odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 17th September 2026, ১৭th September ২০২৬
প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়াতে নতুন সম্পর্কের প্রস্তাব; ট্রাম্পের হুমকির মধ্যেই কানাডার সমর্থন

কানাডাকে ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ করতে চায় ইইউ, স্বাগত কার্নির

Special Correspondent | প্রকাশিত: ১৭ September ২০২৬ ২২:৩০

Special Correspondent
প্রকাশিত: ১৭ September ২০২৬ ২২:৩০

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ হওয়ার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে কানাডা ও ইউরোপের সহযোগিতা আরও গভীর করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া এক ভাষণে কার্নি বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে কানাডা ও ইউরোপ একসঙ্গে থাকলে আরও শক্তিশালী হবে। কার্নির এই বক্তব্যের এক দিন আগে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন কানাডাকে ইইউর প্রথম ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ করার সম্ভাবনার কথা জানান। তবে ইইউর কাঠামোয় বর্তমানে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ নেই। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে নতুন ধরনের একটি সম্পর্কের কাঠামো তৈরি করতে হবে।

প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা                 

কার্নি বলেন, কানাডা ও ইউরোপ একসঙ্গে কাজ করলে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ওপর জোর দেন তিনি। কানাডার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ইউরোপের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে উল্লেখ করেন কার্নি। একই সঙ্গে ইউরোপের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির দক্ষতা কানাডার জন্যও উপকারী হতে পারে বলে জানান তিনি।

ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তায় কানাডা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও হাইড্রোজেন সরবরাহে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও উল্লেখ করেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। কার্নির ভাষায়, দুই পক্ষের সহযোগিতা শুধু বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ আরও শক্তিশালী করার দিকে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

ট্রাম্পের হুমকির মধ্যেই ইইউ-কানাডা ঘনিষ্ঠতা

ইইউর প্রস্তাবটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়ছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করেছে। কানাডাকে ইইউর ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ করার পরিকল্পনার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি এই ধারণাকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করার পাশাপাশি সতর্ক করে বলেছেন, প্রস্তাবটি যদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শত্রুতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে ইউরোপের ওপর খুব গুরুতর শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।

ট্রাম্প বলেন, ইইউর উদ্যোগের উদ্দেশ্য ভালো হলে সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে কার্নি বলেন, কানাডা-ইউরোপের এই সহযোগিতা একটি ইতিবাচক প্রক্রিয়া।

তিনি বলেন, কানাডীয়রা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা আন্তর্জাতিক অংশীদার বেছে নেওয়ার বিষয়ে বাইরের কারও নির্দেশনা মেনে চলবে না।

তৃতীয় কোনো শক্তি গঠন নয়

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে কার্নি স্পষ্ট করেন, কানাডা ও ইউরোপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ কোনো নতুন ভূরাজনৈতিক শক্তিজোট তৈরির পরিকল্পনা নয়। তিনি বলেন, এটি কোনো নতুন শক্তি-ব্লক গঠন করে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার উদ্যোগ নয়। বরং নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা রক্ষার জন্য সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।

কার্নি জলবায়ু পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ক্ষয় এবং বাণিজ্যকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মতো বিষয়গুলোকে বর্তমান বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, অর্থনৈতিক একীভূতকরণ, শুল্ক, আর্থিক ব্যবস্থা ও সরবরাহব্যবস্থাকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

ইইউর পূর্ণ সদস্য হতে চায় না কানাডা

কার্নি স্পষ্ট করে বলেছেন, কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্য হওয়ার চেষ্টা করছে না। প্রস্তাবিত অ্যাসোসিয়েট সদস্য ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে এই নতুন সম্পর্কের সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনও নির্ধারিত হয়নি। কারণ ইইউর বর্তমান ব্যবস্থায় অ্যাসোসিয়েট সদস্য নামে কোনো আনুষ্ঠানিক মর্যাদা নেই। প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করতে হলে ইইউর ২৭টি সদস্য দেশের সম্মতি প্রয়োজন হবে। নতুন ধরনের সদস্যপদ নিয়ে কয়েকটি ইউরোপীয় সরকারের আগের কিছু সংশয়ও রয়েছে। ফলে আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। কার্নি জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত সহযোগিতা নিয়ে কানাডার পার্লামেন্টে আলোচনা ও ভোট হবে।

শিক্ষা ও তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ

ইইউ-কানাডা সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে শিক্ষা ও তরুণদের চলাচলের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কার্নি কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের Erasmus+ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে কানাডা ও ইউরোপের তরুণদের একে অপরের অঞ্চলে কাজ, পড়াশোনা ও বসবাসের সুযোগ আরও বাড়তে পারে। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সম্পদ যৌথভাবে ব্যবহার এবং দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও গভীর করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর নতুন কাঠামো

কানাডা ও ইইউর মধ্যে ইতোমধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের সহযোগিতা রয়েছে। নতুন ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ প্রস্তাব সেই বিদ্যমান সম্পর্কের ওপর আরও বিস্তৃত কৌশলগত সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করতে পারে।

কার্নি এই সম্পর্ককে একটি ‘অনন্য ও ইতিবাচক উদ্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর বিস্তারিত কাঠামো কানাডা ও ইউরোপ একসঙ্গে নির্ধারণ করবে।

অক্টোবরে কানাডায় ইইউ-কানাডা শীর্ষ সম্মেলন

ইইউ ও কানাডার মধ্যে প্রস্তাবিত নতুন সম্পর্কের বিস্তারিত নিয়ে আলোচনা আরও এগিয়ে নিতে আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে কানাডার মন্ট্রিয়লে একটি শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। কার্নি জানিয়েছেন, ওই সম্মেলনে প্রস্তাবটির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, কানাডা-ইইউ সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া এখনও একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

ইইউর ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্য’ হওয়ার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এটি কানাডা ও ইউরোপের মধ্যে প্রচলিত বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে নিয়ে যেতে পারে। তবে এর বাস্তব রূপ নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ আলোচনা এবং ইইউর ২৭ সদস্য দেশের সম্মতির ওপর।

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র