অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক│শিক্ষা দর্শন
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি জাতীয় চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের দর্শন ও বৈজ্ঞানিক মনন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে? এই গভীর বিশ্লেষণধর্মী ফিচারে উঠে এসেছে ঔপনিবেশিক শিক্ষা কাঠামো, মুখস্থনির্ভর পাঠ্যক্রম, ধর্মীয় ও বাজারমুখী প্রভাব, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানবিক শিক্ষা সংকটের বাস্তবতা। রাজশাহী কলেজ থেকে গ্রামীণ বিদ্যালয় পর্যন্ত উদাহরণ টেনে লেখক দেখিয়েছেন, কেন বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা চিন্তাশীল নাগরিক নয়, বরং পরীক্ষানির্ভর যান্ত্রিক প্রজন্ম তৈরি করছে। জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিক মূল্যবোধকে নতুন করে শিক্ষার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে এই প্রবন্ধে। শিক্ষা সংস্কার, পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন ও মুক্তচিন্তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এটি একটি সময়োপযোগী ও চিন্তাজাগানিয়া ফিচার।
প্রথম পরিচ্ছেদ: নির্বাসিত প্রজাপতি
শীতের সকাল। রাজশাহী কলেজের শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে এক পঞ্চাশোর্ধ্ব অধ্যাপক মুঠোফোনের পর্দায় ক্লাসের রুটিন দেখছেন। পাশেই একটি শিশু পকেট থেকে বের করে এক টুকরো পাউরুটি ফেলে এসেছে, যার গায়ে লেখা ‘জাতীয় সংসদ ভবনের ছবি’। অধ্যাপকটি বুড়ো আঙুলে ওই রুটির টুকরোটি উল্টে-পাল্টে দেখেন। তারপর দৃষ্টি ফেরান শহীদ মিনারের বর্ণমালার দিকে। ভাবছেন, আমরা কি এই বর্ণমালার মাধ্যমে সত্যিই আমাদের জাতীয় চেতনাকে বাঁচতে শেখাতে পেরেছি?
একটি প্রজাপতি যেন কখনো ধুলায় মাখামাখি হয়নি—আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সেই রকম নির্বাসিত। এর জানালা খুলে দেয়া হয় শুধু পরীক্ষার হল দেখার জন্য, দেশের মাটি দেখার জন্য নয়। ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোর সূর্য করোটিতে ধারণ করে যারা এই দেশ গড়েছিল, তাদের স্বপ্নের ‘গণমানুষের বিদ্যালয়’ আজ কোথায়? আমরা শিক্ষার নামে যা গ্রহণ করেছি, সেটি যেন এক খোলস: বাইরে আধুনিক, ভেতরে মধ্যযুগীয় আতঙ্ক। জাতীয় চেতনার রক্তিম দ্যুতি যেখানে থাকার কথা, সেখানে বিরাজ করছে এক প্রকার ‘বন্ধ্যা নিরপেক্ষতা’।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: জ্ঞানের মেশিনে বাজে কিলবিল
বাংলাদেশের শিক্ষা দর্শনকে যদি একটি বৃক্ষ বলা যায়, তবে তার মূল দুইটি: একটি ‘ঔপনিবেশিক মনন’, অন্যটি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’। ১৯৪৭ সালের আগে এই উপমহাদেশে ইংরেজি শিক্ষা যেভাবে চালু হয়েছিল, তা ছিল শাসনকে সহজ করার এক কৌশল। ম্যাকুলের মিনিটে যাকে বলা হয় ‘নেটিভ মুন্সিদের’ বদলে ‘ব্রিটিশ মননের প্রতিরূপ’ তৈরি করা। আমরা স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু সেই কলোনিয়াল প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি পাইনি—বরং তাকে ঢেকে দিয়েছি আরও পুরনো ধর্মীয় গোঁড়ামি ও পুঁজিবাদী পণ্যে।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ছিল তিনটি স্রোতের সংঘাত:
- রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অহিংস মানবিক মূল্যবোধ;
- ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সাহস; এবং
- একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নৈর্ব্যক্তিক অস্তিত্ববাদ।
কিন্তু আজ যখন কোনও শিশু কবিতার বইয়ে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ পড়ে, তখন তাকে বলা হয় মুখস্থ করো, কিন্তু ‘আমি যারে দেখিতে নারি’—এই যার মানে কে, তা বিশ্লেষণ করতে কেউ বারণ করে না।
শিক্ষা যেন একটি মৃত মেশিনে পরিণত হয়েছে। এই মেশিনে সকাল আটটা থেকে দুপুর পর্যন্ত ছাত্ররা বসে থাকে কিলবিল শব্দের মতো। এক ঘণ্টা ইতিহাস, এক ঘণ্টা বিজ্ঞান, এক ঘণ্টা ধর্ম, এক ঘণ্টা বাণিজ্য—কোনও কাঠামোতে নেই জাতীয় জীবনের গভীর পাঠ। শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করলে তারা হতাশায় বলেন, ‘আমরা পেয়ে তো কিছু আসে যায়নি, ওদের রেজাল্ট ভালো করতে হবে।’ অর্থাৎ ফলাফল হলো নৈবেদ্য, শিক্ষা হলো সাজানো বাগানের ফটকের সামনের ভেলভেটের দড়ি, যার নিচে নেই আদি মাটির গন্ধ।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: 'বাংলাদেশি'র জটিল পাথেয়
কথায় আছে ‘প্রত্যেকটি জাতির একটি অন্তরে ছিটমহল থাকে’। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সেই ছিটমহল হলো ‘বাংলাদেশি’ কে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের পাঠ্যক্রমে অতি সরল। সেখানে সংযোজিত হয়েছে ‘জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র’—আমাদের সংবিধানের মূলনীতি। কিন্তু এই বানানগুলো শিক্ষার্থী কি আত্মস্থ করে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এক বন্ধু আমাকে বলেছিলেন, ‘প্রথম বর্ষের ছাত্রদের কাছে যখন মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট জিজ্ঞেস করি, তারা মুখস্থ করে “পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে” বলে। কিন্তু জিজ্ঞেস করি, হানাদার বাহিনী আবির্ভাবের পেছনে কী কারণ—সম্পদের অপকেন্দ্রীকরণ, ভাষার দাবি, শোষণের দীর্ঘসূত্রিতা—তারা চুপ করে যায়।’
জাতীয় চেতনার আলোকে শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি খুবই পাতলা। আর সেই পাতলা ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা পাঠাগার ভূমিকম্পে ধসে পড়ার মতো। উদাহরণ স্বরূপ, বিজ্ঞান বিভাগে কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়ানো হয়, কিন্তু পড়ানো হয় না জীববৈচিত্র্য ও নদী বাঁচানোর দার্শনিক আবশ্যকতা; ব্যবসায় শিক্ষায় ‘গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট’ পড়ানো হয় উচ্চস্বরে, কিন্তু পড়ানো হয় না গ্রামীণ অর্থনীতির বুনন। যেন শিক্ষা কেবল দক্ষ জনশক্তি তৈরির কারখানা; ‘মানবিক অসহায়ত্ব বোধ’ বা ‘বৈষম্যের স্বরূপ’ জানার কোনো জায়গা নেই।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: বুড়ো সাপের খোলস আর নবীন আগুন
অবশ্য গত দুই দশকে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও দেখা গেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) তৈরি করল জীবন ও জীবিকা বিষয়ক বই। ইংরেজি মাধ্যমের অভিযোজন দেখা গেল। কিন্তু এই পরিবর্তনের অলংকার যেন বুড়ো সাপের নতুন খোলস—সাপটা একই, শুধু চামড়া বদলায়। আদর্শগত ভিত্তি স্বাধীনতার চেতনার চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চাপ ও প্রযুক্তিনির্ভর পুঁজিবাদী চাহিদার ওপর দাঁড়িয়ে।
আরও ভয়াবহ হলো ধর্মীয় ও জঙ্গি প্রভাব পড়া। ২০০০ সালের দিকে স্কুলে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর বই বিতরণের ঘটনা, পরবর্তী সময়ে ‘বাংলাদেশি ইতিহাস’ বলতে ইসলামী ফিকহের ইতিহাসকে বেশি জায়গা করে দেয়ার প্রবণতা—এসব ধরা পড়লেও তার তাত্ত্বিক প্রতিষেধক আজও অসম্পূর্ণ। ক্লাস সেভেনের এক ছাত্র জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘স্যার, আমরা যদি সমাজতন্ত্র চাই, সেটা মানে কি সম্পত্তির মালিক না হতে?’ তখন শিক্ষিকা বলেছিলেন, ‘এসব পুরনো কথা, বর্তমানে বাজার অর্থনীতি।’ মজার ব্যাপার হলো, বাজার অর্থনীতির অসাম্য ও মূল্যস্ফীতি কিভাবে একজন কৃষকের জীবননাশ করে, তা পাঠ্যসূচিতে নেই, নেই শ্রেণি সংগ্রামের আদ্যোপান্ত বোধ।
আরও গভীর সংকট হলো ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস ও পাঠ্যপুস্তকের ভাষা বদলে যাওয়া। একেক রাজনৈতিক সময় যেন একেক নতুন জাতীয় স্মৃতি নির্মাণ করে। কোনো সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান বিস্তৃত হয়, অন্য সময়ে তা সংকুচিত হয়ে আসে আনুষ্ঠানিক কয়েকটি অনুচ্ছেদে। কখনও ভাষা আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক চেতনা জোর পায়, কখনও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সংজ্ঞাই নতুনভাবে সাজানো হয়। ফলে শিক্ষার্থী ইতিহাসকে স্থির সত্য হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তনশীল রাষ্ট্রীয় ভাষ্য হিসেবে দেখতে শেখে।
বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস যেন অনেকটা নদীর গতিপথের মতো। সরকার বদলালেই কখনও বদলে যায় অধ্যায়ের শব্দ, কখনও ছবি, কখনও বাদ পড়ে কিছু নাম, আবার যুক্ত হয় নতুন ব্যাখ্যা। এক আমলে যাদের জাতীয় ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, পরবর্তী সংস্করণে তাদের উপস্থিতি কমে আসে। কোনো সময়ে মুক্তিযুদ্ধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা হয় বিস্তৃতভাবে, আবার অন্য সময়ে তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে কেবল ঘটনাপঞ্জিতে। ইতিহাস তখন আর অনুসন্ধানের জায়গা থাকে না, হয়ে ওঠে প্রশাসনিক সম্পাদনার অনুশীলন।
এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা শিক্ষার্থীদের মনেও তৈরি করে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। ক্লাস সেভেনের এক ছাত্র একবার প্রশ্ন করেছিল, ‘স্যার, আমাদের বই তো কয়েক বছর পরপর বদলে যায়। তাহলে আসল ইতিহাস কোনটা?’ শিক্ষক কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেছিলেন, ‘পরীক্ষায় যেটা আছে, আপাতত সেটাই মনে রাখো।’ এই উত্তরেই ধরা পড়ে শিক্ষাব্যবস্থার এক নির্মম বাস্তবতা। এখানে প্রশ্নের চেয়ে মুখস্থ উত্তর বেশি নিরাপদ।
অথচ একটি জাতির ইতিহাসের কাজ হওয়া উচিত ছিল মানুষকে নিজের শেকড়, সংগ্রাম ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করানো। কিন্তু যখন পাঠ্যবই রাজনৈতিক আবহাওয়ার সঙ্গে রং বদলায়, তখন শিক্ষার্থীর কাছেও দেশ হয়ে ওঠে এক অনিশ্চিত ধারণা। সে বুঝে উঠতে পারে না কোন স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী, কোন ব্যাখ্যা সাময়িক, আর কোন ইতিহাস সত্যিই জনগণের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। ফলে পাঠ্যক্রমে অনুপস্থিত থেকে যায় কৃষকের বেঁচে থাকার লড়াই, শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা কিংবা বৈষম্যের গভীর অর্থনীতি। থেকে যায় শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার মতো সংক্ষিপ্ত ও নিরাপদ বাক্য।
এইরূপ অপসংস্কৃতির প্রভাবে ফলে শিক্ষার্থীর মনে তৈরি হয় এক প্রকার শূন্যতা। সেই শূন্যতায় জায়গা করে নেয় অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কার, ধর্মীয় উগ্রবাদ বা নির্বোধ কনটেন্টের মিছিল। শিক্ষার মন্দির থেকে যখন জাতীয় চেতনার আগুন সরিয়ে নেয়া হয়, তখন সেখানে প্রবেশ করে ঘোর, কুহক ও জাদুমন্ত্র।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ: মুক্তির মঞ্চ ও সভ্যতার সংকট
বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মহাযুদ্ধে লিপ্ত, আমাদের শিক্ষা দর্শনের গলদটি প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’, ‘টেকনোলজিকাল আউটসোর্সিং’, ‘স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম’ এসব শব্দ জাদুর মতো উচ্চারিত হয়, কিন্তু হয় না ‘মুক্তিযুদ্ধের দর্শন’—যে দর্শন মানুষের মধ্যে মর্যাদা, বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন আর প্রগতির অমোঘ আকাঙ্ক্ষা জাগায়।
কথাপ্রসঙ্গে গ্রামীণ এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন: ‘আমরা বাচ্চাকে শেখাতে চাই ১২x১২ = ১৪৪, কিন্তু এক ফসলি জমির কৃষকের ছেলেকে শেখাইনা কেন, তার বাবার এই কষ্টের অঙ্কটা কারা বসিয়েছিল?’ এই একটি প্রশ্নই আমাদের শিক্ষার ভিত কাঁপিয়ে দেয়। শিক্ষার প্রথম সোপান হলো নিজের দেশপ্রেমকে প্রশ্ন করা, নিজের heritage কে চিনে সেখান থেকে বিশ্বজনীন মানচিত্র খোঁজা। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সেই সোপানের শেষ প্রান্তে ওঠার আগেই ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষার প্রস্তুতির যন্ত্রণায় ক্রাশ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্নাতক শেষে মাত্র ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঐচ্ছিকভাবে কোন দর্শনের বই পড়ে। এবং মাত্র ৫ শতাংশ মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত জটিল কারণ বিশ্লেষণ করতে পারে। বাকিরা সুখী কিন্তু সতর্ক, সচল কিন্তু স্বপ্নহীন।
আমাদের কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘স্বপ্নের ব্যবসা বড়ো কঠিন, বাজারে যত ক্রেতা হোত ভাই।’ বাজারের ক্রেতাদের চাহিদা পুরণে শিক্ষানীতি নতি স্বীকার করে। একদিকে ব্যাংকার-পুঁজিপতিরা চায় মসৃণ বাজারমনস্ক কর্মী। অন্যদিকে ধর্মগুরুরা চায় আনুগত্যের পাঠ। কিন্তু কে চায় চিন্তাশীল, প্রশ্নকাতর মুক্তিবাউলের সন্তান?
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: ফিরে দেখা সোনার বাংলার মঞ্চ
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর যখন বিজয় অর্জিত হয়, তখন সারাদেশের পাঠশালায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাতীয় সংগীত গাওয়া হতো। সেই আবেগের বীজ বপন করতে কোনো টেক্সটবুকের দরকার পড়েনি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তর—এ যেন একটি স্বতঃস্ফূর্ত শিক্ষা। যেখানে প্রতিটি শহিদ মিনার, প্রতিটি গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ ছিল জীবন্ত ক্লাসরুম। কিন্তু আজ সেই স্মৃতিস্তম্ভগুলো ঠাঁই পেয়েছে পিকনিক স্পটের তালিকায়।
উপমা দিতে হয়: শিক্ষা দর্শন যেন সেই পুরনো ‘বটগাছ’ যার ছায়ায় গ্রামের প্রজারা বিচার করত। এখন সেই বটগাছের গোড়ায় বসেছে সিমেন্টের বেঞ্চ, যার ওপর লেখা ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক কর্তৃক ক্রয়কৃত’। প্রকৃত শিক্ষা যখন গণতান্ত্রিক, তখন তার মূল্যায়ন ব্যবস্থা হয় যৌথ ও অংশগ্রহণমূলক। আমাদের এখানে মূল্যায়ন ব্যবস্থা যেন পুলিশি দমননীতি। পরীক্ষার ফলাফল যদি বিবেকের জায়গায় দখল করে নেয়, তাহলে জাতীয় চেতনার পতাকা অর্ধনমিত থাকবেই। এ প্রসঙ্গে একজন শিক্ষাবিদ বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষা কারিকুলামের মাঝে এক ধরণের সিজোফ্রেনিয়া কাজ করে। একদিকে বলি মানবিক মূল্যবোধ, অন্যদিকে সবকিছু মাপি সংখ্যার ফর্দে।’
সমাপনী পরিচ্ছেদ: গণমানুষের বিদ্যালয়ের পথে
১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোর সূর্য করোটিতে ধারণ করে যারা এই দেশ গড়েছিল, তাদের স্বপ্ন ছিল এমন এক বিদ্যালয়, যেখানে শিক্ষা কেবল চাকরির সিঁড়ি নয়, বরং মানুষ হয়ে ওঠার অনুশীলন। সেই বিদ্যালয়ে জাতীয় চেতনার রক্তিম দ্যুতি থাকবে, কিন্তু তা হবে না সংকীর্ণ স্লোগানের বন্দিত্বে; বরং থাকবে মুক্তবুদ্ধি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, মানবিক সহমর্মিতা এবং নিজের দেশকে গভীরভাবে জানার সাহস। আজ প্রশ্ন হলো, সেই ‘গণমানুষের বিদ্যালয়’ কি এখনও সম্ভব?
সম্ভব, যদি শিক্ষাকে আবার জনগণের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
- প্রথমত, পাঠ্যক্রমকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের বাইরে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে। ইতিহাসকে আর দলীয় আয়নায় দেখা চলবে না; তাকে দেখতে হবে মানুষের সংগ্রাম, ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষি, নদী, শ্রম ও মুক্তির সম্মিলিত অভিজ্ঞতা হিসেবে।
- দ্বিতীয়ত, প্রতিটি অঞ্চলের স্থানীয় ইতিহাস, লোকজ জ্ঞান ও জীবনসংগ্রামকে শিক্ষার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে কুড়িগ্রামের শিক্ষার্থী তার নদীকে, সুন্দরবনের শিক্ষার্থী তার বনকে, আর পাহাড়ের শিক্ষার্থী তার ভূমির ইতিহাসকে নিজের পাঠের অংশ হিসেবে চিনতে শেখে।
- তৃতীয়ত, পরীক্ষানির্ভর ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রশ্নভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যে শিশু প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সে কখনও মুক্ত নাগরিক হয়ে উঠতে পারে না। বিদ্যালয় হতে হবে এমন এক জায়গা, যেখানে ছাত্র কেবল উত্তর মুখস্থ করবে না, বরং শিখবে কীভাবে সত্যকে অনুসন্ধান করতে হয়। শিক্ষককে ফিরিয়ে দিতে হবে চিন্তার স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা, কারণ পিডিএফের ফাইল নয়, একজন জাগ্রত শিক্ষকই জাতির দীর্ঘতম আলোকবর্তিকা।
- চতুর্থত, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষা হবে মানবিকতার নতুন পুনর্গঠন। শুধু কোডিং বা দক্ষতা নয়, প্রয়োজন নৈতিকতা, পরিবেশচেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং বৈষম্য সম্পর্কে গভীর বোধ। যে শিক্ষা কৃষকের ঘাম বোঝে না, শ্রমিকের ক্লান্তি বোঝে না, নদীর মৃত্যু বোঝে না, সেই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কেবল যন্ত্রচালিত উৎপাদন তৈরি করবে, মানুষ নয়।
আমাদের দরকার এমন এক প্রজন্ম, যারা একই স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে। সেই স্বপ্ন কোনো দলীয় পতাকার নয়, কোনো ক্ষমতার চক্রেরও নয়। সেই স্বপ্ন হলো এই অভাগা দেশটাকে আর কষ্ট না দেওয়া। দুর্নীতি, বৈষম্য, ঘৃণা ও বিভেদের উত্তরাধিকার না বাড়িয়ে, তাকে একটু বেশি বাসযোগ্য, একটু বেশি ন্যায়ভিত্তিক, একটু বেশি সুখী করে তোলা।
যেদিন বিদ্যালয়ের সকালের সমাবেশে জাতীয় সংগীত কেবল আনুষ্ঠানিকতা থাকবে না, বরং শিক্ষার্থীর ভেতরে জন্ম দেবে দায়িত্ববোধ; যেদিন ইতিহাসের ক্লাসে মুখস্থ তারিখের বদলে শোনা যাবে মানুষের বেঁচে থাকার গল্প; যেদিন বিজ্ঞান শেখাবে কেবল সূত্র নয়, সমাজকে বদলে দেওয়ার কল্পনাশক্তি—সেদিনই হয়তো ফিরে আসবে সেই ‘গণমানুষের বিদ্যালয়’।
তখন স্বাধীনতা দিবস শুধু কুচকাওয়াজের দিন হবে না। হবে আত্মসমালোচনার, পুনর্গঠনের এবং নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির দিন। সেই পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, এই দেশের মানুষ বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রয়োজন শুধু শিক্ষার সেই বটতলায় আবার আলো ফিরিয়ে আনা।
উপদেশনামূলক পরিচ্ছেদ: উদয়াস্তের প্রতীক্ষায়
বাংলাদেশের শিক্ষাদর্শে গলদ মারাত্মক, কিন্তু দুর্ভেদ্য নয়। গলদ হলো ‘অর্থবোধের জাল’। এই জাল ভেদ করতে হলে প্রয়োজন চারটি অস্ত্র:
- প্রথমত, স্থানীয় জ্ঞান ও আঞ্চলিক ইতিহাসকে জাতীয় সিলেবাসের সাথে যুক্ত করা।
- দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের দর্শন (অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত মানুষ)-কে আদর্শবান পাঠদানের অংশ করা, কেবল ‘আমরা ওরা’র গল্প নয়।
- তৃতীয়ত, পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন—যেখানে মুখস্থ নয়, বরং যুক্তি ও সৃজনশীল বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দেয়া।
- চতুর্থত, শিক্ষকের মর্যাদা ও চিন্তার স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা, যিনি আজ পিডিএফের ডিপো।
একদিন যদি কোনও শিশু জিজ্ঞাসা করে, ‘মুক্তিযুদ্ধ মানে কি রক্তের বন্যায় গোসল?’ তার উত্তরে শুধু তারিখ নয়, ঢেকে দিতে হবে গল্প—একটি জাতির আত্মমর্যাদার আগুন। সেই আগুন না এলে পাঠ্যবইয়ের পাতা হলেও সোনালি সূত্রে বাঁধা থাকবে, কিন্তু মন থেকে ঝরে যাবে জাতীয় চেতনার বীজ।
প্রজাপতি যদি ফিরে আসে বনে, তার ডানায় থাকে মাটির গল্প। আমাদের বিদ্যালয়গুলো যদি সত্যিকার অর্থেই জাতীয় চেতনার আলোতে শিক্ষিত করে, তাহলে সেদিন আর স্বাধীনতা দিবসে কেবল কুচকাওয়াজ হবে না—হবে স্বপ্নের নৌকায় চড়ে অমিয় যাত্রা।
নতুন প্রজন্মের আঙুল ধরে সেই যাত্রার রাস্তা বানাতে হলে, আজই ফিরে পেতে হবে আমাদের শিক্ষার সেই মাটির ভিত্তি, যাতে গাঁথা রয়েছে বাষট্টির শহীদ মিনারের লাল সূর্য ও একাত্তরের নীলাঞ্জনা রাত। অন্যথায়, অমর্ত্য সেনের সেই বিখ্যাত বাণী এ দেশেও সত্য হবে: “শিক্ষা যদি কেবল উৎপাদনের দাসী হয়, তাহলে মুক্তির বদলে যন্ত্রই তৈরি হবে।”
যন্ত্রের কোলাহলে যদি মানুষের মন জেগে ওঠে, তবেই সার্থক আমাদের স্বাধীনতা। তবেই রচিত হবে সোনার বাংলার শিক্ষা-উপনিবেশ। এখন সময় উদয়াস্তের—ভাঙার ও গড়ার, প্রকৃত জিজ্ঞাসার অপেক্ষায়।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#বাংলাদেশের_শিক্ষা #জাতীয়_চেতনা #শিক্ষা_সংস্কার #মুক্তিযুদ্ধের_দর্শন #বিজ্ঞানমনস্কতা #পাঠ্যক্রম #মানবিক_শিক্ষা #AIওশিক্ষা #বাংলাদেশি_পরিচয় #শিক্ষাদর্শন
Keywords: বাংলাদেশের শিক্ষা সংকট, জাতীয় চেতনা ও শিক্ষাব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধের দর্শন, বাংলাদেশ শিক্ষা সংস্কার, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পাঠ্যক্রম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষা
মুক্তিযুদ্ধের দর্শন জাতীয় চেতনা ও শিক্ষাব্যবস্থা বাংলাদেশের শিক্ষা সংকট অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক বাংলাদেশ শিক্ষা সংস্কার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষা

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: