odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 5th May 2026, ৫th May ২০২৬
কোকো: একটি ছোট্ট বিড়াল, দুই ভাইয়ের মমতা আর ভালোবাসার নীরব বিদায়│কোকোর আকস্মিক প্রয়াণ, ৪ এপ্রিল ২০২৬ স্মরণে│Short Story

কোকো: শূন্য করে ভরে দেওয়ার খেলা ভালোবাসার একটি ছোট গল্প

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৪ May ২০২৬ ২৩:৩১

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৪ May ২০২৬ ২৩:৩১

গল্পের বর্ণনা

কার্জন হলের আঙিনা থেকে উদ্ধার হওয়া মা-হারা ছোট্ট বিড়ালছানা কোকো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তেপান্তর ও রূপান্তরের পরিবারের এক আপন সদস্য। আদর, যত্ন, খেলা আর দুষ্টুমিতে ভরা দুই বছরের বেশি সময়ের সম্পর্ক হঠাৎ একদিন থেমে যায় কোকোর আকস্মিক প্রয়াণে। কিন্তু কোকো চলে গেলেও তার রেখে যাওয়া ভালোবাসা, স্মৃতি আর মায়া থেকে যায় রূপান্তরের হৃদয়ে। এটি একটি শিশু-কিশোর মন ছুঁয়ে যাওয়া গল্প, যেখানে একটি ছোট্ট প্রাণ শেখায়, ভালোবাসা কখনো ছোট হয় না।

গল্পের পটভূমি

গল্পটির শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী কার্জন হলের পুরনো ইটের আঙিনায়। সেখানে এক মা-হারা, অসহায় বিড়ালছানাকে খুঁজে পায় তেপান্তর। ছোট্ট প্রাণটির মায়াভরা চোখ ও বাঁচার আকুতি তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। বাড়িতে নিয়ে আসার পর তেপান্তর ও তার ছোট ভাই রূপান্তরের যত্নে বিড়ালছানাটির নাম হয় কোকো।

কোকো ধীরে ধীরে পরিবারের আদরের সদস্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে রূপান্তরের সঙ্গে তার বন্ধন ছিল খুব গভীর। রূপান্তর, যে নিজেকে “বিড়ালদের রাজা” ভাবত, কোকোকে নিজের দায়িত্ব, বন্ধু ও ছোট্ট পৃথিবী হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কোকোর আকস্মিক মৃত্যু সেই আনন্দময় ঘরে নেমে আনে গভীর শূন্যতা।

এই গল্প সেই শূন্যতার, সেই স্মৃতির, আর এক শিশুর ভালোবাসা থেকে বড় হয়ে ওঠার গল্প। কোকোর উপস্থিতি যেমন ঘর ভরিয়ে দিয়েছিল, তেমনি তার অনুপস্থিতিও শেখায়, সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না।

কোকোর আকস্মিক প্রয়াণ, এপ্রিল ২০২৬ স্মরণে

গল্পটি পড়ুন এখান থেকে:

কার্জন হলের পুরনো লাল ইটের আঙিনায় একদিন দেখা মিলল এক ছোট্ট বিড়ালছানার। নাম তখনও তার হয়নি। মা নেই, দল নেই, আশ্রয় নেই। ক্ষুধার্ত চোখে সে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত। কখনো ভয় পেত, কখনো আবার বিশ্বাসভরা চোখে মানুষের দিকে তাকাত। দূর থেকে মিউ মিউ করে ডাকত। সেই ডাক যেন বলত, “আমাকে একটু বাঁচতে দাও, একটু আদর দাও।”

ঠিক সেই সময় তেপান্তর কার্জন হলে গিয়েছিল। ছোট্ট প্রাণটার কাঁপতে থাকা শরীর আর মায়াভরা চোখ দেখে তার বুকটা নরম হয়ে গেল। সে আলতো করে বিড়ালছানাটিকে কোলে তুলল, একটু খাবার দিল। সেই মুহূর্তেই যেন ছোট্ট প্রাণটার পৃথিবী বদলে গেল। সে তেপান্তরের পিছু পিছু ঘুরতে লাগল। বারবার মিউ মিউ করে যেন বলল, “আমাকে ফেলে যেও না।”

তেপান্তর খুব দোটানায় পড়ে গেল। একদিকে অগাধ মায়া, অন্যদিকে ভয়, বাড়িতে নিয়ে গেলে মা মানবেন তো? কিন্তু মন তো সব সময় যুক্তির কথা শোনে না। তার মনে হলো, এই ছোট্ট প্রাণটাকে না নিয়ে গেলে যদি ও বাঁচে না?

হঠাৎ তার মনে পড়ল ছোট ভাই রূপান্তরের কথা। রূপান্তর নিজেকে খুব গম্ভীরভাবে “বিড়ালদের রাজা” বলে ঘোষণা করে। সে বলে, পৃথিবীর সব বিড়ালের দেখভাল করার দায়িত্ব নাকি তারই!

শেষ পর্যন্ত তেপান্তর সাহস করে বিড়ালছানাটিকে বাড়িতে নিয়ে এল। প্রথমে একটু লুকোচুরি, একটু ফিসফাস। তারপর খবর গেল রূপান্তরের কাছে। রূপান্তর তো আনন্দে আত্মহারা। তার চোখে যেন নতুন বন্ধু এসেছে, তার রাজ্যে এসেছে এক নতুন প্রজা।

কিন্তু মা প্রথমে আপত্তি করলেন। এত ছোট্ট বিড়াল, বাঁচবে তো? বাড়িতে রাখা কি সম্ভব? তখন দুই ভাই বাবাকে ফোন করল। তারা খুব আন্তরিক গলায় বলল, “আমরা দেখাশোনা করব। ওকে থাকতে দাও না!”

তাদের কণ্ঠে ছিল শিশুর জেদ, কিন্তু সেই জেদের ভেতর ছিল নির্মল ভালোবাসা। ধীরে ধীরে পরিবারের মনও গলে গেল। ছোট্ট অতিথির নাম রাখা হলো, কোকো।

Enjoy the Youtube Video Story: কোকো: এক ছোট্ট বিড়ালের মায়াভরা গল্প│দুই ভাইয়ের মমতা আর ভালোবাসার নীরব বিদায়│A Short Story of a Cat

কোকো তখন একেবারে নবজাতকের মতো। মায়ের দুধ ছাড়া বাঁচা কঠিন। তাই শুরু হলো দুই ভাইয়ের নতুন দায়িত্ব। তেপান্তর ছোট্ট ফিডিং বোতল এনে দুধ খাওয়াতে লাগল। কোকোকে নিয়ে যাওয়া হলো ঢাকার কেন্দ্রীয় প্রাণী হাসপাতালে। ডাক্তারের পরামর্শ, ওষুধ, যত্ন আর দুই ভাইয়ের ভালোবাসায় কোকো ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল।

তারপর কোকো বড় হতে লাগল। ঘরের এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটে বেড়াত। কখনো রূপান্তরের পড়ার টেবিলে উঠে বসত, কখনো খাতার ওপর থাবা রেখে পড়া বন্ধ করে দিত, কখনো কলম নিয়ে খেলত। রূপান্তর রাগ করত, আবার মুহূর্তেই তাকে কোলে তুলে বলত, “তুই আমার কোকো। তুই কোথাও যাবি না।”

কোকোও যেন বুঝত, এই ঘরটাই তার রাজ্য। রূপান্তর তার সবচেয়ে আপন মানুষ। সে ডাকলেই ছুটে আসত। বাথরুমেই তার প্রয়োজন সারত। নিজের পছন্দের খাবার ছাড়া অন্য কিছু খেতে চাইত না। রাত হলে কখনো তেপান্তরের পাশে, কখনো রূপান্তরের কাছে গা ঘেঁষে ঘুমাত। তার ছোট্ট থাবা, নরম লেজ, গোল চোখ আর মিউ মিউ ডাক ঘরটাকে ভরে রাখত।

এইভাবেই দুই বছরের বেশি সময় ধরে কোকো হয়ে উঠল পরিবারের একেবারে আপনজন। সে ছিল না শুধু একটি বিড়াল। সে ছিল হাসির কারণ, খেলার সাথি, আদরের ছোট্ট সদস্য। সে যেন সবাইকে শিখিয়ে দিল, ভালোবাসার জন্য বড় হওয়া লাগে না। ছোট্ট প্রাণও মানুষের হৃদয়ে বিশাল জায়গা করে নিতে পারে।

কিন্তু জীবনের গল্প সব সময় ইচ্ছেমতো লেখা যায় না।

একদিন হঠাৎ করেই কোকো চলে গেল। কোনো আগাম খবর না দিয়ে, কোনো বিদায় না বলে। যেন একটু ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু আর জাগবে না।

রূপান্তর প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। সে বারবার ডাকছিল, “কোকো… কোকো… উঠ না…” তার কণ্ঠে ছিল ভয়, আশা আর অবিশ্বাস। ছোট্ট হাত দিয়ে আলতো করে নাড়িয়ে দিচ্ছিল কোকোকে। যেন আর একটু পরেই কোকো চোখ খুলবে, লেজ নাড়বে, দৌড়ে বেড়াবে।

কিন্তু নীরবতা ভাঙল না।

তারপর রূপান্তরের কান্নায় ঘর ভারী হয়ে উঠল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আল্লাহ, কোকোকে ফিরিয়ে দাও না… ও তো খুব ভালো ছিল…”

শিশুর এই কান্না খুব গভীর। এই কান্নায় থাকে হারানোর ব্যথা, আবার ভালোবাসার সবচেয়ে সত্য রূপটাও লুকিয়ে থাকে।

সেদিন থেকে ঘরটা যেন বদলে গেল। বিকেলের আলো জানালা দিয়ে ঢুকত ঠিকই, কিন্তু আলোতে আগের মতো উষ্ণতা থাকত না। জানালার ধারে যে ছোট্ট ছায়াটা লাফিয়ে উঠত, সে আর নেই। খাতার ওপর যে থাবা পড়ত, সে থাবা আর পড়ে না। খাবার সময় রূপান্তর থেমে যায়, “কোকোকে তো দিতাম…” পড়ার সময় খাতার দিকে তাকিয়ে বলে, “এখানেই বসত…” আর কখনো হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, “ও কি আবার আসবে?”

এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। কিন্তু এই প্রশ্নেই বোঝা যায়, কোকো কতটা আপন ছিল।

দিন যায়। কান্না একটু একটু করে থামে। কিন্তু শূন্যতা থেকে যায়। সেই শূন্যতার ভেতরেই একদিন জন্ম নেয় স্মৃতি। কোকোর দৌড়ঝাঁপ, তার দুষ্টুমি, তার মিউ মিউ ডাক, তার গা ঘেঁষে ঘুমিয়ে পড়া, সবকিছু মিলিয়ে সে অদৃশ্য হয়ে থেকেও ঘরে থেকে যায়।

হয়তো এটাই ভালোবাসার এক আশ্চর্য খেলা। কেউ চলে যায়, তবু একেবারে চলে যায় না। সে থেকে যায় মনে, কথায়, ছবিতে, অভ্যাসে, আর নিঃশব্দ বিকেলের আলোয়।

একদিন সন্ধ্যায় জানালার পাশে বসে রূপান্তর আস্তে করে বলল, “তুই ছিলি বলেই আমি এত ভালোবাসতে শিখেছি, কোকো।”

কোকো আর নেই। তবু কোকো আছে।

রূপান্তরের চোখের জলে, তেপান্তরের মায়ায়, পরিবারের স্মৃতিতে, আর ভালোবাসার সেই ছোট্ট গল্পে।

কোকো শিখিয়ে দিয়ে গেছে, ভালোবাসা কখনো ছোট হয় না। আর একটি ছোট্ট প্রাণও মানুষের জীবনে আকাশের মতো বড় হয়ে উঠতে পারে।

️ লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#কোকো #ছোট্টগল্প #বিড়ালেরগল্প #শিশুসাহিত্য #কিশোরসাহিত্য #ভালোবাসারগল্প #স্মৃতিরগল্প #মায়ারগল্প #পোষাপ্রাণী #রূপান্তর #তেপান্তর #কার্জনহল #মানবিকগল্প #বাংলাগল্প #সাহিত্যপত্রিকা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: