—অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক
একটি রাষ্ট্র, একটি আইন, এক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। ছয় হইতে দশ বৎসরের প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ে আনিবার অঙ্গীকার করিয়াছিল বাংলাদেশ—কিন্তু তিন দশক পরও লক্ষ লক্ষ শিশু শিক্ষার বাইরে। প্রশাসনিক কাঠামো নিষ্ক্রিয়, শাস্তির বিধান অপ্রয়োগিত, আর দায়িত্বের বোঝা হারাইয়া গেছে শূন্যতায়। এই অনুসন্ধানী ফিচার উন্মোচন করিতেছে—কেন ব্যর্থ হইল বাধ্যতামূলক শিক্ষা, এবং কে নেবে দায়?
৩৫ বছরে একটি মামলাও নয়—তাহলে বাধ্যতামূলক শিক্ষা কেবল একটি অভিনয়?
বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের “Primary Education (Compulsory) Act” প্রণয়নের মাধ্যমে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা ছিল কেবল একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদের আলোকে একটি মৌলিক মানবাধিকারের বাস্তবায়নের প্রয়াস। ১৯৯২ সালে সীমিত পরিসরে যাত্রা শুরু করে ১৯৯৩ সালে তা সারাদেশে বিস্তৃত হয়, এবং লক্ষ্য ছিল—প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ের ছায়ায় আনা, নিরক্ষরতার অন্ধকার দূর করা এবং একটি সচেতন, দক্ষ নাগরিক সমাজ গড়ে তোলা। বৈশ্বিক “Education for All” অঙ্গীকারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই আইন এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল, যেখানে জন্মগত বৈষম্য শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই স্বপ্ন এখনো সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের আলো পায়নি; দারিদ্র্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা তার পথরোধ করে রেখেছে ।
সময়ের স্রোতে দাঁড়িয়ে আজ প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে ভর্তির হার প্রায় সর্বজনীনতার কাছাকাছি পৌঁছেছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়ে টিকে থাকার লড়াই ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। গবেষণায় দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণি সম্পন্ন করার আগেই ঝরে পড়ে, যা শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্গত দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে । এই প্রবণতা কেবল সাম্প্রতিক নয়; দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া একটি গভীর ও কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান । ফলে শিক্ষার অগ্রযাত্রা যেন এক বিভ্রম—বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে অন্তর্গত সংকটের বিস্তার।
এই সংকটের মূলে রয়েছে বহুমাত্রিক ব্যর্থতা, যা কেবল নীতিগত নয়, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকও বটে। আইনটি কার্যকর করার জন্য যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তা অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে; মনিটরিং ও জবাবদিহির অভাব নীতিকে কাগজবন্দি করে রেখেছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য ও পারিবারিক বাস্তবতা বহু শিশুকে বিদ্যালয়ের পরিবর্তে শ্রমবাজারের দিকে ঠেলে দেয়—যেখানে আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সামাজিক বাস্তবতা তাকে প্রায় স্বীকৃতি দেয় । গবেষণাগুলো দেখায়, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং শিক্ষার মানগত দুর্বলতাও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়বিমুখ করে তোলে।
এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে নীতির ভাঙনরেখা—আইন যে বাস্তবতাকে রূপ দিতে চেয়েছিল, সেই বাস্তবতাই আজ আইনের সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচন করছে। কারণগুলো নতুন নয়; বরং আইন প্রণয়নের সময় থেকেই সেগুলো বিদ্যমান ছিল। তবুও কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা একটি গভীর পরিকল্পনাগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। ইউনেস্কো-নির্ভর গবেষণাগুলোতেও বারবার উঠে এসেছে—শুধু ভর্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা এবং মানসম্মত শিক্ষা প্রদানই আসল চ্যালেঞ্জ।
ফলে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে—একদিকে নীতিগত সাফল্যের ঘোষণা, অন্যদিকে বাস্তবিক অপূর্ণতা। এই অবস্থায় আইনটি আর কেবল একটি নীতি নয়; এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় ইচ্ছাশক্তির পরিমাপক। যদি এই ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় না হয়, তবে আইন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর প্রতিটি ঝরে পড়া শিশু আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার নীরব ইতিহাস হয়ে থাকবে।
এক বৈশ্বিক অঙ্গীকারের প্রতিধ্বনি: ১৯৯০-এর আইন ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি
বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন মহান সংসদে পাশ হইবার মাধ্যমে কেবল একটি জাতীয় আইন প্রণীত হয় নাই; ইহা ছিল সেই একই বছরে ঘোষিত “সবার জন্য শিক্ষা” (Education for All) বৈশ্বিক অঙ্গীকারের সহিত এক সুস্পষ্ট একাত্মতা প্রকাশ। তৎকালীন সামরিক সরকার এই আইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক ইতিবাচক বার্তা প্রেরণ করিতে চাহিয়াছিল—বাংলাদেশ শিক্ষাকে মানবাধিকারের পর্যায়ে উন্নীত করিয়াছে, এবং প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করিবার প্রতিশ্রুতি প্রদান করিয়াছে। এই আইন ছিল একদিকে অভ্যন্তরীণ নীতিগত ঘোষণা, অন্যদিকে বহির্বিশ্বের প্রতি এক কূটনৈতিক ইঙ্গিত—যে বাংলাদেশ উন্নয়ন, মানবসম্পদ এবং সামাজিক অগ্রগতির পথে অগ্রসর হইতে আগ্রহী। ফলত, সেই সময় আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল হইয়াছিল বলিয়া প্রতীয়মান হয়।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় প্রশ্ন জাগে—সেই অঙ্গীকার আজ কোথায় দাঁড়াইয়া আছে? যে আইনের স্পিরিট ও ইন্টেনশন ছিল প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করা, আজ বাস্তবে দেখা যায় বিপরীত প্রবণতা—প্রাথমিক স্তরের উপযোগী বয়সের বহু শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়ে গিয়াছে, বরং ঝরে পড়ার হার পুনরায় বৃদ্ধি পাইতেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সেই উচ্চকণ্ঠ প্রতিশ্রুতি আজ বাস্তবতার কাছে ম্লান; আইনটির মূল উদ্দেশ্য—সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা—বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি স্থবির, কোথাও কোথাও পশ্চাদমুখী। অতএব, যেই আইন একদা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও প্রশংসা অর্জনের হাতিয়ার ছিল, আজ তাহাই এক প্রকার নীতিগত ব্যর্থতার প্রতীক হইয়া উঠিয়াছে—যেখানে উচ্চাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান দিন দিন প্রসারিত হইতেছে।
আইন আছে, প্রাণ নাই: জীবনের বাস্তবতা কাগজের প্রতিশ্রুতি ও এক অপূর্ণ অঙ্গীকারের ইতিহাস
এ যেন এক পরিহাস, এক রাষ্ট্রীয় আত্মপ্রবঞ্চনার দীর্ঘ কাব্য। ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন—যাহা একদা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের মহাপরিকল্পনা বলিয়া ঘোষিত হইয়াছিল—আজ তাহা পরিণত হইয়াছে এক নিস্তব্ধ দর্শকে। আইন আছে, বিধান আছে, দণ্ড আছে; কিন্তু প্রয়োগ নাই, জবাবদিহি নাই, দায়বোধ নাই। পঁয়ত্রিশ বৎসর অতিক্রান্ত, অথচ একটি মামলার নজিরও নাই—এ কি তবে আইন, না কি কেবল মানসিক প্রশান্তির জন্য নির্মিত এক প্রতীকী আশ্বাস? রাষ্ট্র যেন নিজেকেই বলিয়াছে—“আমরা আইন করিয়াছি”, এবং তাতেই কর্তব্য শেষ।
গ্রামের প্রান্তে দাঁড়াইয়া থাকা একটি ভাঙা টিনের বিদ্যালয়, সকালবেলার কুয়াশা ভেদ করিয়া কয়েকজন শিশু বই হাতে হাঁটিতেছে—এই দৃশ্যই একদিন বাংলাদেশের বাধ্যতামূলক শিক্ষার স্বপ্ন ছিল। ১৯৯০ সালের আইন ঘোষণা করিয়াছিল—ছয় হইতে দশ বৎসরের প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ে আনিতে হইবে; রাষ্ট্র বাধ্য করিবে, পরিবার নিশ্চিত করিবে, প্রশাসন তদারক করিবে। কিন্তু পঁয়ত্রিশ বৎসর পর সেই দৃশ্যের পাশেই আরেকটি বাস্তবতা দাঁড়াইয়া আছে—একই গ্রামের বহু শিশু এখনো ইটভাটায়, চা-স্টলে, কিংবা ঘরের কাজে ব্যস্ত।
আইনের ভাষায় ‘শিশু’ একটি সুস্পষ্ট সত্তা—৬ হইতে ১০ বৎসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যাহার ভবিষ্যৎ বিদ্যালয়ের দোরগোড়ায় নির্ধারিত। কিন্তু বাস্তবে এই সংজ্ঞা যেন জীবন হইতে বিচ্ছিন্ন এক কাগুজে ধারণা। কারণ, পরিসংখ্যান বলিতেছে—প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার আবার বৃদ্ধি পাইয়া ১৬ শতাংশের অধিক হইয়াছে; বহু শিশু বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিলেও শেষ পর্যন্ত টিকিয়া থাকিতে পারিতেছে না। অতএব, আইন শিশুকে সংজ্ঞায়িত করিয়াছে, কিন্তু তাহার বাস্তবতাকে ধারণ করিতে পারে নাই।
নীতির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য: অদক্ষতা না ইচ্ছাকৃত শৈথিল্য?
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠিতেই পারে—এই ব্যর্থতা কি কেবল অদক্ষতার ফল, না কি ইচ্ছাকৃত শৈথিল্যের প্রতিফলন? কারণ, তিনটি বিষয় একযোগে উপস্থিত—আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নাই; প্রশাসনিক কাঠামো আছে কিন্তু সক্রিয়তা নাই; দণ্ডবিধান আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নাই। এই ত্রিমাত্রিক শূন্যতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নহে; ইহা একটি ধারাবাহিক নীতিগত উপেক্ষার ফল।
বাস্তব উদাহরণ বিবেচনা করা যাক—আইন অনুযায়ী যদি কোনো অভিভাবক শিশুকে বিদ্যালয়ে না পাঠায়, তাহা অপরাধ। কিন্তু দেশের কোথাও কি এই অপরাধে কোনো মামলা হইয়াছে? কোনো অভিভাবক কি শাস্তি পাইয়াছে? উত্তর—না। আবার, কমিটি যদি দায়িত্ব পালন না করে, তাহারাও দণ্ডনীয়—কিন্তু এই বিধানও কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। এই পরিস্থিতি নির্দেশ করে—আইনটি কার্যকর করিবার জন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তাহা কখনো দৃঢ়ভাবে উপস্থিত ছিল না।
এই প্রেক্ষাপটে আইনটি এক প্রকার “symbolic legislation”—একটি প্রতীকী আইন, যাহা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অঙ্গীকার প্রদর্শনের জন্য উপযোগী, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় অকার্যকর। রাষ্ট্র বলিতে পারে—“আমরা বাধ্যতামূলক শিক্ষা চালু করিয়াছি”; কিন্তু বাস্তবে সেই বাধ্যবাধকতা অনুপস্থিত।
আইনটি এক মহৎ আকাঙ্ক্ষা লইয়া প্রণীত হইয়াছিল—প্রত্যেক শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা। তাহাতে সংজ্ঞায়িত হইয়াছিল শিশু, নির্ধারিত হইয়াছিল দায়িত্ব, গঠিত হইয়াছিল বহুস্তরীয় কমিটি। ইউনিয়ন হইতে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত এক জটিল প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার কথা বলা হইয়াছিল, যাহারা প্রত্যেক শিশুর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করিবে। কিন্তু বাস্তবে এই কাঠামো যেন কেবল কাগজে অস্তিত্বশীল। কমিটি আছে, কিন্তু সক্রিয়তা নাই; দায়িত্ব আছে, কিন্তু কার্যকারিতা নাই। আইনের ভাষা কঠোর, কিন্তু বাস্তবতা শিথিল।
আইনের কাঠামো: জটিল শাসনযন্ত্রের নিস্তব্ধতা
এই আইনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাহার বিস্তৃত প্রশাসনিক কাঠামো। জাতীয় হইতে শুরু করিয়া বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত গঠিত হইবার কথা ছিল বিভিন্ন কমিটি। তাহাদের দায়িত্ব ছিল—প্রত্যেক শিশুর তালিকা প্রস্তুত করা, বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা, উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা, এবং অভিভাবকদের জবাবদিহির আওতায় আনা। আইনের ৫ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে—প্রত্যেক শিশুর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা কমিটির দায়িত্ব।
কিন্তু বাস্তবে এই কাঠামো যেন এক অদৃশ্য যন্ত্র—যাহার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু কার্যকারিতা নাই। অনেক এলাকায় এই কমিটির সদস্যদের নামও সাধারণ মানুষ জানে না; সভা হয় না, তালিকা হালনাগাদ হয় না, অনুপস্থিতির অনুসন্ধান হয় না। ফলে আইন যে একটি সক্রিয় তদারকি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করিয়া নির্মিত হইয়াছিল, তাহা বাস্তবে নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে বিলীন হইয়াছে।
একটি বাস্তব চিত্র কল্পনা করা যাক—একটি ইউনিয়নে ২০০ শিশুর মধ্যে ৩০ জন বিদ্যালয়ে যায় না। আইন অনুযায়ী কমিটি তাহাদের তালিকা প্রস্তুত করিয়া কারণ অনুসন্ধান করিবে, অভিভাবকদের নোটিশ দিবে, প্রয়োজনে ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া কোথাও দৃশ্যমান নহে। ফলে শিশুটি হারাইয়া যায় পরিসংখ্যানের বাইরে, রাষ্ট্রের নজরের বাইরে।
দায়িত্ব ও দণ্ড: কাগজে কঠোর, বাস্তবে কোমল এক প্রহসন
সময়ের পরিক্রমায় আইনের দণ্ডবিধান হয়ে পড়েছে “ভীতি নয়, ভ্রান্তি”। আইন বলিয়াছিল—অভিভাবক যদি শিশুকে বিদ্যালয়ে না পাঠায়, তাহা হইবে অপরাধ। কমিটি যদি দায়িত্ব পালন না করে, তাহারাও দণ্ডনীয়। কিন্তু পঁয়ত্রিশ বৎসরে একটি শাস্তির নজিরও না থাকিবার অর্থ কি?
ইহা স্পষ্ট—আইনটি ভীতি সৃষ্টির জন্য নহে, বরং প্রদর্শনের জন্য। দণ্ডবিধান এখানে বাস্তব প্রয়োগের উপকরণ নহে; ইহা কেবল আইনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করিবার অলঙ্কার।
আইনটি কেবল নীতিগত ঘোষণা নহে; ইহাতে কঠোর শাস্তির বিধানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভিভাবক যদি শিশুকে বিদ্যালয়ে না পাঠায়, তাহা অপরাধ; কমিটি যদি দায়িত্ব পালন না করে, তাহারাও দণ্ডনীয়; অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড—উভয়ই প্রযোজ্য। এই বিধানগুলি দেখিলে মনে হয়—আইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কার্যকর।
কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পঁয়ত্রিশ বৎসরে একটি মামলার নজির নাই, একটি শাস্তির ইতিহাস নাই। এই তথ্য নিজেই একটি শক্তিশালী ভাষ্য—আইনটি কার্যত প্রয়োগহীন। ইহা এমন এক অবস্থা, যেখানে শাস্তি আছে কিন্তু বিচার নাই; অপরাধ আছে কিন্তু অপরাধী নাই; দায়িত্ব আছে কিন্তু জবাবদিহি নাই।
এই বৈপরীত্যই বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক প্রকার প্রহসনে পরিণত করিয়াছে। আইন যেন একটি মঞ্চসজ্জা—যেখানে সবকিছু প্রস্তুত, কিন্তু নাটক শুরু হয় না। শিশু তখন আর নাগরিক নহে; সে একটি উপেক্ষিত সত্তা, যাহার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর করিয়া থেকেও বাস্তবে অনিশ্চিতই রয়ে যায়।
শিক্ষাব্যবস্থার সংকট: পরিকাঠামোর প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতার নিরাবরণ চিত্র
আইন বলিতেছে—প্রত্যেক শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করিতে হইবে। কিন্তু এই ঘোষণার অন্তরালে একটি মৌলিক প্রশ্ন নীরবে প্রতিধ্বনিত হয়—বিদ্যালয় কি আদৌ প্রস্তুত? কাগজে-কলমে ভর্তি নিশ্চিত করিবার নির্দেশ থাকিলেও বাস্তবের বিদ্যালয় কাঠামো সেই দায়িত্ব বহন করিবার জন্য কতটুকু সক্ষম, তাহাই আজকের প্রধান প্রশ্ন। কারণ, বাধ্যতামূলক শিক্ষার সাফল্য কেবল ভর্তি সংখ্যায় নহে; ইহা নির্ভর করে শিক্ষার পরিবেশ, গুণগত মান এবং ধারাবাহিকতার উপর।
বাংলাদেশের বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো শ্রেণিকক্ষের সংকট প্রকট। এক একটি কক্ষে গাদাগাদি করিয়া বসে ৬০ হইতে ৮০ জন শিক্ষার্থী—যেখানে আদর্শ মান হওয়া উচিত অনেক কম। এই অতিরিক্ত ভিড় শিক্ষাকে পরিণত করে একমুখী বক্তৃতায়, যেখানে শিক্ষক পাঠদান করেন, কিন্তু শিক্ষার্থী শেখে না। আবার অনেক গ্রামীণ অঞ্চলে বিদ্যালয় থাকিলেও তাহার ভৌত অবকাঠামো নাজুক—ভাঙা বেঞ্চ, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস, এমনকি কখনো কখনো টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির অভাব। এই পরিবেশে বিদ্যালয় শিশুর কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র নহে; বরং একপ্রকার অনিচ্ছার স্থান।
শিক্ষক সংকট এই সমস্যাকে আরও জটিল করিয়াছে। একদিকে শিক্ষকসংখ্যা অপর্যাপ্ত, অন্যদিকে বিদ্যমান শিক্ষকদের উপর প্রশাসনিক ও সহশিক্ষামূলক কাজের অতিরিক্ত চাপ। ফলে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী পাঠদান ব্যাহত হয়। বাস্তবে দেখা যায়, একজন শিক্ষক একাধিক শ্রেণি একত্রে পরিচালনা করিতে বাধ্য হন—যাহা শিক্ষার মানকে অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতির অভাবও শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করিতেছে।
শিক্ষার মানগত সংকট এই চিত্রকে আরও উদ্বেগজনক করিয়া তোলে। বহু শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণি সমাপ্ত করিলেও মৌলিক পাঠ ও গণনার দক্ষতা অর্জন করিতে পারে না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়াছে, প্রাথমিক স্তরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের শিক্ষার্থী শ্রেণি-উপযোগী পাঠ্যবই সাবলীলভাবে পড়িতে অক্ষম। এই বাস্তবতা নির্দেশ করে—বিদ্যালয়ে উপস্থিতি থাকিলেও প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হইতেছে না। ফলে শিক্ষার্থীর আগ্রহ হ্রাস পায়, এবং ঝরে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
এই অনুপ্রেরণাহীনতার পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতাও দায়ী। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা যখন বিদ্যালয়ে গিয়া শেখার আনন্দের পরিবর্তে একঘেয়েমি ও ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা লাভ করে, তখন তাহারা সহজেই শ্রমবাজারের দিকে ঝুঁকিয়া পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারও তাহাকে উৎসাহিত করে—কারণ তাৎক্ষণিক আয় দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া বিবেচিত হয়। এইভাবে শিক্ষা ও জীবিকার মধ্যে এক নির্মম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়, যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষা পরাজিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন কার্যত এক প্রকার প্রহসনে পরিণত হয়। আইন বলিতেছে—শিশুকে বিদ্যালয়ে আনো; কিন্তু বিদ্যালয় যদি তাহাকে ধারণ করিবার জন্য প্রস্তুত না থাকে, তবে সেই আনয়ন কেবল সংখ্যাগত অর্জন, বাস্তব উন্নয়ন নহে।
রাজনৈতিক অর্থনীতি: শিক্ষার অগ্রাধিকার কোথায় হারাইল?
রাষ্ট্র যখন উন্নয়নের ভাষ্য নির্মাণ করে, তখন অবকাঠামো উন্নয়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি—এই সূচকগুলিই প্রধান আলোচ্য বিষয় হইয়া ওঠে। দৃশ্যমান উন্নয়নের এই রাজনীতিতে প্রাথমিক শিক্ষা, যাহা দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ গঠনের মূল ভিত্তি, প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। কারণ, শিক্ষায় বিনিয়োগের ফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নহে; ইহা সময়সাপেক্ষ, ধীর এবং রাজনৈতিকভাবে কম আকর্ষণীয়।
এই বাস্তবতায় বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইন একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক অর্থনীতির শিকার। এখানে স্বল্পমেয়াদি সাফল্যের প্রতি প্রবল ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়—যেমন, ভর্তি হার বৃদ্ধি দেখাইয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য প্রদর্শন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, শিক্ষার মান উন্নত করা, এবং প্রকৃত মানবসম্পদ গঠন—এই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যসমূহ তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থাকে।
একই সঙ্গে জবাবদিহির অভাব এই সংকটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়াছে। আইন অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে কমিটি গঠনের কথা থাকিলেও তাহাদের কার্যকারিতা প্রায় অদৃশ্য। কোন শিশু বিদ্যালয়ে যায় না, কেন যায় না—এই প্রশ্নগুলির উত্তর অনুসন্ধানে প্রশাসনিক উদ্যোগ সীমিত। ফলে দায়িত্ব একটি বিমূর্ত ধারণায় পরিণত হয়, যাহার কোনো বাস্তব বহিঃপ্রকাশ নাই।
আইনের প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতার নির্মম বৈপরীত্য
আইনের ভাষা দৃঢ় ও স্পষ্ট—“প্রত্যেক শিশু বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকিবে।” কিন্তু বাস্তবতা এক ভিন্ন গল্প বলিতেছে। এখনও বহু শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে, এবং যাহারা বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে, তাহাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মাঝপথেই ঝরে পড়ে।
এই বৈপরীত্য কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নহে; ইহা একটি নৈতিক সংকট। কারণ, রাষ্ট্র যখন একটি অধিকার ঘোষণা করে কিন্তু তাহা বাস্তবায়ন করিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই অধিকার একটি শূন্য প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়। বাধ্যতামূলক শিক্ষা তখন আর অধিকার থাকে না; ইহা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হইয়া দাঁড়ায়।
বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন ১৯৯০ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করিয়াছিল—প্রত্যেক শিশুর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করিবার দায় রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকের সম্মিলিত দায়িত্ব; এমনকি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা দণ্ডনীয় অপরাধ বলিয়াও নির্ধারিত হইয়াছিল। কিন্তু বাস্তবতার পরিসংখ্যান এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র অঙ্কন করে। গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারে ঝরে পড়ার হার সর্বাধিক; সিলেট অঞ্চলে প্রাথমিক সমাপনী হার সর্বনিম্ন। প্রায় দেড় মিলিয়ন শিশু আজও বিদ্যালয়ের বাইরে—যাহারা দারিদ্র্য, শ্রমবাজারের চাপ, এবং সামাজিক বৈষম্যের বলি। প্রাথমিক স্তর সমাপ্ত করিলেও মাধ্যমিকে উত্তরণের পথে উপস্থিতি হঠাৎ করিয়াই হ্রাস পায়, এবং দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছিতে পারে অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী। প্রতিবন্ধী শিশুরা তো আরও প্রান্তিক—তাহারা অন্যান্য শিশুর তুলনায় সাতগুণ অধিক বিদ্যালয়ের বাইরে থাকিবার ঝুঁকিতে। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, শিক্ষার নিম্নমান, শিক্ষক আচরণ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—এই বহুমাত্রিক সংকটের সম্মিলিত অভিঘাতে আইনের উচ্চকণ্ঠ প্রতিশ্রুতি মাটিতে মিশিয়া যায়। সরকার ভাতা, খাদ্য কর্মসূচি, এবং বিকল্প শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে বটে, কিন্তু ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও বৈষম্যের প্রেক্ষিতে তাহা অপর্যাপ্ত বলিয়াই প্রতীয়মান। অতএব, প্রায় সর্বজনীন ভর্তির গর্ব সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক বাস্তবতা আজ শিক্ষার বৃহত্তম অন্তরায়; এবং এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে—আইনটি কেবল ঘোষণায় শক্তিশালী, কিন্তু প্রয়োগে দুর্বল, সদিচ্ছায় অপূর্ণ, এবং বাস্তবতার মুখোমুখি হইলে প্রায় অকার্যকর।
প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা: নীরবতার এক দীর্ঘ ইতিহাস ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক অদ্ভুত রূপান্তর ঘটিয়াছে—যেখানে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে দায়িত্ব এড়ানোর কৌশলই ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করিয়াছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন বাস্তবায়নের জন্য গঠিত “কেন্দ্রীয় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা সেল” এই বাস্তবতার এক প্রতীকী উদাহরণ। আইন প্রণয়নের পর রাষ্ট্র একটি কাঠামো নির্মাণ করিল, পরবর্তীকালে মন্ত্রণালয় পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে তাহাকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানান্তর করিল; কিন্তু কাঠামো থাকিলেও কার্যকারিতা কোথায়? এই সেলের কার্যক্রম জনসমক্ষে দৃশ্যমান নহে, তাহার অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুপস্থিত, এবং তাহার জবাবদিহির কোনো স্পষ্ট রূপ নাই। ফলত, একটি প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে নীরবতার আবরণে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে—যেখানে কাজের পরিবর্তে অস্তিত্বই প্রধান পরিচয়।
এই নীরবতা কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা নহে; ইহা এক প্রকার নীতিগত অবহেলা এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের বহিঃপ্রকাশ। একটি নতুন প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়িয়া উঠিয়াছে, যেখানে দায়িত্বকে সক্রিয়ভাবে পালন না করিয়া, বরং তাহাকে প্রক্রিয়াগত জটিলতা, ফাইলচক্র, এবং আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের আড়ালে লুকাইয়া রাখা হয়। এই প্রবণতা দুইভাবে প্রাধান্য পাইতেছে—প্রথমত, প্রতিষ্ঠানগত নিষ্ক্রিয়তা, যেখানে কমিটি ও সেল কাগজে সক্রিয় কিন্তু বাস্তবে অচল; দ্বিতীয়ত, দায় স্থানান্তরের সংস্কৃতি, যেখানে প্রত্যেক স্তর নিজের ব্যর্থতার দায় অন্য স্তরের উপর চাপাইয়া দেয়।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো এলাকায় শিশুরা বিদ্যালয়ে না গেলে স্থানীয় কমিটি দায় দেয় অভিভাবকদের উপর; অভিভাবক দায় দেয় দারিদ্র্য বা বিদ্যালয়ের মানের উপর; আর প্রশাসন দায় দেয় ‘সামাজিক বাস্তবতা’র উপর। এইভাবে দায়িত্ব এক প্রকার চক্রে ঘুরিতে থাকে, কিন্তু সমাধান কোথাও পৌঁছায় না। অথচ আইন স্পষ্টভাবে কমিটিগণকে শিশুর তালিকা প্রস্তুত ও উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়াছে —কিন্তু এই বিধান বাস্তবে কার্যকর হয় না।
সমাজের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আইন অভিভাবকদের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করিয়াছিল, কিন্তু সামাজিক মানসিকতা সেই দায়িত্বকে গ্রহণ করে নাই। অনেক পরিবার এখনো শিক্ষাকে বিলাসিতা বলিয়া বিবেচনা করে, বিশেষত যখন দৈনন্দিন জীবিকার প্রশ্ন জড়িত থাকে। শিশুশ্রম অনেক ক্ষেত্রে নীরবে গ্রহণযোগ্য, এবং নিম্নমানের বিদ্যালয় পরিবেশ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হ্রাস করে। ফলে আইন একা কার্যকর হইতে পারে না; ইহা সামাজিক সহযোগিতা ব্যতীত নিষ্প্রভ।
এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়—বাংলাদেশে এক নতুন প্রশাসনিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, যাহার মূল বৈশিষ্ট্য হইল দায়িত্ব লুকানো, জবাবদিহি এড়ানো, এবং নীরবতার আড়ালে ব্যর্থতাকে আড়াল করা। বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইন এই সংস্কৃতির একটি শিকার মাত্র। যতক্ষণ না এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিতেছে, ততক্ষণ আইন থাকিবে, কাঠামো থাকিবে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন অধরাই থাকিবে।
১৫–২০ লক্ষ শিশু বাইরে, তবে আইন কোথায় দাঁড়ায়?
যদি বাস্তবতা এই হয় যে প্রায় ১৫ হইতে ২০ লক্ষ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডির বাইরে রহিয়াছে—তাহা হইলে প্রশ্ন উঠিবে, এই আইন আসলে কি করিল? যে আইন প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ে আনিবার অঙ্গীকার করিয়াছিল, সেই আইন কি কেবল একটি নৈতিক ঘোষণা হইয়া রইল? কারণ, আইন থাকিয়া যদি এত বিপুল সংখ্যক শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে থাকে, তবে আইনটির অস্তিত্ব কার্যত প্রতীকী—ইহা বাস্তব পরিবর্তনের উপকরণ নহে, বরং এক প্রকার কাগুজে প্রতিশ্রুতি মাত্র।
আরও গভীরভাবে দেখিলে প্রতীয়মান হয়—আইনটি যেন বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারাইয়া ফেলিয়াছে। আইন বলিয়াছে “বাধ্যতামূলক”, কিন্তু বাস্তবতা বলিতেছে “ঐচ্ছিক”; আইন বলিয়াছে “দায়বদ্ধতা”, কিন্তু বাস্তবতা দেখাইতেছে “দায়হীনতা”। এত বিপুল সংখ্যক শিশুর বিদ্যালয়বহির্ভূত অবস্থান প্রমাণ করে—আইনের প্রয়োগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভঙ্গুর। কমিটিগুলি কার্যকর নয়, তদারকি নাই, শাস্তি নাই—অতএব বাধ্যতামূলক শিক্ষা কেবল ভাষার অলংকারে সীমাবদ্ধ।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আইনটি তার মূল উদ্দেশ্য—শিশুকে বিদ্যালয়ে আনা—পূরণে ব্যর্থ হইয়াছে। বরং ইহা এক ধরনের আত্মতুষ্টির উপকরণে পরিণত হইয়াছে, যাহার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিজেকে আশ্বস্ত করে—“আমরা আইন করিয়াছি, অতএব দায়িত্ব পালন করিয়াছি।” কিন্তু বাস্তবতা নির্মম—শিশুরা বিদ্যালয়ে নাই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, আর আইন নীরব।
অতএব, এই ১৫–২০ লক্ষ শিশুর অনুপস্থিতি কেবল একটি পরিসংখ্যান নহে; ইহা আইনটির কার্যকারিতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী সাক্ষ্য। ইহা আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয়—আইন প্রণয়ন সহজ, কিন্তু তাহার বাস্তবায়নই প্রকৃত পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন এখনো অকৃতকার্য।
এই বিপুল শিশুহীনতার দায় কার? রাষ্ট্র, সমাজ না আমরা সকলেই?
এই বিপুল সংখ্যক শিশুকে বিদ্যালয়ের আলোয় আনিতে না পারিবার দায় কাহার? প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু উত্তর জটিল ও বহুমাত্রিক। রাষ্ট্র কি তাহার আইন প্রয়োগে ব্যর্থ? নিশ্চয়ই। কারণ, যেই আইন প্রত্যেক শিশুর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করিয়াছিল, সেই আইন প্রয়োগে প্রশাসনিক দৃঢ়তা, নজরদারি ও জবাবদিহির অভাব স্পষ্ট। কমিটিগুলি নিষ্ক্রিয়, দণ্ডবিধান অকার্যকর—অতএব রাষ্ট্র দায়মুক্ত নহে। কিন্তু দায় কি কেবল রাষ্ট্রের? সমাজও কি দায়মুক্ত? দরিদ্রতা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ—এই সকল সামাজিক বাস্তবতা আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিফলন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারও শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয় না, কারণ তাহারা বাঁচিবার সংগ্রামে নিমগ্ন। আবার শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নমান, অনুৎসাহী পরিবেশ, এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের দূরে ঠেলিয়া দেয়। অতএব, এই ব্যর্থতা একক নহে; ইহা রাষ্ট্রের অবহেলা, সমাজের উদাসীনতা, এবং নীতিনির্ধারকদের অর্ধেক সদিচ্ছার সম্মিলিত ফল। সত্য এই—যতক্ষণ না আমরা দায় স্বীকার করিব, ততক্ষণ এই শিশুগণ কেবল পরিসংখ্যানেই রয়ে যাইবে, নাগরিকত্বের অধিকার হইতে বঞ্চিত এক নীরব প্রজন্মরূপে।
প্রতিবেশি রাষ্ট্রে আইন কার্যকর, আর আমরা কেন পিছাই?—এক তুলনামূলক পাঠ
প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করিলে স্পষ্ট হয়—বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন কেবল প্রণয়ন করিলেই ফল আসে না; কার্যকারিতা নির্ভর করে প্রয়োগের কঠোরতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির উপর। যেমন ভারত তাদের “Right to Education Act, 2009” বাস্তবায়নে বিদ্যালয়ভিত্তিক মনিটরিং, স্থানীয় সরকারকে সক্রিয় সম্পৃক্তকরণ এবং আদালত-নির্ভর জবাবদিহির মাধ্যমে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করিবার চেষ্টা করিয়াছে; ফলে ভর্তি ও উপস্থিতির মধ্যে ব্যবধান তুলনামূলকভাবে কম। শ্রীলঙ্কায় বহু আগেই প্রাথমিক শিক্ষা কার্যত সর্বজনীন হইয়াছে, কারণ সেখানে রাষ্ট্র শিক্ষাকে কল্যাণনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করিয়াছে এবং অবকাঠামো ও মান উভয়ের উন্নয়ন ঘটাইয়াছে। নেপাল ও ভুটানেও সম্প্রদায়ভিত্তিক তদারকি ও স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। এর বিপরীতে বাংলাদেশে আইন থাকিলেও তাহার প্রয়োগ কাঠামো নিষ্ক্রিয়; কমিটি আছে কিন্তু কার্যকর নয়, শাস্তির বিধান আছে কিন্তু প্রয়োগ হয় না, এবং আদালতীয় নজির প্রায় শূন্য। ফলে তুলনামূলক বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়—আমাদের আইনটির মূল দুর্বলতা আইনের ভাষায় নহে, বরং তাহার প্রয়োগে; অন্য রাষ্ট্র যেখানে আইনকে জীবন্ত করিয়াছে, আমরা সেখানে আইনকে কাগজে বন্দী রাখিয়াছি।
পরিকল্পনা আছে, প্রয়োগ নাই: শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহির সংকট
এই সামগ্রিক বাস্তবতার আলোকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়—বাংলাদেশের শিক্ষা পরিকল্পনা ও বিধি-বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক গভীর দুরাবস্থা বিরাজমান। নীতিপত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পরিকল্পনায় ব্যাপ্তি থাকিলেও বাস্তবায়নের স্তরে আমলাতান্ত্রিক শৈথিল্য ও উদাসীনতা প্রকট। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো, যাহাদের উপর দায়িত্ব অর্পিত ছিল, তাহারা অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় অথবা দায় এড়াইবার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে। বহু ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ হইতেও প্রয়োজনীয় কঠোরতা ও দায়িত্বশীলতা অনুপস্থিত; মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল, নিয়মিত মূল্যায়ন অনুপস্থিত, এবং ব্যর্থতার জন্য কোনো কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয় না। ফলত, শিক্ষা প্রশাসন এক প্রকার দায়মুক্তির পরিসরে পরিণত হইয়াছে, যেখানে ব্যর্থতা একটি স্বাভাবিক অবস্থায় পরিণত হয়। এই জবাবদিহিতার অভাবই বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে অকার্যকর করিয়া তুলিয়াছে—কারণ, যেখানে দায় নাই, সেখানে প্রয়োগও নাই; আর যেখানে প্রয়োগ নাই, সেখানে আইন কেবল শব্দমাত্র।
প্রতিশ্রুতির ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে শিক্ষা: হারানো ভবিষ্যতের দীর্ঘ ছায়া
পঁয়ত্রিশ বৎসর পূর্বে যে আইনটি এক আলোকবর্তিকার ন্যায় জাতির ভবিষ্যৎকে আলোকিত করিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল, আজ তাহাই দাঁড়াইয়া আছে এক ভগ্নস্তূপের উপর—নিস্তব্ধ, নিস্পৃহ, প্রায় বিস্মৃত। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রণীত হইয়াছিল দৃঢ় অঙ্গীকার লইয়া; কিন্তু বাস্তবায়নের পথে তাহা বারংবার হোঁচট খাইয়াছে। কাঠামো গঠিত হইয়াছিল—কমিটি, সেল, প্রশাসনিক স্তর—সবই ছিল; কিন্তু তাহাদের প্রাণসঞ্চার ঘটেনি। দণ্ড নির্ধারিত হইয়াছিল—কিন্তু প্রয়োগের অভাবে তাহা পরিণত হইয়াছে নিছক অলঙ্কারে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সত্যিই শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করিতে চাহিয়াছিলাম, না কি কেবল তাহার ঘোষণা দিয়াই আত্মতুষ্টিতে ভুগিয়াছি? রাষ্ট্র কি তার নৈতিক দায় পালন করিয়াছে, না কি দায় এড়াইবার এক কৌশলী পথ নির্মাণ করিয়াছে? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তবে এই ব্যর্থতা কেবল নীতির নহে; ইহা একটি প্রজন্মের প্রতি অবিচার।
কারণ, প্রতিটি ঝরে পড়া শিশু কোনো পরিসংখ্যানের সংখ্যা নহে—সে একটি অসমাপ্ত গল্প, একটি অপূর্ণ স্বপ্ন, একটি সম্ভাবনার অকালমৃত্যু। যে শিশুটি পঞ্চম শ্রেণির আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করে, সে কেবল শিক্ষা হারায় না; সে হারায় নিজের সক্ষমতার উপর আস্থা, সমাজ হারায় একটি দক্ষ নাগরিক, আর রাষ্ট্র হারায় তার ভবিষ্যৎ শক্তি।
অসংখ্য শিশু এখনো বিদ্যালয়ের বাইরে: বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি
আজও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে এমন অসংখ্য শিশু আছে, যাহারা বিদ্যালয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছাইতেই পারে না, অথবা পৌঁছিয়াও ফিরিয়া আসে। কেউ ইটভাটায় শ্রম দেয়, কেউ গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত, কেউবা শহরের ব্যস্ত সড়কে ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। দারিদ্র্য তাহাদের জন্য শিক্ষাকে বিলাসিতা বানাইয়া দেয়; সামাজিক বৈষম্য তাহাদের পথ রুদ্ধ করে; আর শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অনাগ্রহ তাহাদের ধীরে ধীরে দূরে সরাইয়া দেয় বিদ্যালয় হইতে।
আইনের ভাষায় বলা হইয়াছে—দুই কিলোমিটারের মধ্যে বিদ্যালয় না থাকিলে তাহা যুক্তিসঙ্গত কারণ হইতে পারে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা এই সরল যুক্তির সীমা অতিক্রম করিয়াছে। এখন বিদ্যালয় আছে—কিন্তু মান নাই; শিক্ষক আছে—কিন্তু দায়বোধ নাই; নীতি আছে—কিন্তু প্রয়োগ নাই। ফলে শিশুর জন্য বিদ্যালয় আর আশ্রয়স্থল নহে; ইহা কখনো কখনো একঘেয়েমির, অবহেলার এবং ব্যর্থতার প্রতীক হইয়া ওঠে।
উদাহরণস্বরূপ, অনেক বিদ্যালয়ে দেখা যায়—শিক্ষক উপস্থিত থাকিলেও পাঠদান কার্যকর নহে; শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে বসিয়া থাকিলেও শেখার প্রক্রিয়া ঘটে না। ফলে শিশুরা বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযোগ হারাইয়া ফেলে। আবার, দরিদ্র পরিবারের জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া মানে একটি কর্মক্ষম হাত হারানো—যাহা পরিবার সহজে মেনে লইতে পারে না। এই বাস্তবতায় আইন কেবল নির্দেশ দেয়, কিন্তু সমাধান দিতে পারে না।
আইন, নীতি, বাস্তবতা ও নৈতিক দায়: এক অনিবার্য প্রশ্ন
এই সমগ্র চিত্র আমাদের একটি গভীর নৈতিক প্রশ্নের সম্মুখীন করে—রাষ্ট্রের দায় কোথায় শেষ, এবং সমাজের দায় কোথায় শুরু? যদি আইন প্রণয়ন করাই দায়িত্বের শেষ ধাপ হয়, তবে সেই আইন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকিবে। কিন্তু যদি বাস্তবায়নই লক্ষ্য হয়, তবে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, এবং সচেতন সামাজিক অংশগ্রহণ।
আজ বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন আমাদের সামনে একটি আয়নার মতো দাঁড়াইয়া আছে—যেখানে আমরা আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের অবহেলা, এবং আমাদের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি স্পষ্টভাবে দেখিতে পাই। এই আয়না ভাঙিয়া ফেলিলে বাস্তবতা পাল্টায় না; বরং আমাদের সাহস করিয়া তাহার দিকে তাকাইতে হইবে।
কারণ, ইতিহাস কেবল আইন প্রণয়নের কথা মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে—সেই আইন কাহার জীবনে পরিবর্তন আনিয়াছিল। আর যদি সেই পরিবর্তন অনুপস্থিত থাকে, তবে আইন যতই মহৎ হউক, তাহা একদিন ভগ্ন প্রতিশ্রুতির স্তূপে পরিণত হইবেই।
সমাধানের পথ: পুনর্জাগরণের আহ্বান—আইনকে কাগজ হইতে জীবনে ফিরাইবার সংগ্রাম
দীর্ঘ অবহেলা, নিষ্ক্রিয়তা ও প্রতিশ্রুতির ভগ্নস্তূপের উপর দাঁড়াইয়া আজ একটি প্রশ্ন স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে—এই আইন কি পুনর্জীবিত হইতে পারে? উত্তর হইল, পারে; কিন্তু তাহার জন্য প্রয়োজন কেবল নীতিগত ঘোষণা নহে, বরং এক সামগ্রিক পুনর্জাগরণ—প্রশাসনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার এক সম্মিলিত জাগরণ।
প্রথমত, যে বহুপদক্ষেপীয় কমিটি কাঠামো একসময় এই আইনের প্রাণশক্তি বলিয়া বিবেচিত হইয়াছিল, তাহাকেই পুনরায় সক্রিয় করিতে হইবে। ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগণকে কেবল কাগজে অস্তিত্ব রাখিলেই চলিবে না; তাহাদের নিয়মিত সভা, শিশু তালিকা হালনাগাদ, এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করিতে হইবে। প্রতিটি অনুপস্থিত শিশুর পেছনে একটি অনুসন্ধান থাকা উচিত—কেন সে বিদ্যালয়ে নাই, এবং কীভাবে তাহাকে ফিরাইয়া আনা যায়।
দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা সেলকে পুনর্গঠন ও কার্যকর করিবার প্রয়োজন। এই সেলকে তথ্যনির্ভর তদারকি, নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ, এবং স্থানীয় প্রশাসনের উপর কার্যকর নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে একটি সক্রিয় নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পরিণত করিতে হইবে। প্রযুক্তির ব্যবহার—ডিজিটাল ট্র্যাকিং, উপস্থিতি মনিটরিং—এই প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করিতে পারে।
তৃতীয়ত, জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা অনিবার্য। আইন যদি দণ্ডবিধান নির্ধারণ করিয়া থাকে, তবে তাহার প্রয়োগ নিশ্চিত করিতে হইবে—অবশ্যই সংবেদনশীল ও বাস্তবসম্মত উপায়ে। অভিভাবক, শিক্ষক, কমিটি সদস্য—সকলেরই একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আনিতে হইবে। “কেউ দায়ী নয়” এই সংস্কৃতি ভাঙিয়া “প্রত্যেকে দায়ী” এই বোধ প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।
চতুর্থত, সামাজিক সচেতনতার পুনর্গঠন অপরিহার্য। শিক্ষা কেবল রাষ্ট্রের দায় নহে; ইহা একটি সামাজিক চুক্তি। গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় নেতৃত্ব—সকলের মাধ্যমে একটি বার্তা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে যে, শিশুর শিক্ষা বিলাসিতা নহে, মৌলিক অধিকার। শিশুশ্রমের প্রতি নীরব সহনশীলতা ভাঙিয়া শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদার কেন্দ্রে আনিতে হইবে।
পরিশেষে, শিক্ষার মান উন্নয়ন ব্যতীত কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা সফল হইতে পারে না। বিদ্যালয়কে এমন এক আকর্ষণীয়, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন পরিবেশে পরিণত করিতে হইবে, যেখানে শিশু আসিতে চাহিবে, থাকিতে চাহিবে, এবং শিখিতে চাহিবে। দক্ষ শিক্ষক, প্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রম, এবং সহায়ক অবকাঠামো—এই তিনটি স্তম্ভ শক্তিশালী করিতে হইবে।
অতএব, এই পুনর্জাগরণ কেবল একটি আইনের পুনরুত্থান নহে; ইহা একটি জাতির ভবিষ্যৎ পুনর্নির্মাণের আহ্বান। এখন প্রশ্ন—আমরা কি সেই আহ্বানে সাড়া দিব, না কি আরেকটি প্রজন্মকেও ভগ্ন প্রতিশ্রুতির উত্তরাধিকার বহন করিতে দিব?
শেষ কথা: প্রতিশ্রুতির ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে শিক্ষা
আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগে রাষ্ট্র এক উচ্চকণ্ঠ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—প্রত্যেক শিশুর হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে শিক্ষার আলো। সেই প্রতিশ্রুতির ভিতরে ছিল ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন, সমতা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা, এবং নাগরিক মর্যাদার এক নীরব অঙ্গীকার। কিন্তু সময়ের দীর্ঘ স্রোত পেরিয়ে আজ যখন আমরা ফিরে তাকাই, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনটি যেন এক ভগ্ন প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আইন প্রণীত হয়েছিল বটে, কিন্তু তার প্রাণ সঞ্চারিত হয়নি বাস্তবতায়; কাঠামো নির্মিত হয়েছিল, কিন্তু তা সক্রিয়তার উষ্ণতা পায়নি; বিধান নির্ধারিত হয়েছিল, কিন্তু প্রয়োগের দৃঢ়তা অনুপস্থিতই থেকে গেছে।
এই বৈপরীত্যের ভেতরেই উঁকি দেয় এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে তুলতে চেয়েছিলাম, নাকি কেবল তার ঘোষণা দিয়েই নিজেদের দায় সেরে ফেলেছি? যদি উত্তর দ্বিতীয়টির দিকে ঝুঁকে থাকে, তবে তা কেবল নীতিগত ব্যর্থতা নয়, বরং এক গভীর নৈতিক সংকটের ইঙ্গিত। কারণ, যে শিশুটি বিদ্যালয়ের পথে হারিয়ে যায়, সে কেবল পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা হয়ে থাকে না; সে হয়ে ওঠে একটি অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতীক, একটি ব্যর্থ প্রতিশ্রুতির জীবন্ত সাক্ষ্য।
রাষ্ট্রের নীতি ও বাস্তবতার এই ব্যবধান আজ স্পষ্টতই আমাদের সামনে প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে অগ্রাধিকার দিচ্ছি, নাকি তার একটি প্রতীকী প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ রয়েছি? সময় এখন আর বিলম্ব সহ্য করে না। প্রয়োজন আইনকে কাগজের সীমানা অতিক্রম করে জীবনের অংশ করে তোলা, প্রতিটি শিশুকে সংখ্যার গণ্ডি থেকে তুলে এনে তার প্রাপ্য মানবিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা। অন্যথায় ইতিহাস একদিন নির্দয়ভাবে লিখে রাখবে—একটি জাতি আইন প্রণয়ন করেছিল, কিন্তু সেই আইন মানার আন্তরিকতা তার ছিল না।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: