odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Tuesday, 9th June 2026, ৯th June ২০২৬
বারবার কারিকুলাম বদল, শিক্ষকের মর্যাদাহানি, নীতিনির্ধারণে শিক্ষাবিদদের অনুপস্থিতি এবং শাস্তিহীন পরীক্ষানিরীক্ষা—বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কি উন্নয়নের পথে, নাকি এক অন্তহীন গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে?

শিক্ষা নামের পরীক্ষাগার: এক পা এগোয়, তিন পা পিছোয় বাংলাদেশ!│শিক্ষকের শ্লীলতাহানি, শিক্ষার্থী বিভ্রান্ত: কার হাতে জিম্মি বাংলাদেশের শিক্ষা?

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৯ June ২০২৬ ০৩:৩১

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৯ June ২০২৬ ০৩:৩১

শিক্ষকের কলম শাসকের চাবুক: কেন শিক্ষকদের বারবার চলে আসতে হয় রাজপথে?

 “শিক্ষা সংস্কার: মরীচিকা না বাস্তবতা” ধারাবাহিকের এই বিশেষ ও দীর্ঘ নিবন্ধটি আমাদের সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং অবহেলিত এক ক্ষতের ব্যবচ্ছেদ। কেন জ্ঞানের কারিগররা আজ রাজপথে ধুলাবালিতে বসে নিজের অধিকারের আর্তনাদ করছেন—তা নিয়ে এক গভীর তাত্ত্বিক ও মানবিক বিশ্লেষণ।

সারসংক্ষেপ (Abstract)

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে এক গভীর নীতিগত, কাঠামোগত ও মূল্যবোধগত সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই বিশ্লেষণধর্মী ফিচার নিবন্ধে শিক্ষকদের মর্যাদাহানি, ঘনঘন কারিকুলাম পরিবর্তন, শিক্ষানীতিতে অস্থিরতা, আমলাতান্ত্রিক প্রভাব এবং শিক্ষাবিদদের সীমিত অংশগ্রহণের ফলে সৃষ্ট বহুমাত্রিক সংকট পর্যালোচনা করা হয়েছে। নিবন্ধটি দেখায় যে শিক্ষা সংস্কারের নামে ধারাবাহিক পরীক্ষানিরীক্ষা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের সামাজিক সম্মানহানি, পেশাগত স্বাধীনতার সংকোচন এবং আর্থিক বৈষম্য শিক্ষাক্ষেত্রে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে। মহামারী-পরবর্তী ‘লার্নিং লস’, ডিজিটাল বৈষম্য, শিক্ষক সংকট এবং স্কুলশিক্ষার দুর্বল ভিত্তিকেও জাতীয় উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে নিবন্ধটি যুক্তি তুলে ধরে যে শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের জন্য গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, শিক্ষাবিদদের নেতৃত্ব, শিক্ষকদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা দর্শন অপরিহার্য। শিক্ষা কেবল প্রশাসনিক খাত নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের মৌলিক ভিত্তি।

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক │ বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম

 বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শিক্ষকের মর্যাদা সংকট, ঘনঘন কারিকুলাম পরিবর্তন, তথাকথিত সংস্কারের নামে বিভ্রান্তিকর নীতি, শিক্ষাবিদদের পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিহীন সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক সবাই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। কেন শিক্ষকদের বারবার রাজপথে নামতে হয়? কেন শিক্ষা নিয়ে ভুল সিদ্ধান্তের কোনো জবাবদিহি নেই? কেন একটি প্রজন্মকে বারবার পরীক্ষাগারের ইঁদুরে পরিণত করা হয়? এই অনুসন্ধানী ফিচার নিবন্ধে উঠে এসেছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্গত সংকট, নেতৃত্বের দুর্বলতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য উত্তরণের পথ।

সূচনালগ্ন: কলমের ওপর চাবুকের আঘাত

ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে দেখা গেছে, সভ্যতার মশাল যারা বহন করেন, সেই শিক্ষকদের কলমই ছিল সমাজ পরিবর্তনের প্রধান শক্তি। প্রাচীন গ্রিসের সক্রেটিস থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশের চাণক্য—শিক্ষকের কলম ও বাণী সবসময় শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অদৃশ্য দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে এসে আমরা এক করুণ বৈপরীত্য প্রত্যক্ষ করছি। যে হাতটি হওয়ার কথা ছিল সর্বোচ্চ সম্মানিত, সেই হাতে আজ আমরা হাতকড়া পরাচ্ছি; যে পিঠটি হওয়ার কথা ছিল সোজা, সেখানে পড়ছে শাসকের চাবুক।

আজ শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে নেই, তারা রাজপথে। তাদের হাতে চক বা কলম নেই, আছে দাবি আদায়ের ব্যানার। এই দৃশ্যটি কেবল একদল মানুষের পেশাগত আন্দোলনের নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের চূড়ান্ত দলিল। কেন জ্ঞানতাপসদের আজ শাসকের চাবুকের ভয়ে বা অধিকারের দাবিতে রাজপথে নামতে হচ্ছে, সেই কার্যকারণ অনুসন্ধান আজ সময়ের দাবি।

ভূতের পিঠে শিক্ষা: এক পা এগোয়, তিন পা পিছোয় বাংলাদেশ!

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন এক অদ্ভুত ভূতের পিঠে চড়ে বসেছে। ভূতটি যখন সামনে হাঁটে, তখন মনে হয় দেশ এগোচ্ছে; কিন্তু একটু পর দেখা যায় সে তিন কদম পিছিয়ে গেছে। শিক্ষার্থী বই খুলে দেখে নতুন নিয়ম, শিক্ষক ক্লাসে গিয়ে শুনেন নতুন পদ্ধতি, অভিভাবক সন্তানের খাতা খুলে আবিষ্কার করেন নতুন মূল্যায়ন। কিন্তু বছর ঘুরতেই সবকিছু আবার বদলে যায়।

কখনো বলা হয় মুখস্থ বিদ্যা বাদ, আবার কিছুদিন পর পরীক্ষার পুরনো কাঠামো ফিরে আসে। কখনো বলা হয় নতুন শিক্ষাক্রমই ভবিষ্যৎ, পরে সেটিই বাতিল হয়। কখনো বলা হয় শিক্ষার্থীকে আনন্দে শেখাতে হবে, আবার কিছুদিন পর দেখা যায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক—তিন পক্ষই বিভ্রান্তির ভারে ক্লান্ত। মনে হয় যেন শিক্ষা কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি অবিরাম পরীক্ষাগার। আর সেই পরীক্ষাগারের পরীক্ষার বস্তু হচ্ছে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই ব্যর্থ পরীক্ষার দায়ভার কেউ নেয় না। একটি প্রজন্মের সময় নষ্ট হয়, শিক্ষকদের নতুন করে প্রশিক্ষণ নিতে হয়, অভিভাবকদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয়—কিন্তু ভুল সিদ্ধান্তের জন্য কোনো জবাবদিহি থাকে না। ফলে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই শিক্ষা সংস্কার করছি, নাকি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বারবার বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় ঠেলে দিচ্ছি?

রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও মেরুদণ্ড ভাঙার খেলা

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে একটি অশুভ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে—শিক্ষকদের একটি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। শাসকগোষ্ঠী সবসময়ই চেয়েছে শিক্ষকরা যেন হয় তাদের একান্ত অনুগত। শিক্ষাকে একটি মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার চেয়ে ‘আদর্শিক অনুসারী’ তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

রূপক বিশ্লেষণ: একটি বটগাছকে যদি নিয়মিত তার শেকড় কেটে ছোট টবে বন্দি করে রাখা হয়, তবে সেটি আর মহীরুহ হতে পারে না। আমাদের শিক্ষকদের অবস্থাও ঠিক তেমন। তাদের উচ্চবেতন বা উচ্চতর সামাজিক মর্যাদার বদলে দেওয়া হয়েছে দলীয় রাজনীতির ‘ট্যাগ’। ফলে শিক্ষকরা আজ দ্বিধাবিভক্ত। যারা মেরুদণ্ড সোজা রাখতে চেয়েছেন, তাদের ওপর নেমে এসেছে শাসকের চাবুক। বদলি, পদোন্নতি বঞ্চিত করা কিংবা তুচ্ছ কারণে লাঞ্ছিত করা—এগুলো যেন আজ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

ইউনুস সরবারের ১৮ মাসের সেই দুঃসহ স্মৃতি ও শিক্ষকের অবমাননা

বিগত দেড় বছরে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে যে নজিরবিহীন অস্থিরতা আমরা দেখেছি, তা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। শিক্ষকদের কান ধরে ওঠবস করানো, জুতোর মালা পরানো কিংবা পদত্যাগে বাধ্য করার যে বীভৎস দৃশ্য আমরা ডিজিটাল স্ক্রিনে দেখেছি, তা খোদায়ী আরশকেও কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো।

শাসকগোষ্ঠী যখন কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে চায়, তখন তারা প্রথমে সেই জাতির শিক্ষকদের সম্মান কেড়ে নেয়। কারণ যখন একজন শিক্ষককে সবার সামনে লাঞ্ছিত করা হয়, তখন সেই ছাত্রের মনে আর শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে না। আর শ্রদ্ধা হারানো শিক্ষার্থী খুব সহজেই অন্ধকার জগতের রোবট হয়ে ওঠে। এই অবমাননাই আজ শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে এনে রাজপথে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তারা আজ কেবল বেতন বৃদ্ধির দাবি করছেন না, তারা দাবি করছেন তাদের হারিয়ে যাওয়া ‘সম্মান’ ফিরে পাওয়ার।

একটি পরিকল্পিত বিপর্যয় এবং শিক্ষক সমাজের অবমাননা: সমকালীন বাংলাদেশের এক ক্ষতবিক্ষত চিত্র

২০২৪ সালের আগস্ট মাসে একটি সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা, কুটিল ষড়যন্ত্র এবং গণআন্দোলনের এক জটিল সমীকরণে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে। এই পতনের পর সমগ্র জাতি এক নজিরবিহীন ও ভিন্নধর্মী বাংলাদেশের অবয়ব অবলোকন করল—যে বাংলাদেশ তার হাজার বছরের ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সুমহান গৌরবকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ও সুক্ষ্ম নীলনকশার মাধ্যমে এদেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের একাংশকে খেপিয়ে তুলে, শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার এক চরম অপসংস্কৃতির পথ উন্মুক্ত করে দিল তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

ইতিহাসের নিকৃষ্টতম অধ্যায় রচিত হলো যখন দেখা গেল—জাতির মেরুদণ্ড, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের গলায় জুতার মালা পরানো হচ্ছে, তাঁদের কান ধরে ওঠবস করানো হচ্ছে এবং প্রকাশ্য দিবালোকে শারীরিক ও মানসিকভাবে মব জাস্টিসের (Mob Justice) নামে চরম হেনস্তা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, যখন এই অরাজকতা ও শিক্ষকদের দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ভারী হয়ে উঠছিল, তখন দেশের আইন উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, এমনকি প্রধান উপদেষ্টাও যেন এক অদ্ভুত উদাসীনতায় মগ্ন ছিলেন। তাঁদের এই নীরবতা দেখে মনে হচ্ছিল, রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন; তাঁরাও যেন এক অদৃশ্য আনন্দের বাঁশি বাজিয়ে এই পতন উপভোগ করছিলেন।

এখানেই এক বিশাল ও যৌক্তিক প্রশ্ন জাগ্রত হয়: যিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত, যাঁর হাত ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অহিংসা ও মানবিকতার বার্তা পৌঁছানোর কথা, সেই পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব কেন শিক্ষকদের এই চরম নিগ্রহের দিনে তাঁদের পাশে এসে দাঁড়ালেন না? কিসের এত ক্ষোভ, কিসের এত অনীহা? কোন সুপ্ত প্রতিশোধের আগুনে তিনি শিক্ষক সমাজকে এভাবে পুড়তে দিলেন?

একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে—"কাক কখনো কাকের মাংস খায় না।" কাক অত্যন্ত কর্কশ এবং অপ্রিয় জীব হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের জাতির প্রতি একাত্মতা বজায় রাখে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা স্বয়ং শিক্ষক সমাজ থেকেই উঠে এসেছিলেন। তাঁরা নিজেরা শিক্ষক হয়েও যেভাবে অন্য শিক্ষকদের এই লাঞ্ছনাকে নীরবে সায় দিলেন, তা দেখে মনে হয়—তাঁরা কাকের চেয়েও নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন। শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি হয়েও তাঁরা যেন সহকর্মী ও সামগ্রিক শিক্ষক সমাজের মাংস খুবলে খেয়েছেন; তাঁদের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষা করা তো দূরের কথা, শিক্ষাব্যবস্থার বারোটা বাজিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। তাঁরা কেন এবং কার ইশারায় এই আত্মঘাতী কাজটি করলেন, তা আজও পুরো দেশবাসীর কাছে এক পরম রহস্য ও বিস্ময়ের বিষয়।

সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সংকট

যাই হোক, এই চরম নৈতিক স্খলন ও সমাজিক বিপর্যয়ের প্রভাব এদেশের ওপর অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য।

  • শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ফাটল: এই ঘটনার মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার যে চিরায়ত পবিত্র, স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল, তাতে চিরতরে একটি গভীর ফাটল ধরেছে।
  • অবিশ্বাসের দেয়াল: যে ছাত্র সমাজ শিক্ষকদের পরম গুরু ভাবত, আজ সেখানে পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গায় এক চরম অবিশ্বাস, সন্দেহ ও হিংস্রতা দানা বেঁধে উঠেছে।

একটি সমাজ যখন তার শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে ভুলে যায়, তখন সেই সমাজের পতন অনিবার্য। শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে বিশ্বাসের এই যে চরম ভাঙন এবং শিক্ষকদের মনে তৈরি হওয়া এই তীব্র ক্ষত—তা নিরাময় করে সমাজকে আবার আগের সুশৃঙ্খল ও শ্রদ্ধাশীল জায়গায় ফিরিয়ে আনতে এদেশের আরও কমপক্ষে ৫০ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। এই ক্ষতি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, এটি একটি গোটা প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দীর্ঘমেয়াদী দলিল

শিক্ষা সংকটের চতুর্থ মাত্রা

(১) নীতিগত অস্থিরতা → (২) শিক্ষক মর্যাদা সংকট → (৩) প্রশাসনিক দুর্বলতা → (৪) দুর্নীতি ও সম্পদ অপচয়

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা সংকটকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি চারটি পরস্পর-সম্পর্কিত সংকটের সমন্বয়ে গঠিত একটি গভীর কাঠামোগত সংকট। প্রথমত, নীতিগত অস্থিরতা শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নষ্ট করেছে। ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতির রদবদল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক সবাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের মর্যাদা সংকট শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে; সামাজিক সম্মানহানি, পেশাগত স্বাধীনতার সংকোচন এবং আর্থিক বৈষম্য শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা ও অনুপ্রেরণাহীনতা সৃষ্টি করেছে। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক দুর্বলতা শিক্ষাবিদদের পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবকে শক্তিশালী করেছে, যার ফলে নীতিনির্ধারণ ও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার মধ্যে একটি বিপজ্জনক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আর চতুর্থত, দুর্নীতি ও সম্পদ অপচয় শিক্ষা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত বিপুল অর্থের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে; ভুল পরিকল্পনা, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতার অভাবে অনেক বিনিয়োগই কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাগত ফল বয়ে আনতে পারেনি। ফলে এই চারটি মাত্রা একে অপরকে পুষ্ট করে এমন একটি সংকটচক্র তৈরি করেছে, যার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হচ্ছে দেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

মহামারির ছায়া থেকে নীতিগত সংকট: ২০২১-পরবর্তী বাংলাদেশের শিক্ষার হারানো সময়

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গত কয়েক বছরে এমন এক সময় অতিক্রম করেছে, যার অভিঘাত হয়তো আগামী এক দশকেও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না। ২০২১ সালের পর থেকে শিক্ষাক্ষেত্রের সামনে যে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা শুধু পাঠদান বা পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনের ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ছিল এই সংকটের সূচনা। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী তাদের শেখার ধারাবাহিকতা হারায়। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত অংশগ্রহণ, সহপাঠীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং শিক্ষকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। গণিত, বিজ্ঞান এবং ভাষাগত দক্ষতার ক্ষেত্রে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব আজও বিভিন্ন স্তরে দৃশ্যমান।

বিশেষজ্ঞরা যাকে ‘লার্নিং লস’ বা শেখার ক্ষতি হিসেবে অভিহিত করেন, সেটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বহু শিক্ষার্থী তাদের শ্রেণি অনুযায়ী প্রত্যাশিত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ভিত্তিগত দুর্বলতা পরবর্তী উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এ সময়ে নতুন শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের উদ্যোগও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। শিক্ষাব্যবস্থাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য প্রশংসিত হলেও বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, উপকরণ সরবরাহ এবং অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের অভাবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একাংশের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার বারবার পরিবর্তনও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নতুন সংকট সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করেন, মূল্যায়ন কাঠামোতে স্থিতিশীলতার অভাব প্রকৃত দক্ষতা পরিমাপকে দুর্বল করেছে এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।

শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও প্রকট হয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ শিক্ষক নেই। আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাদানের জন্য যে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তারও ঘাটতি রয়েছে। ফলে নীতিগত পরিবর্তনের সুফল অনেক ক্ষেত্রেই শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে পারেনি।

ডিজিটাল বৈষম্য মহামারিকালে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি কঠিন বাস্তবতা উন্মোচন করে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ইন্টারনেট সংযোগ, ডিভাইস ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা শিক্ষায় বৈষম্যের নতুন মাত্রা যোগ করে।

অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে পারেনি। ফলে ঝরে পড়ার হার বেড়েছে, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরিবাজারে প্রবেশ করে দক্ষতার ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতা জাতীয় উন্নয়নের জন্যও উদ্বেগজনক।

নীতিগত অস্থিরতা

নীতিগত অস্থিরতাও শিক্ষাক্ষেত্রকে প্রভাবিত করেছে। ঘন ঘন পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং বাস্তবায়নে অসংগতি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়েছে। অন্যদিকে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

এই সমগ্র প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতি সম্ভবত একটি প্রজন্মের শেখার সক্ষমতার ওপর পড়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের গতি মন্থর হয়েছে, দক্ষ কর্মশক্তির ঘাটতি বেড়েছে, সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী শক্তি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের সম্ভাবনাও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

ফলে আজ বাংলাদেশের শিক্ষা খাতকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—আমরা কি কেবল শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে পেরেছি, নাকি সেই পথে এগোতে গিয়ে শিক্ষার গুণগত ভিত্তিটিই দুর্বল করে ফেলেছি? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই ভবিষ্যৎ শিক্ষা নীতির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নিহিত রয়েছে।

ক্ষুধার্ত পেটে জ্ঞানচর্চা: এক তিতকুটে বাস্তবতা

তাত্ত্বিকভাবে আমরা বলি—শিক্ষা একটি পবিত্র সেবা। কিন্তু বাস্তবিকভাবে একজন শিক্ষককেও খেয়ে-পরে বাঁচতে হয়। বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। একজন চতুর্থ শ্রেণীর আমলা বা পুলিশ সদস্যের তুলনায় একজন সিনিয়র শিক্ষকের সামাজিক ও আর্থিক সুবিধা যখন নগণ্য হয়, তখন বুঝতে হবে সেই রাষ্ট্র জ্ঞানকে নয়, বরং ‘শক্তি’কে পুজো করছে।

মেটাফোরিকাল অ্যানালজি: এটি অনেকটা এমন যে, আপনি একটি বাতিঘর থেকে অনেক বেশি আলো আশা করছেন, কিন্তু বাতিঘরের প্রদীপে তেল দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করছেন না। ক্ষুধার্ত পেটে কোনো শিক্ষক মহান কোনো আদর্শ প্রচার করতে পারেন না। যখন একজন শিক্ষককে টিউশন করে বা অন্য কোনো উপায়ে সংসার চালাতে হয়, তখন তার সৃজনশীলতা মৃতপ্রায় হয়ে যায়। শিক্ষকরা আজ রাজপথে কারণ তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। কলম দিয়ে তারা অনেক লিখেছেন, কিন্তু শাসকের চাবুক যখন তাদের ভাতের থালায় আঘাত করেছে, তখন তারা মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন।

আমলাতান্ত্রিক জাঁতাকল নীতিনির্ধারণী অনীহা

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ আমলাতন্ত্রের কাছে বন্দি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পেশাদার শিক্ষকদের চেয়ে সাধারণ ক্যাডারের আমলাদের প্রাধান্য বেশি। ফলে কারিকুলাম থেকে শুরু করে বেতন কাঠামো—সবকিছুই নির্ধারিত হয় একটি প্রশাসনিক ঘরানায়, যেখানে শিক্ষকের হৃদয়ের স্পন্দন অনুপস্থিত।

শাসকগোষ্ঠীর কাছে বড় বড় মেগা প্রজেক্ট যতটা গুরুত্বপূর্ণ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন বা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ততটাই তুচ্ছ। কারণ ব্রিজ বা ফ্লাইওভার দৃশ্যমান, কিন্তু শিক্ষা বিনিয়োগের ফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। রাজনৈতিক দলগুলো পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে ভাবে, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে ভাবে না। এই অনাগ্রহই আজ শিক্ষকদের শত্রু বানিয়ে রাজপথে ঠেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশে শিক্ষা প্রশাসনে প্রকৃত শিক্ষাবিদদের ক্রমশ অনুপস্থিতি। শিক্ষা নীতি প্রণয়ন, পাঠ্যক্রম সংস্কার, মূল্যায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই এমন ব্যক্তিদের দ্বারা নেওয়া হয়, যাদের শিক্ষা গবেষণা, শ্রেণিকক্ষ বাস্তবতা বা শিক্ষাব্যবস্থার গভীর অভিজ্ঞতা সীমিত। ফলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান সৃষ্টি হয়। শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষাবিজ্ঞানী এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের যথাযথ অংশগ্রহণ ছাড়া শিক্ষা সংস্কার টেকসই হতে পারে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন শিক্ষানীতি ও কারিকুলাম পরিবর্তন নিয়ে যে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি দেখা গেছে, তার অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকেই শিক্ষা প্রশাসনে শিক্ষাবিদদের সীমিত ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নয়, বরং গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান, একাডেমিক অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে। তাই শিক্ষা খাতের কার্যকর উন্নয়নের জন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাবিদদের সক্রিয় ও প্রভাবশালী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

হারিয়ে যাওয়া ধারাবাহিকতা: কেন শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষে শিক্ষাবিদদের দেখা যায় না?

বাংলাদেশের শিক্ষা সংকটের শিকড় অনুসন্ধান করতে গেলে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়: স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে আমরা কতবার প্রকৃত শিক্ষাবিদদের নেতৃত্ব পেয়েছি? এখানে শিক্ষাবিদ বলতে কেবল একজন শিক্ষককে বোঝানো হচ্ছে না; বরং এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হচ্ছে যাঁর শিক্ষা বিষয়ে উচ্চতর একাডেমিক প্রশিক্ষণ রয়েছে, যিনি শিক্ষাবিজ্ঞান, শিক্ষানীতি, পাঠক্রম উন্নয়ন কিংবা শিক্ষা গবেষণায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং যিনি শিক্ষা ব্যবস্থার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বাস্তবতা উভয়ই গভীরভাবে অনুধাবন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে একটি ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সময় শিক্ষা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর গঠিত প্রথম প্রশাসনিক কাঠামোতে শিক্ষা বিষয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়েছিল। সেই সময় শিক্ষা পুনর্গঠন এবং জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তার পেছনে ছিল শিক্ষা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই শিক্ষা সংস্কারের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন এবং একটি জাতীয় রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোতে শিক্ষা প্রশাসনের ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন প্রবণতা দৃশ্যমান হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রায়শই এমন একটি প্রশাসনিক খাত হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক ভারসাম্য, দলীয় বিবেচনা, পেশাগত পরিচয় বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে; কিন্তু শিক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞতা সবসময় অগ্রাধিকার পায়নি। ফলে এমন অনেক ব্যক্তি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এসেছেন, যাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলেও শিক্ষা দর্শন, শিক্ষা অর্থনীতি, পাঠক্রম উন্নয়ন, শিক্ষামনোবিজ্ঞান বা শিক্ষানীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান সীমিত ছিল।

এখানেই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা নিহিত। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞানকে মূল্য দিই, কৃষি খাতে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শকে গুরুত্ব দিই, প্রকৌশল প্রকল্পে প্রকৌশলীর দক্ষতাকে অপরিহার্য মনে করি। কিন্তু শিক্ষা খাতের ক্ষেত্রে বহু সময় ধরে এমন একটি ধারণা কাজ করেছে যেন শিক্ষা পরিচালনা করার জন্য শিক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া অপরিহার্য নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হয়েছে।

শিক্ষা একটি অত্যন্ত জটিল ও বিশেষায়িত ক্ষেত্র। একটি পাঠক্রম প্রণয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ, শিক্ষক উন্নয়ন কাঠামো তৈরি, শিক্ষার্থীর শিখনফল মূল্যায়ন কিংবা ভবিষ্যতের কর্মবাজারের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় সাধন কোনো সাধারণ প্রশাসনিক কাজ নয়। এগুলো এমন বিষয়, যার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ গবেষণা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং বাস্তব ক্ষেত্রের গভীর উপলব্ধি। ফলে শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্ব যদি শিক্ষা-গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের হাতে না থাকে, তাহলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবতার মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশ্বের সফল শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় কারিকুলাম কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা কমিশনগুলোতে শিক্ষাবিদদের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জাপানে শিক্ষা সংস্কার কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি গবেষণানির্ভর এবং বিশেষজ্ঞনেতৃত্বাধীন একটি প্রক্রিয়া। ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও শিক্ষানীতির মৌলিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হলো, শিক্ষা অনেক সময় জাতীয় উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে নয়, বরং স্বল্পমেয়াদি প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে এক সরকারের নীতি আরেক সরকার পরিবর্তন করেছে, এক কারিকুলামের জায়গায় আরেক কারিকুলাম এসেছে, কিন্তু একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা দর্শন গড়ে ওঠেনি। এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং পুরো জাতি।

আজ তাই নতুন করে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে: শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্ব কি এমন ব্যক্তিদের হাতে থাকা উচিত নয়, যারা শিক্ষা বিষয়ে গবেষণা করেছেন, শিক্ষাব্যবস্থার তাত্ত্বিক ভিত্তি বোঝেন এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রাখেন? একটি জাতির ভবিষ্যৎ যদি তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে, তবে সেই ব্যবস্থার নেতৃত্বে শিক্ষা-জ্ঞানের উপস্থিতি কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত নয়?

বাংলাদেশের শিক্ষা পুনর্জাগরণের পথ সম্ভবত এখান থেকেই শুরু হতে পারে। কারণ শিক্ষা সম্পর্কে যারা গভীরভাবে জানেন, গবেষণা করেছেন এবং জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের হাতে শিক্ষা ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা তুলে দেওয়া না গেলে আমরা হয়তো বারবার সংস্কারের কথা বলব, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের দেখা পাব না। শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট শেষ পর্যন্ত কারিকুলামের সংকট নয়, বরং নেতৃত্বের সংকট। আর সেই সংকটের সমাধান শুরু হয় শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষে শিক্ষাবিদদের প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে।

শিক্ষায় দুর্নীতি ও অপচয়: শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যায় উন্নয়নের অর্থ

বাংলাদেশের শিক্ষা সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপেক্ষা করা যায় না—শিক্ষাখাতে দুর্নীতি, অপচয় এবং সম্পদের অদক্ষ ব্যবস্থাপনা। শিক্ষা উন্নয়নের জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও প্রশ্ন রয়ে যায়: এই অর্থের কতটুকু প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীর শেখার পরিবেশ উন্নয়নে ব্যয় হয়, আর কতটুকু প্রশাসনিক অদক্ষতা, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির জালে হারিয়ে যায়?

একটি বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ, পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, শিক্ষা উপকরণ ক্রয়, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কিংবা ডিজিটালাইজেশন প্রকল্প—প্রায় প্রতিটি স্তরেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনেক সময় দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রয়োজনের সঙ্গে বাস্তব বরাদ্দের সামঞ্জস্য নেই। কোথাও ভবন আছে কিন্তু শিক্ষক নেই, কোথাও শিক্ষক আছে কিন্তু পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, আবার কোথাও আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়েছে অথচ তা ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণই দেওয়া হয়নি। ফলে বিনিয়োগ হয়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয় না।

শিক্ষা অর্থনীতির একটি মৌলিক ধারণা হলো ‘Efficiency of Spending’ বা ব্যয়ের কার্যকারিতা। অর্থাৎ কত টাকা ব্যয় করা হলো তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ব্যয়ে কতটা শিক্ষাগত উন্নতি অর্জিত হলো। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বহু সময় ব্যয়ের পরিমাণ আলোচনায় আসে, কিন্তু ফলাফল মূল্যায়নের সংস্কৃতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কতজন শিক্ষার্থীর শেখার মান বৃদ্ধি পেল, কতজন শিক্ষক দক্ষতা অর্জন করলেন কিংবা বিদ্যালয়ের পরিবেশ কতটা উন্নত হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে।

পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয়। বই ছাপানোর ব্যয়, মান নিয়ন্ত্রণ, ভুলত্রুটি সংশোধন এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় অদক্ষতা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। একইভাবে শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা অস্বচ্ছতার অভিযোগ জনআস্থাকে দুর্বল করে।

আরও উদ্বেগজনক হলো প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের সংস্কৃতি। আন্তর্জাতিক সহায়তা বা বড় বাজেটের প্রকল্প শেষ হলে অনেক উদ্যোগও কার্যত থেমে যায়। ফলে টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পরিবর্তে কাগজে-কলমে সাফল্যের গল্প তৈরি হয়, কিন্তু শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা খুব বেশি বদলায় না।

দুর্নীতি কেবল অর্থ আত্মসাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ভুল পরিকল্পনা, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, অনুপযুক্ত অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং জবাবদিহিতার অভাবও এক ধরনের অপচয়। যখন একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর সময় নষ্ট হয়, তখন সেটিও জাতীয় সম্পদের অপচয়। যখন একটি অকার্যকর প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয় অথচ শিক্ষার মানের কোনো উন্নতি হয় না, তখন সেই ব্যয়ও কার্যত দুর্নীতির সমতুল্য সামাজিক ক্ষতির জন্ম দেয়।

অতএব, বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের আলোচনায় শুধু নতুন কারিকুলাম বা নতুন নীতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন মূল্যায়নব্যবস্থা। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত প্রতিটি টাকা যদি শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানোর আগেই অপচয় হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়নের সমস্ত উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা শেষ পর্যন্ত কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শিক্ষা খাতে প্রকৃত সংস্কার শুরু হয় তখনই, যখন প্রতিটি বরাদ্দকৃত টাকার হিসাব জনগণের কাছে স্পষ্ট থাকে এবং তার সুফল সরাসরি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যায়।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট আমাদের বিচ্যুতি: যেখানে শিক্ষক জাতির স্থপতি, আর যেখানে তিনি কেবল কর্মচারী

কোনো জাতি তার শিক্ষকদের কী চোখে দেখে, সেটি সেই জাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়। একটি দেশের মহাসড়ক, আকাশচুম্বী অট্টালিকা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে তার উন্নয়নকে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়; কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত সভ্যতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে তার শিক্ষক, গবেষক এবং জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতখানি মর্যাদা দেয় তার ওপর।

বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কখনো ব্যয় হিসেবে দেখেনি; দেখেছে জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে। তারা শিক্ষককে কেবল পাঠদানকারী কর্মী হিসেবে বিবেচনা করেনি; বিবেচনা করেছে জাতি নির্মাণের প্রধান কারিগর হিসেবে। এই কারণেই জাপান, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে শিক্ষকতা একটি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা জাপানের গল্পটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধের পর যখন দেশটির শিল্প, অর্থনীতি এবং অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, তখন একটি প্রশ্ন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে: "কতজন শিক্ষক বেঁচে আছেন?" কারণ তারা উপলব্ধি করেছিল, ভবন পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব, কিন্তু মানুষ গড়ে তোলার কারিগর হারিয়ে গেলে জাতির পুনর্জাগরণ অসম্ভব। সেই উপলব্ধির ফলেই জাপান শিক্ষা এবং শিক্ষকদের মর্যাদাকে জাতীয় পুনর্গঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিল।

জার্মানির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। দেশটির শিক্ষা দর্শনের ভিত্তিতে রয়েছে এই বিশ্বাস যে জ্ঞানই হলো অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান উৎস। তাই শিক্ষককে সেখানে শুধু চাকরিজীবী হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা, গবেষণার সুযোগ এবং সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করার জন্য সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

শিক্ষা সমাজতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক এমিল দুর্খেইম মনে করতেন, শিক্ষক হলেন সমাজের নৈতিক প্রতিনিধি। তাঁর দায়িত্ব কেবল তথ্য সরবরাহ করা নয়; বরং একটি জাতির মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং নাগরিক চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে স্থানান্তর করা। এই কারণেই উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষকের মর্যাদা অনেক সময় বিচারক, চিকিৎসক কিংবা উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সমপর্যায়ের বলে বিবেচিত হয়। সেখানে শিক্ষককে সম্মান করা ব্যক্তিগত সৌজন্যের বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক সংস্কৃতি।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এই বৈশ্বিক প্রবণতা থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্যুত। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষা খাতের গুরুত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের অভাব না থাকলেও বাস্তব নীতিনির্ধারণে শিক্ষার অবস্থান প্রায়শই প্রান্তিক থেকে গেছে। জাতীয় বাজেট, গবেষণা বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা মানবসম্পদ পরিকল্পনায় শিক্ষা যে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, তা বহু ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।

আরও উদ্বেগজনক হলো, শিক্ষাকে অনেক সময় একটি "সার্ভিস সেক্টর" বা সেবামূলক প্রশাসনিক খাত হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে শিক্ষককে জ্ঞানসৃষ্টিকারী পেশাজীবী হিসেবে নয়, বরং নির্দেশ বাস্তবায়নকারী কর্মচারী হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হয়। শিক্ষা তখন একটি সৃজনশীল মানবিক প্রক্রিয়া না হয়ে পরিণত হয় প্রশাসনিক আনুগত্যের কাঠামোয়।

আধুনিক শিক্ষা গবেষণায় "Professional Capital" নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা রয়েছে, যা কানাডীয় শিক্ষাবিদ অ্যান্ডি হারগ্রিভস ও মাইকেল ফুলান বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের মতে, একটি শিক্ষা ব্যবস্থার মান নির্ভর করে শিক্ষককে কতখানি বিশ্বাস করা হচ্ছে এবং তাঁকে কতখানি পেশাগত স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। যেখানে শিক্ষককে বিশ্বাস করা হয়, সেখানে শিক্ষা বিকশিত হয়; আর যেখানে শিক্ষককে কেবল নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সেখানে সৃজনশীলতা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়।

বাংলাদেশের বহু শিক্ষক আজ এমন এক মানসিক বাস্তবতার মধ্যে কাজ করেন, যেখানে দৃশ্যমান শাস্তির চেয়ে অদৃশ্য চাপ অনেক বেশি কার্যকর। এই চাপ সবসময় প্রকাশ্য নয়, কিন্তু এর প্রভাব গভীর। পদোন্নতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কা, বদলির ভয়, রাজনৈতিক চাপ কিংবা পেশাগত মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা অনেক সময় শিক্ষকদের স্বাধীন চিন্তা ও উদ্যোগকে সংকুচিত করে ফেলে।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ক্ষমতার আধুনিক রূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, সমকালীন সমাজে নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় সবসময় দৃশ্যমান বলপ্রয়োগ নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ নিজেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করতে শুরু করে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক শিক্ষক আজ সেই বাস্তবতার মুখোমুখি। তাঁদের হাতে কলম আছে, কিন্তু সেই কলম কতটা স্বাধীনভাবে চলতে পারবে, সে প্রশ্ন অনেক সময় তাঁদের তাড়িত করে।

এখানেই বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দেশগুলোর মৌলিক পার্থক্য। সেখানে রাষ্ট্র শিক্ষকের ওপর আস্থা রাখে; এখানে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষককে তদারকির বিষয় হিসেবে দেখা হয়। সেখানে শিক্ষককে নীতি প্রণয়নের অংশীদার করা হয়; এখানে তাঁকে নীতির গ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে শিক্ষা হলো জাতীয় শক্তির উৎস; এখানে তা অনেক সময় প্রশাসনিক দায়িত্বের একটি খাতমাত্র।

এই বিচ্যুতির মূল্য কেবল শিক্ষকরা দিচ্ছেন না; পুরো জাতি দিচ্ছে। কারণ একজন শিক্ষক যখন আত্মবিশ্বাস হারান, তখন তাঁর শিক্ষার্থীরাও অনুপ্রেরণা হারায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যখন স্বাধীনতা হারায়, তখন গবেষণা দুর্বল হয়ে পড়ে। আর একটি রাষ্ট্র যখন জ্ঞানচর্চাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তার উন্নয়নও দীর্ঘমেয়াদে ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।

অতএব, বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন কোনো কারিকুলাম প্রণয়ন নয়, কিংবা নতুন কোনো প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করাও নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষকের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা। কারণ ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো, যে জাতি তার শিক্ষকদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেয় না, সে জাতি একসময় নিজেও বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে।

রাজপথের আর্তনাদ: এটি কি কেবল অর্থের জন্য?

রাজপথে বসে থাকা একজন শিক্ষককে দেখে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ প্রায়শই একটি সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়: তাঁরা হয়তো বেতন বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করছেন, অথবা জাতীয়করণের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। সংবাদ শিরোনাম, টকশো বিতর্ক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী আলোচনায় শিক্ষকদের আন্দোলনকে প্রায়শই অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেক গভীর, অনেক জটিল এবং অনেক বেশি বেদনাদায়ক।

শিক্ষকদের বর্তমান আন্দোলনকে যদি কেবল বেতন বা আর্থিক সুবিধার প্রশ্নে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে সংকটের প্রকৃত চরিত্রকে অস্বীকার করা হবে। কারণ একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথে বসেন, তখন তিনি শুধু কিছু আর্থিক সুবিধার জন্য তাঁর পেশাগত দায়িত্ব স্থগিত করেন না; তিনি আসলে একটি গভীর সংকটের বিরুদ্ধে শেষ অবলম্বন হিসেবে প্রতিবাদ জানান। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পেশাগত মর্যাদা, স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন।

সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার পেশাজীবীদের একটি স্বতন্ত্র সামাজিক শ্রেণি হিসেবে দেখেছিলেন, যাদের মূল শক্তি তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং পেশাগত স্বাধীনতা। আধুনিক শিক্ষা তত্ত্বেও "Professional Autonomy" বা পেশাগত স্বায়ত্তশাসনকে একজন শিক্ষকের কার্যকর ভূমিকা পালনের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ একজন শিক্ষককে শুধু পাঠ্যবই অনুসরণকারী কর্মচারী হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান নির্মাণের একজন স্বাধীন পেশাজীবী হিসেবে দেখতে হবে।

কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক বাস্তবতা ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরে। শিক্ষকদের একটি বড় অংশ ক্রমশ অনুভব করছেন যে তাঁরা আর শ্রেণিকক্ষের নাবিক নন; তাঁরা কেবল নির্দেশনা বাস্তবায়নের যন্ত্রে পরিণত হচ্ছেন। কোন বিষয় কীভাবে পড়াতে হবে, কোন পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করতে হবে, কোন ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হবে, এমনকি কখনো কখনো কী ধরনের মতামত দেওয়া যাবে কিংবা যাবে না, সেই সিদ্ধান্তও উপরমহলের নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Pedagogy of the Oppressed-এ শিক্ষা ব্যবস্থার যান্ত্রিকীকরণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর মতে, শিক্ষক যদি কেবল নির্দেশ পালনকারী কর্মকর্তা হয়ে যান, তবে শিক্ষা আর মুক্তির উপায় থাকে না; তা পরিণত হয় নিয়ন্ত্রণের একটি ব্যবস্থায়। কারণ প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয় তখনই, যখন শিক্ষক তাঁর অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক বোধ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখান।

শিক্ষকের পেশাগত স্বাধীনতা হারিয়ে গেলে প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হন শিক্ষার্থীরা। একটি শ্রেণিকক্ষে প্রতিটি শিক্ষার্থী আলাদা, প্রতিটি অঞ্চলের বাস্তবতা আলাদা, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনও আলাদা। কিন্তু যখন কেন্দ্রীয় নির্দেশনা সব কিছুর ওপর একরকম ছাঁচ চাপিয়ে দেয়, তখন শিক্ষকের নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং শিক্ষণ কৌশল প্রয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলাফল হিসেবে শিক্ষা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, একমাত্রিক এবং প্রাণহীন।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো মর্যাদার প্রশ্ন। একজন চিকিৎসক যদি চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো স্বাধীনতা না পান, একজন প্রকৌশলী যদি প্রকল্পের প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, কিংবা একজন বিচারক যদি স্বাধীনভাবে রায় দিতে না পারেন, তাহলে তাঁদের পেশাগত পরিচয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ঠিক একইভাবে, একজন শিক্ষক যদি তাঁর পেশাগত বিচারবোধ প্রয়োগের সুযোগ না পান, তাহলে তাঁর পেশার মৌলিক অস্তিত্বই সংকটে পড়ে।

এই কারণেই শিক্ষকদের আন্দোলনকে অনেক বিশ্লেষক "Recognition Movement" বা স্বীকৃতির আন্দোলন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। জার্মান দার্শনিক অ্যাক্সেল হনেথ দেখিয়েছেন, মানুষ কেবল অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে নয়, সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা হারানোর বিরুদ্ধেও আন্দোলন করে। শিক্ষকদের বর্তমান পরিস্থিতি সেই তত্ত্বের একটি বাস্তব প্রতিফলন। তাঁরা কেবল বেশি বেতন চান না; তাঁরা চান তাঁদের পেশাগত সত্তার স্বীকৃতি, তাঁদের জ্ঞানের মূল্যায়ন এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার প্রতি আস্থা।

রাজপথে শিক্ষকদের উপস্থিতি তাই একটি অর্থনৈতিক ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি একটি প্রতীক। এটি রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে শিক্ষা শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে পরিচালিত হয় না। শিক্ষা একটি মানবিক সম্পর্ক, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং জ্ঞানের মধ্যে একটি জীবন্ত সংলাপ বিদ্যমান। সেই সংলাপের কেন্দ্র থেকে যদি শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত স্বাধীনতা সংকুচিত হতে থাকলে মেধাবী তরুণরা শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো দেখিয়েছে যে উচ্চমানের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সেরা মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা। কিন্তু যদি শিক্ষকতা এমন একটি পেশায় পরিণত হয় যেখানে স্বাধীনতা সীমিত, মর্যাদা অনিশ্চিত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্ষীণ, তাহলে মেধাবীরা অন্য পেশায় চলে যাবে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো জাতিকে বহন করতে হবে।

সুতরাং শিক্ষকদের রাজপথে অবস্থানকে কেবল বেতন বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ করে দেখা একটি বড় ভুল। এই আর্তনাদ মূলত একটি অস্তিত্ব রক্ষার আর্তনাদ। এটি এমন একটি পেশার আর্তনাদ, যারা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে কিন্তু নিজেরাই ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। এটি এমন মানুষদের কণ্ঠস্বর, যারা শ্রেণিকক্ষে স্বাধীনভাবে চিন্তা শেখাতে চান, কিন্তু নিজেরাই স্বাধীনভাবে চিন্তা ও কাজ করার পরিসর হারানোর ভয় অনুভব করছেন।

অতএব, শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে রাজপথের ব্যানার নয়, তার অন্তর্নিহিত বেদনা পড়তে হবে। সেখানে কেবল অর্থনৈতিক দাবির ভাষা নেই; সেখানে রয়েছে মর্যাদার দাবি, স্বাধীনতার দাবি এবং একটি পেশার আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের আকুতি। কারণ শিক্ষক যখন তাঁর পেশাগত স্বাধীনতা হারান, তখন শুধু একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ভাঙন: সংস্কারের নামে কি মর্যাদার সংকট?

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শিক্ষাঙ্গনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক চিত্রগুলোর একটি হলো শিক্ষকদের প্রকাশ্য অপমান ও লাঞ্ছনার ঘটনা। বিভিন্ন সময়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে যেখানে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, প্রতিবাদ কিংবা প্রতীকী শাস্তির ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো?

একটি সভ্য সমাজে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে মতভেদ থাকতে পারে, প্রতিবাদ থাকতে পারে, কিন্তু অপমান কখনোই শিক্ষার সংস্কৃতি হতে পারে না। যখন শিক্ষককে জনসমক্ষে হেয় করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন ব্যক্তি নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি।

এখানেই নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব, যারা শিক্ষা সংস্কারের কথা বলেন, তারা কি শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় যথেষ্ট দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন? শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে কি যথেষ্ট দ্রুত ও কার্যকর বার্তা দেওয়া হয়েছে? নাকি নীরবতা অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে শিক্ষককে সম্মান করার সামাজিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়েছে?

এই প্রশ্ন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন নেতৃত্বের শীর্ষে এমন ব্যক্তিত্ব থাকেন, যিনি বিশ্বব্যাপী মানবকল্যাণ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সমাজের অনেকেই তাই জানতে চান: শিক্ষা সংস্কারের আলোচনার পাশাপাশি শিক্ষকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি কেন সমান গুরুত্ব পেল না?

আমরা জানি, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন শিক্ষকরা। রাষ্ট্র যদি তাদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার প্রভাব বহু প্রজন্ম ধরে বহন করতে হয়। শিক্ষকদের সঙ্গে নীতিগত মতপার্থক্য থাকতে পারে, প্রশাসনিক সংস্কারও হতে পারে; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এমন পরিবেশ তৈরি হওয়া উচিত নয়, যেখানে শিক্ষক নিজেকে সমাজে অসম্মানিত ও অনিরাপদ মনে করেন। অতএব, আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং একটি জাতি হিসেবে আমরা কি শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি? কারণ শিক্ষককে ছোট করা সহজ, কিন্তু শিক্ষকহীন মর্যাদাবান সমাজ নির্মাণ করা অসম্ভব।

জ্ঞানের দুর্গের বিরুদ্ধে শব্দের আঘাত: যখন বিশ্ববিদ্যালয়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়

বাংলাদেশের শিক্ষা-ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যতবার সংকটে পড়েছে, ততবার পথ দেখিয়েছে তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনর্জাগরণ, প্রতিটি অধ্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সমাজের বিবেক, জাতির চিন্তার কেন্দ্র এবং ভবিষ্যতের নির্মাণশালা। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও আমাদের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশ এখনও জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদায় দেখতে শেখেনি।

শিক্ষাকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার যে প্রত্যাশা একটি উন্নয়নশীল জাতির কাছে স্বাভাবিক, বাস্তবতা প্রায়শই তার বিপরীত ছবি তুলে ধরে। বাজেট বরাদ্দের আলোচনায় শিক্ষা পিছিয়ে থাকে, গবেষণা বিনিয়োগকে বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনগুলো প্রায়শই প্রশাসনিক পরিসংখ্যানের নিচে চাপা পড়ে যায়। এর মধ্যেই যখন কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্ব দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সম্পর্কে অবমাননাকর বা অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করেন, তখন সেটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বক্তব্য থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে জ্ঞান, গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক মূল্যবোধের ওপর এক ধরনের প্রতীকী আঘাত।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কয়েকটি ভবন, শ্রেণিকক্ষ কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোর সমষ্টি নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি সভ্যতার স্মৃতি, একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের চিন্তাশক্তি তৈরির কারখানা। এখানে শুধু পাঠদান হয় না; এখানে ধারণার জন্ম হয়, মতবাদের সংঘাত ঘটে, নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হয় এবং একটি সমাজ নিজেকে পুনরাবিষ্কার করার শক্তি অর্জন করে। যে সমাজ তার বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল চাকরির প্রস্তুতির কেন্দ্র হিসেবে দেখে, সে সমাজ আসলে নিজের চিন্তার পরিধিকেই সংকুচিত করে ফেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সেই বৃহত্তর সত্যেরই একটি প্রতিফলন। উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠ কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের পদচিহ্ন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল মিছিল, মুক্তিযুদ্ধের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অসংখ্য অধ্যায় এই ক্যাম্পাসের মাটির সঙ্গে মিশে আছে। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে মূল্যায়ন করতে গেলে কেবল ভবনের সংখ্যা বা আয়তনের হিসাব যথেষ্ট নয়; মূল্যায়ন করতে হয় তার ঐতিহাসিক অবদান, সামাজিক প্রভাব এবং জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতার আলোকে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনায় প্রায়শই একটি সরলীকৃত মানসিকতা কাজ করে। গবেষণার প্রকৃতি, জ্ঞান উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুমাত্রিক ভূমিকা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়া অনেক সময় এমন মন্তব্য করা হয়, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। অথচ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশের পেছনে বছরের পর বছর শ্রম, তথ্য সংগ্রহ, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের সংগ্রাম জড়িয়ে থাকে। একটি গবেষণাগার থেকে যে জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তার ফল হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নয়; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটিই একটি জাতির অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং নীতিনির্ধারণের ভিত্তি নির্মাণ করে।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এবং অবকাঠামোগত সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করে। তবুও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা, জ্ঞানচর্চা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা নিরন্তর অবদান রেখে চলেছে। সীমিত সম্পদ, অপ্রতুল গবেষণা অনুদান এবং তুলনামূলকভাবে কম বেতন কাঠামোর মধ্যেও যে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন, তাঁদের অবদানকে খাটো করে দেখা শুধু অন্যায় নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।

প্রকৃতপক্ষে, একটি রাষ্ট্র তার বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কী ভাষায় কথা বলে, সেটি সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়। যে রাষ্ট্র তার গবেষককে সন্দেহের চোখে দেখে, তার শিক্ষককে অবমূল্যায়ন করে এবং তার বিশ্ববিদ্যালয়কে অবজ্ঞা করে, সে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে যে রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয়, গবেষণায় বিনিয়োগ করে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকে সম্মান করে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অগ্রগতি অর্জন করে।

আজকের বাংলাদেশে তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা কোনো মন্তব্যকে ঘিরে নয়। মূল প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই শিক্ষা ও গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখতে প্রস্তুত? আমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল ব্যয় হিসেবে দেখব, নাকি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করব? আমরা কি জ্ঞানের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মান করব, নাকি সাময়িক রাজনৈতিক বক্তব্যের বাজারে তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে দেব?

ইতিহাস বলে, যে জাতি তার বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল করে, সে জাতি শেষ পর্যন্ত নিজেকেই দুর্বল করে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল ভাঙলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি জাতির চিন্তা করার ক্ষমতা, প্রশ্ন করার সাহস এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি। তাই শিক্ষার মর্যাদা রক্ষা করা মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষা করা নয়; বরং একটি জাতির আত্মমর্যাদা রক্ষা করা।

শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের সম্পর্কে বিপর্যয়: যখন জ্ঞানের স্তম্ভগুলোতে ফাটল ধরে

একটি জাতির সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে তিনটি পরস্পরনির্ভর স্তম্ভের ওপর: শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্র। শিক্ষক তৈরি করেন মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে জ্ঞান, আর রাষ্ট্র সেই জ্ঞান ও মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে নির্মাণ করে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথরেখা। এই তিন শক্তির মধ্যে যখন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং সহযোগিতার সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, তখন জাতি এগিয়ে যায়। কিন্তু যখন সেই সম্পর্কের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সংকট শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার অভিঘাত পৌঁছে যায় রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গনে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা চোখে পড়ে। শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার ঐতিহাসিক আস্থার সম্পর্ক যেন ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। যে শিক্ষক একসময় সমাজের নৈতিক অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হতেন, আজ তিনি প্রায়শই প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের চাপে বিপর্যস্ত। যে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র, তা অনেক ক্ষেত্রে নীতিগত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত। আর যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল শিক্ষা ও গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, সে রাষ্ট্র প্রায়শই দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়নকে জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে দেখা যায়।

একটি সময় ছিল, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করতেন না; তাঁরা ছিলেন সমাজের বিবেক। তাঁদের বক্তব্য, গবেষণা ও চিন্তাভাবনা জাতীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলত। রাষ্ট্রও তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিত। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সম্পর্কের জায়গায় তৈরি হয়েছে দূরত্ব, অবিশ্বাস এবং কখনও কখনও প্রকাশ্য বিরোধ। শিক্ষকদের দাবিদাওয়া উপেক্ষিত হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সক্ষমতা সীমিত হয়েছে, আর শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় যথাযথ একাডেমিক পরামর্শ ছাড়াই গ্রহণ করা হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।

এই সম্পর্কের অবনতির একটি বড় লক্ষণ হলো মর্যাদার সংকট। অর্থনৈতিক সংকটের চেয়েও ভয়াবহ হলো সম্মানের সংকট। একজন শিক্ষক যখন অনুভব করেন যে রাষ্ট্র তাঁর পেশাগত স্বাধীনতা, গবেষণা-সৃজনশীলতা কিংবা সামাজিক মর্যাদাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছে না, তখন তাঁর মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়। একইভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় যখন নিজেকে জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার নয়, বরং কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে অনুভব করতে শুরু করে, তখন তার জ্ঞান উৎপাদনের প্রাণশক্তিও ক্ষীণ হয়ে আসে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, অংশীদারিত্বের। গবেষণাগার থেকে উৎপন্ন জ্ঞান সরাসরি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় ব্যবহার হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জাতীয় নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রও শিক্ষা ও গবেষণাকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে জ্ঞানের সঙ্গে উন্নয়নের একটি স্বাভাবিক সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশে সেই সেতুবন্ধন বহু ক্ষেত্রেই দুর্বল। গবেষণা বরাদ্দ সীমিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত চাহিদা ব্যাপক, আর শিক্ষকদের অনেক সময় মৌলিক পেশাগত চাহিদা নিয়েও আন্দোলনে নামতে হয়। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শনের একটি গভীর সংকেত। কারণ যে রাষ্ট্র তার শিক্ষকদের রাজপথে বসতে বাধ্য করে, সে রাষ্ট্র মূলত নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাতাদেরই অবমূল্যায়ন করে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পরিস্থিতির প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়ছে। তারা দেখছে, যাঁদের কাছ থেকে জ্ঞান, মূল্যবোধ ও অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা, সেই শিক্ষকরা নিজেরাই মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার সংগ্রামে ব্যস্ত। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কেও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তখন আর কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র থাকে না; বরং হয়ে ওঠে অসন্তোষ, অনিশ্চয়তা এবং হতাশার প্রতীক।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, কোনো জাতি তার শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল করে শক্তিশালী হতে পারেনি। প্রাচীন এথেন্স থেকে আধুনিক জাপান, জার্মানি কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া, প্রতিটি সফল রাষ্ট্রই জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় অগ্রগতির কেন্দ্রে স্থান দিয়েছে। কারণ তারা বুঝেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে যে ধারণার জন্ম হয়, সেটিই একদিন শিল্প, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

আজ বাংলাদেশের সামনে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে: শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্র কি আবার নতুন করে আস্থার বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে? নাকি এই দূরত্ব আরও বাড়তে থাকবে? উত্তরটি নির্ভর করছে রাষ্ট্র কতটা আন্তরিকভাবে শিক্ষা ও গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারে তার ওপর।

কারণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কোনো মন্ত্রণালয়ের ফাইলে নয়, কোনো প্রকল্পের ইট-পাথরে নয়, বরং শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে, গবেষকের গবেষণাগারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তচিন্তার পরিসরে নির্মিত হয়। সেই পরিসর যদি সংকুচিত হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কেবল শিক্ষা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জাতির আগামী।

জাতির ভিত্তির ফাটল: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা চ্যালেঞ্জ কেন স্কুলশিক্ষা

একটি অট্টালিকার সৌন্দর্য তার গম্বুজে নয়, তার ভিত্তিতে নির্ভর করে। ভিত্তি দুর্বল হলে শত তলা ভবনও একদিন ধসে পড়ে। একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি উদ্ভাবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতই চমকপ্রদ হোক না কেন, যদি স্কুলশিক্ষার ভিত দুর্বল থাকে, তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি নয়, অবকাঠামো নয়, এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতাও নয়; সবচেয়ে গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকট হলো স্কুলশিক্ষার সংকট।

আজ দেশের শহর থেকে গ্রাম, সরকারি বিদ্যালয় থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাংলা মাধ্যম থেকে ইংরেজি মাধ্যম পর্যন্ত সর্বত্র একটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য সনদধারী প্রজন্ম তৈরি করছি? এই প্রশ্নের উত্তর যতটা অস্বস্তিকর, ততটাই উদ্বেগজনক।

স্কুলশিক্ষা একটি জাতির চরিত্র গঠনের প্রথম প্রতিষ্ঠান। শিশুরা এখানে শুধু অক্ষরজ্ঞান অর্জন করে না; তারা শেখে মূল্যবোধ, যুক্তিবোধ, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং নাগরিক চেতনা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশ এমন এক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে, যেখানে পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি শিশুর সৃজনশীলতা, কৌতূহল কিংবা মানবিক বিকাশের চেয়ে তার প্রাপ্ত নম্বরই যেন তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়।

গত এক যুগে স্কুলশিক্ষায় ধারাবাহিক পরীক্ষানিরীক্ষা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারিকুলাম পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতির রদবদল, নতুন বিষয় সংযোজন এবং শিক্ষাদর্শনের ঘনঘন রূপান্তর শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থিতিশীলতার পরিবর্তে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। একটি প্রজন্ম যখন একটি পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, তখনই আরেকটি নতুন পদ্ধতি এসে হাজির হয়েছে। ফলে শিক্ষা অর্জনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে এবং শিখনফল নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর প্রশ্ন।

আরও বড় সমস্যা হলো মৌলিক দক্ষতার সংকট। বিভিন্ন গবেষণা ও মূল্যায়নে বারবার উঠে এসেছে যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী শ্রেণি উত্তীর্ণ হলেও বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী প্রত্যাশিত পাঠদক্ষতা, গণিত দক্ষতা এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না। অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছেও একটি জটিল অনুচ্ছেদ বুঝতে হিমশিম খায়, আবার অনেকে মৌলিক গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এটি কেবল শিক্ষার ব্যর্থতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির সক্ষমতার জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।

স্কুলশিক্ষার আরেকটি গভীর সংকট হলো বৈষম্য। রাজধানীর একটি আধুনিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মধ্যে সুযোগের পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল। একজন যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি, দক্ষ শিক্ষক এবং সমৃদ্ধ শিক্ষাসামগ্রীর সুবিধা পাচ্ছে, অন্যজন সেখানে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সীমিত শিক্ষাসহায়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে। ফলে শিক্ষা, যা সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হওয়ার কথা ছিল, অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্যের পুনরুৎপাদনের মাধ্যম হয়ে উঠছে।

এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষক প্রশ্ন। একটি দেশের স্কুলশিক্ষার মান কখনোই তার শিক্ষকদের মানের চেয়ে বেশি হতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের বহু স্কুলে শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং পেশাগত অনুপ্রেরণার অভাব একটি বাস্তব সমস্যা। শিক্ষককে যদি কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা পালনকারী কর্মচারীতে পরিণত করা হয়, তবে তিনি কখনোই একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষকে রূপ নিতে পারবেন না। শিক্ষা সংস্কারের প্রতিটি আলোচনায় তাই শিক্ষককে কেন্দ্রস্থলে না রাখলে কোনো পরিবর্তনই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

প্রযুক্তির যুগে আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আজকের শিশুরা বইয়ের চেয়ে বেশি সময় কাটায় পর্দার সামনে। তথ্যের প্রাচুর্য বেড়েছে, কিন্তু জ্ঞানের গভীরতা কমেছে। মনোযোগের স্থায়িত্ব কমছে, পাঠাভ্যাস দুর্বল হচ্ছে এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি বিকাশে নতুন বাধা তৈরি হচ্ছে। স্কুলশিক্ষাকে তাই কেবল পাঠ্যপুস্তকনির্ভর না রেখে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তথ্যকে বিশ্লেষণ করতে, প্রশ্ন করতে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্কুলশিক্ষার সংকটের ফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। একটি ভাঙা সেতু বা ধসে পড়া ভবন সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে; কিন্তু দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতি প্রকাশ পেতে সময় লাগে। এর প্রভাব দেখা যায় কর্মক্ষেত্রে, গবেষণায়, প্রশাসনে, রাজনীতিতে এবং সমাজের নৈতিক কাঠামোয়। আজকের দুর্বল স্কুলশিক্ষা আগামী দিনের দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়, দুর্বল অর্থনীতি এবং দুর্বল রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করে।

তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রকৃত লড়াই শুরু হয় স্কুলের শ্রেণিকক্ষে। নতুন মহাসড়ক, উড়ালসেতু কিংবা মেগা প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি শিশুর হাতে সঠিক বই পৌঁছে দেওয়া, একজন শিক্ষককে মর্যাদা দেওয়া এবং একটি বিদ্যালয়কে কার্যকর শিক্ষার পরিবেশে রূপান্তর করা। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় রাজধানীর নীতিনির্ধারণী কক্ষে নয়; নির্মিত হয় গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা শিশুটির স্বপ্নের ভেতর।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনশীল এবং মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে তাকে প্রথমে স্কুলশিক্ষার সংকট মোকাবিলা করতে হবে। কারণ জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি যেমন তার মানুষ, তেমনি তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হয়ে উঠতে পারে সেই মানুষ গড়ে তোলার ব্যর্থ ব্যবস্থা। আর সেই ব্যবস্থার নামই স্কুলশিক্ষা।

অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা, নাকি সবার অধিকার?

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার, সভ্যতার অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী উপকরণ। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষা ক্রমশ এমন এক অবস্থার দিকে এগিয়েছে, যেখানে এর মান ও সুযোগ-সুবিধা অনেকাংশে মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়—শিক্ষা কি একটি পণ্য, যা অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করা যায়, নাকি এটি এমন একটি সার্বজনীন অধিকার, যার মান ও মর্যাদা সকলের জন্য সমান হওয়া উচিত?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি বৈপরীত্য স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। একদিকে রয়েছে ব্যয়বহুল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে উন্নত অবকাঠামো, নিবিড় তদারকি, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। অন্যদিকে রয়েছে সরকারি বিদ্যালয়সমূহ, যেগুলোর অনেকগুলিতেই প্রশিক্ষিত শিক্ষক, বিস্তৃত ক্যাম্পাস, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা বিদ্যমান। তবুও প্রত্যাশিত শিক্ষার মান সর্বত্র সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এই বাস্তবতা কেবল অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাব, জবাবদিহিতার দুর্বলতা, প্রশাসনিক শৈথিল্য এবং পেশাগত প্রেরণার ঘাটতি শিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ফলত সমাজে এমন একটি ধারণা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে ভালো শিক্ষা অর্জন করতে হলে অধিক অর্থ ব্যয় করা ছাড়া বিকল্প নেই। শিক্ষা তখন আর কেবল জ্ঞানার্জনের পথ থাকে না; বরং এটি ধীরে ধীরে একটি বাজারজাত সেবায় রূপান্তরিত হয়, যেখানে আর্থিক সক্ষমতা শিক্ষার মান নির্ধারণের অন্যতম মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে কেবল আয়ের বৈষম্য নয়, জ্ঞান ও সুযোগের বৈষম্যও গভীরতর হয়। যে শিশু জন্মগতভাবে কোনো সুবিধাবঞ্চিত পরিবারে বেড়ে ওঠে, সে প্রায়শই এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার মুখোমুখি হয়, যেখানে তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।

কিন্তু একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের আদর্শ এই বৈষম্যকে সমর্থন করে না। শিক্ষা এমন একটি আলোকশিখা, যার দীপ্তি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের বিদ্যালয়গুলো যদি যথাযথ তদারকি, জবাবদিহিতা এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের মাধ্যমে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তবে সেগুলো সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তখন একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ তার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নয়, বরং তার মেধা, পরিশ্রম এবং সৃজনশীলতার ওপর নির্ভর করবে।

অতএব, শিক্ষা কোনো সাধারণ পণ্য নয়, যা কেবল অর্থের বিনিময়ে অধিকতর উৎকৃষ্ট রূপ লাভ করবে। এটি একটি মানবিক অধিকার, একটি সামাজিক অঙ্গীকার এবং জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য ভিত্তি। যে সমাজ তার সকল নাগরিকের জন্য সমান মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানভিত্তিক, ন্যায়নিষ্ঠ এবং টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে। শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা তখনই অর্জিত হবে, যখন বিদ্যালয়ের দরজা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে এবং সেই দরজার ভেতরে প্রবেশ করার পর আর্থিক বৈষম্যের কোনো ছায়া শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করতে পারবে না।

কোচিং অর্থনীতি ও ছায়া-শিক্ষার বিস্তার: শ্রেণিকক্ষের বাইরে আরেক শিক্ষা ব্যবস্থা

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম আলোচিত কিন্তু প্রায়শই অবহেলিত বাস্তবতা হলো কোচিংনির্ভর শিক্ষা সংস্কৃতি বা "শ্যাডো এডুকেশন"। আজ এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে অনেক অভিভাবক মনে করেন বিদ্যালয়ে পাঠদান কেবল আনুষ্ঠানিকতা; প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীকে কোচিং সেন্টার কিংবা ব্যক্তিগত টিউশনের ওপর নির্ভর করতেই হবে। ফলে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার প্রতি আস্থা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতা, অভিভাবকদের সামাজিক উদ্বেগ এবং শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত বৈষম্য একটি সমান্তরাল শিক্ষা বাজার তৈরি করেছে। বর্তমানে কোচিং খাত কেবল একটি সহায়ক শিক্ষাব্যবস্থা নয়; এটি বহু ক্ষেত্রে মূল শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্পে পরিণত হয়েছে।

এর ফলে কয়েকটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রথমত, অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও গভীর হচ্ছে। যেসব পরিবার অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে পারে না, তাদের সন্তানরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিদ্যালয়, কোচিং এবং ব্যক্তিগত পড়াশোনার চক্রে সৃজনশীলতা, খেলাধুলা এবং মানবিক বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তৃতীয়ত, শিক্ষা ক্রমশ জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে পরীক্ষায় নম্বর অর্জনের যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে।

শিক্ষানীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোচিং সংস্কৃতিকে প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ করার চেয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিক্ষাদান নিশ্চিত করাই অধিক ফলপ্রসূ সমাধান। অন্যথায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক দুই সমান্তরাল ধারায় বিভক্ত হতে থাকবে, যার মূল্য পরিশোধ করবে শিক্ষার্থী ও সমাজ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষা: আমরা কি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত?

বাংলাদেশের শিক্ষা সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি আগামী প্রজন্মকে ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করছি? চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে শুধুমাত্র পাঠ্যবইনির্ভর জ্ঞান আর যথেষ্ট নয়।

বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থাগুলো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এখন শুধু তথ্য মুখস্থ করার দক্ষতা নয়; বরং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সহযোগিতামূলক কাজের দক্ষতা এবং ডিজিটাল নাগরিকত্ব শেখানো হচ্ছে। কারণ তথ্য এখন একটি ক্লিকের দূরত্বে, কিন্তু তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োগ করার দক্ষতাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

বাংলাদেশে এখনও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা মূল্যায়িত হয় পরীক্ষার নম্বর দিয়ে। অথচ AI-নির্ভর ভবিষ্যতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে সেই দক্ষতাগুলো, যেগুলো যন্ত্র সহজে অনুকরণ করতে পারে না—সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচারবোধ, নেতৃত্ব, মানবিকতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তা।

শিক্ষার্থীদের AI ব্যবহারের কৌশল শেখানোর পাশাপাশি AI-এর সীমাবদ্ধতা, তথ্যের সত্যতা যাচাই, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল নৈতিকতা সম্পর্কেও শিক্ষা দেওয়া জরুরি। অন্যথায় আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করব, যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তিকে সমালোচনামূলকভাবে বুঝতে পারবে না।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের ভবিষ্যৎ তাই শুধু কারিকুলাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটিকে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে এগোতে হবে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সমাজে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে।

শিক্ষক উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষা সংস্কার অসম্ভব

বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আলোচনায় বেতন, পদমর্যাদা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়: শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য আমরা কতটা বিনিয়োগ করছি?

আধুনিক বিশ্বের সফল শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষকের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের ওপর। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে শিক্ষকতা একটি আজীবন শেখার পেশা। সেখানে শিক্ষকরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণা, সহকর্মী পর্যবেক্ষণ, মেন্টরিং এবং উদ্ভাবনী শিক্ষাদান পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

বাংলাদেশেও একটি কার্যকর Continuous Professional Development (CPD) কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি। বছরে একবার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের পরিবর্তে শিক্ষককে ধারাবাহিকভাবে শেখার সুযোগ দিতে হবে। নবীন শিক্ষকদের জন্য মেন্টরিং ব্যবস্থা, বিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম এবং শ্রেণিকক্ষ উদ্ভাবনের জন্য ক্ষুদ্র অনুদান (Classroom Innovation Grants) চালু করা যেতে পারে।

শিক্ষকদের গবেষণামূলক কাজ, নতুন শিক্ষণ কৌশল উদ্ভাবন এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানভিত্তিক উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে শিক্ষককে কেবল নির্দেশ পালনকারী কর্মচারী নয়, বরং জ্ঞানসৃষ্টিকারী পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বাস্তবতা হলো, কোনো শিক্ষাক্রমই শিক্ষকের চেয়ে শক্তিশালী নয়। পাঠ্যবই পরিবর্তন করা সহজ, কিন্তু একজন দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং গবেষণামুখী শিক্ষক তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদি কাজ। বাংলাদেশের শিক্ষা পুনর্জাগরণের পথ তাই শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের পেশাগত বিকাশের মধ্য দিয়েই অগ্রসর হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নজিরবিহীন অস্থিরতা ও ঘনঘন পরিবর্তনের তালগোল

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গত কয়েক বছরে যে নজিরবিহীন অস্থিরতা ও ঘনঘন পরিবর্তন চলেছে, তা কাটিয়ে ওঠা যেকোনো নির্বাচিত সরকারের জন্যই একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের প্রবর্তিত বিতর্কিত ‘নতুন শিক্ষাক্রম-২০২২’ বাতিল করে সাময়িকভাবে ২০১২ সালের পুরনো শিক্ষাক্রমে ফিরে গিয়েছিল এবং ২০২৬ সাল নাগাদ নতুন মূল্যায়নের খসড়া তৈরি করেছিল। তবে, বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই "হ-য-ব-র-ল" দশা থেকে শিক্ষাব্যবস্থাকে টেনে তুলতে বেশ কিছু বড় পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

বর্তমান নির্বাচিত সরকার এই জট খুলতে পারবে কি না এবং কীভাবে এগোচ্ছে, তা কয়েকটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা দরকার:

. নতুন কারিকুলাম সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ (২০২৭-২০২৮)

সরকার ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে, ঘনঘন পরিবর্তন বন্ধ করে তারা একটি স্থায়ী ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম তৈরি করছে।

  • ২০২৭ সালের অন্তর্বর্তীকালীন পরিমার্জন: ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী দিয়ে শুরু করে একটি পরিমার্জিত রূপ চালু করা হচ্ছে, যেখানে মুখস্থ বিদ্যার বদলে হাতে-কলমে শেখা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে সমন্বয় করা হবে। চতুর্থ শ্রেণীতে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এর মতো ৪টি নতুন বাধ্যতামূলক বিষয় যুক্ত হচ্ছে।
  • ২০২৮ সালের পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর: ২০২৮ সাল নাগাদ শিক্ষাব্যবস্থায় একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম স্থায়ীভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

. প্রাথমিকে মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার (২০২৬)

প্রাথমিক স্তরে (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী) শুধু ক্লাসরুমের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর না করে, পুনরায় লিখিত পরীক্ষার পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। ২০২৬ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সামষ্টিক মূল্যায়ন বা লিখিত পরীক্ষার সাথে প্রথমবারের মতো মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং পাস মার্ক ন্যূনতম ৪০% করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার হারিয়ে যাওয়া মান কিছুটা পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

. রাজনৈতিক সদিচ্ছা বনাম বাস্তবায়ন সংকট

নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের একটি বড় ম্যান্ডেট বা সমর্থন থাকে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছিল না। তাই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার অনেক বেশি শক্তিশালী। তবে মূল সমস্যাটি সরকারের সদিচ্ছায় নয়, বরং মাঠপর্যায়ে:

  • শিক্ষকদের সক্ষমতার অভাব: বিগত কয়েক বছরের টানাপোড়েনে শিক্ষকরা নিজেরাও বিভ্রান্ত। নতুন কোনো বিষয় বা পদ্ধতি চালু করতে গেলে শিক্ষকদের যে উন্নত মানের প্রশিক্ষণ দরকার, আমাদের সিস্টেমে তার তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
  • এনসিটিবি (NCTB)-র প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) বর্তমানে বিশেষজ্ঞ সংকটে ভুগছে। ডেপুটেশনে বা প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের ঘনঘন বদলির কারণে শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন হচ্ছে।

মূল কথা: বর্তমান নির্বাচিত সরকার যদি শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্থায়ী এবং রাজনীতি-মুক্ত "জাতীয় শিক্ষা কমিশন" গঠন করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়, তবেই এই হ-য-ব-র-ল দশা থেকে মুক্তি সম্ভব। বারবার সরকার বা আদর্শ পরিবর্তনের সাথে সাথে যদি পাঠ্যবই আর পরীক্ষার নিয়ম বদলাতে থাকে, তবে এই ক্ষত কোনো সরকারের পক্ষেই সারানো সম্ভব হবে না। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা ও রোডম্যাপ আশাব্যঞ্জক, তবে এর সফলতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে এর সঠিক ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়নের ওপর।

শিক্ষা নিয়ে ভুল করলে শাস্তি নেই: বিভ্রান্তির কারখানায় কে দায় নেবে?

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো—এই খাতে ভুল সিদ্ধান্তের প্রায় কোনো জবাবদিহি নেই। একজন চিকিৎসক ভুল চিকিৎসা করলে তদন্ত হয়। একজন প্রকৌশলী ভুল নকশা করলে জবাবদিহি করতে হয়। একজন ব্যাংকার ভুল সিদ্ধান্ত নিলে আর্থিক ক্ষতির হিসাব দিতে হয়। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি ভুল কারিকুলাম, একটি বিভ্রান্তিকর মূল্যায়ন পদ্ধতি কিংবা একটি অপরিকল্পিত সংস্কার লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করলেও দায় নির্ধারণের সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত।

গত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি শিক্ষা নিয়ে নানামুখী পরীক্ষানিরীক্ষা। কখনো কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নকে নতুন মোড়কে "সৃজনশীল প্রশ্ন" হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ সমালোচকদের মতে, প্রকৃত সৃজনশীলতার বিকাশের চেয়ে পরীক্ষার কাঠামো পরিবর্তনই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। আবার কখনো বিদেশি মডেলের আংশিক বা প্রেক্ষাপট-বিচ্ছিন্ন অনুকরণ করে এমন কারিকুলাম প্রবর্তনের চেষ্টা হয়েছে, যা দেশের বাস্তবতা, শিক্ষক প্রস্তুতি ও অবকাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্যের কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু অনেক সময় ভুলে যাওয়া হয় যে, কোনো দেশের শিক্ষামডেল কেবল পাঠ্যবই বা মূল্যায়ন পদ্ধতির নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে সেই দেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা।

সমস্যা বিদেশি ধারণা গ্রহণে নয়; সমস্যা হলো যথাযথ গবেষণা, পাইলটিং এবং বাস্তবতা যাচাই ছাড়া তা চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতায়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, নীতিনির্ধারক এবং বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত খ্যাতি, মতাদর্শিক অবস্থান কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা নিয়ে সমাজে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অনেক সময় নীতিগত ধারাবাহিকতার বদলে নীতিগত পরীক্ষার শিকার হন।

একটি রাষ্ট্রে শিক্ষা খাতের ভুলের মূল্য তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। সেতু ভাঙলে ছবি দেখা যায়, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হলে তার ক্ষতি প্রকাশ পায় এক দশক পরে—বিশ্ববিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে, গবেষণাগারে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায়। তাই সময় এসেছে একটি মৌলিক নীতি গ্রহণের: শিক্ষা সংস্কার হবে গবেষণাভিত্তিক, পরীক্ষিত এবং জবাবদিহিমূলক। যে সিদ্ধান্ত লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে, তার দায়ও নির্ধারিত হতে হবে। কারণ শিক্ষা নিয়ে ভুল করা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

শিক্ষা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবতার ফারাক: অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের হিসাব

একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির ওপর। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে তাই জনগণের অন্যতম বড় প্রত্যাশা থাকে শিক্ষা খাতে কার্যকর ও দূরদর্শী সংস্কার। অন্তর্বর্তী সরকারের আবির্ভাবও সেই প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষত রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দীর্ঘদিনের নীতিগত সংকটের পর অনেকেই মনে করেছিলেন, শিক্ষা খাতে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং গুণগত পরিবর্তনের সূচনা ঘটবে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে প্রশ্নটি ক্রমেই উচ্চকিত হয়েছে—সেই প্রতিশ্রুত সংস্কারের বাস্তব রূপ কোথায়?

শিক্ষা সংস্কারের আলোচনায় প্রথমেই সামনে আসে একটি সুসংহত রোডম্যাপের প্রশ্ন। সরকার পরিবর্তনের পর নানা বক্তব্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন করার অঙ্গীকার উচ্চারিত হলেও সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা জনসমক্ষে কতটা স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। ফলে নীতিগত ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির ব্যবধান ক্রমেই দৃশ্যমান হয়েছে।

একই সঙ্গে নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবও শিক্ষাক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করেছে। পূর্ববর্তী নীতিমালার সীমাবদ্ধতা দূর করার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা ও পুরোনো কাঠামোর মধ্যে এক ধরনের দ্বৈততা দেখা গেছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবক—তিন পক্ষই ভবিষ্যৎ শিক্ষা কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট ধারণা লাভে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার জায়গাটিও কিছুটা দুর্বল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের পর্যবেক্ষণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অবশ্য শিক্ষার মান নিয়ে। সংস্কারের প্রকৃত সাফল্য পরিমাপ করা হয় শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে। কিন্তু মৌলিক সাক্ষরতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, গবেষণার পরিবেশ কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা অর্জিত হয়েছে—সে প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। বরং বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিতই বেশি দেয়।

পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাও এই সংকটের বাইরে নয়। বিগত কয়েক বছরে মূল্যায়ন কাঠামো নিয়ে একাধিক পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ও চাকরির বাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের মূল্যায়নের সম্পর্ক কতটা কার্যকরভাবে স্থাপন করা গেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের বিষয়টি সংস্কারের কেন্দ্রে থাকার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রভাব এখনো সীমিত। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতির অভাবে ভুগছে। শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকারিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, নীতিনির্ধারণে সমন্বয়হীনতা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ের দুর্বলতা সংস্কারের গতি মন্থর করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাজেট ও অগ্রাধিকারের প্রশ্নও সামনে আসে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের বাস্তব ফল কতটা দৃশ্যমান—তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি নতুন উন্নয়ন দর্শনের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। তরুণদের ক্ষমতায়ন, উদ্ভাবন ও সামাজিক রূপান্তরের যে স্বপ্ন তুলে ধরা হয়েছিল, তার প্রতিফলন শিক্ষা খাতে কতটা ঘটেছে, সেটিও এখন মূল্যায়নের বিষয়। বিশেষত যুবসমাজের মধ্যে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে, তা সংস্কারের সাফল্য সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

সবশেষে এসে জবাবদিহিতার বিষয়টি অনিবার্য হয়ে ওঠে। শিক্ষা সংস্কার সফল হয়েছে কি না, তা পরিমাপের জন্য কী সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে? কোন মানদণ্ডে জনগণ বুঝবে যে পরিবর্তন বাস্তবেই কার্যকর হয়েছে? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া সংস্কারের দাবি কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি বহন করে।

অতএব, শিক্ষা খাত আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্নটি কেবল সংস্কার হয়েছে কি না, তা নয়; বরং সেই সংস্কার শিক্ষার্থীর জীবনে, শ্রেণিকক্ষে এবং জাতীয় উন্নয়নের ধারায় কতটা বাস্তব পরিবর্তন এনেছে—সেই উত্তরই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।

মুক্তির পথ: চাবুক সরিয়ে কলমকে স্বাধীনতা দেওয়া

প্রতিটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ আসে, যখন তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সে জ্ঞানের পথে হাঁটবে, নাকি ক্ষমতার পথে। সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে রাষ্ট্র শিক্ষককে সম্মান করেছে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বাধীনতা দিয়েছে এবং জ্ঞানচর্চাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ অর্জন করেছে। বিপরীতে, যে রাষ্ট্র শিক্ষককে নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখেছে, তাকে আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছে এবং শিক্ষাকে রাজনৈতিক স্বার্থের অধীনস্থ করেছে, সেই রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত মেধা, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা সংকট মূলত অবকাঠামোগত সংকট নয়; এটি মর্যাদা, আস্থা এবং নীতিগত দর্শনের সংকট। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ নতুন কোনো কারিকুলাম, নতুন কোনো প্রশাসনিক নির্দেশনা কিংবা নতুন কোনো প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল সমাধান নিহিত রয়েছে শিক্ষককে তার হারানো গৌরব, স্বাধীনতা এবং পেশাগত মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে।

শিক্ষাবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার মান কোনো দেশের জাতীয় আয়ের ওপর যতটা নির্ভর করে, তার চেয়েও বেশি নির্ভর করে শিক্ষক পেশার সামাজিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ওপর। ফিনল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা জাপানের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায় যে শিক্ষার উৎকর্ষ শুরু হয় শিক্ষককে কেন্দ্র করে। সেখানে শিক্ষক কেবল একজন চাকরিজীবী নন; তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাতা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষককে ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রথমত: শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও উচ্চতর বেতন কাঠামো প্রবর্তন

শিক্ষকদের জন্য একটি স্বাধীন ও মর্যাদাসম্পন্ন বেতন কাঠামো প্রবর্তন আজ আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় প্রয়োজন। অর্থনীতির ভাষায় যেকোনো পেশার আকর্ষণ নির্ধারিত হয় তার সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত নিরাপত্তা এবং আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে। যখন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনের পর শিক্ষকতার পরিবর্তে অন্য পেশাকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করেন, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজ শিক্ষক পেশাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বর্তমানে দেশের বহু শিক্ষক এমন এক বাস্তবতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন, যেখানে পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তাদের জীবিকার মৌলিক চাহিদা পূরণ নিয়েও উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। এর ফলে শিক্ষা ও গবেষণায় পূর্ণ মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একজন শিক্ষক যদি প্রতিনিয়ত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেন, তবে তাঁর কাছ থেকে বিশ্বমানের জ্ঞানচর্চা আশা করা অবাস্তব।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদদের "Human Capital Theory" অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ আসলে মানবসম্পদে বিনিয়োগ। একজন শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি কোনো ব্যয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ। কারণ একজন দক্ষ শিক্ষক হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করেন। তাই শিক্ষকদের জন্য একটি পৃথক ও মর্যাদাপূর্ণ বেতন স্কেল কেবল পেশাগত সম্মান নয়, জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

দ্বিতীয়ত: শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্বে শিক্ষকদের প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো শিক্ষা প্রশাসন ও শ্রেণিকক্ষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। যাঁরা নীতিনির্ধারণ করেন, তাঁদের একটি বড় অংশ কখনো বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠদান করেননি, কখনো গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হননি, কিংবা কখনো একজন শিক্ষকের বাস্তব চ্যালেঞ্জ প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করেননি।

শিক্ষা প্রশাসন মূলত একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র। যেমন হাসপাতাল পরিচালনায় চিকিৎসকদের মতামত অপরিহার্য, তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থার নেতৃত্বেও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য হওয়া উচিত। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিকুলাম বোর্ড এবং শিক্ষা কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দীর্ঘ শিক্ষণ ও গবেষণা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কারণ তাঁরা শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা বোঝেন, শ্রেণিকক্ষের চাহিদা বোঝেন এবং শিক্ষার্থীদের শেখার মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রাখেন।

বাংলাদেশেও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষাবিদদের প্রাধান্য নিশ্চিত করতে হবে। এতে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা অনেকাংশে কমে আসবে। শিক্ষা তখন কেবল প্রশাসনিক ফাইলের বিষয় হবে না; এটি হয়ে উঠবে বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি মানবিক প্রক্রিয়া।

তৃতীয়ত: শিক্ষকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার জন্য কঠোর আইনি সুরক্ষা

একটি সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা কেবল সাংস্কৃতিকভাবে নয়, আইনগতভাবেও সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষকদের সামাজিক অপমান, শারীরিক নিগ্রহ, রাজনৈতিক হয়রানি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রকাশ্য লাঞ্ছনার ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এসব ঘটনা কেবল একজন শিক্ষককে অপমান করে না; এগুলো পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সমাজের আস্থাকে দুর্বল করে।

রাষ্ট্র যদি বিচারক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নির্মাতা শিক্ষকদের জন্যও কার্যকর সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, অপমানজনক আচরণ কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়নকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আইনের বার্তা স্পষ্ট হতে হবে: শিক্ষককে অপমান করা মানে জাতির ভবিষ্যৎকে অপমান করা।

তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আইনি সুরক্ষার উদ্দেশ্য কোনো বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে শিক্ষক ভয়, চাপ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

উত্তরণের সাত দফা: বাংলাদেশের শিক্ষা পুনর্জাগরণের রূপরেখা

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, সমালোচনা এবং আত্মসমালোচনার পর একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়—সমাধান কোথায়? আমরা যদি কেবল ব্যর্থতার ইতিহাস লিখি, তবে তা হতাশার দলিল হয়ে থাকবে; কিন্তু যদি সংকটের ভেতর থেকেই উত্তরণের পথ খুঁজে নিতে পারি, তবে সেটিই হবে একটি জাতির আত্মশুদ্ধি ও পুনর্জাগরণের সূচনা। শিক্ষা নিয়ে বারবার পরীক্ষানিরীক্ষা, নীতিগত অস্থিরতা, শিক্ষকের মর্যাদাহানি, প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহির অভাব আমাদের এমন এক অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে আংশিক সংস্কার আর যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী জাতীয় ঐকমত্য, যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাবে না, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশের শিক্ষা পুনর্গঠনের জন্য সাতটি মৌলিক পদক্ষেপ অপরিহার্য বলে মনে হয়।

প্রথমত, একটি সাংবিধানিক বা আইনগত ভিত্তিসম্পন্ন জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন, যা রাজনৈতিক সরকারগুলোর ঊর্ধ্বে থেকে শিক্ষা নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি সরকার নিজস্ব দর্শন ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে। ফলে একটি সরকার যে সংস্কার শুরু করে, পরবর্তী সরকার এসে তা বাতিল বা পরিবর্তন করে দেয়। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষা খাতকে দলীয় রাজনীতির তাৎক্ষণিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। জাতীয় শিক্ষা কমিশনে শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষক প্রতিনিধি, শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞানভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষা রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়, কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে নয়।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের জন্য অন্তত ১৫ বছরের একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা। সেখানে সরকার পরিবর্তন হলেও শিক্ষার মৌলিক দর্শন বদলায় না। আমাদের দেশে বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতির রদবদল এবং নীতিগত অস্থিরতা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। একটি শিশু যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন তার শিক্ষাজীবনের অন্তত এক দশকের পথরেখা পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। সেই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে শিক্ষা কখনোই তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।

তৃতীয়ত, শিক্ষক মর্যাদা ও বেতন সংস্কার ছাড়া কোনো শিক্ষা সংস্কার সফল হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি তার শিক্ষকদের মর্যাদা দেয় না, সে জাতি দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। শিক্ষককে কেবল প্রশাসনিক কর্মচারী হিসেবে নয়, বরং জাতি নির্মাণের প্রধান কারিগর হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের বেতন কাঠামোকে প্রতিযোগিতামূলক ও সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করা, গবেষণা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন মেধাবী তরুণ যদি শিক্ষকতাকে জীবনের শ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবে বিবেচনা না করেন, তবে শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। শিক্ষককে শক্তিশালী না করে শিক্ষাকে শক্তিশালী করার চেষ্টা অনেকটা শেকড় শুকিয়ে গিয়ে গাছকে সবুজ রাখার স্বপ্ন দেখার মতো।

চতুর্থত, শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্বে প্রকৃত শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা একটি বিশেষায়িত জ্ঞানক্ষেত্র; এটি কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে পরিচালিত হয় না। পাঠক্রম উন্নয়ন, মূল্যায়ন কাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষামনোবিজ্ঞান এবং শিক্ষানীতির মতো জটিল বিষয়গুলোতে গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অপরিহার্য। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণী কমিটিগুলোতে শিক্ষাবিদদের কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। যে সমাজ চিকিৎসা খাতে চিকিৎসকের, প্রকৌশলে প্রকৌশলীর এবং কৃষিতে কৃষিবিদের দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়, সেই সমাজ শিক্ষা খাতে শিক্ষাবিদদের নেতৃত্বকে উপেক্ষা করতে পারে না।

পঞ্চমত, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গবেষণাভিত্তিক কারিকুলাম ও নীতিনির্ধারণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নতুন কোনো কারিকুলাম বা মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর আগে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পাইলট প্রকল্প, আন্তর্জাতিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় বাস্তবতা যাচাই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। শিক্ষা কোনো পরীক্ষাগার নয়, যেখানে কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার বস্তু হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে তথ্য, উপাত্ত এবং প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ থাকতে হবে। গবেষণার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম, আর ভুল হলেও তা দ্রুত সংশোধনের সুযোগ থাকে। ফলে নীতিনির্ধারণে আবেগ, মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়ে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ষষ্ঠত, শিক্ষা খাতে স্বাধীন মূল্যায়ন ও জবাবদিহি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো ভুল সিদ্ধান্তের প্রায় কোনো জবাবদিহি নেই। একটি ব্যর্থ নীতি বা কারিকুলামের কারণে যদি একটি প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তার দায় কে নেবে—এই প্রশ্নের উত্তর আজও অস্পষ্ট। তাই শিক্ষা খাতের জন্য একটি স্বাধীন মূল্যায়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন, যা সরকারের বাইরে থেকে শিক্ষানীতি, কারিকুলাম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফল নিয়মিত মূল্যায়ন করবে। সাফল্যের স্বীকৃতি যেমন থাকবে, তেমনি ব্যর্থতারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ জবাবদিহি ছাড়া কোনো সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

সপ্তমত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষা ব্যয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায় যে গবেষণা, শিক্ষক উন্নয়ন, বিদ্যালয় অবকাঠামো, প্রযুক্তি সংযোজন এবং শিক্ষার্থীদের সহায়তা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এখনও প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত বরাদ্দ নিয়ে কাজ করছে। একটি জাতি যদি মহাসড়ক, সেতু এবং অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করতে পারে, তবে মানুষ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও একই রকম সাহসী বিনিয়োগ করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার মানুষ।

অতএব, বাংলাদেশের শিক্ষা পুনর্জাগরণের প্রশ্নটি কোনো একক কারিকুলাম, কোনো একক সরকার কিংবা কোনো একক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়। এটি একটি জাতীয় দর্শনের প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যা প্রতি কয়েক বছর পরপর নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জ্ঞান, দক্ষতা, মানবিকতা এবং নাগরিক চেতনার ভিত্তি নির্মাণ করবে? উত্তরণের এই সাত দফা কেবল নীতিগত সুপারিশ নয়; এগুলো একটি সম্ভাব্য জাতীয় পুনর্জাগরণের রূপরেখা। যদি আমরা সত্যিই শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে চাই, তবে পরিবর্তন শুরু করতে হবে এখান থেকেই। কারণ শিক্ষা সংস্কারের চূড়ান্ত লক্ষ্য নতুন বই নয়, নতুন ভবন নয়, বরং এমন এক মানুষ গড়ে তোলা, যে নিজেকে, সমাজকে এবং রাষ্ট্রকে আরও উন্নত করে তুলতে সক্ষম।

কলমের স্বাধীনতাই জাতির স্বাধীনতা

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছিলেন, যে সমাজ জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই নিয়ন্ত্রণহীন করে ফেলে। শিক্ষকের ওপর চাপ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কখনো সৃজনশীল জাতি গড়ে তুলতে পারে না।

শাসকের চাবুক দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে রাজপথ খালি করা যায়, প্রতিবাদ স্তব্ধ করা যায় কিংবা কিছুদিনের জন্য অসন্তোষকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু জ্ঞানচর্চার মন্দিরকে সচল করা যায় না। শ্রেণিকক্ষ ভয় দিয়ে পরিচালিত হয় না; এটি পরিচালিত হয় আস্থা, শ্রদ্ধা এবং অনুপ্রেরণার মাধ্যমে। শিশুর মনকে গড়ে তোলা যায় ভালোবাসা দিয়ে, চাবুক দিয়ে নয়। যে হাতে কেবল নিয়ন্ত্রণের ভাষা থাকে, সেই হাত কখনো কৌতূহল, সৃজনশীলতা এবং মানবিকতার বীজ বপন করতে পারে না।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী এবং মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে তাকে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: সে কি শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি তাঁদের ক্ষমতায়ন করবে? কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার সেনাবাহিনীর শক্তি নয়, তার শিক্ষকদের শক্তি; তার প্রশাসনের ক্ষমতা নয়, তার শ্রেণিকক্ষের প্রাণশক্তি। আর সেই প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হলে চাবুক সরিয়ে কলমকে স্বাধীনতা দিতেই হবে।

শেষ কথা: ইতিহাসের শিক্ষা

ইতিহাস সাক্ষী আছে, যেসব শাসক শিক্ষকদের অপমান করেছে, তাদের সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। আজ শিক্ষকরা রাজপথে বসে আছেন—এটি কেবল শিক্ষকদের জন্য লজ্জার নয়, এটি পুরো রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল অভিশাপ।

আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের বুঝতে হবে, শিক্ষকের কলম যদি একবার চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়, তবে সেই সমাজে কেবল অন্ধকারের রাজত্ব থাকবে। চাবুক তুলে নিয়ে শিক্ষকদের ক্লাসরুমে সসম্মানে ফিরিয়ে আনুন। কারণ কলম যখন অপমানে ভেঙে যায়, তখন বন্দুকের গুলিও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে পারে না।

আসুন আমরা স্বপ্ন দেখি এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে শিক্ষক রাজপথে নয়, বরং সমাজের উচ্চাসনে বসে আগামীর সূর্যসন্তানদের গড়ে তুলবেন। মরীচিকার পেছনে না ছুটে আসুন বাস্তবতার কঠিন মাটিতে শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো অর্থনীতির নয়, রাজনীতিরও নয়; সবচেয়ে বড় সংকট হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি। যে জাতি শিক্ষাকে পরীক্ষাগার বানায়, সে জাতি ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার হাতে তুলে দেয়। আর যে জাতি শিক্ষকের মর্যাদা, শিক্ষাবিদের নেতৃত্ব এবং স্থিতিশীল শিক্ষানীতিকে অগ্রাধিকার দেয়, সেই জাতিই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে টিকে থাকে।

অধ্যাপক . মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#শিক্ষা_সংস্কার #শিক্ষকের_মর্যাদা #বাংলাদেশের_শিক্ষা #কারিকুলাম_সংকট #শিক্ষানীতি #স্কুলশিক্ষা #EducationReform #TeacherDignity #CurriculumCrisis #EducationPolicy #BangladeshEducation #SaveEducation #AcademicFreedom #FutureGeneration #NationalEducationCommission

Keywords: শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষকের মর্যাদা, কারিকুলাম সংকট, শিক্ষা প্রশাসন, স্কুলশিক্ষা, বাংলাদেশ শিক্ষা ব্যবস্থা

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: