odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 19th May 2026, ১৯th May ২০২৬
একই শ্রেণিকক্ষে অটিস্টিক শিশু, দরিদ্র শিক্ষার্থী, ধীরগতির পাঠক, পাহাড়ি ভাষাভাষী শিশু ও তথাকথিত ‘মেধাবী’ শিক্ষার্থী—সবাইকে নিয়ে শেখার নতুন দর্শন নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের গভীর প্রশ্ন ও সম্ভাবনার অনুসন্ধান।

যে শ্রেণিকক্ষে কেউ বাদ পড়ে না: টিম লোরম্যানের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা দর্শন কি বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ?

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৯ May ২০২৬ ০৩:০৯

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৯ May ২০২৬ ০৩:০৯

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │বিশেষ পরীক্ষামূলক ফিচার কলাম

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতা, বৈষম্য, পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা এবং প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের নীরব বর্জনের বাস্তবতার ভেতর দাঁড়িয়ে এই বিশেষ ফিচার নিবন্ধটি বিশ্লেষণ করেছে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পেডাগজিক কাঠামো—Universal Design for Learning (UDL), Differentiated Instruction (DI), এবং Inclusive Pedagogical Approach in Action (IPAA)। টিম লোরম্যানের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা দর্শনের আলোকে রচিত এই পরীক্ষামূলক বিশেষ ফিচারে একই ধারণাকে তিনটি ভিন্ন সাহিত্যিক ও বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়েছে, যাতে পাঠক প্রতিক্রিয়া, পাঠাভ্যাস, আবেগীয় সংযোগ এবং নীতিনির্ধারণী প্রভাবের পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করা যায়। গ্রামীণ বিদ্যালয়, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, প্রান্তিক পরিবার, শিক্ষক সংকট, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং মানবিক শিক্ষা সংস্কারের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে এই নিবন্ধ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা পুনর্গঠনের এক বিকল্প কল্পনা হাজির করে।

ডিসক্লেইমার: একই নিবন্ধে তিনটি সংস্করণ রাখার উদ্দেশ্য

এই বিশেষ ফিচার নিবন্ধটি একটি সচেতন ও গবেষণাভিত্তিক পরীক্ষামূলক সম্পাদকীয় উদ্যোগ হিসেবে নির্মিত। এখানে একই মূল ধারণা, তাত্ত্বিক কাঠামো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা দর্শনকে তিনটি পৃথক ভাষাশৈলী, বর্ণনাভঙ্গি ও বিশ্লেষণ কাঠামোয় উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে পাঠকের আবেগীয় প্রতিক্রিয়া, পাঠ-সম্পৃক্ততা, নীতি-সংবেদনশীলতা এবং সাহিত্যিক গ্রহণযোগ্যতার ভিন্নতা পর্যবেক্ষণ করা যায়।

  1. প্রথম সংস্করণটি অধিক সাহিত্যধর্মী, দার্শনিক ও রূপকনির্ভর; যেখানে সংকট থেকে সনদ, সনদ থেকে নীতি এবং নীতি থেকে টেকসই স্বায়ত্তশাসনের ধারাবাহিক যাত্রাকে কেন্দ্র করে এক গভীর মানবিক বয়ান নির্মাণ করা হয়েছে।
  2. দ্বিতীয় সংস্করণটি তুলনামূলকভাবে সংবাদ-ফিচারধর্মী, নীতি-সংবেদনশীল এবং কাঠামোগত বিশ্লেষণভিত্তিক; যেখানে বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজি এবং নীতিগত রূপান্তরের সম্ভাবনাকে অধিক সরাসরি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
  3. তৃতীয় সংস্করণটি সবচেয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণাত্মক ও বর্ণনামূলক; যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাকে শুধু পেডাগজিক প্রশ্ন নয়, বরং গণতন্ত্র, মানবিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

এই তিন সংস্করণ একত্রে প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য হলো—বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার নিয়ে জনআলোচনা, একাডেমিক পাঠ, মিডিয়া গ্রহণযোগ্যতা এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভিন্ন মাত্রা অনুধাবন করা; এবং একইসঙ্গে বোঝা যে কোন ধরনের ভাষা ও উপস্থাপনা সাধারণ পাঠক, শিক্ষক, নীতিনির্ধারক, গবেষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে সবচেয়ে গভীর সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়।

কীওয়ার্ড:

একীভূত শিক্ষা, বাংলাদেশ শিক্ষা সংস্কার, Tim Loreman, UDL DI IPAA, Inclusive Pedagogy, বৈচিত্র্যভিত্তিক শিক্ষণ

সংস্করণ (version)০১

শ্রেণিকক্ষের ভেতর মহাবিশ্ব: অন্তর্ভুক্তির দর্শন থেকে বাংলাদেশের শিক্ষার সম্ভাবনার পুনরুদ্ধার

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ছাত্র—আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলো আজ এক নীরব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। টিম লোরম্যানের অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজির আলোকে রচিত এই ফিচারটি দেখাবে কীভাবে Universal Design for Learning, Differentiated Instruction এবং IPAA মডেল তিনটি একটি টেকসই স্বায়ত্তশাসন কাঠামোয় রূপ নিতে পারে এবং কীভাবে সেই কাঠামো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্জীবিত করতে পারে।

সকাল তখন সবে চারটে। বিক্রমপুরের এক প্রান্তিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাসরিন শিমু মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তাঁর শ্রেণিকক্ষের ছাত্রসংখ্যা পঞ্চাশ। এর মধ্যে অন্তত সাতজনের শেখার ধরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী, দুজনের মনোযোগের ঘাটতি, আর বাকিদের মধ্যে রয়েছে গৃহহীন, দিনমজুরের সন্তান, যাদের হাতে কোনো খাতা নেই। শিমু  লোরম্যানের নাম শোনেননি। কিন্তু তিনি প্রতিদিন এক অলিখিত সংগ্রাম করছেন—একই চক, একই ব্ল্যাকবোর্ড, একই প্রশ্ন দিয়ে কীভাবে পঞ্চাশটি ভিন্ন ভিন্ন জগৎকে একসূত্রে বাঁধবেন? এই প্রশ্ন কেবল শিমু র নয়। এই প্রশ্ন বাংলাদেশের আট লক্ষ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের। এই প্রশ্ন প্রতিটি শহরের কোচিং সেন্টার, প্রতিটি গ্রামের মাদ্রাসা, প্রতিটি বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অলিগলিতে দানা বেঁধে আছে। আজ আমরা সেই অলিগলিতে প্রবেশ করব। সঙ্গে নিয়ে টিম লোরম্যানের গবেষণার আলো, যার প্রতিটি পাতায় যেন শিমু  বেগমদের জন্য এক একটি দিশারি।

আমাদের যাত্রা শুরু হোক এক সঙ্কটের স্বীকারোক্তি দিয়ে। সঙ্কট শব্দটা আজকাল অনেক বেশিই ব্যবহার করি। শিক্ষা সংকট, মানবিক সংকট, মূল্যবোধের সংকট—এত সংকটের ভিড়ে সঙ্কট নিজেই যেন একটি ক্লিশে। কিন্তু যাঁরা প্রতিদিন একটি দরিদ্র পরিবারের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর মাকে দেখেন হাতজোড় করে বসে থাকতে প্রধান শিক্ষকের সামনে, কেবল এই অনুরোধে—আমার শিশুকে ভর্তি হতে দিন, সে অন্যদের মতো নয় ঠিকই, কিন্তু সেও শিখতে চায়—তাঁরা জানেন সঙ্কট মানে তখন আর কোনো ক্লিশে নয়, সঙ্কট তখন এক হাহাকার। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল কাঠামো তৈরি হয়েছে ঊনবিংশ শতকের ইন্ডাস্ট্রিয়াল যুগের কারখানার আদলে। সেই কাঠামোয় ধরা আছে নির্দিষ্ট বয়স, নির্দিষ্ট পাঠ্যবই, নির্দিষ্ট মূল্যায়ন আর নির্দিষ্ট উত্তর। এই ব্যবস্থায় স্বাভাবিকই যারা নয়, তারাই পড়ে থাকে ‘বিশেষ’ তকমার নিচে। আর এই ‘স্পেশাল’ শব্দটি যতই স্নেহের হোক না কেন, তা ধীরে ধীরে নির্মাণ করে এক অদৃশ্য প্রাচীর। টিম লোরম্যান তাঁর গবেষণায় সতর্ক করে দিয়েছেন—বিশেষ শিক্ষার কৌশলগুলো জন্ম নিয়েছে এক বিচ্ছিন্নতার ভেতর। তাই এগুলোর নকল করতে গিয়ে আমরা যদি সেগুলোকে মূলধারায় চাপিয়ে দিই, তাহলে অন্তর্ভুক্তির বদলে ঘটাবে নব্য-বিচ্ছিন্নতা। এটি একটি চমকপ্রদ ও ভীতিপ্রদ সত্য। মানে, যাকে আমরা সমাধান ভাবছি, সেটাই হয়তো সমস্যার নতুন রূপ।

এখন এই সঙ্কটের বীজ থেকে যদি অঙ্কুরিত করতে চাই কোনো নতুন দর্শন, তাহলে আমাদের দরকার এক সনদ—একটি চার্টার। লোরম্যানের তিনটি মডেল মিলে সেই চার্টারের রূপ দাঁড়ায়। প্রথম মডেল ইউনিভার্সাল ডিজাইন ফর লার্নিং। বড় কথাটি ছোট করে বলি: একটি ভবন নির্মাণের আগে যদি আমরা সব ধরণের মানুষের কথা ভেবে নকশা করি—যাঁরা হুইলচেয়ারে চলেন, যাঁদের দৃষ্টি কম, যাঁদের শ্রবণশক্তি সীমিত—তাহলে পরে কাউকে আলাদা পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকতে হয় না। শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা। ‘একযোগে সকলের জন্য নকশা’—এই দর্শনটি পৃথিবীর আরও অনেক জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর চর্চা এখনও উপেক্ষিত। ধরুন, একজন শিক্ষক একটি অঙ্কের সমস্যা পড়িয়ে তিনভাবে সেটি দেখাতে পারেন: চিত্রের মাধ্যমে, কথার মাধ্যমে ও বাস্তব জীবনের উদাহরণের মাধ্যমে। সেই ক্লাসে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু যেমন বর্ণনার মাধ্যমে বুঝতে পারে, ঠিক তেমনি অন্য একজন কল্পনাপ্রবণ শিশু তার নিজের মত করে বিষয়টিকে রাঙিয়ে নেয়। আর উন্মুক্ত থাকে একাধিক প্রকাশের পথ। শিক্ষার্থী যেমন চায়, তেমনভাবে উত্তর দেয়। লোরম্যান মনে করেন, এই ইউডিএল নিয়ে আমাদের দেশে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি, কিন্তু তার অনুপস্থিতিই যেন আমাদের শিক্ষকদের প্রতিদিন পীড়া দিচ্ছে।

এবার আসা যাক দ্বিতীয় মডেলের কথায়। ডিফারেন্সিয়েটেড ইনস্ট্রাকশন বা বৈচিত্র্যভিত্তিক শিক্ষণ। কল্পনা করুন একই বাগানে গোলাপ, জবা, বেলি আর সূর্যমুখী। একই পানি, একই মাটি দিয়ে কি এদের সবগুলোকে একইভাবে ফলানো যায়? যায় না। কাউকে বেশি ছায়া দরকার, কাউকে বেশি রোদ। শিক্ষার্থীরাও তেমনি। ভিন্ন প্রস্তুতি, ভিন্ন আগ্রহ, ভিন্ন শেখার হার। ডিআই বলে, সমস্যা নেই। তুমি একজনকে একটু বেশি সময় দাও, আরেকজনকে ভিন্ন ধরনের বই দাও, তৃতীয়জনকে দলবদ্ধ কাজে উৎসাহ দাও। খুলনায় একটি এনজিও পরিচালিত স্কুলে আমি এক বার দেখেছিলাম, চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী ক্যালকুলাসের ধারণা বুঝতে চাইছিল, আর তার পাশের বেঞ্চের বন্ধুটি তখনো যোগ-বিয়োগের চিহ্নে গোলমাল করছিল। বিদ্যালয়টির শিক্ষক দুজনকে আলাদা কাজ দিয়েছিলেন, কিন্তু ক্লাসরুমের পরিবেশ এমন ছিল যে কেউ মনে করত না তারা ‘ভিন্ন’। তবে এখানে একটি বড় সতর্কবার্তা রয়েছে। লোরম্যান আঙুল তুলে দেখিয়েছেন, ডিআই কখনো কখনো সেই ‘বেল-কার্ভ’ ধারণার জন্ম দেয়—বেশিরভাগ মধ্যম, দুপাশে কম ও বেশি। এই ধারণার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক ভয়াবহ বিভাজন। শিক্ষার্থী বুঝতে পারে তাকে ‘দুর্বল’ গ্রুপে ফেলা হয়েছে। আর এটি যন্ত্রণাদায়ক। যেমন পাপ্পানো তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন—ভিন্ন কাজ পেয়ে শিশু যখন বুঝতে পারে আমার সঙ্গীর কাজটি ভিন্ন, আমি যেন অন্য কোনো শ্রেণির, তখন অন্তর্ভুক্তির চেতনায় ফাটল ধরে। তাই ডিআই কার্যকর, তবে তা ব্যবহার করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে।

তৃতীয় মডেলটি সবচেয়ে আলোড়ন তোলে। ইনক্লুসিভ পেডাগোজিক্যাল অ্যাপ্রোচ ইন অ্যাকশন বা আইপিএএ। ফ্লোরিয়ান ও স্প্রাটের তৈরি এই কাঠামোর গোড়ার কথা হলো—ভিন্নতা মানব বিকাশের স্বাভাবিক অংশ, কোনো ব্যতিক্রম নয়। কোনো শিশু অস্বাভাবিক নয়। যে শিশু চোখ মেলে তাকিয়ে আছে, যে শিশু আবছায়ায় বসে থাকে, যে শিশু অতিমাত্রায় চঞ্চল—তারাও মানব সত্তারই একেক রকম অভিব্যক্তি। আইপিএএ শিক্ষককে বলে, তুমি যদি বিশ্বাস করো যে তুমি সব শিক্ষার্থীকে শেখাতে পারো, তাহলে শ্রেণিকক্ষের আয়োজন এমন হওয়া উচিত যেখানে প্রত্যেকে নিজের ছন্দে শেখে, কাউকে আলাদা করে চিহ্নিত না করেই। এখানে শিক্ষক নির্দেশক নন, বরং একজন রূপকার। অর্থাৎ নাসরিন শিমু যদি আইপিএএ বাস্তবায়ন করতে চান, তাহলে তাকে আর পঞ্চাশটি শিশুর মধ্যে কোনটি ‘দুর্বল’ বা ‘প্রতিবন্ধী’ সেটা চিহ্নিত করতে হবে না। বরং তার দৃষ্টিভঙ্গি হবে—এই ক্লাসরুমের প্রতিটি সদস্যের শেখার উপায় ভিন্ন, আর এই ভিন্নতাকে ঘিরেই সাজাতে হবে আমার শেখানোর কাঠামো। এটি আপাত দৃষ্টিতে ইউডিএল ও ডিআইয়ের সংমিশ্রণ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি মৌলিকভাবে ভিন্ন। কারণ এর বীজে রয়েছে ‘সম্পর্ক’ ও ‘সহযোগিতা’। শিক্ষার্থী আলাদা নয়, শিক্ষকের অভিজ্ঞতাও আলাদা নয়—পুরো ক্লাসরুটিই এক জীবন্ত প্রক্রিয়া।

এই তিন মডেলকে যদি আমরা একটি সূত্রে বাঁধি—সঙ্কট থেকে সনদ, সনদ থেকে নীতি, নীতি থেকে টেকসই স্বায়ত্তশাসন—তাহলে আমরা একটি সম্ভাবনার মানচিত্র আঁকতে পারি। আমাদের দেশের শিক্ষানীতি প্রণেতারা বহুবার ভালো কিছু করার চেষ্টা করেছেন। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি, ‘বাধাহীন শিক্ষা’ প্রকল্প, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নীতির ঘোষণা—এসবের অভাব সদিচ্ছার নয়, বরং প্রয়োগের কাঠামোর। এক সচিব বলেছিলেন, ‘নীতি তো আছেই, কিন্তু স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী শিক্ষক যদি নিজেদের অযোগ্য মনে করেন প্রতিটি ভিন্ন চাহিদার শিশুকে সামলাতে, তাহলে নীতি অকার্যকর।’ ঠিক এখানেই দরকার নীতির ভাষা থেকে স্কুলের ভাষায় রূপান্তরের সেতু। সেই সেতু হতে পারে একটি কাঠামো, যেখানে স্কুল ও শিক্ষকদের স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে, কিন্তু সেই স্বায়ত্তশাসন হবে দায়বদ্ধতাযুক্ত। যেমন ধরুন, কোন শিক্ষক যদি ইউডিএলের আলোকে নিজের ক্লাস নিতে চান, তাহলে শিক্ষা অফিস তাকে সরাসরি গাইডলাইন বেঁধে দেবে না, বরং তাকে প্রশিক্ষণ ও রিসোর্স দেবে। আর শিক্ষক যদি দেখেন তাঁর পরীক্ষায় পাশের হার বাড়ছে এবং সব ধরনের শিক্ষার্থী সক্রিয় থাকছে, তাহলে তাঁকে পুরস্কৃত করা হবে। অর্থাৎ স্বায়ত্তশাসন বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে ‘কীভাবে কাজ করবে তার কাঠামো স্কুল ঠিক করবে, কিন্তু কেন কাজ করবে তার দর্শনটি জাতীয়ভাবে নির্ধারিত থাকবে’।

তবে স্বায়ত্তশাসনের এই মডেল বাস্তবায়নের পথে একটি বড় বাধা হলো আমাদের কেন্দ্রীক পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা। আমরা যদি শিক্ষার্থীকে তার প্রকাশভঙ্গির স্বাধীনতা দিতে না পারি, যদি পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্রে কেবল একটি নির্দিষ্ট ধরনের উত্তরকে সোনার অক্ষরে লেখা হয়, তাহলে শিক্ষক কখনোই ঝুঁকি নেবেন না। গত বছর আমি রাজশাহীতে একজন উদ্যমী শিক্ষক মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি তাঁর ক্লাসে একাধিক মূল্যায়নের পদ্ধতি চালু করেছিলেন। একজন শিক্ষার্থী যে প্রকল্পের মাধ্যমে শিখতে চাইত তাকে সুযোগ দিয়েছিলেন, আরেকজন চাইত মৌখিক উপস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যায়ন হতে। প্রায় সবাই এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষায় যখন ফলাফল এল, তখন দেখা গেল ক্লাসের গড় পাশের হার তলানিতে ঠেকেছে। কারণ পাবলিক পরীক্ষায় তো শুধু একটি নির্দিষ্ট লিখিত পদ্ধতি। মিজানুর তখন নিজেকে দোষী ভাবতে লাগলেন। পরে তিনি আবার পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যান। এই গল্পটি একটি ট্র্যাজেডি। এটিই দেখায় কীভাবে সঙ্কট থেকে সনদ তৈরি হয়েও নীতি ও স্বায়ত্তশাসনের কাঠামোর অভাবে তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হচ্ছে।

লোরম্যান তাঁর গবেষণায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন: প্রযুক্তি এখানে মিত্র হতে পারে। ম্যাকঘি-রিচমন্ড ও ডি ব্রুইনের যুক্তি আমাদের বাস্তবের কাছাকাছি। ফর্মেটিভ অ্যাসেসমেন্টের জন্য ডিজিটাল টুল, ক্লাসরুমের জন্য অগমেন্টেড রিয়েলিটি, শিক্ষার্থীর নিজের ডিভাইস আনার বিধি—এসব বাংলাদেশের অনেক স্কুলে এখন অর্থাভাবে সম্ভব নয়, কিন্তু তার মানে এই না যে আমরা চিন্তার জগতে সেগুলোকে বাদ দেব। ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলে আমি দেখেছি শিক্ষক একটি সাধারণ মোবাইল ফোনের রেকর্ডার ব্যবহার করে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য পাঠের অডিও সংস্করণ তৈরি করছিলেন। এতে কোনো ব্যয় হয়নি, শুধু একটু সময় আর একটু সৃজনশীলতা লেগেছে। তাই প্রযুক্তি মানেই দামি যন্ত্র নয়; প্রযুক্তি মানে প্রক্রিয়ার সঙ্গে অভিযোজন।

কিন্তু শুধু প্রযুক্তি বা প্রশিক্ষণ দিয়ে হবে না। যেখানে শিক্ষকের শিশুদের প্রতি মমতা আছে কিন্তু আত্মবিশ্বাস নেই, সেখানে প্রয়োজন ‘মানসিকতার আমূল পরিবর্তন’। লোরম্যান লেখেন, শিক্ষককে হতে হবে বিনয়ী ও আত্মসমালোচক। তাঁকে স্বীকার করতে হবে—শিক্ষার্থী নয়, বরং আমার শেখানো ব্যর্থ হলে তবে শেখা বাধাগ্রস্ত হয়। এই বক্তৃতাটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একধরনের বিপ্লব। আমরা অভ্যস্ত এ ভাবতে যে ‘ছেলেটি অমনযোগী’, ‘মেয়েটি ধীর’, ‘ছেলেটি পিছিয়ে আছে’। কিন্তু কতবার আমরা প্রশ্ন করেছি—ক্লাসরুমটা কি এমন করে সাজানো ছিল যাতে সবাই মনোযোগী হয়? কন্টেন্টটা কি একাধিক মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছিল? মূল্যায়নটা কি প্রকাশের একাধিক পথ খোলা রেখেছিল? আমরা না করলে শিক্ষককে কেন দোষারোপ করব?

তাহলে উপায় কী? এই তিন মডেলের মিশ্রণে একটি পাইলট প্রকল্প দরকার। একটি জেলা, কিছু স্কুল, যেখানে শিক্ষকদের প্রথমে তিন মাস ধরে ইউডিএল, ডিআই ও আইপিএএর মৌলিক ধারণা দেওয়া হবে। তারপর সেই স্কুলগুলিকে বার্ষিক পরীক্ষার বাইরে একটি নমনীয় মূল্যায়নের স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। পরীক্ষার ফলাফল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হবে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, ক্লাসরুমের বৈচিত্র্যপূর্ণ উপস্থিতি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অগ্রগতি, এবং শিক্ষকের নিজস্ব লগবুক যাতে তিনি লিখবেন কোন পদ্ধতি কাজ করছে আর কোনটি করছে না। এই পাইলট যদি সফল হয়, তবে তা ধীরে ধীরে পুরো দেশের শিক্ষানীতিতে সঞ্চারিত হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় ‘সঙ্কট থেকে সনদ’ অংশটি হলো লোরম্যানের তিন মডেলকে স্বীকৃতি দেওয়া, ‘সনদ থেকে নীতি’ অংশটি হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ, আর ‘নীতি থেকে টেকসই স্বায়ত্তশাসন’ অংশটি হলো স্কুল-ভিত্তিক পরিকল্পনার স্বাধীনতা।

এই ভাবনাগুলো যখন মাথায় ঘুরছিল, হঠাৎ এক বিকেলে আমি কুমিল্লার প্রত্যন্ত এক গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে উপস্থিত হই। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকা কাকুলি বেগম। সেদিন তিনি ক্লাস নিচ্ছিলেন তৃতীয় শ্রেণির। ক্লাসের একটি বেঞ্চে বসে ছিল অটিস্টিক স্পেকট্রামের একটি শিশু রিয়াদ, যে কোনো উচ্চশব্দে কান চেপে ধরত। আরেকজন শিশু শ্রাবণী, যার ডান হাত জন্মগতভাবে অনুপস্থিত। কাকুলি বেগম লোরম্যানের নাম জানতেন না, কিন্তু তিনি ব্যবহার করছিলেন ইউডিএলের একটি স্বজ্ঞাত রূপ। তিনি অঙ্ক শেখানোর সময় সংখ্যাগুলোকে রঙিন পিচবোর্ডে কেটে এনেছিলেন, পাশাপাশি মৌখিকভাবে বলছিলেন, এবং একটি ছোট আবৃত্তির সুরে সেগুলো গাইছিলেন। রিয়াদকে তিনি মৃদুস্বরে তার প্রিয় গল্পের চরিত্র দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, আর শ্রাবণীকে দিয়েছিলেন বড় মাপের পিচবোর্ডের সংখ্যা, যেটি সে সহজে সাজাতে পারে। আমি হাঁ করে দেখছিলাম। এ যেন এক জীবন্ত আইপিএএ—শিক্ষক বিশ্বাস করছেন তিনি সবাইকে পারবেন, আর শ্রেণিকক্ষ স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্যকে জড়িয়ে নিচ্ছে। ক্লাস শেষে কাকুলি বেগমকে যখন জিজ্ঞেস করলাম তিনি কীভাবে এসব করছেন, তিনি হেসে বললেন, ‘বলি দাদা, বইয়ের কথা জানি না, কিন্তু এই বাচ্চাগুলো যখন আমাকে মা বলে ডাকে, তখন আমি বুঝি এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা গল্প আছে। সেই গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে শেখানো আমার কাজ।’ এর চেয়ে বড় কোনো তত্ত্ব হয় নাকি?

এই কাকুলি বেগমের হাত ধরেই আমরা যদি পৌঁছাতে পারি শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণী বৈঠকে, তাহলে দিন বদলাতে বেশি দেরি হবে না। কিন্তু সেটি তখনই সম্ভব, যখন লেখাপড়ার অংক শুধু পাসের হার আর জিপিএ-৫-এ সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সেখানে যুক্ত হবে বৈচিত্র্যের সূচক, যুক্ত হবে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের মান, যুক্ত হবে শিক্ষকের সৃজনশীল স্বাধীনতার পরিমাপ। লোরম্যান শেষ পর্যন্ত একটি কথাই বারবার বলেন: অন্তর্ভুক্তি কোনো আলাদা কৌশল নয়, এটি শিক্ষার দর্শন, যার প্রতিটি পরতে থাকবে শ্রদ্ধা ও সম্ভাবনা। এই দর্শনের আলোয় আমরা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে হাজির করতে পারি এক নতুন সকালে। সেই সকালে নাসরিন শিমু আর মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকবেন না, তিনি স্বস্তিতে হাসবেন কারণ তাঁর জানা থাকবে প্রতিটি শিশুর জন্য শেখার পথ স্বাভাবিক করে দেওয়া তাঁর হাতেই সম্ভব। সেই সকালে রিয়াদের মাকে আর প্রধান শিক্ষকের সামনে হাতজোড় করতে হবে না, বরং তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে—আপনার সন্তান কোন পথে সবচেয়ে বেশি শিখতে চায়? সেই সকালে মূল্যায়ন বলতে বোঝাবে কোনো প্রতিযোগিতা নয়, বরং আবিষ্কারের উৎসব। আর সেই সকালের ভিত নির্মাণ করতে আজ থেকেই আমাদের হাতে সময় আছে। বিক্রমপুরের সেই আর্দ্র সকালে যখন ভোরের শিশির ভিজিয়ে দিল বিদ্যালয়ের মাঠ, আমি দেখতে পেলাম নাসরিন শিমু শ্রেণিকক্ষে ঢুকছেন। তাঁর হাতে কোনও ডিজিটাল ডিভাইস নেই, কোনও বড় প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট নেই, কিন্তু তাঁর চোখে এক দৃঢ়তা। তিনি বসে পড়লেন, চারপাশে জড়ো হল পঞ্চাশটি ভিন্ন জগৎ। আর তিনি বললেন, ‘আজ আমরা একটি গল্প বলব, যেখানে সব চরিত্র একসঙ্গে যাবে একটি আলোর সন্ধানে।’ সেই আলোর সন্ধানই আমাদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা সংস্কার। সেটি নীতি হতে পারে, সেটি আইন হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি একটি মমতার নাম। আর সেটি যদি আমরা বাংলাদেশের ক্লাসরুমে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে বাধা পেরিয়ে অন্তর্ভুক্তির যে স্বপ্ন টিম লোরম্যান দেখিয়েছিলেন, তার চেয়েও বড় কিছু আমরা গড়ে তুলব—একটি সমাজ, যেখানে ভিন্নতা বোঝা নয়, বরং ডানা মেলার শক্তি।

সংস্করণ (version)০২

বাংলাদেশের শিক্ষায় এক নতুন ভোরের হাতছানিযেভাবে মেলানো সম্ভবশ্রেণিকক্ষের ভেতর মহাবিশ্বসবাইকে সঙ্গে নিয়ে পথচলা

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি । মুন্সীগঞ্জের ফুলতলা গ্রামের এক প্রান্তিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ভিজিয়ে দিচ্ছে স্নিগ্ধ শিশিরবিন্দু। ঠিক এই সময়েই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাসরিন শিমু কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে ভাবছেন তাঁর শ্রেণিকক্ষটি নিয়ে । পঞ্চাশজন শিক্ষার্থীর এই বিশাল ক্লাসে অন্তত সাতজন শিশুর শেখার ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন । একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী, দুজনের মনোযোগের তীব্র ঘাটতি, বাকিরা অতি দরিদ্র, দিনমজুর বা গৃহহীন পরিবারের সন্তান—যাদের অনেকের হাতে একটি ভালো খাতা পর্যন্ত নেই ।

একই চিত্র দেখা যায় মুন্সীগঞ্জের আরেকটি প্রান্তিক বিদ্যালয়েও । সেখানে দশ বছরের শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু সোহাগ মিঝি অন্য বাচ্চাদের মতো দ্রুত দৌড়াতে পারে না । শিক্ষক যখন দ্রুত বোর্ডে অঙ্ক লিখে মুছে দেন, সোহাগ মিঝি তখন শুধুই অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে । তার পাশেই বসা মুনমুন ইতি পড়তে পারে খুব ধীরে । বাড়িতে প্রতিনিয়ত তাকে ‘অক্ষমতার’ খোটা শুনতে হলেও মুনমুন ইতি ছবি এঁকে চমৎকার গল্প বলতে পারে ।

নাসরিন শিমু কিংবা সোহাগ মিঝি-মুনমুন ইতির শিক্ষকেরা হয়তো বিখ্যাত শিক্ষাবিদ টিম লোরম্যানের নাম শোনেননি । কিন্তু তাঁরা প্রতিদিন এক অলিখিত ও নিষ্ঠুর কাঠামোগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন —একই চক, একই ব্ল্যাকবোর্ড, আর একই প্রশ্নপত্র দিয়ে কীভাবে এই বহু মাত্রার বৈচিত্র্যময় জগৎকে একসূত্রে বাঁধবেন? এই প্রশ্নটি আজ কেবল দু-একটি বিদ্যালয়ের নয়, বরং বাংলাদেশের প্রায় আট লক্ষ প্রাথমিক শিক্ষকসহ সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক নীরব হাহাকার ।

একালীন সংকট: ঔপনিবেশিক ছাঁচ বনাম প্রান্তিক শিক্ষার্থীর হাহাকার

বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত ঊনবিংশ শতকের শিল্প বিপ্লবের কারখানার আদলে তৈরি একটি ঔপনিবেশিক কাঠামোকে ধারণ করে চলেছে । এই ব্যবস্থায় ধরে নেওয়া হয় সব শিক্ষার্থী একই গতিতে হাঁটবে, একইভাবে শিখবে এবং একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে তৈরি পরীক্ষায় নিজেদের প্রমাণ করবে । এর বাইরে কোনো শিশু নিজের ভিন্ন গতির কারণে বাদ পড়ে গেলেই তাকে ‘দুর্বল’, ‘অমনোযোগী’ বা ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন’ তকমা দিয়ে আলাদা করে দেওয়া হয় ।

শিক্ষাবিদ টিম লোরম্যান তাঁর ‘Pedagogy for Inclusive Education’ গ্রন্থে এই বৈষম্যকে শুধু শিক্ষাদানের সমস্যা হিসেবে দেখেননি; তিনি একে একটি গভীর মানবিক ও নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন । তাঁর মতে, তথাকথিত ‘বিশেষ শিক্ষা’ বা ‘স্পেশাল এডুকেশন’ অনেক সময় শিশুদের মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক নব্য-বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয় । অনেক সময় সাধারণ স্কুলগুলো ভিন্নধর্মী শিশুদের দায়িত্ব নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায় । অথচ অন্তর্ভুক্তি কোনো দয়া বা অতিরিক্ত সুবিধা নয়, এটি প্রতিটি শিশুর অধিকার এবং এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের।

সংকটের সমাধান: লোরম্যানের ত্রিমাত্রিক পেডাগজিক চার্টার

বাংলাদেশের চলমান শিক্ষা সংস্কারের আলোচনায় সাধারণত পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, ডিজিটাল ডিভাইস বা চাকরিমুখী দক্ষতার কথা বেশি বলা হয় । কিন্তু ক্লাসরুমটি আসলে কার জন্য তৈরি—শহরের দ্রুতগামী শিশুর জন্য, নাকি গ্রামের ধীরগতির, ভাষাগতভাবে প্রান্তিক, দরিদ্র ও ট্রমাগ্রস্ত সব শিশুর জন্য—সেই মৌলিক প্রশ্নটি উহ্যই থেকে যায় । লোরম্যানের গবেষণার আলোকে এই বৈষম্যের দেয়াল ভাঙতে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেডাগজিক মডেলকে একটি ধারাবাহিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে প্রস্তাব করা হচ্ছে:

. ইউনিভার্সাল ডিজাইন ফর লার্নিং (UDL) – নকশার শুরুতেই অন্তর্ভুক্তি: স্থাপত্যের ক্ষেত্রে যেমন একটি ভবন তৈরির সময়ই সিঁড়ির পাশাপাশি র‍্যাম্পের ব্যবস্থা রাখা হয় যাতে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীকে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকতে না হয়, শিক্ষার ক্ষেত্রেও UDL ঠিক একই কথা বলে । শিক্ষকের পাঠ পরিকল্পনা এমন হতে হবে যাতে দৃশ্য, শ্রবণ, এবং হাতে-কলমে কাজ করার বহুমাত্রিক সুযোগ থাকে ।

  • বাস্তব উদাহরণ: লৌহজংয়ের এক বিদ্যালয়ে নদীভাঙন পড়াতে গিয়ে শিক্ষক পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রামের প্রবীণদের সাক্ষাৎকার নিতে বলেন । যারা লিখতে দুর্বল, তারা অডিও রেকর্ড করে আনে; কেউ ছবি আঁকে, কেউ ভিডিও বানায় । ফলাফলস্বরূপ, ক্লাসের প্রতিটি শিশু অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে এই শিখন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় 。

. ডিফারেন্সিয়েটেড ইনস্ট্রাকশন (DI) – বৈচিত্র্যভিত্তিক শিক্ষণ: একটি বাগানে যেমন গোলাপ, জবা বা সূর্যমুখীকে বড় করতে ভিন্ন পরিমাণ আলো-ছায়ার প্রয়োজন হয়, শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও তেমনি ভিন্ন প্রস্তুতি ও গতি অনুসারে ভিন্ন সময় ও কাজের সুযোগ দিতে হবে । তবে DI ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় সতর্কতা রয়েছে । শিক্ষার্থীদের যদি স্থায়ীভাবে ‘ভালো’, ‘মাঝারি’ ও ‘দুর্বল’ দলে ভাগ করে লেবেলিং করা হয়, তবে তা শিশুর মনে স্থায়ী মানসিক ক্ষতের সৃষ্টি করে অন্তর্ভুক্তির চেতনাকে নস্যাৎ করে দেয় ।

. ইনক্লুসিভ পেডাগোজিক্যাল অ্যাপ্রোচ ইন অ্যাকশন (IPAA) – মানবিক রূপান্তর: ফ্লোরিয়ান ও স্প্রাটের তৈরি এই মডেলটি মূলত শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিচয়কে পুনর্গঠন করে । এখানে ভিন্নতাকে কোনো ঘাটতি বা সমস্যা না ভেবে মানব বিকাশের অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সুন্দর একটি অংশ মনে করা হয় । এই মডেলে শিক্ষক কোনো নিয়ন্ত্রক নন, বরং একজন মানবিক সম্পর্কের রূপকার 。

  • বাস্তব উদাহরণ: চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের এক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক বাংলা কবিতা পড়ানোর সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের নিজস্ব মাতৃভাষায় অনুভূতি প্রকাশের স্বাধীনতা দেন । এর ফলে এর আগে ক্লাসে কখনোই মুখ না খোলা লাজুক ও পিছিয়ে পড়া শিশুরাও সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশ নিতে শুরু করে ।

নীতি থেকে প্রয়োগের ক্লাসরুম: টেকসই স্বায়ত্তশাসন রূপান্তরের মানচিত্র

আমাদের দেশে ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি কিংবা ‘বাধাহীন শিক্ষা’ প্রকল্পের মতো অনেক নীতি-উদ্যোগ নেওয়া হলেও মূলত সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগ কাঠামোর অভাবে সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি । নীতিনির্ধারকদের ভাষা থেকে স্কুলের সাধারণ ভাষায় এই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন একটি জবাবদিহিতামূলক 'টেকসই স্বায়ত্তশাসন কাঠামো' ।

শিক্ষা অফিস থেকে শিক্ষকদের ওপর সরাসরি গাইডলাইন চাপিয়ে না দিয়ে বরং তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও রিসোর্স দিতে হবে । শিক্ষক যদি দেখেন তাঁর ক্লাসের সব ধরনের শিশু সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে ও শিখছে, তবে তাঁকে পুরস্কৃত করতে হবে । অর্থাৎ, 'কেন কাজ করা হবে' তার মূল দর্শনটি জাতীয় নীতি দ্বারা নির্ধারিত থাকবে, কিন্তু 'কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে' তার স্বায়ত্তশাসন থাকবে সম্পূর্ণ স্কুলের হাতে ।

তবে এই রূপান্তরের পথে অন্যতম বড় অন্তরায় আমাদের সনাতনী কেন্দ্রীয় ও পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা । উত্তরপত্রে যতক্ষণ পর্যন্ত কেবল একটি নির্দিষ্ট মুখস্থ উত্তরকে সোনা দিয়ে বাঁধাই করা নম্বর দেওয়া হবে, শিক্ষকেরা ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন কোনো সৃজনশীল পরীক্ষা বা অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজির ঝুঁকি নিতে চাইবেন না । মূল্যায়নকে রূপান্তর করতে হবে এক প্রতিযোগিতার নির্মম মঞ্চ থেকে শিশুর আত্ম-আবিষ্কারের উৎসবে。

এক নতুন ভোরের প্রত্যাশা

আমাদের শিক্ষকেরা আজ অতিরিক্ত কাজের চাপ, বড় ক্লাসরুম, কম বেতন এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতায় জর্জরিত 。 তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা সংস্কারের সফলতার জন্য সবার আগে শিক্ষকদের জন্য এক ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের অংশ হওয়া উচিত ।

বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে সত্যিই একটি টেকসই, জ্ঞানভিত্তিক ও বৈষম্যহীন ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র হতে চায়, তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাকে শিক্ষা খাতের কোনো প্রান্তিক আলোচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই । বরিশালের নদীভাঙন কবলিত এলাকায় জোয়ার-ভাটায় ভাসা যে শিশুটি নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না, তাকে ‘অমনোযোগী’ না বলে তার জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষার সময় ও মাধ্যমকে নমনীয় করতে হবে ।

একটি সমাজ বা রাষ্ট্র কতটা সভ্য ও উন্নত, তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সে তার সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক নাগরিকের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে । যেদিন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল, উপকূলীয় ঝড়বিধ্বস্ত স্কুল কিংবা শহুরে করপোরেট ক্লাসরুমের শিক্ষকেরা এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে ক্লাসে ঢুকবেন যে—প্রতিটি শিশুরই ডানা মেলার শক্তি আছে এবং প্রতিটি শিশুরই শেখার পথ আলাদা হতে পারে; সেদিনই সার্থকতা পাবে প্রকৃত শিক্ষা সংস্কার。 সেই নতুন সকালে সোহাগ মিঝি আর বোর্ডের দিকে অসহায় তাকাবে না, নাসরিন শিমু স্বস্তির হাসি হাসবেন, আর কোনো শিশু নিজেকে একা ভাববে না।

সংস্করণ (version)০৩

যে শ্রেণিকক্ষে কেউ একা থাকে না অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার নতুন দর্শন কীভাবে বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের শিক্ষা সংকট, বৈষম্য, মুখস্থনির্ভরতা ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের বর্জনের বাস্তবতার ভেতর দাঁড়িয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো—UDL, DI ও IPAA—কীভাবে নতুন শিক্ষা সংস্কারের পথ দেখাতে পারে, সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে একটি সাহিত্যধর্মী বিশ্লেষণাত্মক ফিচার।

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি নেমে আসেনি। কুয়াশার পাতলা স্তর ভেদ করে উত্তরবঙ্গের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে কয়েকজন শিশু দৌড়াচ্ছে। কারও পায়ে জুতো নেই, কেউ বইয়ের ব্যাগের বদলে পলিথিনে খাতা বয়ে এনেছে। স্কুলঘরের এক কোণে বসে আছে দশ বছরের সোহাগ মিঝি। অন্য বাচ্চাদের মতো সে দৌড়াতে পারে না। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে হাঁটতে তার কষ্ট হয়। ক্লাস শুরু হলে শিক্ষক বোর্ডে অঙ্ক লিখবেন, দ্রুত লিখবেন, তারপর বলবেন, “যারা পারবে না, তারা বাড়িতে গিয়ে আরও প্র্যাকটিস করবে।” সোহাগ মিঝি তখন বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকবে, কারণ সে দ্রুত খাতায় লিখে নিতে পারে না। তার পাশে বসা আরেকটি মেয়ে, মুনমুন ইতি, পড়তে পারে খুব ধীরে। বাড়িতে তাকে প্রায়ই শুনতে হয়, “তোর মাথায় সমস্যা আছে।” অথচ মুনমুন ইতি ছবি এঁকে গল্প বলতে পারে অসাধারণ দক্ষতায়।

বাংলাদেশের অসংখ্য শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন এমন অদৃশ্য নিঃসঙ্গতা জন্ম নেয়। কেউ বাদ পড়ে যায় গতির কারণে, কেউ ভাষার কারণে, কেউ দারিদ্র্যের কারণে, কেউ প্রতিবন্ধকতার কারণে, আবার কেউ শুধু “ভিন্ন” হওয়ার কারণে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় একটি সরু সেতুর মতো, যেখানে ধরে নেওয়া হয় সব শিক্ষার্থী একই গতিতে হাঁটবে, একইভাবে শিখবে, একইভাবে উত্তর দেবে, একই ধরনের পরীক্ষায় নিজেদের প্রমাণ করবে। যে শিশু এই কাঠামোর বাইরে পড়ে যায়, তাকে আমরা প্রায়ই “দুর্বল”, “অমনোযোগী”, “বিশেষ”, “অক্ষম” কিংবা “অন্যরকম” বলে আলাদা করে দিই।

এই আলাদা করে দেওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক শিক্ষা কাঠামো মূলত তৈরি হয়েছিল নির্বাচনের জন্য, অন্তর্ভুক্তির জন্য নয়। সেখানে একটি নির্দিষ্ট ধরনের শিক্ষার্থীকে সফল হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল—যে নির্দিষ্ট ভাষায় দক্ষ, নির্দিষ্ট ধরনের পরীক্ষায় ভালো, নির্দিষ্ট সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই। স্বাধীনতার পর বহু নীতি পরিবর্তিত হলেও শ্রেণিকক্ষের ভেতরের ক্ষমতার কাঠামো খুব বেশি বদলায়নি। আজও বাংলাদেশের বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষক মানে বক্তা, শিক্ষার্থী মানে নীরব শ্রোতা। শেখা মানে তথ্য মুখস্থ করা। ব্যর্থতা মানে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা।

কিন্তু পৃথিবী বদলেছে। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈচিত্র্যের ধারণা শিক্ষা সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষা কি শুধু মেধাবীদের জন্য? একই শ্রেণিকক্ষে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সক্ষমতা, ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য কি একই পদ্ধতি ন্যায্য হতে পারে? যদি একটি শিশু শেখার সুযোগ না পায়, তাহলে ব্যর্থ কে—শিশু, নাকি সেই শিক্ষা কাঠামো?

Tim Loreman তাঁর “Pedagogy for Inclusive Education” গ্রন্থে এই প্রশ্নগুলোকে শুধু শিক্ষাবিদ্যার প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি; তিনি এগুলোকে মানবিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কোনো দয়া নয়, কোনো অতিরিক্ত সুবিধাও নয়। এটি এমন এক নৈতিক অবস্থান, যেখানে বলা হয় প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের পরিবেশে শেখার অধিকার রাখে, এবং সেই পরিবেশকে উপযোগী করে তোলার দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার নিয়ে যত আলোচনা হয়, সেখানে সাধারণত পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা, প্রযুক্তি বা চাকরিমুখী দক্ষতার কথা বলা হয়। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই আলোচনায় আসে সেই মৌলিক প্রশ্নটি—শ্রেণিকক্ষ আসলে কার জন্য তৈরি? শহরের ইংরেজি মাধ্যমের দ্রুতগামী শিশুদের জন্য, নাকি গ্রামের ধীরগতির, ভাষাগতভাবে প্রান্তিক, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র, ট্রমাগ্রস্ত সব শিশুর জন্যও?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে। একসময় পৃথিবীর বহু দেশে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের আলাদা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হতো। তাদের জন্য আলাদা শিক্ষক, আলাদা পাঠ্যক্রম, আলাদা ভবন। যুক্তি ছিল, এতে তারা “বিশেষ যত্ন” পাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেখা গেল, এই পৃথকীকরণ তাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। আলাদা শিক্ষা শেষ পর্যন্ত আলাদা নাগরিকত্ব তৈরি করছে। সমাজের মূলধারায় অংশগ্রহণের বদলে তারা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশেও এখনো সেই বিচ্ছিন্নতার ছায়া আছে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে সাধারণ স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে শুনেন, “আমাদের এখানে এই ধরনের বাচ্চাকে সামলানো সম্ভব না।” কোনো কোনো শিক্ষক সরাসরি না বললেও আচরণে বুঝিয়ে দেন যে শ্রেণিকক্ষে একজন ভিন্ন শিক্ষার্থী মানে অতিরিক্ত ঝামেলা। ফলে পরিবারগুলো ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়। শিশুরাও বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারা আসলেই অন্যদের মতো নয়।

Loreman এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, অন্তর্ভুক্তি শুধু আলাদা শিশুদের মূলধারায় এনে বসিয়ে দেওয়ার নাম নয়। যদি শ্রেণিকক্ষের ভেতরের সংস্কৃতি, মূল্যায়ন, শেখানোর ধরন, ক্ষমতার সম্পর্ক একই থাকে, তাহলে অন্তর্ভুক্তির নামে নতুন ধরনের বর্জন তৈরি হবে। অর্থাৎ শিশুটি একই ঘরে বসে থাকবে, কিন্তু শেখার ভেতর থাকবে না।

এই সংকট বোঝার জন্য তিনি Critical Discourse Analysis-এর ধারণা সামনে আনেন। তিনি জানতে চান, আমরা যেসব শিক্ষাপদ্ধতিকে “স্বাভাবিক” বলে ধরে নিই, সেগুলো কাদের জন্য তৈরি? কারা সেখানে দৃশ্যমান, আর কারা অদৃশ্য? কেন একটি শিশুর নীরবতা “দুর্বলতা” হিসেবে বিবেচিত হয়, কিন্তু অন্য শিশুর উচ্চস্বরে উত্তর দেওয়া “মেধা” হিসেবে গণ্য হয়? কেন পরীক্ষার খাতায় দ্রুত লিখতে পারাকে বুদ্ধিমত্তার মানদণ্ড ধরা হয়?

বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতায় এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের স্কুলগুলোতে এখনো একই বই, একই গতি, একই পরীক্ষা, একই প্রত্যাশা দিয়ে লক্ষ লক্ষ শিশুকে বিচার করা হয়। একজন শিক্ষককে চল্লিশ, পঞ্চাশ, কখনো আশি শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়িয়ে পাঠদান করতে হয়। সেখানে ভিন্নতার জন্য জায়গা তৈরি করা যেন অসম্ভব এক স্বপ্ন। কিন্তু আসল সংকট হয়তো সম্পদের অভাব নয়; সংকট হলো শিক্ষাকে আমরা কীভাবে কল্পনা করি।

ঢাকার একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক নাসরিন আক্তার এক আলোচনায় বলছিলেন, “আমি আগে ভাবতাম দুর্বল ছাত্র মানে যার মাথা কম কাজ করে। পরে বুঝলাম, আমি যেভাবে পড়াই, সবাই সেভাবে শিখতে পারে না।” তাঁর ক্লাসে এক শিশু ছিল, যে লিখতে খুব ধীর, কিন্তু মৌখিকভাবে চমৎকার ব্যাখ্যা দিতে পারে। আগে সে পরীক্ষায় ফেল করত। পরে শিক্ষক তাকে দলীয় আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেন। ধীরে ধীরে ছেলেটির আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে আছে পেডাগজি, অর্থাৎ শেখানোর দর্শন। Loreman-এর আলোচনায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো উঠে আসে—Universal Design for Learning বা UDL, Differentiated Instruction বা DI, এবং Inclusive Pedagogical Approach in Action বা IPAA। এই তিনটি কাঠামোকে আলাদা তত্ত্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এগুলোকে একটি দীর্ঘ যাত্রার তিনটি ধাপ হিসেবে দেখা যায়। প্রথম ধাপ সংকট চিহ্নিত করে, দ্বিতীয় ধাপ নীতির খসড়া তৈরি করে, তৃতীয় ধাপ মানবিক ও টেকসই শিক্ষার নতুন সামাজিক চুক্তির দিকে এগিয়ে যায়।

UDL-এর ধারণাটি শুরু হয় স্থাপত্যের জগৎ থেকে। যেমন একটি ভবনের প্রবেশপথ যদি শুধু সিঁড়িনির্ভর হয়, তাহলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ শুরুতেই বাদ পড়ে যায়। পরে আলাদা র‌্যাম্প যোগ করলে সেটি সমাধান হলেও মূল নকশা ছিল বর্জনমূলক। কিন্তু যদি শুরু থেকেই এমন নকশা করা হয় যেখানে সবার প্রবেশ সম্ভব, তাহলে কাউকে আলাদা করে “বিশেষ সুবিধা” দিতে হয় না। শিক্ষা ক্ষেত্রেও UDL একই কথা বলে। পাঠ পরিকল্পনার শুরু থেকেই শিক্ষককে ধরে নিতে হবে যে শ্রেণিকক্ষে ভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থী থাকবে। কেউ দৃশ্য দেখে ভালো শেখে, কেউ শুনে, কেউ হাতে-কলমে কাজ করে, কেউ গল্পের মাধ্যমে বোঝে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষে এখনো শেখানো হয় একমুখী পদ্ধতিতে। শিক্ষক বোর্ডে লিখবেন, শিক্ষার্থীরা খাতায় নেবে, তারপর পরীক্ষায় পুনরাবৃত্তি করবে। কিন্তু UDL বলছে, শেখানোর বহু পথ থাকতে হবে। একটি ইতিহাসের পাঠ শুধু বই পড়ে নয়, নাটক, মানচিত্র, অডিও গল্প, স্থানীয় স্মৃতিচারণ, ছবি কিংবা ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমেও শেখানো যেতে পারে। একটি বিজ্ঞান ক্লাসে শুধু সূত্র মুখস্থ নয়, বাস্তব পর্যবেক্ষণ, দলীয় পরীক্ষা, ভিডিও সিমুলেশন বা স্থানীয় উদাহরণ ব্যবহার করা যেতে পারে।

কুমিল্লার এক বিদ্যালয়ে এক শিক্ষক নদীভাঙন নিয়ে ভূগোল পড়াতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সাক্ষাৎকার নিতে বলেন। যারা লিখতে দুর্বল, তারা মোবাইলে অডিও রেকর্ড করে। কেউ ছবি আঁকে, কেউ ছোট ভিডিও বানায়। ফলাফল হলো, প্রথমবারের মতো ক্লাসের প্রায় সব শিশু আলোচনায় অংশ নেয়। এই দৃশ্য UDL-এর মূল চেতনাকে ধারণ করে। শেখা তখন শুধু তথ্য গ্রহণ নয়; অংশগ্রহণ, অভিজ্ঞতা ও প্রকাশের বহুমাত্রিক ক্ষেত্র।

তবে UDL কোনো জাদুর কাঠি নয়। Loreman নিজেই মনে করিয়ে দেন যে এই মডেল নিয়ে এখনো বৃহৎ পরিসরে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। বিশেষ করে দরিদ্র ও সীমিত সম্পদের দেশে এটি কীভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেখানে বহু স্কুলে এখনো পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই, সেখানে ডিজিটাল বৈচিত্র্যময় শিক্ষা কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু UDL-এর সবচেয়ে বড় শক্তি প্রযুক্তি নয়; তার শক্তি দৃষ্টিভঙ্গিতে। এটি শিক্ষককে শেখায়, বৈচিত্র্য কোনো ব্যতিক্রম নয়, সেটিই বাস্তবতা।

DI বা Differentiated Instruction এই আলোচনাকে আরও বাস্তব পর্যায়ে নিয়ে আসে। এটি স্বীকার করে যে সব শিক্ষার্থী একই প্রস্তুতি, আগ্রহ বা গতিতে শেখে না। তাই একই শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন ধরনের কাজ, সময় ও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বহু শিক্ষক অজান্তেই DI-এর কিছু চর্চা করেন। কেউ দুর্বল শিক্ষার্থীকে বাড়তি সময় দেন, কেউ দলীয় কাজের মাধ্যমে শেখান, কেউ ছবি এঁকে বোঝাতে বলেন। কিন্তু সমস্যাও এখানেই। যখন শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা দলে ভাগ করা হয়, তখন অনেক সময় “ভালো”, “মাঝারি” ও “দুর্বল” পরিচয় স্থায়ী হয়ে যায়।

রাজশাহীর এক স্কুলে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী বলছিল, “ম্যাডাম আমাদের তিনটা দলে ভাগ করেন। আমি সবসময় শেষ দলে থাকি। মনে হয় আমি খারাপ।” এই অনুভূতিই DI-এর সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা। ভালো উদ্দেশ্য থেকেও কখনো কখনো শ্রেণিবিন্যাস নতুন মানসিক দেয়াল তৈরি করে। Florian-এর ভাষায়, যদি আমরা শুরুতেই শিক্ষার্থীকে শ্রেণিবদ্ধ করি, তাহলে অন্তর্ভুক্তির বদলে নতুন লেবেল তৈরি হয়।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের বড় সংকট এখানেই। আমরা প্রায়ই শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনার বদলে ঘাটতির ভিত্তিতে দেখি। যে শিশু দ্রুত লিখতে পারে না, তাকে “দুর্বল” বলা হয়। যে শিশু চুপচাপ থাকে, তাকে “কম মেধাবী” ভাবা হয়। যে শিশু অটিজম স্পেকট্রামে আছে, তাকে “সমস্যা” হিসেবে দেখা হয়। অথচ অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজি বলছে, সমস্যা শিশুর মধ্যে নয়; সমস্যা সেই কাঠামোয়, যা শুধু একটি ধরনের শেখাকে মূল্য দেয়।

IPAA বা Inclusive Pedagogical Approach in Action এই জায়গা থেকেই নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। Florian ও Spratt-এর এই ধারণা মূলত শিক্ষকের পরিচয়কে পুনর্গঠন করে। এখানে শিক্ষক আর শুধু পাঠদানকারী নন; তিনি এমন একজন নকশাকার, যিনি শ্রেণিকক্ষকে মানবিক সম্পর্কের জায়গায় রূপ দেন। IPAA বলে, ভিন্নতা মানব বিকাশের স্বাভাবিক অংশ। তাই কাউকে “স্বাভাবিক” আর কাউকে “বিশেষ” ধরে শিক্ষা পরিকল্পনা করা যাবে না।

চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের একটি বিদ্যালয়ে এক শিক্ষক তাঁর ক্লাসে বাংলা কবিতা পড়ানোর সময় শিশুদের নিজস্ব ভাষায় অনুভূতি প্রকাশ করতে বলেন। কেউ চাকমা ভাষায়, কেউ মারমা ভাষায়, কেউ বাংলায় কথা বলে। প্রথমে বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকরা এটিকে বিশৃঙ্খলা ভেবেছিলেন। পরে দেখা গেল, যেসব শিশু আগে কথা বলত না, তারাই আলোচনায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। IPAA-এর মূল দর্শন এখানেই। শেখা তখন নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; সম্পর্ক, সম্মান ও অংশগ্রহণের বিষয়।

বাংলাদেশে শিক্ষার সবচেয়ে বড় অদৃশ্য সংকট হলো ভয়। পরীক্ষার ভয়, ব্যর্থতার ভয়, অপমানের ভয়। একটি শিশু যদি ভুল উত্তর দেয়, পুরো ক্লাসের সামনে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। যদি ধীরে পড়ে, তাকে “বোকার হদ্দ” বলা হয়। এই সংস্কৃতি শুধু শেখাকে নয়, আত্মপরিচয়কেও ধ্বংস করে। অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজি সেই ভয়ভিত্তিক শ্রেণিকক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এটি বলে, শেখা তখনই সম্ভব যখন শিক্ষার্থী নিরাপদ বোধ করে।

Loreman-এর আলোচনায় প্রযুক্তিও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু প্রযুক্তিকে তিনি কখনো যন্ত্রগত সমাধান হিসেবে দেখেন না। বাংলাদেশের শহুরে শিক্ষানীতিতে প্রযুক্তিকে প্রায়ই স্মার্ট বোর্ড, ট্যাব বা ডিজিটাল কনটেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। অথচ অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তির অর্থ অনেক বিস্তৃত। একটি মোবাইল ফোনে অডিও লেকচার রেকর্ড করা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য স্ক্রিন রিডার ব্যবহার, শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য সাবটাইটেল, কিংবা গ্রামের শিশুর জন্য অফলাইন কনটেন্ট—সবই অন্তর্ভুক্তির অংশ।

ময়মনসিংহের এক কলেজছাত্রী, যার দৃষ্টিশক্তি সীমিত, বলছিলেন, “আগে ভাবতাম আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারব না। পরে মোবাইলের টেক্সট-টু-স্পিচ ব্যবহার করে পড়াশোনা শুরু করি।” প্রযুক্তি এখানে বিলাসিতা নয়; এটি সমান অংশগ্রহণের সেতু।

কিন্তু শুধু প্রযুক্তি দিলেই অন্তর্ভুক্তি আসে না। বাংলাদেশের বহু স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব তালাবদ্ধ থাকে, কারণ শিক্ষক প্রশিক্ষণ নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নতুন বৈষম্যও তৈরি করে। শহরের শিশু অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারে, গ্রামের শিশু পারে না। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা সংস্কারের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

এই জায়গায় এসে তিনটি কাঠামো যেন একটি দীর্ঘ নদীর তিনটি বাঁকের মতো মিলিত হয়। UDL আমাদের শেখায়, নকশার শুরুতেই বৈচিত্র্যকে কল্পনা করতে হবে। DI আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার্থীদের শেখার বাস্তব পার্থক্যকে অবহেলা করা যাবে না। আর IPAA আমাদের নিয়ে যায় আরও গভীরে, যেখানে ভিন্নতাকে আর সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না; বরং সেটিকে মানবিক সহাবস্থানের স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই মানবিক হতে চায়, তাহলে এই তিনটি কাঠামোকে আলাদা প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি ধারাবাহিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে ভাবতে হবে। প্রথমে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে বর্তমান শিক্ষা কাঠামো বহু শিশুকে অদৃশ্য করে রাখছে। এরপর প্রয়োজন এমন নীতি, যা পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্গঠন করবে। এবং শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন এমন এক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, যেখানে বিদ্যালয়কে শুধু ফলাফলের কারখানা নয়, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের অনুশীলনক্ষেত্র হিসেবে দেখা হবে।

আজ বাংলাদেশের বহু অভিভাবক সন্তানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। কেউ কোচিংয়ের দৌড়ে ক্লান্ত, কেউ সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভীত, কেউ প্রতিবন্ধী সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত। শিক্ষা যেন ক্রমেই প্রতিযোগিতার নির্মম যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা হারিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজি এই সংকটের ভেতর একটি বিকল্প কল্পনা হাজির করে।

ভাবা যাক, একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক পাঠ শুরু করছেন এই প্রশ্ন দিয়ে, “তোমরা কে কীভাবে শিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো?” একজন শিক্ষার্থী বলছে, সে গল্প শুনে শেখে। আরেকজন বলছে, ছবি এঁকে। কেউ দলীয় আলোচনায়, কেউ হাতে-কলমে কাজ করে। শিক্ষক তখন বোঝেন, শিক্ষা মানে সবাইকে একই ছাঁচে ঢোকানো নয়; বরং বিভিন্ন পথকে সম্মান করা।

এমন একটি শ্রেণিকক্ষে হয়তো পরীক্ষাও বদলে যাবে। শুধু লিখিত উত্তর নয়, মৌখিক উপস্থাপনা, প্রকল্প, স্থানীয় গবেষণা, শিল্পকর্ম, ডিজিটাল গল্প বলা—সবই শেখার বৈধ প্রকাশভঙ্গি হবে। সেখানে ব্যর্থতা আর লজ্জা নয়; শেখার অংশ। শিক্ষক আর ক্ষমতার একমাত্র উৎস নন; তিনি সহযাত্রী।

এই রূপান্তর অবশ্যই সহজ নয়। বাংলাদেশের শিক্ষকরা ইতিমধ্যে অতিরিক্ত কাজের চাপে ক্লান্ত। কম বেতন, রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক জটিলতা, বড় ক্লাসরুম—সব মিলিয়ে তারা প্রায়ই অবসন্ন। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা সংস্কার শুধু শিক্ষার্থীর জন্য নয়; শিক্ষকদের জন্যও ন্যায্য কর্মপরিবেশ দাবি করে। যদি একজন শিক্ষককে দিনে সাতটি ক্লাস নিতে হয়, শত শত খাতা দেখতে হয়, তাহলে তিনি কীভাবে প্রতিটি শিশুর ভিন্নতা বোঝার সময় পাবেন?

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা তাই শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের প্রশ্ন। শুধু পাঠ্যপুস্তকে “সবার জন্য শিক্ষা” লিখে দিলে হবে না। দরকার বাজেট, প্রশিক্ষণ, স্থানীয় গবেষণা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, প্রযুক্তির ন্যায্য প্রবেশাধিকার এবং সবচেয়ে বেশি দরকার সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।

বাংলাদেশে এখনো প্রতিবন্ধিতা নিয়ে অসংখ্য কুসংস্কার আছে। অনেক পরিবার সন্তানকে লুকিয়ে রাখে। অনেক শিশু স্কুলেই যায় না। আবার জাতিগত সংখ্যালঘু, চরাঞ্চলের শিশু, পথশিশু, শ্রমজীবী শিশু কিংবা জলবায়ু উদ্বাস্তু শিশুরাও শিক্ষা কাঠামোর প্রান্তে পড়ে থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা সংস্কার তখনই সত্যিকারের সংস্কার হবে, যখন সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা শিশুটির চোখ দিয়ে আমরা পুরো ব্যবস্থাকে দেখতে শিখব।

একটি কল্পিত দৃশ্য কল্পনা করা যাক। বরিশালের নদীভাঙন এলাকার একটি স্কুল। বর্ষায় স্কুলঘর ডুবে যায়। শিশুরা অনিয়মিতভাবে আসে। তাদের মধ্যে একজন, নাহিদ, প্রায়ই স্কুল মিস করে কারণ তাকে বাবার সঙ্গে নৌকায় কাজ করতে হয়। পুরোনো শিক্ষা কাঠামো তাকে “অমনোযোগী” বলত। কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজি প্রশ্ন করবে, নাহিদের বাস্তবতাকে বিবেচনায় না রেখে তৈরি করা শিক্ষাব্যবস্থা কতটা ন্যায্য? তখন হয়তো স্কুলে নমনীয় সময়সূচি আসবে, স্থানীয় অভিজ্ঞতাভিত্তিক পাঠ আসবে, প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প শেখার সুযোগ আসবে। অর্থাৎ শিক্ষা শিশুর জীবনের দিকে এগিয়ে যাবে, শিশুকে জোর করে কাঠামোর ভেতরে ঠেলে দেবে না।

এখানেই অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা শুধু শিক্ষাবিদ্যার ধারণা থাকে না; এটি গণতন্ত্রের অনুশীলন হয়ে ওঠে। কারণ একটি সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, সেটিই তার নৈতিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাংলাদেশের শিক্ষা নীতিতে এখন অনেক পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। নতুন কারিকুলাম নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক মেরুকরণও প্রবল। কিন্তু এই উত্তপ্ত বিতর্কের ভেতর একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই হারিয়ে যায়—আমরা কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই? শুধু পরীক্ষায় সফল মানুষ, নাকি সহমর্মী, বৈচিত্র্য-সম্মানকারী, সহযোগিতামূলক নাগরিক?

Loreman-এর আলোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এখানেই। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাকে আলাদা কোনো “বিশেষ শিক্ষা”র অধ্যায় বানান না। বরং তিনি দেখান, ভালো শিক্ষা মানেই অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা। formative assessment, collaboration, constructivism, বহু মাধ্যমে শেখানো, আত্মসমালোচনামূলক শিক্ষকতা—এসব আসলে সবার জন্যই ভালো শিক্ষা। অর্থাৎ অন্তর্ভুক্তি শুধু প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য নয়; এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে মানবিক করার পথ।

একজন শিক্ষক যখন বলেন, “সমস্যা শিক্ষার্থীর না, হয়তো আমার শেখানোর পদ্ধতির,” তখন শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে এক নীরব বিপ্লব শুরু হয়। কারণ সেই মুহূর্তে দায় স্থানান্তরিত হয়। শিশুকে আর ব্যর্থতার একমাত্র বাহক ভাবা হয় না। বরং শেখার পরিবেশ, পদ্ধতি ও কাঠামোকে প্রশ্ন করা শুরু হয়।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা প্রায়ই অর্থনীতি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি বা বৈদেশিক বিনিয়োগের কথা বলি। কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার শ্রেণিকক্ষগুলো কেমন তার ওপর। যদি শ্রেণিকক্ষ বৈষম্য শেখায়, তাহলে সমাজও বৈষম্যমূলক হবে। যদি শ্রেণিকক্ষ অপমান শেখায়, তাহলে নাগরিক জীবনেও অসহিষ্ণুতা বাড়বে। আর যদি শ্রেণিকক্ষ সহযোগিতা, সম্মান ও বৈচিত্র্যের মূল্য শেখায়, তাহলে সেই সমাজ আরও গণতান্ত্রিক ও মানবিক হয়ে উঠবে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এই যে, এটি আমাদের ভিন্নতাকে ভয় না পেতে শেখায়। একটি শিশুর ধীরগতি, আরেকজনের অতিরিক্ত কৌতূহল, কারও ভাষাগত বৈচিত্র্য, কারও শারীরিক সীমাবদ্ধতা, কারও সৃজনশীল প্রকাশ—এসবকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শেখায়।

ঢাকার ব্যস্ত নগরীর কোনো স্কুলে কিংবা কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত চরে, পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট্ট বিদ্যালয়ে কিংবা উপকূলের ঝড়বিধ্বস্ত স্কুলঘরে, যদি একদিন শিক্ষকরা এই বিশ্বাস নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করেন যে প্রতিটি শিশু শেখতে সক্ষম, তাহলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে এক নতুন ভোর শুরু হতে পারে।

হয়তো সেই ভোরে সোহাগ মিঝি আর বোর্ডের দিকে অসহায় তাকিয়ে থাকবে না। মুনমুন ইতির ধীরপাঠ আর ব্যর্থতার প্রতীক হবে না। পাহাড়ি শিশুর মাতৃভাষা আর লজ্জার কারণ হবে না। কোনো শিক্ষক আর বলবেন না, “এই ধরনের বাচ্চাকে সামলানো কঠিন।” বরং বলা হবে, “শ্রেণিকক্ষটিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে সবাই শিখতে পারে।”

সেখানেই অন্তর্ভুক্তিমূলক পেডাগজির প্রকৃত শক্তি। এটি শুধু শিক্ষার পদ্ধতি বদলাতে চায় না; এটি মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে চায়। সংকট থেকে সনদ, সনদ থেকে নীতি, নীতি থেকে টেকসই মানবিক কাঠামোর দিকে এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষা তখনই সত্যিকার শিক্ষা, যখন সেখানে কেউ অদৃশ্য থাকে না।

বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র হতে চায়, তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা আর প্রান্তিক কোনো আলোচনা থাকতে পারে না। এটি হতে হবে জাতীয় পুনর্গঠনের কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার। কারণ প্রতিটি শিশুর জন্য শেখার জায়গা তৈরি করা মানে শুধু একটি বিদ্যালয় সংস্কার করা নয়; বরং একটি সমাজকে আরও ন্যায়সঙ্গত করে তোলা।

আর সেই সমাজের শুরু হতে পারে খুব ছোট একটি দৃশ্য থেকে—একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ধীরে হেঁটে এসে বলছেন, “তোমাদের প্রত্যেকের শেখার পথ আলাদা হতে পারে। কিন্তু এই ঘরে সবার জন্য জায়গা আছে।”

অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

হ্যাশট্যাগ: #InclusiveEducation #BangladeshEducation #EducationReform #TimLoreman #UDL #InclusivePedagogy #DI #IPAA #শিক্ষাসংস্কার #অন্তর্ভুক্তিমূলকশিক্ষা #বাংলাদেশেরশিক্ষা #শ্রেণিকক্ষেরভেতরমহাবিশ্ব #সবাইরজন্যশিক্ষা #DisabilityInclusion #EducationForAll

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: