক্তকেশ, ভয়ংকর শক্তির প্রকাশ। অথচ সুরের ভেতর দিয়ে তাঁর আরেকটি মুখ উন্মোচিত হচ্ছে: তিনি মা, সন্তানকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ। শ্রোতা হয়তো দেবীর উপাসক, হয়তো কেবল সংগীতপ্রেমী। কিন্তু মাতৃস্নেহের সেই আহ্বান তাঁর কাছেও পরিচিত। গানটির রচয়িতা কাজী নজরুল ইসলাম। যাঁকে আমরা বিদ্রোহের বজ্রকণ্ঠে চিনেছি, তাঁরই কণ্ঠে এখানে ভেসে আসে নির্ভরতার কোমল আকুতি।
বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এই দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন বিস্ময় নয়; তবু আমাদের অভ্যস্ত নজরুলপাঠকে এটি নতুন করে প্রশ্ন করে। আমরা তাঁকে প্রায়ই কয়েকটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে ফেলি—বিদ্রোহী কবি, সাম্যের কবি, জাতীয় কবি, ইসলামী গানের স্রষ্টা। প্রতিটি পরিচয় সত্য, কিন্তু কোনো একটিতে তাঁর সম্পূর্ণ সত্তা ধরা পড়ে না। তাঁর শ্যামাসংগীত, কীর্তন, ভজন এবং দেবদেবীকে ঘিরে রচিত গান সামনে এলে দেখা যায়, মানুষের বিচিত্র বিশ্বাস ও অনুভূতিকে ধারণ করার ক্ষমতাই তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রধান শক্তি। সেই শক্তি বোঝার জন্য তাঁর জীবন, সংগীত এবং কাব্যিক দর্শনকে পাশাপাশি পড়তে হয়।
নজরুলের এই সাংস্কৃতিক যাত্রার গোড়ায় রয়েছে চুরুলিয়ার শৈশব। মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা, মক্তবের শিক্ষা, মসজিদ ও মাজারের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে ইসলামী জীবন ও শব্দভুবনের গভীর পরিচয় দিয়েছিল। আবার কৈশোরে লেটোদলে যোগ দিয়ে তিনি পরিচিত হন হিন্দু পুরাণ, লোকনাট্য এবং পালাগানের সঙ্গে। শকুনি, যুধিষ্ঠির, কর্ণ কিংবা মেঘনাদের কাহিনি তাঁর কাছে দূরের কোনো সম্প্রদায়ের অচেনা বিষয় হয়ে থাকেনি। অভিনয়, ছন্দ ও গানের মধ্য দিয়ে সেগুলো প্রবেশ করেছিল তাঁর শিল্পীসত্তায়। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
লেটোর আসরে পুরাণ কেবল ধর্মীয় নির্দেশনার বিষয় ছিল না। সেখানে চরিত্রের সংকট, বীরত্ব, প্রতারণা, আত্মত্যাগ ও পরাজয় দর্শকের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠত। দরিদ্র কিশোর নজরুল এই গল্পগুলোর মধ্যে মানুষের অভিজ্ঞতা চিনতে শিখেছিলেন। ফলে তাঁর পরিণত সাহিত্যজীবনে পৌরাণিক চরিত্র ব্যবহারের পেছনে ছিল দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরিচয়। তাঁর কল্পনায় আরবি-ফারসি ঐতিহ্য ও হিন্দু পুরাণ পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। এই সহাবস্থানকে নিছক শব্দের বৈচিত্র্য বললে ভুল হবে; এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন উত্তরাধিকারকে নিজের সৃষ্টির উপাদান হিসেবে গ্রহণ করার আত্মবিশ্বাস।
বিশ শতকের প্রথম ভাগে এই আত্মবিশ্বাসের বিশেষ সামাজিক তাৎপর্য ছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পাশাপাশি বাংলায় ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে রাজনৈতিক দূরত্বও বাড়ছিল। তখন এক সম্প্রদায়ের শিল্পী অন্য সম্প্রদায়ের ভক্তির ভাষায় আন্তরিকভাবে গান লিখলে পরিচয়ের প্রচলিত সীমানা প্রশ্নের মুখে পড়ত। নজরুল সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি। তাঁর কাজের মধ্যে এমন এক সাংস্কৃতিক অধিকারবোধ দেখা যায়, যেখানে জন্মপরিচয় শিল্পীর কল্পনাকে বন্দী করতে পারে না। অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করতে হলে তার অনুভূতির জগতে প্রবেশের চেষ্টা করতে হয়—তাঁর সংগীত এই চেষ্টার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তবে শ্যামাসংগীতের নিজস্ব পরিচয় বুঝে নেওয়া জরুরি। হিন্দু দেবদেবীকে নিয়ে লেখা সব গান শ্যামাসংগীত নয়। এই ধারার কেন্দ্রে রয়েছেন শ্যামা বা কালী; শাক্ত ভক্তি, মাতৃসম্বোধন, আত্মনিবেদন এবং দেবীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথোপকথন এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মতো কবিদের হাতে বাংলায় এই ধারার শক্তিশালী বিকাশ ঘটেছিল। দেবী এখানে দূরবর্তী মহাশক্তি হয়েও সংসারের আপন মা। তাঁর কাছে ভক্ত দাবি জানায়, অভিমান করে, নিজের দুঃখ বলে। নজরুল এই প্রতিষ্ঠিত উত্তরাধিকারে প্রবেশ করে তাকে নতুন কাব্যিক ও সাংগীতিক প্রাণ দিয়েছেন।
এই গানের ভক্ত বিস্ময়করভাবে স্বাধীন। সে দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে শুধু প্রশংসা করে না; অভিযোগও জানাতে পারে। জীবনের দুর্ভোগ কেন শেষ হয় না, প্রার্থনার উত্তর কেন আসে না, আশ্রয় কোথায়—এসব প্রশ্ন গানে জায়গা পায়। নজরুলের বিদ্রোহী স্বভাবের সঙ্গে এই অন্তরঙ্গ ভক্তিভাষার একটি সাযুজ্য রয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক কবিতায় মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে; ভক্তিগানে মানুষ নিজের অসহায়তা নিয়েও নীরব থাকে না। দুই ক্ষেত্রের লক্ষ্য ও বিশ্বাস আলাদা, কিন্তু অনুভূতি প্রকাশের সাহস উভয়কে একটি মানবিক সূত্রে যুক্ত করে।
নজরুলের শ্যামাসংগীতের বিশিষ্ট উদাহরণ ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়’। এখানে কালীর অন্ধকার রূপের সঙ্গে মহাজাগতিক আলোর সম্পর্ক নির্মিত হয়েছে। সূর্য, চন্দ্র, আকাশ ও সমুদ্রের মধ্যে ছড়িয়ে আছে দেবীর উপস্থিতি। ভয়ংকর প্রতিমার পরিচিত অবয়ব অতিক্রম করে গানটি তাঁকে সৃষ্টির বিপুল সৌন্দর্যের কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করে। আবার দেবীকে মেয়ে ও মা হিসেবে ভাবার মধ্যে সৃষ্টি হয় পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা। নজরুল সঙ্গীতকোষে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, গানটি পৌষ ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে স্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এবং ১৯৩২ সালে মৃণালকান্তি ঘোষের কণ্ঠে রেকর্ড হয়।
এই গানের আলো-অন্ধকারের সম্পর্ককে সমকালীন পাঠক সৌন্দর্যবোধের দিক থেকেও পড়তে পারেন। কালো এখানে অবমূল্যায়নের চিহ্ন নয়; তার মধ্যেই সৌন্দর্য ও আলোর উৎস কল্পিত হয়েছে। অবশ্য গানটিকে আধুনিক বর্ণবৈষম্যবিরোধী ঘোষণাপত্র বলে দাবি করা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ হবে না। কিন্তু তার কাব্যিক বিন্যাস আমাদের পরিচিত মূল্যবোধকে নাড়া দেয়। যে রংকে সমাজ অনেক সময় হীন বলে বিবেচনা করে, কবির কল্পনায় সেটিই মহিমার বাহন। এভাবে একটি ভক্তিগান নিজের ধর্মীয় অর্থ বজায় রেখেও বৃহত্তর নান্দনিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
আরেকটি পরিচিত গান ‘বল্ রে জবা বল্’। এখানে সাধনার শিক্ষক হয়ে ওঠে দেবীর পায়ে নিবেদিত একটি ফুল। মানুষ জানতে চায়, কীভাবে সেই জবা দেবীর চরণে স্থান পেল। এই কাব্যিক পরিস্থিতিতে জ্ঞানের প্রচলিত অহংকার উল্টে যায়: প্রশ্নকারী মানুষ, উত্তর দেওয়ার সম্ভাব্য অধিকারী ক্ষুদ্র ফুল। ভক্ত নিজের অন্তরের পরিবর্তন কামনা করে। ফুলের রাঙা রূপ তার কাছে আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা হয়ে ওঠে। প্রকৃতি, উপাসনার উপকরণ এবং অন্তর্জীবনকে একসূত্রে বাঁধার এই ক্ষমতা নজরুলের গীতিকবিতার বিশেষ সৌন্দর্য।
জবার কাছে মানুষের এই বিনয়কে বৃহত্তর অর্থেও ভাবা যায়। শিক্ষা বা ক্ষমতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ প্রায়ই বিশ্বাস করে, তার জানার বাইরে আর কিছু নেই। নজরুলের গানের ভক্ত সেই নিশ্চয়তা ত্যাগ করে। সে ছোট একটি ফুলের কাছে শিখতে প্রস্তুত। এই অবস্থান আত্মমর্যাদা বিসর্জনের সমার্থক নয়; বরং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকারের ক্ষমতা। ধর্মীয় সাধনার পরিসরে এর অর্থ এক রকম, দৈনন্দিন জীবনে অন্য রকম। উভয় ক্ষেত্রেই শেখার জন্য মন খুলে দেওয়া প্রয়োজন। গানটি সেই উন্মুক্ততার একটি স্মরণীয় চিত্র নির্মাণ করে।
‘শ্মশানে জাগিছে শ্যামা’ আমাদের নিয়ে যায় আরও গভীর সংকটের মুখোমুখি। শ্মশান সাধারণত বিচ্ছেদ, মৃত্যুভয় ও নিঃসঙ্গতার স্থান। নজরুলের গানে সেখানে দেবী অপেক্ষা করেন সন্তানকে গ্রহণ করার জন্য। জীবনের শেষ প্রান্তে আতঙ্কের মধ্যে প্রবেশ করে মাতৃআশ্রয়ের কল্পনা। শাক্ত ঐতিহ্যের শ্মশানসংক্রান্ত অনুষঙ্গ এখানে মানবিক কোমলতায় উজ্জ্বল হয়। মৃত্যুকে অস্বীকার না করেও তার মুখোমুখি হওয়ার একটি ভক্তিমূলক ভাষা তৈরি হয়। গানটির বাণী ও স্বরলিপির তথ্য নজরুল ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত সংকলনসহ একাধিক গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে।
এই গান শোকের অভিজ্ঞতার কাছে বিশেষভাবে অর্থবহ হতে পারে। প্রিয়জন হারানোর পরে মানুষ প্রায়ই এমন ভাষা খোঁজে, যাতে বিচ্ছেদের সত্যও থাকে, ভালোবাসার ধারাবাহিকতাও থাকে। নজরুলের মাতৃকল্পনা সেই চাহিদাকে স্পর্শ করে। বিশ্বাসী শ্রোতা এতে আধ্যাত্মিক আশ্বাস পান; অন্য শ্রোতা অনুভব করতে পারেন শেষ মুহূর্তেও আশ্রয় চাওয়ার মানবিক আকুতি। তবে এই অনুভূতিকে চিকিৎসাগত উপকারের প্রমাণ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। সংগীতের শক্তি এখানে অভিজ্ঞতা প্রকাশে, শোককে ভাগ করে নেওয়ায় এবং একাকিত্বের মধ্যে সম্পর্কের স্মৃতি জাগিয়ে তোলায়।
‘মহাকালের কোলে এসে’ গানে দেবীর রূপান্তর অন্য মাত্রা পায়। গৌরী, মহাকালী, উমা, ভৈরবী ও অন্নদার পরিচয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সৃষ্টি করে এক বহুরূপী দেবীচিত্র। বিশ্বকে অন্নদানের ক্ষমতা এবং পথে চলার দীনতা পাশাপাশি আসে। রাজদুলালী ও ভিক্ষার অনুষঙ্গ একই কল্পনায় মিলিত হয়। এখানে ঐশ্বর্য শুধু বাহ্যিক সমৃদ্ধির বিষয় থাকে না; প্রেম, ত্যাগ ও মহাজাগতিক উপস্থিতির মধ্যেও তার প্রকাশ ঘটে। গানটির সংরক্ষিত বাণীতে এই বৈপরীত্যগুলো স্পষ্ট।
সাহিত্যিক পাঠে এই বৈপরীত্য আমাদের মর্যাদার ধারণাকে প্রশ্ন করতে পারে। যার পোশাক অনাড়ম্বর, যার জীবন দারিদ্র্যে ঘেরা, তার অস্তিত্ব কি কম মূল্যবান? দেবীর মহিমাকে পথের দীনতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কল্পনা বাহ্যিক অবস্থার ঊর্ধ্বে মূল্য খোঁজার সুযোগ দেয়। এটি গানটির এক সম্ভাব্য মানবিক ব্যাখ্যা; এর শাক্ত ধর্মতাত্ত্বিক অর্থকে প্রতিস্থাপন করে না। নজরুলের গানের সৌন্দর্য এখানেই—বিশ্বাসের নির্দিষ্ট ভাষায় রচিত হলেও তা পাঠককে আরও বিস্তৃত জীবনপ্রশ্নের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
নজরুলের ভক্তিমূলক সংগীত
নজরুলের ভক্তিমূলক সংগীত অবশ্য কালীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষ্ণকে ঘিরে তাঁর গানে নামস্মরণ, আকুলতা ও প্রেমের নানা প্রকাশ রয়েছে; শিবকে ঘিরে রয়েছে যোগীসত্তা ও বন্দনার ভাষা। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের আদি সংগীত ও স্বরলিপির তালিকায় ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ বোল রে মন’ এবং ‘যোগী শিব শঙ্কর’ শিরোনামে সংশ্লিষ্ট গান সংরক্ষিত আছে। এই বৈচিত্র্য মনে করিয়ে দেয়, হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতিও একক অনুভূতির জগৎ নয়। বিভিন্ন দেবতা, ভক্তিধারা এবং আখ্যানের নিজস্ব আবেগ ও প্রকাশভঙ্গি রয়েছে।
কৃষ্ণভক্তির গানে প্রেমের ভাষা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সেখানে অপেক্ষা, বিরহ, আকর্ষণ ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে ভক্তের সঙ্গে আরাধ্যের সম্পর্ক প্রকাশিত হয়। এই অনুভূতির সাহিত্যিক ক্ষমতা বিস্তৃত: মানুষের পরিচিত প্রেমের অভিজ্ঞতা আধ্যাত্মিক অন্বেষণের ভাষা হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রতিটি গানকে একই ধরনের ভক্তির মধ্যে ফেলা উচিত নয়। কৃষ্ণনামযুক্ত রচনা, রাধাকৃষ্ণের প্রেমবিষয়ক গীতিকবিতা, কীর্তনধর্মী গান ও নাটকের গান আলাদা প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করতে হয়। যথাযথ পাঠেই বোঝা যায়, নজরুল কত বিচিত্র ভঙ্গিতে এই উত্তরাধিকার গ্রহণ করেছিলেন।
শিবকে ঘিরে রচনায় আবার পাওয়া যায় ভিন্ন কল্পলোক। যোগী, ত্যাগী, ভোলা এবং মহাশক্তির অনুষঙ্গ নিয়ে শিব বাংলা সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে বহুদিন ধরে উপস্থিত। নজরুল এই পৌরাণিক ভাষাকে সংগীতের উপযোগী করে গ্রহণ করেছেন। তাঁর বৃহত্তর কবিতাভুবনেও ধ্বংস ও নবসৃষ্টির সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেখান থেকে সব শিববন্দনাকে সরাসরি রাজনৈতিক বিপ্লবের রূপক বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া চলে না। ভক্তিমূলক গান তার নিজস্ব আরাধনার অর্থ বহন করে। সাহিত্যিক সাদৃশ্য বোঝার জন্য যেমন তুলনা দরকার, তেমনি পার্থক্য রক্ষার সতর্কতাও প্রয়োজন।
নজরুলের ধর্মীয় সংগীত নিয়ে সবচেয়ে পরিচিত প্রশ্নটি আসে তাঁর নাম ও জন্মপরিচয় থেকে: একজন মুসলিম কবি কেন হিন্দু দেবদেবীর গান লিখলেন? ইতিহাসের বিচারে প্রশ্নটি তাঁর শিল্পীজীবনের স্বাভাবিক ব্যাপ্তিকে সংকুচিত করে। বাংলার ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং সংগীত ছিল তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্র; সেই ক্ষেত্রের বিভিন্ন উত্তরাধিকারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। অন্যদিকে, সাহিত্যিক কণ্ঠস্বরকে লেখকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সরাসরি বিবৃতি ভাবাও সমস্যাজনক। কোনো গানে ভক্তের আকুতি রচনা করা এবং লেখকের ব্যক্তিগত ধর্মীয় অবস্থান নির্ধারণ করা পৃথক অনুসন্ধান।
তাঁর এসব গানকে কেবল বাজারের চাহিদা দিয়ে ব্যাখ্যা করলেও পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। গ্রামোফোন, বেতার, নাট্যমঞ্চ ও শিল্পীদের প্রয়োজন তাঁর সংগীতজীবনের বাস্তব অংশ ছিল। কিন্তু কাজের উপলক্ষ দিয়ে সৃষ্টির সমস্ত আন্তরিকতা মাপা যায় না। গবেষক গোলাম মুরশিদ নজরুলের শ্যামাসংগীতের কাব্যিক সৌন্দর্য, সাংগীতিক ঐশ্বর্য ও অন্তরের আবেদনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পেশাগত পরিবেশ এবং গভীর সৃজনশীল অংশগ্রহণ একই শিল্পীর জীবনে পাশাপাশি থাকতে পারে। ইতিহাস বুঝতে হলে দুটিকেই বিবেচনায় রাখতে হয়।
এখানে আরেকটি সহজ সিদ্ধান্তের প্রলোভন রয়েছে—নজরুল বুঝি সব ধর্মের পার্থক্য মুছে একটি অভিন্ন বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সংগীত সেই দাবি সমর্থন করে না। হামদ, নাত, শ্যামাসংগীত ও কীর্তনের আরাধ্য, পরিভাষা এবং ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি আলাদা। তিনি এসব স্বাতন্ত্র্য গ্রহণ করেই গান লিখেছেন। তাঁর সৃষ্টির মানবিক তাৎপর্য হলো, ভিন্ন বিশ্বাসের অনুভূতিকে মনোযোগ ও মর্যাদা দেওয়ার ক্ষমতা। সহাবস্থান মানে সবাইকে একই হতে বলা নয়; নিজস্ব পরিচয় নিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।
এই অবস্থানের সঙ্গে তাঁর বিদ্রোহের সম্পর্ক গভীর। নজরুলের বিদ্রোহ শুধু শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সীমিত ছিল না; মানুষের ওপর আরোপিত অযৌক্তিক সীমার বিরুদ্ধেও তা সক্রিয়। কে কোন কাহিনি লিখবে, কার কণ্ঠে কোন বিশ্বাসের অনুভূতি প্রকাশ পাবে—এসব প্রশ্নে সামাজিক বাধা শিল্পকে সংকুচিত করতে পারে। তাঁর ভক্তিগান সেই সংকোচনের বাইরে সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখায়। একই সঙ্গে তাঁর মাতৃবন্দনা মনে করিয়ে দেয়, বিদ্রোহী মানুষও ক্লান্ত হয়, শোক পায়, আশ্রয় চায়। শক্তি ও কোমলতা একসঙ্গে ধারণ করাই তাঁর শিল্পীসত্তাকে আরও সম্পূর্ণ করে।
সংগীতের দিক থেকেও এই রচনাগুলোর মূল্য যথেষ্ট। নজরুল বাংলা গানের বিভিন্ন লোকজ ধারা এবং উত্তর ভারতীয় রাগসংগীতের উপাদান নিয়ে কাজ করেছেন। কীর্তন ও শ্যামাসংগীতের পরিচিত আবেগ তাঁর বৃহত্তর সুরসৃষ্টির অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে ভক্তির ভাষা পেয়েছে বৈচিত্র্যময় সাংগীতিক প্রকাশ। বাংলাপিডিয়ার নজরুলসংগীতবিষয়ক আলোচনায় তাঁর রচনায় বিভিন্ন আঙ্গিক ও সুরঐতিহ্যের এই মিলনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। যথাযথ পরিবেশনে তাই শব্দের অর্থের পাশাপাশি সুর, তাল, উচ্চারণ ও অনুভূতির সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের শিক্ষায় এই গানগুলো কাজে লাগতে পারে সাংস্কৃতিক সাক্ষরতা গড়ে তুলতে। শিক্ষার্থীরা জানতে পারে, বাংলার সাহিত্য ও সংগীত বহু উৎস থেকে সমৃদ্ধ হয়েছে। একজন শিল্পী নিজের পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে অন্য ঐতিহ্য অধ্যয়ন করতে পারেন এবং দায়িত্বের সঙ্গে তা প্রকাশ করতে পারেন। এমন পাঠ কাউকে ধর্মীয় আচারে অংশ নিতে বাধ্য করে না। বরং ইতিহাস, ভাষা, রূপক ও নন্দনতত্ত্ব বোঝার সুযোগ দেয়। শিক্ষক যদি বিশ্বাসের প্রতি সম্মান এবং বিশ্লেষণের স্বাধীনতা একসঙ্গে বজায় রাখেন, নজরুলের গান শ্রেণিকক্ষে ফলপ্রসূ আলোচনার বিষয় হতে পারে।
সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার সম্ভাবনাময়, তবে গান শোনালেই সামাজিক বিভেদ দূর হয়ে যাবে—এমন সরল প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। আন্তধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গানের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা, সংশ্লিষ্ট ঐতিহ্যের মানুষের অভিজ্ঞতা শোনা এবং স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা জরুরি। তখন সংগীত পরিচয়ের মধ্যে কথোপকথন ঘটাতে পারে। একজন শ্রোতা বুঝতে পারেন, অন্যের ভক্তির ভাষাতেও রয়েছে তাঁর পরিচিত দুঃখ, ভালোবাসা ও আশা। এই উপলব্ধি সামাজিক ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়, কিন্তু পারস্পরিক মর্যাদাবোধের একটি সহায়ক ভিত্তি হতে পারে।
গবেষণা ও সংরক্ষণেও প্রয়োজন যত্ন। গানগুলোর রচনাকাল, প্রথম প্রকাশ, প্রাথমিক রেকর্ড, স্বরলিপি ও পাঠভেদ যাচাই করলে নজরুলের সংগীতজীবনের বিকাশ আরও স্পষ্ট হবে। কোনো একটি জনপ্রিয় পরিবেশনাকেই মূল রচনার একমাত্র রূপ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তেমনি প্রচলিত স্মৃতিচারণ ও পরবর্তী ব্যাখ্যাকে প্রাথমিক দলিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। এ কাজ শিল্পীর মর্যাদা কমায় না; তাঁর উত্তরাধিকারকে নির্ভরযোগ্যভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। বিশেষত ডিজিটাল পরিসরে তথ্যের সঙ্গে উৎস উল্লেখ করা এই সাংস্কৃতিক দায়িত্বের অংশ।
সবশেষে সেই সন্ধ্যার গানের কাছে ফিরে আসা যাক। যে দেবীকে কেউ উপাসনা করেন, অন্য কেউ তাঁর মধ্যে দেখেন কবিতার মাতৃপ্রতিমা; আরেকজন কেবল সুরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। এই ভিন্ন শ্রবণ পাশাপাশি সম্ভব। নজরুলের শ্যামাসংগীত ও দেবদেবীবিষয়ক অন্যান্য গান আমাদের সেই সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর বিদ্রোহ মানুষকে শৃঙ্খলমুক্ত দেখতে চায়, তাঁর ভক্তি মানুষের অসহায়তার ভাষা খুঁজে পায়। দুইয়ের মিলনে গড়ে ওঠে এক বিশাল শিল্পভুবন—যেখানে নিজের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখেও অন্যের অনুভূতিকে সম্মান করা যায়, এবং যেখানে বাংলার বহুস্বরের মধ্যে মানুষের মুখটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘আমার কৈফিয়ৎ’: পরিচয়ের কাঠগড়ায় নজরুলের নিজের জবাব
নজরুল আস্তিক ছিলেন, না নাস্তিক—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা প্রায়ই তাঁর হয়ে কথা বলি। কেউ তাঁর ইসলামী গান সামনে আনেন, কেউ শ্যামাসংগীত; কেউ বিদ্রোহের পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করেন, কেউ আত্মসমর্পণের প্রার্থনা। কিন্তু যাঁকে নিয়ে এত বিচার, তিনি নিজে এই বিচারকদের সম্পর্কে কী বলেছেন? তাঁর নিজের কবিতায় ফিরে গেলে দেখা যায়, পরিচয়ের এই টানাটানি তাঁর অজানা ছিল না। বরং তিনি এর অসংগতি, সংকীর্ণতা ও ক্ষমতার রাজনীতি চিনেছিলেন। ‘আমার কৈফিয়ৎ’ সেই অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যিক দলিল।
কবিতার শুরুতেই তিনি নিজের অবস্থান জানান:
“বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!”
এই ঘোষণায় প্রথমেই একটি সীমারেখা টানা হয়। তিনি কবি; ধর্মীয় বিধানদাতা কিংবা নির্ভুল ভবিষ্যদ্বক্তা হওয়ার দাবি করছেন না। বর্তমানের মানুষের অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা ও সংগ্রাম তাঁর লেখার অবলম্বন। তাই তাঁর কবিতাকে ধর্মবিশ্বাসের প্রশ্নোত্তরপত্র বানিয়ে প্রতিটি পঙ্ক্তির নিচে আস্তিক বা নাস্তিকের সিল বসালে তাঁর ঘোষিত সাহিত্যিক পরিচয়ই আড়ালে পড়ে যায়।
তবে ‘যাহা বলো’ কথাটিকে নির্বিকার আত্মসমর্পণ ভাবাও ভুল। পুরো কবিতাই দেখায়, এই আপাত সহিষ্ণুতার ভেতর রয়েছে ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ ও আত্মমর্যাদা। তিনি সমালোচনা শুনেছেন; কিন্তু সমালোচকের পছন্দমতো নিজেকে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দেননি। কবিতাটি তাঁর জীবন সম্পর্কে কথা বলে, যদিও তার আত্মবয়ানও ব্যঙ্গ ও অতিশয়োক্তির শিল্পরীতিতে নির্মিত—এটি মনে রেখেই পড়তে হবে।
দেবদেবীর নাম ব্যবহারের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছিল, তিনি তা অভিযোগকারীর কণ্ঠেই তুলে ধরেন:
ফতোয়া দিলাম—কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!’”
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘কাফের কাজী’ কবির নিজের দেওয়া পরিচয় নয়। তিনি অন্যের আরোপিত পরিচয় উদ্ধৃত করে তার অযৌক্তিকতা প্রকাশ করছেন। অথচ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে এই শব্দগুলো তুলে নিলে উল্টো অর্থ দাঁড়াতে পারে। যে পঙ্ক্তি অপবাদ দেওয়ার প্রবণতাকে ব্যঙ্গ করছে, তাকেই অপবাদের প্রমাণ বানানো হবে।
কবির পর্যবেক্ষণ একদিকে সীমাবদ্ধ নয়। একই কবিতায় তিনি লিখছেন:
“হিন্দুরা ভাবে, ‘পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’”
দুই অভিযোগ পাশাপাশি রাখলে সমস্যার প্রকৃতি স্পষ্ট হয়। এক পক্ষের আপত্তি দেবদেবীর নাম ব্যবহারে; অন্য পক্ষের আপত্তি ফারসি শব্দে। অর্থাৎ কবিতার সৌন্দর্য বা বক্তব্যের আগে বিচার করা হচ্ছে তার শব্দ কোন সম্প্রদায়ের বলে চিহ্নিত। কবি যেন ভাষার উপকরণ গ্রহণ করতেও পরিচয়ের অনুমতি চাইবেন! নজরুল সেই অনুমতির শাসন মানেননি।
এই জায়গায় তাঁর দুর্গাগানের তাৎপর্য নতুনভাবে বোঝা যায়। দুর্গা, উমা বা শ্যামার অনুভব প্রকাশ করার জন্য তাঁকে মুসলিম পরিচয় অস্বীকার করতে হয় না। আবার ইসলামী ঐতিহ্যের ভাষা ব্যবহারের জন্য বাংলা সংস্কৃতির বাইরে যেতে হয় না। তাঁর রচনা দেখায়, একজন স্রষ্টার সাংস্কৃতিক অধিকার নিজের সম্প্রদায়ের পরিচিত উপকরণে শেষ হয়ে যায় না।
পরিচয় আরোপের এই অভিজ্ঞতাকে নজরুল আরও বিস্তৃত করেন:
একই কবিতায় রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অসন্তোষও উঠে আসে। কারও চোখে তিনি অতিরিক্ত বিপ্লবী, কারও চোখে যথেষ্ট বিপ্লবী নন। এমনকি নারী–পুরুষ সম্পর্কে তাঁর অবস্থান নিয়েও বিপরীত অভিযোগ: “নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!”
এই পরস্পরবিরোধী রায়গুলো সব সমালোচনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে না। কোনো কোনো সমালোচনায় যথার্থ প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু কবিতাটি একটি প্রবণতা ধরিয়ে দেয়: মানুষ অনেক সময় কবিকে সম্পূর্ণভাবে পড়ার বদলে নিজেদের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করে। নিজের মতের অনুকূল পঙ্ক্তি গ্রহণ করে, প্রতিকূল পঙ্ক্তি দিয়ে বহিষ্কারের যুক্তি বানায়। তখন আলোচনার কেন্দ্রে কবির সৃষ্টি থাকে না; থাকে তাঁকে নিজের দলে নেওয়া বা অন্যের দল থেকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা।
এই অবস্থায় নজরুলের আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সূত্র কোথায়? ‘আমার কৈফিয়ৎ’-এর পরবর্তী অংশে তা পাওয়া যায় ক্ষুধার্ত শিশুর দৃশ্যে:
“ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।”
এখানে কবি স্বাধীনতার বিরোধিতা করছেন না। তিনি স্বাধীনতার স্লোগান ও মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের ব্যবধান দেখাচ্ছেন। যে শিশুর পেটে আগুন জ্বলছে, তার সামনে বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অন্নের প্রশ্নও রাখতে হবে। এই মানবিক অস্থিরতা থেকেই পরের প্রশ্ন: “কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছ কি?”
এই পঙ্ক্তিকে লুকিয়ে রেখে নজরুলকে প্রশ্নহীন বিশ্বাসের কবি বানানো যায় না। এখানে ঈশ্বরের উপস্থিতি সম্পর্কে সত্যিই একটি তীব্র প্রশ্ন আছে। কিন্তু প্রশ্নটির জন্ম কোথায়, সেটিও দেখতে হবে: ক্ষুধার্ত শিশুকে দেখে, মানুষের নিষ্ঠুরতায় বিপর্যস্ত হয়ে। এর মধ্যে অন্যায় ও দুঃখের মুখে ঈশ্বরের ন্যায়বিচার নিয়ে সংশয়ের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়।
আবার এই একটি প্রশ্ন থেকেই তাঁর স্থায়ী নিরীশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে অভিমান, প্রতিবাদ কিংবা অস্তিত্বের প্রশ্ন তোলা এবং সুসংবদ্ধভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। প্রশ্নটি বিশ্বাসের ভেতরের সংকট হিসেবেও পড়া যায়; গভীর সংশয়ের প্রকাশ হিসেবেও পড়া যায়। কোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করব, তা নির্ধারণে তাঁর অন্য রচনা ও প্রসঙ্গও বিবেচনা করতে হবে। নিজের লেখার উৎস সম্পর্কে কবি অবশ্য আরও স্পষ্ট:
“দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,”
এই ‘রক্ত-লেখা’ তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের কেন্দ্রে নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা স্থাপন করে। কবিতার তীব্রতা কোথাও ধর্মকে, কোথাও রাজনীতিকে, কোথাও সাহিত্যিক আত্মতৃপ্তিকে আঘাত করে। এসব আঘাতের একটি প্রধান যোগসূত্র মানুষের দুর্দশার বিরুদ্ধে তাঁর অস্থিরতা। সেই সূত্রে তাঁর দুর্গাগানও পড়া যায়—দেবীর শক্তি মানুষের শক্তি হয়ে উঠুক, ভক্তির মধ্যে মানুষের কল্যাণের দায় থাকুক।
তবু নজরুলের ধর্মচেতনার সব দ্বন্দ্ব ‘মানবতাবাদ’ শব্দে ঢেকে দেওয়া উচিত নয়। ‘আত্মশক্তি’ কবিতায় তিনি আরও দুরূহ প্রশ্ন রাখেন:
“বলো, নাস্তিক হউক আপন মহিমা নেহারি শুদ্ধ ধীর!”
এই পঙ্ক্তিতে ‘নাস্তিক’ পরিচয়কে নিছক অপমান হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে না। কবির আহ্বানে নিজের মহিমা উপলব্ধি, শুদ্ধতা ও স্থিরতার মূল্য আছে। ফলে একজন মানুষকে শুধু নাস্তিক বলা হয়েছে বলেই তার নৈতিক সামর্থ্য বাতিল—এমন ধারণার সঙ্গে পঙ্ক্তিটি মেলে না। তবে এখানেও কবি সরাসরি ‘আমি নাস্তিক’ বলছেন না; তিনি আত্মশক্তির জাগরণ নিয়ে কথা বলছেন।
কবিতার আরও একটি অংশে প্রশ্নটি গভীর হয়:
“জাগাও আদিম স্বাধীন প্রাণ,
আত্মা জাগিলে বিধাতা চান।
কে ভগবান?—
আত্ম-জ্ঞান!”
এখানে দেবত্বের ভাষা মানুষের আত্মোপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বাইরের কর্তৃত্বের সামনে নিষ্ক্রিয় থাকার বদলে নিজের মধ্যে স্বাধীনতা ও সত্যের শক্তি খুঁজে পাওয়ার আহ্বান রয়েছে। এই অংশকে মানুষের অন্তর্নিহিত দেবত্বের ভাবনায় পড়া যায়; আবার আত্মনির্ভরতার তীব্র কাব্যিক ঘোষণা হিসেবেও পড়া যায়। শুধু এই কয়েকটি পঙ্ক্তি দিয়ে তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট দর্শনের অনুসারী ঘোষণা করা সংগত হবে না।
তারপর আসে এমন একটি বক্তব্য, যা তাঁর স্বাধীন বিবেকের দাবি স্পষ্ট করে:
“না জাগিলে প্রাণে সত্য চেতনা, মানি না আদেশ কারও বাণীর!”
কার বাণী—এই প্রশ্নে কবিতাটি এখানে পৃথক তালিকা দেয় না। কিন্তু বক্তব্যে সত্যের উপলব্ধি ছাড়া নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি আছে। তাই নজরুলের বিশ্বাসের ভাষা থাকলেও তাঁকে অন্ধ আনুগত্যের কবি হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন। তাঁর কাছে আত্মমর্যাদা, উপলব্ধি ও সত্যের প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে।
‘অভিশাপ’ কবিতার মুখোমুখি হলে এই বিশ্লেষণ আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন:
“আমি বিধির বিধান ভাঙিয়াছি, আমি এমনি শক্তিমান!
মম চরণের তলে, মরণের মার খেয়ে মরে ভগবান।”
এই ভাষা প্রথাগত ভক্তির নয়। ঈশ্বরের সর্বময় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এখানে চরম কাব্যিক আক্রমণ আছে—সেটি স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু কবিতার শেষ অংশে বক্তা নিজেকে ‘কালসাপ’ বলে চিহ্নিত করে এবং জানায়, লোকে তাকে ‘অভিশাপ’ বলে। ফলে এই ‘আমি’কে কোনো মধ্যবর্তী ব্যাখ্যা ছাড়া বাস্তব ব্যক্তি নজরুলের আত্মঘোষণা হিসেবে নেওয়া যাবে না।
কবিতায় বিমূর্ত শক্তি, চরিত্র কিংবা অভিজ্ঞতা ব্যক্তির কণ্ঠ পেতে পারে। এখানে সেই নাটকীয় বক্তার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বক্তা আলাদা বলেই কবি রচনার ভাবনা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন—এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। তাঁর কল্পনায় স্রষ্টা, সৃষ্টি, ক্ষমতা ও বিদ্রোহের সম্পর্ক নিয়ে যে সংঘাত আছে, কবিতাটি তার সাক্ষ্য। সঠিক পাঠে তাই দুটি কথা একসঙ্গে রাখতে হয়: এর বিদ্রোহী তীব্রতা অস্বীকার করা যাবে না; আবার একে ব্যক্তিগত ধর্মত্যাগের লিখিত ঘোষণা বানানোও যাবে না।
অন্য কবিতায় ভিন্ন সুর পাওয়া যায়। ‘অভয়-মন্ত্র’-এ তিনি বলেন:
“তুই চেয়ে দেখ ভাই আপনার মাঝে,
সেথা জাগ্রত ভগবান রাজে,”
‘বিদায়-মাভৈঃ’-এ রয়েছে:
“ঘরের প্রদীপ নিবলে বিধির আলোক-প্রদীপ রয়।”
এসব পঙ্ক্তিতে মানুষের সীমিত অস্তিত্বের বাইরে বা অন্তরে এক বৃহত্তর আলোক ও শক্তির কল্পনা আছে। এগুলোকে উপেক্ষা করে কবিকে নিঃসংশয়ে নিরীশ্বরবাদী বলা অসম্পূর্ণ পাঠ। আবার এগুলো দেখিয়ে ‘অভিশাপ’-এর বিদ্রোহ কিংবা ‘আমার কৈফিয়ৎ’-এর প্রশ্ন মুছে ফেলাও অসম্পূর্ণ। বিশ্বাস, সংশয়, আত্মশক্তি ও প্রতিবাদ—সবই তাঁর রচনায় উপস্থিত।
এই বহুমাত্রিকতার একটি সুন্দর প্রকাশ বিষের বাঁশির উৎসর্গে। একজন মুসলিম নারীকে তিনি সম্বোধন করেছেন:
“বাংলার অগ্নি-নাগিনি মেয়ে মুসলিম-মহিলা-কুল-গৌরব
আমার জগজ্জননী-স্বরূপা মা”
একই উৎসর্গে ‘পবিত্র চরণারবিন্দে’, ‘নাগমাতা’ ও ‘জগন্মাতা’র ভাষা এসেছে। এখানে মুসলিম পরিচয় ও দেবীময় মাতৃরূপ পরস্পরকে বাতিল করছে না। শেষের দিকে তিনি বোঝান, শুধু তাঁকে ভালোবাসার জন্য নয়, সব সন্তানকে সমান ভালোবাসার জন্য এই মাতৃত্বের মর্যাদা:
“নহে তার তরে,—সব সন্তানে তুমি যে বেসেছ ভালো,
তোমার মানিক সকলের মুখে দেয় যে সমান আলো,”
এখানে দেবীময় উপমার নৈতিক ভিত্তি সর্বজনীন মমতা। একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের শব্দ অন্য পরিচয়ের মানুষের মহত্ত্ব প্রকাশে ব্যবহৃত হয়েছে। নজরুলের দুর্গাভাবনার সঙ্গে এই ভাষার যোগ গভীর: জননীর মহিমা মানুষের দুঃখ বহন ও সমান স্নেহ দেওয়ার মধ্যে প্রকাশ পায়।
অনুবাদের ক্ষেত্রে অবশ্য আরও একটি সীমারেখা রাখতে হবে। সংযুক্ত পাঠে রয়েছে:
“নাস্তিক আর কাফের বলো তোমরা লয়ে আমার নাম,
কুৎসা গ্লানির পঙ্কিল স্রোত বহাও হেথা অবিশ্রাম।”
এই রুবাই নজরুলের অনূদিত রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম-এর অংশ। এর বাংলা ভাষা নজরুলের, কিন্তু বক্তার বক্তব্য খৈয়ামের নামে প্রচলিত রুবাইয়ের অনুবাদভুবনের অন্তর্গত। তাই একে নজরুলের নিজের জীবনের সরাসরি কৈফিয়ৎ বলা ঠিক হবে না। অনুবাদ তাঁর সাহিত্যিক আগ্রহ বোঝার উপকরণ হতে পারে; ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ স্বীকারোক্তি নয়।
একই পার্থক্য ‘অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত’-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেখানে শাস্ত্র–আচার ভাঙার বিপ্লবী আহ্বান আছে; কিন্তু রচনাটির অনুবাদ বা রূপান্তরের পরিচয় বাদ দিয়ে প্রতিটি বক্তব্যকে কবির স্বতন্ত্র আত্মঘোষণা হিসেবে উদ্ধৃত করা যাবে না। মূল রচনা, অনুবাদ, নাটকীয় বক্তা ও আত্মবয়ান আলাদা না করলে যুক্তির ভিত্তিই দুর্বল হয়।
সবশেষে ‘হবে জয়’ কবিতায় যেন আমাদের বর্তমান সাংস্কৃতিক সংকটের জন্যও একটি পাঠ রয়ে যায়:
“অভিশাপ-শ্বাস দমকা বাতাস
প্রদীপ নিবায় বলে
আলো না জ্বালায়ে রহিবে বসিয়া
আঁধার আঙিনাতলে?”
এটি বর্তমানের কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উদ্দেশে লেখা নয়। কিন্তু আজকের পাঠে এর প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক: নিন্দা, বাধা বা আক্রমণের ভয়ে কি সৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক চর্চা বন্ধ হবে? কবিতার উত্তর অগ্রযাত্রার পক্ষে। তবে আজ সেই অগ্রযাত্রার অর্থ অন্যকে অপমান করা নয়; পাঠ, সংলাপ, স্বাধীন সমালোচনা ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এই কবিতাগুলো মিলিয়ে নজরুলের নিজের জবাব একটি মাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের বাক্যে শেষ হয় না। সবচেয়ে সরাসরি আত্মবয়ানে তিনি বর্তমানের কবি, মানুষের যন্ত্রণার সাক্ষী এবং আরোপিত পরিচয়ের ব্যঙ্গকার। অন্য রচনায় তিনি বিশ্বাসী ভাষার ব্যবহারকারী, ঈশ্বরকে প্রশ্নকারী, আত্মশক্তির আহ্বানকারী এবং কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। এই অবস্থানগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন আছে; সেগুলোকে জোর করে মুছে দেওয়া গবেষণার কাজ নয়।
তাঁকে যে পরিচয়েই ডাকা হোক, তাঁর রচনা তাতে বদলায় না। কিন্তু আমাদের দেওয়া পরিচয় যদি তাঁর কোনো গানকে নিষিদ্ধ করে, কোনো প্রশ্নকে গোপন করে কিংবা কোনো সম্প্রদায়কে তাঁর উত্তরাধিকার থেকে সরিয়ে দেয়, তখন সেই পরিচয় আর নিরীহ থাকে না। তখন তা পাঠের ওপর কর্তৃত্বের দাবি হয়ে ওঠে।
দুর্গাপূজার প্রাক্কালে নজরুলের নিজের কৈফিয়ৎ তাই আমাদের কাছে একটি বড় দাবি রাখে: তাঁকে ধর্মীয় নিষ্ঠা যাচাইয়ের আসামি করে নয়, সম্পূর্ণ সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে পড়তে হবে। তাঁর বিশ্বাসের ভাষাও শুনতে হবে, সংশয়ের ভাষাও; তাঁর দেবীবন্দনার সৌন্দর্যও গ্রহণ করতে হবে, মানবিক দায়ের প্রশ্নও। কবি আমাদের পছন্দমতো ছোট হবেন না। বরং তাঁকে যথার্থভাবে বুঝতে হলে আমাদের পাঠের পরিসরই বড় করতে হবে।
শেষকথা: দেবতা খুঁজতে গিয়ে মানুষকে হারাবেন না
নজরুলের কবিতায় ধর্ম কোথায়—এই প্রশ্নের আগে আরেকটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন: তাঁর কবিতায় মানুষ কোথায়? ‘শূদ্রের মাঝে জাগিছে রুদ্র’ পড়লে সেই মানুষের দেখা মেলে মাঠে, খনিতে, নির্মাণস্থলে, তাঁতের পাশে এবং ভোর হওয়ার আগের নির্জন রাজপথে। কবিতার শুরুতেই তিনি ঘোষণা করেন—
“শূদ্রের মাঝে জাগিছে রুদ্র
ব্যথা-অনিদ্র দেবতা।”
দেবতা এখানে কেবল উপাসনালয়ের অধিবাসী নন। তিনি শ্রমজীবী মানুষের রূপে উপস্থিত। যাঁরা সমাজের সম্পদ সৃষ্টি করেন, অথচ নিজেরাই বঞ্চিত থাকেন, তাঁদের মধ্যে কবি দেবত্বের মহিমা দেখছেন। কৃষক অন্যের অন্ন জোগান, শ্রমিক অন্যের ভাণ্ডার পূর্ণ করেন, রাজমিস্ত্রি অন্যের প্রাসাদ নির্মাণ করেন। অথচ—
“কুটিরে তোমার জ্বলে না প্রদীপ,
কাঁদে নিরন্ন পরিজন,”
এই বৈপরীত্যই কবিতার নৈতিক কেন্দ্র। মানুষের শ্রম গ্রহণ করব, কিন্তু শ্রমিককে সম্মান দেব না; তাঁর সেবা নেব, কিন্তু তাঁকেই নিচু বলে দূরে সরিয়ে রাখব—এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নজরুলের রুদ্র জেগে ওঠেন। কবিতায় ব্যবহৃত ঐতিহাসিক জাতি ও পেশাসূচক শব্দগুলোর মধ্যে কিছু আজ অবমাননাকর বলে বিবেচিত; সেগুলো উদ্ধৃত করার সময়ও মনে রাখতে হবে, কবির এই রচনার লক্ষ্য অবজ্ঞাপ্রাপ্ত মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। তাঁর প্রশ্ন আমাদের দিকে: যাঁর শ্রমে পৃথিবী পরিচ্ছন্ন থাকে, তাঁকেই কেন আমরা অপবিত্র ভাবি?
এই প্রশ্ন নিয়ে ‘পূজা অভিনয়’-এ প্রবেশ করলে দেবীবন্দনার আরেকটি অর্থ উন্মোচিত হয়। নজরুল দেখেন, মানুষ প্রতিমা নির্মাণ করছে, অথচ নিজের শক্তিকে জাগাতে পারছে না—
“দেবতারে যারা করেছে সৃজন,
সৃজিতে পারে না আপনারে,
আসে না শক্তি, পায় না আশিস,
ব্যর্থ সে পূজা বারে বারে।”
এখানে আচার ও আত্মশক্তির মধ্যকার ব্যবধানকে তিনি আঘাত করেছেন। দেবীর হাতে অস্ত্র সাজিয়ে মানুষ যদি নিজের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে শক্তিপূজার উদ্দেশ্য কীভাবে পূর্ণ হবে? কবির ব্যঙ্গ তাই তীক্ষ্ণ—
“মহিষাসুরেরে বলি দিতে নারে,
বলে, ‘মাগো ওটা তুই বধিস।’”
এই পঙ্ক্তির সমকালীন পাঠ হতে পারে: অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের কর্তব্য পালন না করে সব দায়িত্ব অলৌকিক শক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া আত্মপ্রবঞ্চনা। আবার কবিতার ‘ধনিক রাবণ’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অসুরের চেহারা কেবল পৌরাণিক নয়; লুণ্ঠন, সীমাহীন লোভ ও শোষণের মধ্যেও তার প্রতীকী উপস্থিতি আছে। তবে এই রূপক দিয়ে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অসুর বলা কবিতার মানবমুক্তির অর্থকেই বিকৃত করবে।
‘রক্ত-তিলক’-এ সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আরও অগ্নিময়। কবিতাটির রক্ত ও যুদ্ধের ভাষা পরাধীনতার বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রামচেতনার অংশ; বর্তমানের মানুষকে আক্রমণের নির্দেশ হিসেবে তাকে গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু তার একটি প্রশ্ন আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক—“আজ যদি নাহি বাঁচিলি, বাঁচিবি বল কখন?”
আরও স্পষ্ট উচ্চারণ—“আজের মর্ত্য সেই সে স্বর্গ সর্বকাল!”
— এই উচ্চারণে পৃথিবীর জীবনকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি আছে। ভবিষ্যতের সুখ কিংবা পরলোকের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমানের ক্ষুধা, অপমান ও অধীনতাকে উপেক্ষা করা যায় না। এখান থেকেই কবি প্রশ্ন করেন—“কী হবে পূজিয়া পাষাণ-দেবতা পুণ্য-চোর?”
এই ভাষা তীব্র; তাকে কোমল করে দেখানোর প্রয়োজন নেই। তবে এর প্রসঙ্গও বাদ দেওয়া যাবে না। কবি এমন পুণ্যচর্চাকে প্রশ্ন করছেন, যা জীবনের সংকটের মুখে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে। তাঁর কবিতায় বিশ্বাসের মূল্য নির্ধারণে মানুষের জীবন বারবার সামনে আসে।
অথচ এই প্রতিবাদী কবিই ‘নমস্কার’-এ নবজীবনকে অভিবাদন জানান। নদীর প্রবাহ, ফল-ফসল, শিশুর প্রাণ ও নতুন দিনের সম্ভাবনার মধ্যে তাঁর প্রণতি বিস্তৃত হয়। একই কবিতায় ‘দেবী’, ‘নব জিশু’ ও ‘ভাগীরথী’র উপস্থিতি দেখায়, বিভিন্ন ঐতিহ্যের প্রতীক তাঁর কাব্যভাষায় পাশাপাশি কাজ করতে পারে। একটি নাম দেখে তাঁকে একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে বন্দি করলে এই বিস্তৃত কল্পনাজগৎ অধরা থেকে যায়।
তার পাশে ‘হোলি’ ও ‘বে-শরম’ রাখলে দেখা যায়, নজরুলের কবিতা শুধু বিদ্রোহের ভাষা নয়; প্রেম, রঙ, হাসি, লজ্জা ও দুষ্টুমির ভাষাও। ‘শেষের ডাক’-এ আবার মৃত্যুর বিষণ্নতা, কাফনের গন্ধ ও বিচ্ছেদের আকুলতা। এসব অনুভূতির প্রতিটিকে ধর্মপরিচয়ের প্রমাণ বানাতে গেলে জীবনের বহুবর্ণ অভিজ্ঞতাই সংকুচিত হয়। প্রেমের গানের বক্তা, মৃত্যুচিন্তার ‘আমি’ এবং বিপ্লবের নাটকীয় কণ্ঠকে একই ধরনের ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি ভাবা যায় না।
এই কারণেই নজরুলকে বোঝার শেষ দরজাটি কোনো পরিচয়ের সনদ নয়; তাঁর কবিতার সম্পূর্ণ মানবিক পরিসর। সেখানে বিশ্বাস আছে, বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন আছে, দেবতার প্রতি প্রণতি আছে, নিষ্ক্রিয় দেবত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও আছে। এই টানাপোড়েন মুছে দিয়ে তাঁকে সুবিধামতো নির্মাণ করলে আমরা কবিকে পাই না—নিজেদের পছন্দের প্রতিচ্ছবি পাই।
কবিতা ও সংস্কৃতিতে ধর্মীয় ভাবনা অনুসন্ধান অবশ্যই বৈধ। কিন্তু অনুসন্ধান যখন কেবল কবির ধর্মীয় নিষ্ঠা যাচাই, তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা বা নিজের দলে নেওয়ার উপায় হয়ে ওঠে, তখন পাঠের সততা হারায়। ‘শরাবন তহুরা’র পেয়ালা, সাকি ও মত্ততার কাব্যভাষা দেখে যেমন সরাসরি কবির জীবনাচরণ নির্ধারণ করা যায় না, তেমনি ‘বে-শরম’-এর প্রেমময় খেলা দিয়ে তাঁর নৈতিক চরিত্রের রায়ও দেওয়া যায় না।
শেষের এই দুই শিরোনাম তাই আমাদের পাঠাভ্যাসের জন্য একটি ব্যঙ্গাত্মক আয়না হতে পারে। যাঁরা কবিতার মানবিক সত্য এড়িয়ে কেবল নিজের পছন্দের ধর্মীয় প্রমাণ খোঁজেন, তাঁরা যেন ‘শরাবন তহুরা’র পেয়ালায় নিজেদের প্রত্যাশার পানীয়ই খুঁজে ফেরেন। আর প্রসঙ্গ ছিঁড়ে কবির বিরুদ্ধে রায় সাজানোর সেই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত ‘বে-শরম’ হয়ে ওঠে—কবির নয়, পাঠকের বিচার।
পেয়ালায় নিজের প্রত্যাশা ঢেলে তাকে কবির বিশ্বাস বলবেন না। কবিতাকে তার সম্পূর্ণতায় পড়ুন; নইলে শেষের ‘বে-শরম’ শিরোনামটি কবির চেয়ে আমাদের পাঠকেই বেশি প্রশ্ন করবে।
শেষ আহ্বান: তার ছিঁড়িয়া গেলে সুর হারায়, বিবেক ছিঁড়িয়া গেলে হারায় মনুষ্যত্ব
রবীন্দ্রনাথের আত্মজিজ্ঞাসায় নজরুলের বিদ্রোহী প্রত্যুত্তর
"আজব এক দেশে বাস করছি। শিক্ষাব্যবস্থার গলদের কারণে অনেক মানুষই ছোটবেলা থেকে এই সমস্যায় ভুগছে—হুট করে তাদের মাথার তার ছিঁড়ে যায়, আর এর ফলে যা ইচ্ছা তাই করে বসে। কোনো বিষয় পুরোটা না জেনেই শুরু করে দেয় এমন তার-ছিঁড়া কাণ্ড। এই যেমন দেখলাম রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি মারতে। কিন্তু এতে কি কবির সত্যি কিছু এসে যায়? কবি তো জানেনই, মাথার তার ছিঁড়লে মানুষ কত কী-ই না করে ফেলে! অনেকে আবার সংকোচের কারণে কোনো বিষয়ে পুরোটা জানতে পারে না, আর সেই না-জানার লজ্জা থেকে বাঁচতেও তাদের মাথার তার ছিঁড়ে যায়। হয়তো তাই কবি লিখেছিলেন, 'সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান'।"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁহার ‘আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে’ গানে লিখিয়াছিলেন—
কবির এই পঙ্ক্তি মূলত হারানো দিনের স্মৃতি, বিরহ ও জীবনের সুর বিচ্ছিন্ন হইবার বেদনাকে ধারণ করে। কিন্তু সমকালীন সমাজের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকাইলে ইহার মধ্যে যেন এক ভিন্ন প্রতীকী তাৎপর্যও খুঁজিয়া পাওয়া যায়। আমাদের সমাজের কোথাও কোথাও আজ যুক্তির তার ছিঁড়িয়া যাইতেছে, বিবেচনার সুর হারাইয়া যাইতেছে, আর সেই ছিন্নতারের বিকট শব্দে ঢাকা পড়িতেছে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সহিষ্ণুতা ও মানবিকতার মধুর সংগীত।
আর এইখানেই যেন রবীন্দ্রনাথের বিষণ্ন সুরের বিপরীতে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কণ্ঠ আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয়, মানুষের আত্মমর্যাদা ও বিবেকের শক্তি নিঃশেষ হইয়া যায় নাই। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করিয়াছিলেন—
“বল বীর— বল উন্নত মম শির!”
রবীন্দ্রনাথের ছিন্নতারের বেদনা এবং নজরুলের উন্নতশিরের ঘোষণা সাহিত্যিকভাবে ভিন্ন প্রসঙ্গে উচ্চারিত হইলেও সমকালীন সমাজের সংকটে উভয়কে পাশাপাশি পাঠ করিবার একটি গভীর তাৎপর্য রহিয়াছে। একজন আমাদের হারানো সুরের কথা স্মরণ করান, অন্যজন সেই সুর ফিরাইয়া আনিবার জন্য আত্মমর্যাদা ও প্রতিবাদী সাহসের প্রয়োজনীয়তাকে উজ্জ্বল করিয়া তোলেন। একজনের বেদনা আত্মজিজ্ঞাসার দ্বার উন্মোচন করে, অন্যজনের বিদ্রোহ সেই আত্মজিজ্ঞাসাকে কর্মমুখী করিবার শক্তি জোগায়।
আমরা এক আশ্চর্য সময়ে বাস করিতেছি। এখানে কোনো বিষয়ে সম্পূর্ণ না জানিয়াই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিবার প্রবণতা দেখা যায়; কোনো সাহিত্যিককে গভীরভাবে না পড়িয়াই তাঁহার বিচার শুরু হয়; কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট না বুঝিয়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রায় প্রদান করা হয়। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করিবার পরিবর্তে কখনো কখনো সেই অজ্ঞতাকেই উচ্চকণ্ঠ আত্মবিশ্বাসের আবরণে আড়াল করা হয়। যেন না জানাটা অপরাধ নহে, কিন্তু না জানিয়াও সব জানিবার ভান করাটা এক বিশেষ সামাজিক যোগ্যতা!
এইখানেই মনে পড়ে আমাদের পরিচিত কথ্যভাষার সেই তির্যক অভিব্যক্তি—‘মাথার তার ছিঁড়িয়া গিয়াছে’। ইহা কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষা নহে; বরং হঠকারিতা, অসংলগ্ন আচরণ ও বিচারবোধহীন কর্মকাণ্ডকে ব্যঙ্গ করিবার এক লোকজ রূপক। রবীন্দ্রনাথের বীণার ছিন্ন তারের সহিত এই কথ্যরূপকের সরাসরি সাহিত্যিক সম্পর্ক নাই; কিন্তু সমকালীন সমাজের অসংগতিকে ব্যাখ্যা করিতে গেলে দুইয়ের মধ্যে এক ব্যঙ্গাত্মক প্রতিধ্বনি অনুভব করা যায়। কবির বীণার তার ছিঁড়িলে সুর হারায়; আর মানুষের বিবেকের তার ছিঁড়িলে যুক্তি, সৌজন্য ও সহিষ্ণুতার সুর হারাইয়া যায়।
সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি লেপনের যে ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা এই বৃহত্তর প্রশ্নটিকেই সামনে আনিয়াছে। একটি প্রতিকৃতিতে কালি লাগাইলে কি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক মহিমা মুছিয়া যায়? কোনো কবির ছবি বিকৃত করিলে কি তাঁহার রচিত কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও দর্শনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিনষ্ট হয়? রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করা অবশ্যই সম্ভব, প্রয়োজনীয়ও বটে। তাঁহার সাহিত্যদর্শন, সমাজভাবনা, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ঐতিহাসিক ভূমিকা লইয়া তথ্যনির্ভর বিতর্ক হইতে পারে। কিন্তু সমালোচনার পরিবর্তে প্রতিকৃতিকে অপমান করিবার মধ্য দিয়া কোনো যুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং উহা অনেক সময় যুক্তি উপস্থাপনের অক্ষমতাকেই অধিক দৃশ্যমান করিয়া তোলে।
রবীন্দ্রনাথকে কালি মাখাইয়া কালিমালিপ্ত করা যায় না; যেমন নজরুলকে ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ খাঁচায় বন্দি করিয়াও তাঁহার মানবতাবাদী সাহিত্যসত্তাকে মুছিয়া ফেলা যায় না। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার কোনো প্রতিকৃতির রঙে সীমাবদ্ধ নহে; নজরুলের বিদ্রোহী চেতনাও কোনো বিশেষ ধর্মীয় পরিচয়ের একচ্ছত্র সম্পত্তি নহে। উভয়ের সৃষ্টি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। সুতরাং একজনকে অসম্মান করিয়া অন্যজনকে সম্মানিত করিবার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত আমাদের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতিই অবিচার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই দুই মহাকবির সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্নেহ, সাহিত্যিক স্বীকৃতি ও গভীর আত্মিক অনুরাগের। রবীন্দ্রনাথ যখন কারাবন্দি তরুণ নজরুলকে তাঁহার ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ করিয়াছিলেন, তখনই তিনি বিদ্রোহী কবির সাহিত্যিক প্রতিভার প্রতি নিজের শ্রদ্ধা ও স্নেহের এক ঐতিহাসিক নিদর্শন রাখিয়াছিলেন। আর ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণের সংবাদে শোকবিহ্বল নজরুল রচনা করিয়াছিলেন ‘রবি-হারা’ ও ‘সালাম অস্ত-রবি’ কবিতা এবং হৃদয়বিদারক শোকসংগীত ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’। ‘রবি-হারা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণকে তিনি কেবল একজন কবির মৃত্যু হিসাবে দেখেন নাই; দেখিয়াছিলেন বাংলার আকাশ হইতে এক মহাজাগতিক আলোকবর্তিকার অন্তর্ধানরূপে। তাই তাঁহার শোকাতুর উচ্চারণ—‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্ত-পথের কোলে’—যেন সমগ্র বাংলার হৃদয়ে নেমে আসা এক গভীর অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি। নজরুলের কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘বিশ্বের রবি, ভারতের কবি’; তাঁহার বিদায় যেন বাংলার সাংস্কৃতিক আকাশে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করিয়াছিল। সেই শোকের গভীরতা আরও মর্মস্পর্শী হইয়া উঠিয়াছিল নজরুলের অমর সংগীতে—‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবি রে জাগায়ো না জাগায়ো না’
ভাবিয়া দেখুন, যাঁহাকে আজ কেহ কেহ ধর্মীয় পরিচয়ের অজুহাতে অবমাননা করিতে উদ্যত, সেই রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণে মুসলমান কবি নজরুলের হৃদয় ভাঙিয়া পড়িয়াছিল গভীর বেদনায়; আর যাঁহাকে কেহ কেহ কেবল একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করিতে চান, সেই নজরুলই রবীন্দ্রনাথকে আপন সাহিত্যিক জীবনের এক পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বরূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই ঐতিহাসিক সম্পর্ক কি আমাদের কিছুই শিক্ষা দেয় না? যাঁহারা নজরুলের নাম উচ্চারণ করিয়া রবীন্দ্রনাথকে অপমান করেন, তাঁহারা কি কখনো ভাবিয়া দেখিয়াছেন, তাঁহাদের এই আচরণ নজরুলের নিজের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের সঙ্গেই কতখানি সাংঘর্ষিক? রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য ছিল, দর্শন ও প্রকাশভঙ্গিতেও ছিল পার্থক্য; কিন্তু সেই পার্থক্য কখনো পরস্পরের মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হয় নাই। বরং একজনের প্রতি অন্যজনের শ্রদ্ধা বাংলা সাহিত্যকে করিয়াছে আরও মহিমান্বিত। অতএব, রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি লেপনের পূর্বে নজরুলের সেই শোকাতুর হৃদয়ের কথা একবার স্মরণ করা প্রয়োজন। কেননা যে রবির অস্তগমনে নজরুলের কলম অশ্রুসিক্ত হইয়াছিল, সেই রবির মুখে কালি মাখাইয়া নজরুলকে সম্মান করিবার দাবি ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস বৈ আর কিছু নহে। রবীন্দ্রনাথের অবমাননা নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হইতে পারে না; বরং দুই কবির পারস্পরিক ভালোবাসা ও বাঙালির সম্মিলিত সাংস্কৃতিক চেতনাকেই তাহা আহত করে।
আসলে কালি লেপনের মেতো এই অসহিষ্ণুতার পিছনে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকাও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হইল, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখস্থবিদ্যার পাশাপাশি স্বাধীন চিন্তা, বিশ্লেষণ, ঐতিহাসিক অনুসন্ধান, নৈতিক বিচারবোধ এবং ভিন্নমতকে সম্মান করিবার অভ্যাস কতখানি গড়িয়া উঠিতেছে। শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার নম্বর, সনদ ও পেশাগত প্রতিযোগিতার উপকরণে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইলেও মননশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির উদ্দেশ্য অপূর্ণ থাকিয়া যাইতে পারে। অবশ্য সামাজিক অসহিষ্ণুতার সকল দায় শিক্ষাব্যবস্থার উপর চাপানোও যথার্থ নহে; পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার ভূমিকাও এখানে বিবেচ্য।
প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে কেবল উত্তর প্রদান করিতে শেখায় না; প্রশ্ন করিতে শেখায়। শুধু নিজের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করিতে শেখায় না; অপরের বিশ্বাসের উৎস ও যুক্তিও বুঝিতে শেখায়। সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ জানেন, সকল বিষয়ে তাঁহার জ্ঞান সম্পূর্ণ নহে। তিনি ভুল স্বীকার করিতে লজ্জাবোধ করেন না, সংশোধিত হইতে অপমানিত হন না এবং অজানাকে জানিবার মধ্যে নিজের মর্যাদাহানি দেখেন না। বরং অজ্ঞতা গোপন করিবার জন্য আক্রমণাত্মক আচরণই জ্ঞানের পথে অন্যতম অন্তরায়।
এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আরেকটি সংগীত আমাদের সামনে গভীর নৈতিক আহ্বান লইয়া উপস্থিত হয়। ‘সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান’ গানে কবি উচ্চারণ করিয়াছেন—
এই পঙ্ক্তিতে রবীন্দ্রনাথ যে সঙ্কোচের কথা বলিয়াছেন, তাহা মূলত ভয়, আত্মসংশয় ও সংকটের সম্মুখে নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে আত্মশক্তি জাগরণের আহ্বান। ইহাকে অজ্ঞতা স্বীকার করিবার লজ্জা সম্পর্কে সরাসরি উক্তি বলিয়া গ্রহণ করা যথার্থ নহে। তথাপি সমকালীন শিক্ষার আলোচনায় ইহার তাৎপর্য প্রসারিত করিয়া বলা যায়—প্রশ্ন করিতে ভয় পাইও না, না জানিলে জানিতে লজ্জা পাইও না, আর ভুল বুঝিলে তাহা সংশোধন করিতে সঙ্কুচিত হইও না। কারণ আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রকৃত পথ অজ্ঞতাকে আড়াল করা নহে; জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়া নিজেকে সমৃদ্ধ করা।
কবি একই গানে আহ্বান জানাইয়াছেন—
কী আশ্চর্য, শতাব্দীপ্রাচীন এই আহ্বান আজও কত প্রাসঙ্গিক! ভয়মুক্তির অর্থ কেবল বিপদের সম্মুখে সাহসী হওয়া নহে; নিজের পূর্বধারণাকে প্রশ্ন করিবার সাহস অর্জন করাও একপ্রকার মুক্তি। সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রচলিত মতের বাহিরে সত্য উচ্চারণের সাহস, ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহস, প্রিয় ব্যক্তিত্বের ভুলকে যুক্তিসংগতভাবে সমালোচনা করিবার সাহস এবং বিরুদ্ধমত পোষণকারী মানুষের নাগরিক অধিকার রক্ষার সাহস—এই সকলই মুক্তচিন্তার অপরিহার্য উপাদান।
এইখানেই রবীন্দ্রনাথের ভয়মুক্তির আহ্বানের সহিত নজরুলের বিদ্রোহী মানবতাবাদের এক গভীর আত্মিক সংযোগ অনুভব করা যায়। একজন মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগাইতে চাহিয়াছেন, অন্যজন সেই শক্তিকে অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রূপ দিতে চাহিয়াছেন। একজনের সংগীতে ভয়মুক্তির আহ্বান, অন্যজনের কবিতায় শৃঙ্খলমুক্তির বজ্রনিনাদ। কিন্তু উভয়ের নৈতিক অভিমুখে রহিয়াছে মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা ও মানবিক বিকাশের আকাঙ্ক্ষা।
রবীন্দ্রনাথ যখন মানুষকে নিজের ভয় জয় করিবার আহ্বান জানান, নজরুল তখন সেই আত্মজয়ের শক্তিকে সমাজের সকল মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সহিত যুক্ত করেন। ‘মানুষ’ কবিতায় তাঁহার ঘোষণা—
এইখানে দুই কবির মধ্যে যেন এক অনন্য ভাবসংলাপ রচিত হয়। রবীন্দ্রনাথ বলিতেছেন, নিজের ভিতরের ভয়কে জয় করো; নজরুল বলিতেছেন, সেই ভয়জয়ী মানুষ যেন অন্য মানুষের মর্যাদা অস্বীকার না করে। রবীন্দ্রনাথ আত্মশক্তির মুক্তির পথ দেখান; নজরুল সেই মুক্তিকে সামাজিক সাম্য ও মানবিক ন্যায়বিচারের বৃহত্তর পরিসরে বিস্তৃত করেন। ইহা দুই কবির মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক বিতর্ক নহে; বরং তাঁহাদের রচনার সমকালীন পাঠে নির্মিত এক তাৎপর্যপূর্ণ সাহিত্যিক সংলাপ। আসলে রবীন্দ্রনাথের এই আহ্বানের সহিত নজরুলের বিদ্রোহী মানবতাবাদের এক গভীর আত্মিক সংযোগ অনুভব করা যায়। একজন মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগাইতে চাহিয়াছেন, অন্যজন সেই শক্তিকে অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রূপ দিতে চাহিয়াছেন। একজনের সংগীতে ভয়মুক্তির আহ্বান, অন্যজনের কবিতায় শৃঙ্খলমুক্তির বজ্রনিনাদ। কিন্তু উভয়ের নৈতিক অভিমুখে রহিয়াছে মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা ও মানবিক বিকাশের আকাঙ্ক্ষা।
স্মরণ রাখা প্রয়োজন, রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হইবার অর্থ তাঁহার সকল বক্তব্যকে প্রশ্নাতীত ঘোষণা করা নহে; একইভাবে নজরুলকে ভালোবাসিবার অর্থও তাঁহার সকল রচনাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে স্থাপন করা নহে। সাহিত্যিক মহত্ত্বের প্রকৃত স্বীকৃতি অন্ধ আনুগত্যে নহে, গভীর পাঠে; প্রতিকৃতি পূজায় নহে, চিন্তার অনুসন্ধানে; আবেগের উচ্ছ্বাসে নহে, যুক্তিনিষ্ঠ মূল্যায়নে। যে সমাজ তাহার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের লইয়া যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক করিতে পারে, সেই সমাজের বৌদ্ধিক ভিত্তিই অধিক সুদৃঢ় হয়।
তাই আজ প্রশ্ন একটিই—আমরা কি এমন বাংলাদেশ গড়িতে চাই, যেখানে একজন মানুষ রবীন্দ্রনাথের গান গাহিবেন বলিয়া তাঁহাকে ধর্মীয় পরিচয়ের বিচারে সন্দেহ করা হইবে? যেখানে নজরুলের শ্যামাসংগীত গাহিলে তাঁহার ইসলামী সাহিত্যিক অবদানকে অস্বীকার করিবার প্রয়াস চলিবে? যেখানে কোনো শিল্পীর ধর্মীয় পরিচয়ই তাঁহার শিল্পকর্মের মূল্য নির্ধারণ করিবে? নাকি আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়িতে চাই, যেখানে মসজিদের আজান, মন্দিরের শঙ্খধ্বনি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, বাউলের একতারা এবং লোকসংগীতের বহুমাত্রিক সুর নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখিয়াই বাঙালির সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জীবনে স্থান পাইবে?
আমাদের শেষ আহ্বান তাই প্রতিহিংসার নহে, আত্মসমালোচনার; নিষেধাজ্ঞার নহে, জ্ঞানের; বিভাজনের নহে, মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থানের। যাঁহারা রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যাখ্যান করিতে চান, তাঁহারা আগে তাঁহাকে পড়ুন। যাঁহারা নজরুলকে একমাত্রিক ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করিতে চান, তাঁহারা তাঁহার ইসলামী সংগীতের পাশাপাশি শ্যামাসংগীত, সাম্যবাদী কবিতা ও মানবতাবাদী সাহিত্যও পাঠ করুন। আর যাঁহারা একজনকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য অন্যজনকে খাটো করিতে চান, তাঁহারা স্মরণ রাখুন—বাংলা সাহিত্য কোনো প্রতিযোগিতার মঞ্চ নহে, যেখানে একজনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যজনের মর্যাদাহানি অপরিহার্য।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ফিরিয়া আসুক প্রশ্ন করিবার স্বাধীনতা, পাঠাভ্যাস, যুক্তিবোধ, নৈতিক সাহস ও শিল্পসাহিত্যের বহুমাত্রিক পাঠ। পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল কেবল পরীক্ষার প্রশ্নের উপাদান হইয়া না থাকুন; তাঁহারা হউন স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিকতার জীবন্ত অনুপ্রেরণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হউক তথ্য যাচাই করিবার অভ্যাস, যুক্তিপূর্ণ বিতর্কের সংস্কৃতি এবং ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা।
শেষ করিবার পূর্বে রবীন্দ্রনাথের সেই সংগীতের আরেকটি আহ্বান স্মরণ করি—
“দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো,”
এই বাণীর সমকালীন নৈতিক পাঠ হউক—দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াও, অন্যায়কে প্রতিরোধ করো; কিন্তু মানুষকে ঘৃণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করিও না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যেন নিজেই আরেক অন্যায়ের জন্ম না দেয়। ধর্মীয় বিশ্বাস যেন প্রতিবেশীর নিরাপত্তার শত্রু না হয়। সাহিত্যিক মতভেদ যেন শিল্পীর অবমাননার অজুহাত না হয়।
রবীন্দ্রনাথের এই আহ্বানের পাশে নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার মানবিক উচ্চারণও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—
এইখানে যেন রবীন্দ্রনাথের দুর্বলকে রক্ষা করিবার নৈতিক আহ্বান এবং নজরুলের ধর্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের জীবন রক্ষার আকুতি একই মানবিক দায়িত্বের দুইটি পরিপূরক উচ্চারণে পরিণত হয়। একজন দুর্বলের পাশে দাঁড়াইতে বলেন; অন্যজন প্রশ্ন করেন, বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করিবার পূর্বে তাহার ধর্মীয় পরিচয় জানিবার প্রয়োজন কী? একজন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের কথা বলেন; অন্যজন সেই সাহসকে সকল মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রয়োগ করিতে আহ্বান জানান।
এই দুই কবির সম্মিলিত মানবিক শিক্ষা আজ আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। কারণ যে সমাজ বিপন্ন মানুষের ধর্মীয় পরিচয় অনুসন্ধানে অধিক ব্যস্ত থাকে, কিন্তু তাহার বিপদ মোচনে যথেষ্ট উদ্যোগী হয় না, সেই সমাজের ধর্মীয় আনুগত্য যত প্রবলই হউক, মানবিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নটি সেখানে অনিবার্যভাবেই উত্থাপিত হয়।
রবীন্দ্রনাথের বীণার ছিন্ন তারের বেদনা আমাদের স্মরণ করাইয়া দিক, একটি সমাজের সাংস্কৃতিক সুরও সহজে বিনষ্ট হইতে পারে। কিন্তু সেই সুর ফিরাইয়া আনিবার পথ প্রতিকৃতিতে কালি লেপন নহে, অপরের কণ্ঠ রুদ্ধ করা নহে, ইতিহাসকে বিকৃত করা নহে। সেই পথ শিক্ষা, সংলাপ, আত্মসমালোচনা, সহমর্মিতা এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে গভীরভাবে জানিবার মধ্য দিয়াই নির্মিত হয়।
আর নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা আমাদের স্মরণ করাইয়া দিক, ছিন্ন সুরের জন্য কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেই চলিবে না; যাহারা অজ্ঞতা, বিদ্বেষ ও সংকীর্ণতার মাধ্যমে সমাজের মানবিক বন্ধন ছিন্ন করিতে চাহে, তাহাদের বিরুদ্ধে যুক্তি, শিক্ষা, সত্য ও নৈতিক সাহসের শক্তি লইয়া দাঁড়াইতেও হইবে। তবে সেই প্রতিবাদ হইবে মানবিক, সেই প্রতিরোধ হইবে যুক্তিনিষ্ঠ, আর সেই সংগ্রামের লক্ষ্য হইবে মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।
রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করিয়া নজরুলকে বড় করা যায় না; নজরুলকে খণ্ডিত করিয়া রবীন্দ্রনাথকেও সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। একজনের কণ্ঠে মানবাত্মার মুক্তির সংগীত, অন্যজনের কণ্ঠে শোষিত মানুষের বিদ্রোহ—এই দুই সুর মিলিয়াই বাঙালির মনন ও মানবিক চেতনার এক অনন্য ঐশ্বর্য নির্মিত হইয়াছে।
সুতরাং আর যেন আমাদের বিবেকের তার ছিঁড়িয়া না যায়। অজ্ঞতার অন্ধকারে যেন যুক্তির প্রদীপ নিভিয়া না আসে। ধর্মের নামে যেন মানুষের প্রতি ভালোবাসা নির্বাসিত না হয়। আর সাহিত্যিক মতভেদের নামে যেন আমরা নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের মুখেই কালি না মাখাই।
কবির প্রতিকৃতিতে কালি লাগাইবার পূর্বে নিজের অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করিবার চেষ্টা করি। কারণ কালি মুছিলে প্রতিকৃতি পরিচ্ছন্ন হয়, কিন্তু অজ্ঞতা দূর করিলে আলোকিত হয় মানুষ, সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎ।
রবীন্দ্রনাথের অমোঘ আহ্বানেই তবে শেষ হউক আমাদের এই আত্মজিজ্ঞাসা—
আর সেই ভয়মুক্ত মানুষকে নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা স্মরণ করাইয়া দিক—মুক্তির প্রকৃত সার্থকতা একা নিজের উন্নতশিরে নহে, সকল মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়। কারণ রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখাইয়াছেন ভয়কে জয় করিতে, নজরুল শিখাইয়াছেন অন্যায়কে প্রতিরোধ করিতে। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ আমাদের অন্তরকে প্রসারিত করে, নজরুলের বিদ্রোহ সেই প্রসারিত অন্তরকে সামাজিক দায়িত্বে জাগ্রত করে। একজনের সংগীতে আত্মমুক্তির সাধনা, অন্যজনের কবিতায় সাম্যের সংগ্রাম—এই দুইয়ের মিলনেই নির্মিত হইতে পারে আমাদের কাঙ্ক্ষিত মানবিক সমাজ। কেননা আমাদের এই সমাজ সম্প্রীতির, যেমন নজরুল বলেন,
তাই রবীন্দ্রনাথের বীণায় ফিরিয়া আসুক হারানো সুর, নজরুলের অগ্নিবীণায় জাগিয়া উঠুক বিবেকের বজ্রনিনাদ। দুই কবির দুই কণ্ঠে ধ্বনিত হউক একটি অভিন্ন মানবিক আহ্বান—ভয়মুক্ত হউক মানুষ, বিদ্বেষমুক্ত হউক সমাজ, আর ধর্ম-বর্ণের সকল বিভেদের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত হউক মানুষের অক্ষয় মর্যাদা। কেননা নজরুলের সেই বাণী,
“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান...”
আর ততদিন ছরবে মানব অভিযান,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না,
আগামীকাল পড়ুন বিশেষ ফিচার
রবীন্দ্র–নজরুল: একই পুষ্পস্তবকের দুই ফুল, একের অবমাননায় আহত অন্যেরও মর্যাদা│একই ভাষার বাগানে তাঁদের প্রস্ফুটন, অথচ রং ও সৌরভে স্বতন্ত্র। রবীন্দ্রনাথের আত্মজিজ্ঞাসা আর নজরুলের বিদ্রোহ, একজনের ভয়শূন্য চিত্ত আর অন্যজনের উন্নত শির—বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে মানুষের মর্যাদা রক্ষার দুই অনন্য ভাষা। তাঁদের একজনকে অন্যজনের বিরুদ্ধে দাঁড় করালে আঘাত লাগে আমাদের যৌথ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারেই।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com
#নজরুল #কাজীনজরুলইসলাম #রবীন্দ্রনাথ #শ্যামাসংগীত #দুর্গাবন্দনা #নজরুলসংগীত #আমারকৈফিয়ৎ #শারদীয়দুর্গোৎসব #মহালয়া #বাংলাসাহিত্য #বাঙালিসংস্কৃতি #সাংস্কৃতিকসম্প্রীতি #মানবতারকবি #সাহিত্যেরস্বাধীনতা #অধিকারপত্র #বিশেষফিচার #KaziNazrulIslam #RabindranathTagore #NazrulSangeet #ShyamaSangeet #DurgaPuja #Mahalaya #BengaliLiterature #CulturalHarmony #AdhikarPatro
