সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি | অধিকার পত্র ডটকম
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এক সাক্ষীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত নয়টার দিকে উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে দুলাল মিয়ার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় তাঁর পরিবারের পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল ব্যক্তি তাঁদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের মারধর করেন। এ সময় ঘরের আসবাবপত্র, টেলিভিশন ও রেফ্রিজারেটর ভাঙচুর করা হয়। পাশাপাশি ছয়টি গরু, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন দুলাল মিয়া।
দুলাল মিয়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা একটি মামলার সাক্ষী। তাঁর বাবা মামুদ মিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন। তাঁর বোন জমিলা খাতুনও বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
দুলাল মিয়ার অভিযোগ, যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষী হওয়ার কারণে মামলার আসামি ও তাঁদের স্বজনেরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকেই বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এ ছাড়া গত ২৩ অক্টোবর তাঁর বাড়ির সামনের দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পর ২৯ অক্টোবর পুলিশ তদন্তে গ্রামে যায়। পুলিশ আসার ঘটনায় স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ক্ষুব্ধ হন বলে অভিযোগ পরিবারের।
দুলাল মিয়ার মেয়ে উজালা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের জালাল মিয়া ও আবদুল হেকিমের পরিবারের লোকজন এ হামলার সঙ্গে জড়িত। হামলার পরও তাঁরা হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। নিরাপত্তার কারণে পরিবারটি বর্তমানে শাল্লা উপজেলা সদরে অবস্থান করছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত জালাল মিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা হামলার সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর দাবি, দুলাল মিয়ার পরিবারের সদস্যরা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং এ নিয়ে এলাকায় বিরোধ রয়েছে। মাদকবিরোধী উদ্যোগের কারণে এলাকার লোকজন তাঁদের ওপর হামলা করে থাকতে পারে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে শাল্লা উপজেলার উজাননগাঁও, শ্যামারচর ও পেরুয়া গ্রামে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা রজনী দাস। ওই মামলায় স্থানীয় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দুলাল মিয়া মামলার একজন সাক্ষী।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, দুলাল মিয়ার পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক ও চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত চার বছরে অন্তত ২৫টি মামলা হয়েছে। পরিবারের কয়েকজন সদস্য মাদক মামলায় কারাগারেও গেছেন। তবে দুলাল মিয়ার দাবি, তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো মিথ্যা এবং এর পেছনে যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি জড়িত।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল প্রথম আলোকে বলেন, পরিবারটি থানায় এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলেও সেটি পুলিশের দেখার বিষয়। এ কারণে কারও বাড়িতে হামলা করার অধিকার কারও নেই। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রোববার (১ নভেম্বর) পরিবারটির পক্ষ থেকে থানায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছিল। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অধিকার পত্র ডটকমের পর্যবেক্ষণ: কোনো পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা বা অপরাধের অভিযোগ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।
