odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 29th May 2026, ২৯th May ২০২৬
যে শিশুকে আমরা ‘বদমেজাজি’ বলি, সে হয়তো প্রতিদিন নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরির সঙ্গে যুদ্ধ করছে—IED-এর বিস্ফোরণে ভাঙছে শুধু ঘর নয়, নীরবে ভেঙে যাচ্ছে একেকটি শিশুমন।

প্রতিটি বিস্ফোরণের আড়ালে একটি বেদনা—শিশুর ‘ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার’ যখন নীরব যন্ত্রণায় রূপ নেয়, কিন্তু লোহান বললেও শশী যে বুঝতেই চায় না!

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ২৯ May ২০২৬ ০০:২৫

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ২৯ May ২০২৬ ০০:২৫

অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য

বাংলাদেশের পরিবার, স্কুল ও সমাজে বহু শিশুকে ‘দুষ্ট’, ‘অসভ্য’ বা ‘বখে যাওয়া’ বলে চিহ্নিত করা হয়, অথচ তাদের আচরণের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়াবহ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা—Intermittent Explosive Disorder (IED)। এই গভীর অনুসন্ধানধর্মী ফিচারটিতে উঠে এসেছে শিশুদের বিস্ফোরক রাগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণের সংকট, পারিবারিক ট্রমা, মস্তিষ্কের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক বাস্তবতা, চিকিৎসা, থেরাপি এবং সমাজের ভুল বোঝাবুঝির নির্মম চিত্র। রাহুল, তানিয়া, ফারদিন কিংবা সাদিয়ার গল্পের মধ্য দিয়ে পাঠক জানতে পারবেন—প্রতিটি বিস্ফোরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নীরব কান্না, যা শাস্তি নয়; চায় বোঝাপড়া, সহানুভূতি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। এই ফিচার অভিভাবক, শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এক জরুরি সতর্কবার্তা।

শহরের ব্যস্ততম সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছে রাহুল। বয়স মাত্র নয় বছর। হাতে একটি পুরনো টিফিন বাক্স। হঠাৎ করেই সে টিফিন বাক্সটি জোরে মাটিতে ছুঁড়ে মারল। পথচারীরা ভয় পেয়ে গেল। কেউ বলল, “ছেলেটা বদমেজাজি।” কেউ বলল, “বাবা-মা শেখায়নি।” কিন্তু কেউ কি জানত, এই ক্ষণিকের বিস্ফোরণের পেছনে রয়েছে এক অসহায় শিশুর মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা? রাহুলের মতো হাজারো শিশু প্রতিদিন ফেটে পড়ছে, ভাঙছে, চিৎকার করছে—তবু তাদের কান্না বোঝার মানুষ নেই। আজকের ফিচারটি লিখেছি ‘ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার’ (আইইডি) নিয়ে—যে রোগ শিশুকে মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র করে তুললেও, আসলে সে নিজেই তার আবেগের বন্দি।

পর্ব : বিস্ফোরণের কালো ছবি

সপ্তম শ্রেণির তানিয়া। ক্লাসের সেরা ছাত্রী। কিন্তু গত সপ্তাহে একটু দেরি করে বাসায় ফেরায় মা বকা দিয়েছিলেন। তানিয়া চুপ করে শুনছিল—তারপর হঠাৎ যেন ট্রিগার পুশ করল কেউ। চোখ লাল, শ্বাস ভারী। সে টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল, চশমা, এমনকি দামি ল্যাপটপ ছুড়ে ভাঙল। বাবার বুকে কিল মারল। তারপর ক্লান্ত হয়ে ফ্লোরে পড়ে গিয়ে কাঁদতে লাগল। কান্নার সময় সে বারবার বলল, “আমি চাইনি… আমার ওপর যেন পিশাচ চেপে বসে।”

এটাই আইইডি। বয়স ৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের ডায়াগনস্টিক ম্যানুয়াল (ডিএসএম-৫) অনুযায়ী, এটি একধরনের ইম্পালস কন্ট্রোল ডিসঅর্ডার। আক্রান্ত শিশু ক্ষুদ্র উস্কানিতেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ রাগ দেখায়। কিন্তু এটা সাধারণ রাগ নয়; বরং তা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো—আকস্মিক, ধ্বংসাত্মক এবং অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়। এর পরপরই শিশুটি অনুশোচনা ও লজ্জায় ভোগে।

পর্ব : বাস্তব উদাহরণরাহুলের গল্প

রাহুলের যখন তিন বছর বয়স, তখন তার বাবা-মা আলাদা হয়ে যান। মা একা সংসার চালান। রাহুল বড় হয় নিঃসঙ্গ। স্কুলে যদি কেউ তার পেন্সিল নেয়, সে সেটা নিয়ে লড়াই না করে বরং দশটা কলম ভেঙে ফেলে। শিক্ষকরা ভাবতেন ছেলেটি ‘দুষ্টু’। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, রাহুলের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স—যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে—স্বাভাবিকের চেয়ে দুর্বল। চিকিৎসক ডা. ফারহান আহমেদ বলেন, “আইইডি আক্রান্ত শিশুদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা অস্বাভাবিক থাকে। তারা ‘একটু চিন্তা করে কাজ করা’ শব্দটি জানে না। কারণ ‘থামো’ সিগন্যাল তাদের নিউরনে পৌঁছোতে দেরি হয়।”

একদিন রাহুলের স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। রাহুল ১০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় হলো। পুরস্কার বিতরণে তার নাম উচ্চারিত হলে সে মঞ্চে না গিয়ে লাঠি হাতে পেছনের সারির চারটি ছাতা ভেঙে ফেলে। অভিভাবকরা চিৎকার করলেন “পাগল ছেলে!” কিন্তু রাহুলের মা চুপ করে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই রাতে তিনি চিকিৎসকের কাছে যান। রোগ নির্ণয় হয় ‘ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার’।

পর্ব : ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার (IED): ইতিহাস, উৎপত্তি শিশুমনের বিস্ফোরিত নীরবতা

শিশু হঠাৎ করে প্রচণ্ড রেগে যায়। ছোট একটি কারণে জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে, চিৎকার করে, মারধর করে, এমনকি নিজেকেও আঘাত করতে পারে। কিছুক্ষণ পর আবার যেন কিছুই হয়নি—চুপচাপ বসে থাকে। বহু পরিবার এই আচরণকে “খুব বদমেজাজি”, “অসভ্য”, “বখে যাওয়া” কিংবা “অতিরিক্ত আদরে নষ্ট” বলে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই আচরণের পেছনে থাকতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক-আচরণগত অবস্থা—ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার (Intermittent Explosive Disorder বা IED)।

IED কী?: ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার হলো এমন একটি মানসিক ও আচরণগত ব্যাধি, যেখানে ব্যক্তি হঠাৎ, অপ্রত্যাশিত ও নিয়ন্ত্রণহীন রাগের বিস্ফোরণে আক্রান্ত হয়। এই রাগ পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়। একটি ছোট অনুরোধ, সামান্য বাধা, খেলায় হার, কিংবা ভাইবোনের সঙ্গে তর্কও শিশুর মধ্যে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।—IED আক্রান্ত শিশু বা কিশোর সাধারণত পরে নিজের আচরণের জন্য অনুতপ্ত হয়, কিন্তু রাগের মুহূর্তে সে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অর্থাৎ এটি কেবল “রাগী স্বভাব” নয়; বরং আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি জটিল স্নায়ুবিক ও মানসিক সমস্যা।

ইতিহাস— “খারাপ মেজাজথেকে বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি: মানবসভ্যতার ইতিহাসে হঠাৎ বিস্ফোরক রাগের আচরণ নতুন কিছু নয়। প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক Hippocrates মানুষের চার ধরনের temperament বা মেজাজের কথা বলেছিলেন, যেখানে অতিরিক্ত “choleric temperament” বা রাগী স্বভাবের ধারণা ছিল। তবে তখন এসব আচরণকে চিকিৎসাগত ব্যাধি হিসেবে দেখা হতো না; বরং ব্যক্তিত্বের অংশ মনে করা হতো। উনিশ ও বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপীয় মনোরোগবিদ্যায় “episodic dyscontrol syndrome” নামে একটি ধারণা উঠে আসে। গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, কিছু মানুষ হঠাৎ অত্যন্ত সহিংস বা বিস্ফোরক আচরণ করে, কিন্তু তারা সবসময় আগ্রাসী নয়। এই আচরণগুলোকে প্রথমদিকে ব্যক্তিত্বগত সমস্যা, নৈতিক দুর্বলতা বা অপরাধপ্রবণতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো।—পরবর্তীতে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন যখন মানসিক রোগ নির্ণয়ের আন্তর্জাতিক গাইডলাইন Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders (DSM) তৈরি করে, তখন ধীরে ধীরে IED একটি পৃথক ব্যাধি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। —১৯৮০ সালে প্রকাশিত DSM-III সংস্করণে প্রথমবারের মতো “Intermittent Explosive Disorder” আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে তখন এর মানদণ্ড ছিল সীমিত ও অস্পষ্ট। পরবর্তী DSM-IV এবং বিশেষ করে DSM-5-এ এসে IED সম্পর্কে ধারণা আরও স্পষ্ট হয়। এখন এটিকে impulse-control disorder বা আবেগ ও তাড়না নিয়ন্ত্রণজনিত ব্যাধির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শিশুর ক্ষেত্রে IED: কেন গুরুত্বপূর্ণ?: আগে ধারণা করা হতো, IED মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক শিশুর মধ্যেও এই ব্যাধির লক্ষণ ছোটবেলা থেকেই প্রকাশ পেতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু:

  • অত্যন্ত impulsive,
  • আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বল,
  • ADHD, ODD বা trauma-related সমস্যায় আক্রান্ত,
  • পরিবারে সহিংসতা বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের মধ্যে বড় হচ্ছে,

তাদের মধ্যে IED-এর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। অনেক সময় ADHD, ODD বা Conduct Disorder-এর সঙ্গে IED একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। ফলে একটি শিশুকে শুধু “দুষ্ট” বা “অবাধ্য” বললে তার প্রকৃত সমস্যাটি আড়ালে থেকে যেতে পারে।

IED-এর উৎপত্তিমস্তিষ্ক, পরিবেশ অভিজ্ঞতার জটিল সম্পর্ক: বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, IED-এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং এটি জিনগত, স্নায়ুবিক ও সামাজিক বিভিন্ন উপাদানের সম্মিলিত ফল।

  • . মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমস্যা: গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের amygdala (আবেগপ্রতিক্রিয়া কেন্দ্র) এবং prefrontal cortex (যুক্তি ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র)-এর মধ্যে ভারসাম্যহীনতা থাকলে ব্যক্তি সহজে আবেগ বিস্ফোরণে আক্রান্ত হতে পারে। অর্থাৎ রাগ তৈরি হয় দ্রুত, কিন্তু সেটি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দুর্বল থাকে।
  • ২. শৈশবের ট্রমা ও সহিংস পরিবেশ: যেসব শিশু ছোটবেলায় শারীরিক শাস্তি, পারিবারিক সহিংসতা, অবহেলা বা মানসিক নির্যাতনের মধ্যে বড় হয়, তাদের মধ্যে পরবর্তীতে IED-এর ঝুঁকি বাড়তে পারে। কারণ শিশুর মস্তিষ্ক তখন “সবসময় বিপদের মধ্যে” থাকার মতো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে শেখে।
  • ৩. জিনগত ও পারিবারিক প্রভাব: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে impulsive aggression বা mood disorder থাকলে শিশুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
  • ৪. সহ-অবস্থান (Comorbidity): IED প্রায়ই ADHD, Depression, Anxiety, Bipolar Disorder বা Substance Use Disorder-এর সঙ্গে একসঙ্গে দেখা যায়। তাই সঠিক মূল্যায়ন ছাড়া শুধু “রাগের সমস্যা” হিসেবে দেখলে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।

রাগআর IED-এর পার্থক্য কোথায়?

সব শিশুই রাগ করে। কিন্তু IED-এর ক্ষেত্রে রাগ:

  • পরিস্থিতির তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়,
  • হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়,
  • নিয়ন্ত্রণহীন হয়,
  • বারবার ঘটে,
  • এবং সামাজিক, পারিবারিক বা শিক্ষাজীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলে।

একজন সাধারণ শিশু হয়তো খেলায় হারলে কাঁদবে; কিন্তু IED আক্রান্ত শিশু চেয়ার ছুড়ে ফেলতে পারে, বন্ধুকে মারতে পারে বা নিজের ক্ষতি করতে পারে।

শিশুর আবেগ, বিস্ফোরণ নীরব মানসিক সংগ্রামকে বোঝার চেষ্টা: প্রতিটি শিশুই কোনো না কোনো সময় রাগ করে। খেলনা না পেলে কান্না করা, মোবাইল বন্ধ করে দিলে বিরক্ত হওয়া, খেলায় হারলে চিৎকার করা—এসব শৈশবের স্বাভাবিক আবেগীয় বিকাশের অংশ। কারণ শিশুর মস্তিষ্ক তখনও আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখার পর্যায়ে থাকে। কিন্তু সব রাগ একরকম নয়। কখনো কখনো একটি শিশুর রাগ এতটাই তীব্র, হঠাৎ ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে যে তা শুধু “মেজাজ” বা “দুষ্টুমি” বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। তখন প্রশ্ন আসে—এটি কি স্বাভাবিক রাগ, নাকি Intermittent Explosive Disorder (IED)-এর মতো কোনো গভীর মানসিক-আচরণগত সংকেত?

স্বাভাবিক রাগআবেগের স্বাভাবিক ভাষা: রাগ একটি মানবিক আবেগ। শিশুরা যখন হতাশ হয়, প্রত্যাখ্যাত বোধ করে, ক্লান্ত থাকে, ভয় পায় বা নিজেদের চাহিদা প্রকাশ করতে পারে না, তখন তারা রাগের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখায়। যেমন ধরুন:

উদাহরণ ১—স্বাভাবিক রাগ

৬ বছরের রাফি খেলতে খেলতে হেরে গেল। সে রাগ করে বলল,— “আমি আর খেলব না!” সে হয়তো ৫-১০ মিনিট মন খারাপ করে বসে থাকল, তারপর আবার খেলায় ফিরে গেল। এটি স্বাভাবিক আবেগীয় প্রতিক্রিয়া। কারণ:

  • রাগের কারণ ছিল বাস্তব,
  • প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতির তুলনায় অতিরিক্ত ছিল না,
  • কিছু সময় পরে সে নিজেকে শান্ত করতে পেরেছে।
IED-এর রাগআবেগ নয়, বিস্ফোরণ: IED-এর ক্ষেত্রে রাগ শুধু “রাগ” থাকে না; এটি হয়ে ওঠে হঠাৎ বিস্ফোরক, নিয়ন্ত্রণহীন ও পরিস্থিতির তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে তীব্র। এখানে শিশুর মস্তিষ্ক যেন মুহূর্তের মধ্যে “fight mode”-এ চলে যায়। ছোট একটি ঘটনা থেকেও ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। যেমন ধরুন:

উদাহরণ ২—IED-এর সম্ভাব্য আচরণ

৮ বছরের যুবরাজকে মা বললেন:— “এখন মোবাইলটা বন্ধ করো।” হঠাৎ যুবরাজ চিৎকার শুরু করল। মোবাইল ছুড়ে মারল। টেবিল উল্টে দিল। মাকে ধাক্কা দিল। নিজের মাথা দেয়ালে ঠুকতে লাগল। ১৫ মিনিট পরে সে কাঁদতে কাঁদতে বলল:— “আমি এটা করতে চাইনি…” এখানে আচরণটি শুধু “রাগ” নয়। কারণ:

  • প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতির তুলনায় অত্যন্ত তীব্র,
  • আচরণ নিয়ন্ত্রণহীন,
  • হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটেছে,
  • পরে অনুশোচনা এসেছে,
  • এবং এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।

IED-এর রাগ কেন ভয়ংকরভাবে আলাদা?

  • . কারণ ছোট, প্রতিক্রিয়া বিশাল: স্বাভাবিক রাগে কারণ ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কিছুটা সামঞ্জস্য থাকে। কিন্তু IED-তে ছোট একটি ঘটনাও বিশাল বিস্ফোরণ তৈরি করতে পারে। উদাহরণ: হিসেবে বলা যায়, একটি পেন্সিল খুঁজে না পেয়ে শিশু পুরো ঘর ভাঙচুর শুরু করল। অথবা, খাবারে পছন্দের ডিম না পেয়ে সে ছোট ভাইকে মারতে শুরু করল।—এখানে সমস্যা শুধু রাগ নয়; সমস্যা হলো আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভেঙে পড়া।
  • . রাগের সময় শিশুটি যেন নিজে থাকে না: IED আক্রান্ত শিশুরা অনেক সময় পরে বলে: “আমি নিজেকে থামাতে পারিনি।”; অথবা “আমার মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল।” অথবা “আমি বুঝতেই পারিনি আমি কী করছি।” —অর্থাৎ রাগের মুহূর্তে তাদের prefrontal cortex (যে অংশ চিন্তা ও নিয়ন্ত্রণ করে) কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। আবেগ মস্তিষ্ককে দখল করে নেয়।
  • . বিস্ফোরণ হঠাৎ হয় এবং দ্রুত বাড়ে: স্বাভাবিক রাগ সাধারণত ধীরে বাড়ে। কিন্তু IED-এর ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিক্ষক বললেন,— “তোমার খাতা আনোনি কেন?” —সাধারণ শিশু লজ্জা পেতে পারে বা চুপ থাকতে পারে। কিন্তু IED আক্রান্ত শিশু হয়তো সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছুড়ে মারল বা ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল।
  • . পরে অনুশোচনা আসে: IED আক্রান্ত অধিকাংশ শিশু আসলে “খারাপ” নয়। তারা পরে অনুতপ্ত হয়, কাঁদে, অপরাধবোধে ভোগে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাগের মাথায় ছোট বোনকে মেরেছে। রাতের বেলা গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, — “আমি ইচ্ছা করে করিনি…”—এই অনুশোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায় শিশুটি ইচ্ছাকৃত অপরাধী নয়; বরং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সংগ্রাম করছে।

স্বাভাবিক রাগ বনাম IED—শিশুমনের আবেগ বিস্ফোরণের ভেতরের পার্থক্য

শিশুর রাগ সবসময়ই সমস্যা নয়। বরং রাগ মানুষের একটি স্বাভাবিক আবেগ, যা হতাশা, কষ্ট, অপূর্ণ চাহিদা বা অন্যায়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রকাশ পায়। কিন্তু যখন সেই রাগ পরিস্থিতির তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে তীব্র, নিয়ন্ত্রণহীন ও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে, তখন সেটি শুধু “রাগ” থাকে না; বরং তা Intermittent Explosive Disorder (IED)-এর মতো একটি মানসিক-আচরণগত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। স্বাভাবিক রাগ এবং IED-এর পার্থক্য বোঝা তাই অভিভাবক, শিক্ষক ও মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Read More │ADHD: ‘দুষ্টুমি’ নয়, শিশুমনের নীরব সংগ্রাম—কিন্তু লোহান বুঝলেও শশী যে বুঝে না?│ বাংলাদেশের অসংখ্য শিশুকে ‘অমনোযোগী’ বা ‘চঞ্চল’ বলে উপেক্ষা করা হয়। অথচ তাদের অনেকেই হয়তো Attention Deficit Hyperactivity Disorder (ADHD)-এর সঙ্গে লড়ছে নীরবে।

ক) কারণ: বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া নাকি ক্ষুদ্র ঘটনায় বিস্ফোরণ?

স্বাভাবিক রাগ সাধারণত বাস্তব ও বোধগম্য কোনো কারণ থেকে সৃষ্টি হয়। একটি শিশু খেলায় হারলে, পছন্দের খেলনা না পেলে, বা ভাইবোনের সঙ্গে ঝগড়া হলে মন খারাপ করতে পারে, রাগ করতে পারে। এই রাগের পেছনে একটি স্পষ্ট আবেগীয় কারণ থাকে। অর্থাৎ পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কিছুটা সামঞ্জস্য থাকে।

কিন্তু IED-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে খুব ছোট, তুচ্ছ বা দৈনন্দিন একটি ঘটনাও ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মা হয়তো শুধু বললেন “এখন টিভি বন্ধ করো”, আর শিশুটি হঠাৎ চিৎকার শুরু করল, জিনিসপত্র ছুড়ে মারল বা কাউকে আঘাত করল। বাইরের মানুষ ঘটনাটি দেখে অবাক হয়ে যায়, কারণ প্রতিক্রিয়াটি পরিস্থিতির তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি।

খ) তীব্রতা: সীমিত আবেগ নাকি বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া?

স্বাভাবিক রাগের তীব্রতা সাধারণত নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত হয়। শিশু হয়তো কাঁদবে, অভিমান করবে, মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে বা কিছু সময় কথা বলবে না। কিন্তু তার আচরণ পুরো পরিবেশকে ভেঙে ফেলার মতো হয় না।

অন্যদিকে IED-এর রাগ যেন হঠাৎ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো। শিশুটি চিৎকার করতে পারে, দরজা আছড়ে ফেলতে পারে, ভাঙচুর করতে পারে, অন্যকে মারতে পারে, এমনকি নিজের শরীরেও আঘাত করতে পারে। অনেক সময় পরিবার বলে—“ও রেগে গেলে যেন আর নিজের মধ্যে থাকে না।” এই বিস্ফোরক তীব্রতাই IED-কে সাধারণ রাগ থেকে আলাদা করে।

গ) নিয়ন্ত্রণ: আবেগ সামলাতে পারা নাকি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা?

স্বাভাবিক রাগের সময়ও শিশুর কিছুটা আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকে। সে হয়তো রাগ দেখায়, কিন্তু বড়দের কথা শুনে ধীরে ধীরে থেমে যায় বা পরিস্থিতি থেকে সরে আসে। অর্থাৎ তার মস্তিষ্ক এখনও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে।

কিন্তু IED-এর ক্ষেত্রে শিশুটি প্রায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। রাগের মুহূর্তে সে নিজের আচরণের পরিণতি নিয়ে ভাবতে পারে না। অনেক সময় পরে সে নিজেই বলে—“আমি নিজেকে থামাতে পারিনি।” এটি আসলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভেঙে পড়া, যেখানে impulsive reaction যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়।

ঘ) সময়কাল: সাময়িক রাগ নাকি পুনরাবৃত্ত বিস্ফোরণ?

স্বাভাবিক রাগ সাধারণত স্বল্পস্থায়ী হয়। কিছুক্ষণ কান্না, রাগ বা অভিমানের পর শিশু আবার খেলতে শুরু করে, অন্যদিকে মনোযোগ দেয় বা স্বাভাবিক হয়ে যায়। অর্থাৎ আবেগটি দীর্ঘ সময় ধরে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না।

IED-এর ক্ষেত্রে বিস্ফোরণ বারবার পুনরাবৃত্ত হয়। এটি কোনো একদিনের ঘটনা নয়। পরিবার লক্ষ্য করে—প্রায়ই একই ধরনের বিস্ফোরক আচরণ ঘটছে। ছোটখাটো বিষয়েই প্রতিনিয়ত বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ফলে পরিবারে এক ধরনের স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়—“আজ আবার কখন রেগে যাবে?”

ঙ) আচরণ: অভিমানী প্রতিক্রিয়া নাকি আক্রমণাত্মক বিস্ফোরণ?

স্বাভাবিক রাগে শিশুর আচরণ সাধারণত আবেগ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে—কান্না, অভিমান, চুপ করে থাকা বা সাময়িক বিরক্তি। এতে পরিবেশ অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু তা ভয়াবহ হয়ে ওঠে না।

IED-এর ক্ষেত্রে আচরণ অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে। শিশুটি মারধর করতে পারে, জিনিসপত্র ভাঙতে পারে, দেয়ালে আঘাত করতে পারে, বা হঠাৎ স্কুল থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। অনেক সময় অন্য শিশুরা তাকে ভয় পেতে শুরু করে। শিক্ষক বা পরিবার তাকে “খুব খারাপ মেজাজের” শিশু হিসেবে দেখতে শুরু করে।

চ) পরিণতি: দ্রুত শান্ত হওয়া নাকি সামাজিক পারিবারিক সংকট তৈরি করা?

স্বাভাবিক রাগ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করে না। কিছুক্ষণ পর শিশু শান্ত হয়ে যায়, সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং দৈনন্দিন জীবন চলতে থাকে।

কিন্তু IED-এর বিস্ফোরণ পরিবার, স্কুল ও সামাজিক জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। পরিবারে ভয়, অস্থিরতা ও মানসিক চাপ তৈরি হয়। স্কুলে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়, শিক্ষক বিরক্ত হন, এমনকি বহিষ্কারের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। শিশুটিও ধীরে ধীরে “সমস্যাজনক শিশু” হিসেবে পরিচিত হয়ে পড়ে, যা তার আত্মসম্মানে গভীর আঘাত করে।

ছ) অনুশোচনা: সামান্য আফসোস নাকি গভীর অপরাধবোধ?

স্বাভাবিক রাগের পরে শিশু হয়তো কিছুটা অনুতপ্ত হয়, কিন্তু তা খুব গভীর হয় না। কারণ সে জানে পরিস্থিতি খুব বেশি খারাপ হয়নি।

কিন্তু IED আক্রান্ত অনেক শিশুই বিস্ফোরণের পরে গভীর অনুশোচনায় ভোগে। রাগের মাথায় যা করেছে, পরে সেটি মনে করে কাঁদে, লজ্জা পায় বা অপরাধবোধে ভোগে। অনেকেই বলে—“আমি এটা করতে চাইনি।” এই অনুশোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে শিশুটি ইচ্ছাকৃতভাবে “খারাপ” মনে রাখতে হবে, সব রাগ মানেই IED নয়। আবার সব বিস্ফোরক আচরণকেও শুধু “দুষ্টুমি” বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। পার্থক্যটি বোঝার মূল জায়গা হলো—আচরণটি কতটা তীব্র, কতবার ঘটে, কতটা নিয়ন্ত্রণহীন, এবং সেটি শিশুর দৈনন্দিন জীবনকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

যখন আমরা শিশুর আচরণের পেছনের মানসিক ও স্নায়ুবিক বাস্তবতাকে বুঝতে শিখি, তখন শাস্তির বদলে সহায়তা, দোষারোপের বদলে সহানুভূতি, আর ভয় দেখানোর বদলে চিকিৎসা ও সমর্থনের পথ তৈরি হয়। আর সেই বোঝাপড়াই একটি শিশুর জীবনকে ধ্বংসের দিক থেকে সম্ভাবনার দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

বাংলাদেশি বাস্তবতায় বড় ভুল বোঝাবুঝি: অনিশ্চিত শিশুদের ভবিষ্যত

আমাদের সমাজে অনেক সময় IED আক্রান্ত শিশুকে বলা হয়:

  • “অসভ্য”
  • “বদমেজাজি”
  • “বখে গেছে”
  • “ইচ্ছা করে এমন করে”
  • “বেশি আদরে নষ্ট”

ফলে শিশুটি সাহায্য পাওয়ার বদলে পায়:

  • শারীরিক শাস্তি,
  • অপমান,
  • তুলনা,
  • সামাজিক প্রত্যাখ্যান।

ধীরে ধীরে সে নিজের সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে শুরু করে।

কখন সতর্ক হবেন?

যদি শিশুর:

  • রাগ বারবার বিস্ফোরক হয়,
  • ছোট কারণে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হয়,
  • স্কুল/পরিবারে সমস্যা তৈরি হয়,
  • নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করে,
  • পরে কাঁদে বা অনুশোচনা করে,
  • এবং এই আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে—

তবে এটিকে শুধু “দুষ্টুমি” বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা

IED আক্রান্ত শিশু “খারাপ শিশু” নয়। সে এমন একটি শিশু, যার মস্তিষ্ক আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে লড়াই করছে। আমরা যদি শুধু তার আচরণ দেখি, তবে তাকে শাস্তি দেব। কিন্তু যদি তার ভেতরের সংগ্রাম দেখি, তবে তাকে সাহায্য করব। আর সেই পার্থক্যটাই একটি শিশুর পুরো ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

আধুনিক চিকিৎসা, ব্যবস্থাপনা আশার জায়গা

IED এখন আর “খারাপ স্বভাব” হিসেবে দেখা হয় না। আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞান এটিকে একটি বাস্তব মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সঠিক মূল্যায়ন, Cognitive Behavioral Therapy (CBT), anger management training, parent management training এবং প্রয়োজনে ওষুধের মাধ্যমে অনেক শিশুই উল্লেখযোগ্য উন্নতি করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শিশুর বিস্ফোরক আচরণের পেছনের নীরব কষ্টকে বোঝা। কারণ অনেক সময় শিশুর রাগ আসলে তার সাহায্যের ভাষা।

পর্ব : আইইডি কীভাবে চিহ্নিত করবেন?

শিশুদের আইইডি চেনা সহজ নয়। কারণ বাচ্চাদের রাগ করা স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু সতর্ক সংকেত আছে:

  • উদাহরণ : আট বছর বয়সী সমীর। খুব মিষ্টি ছেলে। কিন্তু টিভির রিমোট হারিয়ে গেলে সে জানালার কাঁচ ভেঙে দেয়। ১০ মিনিট পর কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “ভাইয়া রিমোট আমি নিজেই লুকিয়ে রেখেছিলাম, ভুলে গিয়েছিলাম।” এখানে অনুশোচনা আছে, কিন্তু বারবার একই ঘটনা ঘটে।
  • উদাহরণ : সাত বছর বয়সী নুসরাত। শুক্রবার মাগরিবের নামাজের পর বাসায় খাবার পছন্দ না হওয়ায় সে রান্নাঘরের তিনটা প্লেট ভাঙে। রাগ কমার পর বোনকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আমি একটা দানব। আমাকে দূরে সরিয়ে দাও।” এই আত্ম-ঘৃণা আইইডির অন্যতম লক্ষণ।
  • বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি শিশু যদি মাসে অন্তত দুই থেকে তিনবার এই রকম ধ্বংসাত্মক আচরণ করে, যেখানে কোনো শারীরিক আঘাতের কারণ নেই কিংবা সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়, এবং তা যদি ছয় মাসের বেশি স্থায়ী হয়—তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

পর্ব : সমাজের দৃষ্টি ভুল বোঝাবুঝি

একটি মফস্বল শহরের গল্প বলি। সেখানকার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সুফিয়া বেগম। তাঁর ক্লাসে দশ বছর বয়সী ফারদিন। ফারদিন একবার সহপাঠীর গায়ে কালি ছুড়েছিল। শিক্ষিকা তাকে ক্লাস থেকে বের করে দেন, লাল ফিতা পরিয়ে দাঁড় করান। ঘটনার পর ফারদিন দুইদিন স্কুলে আসেনি। তৃতীয় দিন এসে সে শিক্ষিকার ঘরের দরজায় লাথি মারে। পুলিশ ডাকা হলো। শিশুটি তখন কাঁপছে, চোখ মুখ লাল, বলছে “আমি মরতে চাই।”

এটি একটি করুণ ব্যর্থতা। আইইডিকে শৃঙ্খলার সমস্যা ভেবে শাস্তি দিলে সেটা আরও ভয়াবহ আকার নেয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ৭ শতাংশ শিশুর মধ্যে আইইডির প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায়, কিন্তু ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সেটি ‘বদ আচরণ’ হিসেবে গন্য হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, আইইডি একটি রোগ, দুষ্টামি নয়।

পর্ব : ব্যবস্থাপনার পাঠযা কাজ করে

  • প্রথম উদাহরণ: রাহুলের চিকিৎসা শুরু হয় কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির (সিবিটি) মাধ্যমে। তাকে শেখানো হলো ‘ভলক্যানো মেডিটেশন’—যেমন আগ্নেয়গিরি ফেটে ওঠার আগে ধোঁয়া দেয়, তেমনই শরীর গরম লাগলে, চোখ টকটকে হলে সে যেন গণনা শুরু করে ১ থেকে ২০ পর্যন্ত। রাহুল সেটা শিখেছে। এখন তার ক্ষোভ আসলেও সে কখনো কখনো দৌড়ে গিয়ে বালিশ ছিঁড়ে ফেলে, কিন্তু আর কাউকে আঘাত করে না।
  • দ্বিতীয় উদাহরণ: তানিয়ার জন্য চিকিৎসক ‘ফ্যামিলি থেরাপি’ দেন। তার বাবা-মাকে শেখানো হলো ‘টাইম-আউট’ নিয়ম—অর্থাৎ রাগের সময় সন্তানকে শাস্তি না দিয়ে, তাকে একটি নিরাপদ ঘরে একা রেখে প্রশান্তির পরিবেশ দেওয়া। বাবা মা এখন তানিয়াকে বলে, “তোমার আগ্নেয়গিরি জ্বলছে? তাহলে দৌড়ে বাগানে গিয়ে দশবার লাফ দাও।” তানিয়া ধীরে ধীরে উন্নতি করছে।
  • তৃতীয় উদাহরণ: স্কুল পর্যায়ে পরিবর্তন। চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি স্কুলে ‘শান্তি কর্নার’ চালু হয়েছে। যে শিশুটি উত্তেজিত হয়, সে সেখানে রঙ করবে, বালির ট্রেতে আঙুল চালাবে, বা প্লেডো মাখবে। পাঁচ বছরের ফলাফলে দেখা গেছে, সেখানে আইইডি-জনিত ঘটনা ৬০ শতাংশ কমেছে।

পর্ব : ওষুধ সীমাবদ্ধতা

শুধু থেরাপি দিয়ে সব হয় না। কিছু শিশুর প্রয়োজন হয় ফার্মাকোলজিক্যাল সাহায্য। মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) আইইডির জন্য সরাসরি কোনো ওষুধ অনুমোদন করেনি, তবে গবেষণায় দেখা গেছে, সিলেকটিভ সেরোটোনিন রিউটেক ইনহিবিটর (এসএসআরআই) এবং মুড স্টেবিলাইজার কাজ করে। ঢাকার শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আরা বলেন, “অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো তারা ওষুধ খাওয়াতে চান না, বলেন ‘ছেলেকে পাগলের ওষুধ দেব?’ অথচ ডায়াবেটিসের ইন্সুলিন যেমন জরুরি, তেমনি আইইডির জন্য সঠিক ওষুধ জীবন বাঁচাতে পারে।”

পর্ব : বাস্তব জীবনের জয়গাথা

সব শেষে একটি ইতিবাচক গল্প দিয়ে শেষ করি। সাদিয়া। যে ১২ বছর বয়সে আঘাতে তার ছোট ভাইয়ের হাত ভেঙে দিয়েছিল। তার আইইডি এতটাই গুরুতর ছিল যে তাকে রেসিডেন্সিয়াল ট্রিটমেন্ট নিতে হয়েছিল। সেখানে তিন বছর কাটানোর পর সাদিয়া এখন কলেজের অনার্সের ছাত্রী। সে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে, যেসব শিশু আইইডিতে ভোগে তাদের জন্য সচেতনতা গড়ে তোলে। সাদিয়ার ভাষ্যঃ “আমার ভেতরের সেই দানবটি আজও আছে, কিন্তু আমি তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি। বড় হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করা, আর সাহায্য চাইতে না লজ্জা করা।”

পরিশেষ: শিক্ষার নতুন সংজ্ঞা

শিশুদের ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার নিয়ে আমরা যত কম জানি, তত বেশি শিশু নীরবে যন্ত্রণা ভোগে। আমাদের সমাজের স্কুল, পরিবার ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় এখনই জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন—শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্কুলে কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা, আইইডিকে অপরাধ না দেখে ‘মেডিকেল কন্ডিশন’ হিসেবে মানা।

রাহুল, তানিয়া, সমীর, নুসরাত, ফারদিন কিংবা সাদিয়া—এই শিশুরা কোনও অপরাধী নয়। তারা একেকটি আগ্নেয়গিরি যাদের অস্তিত্বের গভীরে লুকিয়ে আছে বিশাল এক সমুদ্রের ব্যথা। হাত বাড়িয়ে দিলে হয়তো তারা ফুল ফোটাতে পারে। চোখ ফিরিয়ে নিলে শুধু ধ্বংসস্তূপ। আমাদের পছন্দ কোনটা?

আজ রাতে আপনার প্রতিবেশী, আত্মীয় বা স্কুলের কোনো শিশু যদি হঠাৎ ফেটে পড়ে, তাকে ‘খারাপ’ না বলে একটু থামুন। হয়তো সেও কোনও আইইডি রোগী। হয়তো তার শুধু একটি বোঝার হাতের প্রয়োজন।

লেখকের শেষ কথা: মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কুসংস্কার ভাঙার দিন এখনই। প্রতিটি শিশু সুস্থ পরিবেশ পেলে বিস্ফোরণের বদলে সৃষ্টি করবে। আমরা সেই পরিবেশ গড়ে তুলব—এই অঙ্গীকারে আজকের ফিচারটি শেষ করছি।

লেখক: . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র  (odhikarpatranews@gmail.com)

#শিশুমনের_নীরব_কান্না #IEDAwareness #মানসিক_স্বাস্থ্য #শিশুর_রাগ_নয়_সংকেত #ParentingAndPsychology #BreakTheStigma



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: