odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 15th July 2026, ১৫th July ২০২৬
স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে ডিজিটাল বিভ্রম—বিস্তার, বৈপরীত্য, আস্থাসংকট ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার সন্ধানে এক রম্য-ব্যঙ্গাত্মক দীর্ঘ অনুসন্ধান

শিক্ষার নদী, সভ্যতার আয়না—আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার হেরফের: ৫৫ বছরে আমরা কোথায়, আর আগামী ৫০ বছরে যাব কোথায়?

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১৫ July ২০২৬ ০১:৪৫

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১৫ July ২০২৬ ০১:৪৫

অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকবিশেষ ফিচার স্টোরি

স্বাস্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছরে বাংলাদেশে বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী, নারীশিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু শেখার গভীরতা, শিক্ষক-মর্যাদা, গবেষণা, নীতি-ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এবং শিক্ষা ও কর্মজগতের সংযোগ কতটা এগিয়েছে? আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী পরিবর্তিত সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা, গুজব ও অ্যালগরিদমের মনস্তত্ত্ব, বিদেশি সংস্কারের অনুকরণ, অল্প বাজেটে বিশ্বমানের প্রত্যাশা এবং আগামী অর্ধশতকের জন্য একটি মানুষকেন্দ্রিক শিক্ষা-ভিশন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অর্জন, হেরফের ও সম্ভাবনার বিশ্লেষণ।

. পুরাণের সমুদ্র, শিক্ষার অমৃত এবং আমাদের দীর্ঘ মন্থন

পুরাণে দেবতা ও অসুর একদিন স্থির করলেন, সমুদ্র মন্থন না করলে অমৃত উঠবে না। উদ্যোগটি ছিল যৌথ, উদ্দেশ্য মহৎ, ব্যবস্থাপনাও আন্তর্জাতিক প্রকল্পের মতো—একদিকে দেবতা, অন্যদিকে অসুর, মাঝখানে বাসুকী নাগ, নিচে কচ্ছপ, ওপরে পাহাড়। আমাদের শিক্ষা সংস্কারের কমিটি দেখলে পুরাণের সেই সভার কথা মনে পড়ে। শুধু পার্থক্য, সেখানে শেষ পর্যন্ত অমৃত উঠেছিল; আমাদের এখানে অধিকাংশ সময় উঠে আসে নতুন পরিভাষা, নতুন লোগো, নতুন প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল এবং পুরোনো প্রশ্নের নতুন মলাট।

স্বাধীনতার পর শিক্ষা ছিল নতুন রাষ্ট্রের নৈতিক প্রতিশ্রুতি। সংবিধানের ভাষায় রাষ্ট্র একটি গণমুখী, সর্বজনীন ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে যাবে—এই ছিল আশা। তখন বিদ্যালয়ের ভবন কম ছিল, বইয়ের ঘাটতি ছিল, প্রশিক্ষিত শিক্ষকও অপ্রতুল; কিন্তু শিক্ষা সম্পর্কে সামাজিক বিশ্বাস ছিল প্রবল। আজ ভবন বেড়েছে, প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, সনদ বেড়েছে, পর্দা বেড়েছে; প্রশ্ন হলো, জ্ঞানের প্রতি সেই বিশ্বাস কি একই হারে বেড়েছে?

শিক্ষাব্যবস্থা কোনো যন্ত্র নয় যে নাট-বল্টু বদলালেই নতুন হয়ে যাবে। এটি একটি জীবন্ত নদী। রাষ্ট্র তার নৌকা, শিক্ষক মাঝি, শিক্ষার্থী যাত্রী, গবেষণা বাতিঘর, প্রযুক্তি ইঞ্জিন, আর সমাজ দুই তীর। নদীর স্রোত ঠিক না থাকলে নৌকায় নতুন রং করে লাভ নেই। আমরা পঞ্চান্ন বছর ধরে নৌকার নাম বদলেছি, মাঝির পোশাক বদলেছি, যাত্রীদের টিকিটে কিউআর কোড বসিয়েছি; কিন্তু মানচিত্রের উত্তর দিকটি মাঝে মাঝেই উল্টো ধরে ফেলেছি।

. ১৯৭১-২০২৬: নদী চওড়া হয়েছে, কিন্তু কতটা গভীর?

বাংলাদেশের শিক্ষার গল্প ব্যর্থতার একরঙা কাহিনি নয়। প্রাথমিক শিক্ষার প্রবেশাধিকার বিস্তৃত হয়েছে, নারীশিক্ষায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে, গ্রাম থেকে উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার সামাজিক পথ প্রশস্ত হয়েছে, কারিগরি ও প্রযুক্তিশিক্ষা নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। একসময় যে পরিবারে কন্যাশিশুর বই কেনা বিলাসিতা বলে মনে হতো, আজ সেই পরিবারই তার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ফলের অপেক্ষায় রাত জাগে। এই পরিবর্তন কোনো ছোট অর্জন নয়।

কিন্তু শিক্ষার পরিসংখ্যানের রাজ্যে একটি কৌতুক আছে। যে বিষয় গোনা সহজ, আমরা সেটিই বেশি গুনি। কতটি স্কুল, কতজন ভর্তি, কত শতাংশ পাস—এসবের হিসাব আছে। কিন্তু কতজন শিশু অর্থ বুঝে পড়তে পারে, কতজন প্রশ্ন করতে সাহস পায়, কতজন শিক্ষক নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করতে সক্ষম, কতটি বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের সমস্যার সমাধানে কার্যকর জ্ঞান তৈরি করে—এসব প্রশ্নের উত্তর পাতলা।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের বাংলাদেশ লার্নিং পভার্টি ব্রিফ জানায়, প্রাথমিক শিক্ষা শেষে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ন্যূনতম পাঠদক্ষতায় পৌঁছাতে পারে না। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে থাকা আর শেখা এক জিনিস নয়। নদীতে নৌকা নামলেই যাত্রী মোহনায় পৌঁছায় না; মাঝি, স্রোত, মানচিত্র ও নৌকার কাঠামো—সবই দরকার।

আমরা তাই একই সঙ্গে দুই বাংলাদেশের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এক বাংলাদেশ বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তারের গল্প বলে; অন্য বাংলাদেশ শেখার ঘাটতি, ঝরে পড়া, অঞ্চলভেদ, সামাজিক বৈষম্য এবং দক্ষতার অমিলের হিসাব চায়। প্রথম বাংলাদেশ উদ্বোধনী ফলকে হাসে, দ্বিতীয় বাংলাদেশ শ্রেণিকক্ষের শেষ বেঞ্চে নীরবে বসে থাকে। কেননা.,

“বিদ্যালয়ে থাকা আর শেখা এক জিনিস নয়; নৌকা নদীতে নামলেই যাত্রী মোহনায় পৌঁছায় না।”

. আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী হার্ড ব্রেক: বিশ্বাস বনাম অবিশ্বাস

চলন্ত বাসে হঠাৎ হার্ড ব্রেক পড়লে যাত্রীরা প্রথমে গন্তব্য নিয়ে ভাবেন না; নিজের ভারসাম্য বাঁচান। আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সামাজিক ও রাজনৈতিক পালাবদল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এমন এক ঝাঁকুনির মধ্যে ফেলেছে। প্রতিষ্ঠান চলেছে, ক্লাস হয়েছে, পরীক্ষা হয়েছে; কিন্তু সম্পর্কের অন্তঃস্রোতে নতুন প্রশ্ন জন্মেছে—কে কার পক্ষে, কার কথার রাজনৈতিক অনুবাদ কী, কোন বক্তব্য ভিডিও হয়ে ছড়াবে, কোন নীরবতা অপরাধ হিসেবে পড়া হবে?

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের নৈতিক ভিত্তি হলো আস্থা। শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর প্রশ্নে ষড়যন্ত্র দেখেন, আর শিক্ষার্থী যদি শিক্ষকের প্রতিটি বক্তব্যে গোপন অবস্থান খোঁজে, তবে শ্রেণিকক্ষ জ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে সতর্কতার মঞ্চে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠান যদি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার বদলে জনচাপ, গুজব বা তাৎক্ষণিক আবেগের ভাষায় সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয়ে যায়।

এখানে কোনো পক্ষকে এক বাক্যে অভিযুক্ত করলে বিশ্লেষণ সহজ হয়, সত্য কঠিন হয়। পরিবর্তনের সময়ে প্রতিষ্ঠানকে একই সঙ্গে তিনটি কাজ করতে হয়—অন্যায়ের জবাবদিহি, ব্যক্তির ন্যায্য প্রক্রিয়ার অধিকার এবং শিক্ষার পরিবেশের ধারাবাহিকতা। একটির নামে অন্যটি বিসর্জন দিলে বিশ্ববিদ্যালয় আদালতও থাকে না, আশ্রমও থাকে না; হয়ে ওঠে প্রতিদিনের জনমতের শেয়ারবাজার।

বিশ্বাস কাচের গ্লাসের মতো। ভাঙার শব্দ এক সেকেন্ড; জোড়া লাগাতে সময় লাগে বহু বছর। আগামী অর্ধশতকের শিক্ষা-ভিশন তাই ভবন নির্মাণের আগে সামাজিক আস্থা পুনর্নির্মাণের প্রকল্পও হতে হবে।

. গুজবতত্ত্ব, অ্যালগরিদম এবং ডিজিটাল মনের ব্যাকরণ

আগে গুজব পায়ে হেঁটে যেত; এখন সে ফাইবার-অপটিক কেবলে চড়ে। আগে চায়ের দোকানে একটি খবরের উৎস জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাওয়া যেত—“বিশ্বস্ত লোকের কাছে শুনেছি।” এখন উৎস হলো একটি স্ক্রিনশট, কাটা ভিডিও, অচেনা পেজ বা এমন এক পোস্ট, যার নিচে হাজার মন্তব্য থাকলেই সত্যের সনদ মিলে যায়।

ডিজিটাল অ্যালগরিদম সত্যের শিক্ষক নয়; মনোযোগের ব্যবসায়ী। যে তথ্য রাগ বাড়ায়, ভয় জাগায় বা পরিচয়ের শত্রু তৈরি করে, সেটিই দ্রুত ছড়ায়। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে নতুন পাঠ্যবিষয় দাঁড়িয়েছে—তথ্য যাচাই, উৎস বিচার, প্রমাণের মান, ডিজিটাল নাগরিকত্ব এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ। আমরা শিক্ষার্থীকে গণিতের সূত্র শেখাই, কিন্তু ভাইরাল পোস্টের সূত্র শেখাই না; ব্যাকরণ শেখাই, কিন্তু ডিজিটাল প্রতারণার ব্যাকরণ শেখাই না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক সেকেন্ডে প্রবন্ধ লিখতে পারে, উত্তর সাজাতে পারে, এমনকি শিক্ষকসুলভ ব্যাখ্যাও দিতে পারে। কিন্তু কোন প্রশ্ন নৈতিক, কোন উৎস নির্ভরযোগ্য, কোন উত্তর প্রেক্ষিতবিচ্ছিন্ন—এই বিচার মানুষকেই শিখতে হবে। প্রযুক্তি যদি ইঞ্জিন হয়, সমালোচনামূলক চিন্তা তার ব্রেক। ইঞ্জিন যত শক্তিশালী, ব্রেকও তত উন্নত না হলে গতি উন্নয়ন নয়, দুর্ঘটনা।

. বিদেশি অনুকরণে সংস্কার: নরওয়ের কোট, বৈশাখের দুপুর

একজন দর্জি নরওয়ে থেকে শীতের কোটের নকশা এনে বৈশাখে বিক্রি করলেন। কোটের সেলাই চমৎকার, কাপড় উন্নত, বোতাম আন্তর্জাতিক মানের; শুধু ক্রেতারা ঘামতে ঘামতে পালালেন। দর্জি সিদ্ধান্ত নিলেন—জনগণ আধুনিকতা বোঝে না। আমাদের কিছু শিক্ষা সংস্কারও এই দর্জির আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।

ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা ইংল্যান্ড—প্রতিটি দেশের অভিজ্ঞতা মূল্যবান। কিন্তু শিক্ষা কোনো রেডিমেড পোশাক নয়। ভাষা, শিক্ষক-প্রস্তুতি, শ্রেণিকক্ষের আকার, পরিবার, পরীক্ষার সংস্কৃতি, স্থানীয় প্রশাসন, শ্রমবাজার, প্রযুক্তি ও অর্থায়নের সঙ্গে নীতি না মিললে সুন্দর ধারণাও অসুন্দর ফল দেয়।

বিদেশ থেকে শেখা অপরাধ নয়; না শেখাই বরং অহংকার। কিন্তু শেখা ও নকলের মধ্যে পার্থক্য আছে। শেখা প্রশ্ন করে—কেন এটি কাজ করেছে? নকল বলে—ওখানে হয়েছে, এখানেও হবে। অভিযোজন গবেষণা চায়, পাইলট চায়, শিক্ষকের মতামত চায়, ব্যর্থতা স্বীকারের সাহস চায়। কপি-পেস্ট শুধু অনুবাদক চায়।

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারকে তাই আমদানিকারক থেকে স্থপতি হতে হবে। বিদেশি নকশা দেখা যাবে, কিন্তু ভিত্তির মাটি পরীক্ষা হবে দেশীয় বাস্তবতায়।

. শিক্ষা প্রশাসনের নাট্যমঞ্চ: পরিকল্পনার পাহাড়, বাস্তবায়নের খরা

বাংলাদেশে কোনো সমস্যার সমাধান না হলেও তার জন্য একটি কমিটি জন্মায়। কমিটি একটি উপকমিটি করে, উপকমিটি কর্মশালা করে, কর্মশালা ধারণাপত্র লেখে, ধারণাপত্র সুপারিশ দেয়, সুপারিশ বাস্তবায়নে আরেকটি কমিটি হয়। এই বংশবৃদ্ধির তুলনায় আমাদের অনেক বিদ্যালয়ের গাছপালাও লজ্জা পায়।

নীতির মূল্য নথির সৌন্দর্যে নয়, বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায়। কিন্তু শিক্ষা প্রশাসনে নেতৃত্ব বদলালে অগ্রাধিকার বদলে যায়, প্রকল্প শেষ হলে সক্ষমতাও শেষ হয়, প্রশিক্ষণ শেষ হলে ফাইল বন্ধ হয়। শিক্ষককে বলা হয় নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করতে; কিন্তু সময়, উপকরণ, সহায়তা ও মূল্যায়ন পুরোনো থাকে। প্রধান শিক্ষককে জবাবদিহি করতে হয় বহু দপ্তরে; অথচ বিদ্যালয়ের শেখার মান উন্নয়নে তাঁর সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সীমিত।

আমাদের নীতিনির্ধারণে পরিকল্পনা প্রায়ই দৃশ্যমান, বাস্তবায়ন অদৃশ্য। উদ্বোধন সংবাদ হয়, রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। নতুন পাঠ্যক্রম আলোচনায় আসে, শিক্ষক সহায়তার দৈনন্দিনতা আসে না। বাজেট ঘোষণায় করতালি হয়, ব্যয়ের গুণমান নিয়ে নিস্তব্ধতা নামে। প্রশাসনিক সংস্কারের কেন্দ্রে তাই তিনটি শব্দ দরকার—স্পষ্ট দায়িত্ব, তথ্যভিত্তিক নজরদারি এবং ধারাবাহিক পেশাগত সহায়তা। না হলে শিক্ষা সংস্কার সেই স্থপতির মতো, যিনি প্রতি বছর নতুন নকশা আঁকেন, কিন্তু একই অসমাপ্ত বাড়ির সামনে ছবি তোলেন।

. প্রতিবেশীর জানালা: পিছিয়ে থাকা, এগিয়ে থাকা এবং তুলনার সতর্কতা

প্রতিবেশীর ঘরে সারাক্ষণ উঁকি দেওয়া ভদ্রতা নয়; নিজের জানালা বন্ধ রাখাও প্রজ্ঞা নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একই সঙ্গে জনসংখ্যার চাপ, বৈষম্য, ভাষিক বৈচিত্র্য, পরীক্ষানির্ভরতা ও কর্মসংস্থানের সংকটে ভোগে। তবু শিক্ষা বিনিয়োগ, প্রাথমিক শেখা, গবেষণা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে পার্থক্য স্পষ্ট।

বাংলাদেশের বড় শক্তি হলো শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের বিস্তার ও নারীশিক্ষার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। দুর্বলতা হলো শেখার ফলাফল, গবেষণা অর্থায়ন, বিদ্যালয়ভিত্তিক সহায়তা, শিক্ষক প্রস্তুতি ও দক্ষতা-চাহিদার সংযোগ। তুলনা করতে গিয়ে শুধু র্যাঙ্কিংয়ের সংখ্যা দেখলে ভুল হবে; দেখতে হবে কোন দেশ ধারাবাহিকভাবে শিক্ষক উন্নয়ন করেছে, স্থানীয় সরকারকে সক্ষম করেছে, তথ্য ব্যবহার করেছে এবং শিক্ষাকে রাজনৈতিক মেয়াদের বাইরে জাতীয় চুক্তি বানিয়েছে।

শিক্ষায় প্রতিযোগিতার প্রকৃত প্রতিপক্ষ ভারত, শ্রীলঙ্কা বা ভুটান নয়; আমাদের নিজের গতকালের সীমাবদ্ধতা। প্রতিবেশীর সাফল্য আয়না, অপমান নয়। সেই আয়নায় মুখ দেখে চুল আঁচড়াতে হয়, আয়না ভাঙতে নয়।

. নিম্ন বাজেটে উচ্চ প্রত্যাশা: গলাবাজি, তেলবাজি এবং বিশ্বমানের সাইকেল

আমরা একটি সাইকেল কিনে তাকে বলি—বিশ্বমানের উড়োজাহাজ হও। শিক্ষককে বলি গবেষণা করুন, প্রশাসন করুন, ভর্তি পরীক্ষা নিন, কমিটিতে বসুন, অনলাইন রিপোর্ট দিন, আবার আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংও বাড়ান। শেষে গবেষণার অর্থ চাইলে উত্তর—দেশপ্রেম থাকলে অর্থ লাগে না।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা বরাদ্দ জিডিপির আনুমানিক ১.৪ থেকে ১.৭ শতাংশের মধ্যে হিসাব করা হয়েছে—গণনার আওতা ভেদে অঙ্ক ভিন্ন। ২০২৬-২৭ প্রস্তাবিত বাজেটে তা ২ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা এসেছে। বৃদ্ধি ইতিবাচক, কিন্তু UNESCO-এর শিক্ষা ২০৩০ কাঠামোর ৪-৬ শতাংশ জিডিপি বা মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫-২০ শতাংশ নির্দেশক মানদণ্ড থেকে এখনও দূরে। অর্থের পরিমাণই একমাত্র বিষয় নয়; সময়মতো ব্যয়, সঠিক অগ্রাধিকার, অপচয় রোধ এবং শেখার ফলের সঙ্গে ব্যয়ের সম্পর্ক জরুরি।

উচ্চপর্যায়ে শিক্ষা যতবার “সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার” হয়, মাঠপর্যায়ের শিক্ষক ততবার ক্যালকুলেটর নিয়ে বসেন—এই অগ্রাধিকারের টাকা কোন লাইনে আছে? বক্তৃতা হলো বেলুন; বাজেট হলো তার সুতো। সুতো না থাকলে বেলুন সুন্দর, কিন্তু বাতাসের সম্পত্তি।

বক্তৃতা হলো বেলুন; বাজেট হলো তার সুতো। সুতো না থাকলে বেলুন সুন্দর, কিন্তু বাতাসের সম্পত্তি।

. প্রযুক্তির জাল: অসারতার নতুন আলো

স্মার্ট বোর্ড থাকলেই স্মার্ট শিক্ষা হয় না, যেমন মাইক্রোফোন থাকলেই বক্তৃতা জ্ঞানগর্ভ হয় না। করোনাকালে প্রযুক্তি শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু একই সঙ্গে ডিজিটাল বিভাজনও উন্মোচিত করেছে। ডিভাইস, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, ভাষা ও পারিবারিক সহায়তার বৈষম্য পর্দার ওপারে শিক্ষার্থীদের সমান রাখেনি।

আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা পুনর্গঠনের সুযোগ দিচ্ছে—ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখা, ভাষা-সহায়তা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর প্রবেশগম্যতা, শিক্ষক পরিকল্পনা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও গবেষণায়। কিন্তু নীতিহীন ব্যবহার নকল, নজরদারি, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, পক্ষপাত ও বৌদ্ধিক অলসতা বাড়াতে পারে।

তাই ভবিষ্যতের বিদ্যালয়ে প্রযুক্তি একটি বিষয় নয়; একটি পরিবেশ। সেখানে শিক্ষার্থীকে শুধু টুল ব্যবহার নয়, টুলের সীমা, নৈতিকতা ও ক্ষমতার রাজনীতি বুঝতে হবে। তথ্যের সমুদ্রে সাঁতার শেখানোই শিক্ষা; কেবল লাইফজ্যাকেট বিতরণ নয়।

১০. সার্বিক পরিস্থিতি: শিক্ষা গড়ছি, না শিক্ষার অনুকরণ?

এক বৃদ্ধ কুমোর শিষ্যকে বললেন, “ভালো কলস বানাতে আগে মাটি চিনতে শেখো।” শিষ্য চাকা, নকশা ও আগুনের কথা বললে বৃদ্ধ হাসলেন—“মাটি না চিনে কলস নয়, কলসের অভিনয় বানাবে।” বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রেও এই মাটির প্রশ্ন। আমাদের সমাজের ভাষা, বৈষম্য, জলবায়ু, শিশুর জীবন, শ্রমবাজার, সংস্কৃতি ও স্থানীয় জ্ঞান কতটা নীতির কেন্দ্রে?

সার্বিক চিত্রে অর্জন আছে, সংকটও আছে। প্রবেশাধিকার বেড়েছে, কিন্তু শেখার গভীরতা অসম। প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসেনি। প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, গবেষণা সংস্কৃতি অনুপাতে বাড়েনি। নীতি হয়েছে, বাস্তবায়ন দুর্বল। শিক্ষককে পরিবর্তনের বাহক বলা হয়েছে, কিন্তু পরিবর্তনের নকশায় তাঁকে প্রায়ই দর্শক রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে গভীর সংকট সম্ভবত পরিচয়ের—শিক্ষা কি পরীক্ষার জন্য, চাকরির জন্য, নাগরিকত্বের জন্য, নাকি মানুষ হওয়ার জন্য? উত্তর “সবকিছুর জন্য” বলা সহজ; সেই ভারসাম্য তৈরি কঠিন।

১১. মুক্তি কোথায়আদৌ মিলবে কি?

মুক্তি কোনো একক কমিশন, নতুন বই বা নতুন অ্যাপের মধ্যে নেই। মুক্তি আছে ধারাবাহিকতার সংস্কৃতিতে। জাতীয় ঐকমত্যের একটি দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ভিশন দরকার, যা সরকার বদলালেও মূল দিক হারাবে না। দরকার শিক্ষককে সন্দেহভাজন কর্মচারী নয়, পেশাজীবী হিসেবে দেখা; বিদ্যালয়কে আদেশ গ্রহণকারী অফিস নয়, শেখার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সক্ষম করা; গবেষণাকে সাজসজ্জা নয়, সিদ্ধান্তের ভিত্তি করা।

মুক্তির প্রথম শর্ত সত্য বলা। কোথায় অগ্রগতি, কোথায় ব্যর্থতা, কোন সংস্কার কাজ করেনি—এই স্বীকারোক্তি দুর্বলতা নয়। চিকিৎসক রোগের নাম না বললে রোগী সুস্থ হয় না। শিক্ষা ব্যবস্থারও সৎ রোগনির্ণয় দরকার।

দ্বিতীয় শর্ত ধৈর্য। শিক্ষা সংস্কারের ফল নির্বাচনী ক্যালেন্ডারে আসে না। একটি ভালো শিক্ষক-প্রশিক্ষণ নীতি, প্রাথমিক পাঠদক্ষতা কর্মসূচি বা গবেষণা সংস্কৃতি ফল দিতে দশক চাইতে পারে। দ্রুত ফলের নেশা শিক্ষাকে প্রদর্শনীতে পরিণত করে।

১২. শেষকথা: পথের হিসাব

পঞ্চান্ন বছরে আমরা শূন্যে দাঁড়িয়ে নেই। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে বিস্তৃত শিক্ষাব্যবস্থা গড়েছি, নারীশিক্ষায় সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছি, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় এনেছি। কিন্তু দরজায় পৌঁছানো আর ঘরের আলো পাওয়া এক নয়।

আগামী পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা হবে শুধু ডিগ্রি উৎপাদনে নয়; প্রজ্ঞা, উদ্ভাবন, মানবিকতা, গণতান্ত্রিক আচরণ, জলবায়ু অভিযোজন ও প্রযুক্তিনৈতিকতায়। শিক্ষা যদি এই সক্ষমতা না গড়ে, অর্থনৈতিক উন্নয়নও কাচের প্রাসাদ হবে।

আমাদের নদী এখনও বেঁচে আছে। স্রোত কখনও ক্ষীণ, কখনও বিভ্রান্ত; তবু মোহনা হারায়নি। প্রশ্ন—আমরা কি মানচিত্র ঠিক করব, মাঝিকে মর্যাদা দেব, নৌকা মেরামত করব এবং যাত্রীকে শুধু টিকিট নয়, যাত্রার উদ্দেশ্য বুঝতে শেখাব?

১৩. সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য করণীয়

আগামী অর্ধশতকের শিক্ষা হতে হবে মানুষকেন্দ্রিক, প্রমাণনির্ভর ও ভবিষ্যৎ-সক্ষম। প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষা, পাঠদক্ষতা, গণিত ও সামাজিক-আবেগিক শেখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মাধ্যমিকে বিষয়জ্ঞানকে বাস্তব সমস্যা, সৃজনশীলতা, শিল্প, নাগরিকতা ও কারিগরি অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় গবেষণা, একাডেমিক স্বাধীনতা, শিল্প-সমাজ সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

শিক্ষকের প্রাথমিক প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নকে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যারিয়ার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিদ্যালয় নেতৃত্ব, জেলা-উপজেলা সহায়তা ও তথ্যব্যবস্থাকে জবাবদিহিমূলক কিন্তু সহায়ক হতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায় প্রতিবন্ধিতা, ভাষা, লিঙ্গ, দারিদ্র্য, অঞ্চল ও জলবায়ুজনিত বৈষম্যের জন্য আলাদা সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, প্রতিটি বড় সংস্কারের আগে পাইলট, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং পর্যায়ক্রমিক সম্প্রসারণ বাধ্যতামূলক করা দরকার। জাতীয় শিক্ষা নীতি যেন স্থির পাথর না হয়; আবার প্রতি ঋতুতে বদলে যাওয়া পোস্টারও না হয়।

১৪. বিশেষ ১৫ দফা সুপারিশ: শিক্ষা ভিশন ২০৭৬

১. সংসদীয় ও সামাজিক ঐকমত্যে ৫০ বছরব্যাপী “জাতীয় শিক্ষা ভিশন ২০৭৬” প্রণয়ন।
২. স্বাধীন জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও মূল্যায়ন কমিশন গঠন।
৩. “Pilot before Scale”—দেশব্যাপী প্রয়োগের আগে বাধ্যতামূলক পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন।
৪. প্রাথমিক পাঠদক্ষতা ও গণিতের জন্য জাতীয় পুনরুদ্ধার মিশন।
৫. শিক্ষক-নেতৃত্বাধীন সংস্কার এবং পেশাগত মানদণ্ডভিত্তিক ক্যারিয়ার পথ।
৬. শিক্ষা ব্যয় ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক নির্দেশক মানের দিকে নেওয়া এবং ফলভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনা।
৭. Policy Impact Assessment ও পাঁচ বছর অন্তর Policy Sunset Review।
৮. জাতীয় ও স্থানীয় জ্ঞানভান্ডার—Local Knowledge Repository—প্রতিষ্ঠা।
৯. একটি উন্মুক্ত National Education Observatory, যেখানে শেখা, বৈষম্য, বাজেট ও বাস্তবায়নের ড্যাশবোর্ড থাকবে।
১০. ডিজিটাল সাক্ষরতা, AI নৈতিকতা, তথ্য যাচাই ও গোপনীয়তা সুরক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
১১. অন্তর্ভুক্তিমূলক বিদ্যালয়ে রিসোর্স শিক্ষক, সহায়ক প্রযুক্তি ও ইউনিভার্সাল ডিজাইন ফর লার্নিং সম্প্রসারণ।
১২. বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার স্থায়ী তহবিল, ন্যায্য গ্রান্ট ব্যবস্থা ও একাডেমিক স্বাধীনতার সুরক্ষা।
১৩. শিক্ষা-শিল্প-সমাজ অংশীদারত্বে আঞ্চলিক দক্ষতা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র।
১৪. প্রশাসনিক পদে পেশাগত যোগ্যতা, মেয়াদকালীন ধারাবাহিকতা ও প্রকাশ্য জবাবদিহি।
১৫. শিক্ষক-শিক্ষার্থী-প্রতিষ্ঠানের আস্থা পুনর্গঠনে ন্যায্য প্রক্রিয়া, সংলাপ ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা।
১৫. চূড়ান্ত প্রতিফলন: ২০৭৬ সালের শিশুর প্রশ্ন

ধরা যাক, ২০৭৬ সালের এক শিশু পুরোনো ডিজিটাল আর্কাইভে ২০২৬ সালের এই লেখা পড়ছে। সে তার দাদাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা এত শিক্ষা সংস্কার করেছিলে; শেষ পর্যন্ত কী শিখেছিলে?”

দাদা হয়তো কিছুক্ষণ চুপ থাকবেন। তারপর বলবেন, “আমরা প্রথমে ভাবতাম শিক্ষা মানে বই বদলানো। পরে বুঝেছি, শিক্ষা মানে সম্পর্ক বদলানো। আমরা ভাবতাম প্রযুক্তি এলেই ভবিষ্যৎ আসে; পরে বুঝেছি, প্রযুক্তির চেয়ে বড় হলো বিচারবোধ। আমরা ভাবতাম বিদেশি মডেল কিনলেই উন্নতি হয়; পরে বুঝেছি, নিজের মাটি না চিনলে কোনো বীজই ফল দেয় না। আর সবচেয়ে দেরিতে বুঝেছি—শিক্ষককে দুর্বল রেখে কোনো জাতি শক্তিশালী হয় না।”

শিশুটি হয়তো আবার জিজ্ঞেস করবে, “তাহলে তোমরা কী করেছিলে?”

সেই উত্তর আজ আমাদেরই লিখতে হবে। বাজেটে, শ্রেণিকক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিক্ষক নিয়োগে, গবেষণায়, ডিজিটাল নীতিতে এবং মতভেদের প্রতি আচরণে। আগামী পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস কোনো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম লিখবে না; তারা শুধু ফল ভোগ করবে। ইতিহাসের খসড়া লিখছি আমরা।

সম্ভবত শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংস্কার নতুন পাঠ্যবই নয়; নতুন মানুষ। আর মানুষ বদলানোর সবচেয়ে কঠিন কাজটি কোনো মন্ত্রণালয় নয়, একটি শ্রেণিকক্ষই নীরবে করে যায়।

“ইতিহাসের খসড়া লিখছি আমরা; ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু তার ফল ভোগ করবে।”

 সম্পাদকীয় নোট

এই ফিচার স্টোরিতে ব্যবহৃত তথ্য, উপাত্ত বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা, নীতিপত্র, সরকারি নথি এবং সমসাময়িক তথ্যসূত্রের সমন্বয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার মান শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম পাঠদক্ষতার সংকট বিশ্লেষণে World Bank-এর Bangladesh Learning Poverty Brief 2024- প্রকাশিত তথ্য ধারণা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাখাতে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনায় UNESCO Institute for Statistics এবং Education 2030 Framework for Action- উল্লিখিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডমোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) শতাংশ অথবা মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সুপারিশবিশ্লেষণের প্রাসঙ্গিক কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলাদেশের ২০২৫২৬ অর্থবছরের অনুমোদিত বাজেট এবং ২০২৬২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট-সংক্রান্ত আলোচনায় সরকারি বাজেট দলিল সমসাময়িক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসরণ করা হয়েছে। তবে শিক্ষা ব্যয়ের হিসাব নির্ধারণে বিভিন্ন সংস্থা পদ্ধতির পরিমাপগত পার্থক্যের কারণে শতকরা অনুপাত বা উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে সামান্য ভিন্নতা দেখা দিতে পারেপাঠকদের সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখার অনুরোধ রইল।
এই রচনায় আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে একটি গবেষণাভিত্তিক সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ। এর উদ্দেশ্য সামাজিক, রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার ব্যাখ্যা মূল্যায়ন; এটি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিচারিক সিদ্ধান্ত, অভিযোগপত্র কিংবা চূড়ান্ত সত্যের দাবি হিসেবে উপস্থাপিত নয়।
সবশেষে, এই ফিচার স্টোরি কেবল তথ্যের সমাবেশ নয়; এটি সাংবাদিকতা, গবেষণা, সাহিত্যিক গদ্য, বিদগ্ধ রম্য, ব্যঙ্গ, লোককথা, রূপক এবং দার্শনিক উপমার সৃজনশীল সমন্বয়ে নির্মিত একটি মৌলিক সম্পাদকীয় রচনা। পাঠকে অধিকতর প্রাণবন্ত, চিন্তাশীল মননশীল করে তুলতে সাহিত্যিক অলংকার রূপকধর্মী ভাষার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে; তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট লেখক, সাহিত্যিক বা গদ্যশৈলীর অনুকরণ নয়, বরং সমকালীন বাংলা সংবাদপত্রের দীর্ঘ-ফর্ম ফিচারধর্মী লেখনির স্বতন্ত্র নির্মাণ।

লেখক ও গবেষক:  অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#শিক্ষা_সংস্কার #বাংলাদেশের_শিক্ষা #শিক্ষার_গুণগত_মান #শিক্ষক_মর্যাদা #প্রমাণভিত্তিক_নীতি #ডিজিটাল_শিক্ষা #উচ্চশিক্ষা #শেখার_সংকট #শিক্ষা_ভিশন_২০৭৬ #জ্ঞানভিত্তিক_বাংলাদেশ



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: