নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল এবং বাকি ৪ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। আজ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানানো হয়েছে।
মৃত্যুর মিছিল ও সংক্রমণের পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত মোট ২৪০ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে:
হাম নিশ্চিত হয়ে মৃত্যু: ৪২ জন
হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু: ১৯৮ জন
গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে ৬ জনই ঢাকা বিভাগের, এবং বাকি ১ জন সিলেট বিভাগের। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছে ১ হাজার ৩৮৭ জন শিশু। গত একদিনে নতুন করে ১ হাজার ২১৫ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার বড় একটি অংশই শিশু।
সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে শিশুরা
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা। আক্রান্তদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
৭৯% রোগীর বয়স ৫ বছরের নিচে।
৬৬% রোগীর বয়স ২ বছরের নিচে।
৩৩% রোগীর বয়স মাত্র ৯ মাসের নিচে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন মৃত শিশুদের প্রায় সবাই হয় কোনো টিকা পায়নি অথবা মাত্র এক ডোজ টিকা পেয়েছে। আক্রান্তদের ৯১ শতাংশই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী, যা শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি নির্দেশ করে।
কেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে এই সংকটের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী:
টিকার ঘাটতি: ২০২৪-২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার ব্যাপক ঘাটতি ছিল। ২০০০ সালে যেখানে টিকার কভারেজ ছিল ৮৯%, বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা: ২০২০ সালের পর থেকে দেশে কোনো নিয়মিত সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি (এসআইএ) পালন করা হয়নি।
আইসোলেশন সংকট: হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আলাদা ব্যবস্থা বা 'আইসোলেশন' নেই। সাধারণ রোগীদের সঙ্গে একই পরিবেশে থাকায় এই অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
চিকিৎসকদের হিমশিম অবস্থা
হাসপাতালগুলোতে ক্রমাগত রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৬৩টি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যদিও এর মধ্যে গত একদিনে সারা দেশে ৭৯৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, কিন্তু নতুন আক্রান্তের হার সেই তুলনায় অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে। কোনো শিশুর শরীরে তীব্র জ্বর এবং লালচে দানা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একইসাথে আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং হাসপাতালে আইসোলেশন নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: