নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকারপত্র ডটকম
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সাতরাস্তা থেকে রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়কের বড় অংশ কার্যত ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানের পার্কিংয়ের দখলে চলে গেছে। সড়কের দুই পাশে সারি সারি ভারী যানবাহন রাখার পাশাপাশি কোথাও কোথাও চলছে ট্রাক ও পিকআপের মেরামতের কাজ। এতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে যান চলাচলের জায়গা, বাড়ছে যানজট এবং চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রী, রিকশাচালক ও পথচারীরা।
মূল সড়কের পাশাপাশি আশপাশের ভেতরের সড়কেও রাখা হচ্ছে এসব যানবাহন। ট্রাকস্ট্যান্ডের পাশে আনসার কার্যালয়ের সামনেও ট্রাক-পিকআপ পার্ক করে রাখতে দেখা গেছে। এমনকি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ভবনের প্রধান ফটকের সামনেও কাভার্ড ভ্যান রাখা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এ পরিস্থিতিতে সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অফিসে যাওয়া-আসার সময় এবং সন্ধ্যায় যানজট তীব্র আকার ধারণ করছে।
একসময় দখলমুক্ত ছিল তেজগাঁওয়ের সড়ক
সাতরাস্তা থেকে তেজগাঁও রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়ক এবং আশপাশের এলাকায় অবৈধভাবে ট্রাক রাখার সমস্যা বহুদিনের। ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আনিসুল হক সড়কটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। এ সময় ট্রাক শ্রমিকদের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। পরে সড়কটি দখলমুক্ত করতে সক্ষম হন তিনি।
সড়কটি থেকে ট্রাক সরিয়ে দেওয়ার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছিল এবং নগরবাসী এর সুফল পেয়েছিলেন। তবে আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে আবারও সড়কটিতে ট্রাক রাখা শুরু হয়। প্রথমে অল্পসংখ্যক যানবাহন থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা বেড়ে বর্তমানে সারি সারি ট্রাকে পরিণত হয়েছে।
ফলে পুরোনো সমস্যা আবারও ফিরে এসেছে। সড়কের দুই পাশে ট্রাক রাখায় চলাচলের জায়গা কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ যানবাহনকে সীমিত জায়গায় চলাচল করতে হচ্ছে।
অফিস সময়ে বাড়ছে যানজট
তেজগাঁওয়ের ট্রাকস্ট্যান্ডের কারণে অফিস সময়ে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় রিকশাচালক মো. দুলাল।
তিনি বলেন, ট্রাকগুলো সব সময় সড়কের পাশে রাখা থাকে। সিটি করপোরেশন ছাড়া অন্য কারও পক্ষে এগুলো সরানো সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি।
দুলাল বলেন, সকাল ৮টার পর এবং অফিস ছুটির পর যানজট বাড়ে। আগে সড়ক ফাঁকা থাকলেও এখন ট্রাকের কারণে একটি গাড়ি চলাচলের মতো জায়গা অবশিষ্ট থাকে। ফলে রিকশা চালাতে অনেক সমস্যা হয়। তাঁর মতো অন্য রিকশাচালকদেরও একই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রেলগেটের মোড় থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ট্রাক রাখা হচ্ছে। এতে পুরো এলাকার যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ
রেললাইনের পাশে ট্রাক পার্কিংয়ের কারণে সন্ধ্যার পর যানজট আরও বাড়ে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা কালাম মিয়া।
তিনি বলেন, অফিস শেষে মানুষ যখন বাড়ি ফেরেন, তখন সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ে। একই সময়ে রাস্তার দুই পাশে ট্রাক রাখা থাকায় চলাচলের জায়গা কমে যায়। ফলে যানজট তৈরি হয়।
কালাম মিয়ার ভাষ্য, রেলগেটের সামনের অংশ থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত সড়কের দুই পাশেই ট্রাক থাকায় অনেক সময় সব যানবাহনকে এক পাশ দিয়ে চলাচল করতে হয়।
ট্রাকচালকদের বিরুদ্ধে আইন না মানার অভিযোগ
সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী জুয়েল শাহেদ অভিযোগ করেন, ট্রাকচালকদের অনেকে ট্রাফিক আইন ও নিয়মকানুন মানছেন না। তাঁর দাবি, পুলিশ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থাকা সত্ত্বেও সড়কের দুই পাশে ট্রাক রেখে সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এভাবে সড়ক দখল করে রাখার কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ট্রাকচালকদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে সড়কে ট্রাক রাখার দায় নির্ধারণ এবং আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের তথ্য প্রয়োজন।
‘জায়গা না পেয়েই রাস্তায় গাড়ি রাখি’
সড়কে ট্রাক ও পিকআপ পার্ক করে রাখা চালকদের বক্তব্য, নির্ধারিত ট্রাকস্ট্যান্ডে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁরা সড়কের পাশে গাড়ি রাখেন। উপযুক্ত জায়গা পেলে সেখানে গাড়ি রাখতে আগ্রহী তাঁরা।
বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি মো. তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তাঁরা নিজেরাও সড়কে গাড়ি রাখতে চান না। বর্তমানে যে জায়গায় তাঁরা অবস্থান করছেন, সেটি সরকারি বা জনসাধারণের জায়গা। কেউ আইনি পদক্ষেপ নিলে সেখানে অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তিনি দাবি করেন, একটি গাড়ির জন্য প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার টাকা কর দিতে হয়। অথচ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান রাখার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দেওয়া হচ্ছে না।
তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বলেন, ধউর এলাকায় জায়গা কেনার বিষয়টি তাঁরা বিবেচনা করেছিলেন। তবে সরকার নদীর পাড় বাদ দিয়ে তাঁদের জন্য উপযুক্ত জায়গা বরাদ্দ করলে সমস্যার সমাধান হতে পারে। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সড়কে গাড়ি রাখার প্রয়োজন কমবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও কমবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে স্ট্যান্ড রয়েছে, সেখানে সব গাড়ির সংকুলান হচ্ছে না। এ কারণে তাঁরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন।
ডিএনসিসির বক্তব্য পাওয়া যায়নি
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসকের কাছে জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন পার্কিং ব্যবস্থাপনা
তেজগাঁওয়ের এই পরিস্থিতি রাজধানীতে ভারী যানবাহনের পার্কিং ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সমস্যাকে সামনে এনেছে। একদিকে সড়ক দখল করে ট্রাক রাখার কারণে নগরবাসীর চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাক মালিকদের দাবি, পর্যাপ্ত নির্ধারিত জায়গা না থাকায় তাঁরা বিকল্প পাচ্ছেন না।
এ অবস্থায় সড়ক দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত তদারকি, আইন প্রয়োগ এবং ভারী যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে সড়কের ওপর গাড়ি মেরামত বন্ধ করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ যানবাহনমুক্ত রাখার বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তেজগাঁওয়ের সড়ক আবারও আগের মতো স্বাভাবিক করতে ডিএনসিসি, ট্রাফিক পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
**সূত্র:বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রতিবেদন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাব পাওয়া যায়নি বলে মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
