odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Saturday, 10th October 2026, ১০th October ২০২৬
শিশুর মুখে কথা ফুটছে না, আমরা কি তার ভাষা বুঝছি? মস্তিষ্কের বিজ্ঞান থেকে অভিভাবকের করণীয়

শিশুর মুখে কথা ফুটছে না, আমরা কি তার ভাষা বুঝছি? মস্তিষ্কের বিজ্ঞান থেকে অভিভাবকের করণীয়

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ১০ October ২০২৬ ০২:৩৭

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ১০ October ২০২৬ ০২:৩৭

অধিকারপত্র গবেষণাধর্মী বিশেষ ফিচার | শিশু বিকাশ, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য

শিশুর কথা বলা শুধু শব্দ উচ্চারণ নয়; এটি মস্তিষ্কের বিকাশ, ভাষা অর্জন, সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষা ও আত্মপ্রকাশের সমন্বিত প্রক্রিয়া। শিশুর যোগাযোগগত অসুবিধা যথাসময়ে শনাক্ত না করে ভুল ব্যাখ্যা ও শাস্তিমূলক আচরণের আশ্রয় নেওয়া যেমন ক্ষতিকর, তেমনি পরিবার ও রাষ্ট্রের কার্যকর সহায়তার অভাবও শিশুর বিকাশ ও অধিকার বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।
শিশুর কথা বলা কখন শুরু হয়? কেন কোনো শিশু বয়স অনুযায়ী কথা বলতে দেরি করে? শব্দ উচ্চারণে অসুবিধা, তোতলামি, বিকাশগত ভাষা প্রতিবন্ধকতা, ডিসলেক্সিয়া কিংবা শ্রবণসংক্রান্ত সমস্যার মধ্যে পার্থক্য কী? শিশুর ভাষা অর্জনে মস্তিষ্ক, স্নায়বিক সংযোগ, শ্রবণ, স্মৃতি, পারিবারিক পরিবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে? এসব প্রশ্নের গবেষণাভিত্তিক উত্তর নিয়ে তৈরি হয়েছে এই বিশেষ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।
বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারে শিশুর ভাষা বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কোনো শিশু কথা বলতে দেরি করলে তাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়, কোনো শিশুর তোতলামি নিয়ে হাসাহাসি হয়, আবার পড়তে অসুবিধা হলে তাকে অলস কিংবা অমনোযোগী মনে করা হয়। অথচ একই ধরনের বাহ্যিক লক্ষণের আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিকাশগত, ভাষাগত, শ্রবণসংক্রান্ত কিংবা শিক্ষাগত প্রয়োজন থাকতে পারে।
এই নিবন্ধে শিশুর ভাষা অর্জনের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করা হয়েছে ব্রোকা ও ভার্নিকে অঞ্চলের ঐতিহাসিক ধারণা, নিউরোপ্লাস্টিসিটি এবং মস্তিষ্কের বিস্তৃত ভাষা-নেটওয়ার্কের আলোকে। স্কিনার, চমস্কি, পিয়াজে, ভাইগটস্কি ও ব্রুনারের শিক্ষাগত ধারণার মাধ্যমে আলোচনা করা হয়েছে জন্মগত সক্ষমতা, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং অভিজ্ঞতার ভূমিকা।
পাশাপাশি Speech Delay, Speech Sound Disorder, Developmental Language Disorder, Stuttering, Cluttering, Childhood Apraxia of Speech, Dysarthria, Dyslexia, Dysgraphia, Selective Mutism, Social Communication Disorder এবং শ্রবণসংক্রান্ত সমস্যার বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অভিভাবকের দৈনন্দিন করণীয় এবং প্রচলিত ভুল বিশ্বাস সংশোধনে। শিশুর আগ্রহ অনুসরণ করে কথা বলা, তার বক্তব্য সম্প্রসারণ, অর্থপূর্ণ শব্দ পুনরাবৃত্তি, ছবির বই দিয়ে গল্প, শ্রবণ-মনোযোগের খেলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের সহায়তা গ্রহণের মতো ব্যবহারিক পদ্ধতি আলোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপ্রমাণিত চিকিৎসা, শাস্তিমূলক অনুশীলন এবং কথাবহির্ভূত মুখের পেশির ব্যায়ামকে সর্বজনীন স্পিচ থেরাপি হিসেবে ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনা ব্যবহার করে দেখানো হয়েছে কেন প্রাথমিক বিকাশগত পর্যবেক্ষণ, শ্রবণ পরীক্ষা ও যথাসময়ে স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিদেশি পরিসংখ্যানকে বাংলাদেশের জাতীয় বিস্তারহার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
সবশেষে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, উপজেলা পর্যায়ের সহায়তা, পরিবারকেন্দ্রিক সেবা, স্থানীয় ভাষায় মূল্যায়ন উপকরণ এবং প্রতিবন্ধী শিশুর যোগাযোগের অধিকার নিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধটি অভিভাবক, শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, থেরাপিস্ট, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ পাঠকের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এর কেন্দ্রীয় বক্তব্য হলো—শিশুর ভাষাগত অসুবিধাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে হবে এবং এমন পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি শিশুর যোগাযোগের অধিকার ও মানবিক মর্যাদা স্বীকৃত হয়।

প্রারম্ভিকা: শিশুর মুখে শব্দ নেই, অথচ চারপাশে কথার অভাব নেই

একটি সম্ভাব্য দৃশ্য কল্পনা করা যাক। আড়াই বছরের একটি শিশু মায়ের হাত ধরে পানির গ্লাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মুখে কোনো শব্দ নেই। মা উদ্বিগ্ন হয়ে বলছেন, ‘পানি বলো, আগে পানি বলো।’ পাশ থেকে দাদি আশ্বস্ত করছেন, ‘চিন্তার কিছু নেই, ওর বাবাও ছোটবেলায় দেরিতে কথা বলেছিল।’ বাবা মোবাইলে একটি ভিডিও চালিয়ে দিয়েছেন—শিশুটি হয়তো ইংরেজি শব্দ শুনে দ্রুত কথা বলা শিখবে। সবাই শিশুটিকে কথা বলাতে ব্যস্ত। কিন্তু কেউ জানতে চাইছেন না, সে কথা কতটা বোঝে, শুনতে পায় কি না, কীভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করে কিংবা তার বিকাশে বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে কি না।

অন্য একটি দৃশ্য বিদ্যালয়ের। শিক্ষক ছবির গল্প বলতে বলেছেন। একজন শিক্ষার্থী শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না, আরেকজন কথা বলতে গিয়ে আটকে যাচ্ছে, তৃতীয়জন গল্প বলতে পারলেও বইয়ের শব্দ পড়তে পারছে না। শিক্ষক বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তোমরা মনোযোগ দাও না কেন?’ অথচ তিন শিশুর সমস্যার প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

এই দুটি কাল্পনিক দৃশ্য আমাদের একটি অস্বস্তিকর বাস্তব প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—বাংলাদেশে শিশু কথা বলতে না পারলে আমরা কি সত্যিই তার সমস্যাটি বুঝতে চেষ্টা করি, নাকি তাকে দ্রুত স্বাভাবিক করে তোলার চাপে আরও একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করি?

শিশুর ভাষা অর্জন কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এতে মস্তিষ্ক, শ্রবণ, স্মৃতি, অর্থ অনুধাবন, সামাজিক যোগাযোগ, আবেগ এবং পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে। একজন শিশুর অসুবিধা কোথায়, তা না জেনে তাকে শব্দ মুখস্থ করানো অনেকটা রোগ শনাক্ত না করে ওষুধ দেওয়ার মতো।

এই বিশেষ নিবন্ধে শিশুর ভাষা অর্জনের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি, যোগাযোগ ও শিখনসংক্রান্ত সমস্যার পার্থক্য, প্রচলিত ভুল বিশ্বাস, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, ঘরোয়া সহায়তা এবং বাংলাদেশের নীতিগত করণীয়কে একটি সমন্বিত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

অঙ্ক–০১

শিশুর মস্তিষ্কে ভাষার জন্ম—শব্দ, চিন্তা ও যোগাযোগের বিজ্ঞান

মস্তিষ্কের ভেতরে তৈরি হচ্ছে ভাষার অদৃশ্য নগরী

নবজাতকের মস্তিষ্ককে একটি নির্মীয়মাণ নগরীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। কোথাও নতুন সড়ক তৈরি হচ্ছে, কোথাও সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে, আবার বারবার ব্যবহারের ফলে কিছু পথ আরও কার্যকর হয়ে উঠছে। এই নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো ভাষা।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Center on the Developing Child-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জীবনের প্রথম কয়েক বছরে মস্তিষ্কে প্রতি সেকেন্ডে দশ লাখের বেশি নতুন স্নায়বিক সংযোগ তৈরি হওয়ার অনুমান রয়েছে। তবে এটি সামগ্রিক মস্তিষ্ক বিকাশের ধারণাগত হিসাব, শুধু ভাষাসংশ্লিষ্ট সংযোগের সংখ্যা নয়।

স্নায়ুকোষের পারস্পরিক সংযোগকে বলা হয় সিন্যাপস (Synapse)। আর অভিজ্ঞতার প্রভাবে মস্তিষ্কের সংযোগ ও কার্যক্রম পরিবর্তনের ক্ষমতা হলো স্নায়বিক নমনীয়তা বা নিউরোপ্লাস্টিসিটি (Neuroplasticity)।

শিশু যখন শব্দ শোনে, কারও মুখের দিকে তাকায়, ইশারা বোঝে কিংবা খেলার মধ্যে প্রশ্নের উত্তর দেয়, তখন তার মস্তিষ্কের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলো ভাষা ও যোগাযোগ শেখার ভিত্তিকে সহায়তা করে। তবে বেশি শব্দ শোনানো মানেই বেশি ভাষাগত বিকাশ নয়; প্রয়োজন অর্থপূর্ণ, বয়সোপযোগী ও সাড়াদানমূলক অভিজ্ঞতা।

ঐতিহাসিকভাবে ব্রোকা (Broca) এবং ভার্নিকে (Wernicke) অঞ্চলকে যথাক্রমে ভাষা উৎপাদন ও অনুধাবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানে অবশ্য ভাষাকে দুটি বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রের কাজ মনে করা হয় না। মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল, টেম্পোরাল ও প্যারিয়েটাল অঞ্চলের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, শ্রবণব্যবস্থা, স্মৃতি এবং মোটর-নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়ে ভাষা প্রক্রিয়াজাত হয়।  আসলে সংবাদপত্রের কার্যালয়ে যেমন প্রতিবেদক, সম্পাদক, শিরোনাম প্রস্তুতকারী ও মুদ্রণ বিভাগের সম্মিলিত কাজ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ সম্পূর্ণ হয় না, তেমনি মস্তিষ্কেও ভাষা উৎপাদন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।

একটি শিশু ‘পানি’ শব্দটি শুনলে প্রথমে শব্দসংকেত গ্রহণ করে, পরে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তার অর্থ শেখে এবং একসময় সেই শব্দ বা অন্য কোনো যোগাযোগপদ্ধতি ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করে। তাই শব্দ শোনা, অর্থ বোঝা এবং নিজে প্রকাশ করা—তিনটি সম্পর্কিত হলেও স্বতন্ত্র দক্ষতা।

শিশুর মস্তিষ্ক টেপ রেকর্ডার নয়: ভাষা শেখায় সম্পর্কের গুরুত্ব

শিশুর ভাষা শেখা নিয়ে স্কিনার অনুকরণ ও পরিবেশগত প্রতিক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। চমস্কি ভাষা অর্জনের অন্তর্নিহিত জৈবিক সক্ষমতা তুলে ধরেন। পিয়াজে ভাষাকে জ্ঞানীয় বিকাশের সঙ্গে এবং ভাইগটস্কি সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও সহায়তাপ্রাপ্ত শেখার সঙ্গে সম্পর্কিত করেন। ব্রুনারের Scaffolding ধারণা দেখায়, বড়রা শিশুর বর্তমান সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী শেখার ধাপ তৈরি করতে পারেন।

এই তত্ত্বগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, শিশু কেবল শব্দ অনুকরণ করে ভাষা শেখে না; সে অভিজ্ঞতা থেকে অর্থ গঠন করে এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষার ব্যবহার আয়ত্ত করে।

হার্ভার্ডের Serve and Return ধারণাটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রাসঙ্গিক। শিশু আঙুল তুলে কাক দেখাল, মা বললেন, ‘হ্যাঁ, কাকটি উড়ছে।’ শিশু আবার তাকাল, মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাচ্ছে?’ এই ছোট্ট কথোপকথনে শিশুর যৌথ মনোযোগ (Joint Attention), ভাষা অনুধাবন ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

জীবনের প্রথম তিন বছর ভাষা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল সময়। কিন্তু এর অর্থ তিন বছর পর শেখার দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। বরং প্রাথমিক সময়ে প্রয়োজনীয় ভাষাগত অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে আরেকটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। বাচন (Speech) হলো মুখের মাধ্যমে শব্দ উৎপাদন; ভাষা (Language) হলো অর্থপূর্ণ প্রতীকব্যবস্থা; আর যোগাযোগ (Communication) কথ্য শব্দ, ইশারা, ছবি, দৃষ্টি কিংবা প্রযুক্তির মাধ্যমেও হতে পারে। ফলে মুখে কথা বলতে না পারা শিশুও অর্থপূর্ণ যোগাযোগ করতে পারে।

ভাষাগত বিলম্ব কতটা পরিচিত সমস্যা?

American Speech-Language-Hearing Association (ASHA)-এর গবেষণা পর্যালোচনায় ১৮–২৩ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে Late Language Emergence-এর আনুমানিক হার ১৩.৫ শতাংশ এবং ৩০–৩৬ মাস বয়সীদের মধ্যে ১৬–১৭.৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাভেদে বয়স, সংজ্ঞা ও মূল্যায়নপদ্ধতি ভিন্ন; এগুলো বাংলাদেশের জাতীয় হার নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের National Institute on Deafness and Other Communication Disorders (NIDCD) জানায়, কিন্ডারগার্টেন পর্যায়ের প্রায় প্রতি ১৪ জন শিশুর একজনের বিকাশগত ভাষা প্রতিবন্ধকতা বা Developmental Language Disorder (DLD) থাকতে পারে।

এ তথ্যের সামাজিক গুরুত্ব গভীর। ভাষাগত সমস্যার সব লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। একটি শিশু হাঁটছে, খেলছে, বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, অথচ বাক্যের অর্থ বুঝতে কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে পারছে না।—দেখতে সুস্থ শিশুর অদৃশ্য অসুবিধাকে অলসতা, অবাধ্যতা বা কম মেধার পরিচয় হিসেবে চিহ্নিত করা শিক্ষাগত অবিচার।

শিশুর কথা বলা নিয়ে ভুল বিশ্বাস: মিথ, কুসংস্কার ও অভিভাবকত্বের বিভ্রান্তি

শিশুর ভাষা বিকাশ নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞানের গবেষণা যতটা এগিয়েছে, অনেক পরিবারে প্রচলিত বিশ্বাসের পরিবর্তন ততটা হয়নি। দেরিতে কথা বলা শিশুকে নিয়ে কখনো বলা হয়, ‘ওর বাবা ছোটবেলায় দেরিতে কথা বলেছিল।’ কখনো বলা হয়, ‘ছেলেদের কথা ফুটতে সময় লাগে।’ কেউ আবার পরামর্শ দেন, শিশুর মুখে বিশেষ কিছু খাওয়াতে হবে, কোনো আচার পালন করতে হবে কিংবা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।—সমস্যা শুধু ভুল ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসব বিশ্বাসের কারণে কখনো শিশুর শ্রবণ পরীক্ষা, ভাষাগত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় বিকাশগত সহায়তা গ্রহণ বিলম্বিত হতে পারে।

শিশুর কথা বলা নিয়ে আমাদের সমাজে পরিবারে অনেক মিথ প্রচলিত আছে। আসলে, ‘মিথ’ শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক মিথোস (mythos) থেকে, যার অর্থ কথা, কাহিনি বা আখ্যান। বাংলায় একে সাধারণত ‘পুরাণকথা’ বা ‘পৌরাণিক আখ্যান’ বলা হয়। নৃতত্ত্ব ও সংস্কৃতিচর্চায় মিথ বলতে এমন ঐতিহ্যবাহী কাহিনি বোঝায়, যার মাধ্যমে একটি সমাজ জগতের সৃষ্টি, মানুষের অস্তিত্ব, দেবদেবী, প্রাকৃতিক ঘটনা কিংবা সামাজিক রীতিনীতির অর্থ ব্যাখ্যা করে। এসব কাহিনি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত না হলেও মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; তাই মিথকে কেবল মিথ্যা বলা যথার্থ নয়। তবে দৈনন্দিন কথাবার্তায় শব্দটি আরেক অর্থেও ব্যবহৃত হয়—প্রচলিত কিন্তু প্রমাণহীন বা ভুল ধারণা বোঝাতে। যেমন, ‘সব শিশু একই বয়সে কথা বলা শুরু করে’—এমন ধারণাকে মিথ বলা হলে তা পৌরাণিক কাহিনি নয়, বরং শিশুর বিকাশ সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত সাধারণীকরণ নির্দেশ করে। এবার নিচে কথা বলা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ভ্রান্তিসমূহ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

  • মিথ এক—ছেলেশিশু দেরিতে কথা বলে, তাই চিন্তার প্রয়োজন নেই : গবেষণায় ছেলে ও মেয়েশিশুর ভাষা অর্জনের সময় ও কিছু ভাষাগত সমস্যার বিস্তারে গড়পড়তা পার্থক্য পাওয়া গেছে। ASHA-র উল্লেখ করা একটি গবেষণায় ছেলেশিশুদের মধ্যে Late Language Emergence-এর হার মেয়েশিশুদের তুলনায় বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু গোষ্ঠীগত পরিসংখ্যান দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট শিশুর বিকাশগত অসুবিধা উপেক্ষা করা যায় না। একটি এলাকায় ছেলেদের উচ্চতা মেয়েদের তুলনায় গড়ে বেশি হতে পারে। কিন্তু তাই বলে কোনো শিশুর অস্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি মূল্যায়নের প্রয়োজন নেই—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। একই যুক্তি ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।ম আসলে শিশু ছেলে না মেয়ে, সেটি নয়; তার বয়স অনুযায়ী ভাষা বোঝা, যোগাযোগের চেষ্টা এবং ভাষাগত অগ্রগতি কেমন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
  • মিথ দুই—বাবা দেরিতে কথা বলেছিলেন, ছেলেও এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে : ভাষাগত বিকাশে বংশগত প্রভাব থাকতে পারে। কিছু বিকাশগত ভাষা প্রতিবন্ধকতার পারিবারিক ইতিহাসও গবেষণায় পাওয়া যায়। কেননা NIDCD-এর তথ্য অনুযায়ী, DLD রয়েছে এমন শিশুদের প্রায় ৫০–৭০ শতাংশের অন্তত একজন পরিবারের সদস্যের ভাষাগত সমস্যার ইতিহাস থাকতে পারে। এই তথ্য থেকে বরং বিপরীত শিক্ষাটিই পাওয়া যায়। পরিবারে ভাষাগত অসুবিধার ইতিহাস থাকলে শিশুর ভাষা বিকাশ আরও সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন হতে পারে। —বংশগত প্রভাবের সম্ভাবনা কোনো সমস্যাকে অবহেলার অনুমতি দেয় না।
  • মিথ তিন—মোবাইলে ইংরেজি কার্টুন দেখালেই শিশু দ্রুত ইংরেজি শিখবে: শিশু ভিডিও থেকে কিছু শব্দ, গান বা বাক্যাংশ শিখতে পারে। কিন্তু মুখস্থ উচ্চারণ এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে ভাষার অর্থপূর্ণ ব্যবহার এক নয়। একটি শিশু যদি কার্টুন দেখে ইংরেজিতে দশ পর্যন্ত গুনতে পারে, অথচ নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে না পারে, তাহলে শুধু ইংরেজি শব্দ বলার ক্ষমতা দিয়ে তার সামগ্রিক ভাষাগত বিকাশ নির্ধারণ করা যাবে না।—এখানে প্রযুক্তির ব্যবহার, শিশুর বয়স, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং বাস্তব জীবনে ভাষা প্রয়োগের সুযোগ বিবেচনা করতে হবে। একটি ডিজিটাল পর্দা হতে পারে জানালা, যার মাধ্যমে শিশু নতুন দৃশ্য দেখে। কিন্তু জানালা দিয়ে বাইরে দেখা আর বাইরে গিয়ে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া এক অভিজ্ঞতা নয়। অতএব প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, মানুষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ যোগাযোগের বিকল্প নয়।
  • মিথ চার— দুটি ভাষা শেখালে শিশুর কথা বলতে দেরি হয়: বাংলাদেশে এই ধারণাটি বিশেষভাবে প্রচলিত। অনেক পরিবার মনে করে, বাংলা ও ইংরেজি একসঙ্গে শেখার কারণে শিশু বিভ্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু বহুভাষিকতা নিজে ভাষাগত বিলম্ব বা DLD সৃষ্টি করে না। ASHA এবং NIDCD উভয় প্রতিষ্ঠানই এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে। বাংলা, চাকমা, মারমা, সাঁওতালি কিংবা অন্য কোনো মাতৃভাষায় শিশুর সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ বন্ধ করে শুধু ইংরেজি শেখানোর চাপ দেওয়া তাই প্রয়োজনীয় নয়। শিশুর পারিবারিক ভাষা তার আবেগ, পরিচয় ও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভাষাগত সমস্যার মূল্যায়নেও শিশুর ব্যবহৃত সব ভাষা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
  • মিথ পাঁচ—শিশু কথা না বললে তাকে বারবার শব্দ বলতে বাধ্য করতে হবে: কিছু পরিবারে দেখা যায়, শিশুর সামনে বসে বারবার বলা হচ্ছে, ‘মা বলো’, ‘বাবা বলো’, ‘আবার বলো’, ‘ঠিক করে বলো’। শিশুর অনুকরণ শেখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি যোগাযোগকে পরীক্ষা কিংবা বাধ্যতামূলক উচ্চারণের অনুশীলনে পরিণত করলে স্বাভাবিক কথোপকথনের আনন্দ কমে যেতে পারে। ভাষা শেখাতে অধিক কার্যকর হতে পারে শিশুর আগ্রহ অনুসরণ করা, তার শব্দ সম্প্রসারণ করা, বাস্তব ঘটনা ব্যাখ্যা করা এবং তাকে প্রতিক্রিয়ার সুযোগ দেওয়া। ধরা যাক, শিশু বলল ‘গাড়ি’। বাবা বলতে পারেন, ‘হ্যাঁ, লাল গাড়িটা যাচ্ছে।’ এভাবে শিশুর বক্তব্যকে স্বাভাবিকভাবে সম্প্রসারণ করা যায়। এটি একটি চারাগাছকে পরিচর্যা করার মতো। চারাগাছ বড় করতে প্রতিদিন তাকে টেনে লম্বা করা যায় না। প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ, আলো, পানি এবং সময়।
  • মিথ ছয়—কথা না বলা মানেই বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা: এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর ভুল ধারণাগুলোর একটি। কোনো শিশুর বাচন উৎপাদনে অসুবিধা থাকলেও তার ভাষা বোঝার দক্ষতা ভালো হতে পারে। আবার কেউ মুখে কথা বলতে না পারলেও ইশারা, ছবি কিংবা সহায়ক যোগাযোগপ্রযুক্তির মাধ্যমে জটিল চিন্তা প্রকাশ করতে পারে। সুতরাং মুখের শব্দের পরিমাণ দিয়ে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য নির্ধারণ করা যায় না।—এই ধরনের ভুল ধারণা প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
  • মিথ সাত—ছবি বা যোগাযোগযন্ত্র ব্যবহার করতে দিলে শিশু আর কথা বলবে না: সহায়ক ও বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা, অর্থাৎ AAC নিয়ে এ ধরনের আশঙ্কা অনেক পরিবারে দেখা যায়। কিন্তু ASHA-র গবেষণাভিত্তিক নির্দেশনা অনুযায়ী, AAC শিশুর কথ্য ভাষা বিকাশে বাধা দেয় না; উপযুক্ত ক্ষেত্রে এটি যোগাযোগ এবং কথ্য ভাষার বিকাশে সহায়কও হতে পারে।  একটি শিশুকে ছবি ব্যবহার করে খাবার চাইতে দেওয়া মানে তার মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া নয়। বরং তাকে নিজের প্রয়োজন প্রকাশের একটি কার্যকর পথ দেওয়া। যোগাযোগের মাধ্যম শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। কোনো একটি মাধ্যমকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা যাবে না।
  • মিথ আট—ভাষাগত সমস্যা থাকলে শিশুকে বকাঝকা বা লজ্জা দিলে সে চেষ্টা করবে: কিছু শিশু তোতলালে, ভুল উচ্চারণ করলে কিংবা প্রশ্নের উত্তর দিতে দেরি করলে বড়রা বিরক্ত হন। কখনো অন্যের সামনে অনুকরণ করে হাসাহাসিও করেন। এ ধরনের আচরণ ভাষা শেখার সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে না। বরং শিশুর যোগাযোগে অংশগ্রহণের আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু ভুল বললে তাকে অপমান না করে মডেলিং, অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে উপযুক্ত ভাষার উদাহরণ দেওয়া বেশি গ্রহণযোগ্য।
  • মিথ নয়—বিশেষ তাবিজ, ঝাড়ফুঁক বা মুখে কিছু লাগালেই কথা ফুটবে: ভাষাগত বিলম্বের জন্য প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন ও সহায়তার বিকল্প হিসেবে তাবিজ, ঝাড়ফুঁক, ভয় দেখানো কিংবা অপ্রমাণিত পদার্থ প্রয়োগের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বিশেষত মুখে অজানা পদার্থ দেওয়া, জোরপূর্বক শারীরিক কৌশল প্রয়োগ বা চিকিৎসার নামে আঘাত করা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পরিবারের সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অসম্মান করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এসব বিশ্বাস যেন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও বিকাশগত সহায়তা গ্রহণের পথে বাধা না হয়।
  • মিথ দশ: চার-পাঁচ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করলেই বোঝা যাবে সমস্যা আছে কি না: এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ জন্মের পর থেকেই শিশুর যোগাযোগ বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা যায়। উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ দেখা দিলে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। CDC-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুর আগে অর্জিত কোনো বিকাশগত দক্ষতা হারিয়ে গেলে কিংবা বয়সোপযোগী মাইলফলক পূরণ না হলে চিকিৎসককে জানিয়ে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।  সময়মতো মূল্যায়ন মানেই শিশুর কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতা আছে—এমন সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি সম্ভাব্য সমস্যাকে যথাসময়ে বোঝার একটি দায়িত্বশীল উপায়।

ভুল বিশ্বাসের দেয়াল: অপেক্ষা, ভয় ও অনুপযুক্ত চিকিৎসা

উপরের মিথগুলো বিশ্লেষণ করে ভুল বিশ্বাসের দেয়াল দেখতে পাওয়া যায়, যা ভেঙ্গে ফেলতে না পারলে শিশুর ভয়াবহ স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।  শিশুর ভাষাগত বিলম্ব নিয়ে পরিবারে প্রচলিত কিছু ধারণা বিশেষভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। ‘ছেলেদের কথা ফুটতে দেরি হয়’—এই বক্তব্যে কিছু গোষ্ঠীগত পরিসংখ্যানের আংশিক প্রতিফলন থাকলেও নির্দিষ্ট শিশুর বিলম্ব উপেক্ষা করার যুক্তি নেই। ‘বাবাও দেরিতে কথা বলেছিল’—এ যুক্তিও যথেষ্ট নয়। বরং NIDCD-এর তথ্য অনুযায়ী, DLD রয়েছে এমন শিশুদের প্রায় ৫০–৭০ শতাংশের অন্তত একজন পরিবারের সদস্যের ভাষাগত সমস্যার ইতিহাস থাকতে পারে।

একইভাবে বাংলা ও ইংরেজি একসঙ্গে শেখালে শিশুর ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়—এ ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বহুভাষিকতা নিজে DLD সৃষ্টি করে না। শিশুর পারিবারিক ভাষাকে সম্মান করে অর্থপূর্ণ যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন। আরও ক্ষতিকর হলো, শিশুকে কথা বলাতে বাধ্য করা, ভুল উচ্চারণে অপমান করা, তোতলামির জন্য ভয় দেখানো কিংবা তাবিজ, ঝাড়ফুঁক ও অপ্রমাণিত পদার্থের ওপর নির্ভর করে পেশাগত মূল্যায়ন বিলম্বিত করা।

ভিডিও দেখে ইংরেজি সংখ্যা বলা কিংবা গান মুখস্থ করা ভাষা ব্যবহারের একটি দিক হতে পারে, কিন্তু সেটিই সামগ্রিক যোগাযোগদক্ষতার প্রমাণ নয়। শিশুর মস্তিষ্ক শব্দের গুদাম নয়; তাকে অর্থপূর্ণ সামাজিক অভিজ্ঞতা দিতে হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল বিশ্বাসটি হলো—মুখে কথা না বলতে পারা মানেই বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা। বাস্তবে বাচন উৎপাদনের অসুবিধা এবং চিন্তা করার সক্ষমতা এক বিষয় নয়।—একটি শিশুর মুখে কত শব্দ আছে, সেটি দিয়ে তার সম্ভাবনার পরিমাপ করা যায় না।

অঙ্ক–০২:

কথা শেখার পথে নানা বাধা—একই লক্ষণের আড়ালে ভিন্ন সমস্যা

সব শিশু কথা বলতে দেরি করে একই কারণে নয়

শিশুর ভাষা বিকাশকে একটি সংগীতানুষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সুর, তাল, যন্ত্র, শিল্পীর দক্ষতা ও পারস্পরিক সমন্বয়ের কোনো একটি অংশে সমস্যা হলে পরিবেশনার মান প্রভাবিত হতে পারে। একইভাবে ভাষা বোঝা, শব্দ নির্বাচন, উচ্চারণ, সাবলীলতা এবং সামাজিক যোগাযোগের অসুবিধাগুলো পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন।

শিশুর বয়স অনুযায়ী শব্দ বা বাক্য ব্যবহারে বিলম্বকে সাধারণভাবে Speech বা Language Delay বলা হয়। কিন্তু বিলম্ব একটি পর্যবেক্ষণ, নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। এর পেছনে শ্রবণক্ষতি, বিকাশগত ভাষা প্রতিবন্ধকতা, মোটর-বাচন সমস্যা কিংবা অন্যান্য বিকাশগত কারণ থাকতে পারে।

শিশুর উচ্চারণ অস্পষ্ট হলে Speech Sound Disorder-এর সম্ভাবনা বিবেচিত হয়। এখানে Articulation Disorder ও Phonological Disorder-এর পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি ধ্বনি উৎপাদনের পদ্ধতির সঙ্গে, দ্বিতীয়টি ভাষার ধ্বনিগত নিয়ম ব্যবহারের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। ছোট শিশুদের মধ্যে কিছু উচ্চারণগত সরলীকরণ স্বাভাবিক হলেও বয়সের তুলনায় স্থায়ী অসুবিধা থাকলে মূল্যায়ন প্রয়োজন।

NIDCD-এর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরিসংখ্যানে ছোট শিশুদের মধ্যে Speech Sound Disorder-এর আনুমানিক হার ৮–৯ শতাংশ। আবার তিন থেকে সতেরো বছর বয়সীদের প্রায় ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী এক বছরে অন্তত এক সপ্তাহ স্থায়ী কোনো বাচনসংক্রান্ত সমস্যা নথিবদ্ধ হয়েছে।

এসব হার বাংলাদেশে সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না। তবে সমস্যাগুলোর গুরুত্ব ও প্রাথমিক শনাক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা বোঝায়।

একই শ্রেণিকক্ষে দশ শিশু, অথচ তাদের ভাষাগত সমস্যা দশ রকম

একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের কথা ভাবা যাক। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের একটি ছবি দেখিয়ে গল্প বলতে বললেন। একটি শিশু ছবির সবকিছু বুঝতে পারছে, কিন্তু শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। অন্য একটি শিশু গল্প বলতে শুরু করে মাঝেমধ্যে আটকে যাচ্ছে। তৃতীয় শিশুটি সাবলীলভাবে কথা বললেও বইয়ের লেখা পড়তে গিয়ে অক্ষর ও ধ্বনির সম্পর্ক বুঝতে অসুবিধা অনুভব করছে।

চতুর্থ শিশুটি শিক্ষক কী বলেছেন, তা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। পঞ্চম শিশুটি বাড়িতে অনেক কথা বলে, কিন্তু বিদ্যালয়ে শিক্ষক বা সহপাঠীদের সামনে কথা বলতে পারছে না। ষষ্ঠ শিশুটির উচ্চারণ এতটাই অস্পষ্ট যে অপরিচিত মানুষের পক্ষে তার বক্তব্য বোঝা কঠিন।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এরা সবাই ‘কথা বলায় দুর্বল’। কিন্তু শিক্ষা, ভাষাবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তাদের সমস্যাগুলো এক নয়।

শিশুর ভাষা ও যোগাযোগ বিকাশকে একটি বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত পরিবেশনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি সুরের জন্য যেমন বিভিন্ন যন্ত্রের সমন্বয় প্রয়োজন, তেমনি অর্থপূর্ণ যোগাযোগের জন্য শ্রবণ, ভাষা বোঝা, শব্দ নির্বাচন, বাক্য গঠন, ধ্বনি উৎপাদন, শ্বাসপ্রশ্বাসের সমন্বয় এবং সামাজিক পরিস্থিতি বোঝার মতো একাধিক দক্ষতা কাজ করে।

কোনো একটি অংশে অসুবিধা হলেই সামগ্রিক যোগাযোগে প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু সব সমস্যার চিকিৎসা, সহায়তা কিংবা শিক্ষাগত কৌশল এক রকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের National Institute on Deafness and Other Communication Disorders বা NIDCD-এর প্রকাশিত পরিসংখ্যানে তিন থেকে সতেরো বছর বয়সী প্রায় ৫ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী এক বছরের মধ্যে অন্তত এক সপ্তাহ স্থায়ী কোনো বাচনসংক্রান্ত সমস্যা থাকার তথ্য পাওয়া যায়। ছোট শিশুদের মধ্যে Speech Sound Disorder-এর আনুমানিক হার ৮–৯ শতাংশও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক; বাংলাদেশের জাতীয় হার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। —এই তথ্য মনে করিয়ে দেয়, শিশুর ভাষা ও যোগাযোগগত অসুবিধা কোনো বিচ্ছিন্ন বা বিরল বিষয় নয়। বরং এগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্ত করার জন্য অভিভাবক, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরি।

১. Speech Delay: শিশু যখন বয়স অনুযায়ী কথা বলা শুরু করতে দেরি করে

শিশুর কথা বলতে দেরি করাকে সাধারণভাবে Speech Delay বা বাচন বিকাশে বিলম্ব বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভাষাগত বিলম্ব বোঝাতেও কথাটি ব্যবহার করা হয়, যদিও বাচন ও ভাষা এক বিষয় নয়। কোনো শিশু বয়স অনুযায়ী প্রত্যাশিত শব্দ ব্যবহার করছে না, দুটি শব্দ যুক্ত করতে দেরি হচ্ছে কিংবা মৌখিকভাবে নিজের প্রয়োজন প্রকাশে অসুবিধা হচ্ছে—এ ধরনের পরিস্থিতি অভিভাবকের নজরে আসতে পারে।

ধরা যাক, দুই বছর বয়সী একটি শিশু শুধু কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করছে। পানি চাইলে সে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, কিন্তু শব্দ ব্যবহার করছে না। তার ভাষা বোঝা, অঙ্গভঙ্গি, শ্রবণ, খেলাধুলা ও সামাজিক যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। সব দেরিতে কথা বলা শিশুর দীর্ঘমেয়াদি ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা থাকে না। কিছু শিশু পরে বয়সোপযোগী দক্ষতা অর্জন করে। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে ভাষাগত অসুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে। NIDCD-এর মতে, শিশুদের ভাষা বিকাশে স্বাভাবিক বৈচিত্র্য থাকলেও উল্লেখযোগ্য বিলম্বের পেছনে শ্রবণসংক্রান্ত সমস্যা কিংবা বাচন ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে।  অতএব শুধু বয়সের অপেক্ষায় না থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্যায়ন করানোই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।

২. Speech Sound Disorder: শিশু যখন শব্দের ধ্বনি সঠিকভাবে উৎপাদন করতে পারে না

বাচনধ্বনি উৎপাদনজনিত প্রতিবন্ধকতা বা Speech Sound Disorder শিশুদের মধ্যে পরিচিত একটি সমস্যা। এক্ষেত্রে শিশু নির্দিষ্ট ধ্বনি বাদ দিতে পারে, অন্য ধ্বনি দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারে কিংবা শব্দের ধ্বনি বিন্যাস পরিবর্তন করতে পারে। যেমন, কোনো শিশু ‘কলম’ শব্দটি বলতে গিয়ে ‘কম’ বলছে। অন্য শিশু ‘স্কুল’ শব্দটি বারবার বিকৃতভাবে উচ্চারণ করছে। তবে অল্প বয়সে কিছু ধ্বনি অসম্পূর্ণভাবে বলা স্বাভাবিক বিকাশের অংশও হতে পারে। কোনটি বয়সোপযোগী আর কোনটি মূল্যায়নের প্রয়োজন নির্দেশ করে, তা ভাষা ও বয়স অনুযায়ী বিচার করতে হয়।

এই সমস্যার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন হলো Articulation Disorder এবং Phonological Disorder: Articulation Disorder-এর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ধ্বনি উৎপাদনের শারীরিক বা মোটর-সম্পর্কিত দিকটিতে অসুবিধা থাকতে পারে। অন্যদিকে Phonological Disorder-এর ক্ষেত্রে শিশুর ভাষার ধ্বনিগত নিয়ম বা ধ্বনির ব্যবহারের ধরনে সমস্যা দেখা যায়।—দুটি বিষয়কে একই নামে চিহ্নিত করলে উপযুক্ত সহায়তার পদ্ধতি নির্ধারণ কঠিন হতে পারে।

ASHA-র গবেষণা পর্যালোচনায় চার থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন গবেষণায় Speech Sound Disorder-এর হার ২.১ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এত বড় ব্যবধানের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে গবেষণার নমুনা, সংজ্ঞা এবং মূল্যায়নপদ্ধতির পার্থক্য। অভিভাবকের করণীয় হলো শিশুর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভুল উচ্চারণ নিয়ে উপহাস না করা এবং বয়সের তুলনায় অসুবিধা অব্যাহত থাকলে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া।

৩. Stuttering বা তোতলামি: কথা যখন মাঝপথে আটকে যায়

একটি শিশু বলতে শুরু করল, ‘আ-আ-আমি আজ স্কুলে যাব।’ কখনো একটি ধ্বনি বারবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কখনো শব্দ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কখনো শিশু কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু শব্দ বের করতে অসুবিধা হচ্ছে।—এ ধরনের বাচনের সাবলীলতাজনিত সমস্যার একটি পরিচিত ধরন হলো Stuttering বা তোতলামি। NIDCD-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫–১০ শতাংশ শিশু শৈশবের কোনো পর্যায়ে তোতলামির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। এদের অধিকাংশের তোতলামি পরে কমে যায় বা দূর হয়, তবে প্রায় এক-চতুর্থাংশের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।  তোতলামির কারণ হিসেবে শুধু ভয়, মানসিক চাপ কিংবা খারাপ অভিভাবকত্বকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এর সঙ্গে স্নায়ুবিকাশগত ও বংশগত উপাদান জড়িত থাকতে পারে। উদ্বেগ বা চাপ তোতলামির প্রকাশকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু সেগুলোকে সব ক্ষেত্রে মূল কারণ বলা যায় না।

বাংলাদেশের পরিবার ও বিদ্যালয়ে তোতলামি নিয়ে হাসাহাসি, অনুকরণ বা অপমানের ঘটনা সামাজিকভাবে গুরুতর সমস্যা। অনেক সময় শিশুকে বলা হয়, ‘ধীরে বলো’, ‘আবার বলো’, ‘এত আটকে যাচ্ছ কেন?’ অথচ বারবার নির্দেশ দেওয়ার পরিবর্তে শিশুকে নিজের গতিতে বক্তব্য শেষ করার সুযোগ দেওয়া অধিক সহায়ক হতে পারে।—তোতলামি শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং আত্মবিশ্বাসও সম্পর্কিত। শিশুর তোতলামি স্থায়ী হচ্ছে, বেশি কষ্ট সৃষ্টি করছে কিংবা শিশু কথা বলা এড়িয়ে চলছে—এমন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৪. Cluttering: দ্রুত ও বিশৃঙ্খল বাচন

সব সাবলীলতার সমস্যা তোতলামি নয়। কিছু শিশুর কথা এত দ্রুত বা অনিয়মিত গতিতে হয় যে শ্রোতার পক্ষে বক্তব্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।—এই সমস্যাকে বলা হয় Cluttering। শিশু শব্দের কিছু অংশ অস্পষ্টভাবে বলতে পারে, অস্বাভাবিক বিরতি দিতে পারে কিংবা কথা বলার গতি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে অসুবিধা অনুভব করতে পারে।

ধরা যাক, একটি শিশু অনেক কিছু বলতে চায়। কিন্তু সে এত দ্রুত কথা বলছে যে কয়েকটি শব্দ একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। শিক্ষক ভাবছেন, শিশুটি অসতর্ক। অথচ সমস্যাটি বাচনের সাবলীলতা ও সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ASHA তোতলামি ও Cluttering-কে বাচনের সাবলীলতাজনিত সমস্যার আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যদিও এদের বৈশিষ্ট্য ও মূল্যায়ন পৃথক।  এক্ষেত্রে শিশুকে শুধু ‘ধীরে কথা বলো’ বলাই যথেষ্ট সমাধান নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাগত মূল্যায়ন এবং পরিকল্পিত বাচন সহায়তা প্রয়োজন।

৫. Childhood Apraxia of Speech: মস্তিষ্ক পরিকল্পনা করছে, কিন্তু মুখের পেশিতে নির্দেশের সমন্বয় হচ্ছে না

Childhood Apraxia of Speech (CAS) একটি স্নায়ুবিক মোটর-বাচন সমস্যা। এক্ষেত্রে শিশুর মস্তিষ্ক বাচন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পেশির নড়াচড়ার পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক সমন্বয় করতে অসুবিধা অনুভব করে। শিশুর জিহ্বা, ঠোঁট কিংবা চোয়ালের পেশি দুর্বল থাকতেই হবে—এমন নয়। সমস্যা হতে পারে নির্দিষ্ট ধ্বনি ও শব্দ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় চলন পরিকল্পনায়।

বিষয়টি একটি বাদ্যযন্ত্র বাজানোর সঙ্গে তুলনা করা যায়। বাদ্যযন্ত্রের সব অংশ ঠিক আছে, শিল্পীও সুরটি জানেন, কিন্তু নির্দিষ্ট ক্রমে আঙুল চালানোর পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে সমস্যা হচ্ছে। CAS রয়েছে এমন শিশু একই শব্দ ভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে উচ্চারণ করতে পারে। দীর্ঘ শব্দ বা জটিল ধ্বনি বিন্যাস উচ্চারণে বেশি অসুবিধা হতে পারে। শব্দের স্বরাঘাত বা ছন্দও অস্বাভাবিক হতে পারে।

তবে এসব বৈশিষ্ট্যের কোনো একটিই এককভাবে রোগনির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। ASHA এই সমস্যার পৃথক মূল্যায়ন এবং অন্যান্য বাচনধ্বনি সমস্যার সঙ্গে পার্থক্য নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। CAS-এর ক্ষেত্রে শুধু শব্দ পুনরাবৃত্তি করানো কিংবা সাধারণ উচ্চারণ অনুশীলন সব সময় যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞের পরিকল্পিত মোটর-বাচনভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।

৬. Dysarthria: বাচন উৎপাদনের পেশি নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা

Dysarthria আরেক ধরনের মোটর-বাচন সমস্যা। কিন্তু এটি Childhood Apraxia of Speech-এর সমার্থক নয়। Dysarthria-তে স্নায়ুবিক কারণে বাচন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পেশির শক্তি, গতি, টান বা সমন্বয় প্রভাবিত হতে পারে। ফলে শিশুর কথা অস্পষ্ট, দুর্বল, অস্বাভাবিক ধীর কিংবা অনিয়মিত শোনাতে পারে। শ্বাসপ্রশ্বাস, কণ্ঠস্বর এবং উচ্চারণের সমন্বয়েও সমস্যা থাকতে পারে।

সেরিব্রাল পালসিসহ বিভিন্ন স্নায়ুবিক অবস্থার সঙ্গে Dysarthria দেখা যেতে পারে। CAS-এ মূল সমস্যা মোটর পরিকল্পনায়; Dysarthria-তে সমস্যা বাচন উৎপাদনের স্নায়ু-পেশিগত নিয়ন্ত্রণে। কোনো কোনো শিশুর উভয় সমস্যা একসঙ্গে থাকতে পারে। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক টিউটোরিয়ালে এই দুই সমস্যার পৃথক রোগনির্ণয়ের জটিলতা এবং যথাযথ মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। —শিশুর কথা অস্পষ্ট হলেই তাকে অসাবধান বা অলস বলা তাই সম্পূর্ণ অনুচিত।

৭. Developmental Language Disorder: শব্দ বলতে পারলেও ভাষার নিয়ম ও অর্থ বুঝতে অসুবিধা

Developmental Language Disorder (DLD) এমন একটি বিকাশগত ভাষা প্রতিবন্ধকতা, যা শিশুর ভাষা শেখা, বোঝা ও ব্যবহারে প্রভাব ফেলে।—একটি শিশু হয়তো অনেক শব্দ বলতে পারে, কিন্তু জটিল বাক্য বুঝতে পারে না। কেউ গল্পের ঘটনাগুলো যথাযথভাবে সাজিয়ে বলতে পারে না। অন্য শিশু শিক্ষকের কয়েক ধাপের নির্দেশনা অনুসরণ করতে অসুবিধা অনুভব করে।

ধরা যাক, শিক্ষক বললেন, ‘খাতা বের করে প্রথমে নাম লেখো, তারপর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দাও।’ একজন শিক্ষার্থী শুধু খাতা বের করল। শিক্ষক ভাবলেন, সে মনোযোগ দিচ্ছে না। কিন্তু শিশুটি হয়তো নির্দেশনার সব অংশ বুঝতে পারেনি। NIDCD-এর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে কিন্ডারগার্টেন পর্যায়ের প্রায় প্রতি ১৪ জন শিশুর মধ্যে একজনের DLD থাকতে পারে। এটি শুধু কথ্য ভাষা নয়, পরবর্তী সময়ে পড়া, লেখা এবং শিক্ষাগত অগ্রগতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এই সমস্যার অন্যতম বিপজ্জনক দিক হলো এর অদৃশ্যতা। শিক্ষক শিশুকে অবাধ্য মনে করতে পারেন, অথচ তার প্রকৃত অসুবিধা ভাষা বোঝায়। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষাগত অসুবিধাকে আচরণগত সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলার সচেতনতা প্রয়োজন।

৮. Dyslexia বা ডিসলেক্সিয়া: কথা বলার সমস্যা নয়, কিন্তু ভাষা ও সাক্ষরতার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক

ডিসলেক্সিয়াকে অনেক সময় ভুলভাবে কথা বলার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রকৃতপক্ষে Dyslexia প্রধানত একটি নির্দিষ্ট শিখনপ্রতিবন্ধকতা, যেখানে শব্দ পড়া, বানান এবং লিখিত শব্দ শনাক্ত করার নির্ভুলতা বা গতি প্রভাবিত হয়। একটি শিশু সাবলীলভাবে গল্প বলতে পারে, কিন্তু বইয়ের একটি পরিচিত শব্দ পড়তে গিয়ে বারবার অসুবিধা অনুভব করতে পারে। সে শব্দের ধ্বনি ও বর্ণের সম্পর্ক বুঝতে সময় নিতে পারে কিংবা বানান শেখায় ধারাবাহিক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে।

২০২৫ সালে International Dyslexia Association-এর সংশোধিত সংজ্ঞায় ডিসলেক্সিয়াকে শব্দপঠন ও বানানের নির্ভুলতা বা গতিসংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট শিখনপ্রতিবন্ধকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর সঙ্গে জিনগত, স্নায়ুজৈবিক ও পরিবেশগত উপাদানের জটিল সম্পর্ক রয়েছে। ধ্বনিগত ও শব্দগঠনসংক্রান্ত প্রক্রিয়াকরণে অসুবিধা থাকতে পারে, যদিও তা প্রত্যেকের ক্ষেত্রে একই রকম নয়। এই এসোশিয়েশনের মতে, ডিসলেক্সিয়া মানেই শিশুর বুদ্ধিমত্তা কম নয়। একইভাবে শিশুর চোখে অক্ষর সব সময় উল্টো দেখা কিংবা ‘ব’ ও ‘দ’ গুলিয়ে ফেলাই ডিসলেক্সিয়ার একমাত্র লক্ষণ নয়।

শিশুর মৌখিক ভাষা বিকাশ এবং পরবর্তী সাক্ষরতা অর্জনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। কিছু শিশুর প্রাথমিক ভাষাগত দুর্বলতা পরে পড়া শেখার সমস্যার পূর্বসংকেত হতে পারে। বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই সমস্যা অনেক সময় অলসতা, অনুশীলনের অভাব বা অমনোযোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে শিশুকে বেশি বেশি লিখতে বাধ্য করা হয় কিংবা ভুল পড়লে তিরস্কার করা হয়। কিন্তু কার্যকর সহায়তার জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত, সুস্পষ্ট ও ধারাবাহিক পাঠ-নির্দেশনা, যেখানে ধ্বনিসচেতনতা, বর্ণ-ধ্বনি সম্পর্ক, শব্দপঠন এবং বানান শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এজন্য বাংলা ভাষার ধ্বনি, বর্ণ, যুক্তাক্ষর ও বানানরীতির বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় উপযুক্ত মূল্যায়ন ও শিক্ষণপদ্ধতি তৈরি করাও জরুরি।

৯. Dysgraphia ও লিখিত ভাষার সমস্যা: মুখে বলতে পারে, লিখতে পারে না

কিছু শিশু মুখে সুন্দরভাবে গল্প বলতে পারে, কিন্তু লিখতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। কেউ অক্ষর গঠনে অসুবিধা অনুভব করে, কারও হাতের লেখা অত্যন্ত ধীর, আবার কেউ চিন্তা অনুযায়ী বাক্য সাজিয়ে লিখতে পারে না।—এসব ক্ষেত্রে Dysgraphia বা লিখনসম্পর্কিত নির্দিষ্ট অসুবিধার ধারণা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে সব লেখার সমস্যা একই কারণে ঘটে না। হাতের সূক্ষ্ম পেশি নিয়ন্ত্রণ, বানান, ভাষা সংগঠন এবং লিখিত প্রকাশ—এগুলোর মূল্যায়ন পৃথকভাবে প্রয়োজন হতে পারে।

ধরা যাক, একটি শিশু মৌখিক পরীক্ষায় একটি গল্প বিস্তারিত বলতে পারছে, কিন্তু লিখিত পরীক্ষায় কয়েকটি বাক্যের বেশি লিখতে পারছে না। শুধু লিখিত ফলাফলের ভিত্তিতে শিশুর চিন্তা বা জ্ঞানের সীমা নির্ধারণ করা এখানে ভুল হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী লিখিত কাজের বিকল্প পদ্ধতি, অতিরিক্ত সময়, সহায়ক প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত শিক্ষণ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।

১০. Selective Mutism: বাড়িতে কথা বলে, কিন্তু বিদ্যালয়ে পারে না

একটি শিশু বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলে, গল্প করে এবং হাসে। কিন্তু বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষক প্রশ্ন করলে সে একেবারে চুপ হয়ে যায়।

শিক্ষক ভাবতে পারেন, শিশুটি অত্যন্ত লাজুক কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে কথা বলছে না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটি Selective Mutism নামের একটি উদ্বেগজনিত অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

ASHA-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, Selective Mutism একটি জটিল উদ্বেগজনিত সমস্যা, যেখানে শিশু কিছু সামাজিক পরিস্থিতিতে কথা বলতে পারে না, যদিও অন্য পরিস্থিতিতে তার কথ্য ভাষা ব্যবহারের সক্ষমতা থাকে। —এখানে ‘Selective’ শব্দটি দেখে মনে করা উচিত নয় যে শিশু ইচ্ছা করে কথা না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিশুকে জোর করে সবার সামনে দাঁড় করানো, ‘কথা না বললে শাস্তি’ দেওয়া কিংবা উপহাস করা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সংবেদনশীল পরিবেশ, শিশুর উদ্বেগের যথাযথ মূল্যায়ন, পরিবার-বিদ্যালয়ের সহযোগিতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞের সমন্বিত সহায়তা।

১১. Social Communication Disorder: শব্দ জানে, কিন্তু কথোপকথনের সামাজিক নিয়ম বুঝতে অসুবিধা

ভাষা শুধু শব্দ ও বাক্য নয়। কখন কথা বলতে হবে, কখন শুনতে হবে, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, অন্যের ইঙ্গিত কীভাবে বুঝতে হবে—এসবও ভাষা ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।—এই দিকটিকে বলা হয় Pragmatics বা ভাষার সামাজিক ব্যবহার।

কিছু শিশু কথোপকথনে পালা নেওয়া, বিষয় ধরে রাখা, শ্রোতার প্রয়োজন অনুযায়ী বক্তব্য পরিবর্তন করা কিংবা পরোক্ষ অর্থ বুঝতে অসুবিধা অনুভব করতে পারে। যেমন শিক্ষক বললেন, ‘তোমার খাতাটা কি একটু দেখতে পারি?’ শিশুটি শুধু বলল, ‘হ্যাঁ, পারেন’, কিন্তু খাতা এগিয়ে দিল না। সে বাক্যটির আক্ষরিক অর্থ বুঝলেও প্রচলিত সামাজিক উদ্দেশ্য অনুধাবনে অসুবিধা অনুভব করতে পারে। তবে একটি বিচ্ছিন্ন উদাহরণ দিয়ে কোনো শিশুর Social Communication Disorder নির্ণয় করা যায় না। ভাষাগত দক্ষতা, সাংস্কৃতিক নিয়ম, বয়স এবং সামগ্রিক বিকাশ বিবেচনা করতে হয়।

অটিস্টিক শিশুদের মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগে ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগগত অসুবিধাকে অটিজম বলা সঠিক নয়।—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো শিশুর যোগাযোগের প্রয়োজন বুঝে দৃশ্যমান নির্দেশনা, স্পষ্ট ভাষা এবং উপযুক্ত সহায়তা দেওয়া।

১২. শ্রবণসংক্রান্ত অসুবিধা: শিশুর কথা দেরিতে শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ

শিশু কথা বলতে দেরি করলে শ্রবণক্ষমতা মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু উচ্চ শব্দ শুনতে পেলেও কিছু নির্দিষ্ট ধ্বনি শুনতে অসুবিধা হতে পারে। আবার দীর্ঘস্থায়ী বা পুনরাবৃত্ত মধ্যকর্ণের সমস্যায় শ্রবণক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। কেননা শ্রবণক্ষমতা কথ্য ভাষা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে বধির শিশুদের ভাষাগত বিকাশকে শুধু মুখে কথা বলার দক্ষতা দিয়ে বিচার করা যাবে না।

শিশুর জন্য উপযুক্ত এবং সহজলভ্য ভাষা—কথ্য, ইশারাভিত্তিক কিংবা উভয় মাধ্যমে—নিশ্চিত করা জরুরি। একজন বধির শিশু ইশারা ভাষায় জটিল চিন্তা প্রকাশ করতে পারলে সেটি ভাষাগত দক্ষতারই প্রকাশ। এখানে সমস্যা শুধু শিশুর শ্রবণক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; পরিবার ও বিদ্যালয় তার উপযোগী যোগাযোগব্যবস্থা দিতে ব্যর্থ হলেও অংশগ্রহণে বাধা তৈরি হয়।

১৩. কণ্ঠস্বর ও অনুনাদের সমস্যা: স্বর ভাঙা, অতিরিক্ত নাকিসুর কিংবা অস্পষ্ট বাচন

সব যোগাযোগগত সমস্যা শব্দের অর্থ বা উচ্চারণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কিছু শিশুর কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক কর্কশ, দুর্বল কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা থাকতে পারে। আবার তালুকাটা বা Cleft Palate-সহ কিছু শারীরিক অবস্থার কারণে কথা বলার সময় অতিরিক্ত নাকিসুর বা Hypernasality দেখা দিতে পারে।

এ ধরনের সমস্যাকে Voice Disorder ও Resonance Disorder-এর আলোচনায় বিবেচনা করা হয়। এগুলো আলাদা সমস্যা এবং মূল্যায়নপদ্ধতিও পৃথক। ASHA-এর নির্দেশিকায় তালুকাটা ও মুখমণ্ডলীয় গঠনগত পার্থক্যের ক্ষেত্রে উচ্চারণ, শ্রবণ, অনুনাদ এবং ভাষাগত বিকাশের সম্ভাব্য প্রভাবের কথা উল্লেখ রয়েছে।  এক্ষেত্রে শুধু উচ্চারণ অনুশীলন যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী কান-নাক-গলা বিশেষজ্ঞ, সার্জন, অডিওলজিস্ট ও স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের সমন্বিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

সারণী: একই লক্ষণ, ভিন্ন সমস্যা: অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা

সমস্যা
সম্ভাব্য লক্ষণ
প্রধান সহায়তার ক্ষেত্র
Speech/Language Delay
বয়স অনুযায়ী শব্দ বা বাক্য ব্যবহারে বিলম্ব
ভাষা ও শ্রবণ মূল্যায়ন
Speech Sound Disorder
নির্দিষ্ট ধ্বনি ভুল বা অস্পষ্ট উচ্চারণ
বাচনধ্বনি মূল্যায়ন ও থেরাপি
Stuttering
ধ্বনি পুনরাবৃত্তি, দীর্ঘায়ন, আটকে যাওয়া
সাবলীলতাবিষয়ক মূল্যায়ন
Cluttering
অস্বাভাবিক দ্রুত বা বিশৃঙ্খল বাচন
বাচনের গতি ও সংগঠন
Childhood Apraxia
শব্দ উৎপাদনের চলন পরিকল্পনায় অসুবিধা
বিশেষায়িত মোটর-বাচন থেরাপি
Dysarthria
পেশি নিয়ন্ত্রণজনিত অস্পষ্ট বা দুর্বল বাচন
স্নায়ু-মোটর বাচন মূল্যায়ন
DLD
ভাষা বোঝা, বাক্য গঠন ও ব্যবহারে অসুবিধা
ভাষাগত থেরাপি ও শিক্ষাগত সহায়তা
Dyslexia
শব্দ পড়া ও বানান শেখায় স্থায়ী অসুবিধা
বিশেষায়িত সাক্ষরতা শিক্ষা
Dysgraphia
লেখা, অক্ষর গঠন বা লিখিত প্রকাশে সমস্যা
শিক্ষাগত ও প্রয়োজনমতো কর্মথেরাপি
Selective Mutism
কিছু পরিস্থিতিতে কথা বলতে না পারা
উদ্বেগ ও যোগাযোগভিত্তিক সহায়তা
Social Communication Disorder
কথোপকথনের সামাজিক ব্যবহার বুঝতে অসুবিধা
সামাজিক যোগাযোগ সহায়তা
শ্রবণসংক্রান্ত অসুবিধা
শব্দ বা কথ্য ভাষা শুনতে অসুবিধা
অডিওলজি ও ভাষাগত প্রবেশগম্যতা

এই লক্ষণগুলো প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্য; কোনো একক লক্ষণ রোগনির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। এক শিশুর একাধিক সমস্যা একসঙ্গে থাকতে পারে।

কথা বোঝা, সামাজিক যোগাযোগ ও পরিস্থিতিভিত্তিক নীরবতা

বিকাশগত ভাষা প্রতিবন্ধকতা বা DLD রয়েছে এমন শিশু দীর্ঘ নির্দেশনা বুঝতে, বাক্য গঠন করতে কিংবা গল্প সাজিয়ে বলতে অসুবিধা অনুভব করতে পারে। এর প্রভাব পড়া, লেখা এবং গণিতের ভাষাভিত্তিক সমস্যাতেও দেখা যেতে পারে। আবার Social Communication Disorder বা সামাজিক যোগাযোগজনিত সমস্যায় কথোপকথনে পালা নেওয়া, পরোক্ষ অর্থ বোঝা এবং সামাজিক পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার কঠিন হতে পারে। অটিস্টিক শিশুদের মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগের ভিন্নতা থাকতে পারে; কিন্তু সব সামাজিক যোগাযোগগত অসুবিধাই অটিজম নয়।

Selective Mutism আরেকটি পৃথক পরিস্থিতি। কোনো শিশু বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও বিদ্যালয়ের মতো নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবেশে উদ্বেগের কারণে কথা বলতে অক্ষম হতে পারে। এটিকে ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা ভেবে শাস্তি দেওয়া অনুচিত। শ্রবণসংক্রান্ত সমস্যাও কথ্য ভাষা অর্জনে প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ শব্দে প্রতিক্রিয়া দেখালেই শিশুর সব ধরনের শ্রবণক্ষমতা স্বাভাবিক—এমন ধরে নেওয়া যায় না। প্রয়োজনে অডিওলজিক্যাল মূল্যায়ন দরকার।

এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী কর্কশ কণ্ঠস্বর, স্বরের দুর্বলতা কিংবা তালুকাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত নাকিসুরের মতো সমস্যাও হতে পারে। এগুলো Voice ও Resonance Disorder-এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কান-নাক-গলা বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর মূল্যায়ন প্রয়োজন।—মূল কথা হলো, একই রকম শোনা অস্পষ্ট কথার পেছনেও সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই রোগনির্ণয়ের আগে সমস্যার নাম দিয়ে শিশুকে চিহ্নিত করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

যখন মুখে কথা নেই, কিন্তু ভাষা আছে

বধির, অটিস্টিক কিংবা মোটর-বাচনসংক্রান্ত অসুবিধা রয়েছে এমন কিছু শিশু ইশারা ভাষা, ছবি, প্রতীক বা সহায়ক যোগাযোগযন্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এই পদ্ধতিগুলোকে বলা হয় Augmentative and Alternative Communication (AAC) বা সহায়ক ও বিকল্প যোগাযোগ।

ছবি ব্যবহার করলে শিশু আর মুখে কথা বলবে না—এ ধারণা যথার্থ নয়। উপযুক্ত AAC শিশুর যোগাযোগের সুযোগ বাড়াতে পারে।—এখানে প্রতিবন্ধিতার সামাজিক মডেল গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর মুখে শব্দ না থাকাটিই একমাত্র বাধা নয়; পরিবার ও বিদ্যালয় যদি তার যোগাযোগমাধ্যম বুঝতে বা গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।

একজন বধির শিশুর জন্য প্রবেশগম্য ইশারা ভাষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তেমনি অন্য শিশুর জন্য প্রয়োজন হতে পারে ছবি, যোগাযোগবোর্ড কিংবা শ্রবণসহায়ক প্রযুক্তি। তবে অপ্রমাণিত Facilitated Communication-কে AAC-এর সমতুল্য ভাবা যাবে না। এ পদ্ধতিতে সহায়তাকারী ব্যক্তির শারীরিক নিয়ন্ত্রণে তৈরি বার্তা শিশুর নিজের বক্তব্য বলে উপস্থাপিত হতে পারে। ASHA একে অগ্রহণযোগ্য ও ক্ষতিকর পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। —যোগাযোগের লক্ষ্য কেবল শব্দ উৎপাদন নয়; শিশুর নিজের বক্তব্য স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা।

অঙ্ক–০৩

বাংলাদেশের বাস্তবতা—স্ক্রিনিং, অভিভাবকের সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

বাংলাদেশেসমস্যার চেয়ে বড় সমস্যা ভুল চিহ্নিতকরণ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এসব সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিশুদের অনেক অসুবিধাই যথাসময়ে শনাক্ত হয় না। একজন ডিসলেক্সিয়াযুক্ত শিশু পড়তে দেরি করলে তাকে অলস বলা হতে পারে। তোতলামি রয়েছে এমন শিশুকে সহপাঠীরা উপহাস করতে পারে। DLD রয়েছে এমন শিক্ষার্থী শিক্ষকের নির্দেশনা বুঝতে না পারলে তাকে অমনোযোগী মনে করা হতে পারে। আর Selective Mutism রয়েছে এমন শিশুকে বিদ্যালয়ে কথা বলতে বাধ্য করা হতে পারে।

এসব উদাহরণ বাংলাদেশের সম্ভাব্য শ্রেণিকক্ষ-বাস্তবতা বোঝানোর জন্য; এগুলো কোনো জাতীয় জরিপের পরিসংখ্যান নয়। আমাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তাই তিনটি পরিবর্তন বিশেষভাবে জরুরি।

  • প্রথমত, শিশুর ভাষা ও যোগাযোগগত অসুবিধাকে বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা বা আচরণগত সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা বন্ধ করতে হবে।
  • দ্বিতীয়ত, প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে Speech, Language, Communication এবং Literacy Disorder-এর মৌলিক পার্থক্য অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
  • তৃতীয়ত, স্কুলভিত্তিক প্রাথমিক স্ক্রিনিং, অভিভাবক পরামর্শ এবং বিশেষজ্ঞের কাছে রেফারালের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

শিশু সমস্যার নাম না জানলেও নিজের অসুবিধা অনুভব করতে পারে। সে হয়তো বুঝতে পারে, অন্যরা সহজে যা করতে পারছে, তার জন্য সেটি কঠিন হচ্ছে। যদি সেই অসুবিধার জন্য তাকে বারবার অপমান করা হয়, তবে ভাষাগত সমস্যার পাশাপাশি সামাজিক ও আবেগগত চাপও তৈরি হতে পারে। অতএব ভুল শিক্ষণ ও শাস্তিমূলক আচরণ কখনো মূল সমস্যার সমাধান নয়; বরং শিশুর শিক্ষাগত অংশগ্রহণে নতুন বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

প্রাথমিক শনাক্তকরণ: অপেক্ষা নয়, প্রয়োজন বুঝে ব্যবস্থা

শিশুর ভাষা বিকাশে তিনটি ধারণার পার্থক্য জরুরি। অভিভাবক প্রতিদিন শিশুর আচরণ ও অগ্রগতি লক্ষ্য করলে সেটি বিকাশগত পর্যবেক্ষণ (Developmental Monitoring)। প্রশিক্ষিত পেশাজীবী নির্দিষ্ট উপকরণ দিয়ে ঝুঁকি যাচাই করলে সেটি বিকাশগত স্ক্রিনিং (Developmental Screening)। আর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের মাধ্যমে সমস্যার প্রকৃতি নির্ধারণ করা হলো Diagnostic Assessment।

স্ক্রিনিং মানেই রোগনির্ণয় নয়। American Academy of Pediatrics-এর সুপারিশ অনুসারে, নিয়মিত স্বাস্থ্যপর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ৯, ১৮ ও ৩০ মাস বয়সে সাধারণ বিকাশগত স্ক্রিনিং এবং ১৮ ও ২৪ মাসে অটিজম-নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং করা উচিত। CDC-ও এই সময়সূচি অনুসরণ করে। তবে কোনো বয়সেই উদ্বেগ দেখা দিলে পরবর্তী নির্ধারিত স্ক্রিনিং পর্যন্ত অপেক্ষার প্রয়োজন নেই।

আন্তর্জাতিক নবজাতক শ্রবণসেবায় ‘১–৩–৬’ কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ: জন্মের এক মাসের মধ্যে শ্রবণ স্ক্রিনিং, তিন মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ শ্রবণ মূল্যায়ন এবং শ্রবণক্ষতি নিশ্চিত হলে ছয় মাসের মধ্যে উপযুক্ত সহায়তা শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। এখানে সহায়তা মানে শুধু শ্রবণযন্ত্র নয়; শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী ভাষাগত প্রবেশগম্যতা, ইশারা ভাষা, পারিবারিক পরামর্শ এবং যোগাযোগ সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশের জন্য এসব আন্তর্জাতিক নির্দেশনা সরাসরি অনুকরণের পরিবর্তে স্থানীয় ভাষা, প্রশিক্ষিত জনবল, উপকরণের বৈধতা ও স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বিবেচনায় গ্রহণ করা প্রয়োজন।

মা-বাবার হাতে ভাষা শেখার সহজ উপায়

শিশুর ভাষা বিকাশে পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ সব সময় দামি খেলনা নয়; সময়, মনোযোগ ও সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া। শিশু ‘গাড়ি’ বললে মা বলতে পারেন, ‘হ্যাঁ, লাল গাড়িটা যাচ্ছে।’ এটি Expansion—শিশুর বক্তব্যকে অর্থপূর্ণভাবে সম্প্রসারণ করা। আবার শিশু যে খেলনা নিয়ে ব্যস্ত, সেটি নিয়ে কথা বলাকে Follow the Child's Lead বলা হয়। একই প্রয়োজনীয় শব্দ বিভিন্ন বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা Focused Stimulation-এর উদাহরণ। যেমন ‘খোলো’ শব্দটি দরজা, বাক্স ও বইয়ের প্রসঙ্গে ব্যবহার করা যায়।

পরিচর্যার সময় বড়রা নিজের কাজ বর্ণনা করতে পারেন—‘আমি আলু ধুচ্ছি।’ শিশুর কাজও বর্ণনা করতে পারেন—‘তুমি নীল ব্লকটি ওপরে রাখছ।’ এই পদ্ধতিগুলো যথাক্রমে Self-Talk ও Parallel Talk নামে পরিচিত। ছবির বই দিয়ে প্রশ্নোত্তর, পরিচিত গল্পের বাক্য পূরণ করার সুযোগ এবং ছড়ার ছন্দ নিয়ে খেলা শিশুর শব্দভান্ডার, অর্থ অনুধাবন ও ধ্বনিসচেতনতা বিকাশে সহায়ক হতে পারে। তবে শিশুর প্রতিটি যোগাযোগকে পরীক্ষা বানানো যাবে না। সে শব্দ, ইশারা বা ছবি দিয়ে কিছু চাইলে আগে তার বক্তব্যের স্বীকৃতি দিতে হবে। যোগাযোগের জন্য খাবার, পানি বা প্রয়োজনীয় সহায়তা আটকে রাখা অনৈতিক।

শিশুর ভাষা ও যোগাযোগ বিকাশের স্ক্রিনিং: অভিভাবকের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের করণীয়

শিশুর ভাষা বিকাশে স্ক্রিনিং বা প্রাথমিক যাচাইয়ের গুরুত্ব বোঝাতে একটি পরিচিত উপমা ব্যবহার করা যায়। আমরা বাড়ি নির্মাণের সময় ভিত্তি পরীক্ষা করি। গাড়ি চালানোর আগে ব্রেক ও ইঞ্জিনের অবস্থা দেখি। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি বোঝার চেষ্টা করি। অথচ শিশুর ভাষা ও যোগাযোগ বিকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে অনেক সময় কেবল অনুমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। স্ক্রিনিংয়ের অর্থ শিশুকে অসুস্থ বা প্রতিবন্ধী ঘোষণা করা নয়। এটি বয়সোপযোগী বিকাশের নির্দিষ্ট দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করার প্রাথমিক প্রক্রিয়া।

পর্যবেক্ষণ, স্ক্রিনিং ও রোগনির্ণয় এক বিষয় নয়

অভিভাবক প্রতিদিন শিশুর আচরণ দেখে বুঝতে পারেন, সে নতুন শব্দ শিখছে কি না, ডাকলে সাড়া দেয় কি না, অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করে কি না কিংবা অন্যের বক্তব্য বোঝে কি না। এটি বিকাশগত পর্যবেক্ষণ বা Developmental Monitoring। অন্যদিকে প্রশিক্ষিত পেশাজীবী বয়সোপযোগী, বৈধতা-পরীক্ষিত উপকরণ ব্যবহার করে বিকাশগত ঝুঁকি যাচাই করলে সেটি Developmental Screening।

স্ক্রিনিংয়ে উদ্বেগ পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বা Diagnostic Assessment করা হয়। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ হলো সম্ভাব্য সংকেত দেখা, স্ক্রিনিং হলো নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সেই সংকেত যাচাই করা, আর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হলো সমস্যার প্রকৃতি ও প্রয়োজন বোঝা।

—এই তিনটি পর্যায়কে এক করে ফেললে অভিভাবক অকারণে আতঙ্কিত হতে পারেন কিংবা প্রকৃত সমস্যার যথাযথ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

কোন বয়সে স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন?

American Academy of Pediatrics-এর সুপারিশ অনুযায়ী, শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্যপর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ৯, ১৮ ও ৩০ মাস বয়সে মানসম্মত বিকাশগত স্ক্রিনিং এবং ১৮ ও ২৪ মাস বয়সে অটিজম-নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং করা উচিত। CDC-ও এই সময়সূচি উল্লেখ করেছে।

আন্তর্জাতিক সুপারিশভিত্তিক রেফারেন্স; বাংলাদেশের সেবাব্যবস্থায় স্থানীয়ভাবে বৈধতা-পরীক্ষিত উপকরণ ও প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর মাধ্যমে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

সারণী:, শিশুর বিকাশগত স্ক্রিনিংয়ের সময়সূচি

শিশুর বয়স
কি করতে হবে
৯ মাস
সাধারণ বিকাশগত স্ক্রিনিং
১৮ মাস
সাধারণ বিকাশগত ও অটিজম-নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং
২৪ মাস
অটিজম-নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং
৩০ মাস
সাধারণ বিকাশগত স্ক্রিনিং
যেকোনো বয়স
বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে অতিরিক্ত স্ক্রিনিং বা মূল্যায়ন
উৎস: CDC, Developmental Monitoring and Screening।

এই সময়সূচি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি নির্দেশক। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এর বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সক্ষমতা, সেবাপ্রাপ্যতা, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং উপকরণের উপযোগিতা বিবেচনা করতে হবে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নির্ধারিত বয়সের স্ক্রিনিংয়ের জন্য অপেক্ষা না করে কোনো উদ্বেগ দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী আগেই মূল্যায়ন নেওয়া।

নবজাতকের শ্রবণ পরীক্ষা কেন জরুরি?

শ্রবণক্ষমতা ভাষা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বিশেষত কথ্য ভাষা অর্জনের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিকভাবে নবজাতকের শ্রবণ শনাক্তকরণে ‘১–৩–৬’ কাঠামো সুপরিচিত। এর লক্ষ্য হলো জন্মের এক মাসের মধ্যে শ্রবণ স্ক্রিনিং, তিন মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ শ্রবণ মূল্যায়ন এবং শ্রবণক্ষতি নিশ্চিত হলে ছয় মাসের মধ্যে উপযুক্ত প্রারম্ভিক সহায়তা শুরু করা। আরও দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হলে সেটি অগ্রাধিকারযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের NIDCD-এর তথ্যমতে, দেশটির প্রায় ৯৮ শতাংশ নবজাতকের এক মাস বয়স হওয়ার আগেই শ্রবণ স্ক্রিনিং করা হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার তথ্য, বাংলাদেশের হার নয়। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হলো, প্রতিটি নবজাতকের শ্রবণ পরীক্ষার সুযোগ কতটা সহজলভ্য এবং পরীক্ষায় উদ্বেগ পাওয়া গেলে পরিবার দ্রুত কোথায় সেবা পাবে?

শ্রবণ পরীক্ষার উদ্দেশ্য শুধু শিশুকে কথ্য ভাষায় কথা বলতে সক্ষম করার চেষ্টা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রবণসহায়ক ব্যবস্থা, ইশারা ভাষার সুযোগ, পরিবারকে যোগাযোগ প্রশিক্ষণ এবং পূর্ণাঙ্গ ভাষাগত বিকাশের সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

অভিভাবকের পর্যবেক্ষণ: কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন?

অভিভাবকেরা শিশুর বিকাশ সম্পর্কে অনেক মূল্যবান তথ্য দিতে পারেন। তবে তাঁদের নিজেরাই রোগনির্ণয় করার প্রয়োজন নেই। উদাহরণ হিসেবে দুই বছর বয়সী অধিকাংশ শিশুর ক্ষেত্রে CDC অন্তত দুটি শব্দ একত্রে ব্যবহার, পরিচিত ছবির বস্তু নির্দেশ করা এবং বিভিন্ন যোগাযোগমূলক অঙ্গভঙ্গির কথা উল্লেখ করে।

শিশুর বয়স অনুযায়ী এসব সাধারণ দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য বিলম্ব থাকলে, শ্রবণ নিয়ে সন্দেহ হলে, ভাষা বুঝতে অসুবিধা দেখা দিলে কিংবা আগে অর্জিত যোগাযোগদক্ষতা হারিয়ে গেলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে একজন শিশুবিশেষজ্ঞের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী অডিওলজিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট অথবা বিকাশগত বিশেষজ্ঞের কাছে রেফারাল পাওয়া যেতে পারে।

ঘরে বসে অভিভাবকের করণীয়: ভাষাসমৃদ্ধ পরিবেশ গড়ে তোলা

শিশুর ভাষা বিকাশে অভিভাবকের ভূমিকা শুধু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন বড় ধরনের শিক্ষাগত সুযোগ তৈরি করতে পারে। সকালে শিশুকে পোশাক পরানোর সময় পোশাকের নাম বলা, খাবার পরিবেশনের সময় খাবারের রং ও স্বাদ নিয়ে কথা বলা, হাঁটার সময় আশপাশের ঘটনা বর্ণনা করা কিংবা রাতে ছবি দেখে গল্প বলা—এসবই ভাষা বিকাশের উপযোগী অভিজ্ঞতা। শিশু যদি একটি শব্দ বলে, বড়রা সেটিকে সম্প্রসারণ করতে পারেন। যেমন শিশু বলল, ‘ফুল’। মা বলতে পারেন, ‘হ্যাঁ, লাল ফুলটি ফুটেছে।’

শিশু যদি ইশারায় কিছু বোঝায়, তার যোগাযোগের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। সে কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর দেওয়ার আগে একটু অপেক্ষা করা যেতে পারে, যাতে সে নিজেও ভাবার সুযোগ পায়।—এই অনুশীলনগুলো ব্যয়বহুল নয়। কিন্তু এগুলো কার্যকর করতে অভিভাবকের সময়, মনোযোগ এবং সংবেদনশীলতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, নিয়মিত পারিবারিক অনুশীলন প্রয়োজনীয় পেশাগত মূল্যায়ন বা থেরাপির বিকল্প নয়। কোনো শিশুর বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন হলে পরিবার ও বিশেষজ্ঞের সমন্বিত পরিকল্পনা সবচেয়ে উপযোগী।

ভুল চর্চা: যখন সহায়তার নামে শিশুর ওপর চাপ তৈরি হয়

ভাষাগত অসুবিধা রয়েছে এমন শিশুর সঙ্গে কয়েকটি প্রচলিত আচরণ বিশেষভাবে পরিহার করা প্রয়োজন। শিশুকে দিনের পর দিন একই শব্দ উচ্চারণে বাধ্য করা, ভুল বললে শাস্তি দেওয়া, অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করা, কথা বলার জন্য খাবার বা প্রয়োজনীয় সহায়তা আটকে রাখা কিংবা পরিবারের সামনে তাকে অপমান করা—এসব আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।

একইভাবে শিশুর বয়স ও প্রয়োজন না বুঝে অপ্রমাণিত চিকিৎসা, অতিরিক্ত ব্যয়বহুল যন্ত্র কিংবা ‘নিশ্চিতভাবে কথা বলাবে’ ধরনের বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। যোগাযোগগত প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সতর্কতার বিষয় হলো Facilitated Communication। এই পদ্ধতিতে একজন সহায়তাকারী ব্যক্তির হাত বা শরীর ধরে যোগাযোগের বার্তা তৈরিতে সহায়তা করেন বলে দাবি করা হয়। ASHA এই পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রমাণিত ও ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করেছে, কারণ গবেষণায় অনেক ক্ষেত্রে বার্তাটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নয়, সহায়তাকারীর তৈরি বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। —এটি উপযুক্ত AAC ব্যবস্থার সমতুল্য নয়। শিশুর স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ নিশ্চিত করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।

শ্রবণ-মনোযোগের খেলা কি কাজে আসে?

পরিচিত শব্দের উৎস শনাক্ত করা, দুটি শব্দের পার্থক্য বোঝা, শব্দ শুনে ছবি বা বস্তু নির্বাচন করা এবং বয়সোপযোগী নির্দেশনা অনুসরণ—এসব ঘরোয়া খেলা শ্রবণ-মনোযোগ ও ভাষা বোঝার সুযোগ তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে, শিশুকে পরিচিত মৃদু ঘণ্টা ও কাগজের শব্দ শুনিয়ে উৎস শনাক্ত করতে বলা যায়। পরে ‘বলটা দাও’ থেকে ‘লাল বলটা বাক্সে রাখো’ ধরনের নির্দেশনা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শ্রবণসংক্রান্ত অসুবিধা রয়েছে এমন শিশুর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত অডিওলজিস্টের পরামর্শে উপযুক্ত কার্যক্রম নির্বাচন করতে হবে। শ্রবণযন্ত্র বা ককলিয়ার ইমপ্লান্ট ব্যবহারকারীদের জন্য Ling Six Sound Check পরিচিত একটি দৈনন্দিন যাচাইপদ্ধতি; কিন্তু এটি পূর্ণাঙ্গ শ্রবণ পরীক্ষার বিকল্প নয়।

শব্দ শুনতে না পারলে শিশুকে উচ্চস্বরে চিৎকার করে পরীক্ষা করা উচিত নয়। বরং শ্রবণপ্রবেশগম্যতা ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগমাধ্যম নিশ্চিত করতে হবে। আয়নার সামনে উচ্চারণের দৃশ্যমান অবস্থান দেখানো কিছু নির্দিষ্ট সমস্যায় থেরাপিস্টের নির্দেশনায় সহায়ক হতে পারে। কিন্তু জিহ্বা নাড়ানো, ফুঁ দেওয়া কিংবা স্ট্র দিয়ে পানি টানার মতো কথাবহির্ভূত মুখের পেশির অনুশীলনকে সব উচ্চারণ সমস্যার চিকিৎসা বলা যায় না। গবেষণা পর্যালোচনায় এ ধরনের অনুশীলন দিয়ে বাচন উৎপাদনের উন্নতি ঘটার পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিভাবকেরা দৈনিক কয়েকটি ছোট, আনন্দময় খেলার পর্ব রাখতে পারেন। কিন্তু শিশুর নির্দিষ্ট সমস্যার চিকিৎসা পরিকল্পনা ও অনুশীলনের মাত্রা বিশেষজ্ঞই নির্ধারণ করবেন।

শাস্তির সংস্কৃতি থেকে সহায়তার সংস্কৃতিতে

বাংলাদেশের শ্রেণিকক্ষে ভাষাগত অসুবিধা অনেক সময় শিক্ষাগত বা আচরণগত দুর্বলতা হিসেবে ব্যাখ্যা হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ডিসলেক্সিয়াযুক্ত শিশুকে বেশি অনুলিপি লিখতে বাধ্য করা, তোতলামির জন্য উপহাস করা কিংবা Selective Mutism রয়েছে এমন শিশুকে জোর করে সবার সামনে কথা বলানো সহায়ক পদ্ধতি নয়।

শিক্ষকের কাজ চিকিৎসা নির্ণয় করা নয়; অসুবিধা শনাক্ত করার মতো সচেতনতা অর্জন, অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা এবং যথাযথ সেবায় রেফারাল নিশ্চিত করা। এই ব্যবস্থায় পিতা-মাতার পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও অংশ নিতে হবে। শিশুর ভাষা বিকাশের দায়িত্ব শুধু মায়ের ওপর চাপিয়ে দিলে কর্মজীবী ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবার আরও চাপের মুখে পড়তে পারে। অভিভাবককে শুধু বেশি কথা বলতে বলা যথেষ্ট নয়; পরিবারে সময়, সহায়তা, পাঠসামগ্রী এবং সেবাপ্রাপ্তির বাস্তব সুযোগও প্রয়োজন।

অভিভাবকদের জন্য নির্দেশনা: শিশুর অসুবিধাকে শাস্তি নয়, সহায়তার সংকেত হিসেবে দেখুন

শিশুর কথা বলা, ভাষা বোঝা, পড়া কিংবা যোগাযোগে অসুবিধা দেখা দিলে প্রথম কাজ হলো তার সমস্যাটির প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করা। শিশু কী বলতে চাইছে, সে অন্যের কথা কতটা বুঝছে, তার শ্রবণক্ষমতা কেমন, কোন পরিস্থিতিতে বেশি অসুবিধা হচ্ছে এবং সেই অসুবিধা তার দৈনন্দিন জীবনে কী প্রভাব ফেলছে—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুবিশেষজ্ঞ, অডিওলজিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, মনোবিজ্ঞানী কিংবা বিশেষ শিক্ষাবিদের সহায়তা নেওয়া উচিত।

শিশুকে অন্যের সঙ্গে তুলনা, ভুল উচ্চারণ নিয়ে হাসাহাসি, বারবার বাধ্যতামূলক অনুশীলন এবং অপ্রমাণিত চিকিৎসাপদ্ধতি থেকে বিরত থাকতে হবে। শিশুর ভাষা বিকাশকে একটি বাগানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সেখানে সব গাছ একই সময়ে ফুল ফোটায় না। কিন্তু কোনো গাছের বিকাশে সমস্যা দেখা দিলে শুধু অপেক্ষা করাও যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সঠিক পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত পরিচর্যা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের সহায়তা। তেমনি প্রতিটি শিশুর বিকাশগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে হবে, কিন্তু তার প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার অধিকারকে অবহেলা করা যাবে না।

বাংলাদেশের জন্য পরিবারকেন্দ্রিক স্ক্রিনিং ও সহায়তাব্যবস্থা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু অভিভাবককে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানালে চলবে না। এমন একটি সেবাব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে অভিভাবক উদ্বেগ প্রকাশ করলে সহজে যথাযথ পরামর্শ ও মূল্যায়ন পাবেন।

  • প্রথমত, নবজাতক ও শিশুর নিয়মিত স্বাস্থ্যপর্যবেক্ষণে ভাষা, শ্রবণ এবং সামাজিক যোগাযোগের সাধারণ নির্দেশক অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
  • দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় প্রাথমিক বিকাশগত পর্যবেক্ষণ ও উপযুক্ত রেফারাল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা উচিত।
  • তৃতীয়ত, প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষক ও শিশুযত্নকর্মীদের প্রশিক্ষণে ভাষা বিকাশের মৌলিক ধারণা, যোগাযোগগত বৈচিত্র্য এবং সতর্কসংকেত অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
  • চতুর্থত, অভিভাবকদের জন্য সহজ বাংলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য মাতৃভাষায় বয়সোপযোগী নির্দেশিকা, যোগাযোগভিত্তিক খেলার উদাহরণ ও প্রয়োজনীয় সেবার তথ্য সহজলভ্য করতে হবে।
  • পঞ্চমত, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অডিওলজি এবং প্রারম্ভিক বিকাশগত সহায়তার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল ও সেবা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ জরুরি।
  • ষষ্ঠত, বাংলাদেশের শিশুদের ভাষাগত বিকাশ নিয়ে স্থানীয় গবেষণা ও বৈধতা-পরীক্ষিত মূল্যায়ন উপকরণ তৈরি করতে হবে। বিদেশি ভাষার মূল্যায়ন পরীক্ষা সরাসরি অনুবাদ করে ব্যবহার করলে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি থাকতে পারে।
  • সবশেষে, রাষ্ট্রীয় সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং পরিবারকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।ন শিশুর বিকাশের দায়িত্ব শুধু মায়ের নয়, শুধু বাবার নয়, শুধু শিক্ষকের নয়, শুধু চিকিৎসকেরও নয়। এটি সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশের নীতিগত সংস্কার: কে করবে, কীভাবে করবে?

  • প্রথম সংস্কার হওয়া উচিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিকাশগত পর্যবেক্ষণ ও রেফারালব্যবস্থা শক্তিশালী করা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে শিশুস্বাস্থ্যসেবায় শ্রবণ, ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগের সাধারণ নির্দেশক অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রথম ১২ মাসে নির্বাচিত উপজেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এবং দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে। সাফল্য নির্ধারিত হবে কত শিশু পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে, কতজনের প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন হয়েছে এবং রেফারালের পর কত পরিবার সেবা পেয়েছে—এসব সূচকে।
  • দ্বিতীয়ত, প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণে ভাষা ও যোগাযোগগত বৈচিত্র্য অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি, সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌথভাবে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করতে পারে। এতে তোতলামি, DLD, ডিসলেক্সিয়া, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, সামাজিক যোগাযোগ ও যুক্তিসংগত শিক্ষাগত সমন্বয়ের মৌলিক বিষয় থাকবে। প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা শুধু উপস্থিতি দিয়ে নয়, শ্রেণিকক্ষের আচরণ এবং উপযুক্ত রেফারালের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত।
  • তৃতীয়ত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বহু-পেশাগত সহায়তা সম্প্রসারণ প্রয়োজন। অডিওলজিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও বিশেষ শিক্ষাবিদের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা খাতের সহযোগিতা দরকার। জনবল ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় জেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ দল এবং উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষিত রেফারাল-কেন্দ্র দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
  • চতুর্থত, বাংলা ও অন্যান্য মাতৃভাষায় গবেষণাভিত্তিক স্ক্রিনিং ও অভিভাবক নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে। বিদেশি পরীক্ষার সরাসরি অনুবাদ সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়। বাংলা ভাষার ধ্বনি, উপভাষা, শব্দগঠন ও সামাজিক ব্যবহার বিবেচনায় উপকরণের মান যাচাই করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলো এখানে নেতৃত্ব দিতে পারে।
  • পঞ্চমত, সবার জন্য যোগাযোগের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বধির শিশুদের উপযোগী ইশারা ভাষা, AAC, সহজপাঠ্য উপকরণ, দৃশ্যমান নির্দেশনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক প্রযুক্তির সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। এসব কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাঁদের সংগঠনগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ থাকা উচিত।
  • ষষ্ঠত, অভিভাবক শিক্ষাকে পরিবারবান্ধব সামাজিক কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে। শুধু শহুরে সেমিনার নয়; স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বল্পব্যয়ের ব্যবহারিক নির্দেশনা পৌঁছে দিতে হবে। এর ফলাফল মাপা যেতে পারে অভিভাবকের জ্ঞান, সেবাগ্রহণ, শিশুর যোগাযোগের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ধারাবাহিকতা দিয়ে।

এসব প্রস্তাব তাৎক্ষণিক সাফল্যের প্রতিশ্রুতি নয়; এগুলো পরিকল্পনা, বাজেট, প্রশিক্ষণ, স্থানীয় গবেষণা এবং নিয়মিত মূল্যায়ননির্ভর সংস্কারপথ।

শেষকথা: শিশুর সমস্যা শনাক্তের আগে সমাজের ভুলগুলো শনাক্ত করি

শিশুর ভাষা অর্জনকে শুধু মুখে শব্দ উৎপাদনের ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ রাখলে আমরা তার বিকাশের বড় একটি অংশ উপেক্ষা করি। মস্তিষ্ক, শ্রবণ, ভাষা অনুধাবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং শিক্ষা—সবগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একইভাবে শিশুর যোগাযোগগত অসুবিধাকে অলসতা কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতার পরিচয় হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিক ও মানবিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই ভুল।

গবেষণার শিক্ষা স্পষ্ট: প্রারম্ভিক বিকাশের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সব শিশুর প্রয়োজন একই নয়। তাই সময়মতো পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ কেবল অভিভাবকের সচেতনতা নয়। এর সঙ্গে রয়েছে প্রশিক্ষিত জনবল, স্থানীয়ভাবে উপযোগী মূল্যায়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার সমন্বয়, আর্থিক প্রবেশগম্যতা এবং প্রতিবন্ধী শিশুর যোগাযোগের অধিকার।—শিশুর কথা বলার অসুবিধা যতটা ব্যক্তিগত বিকাশের প্রশ্ন, তার প্রয়োজন বুঝে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা ততটাই সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

চূড়ান্ত প্রতিফলন: শিশুর কথা শোনার সভ্যতা

শিশুর প্রথম শব্দ একটি পরিবারের জন্য আনন্দের মুহূর্ত। কিন্তু তার কথা শোনার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব। এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে গভীর পার্থক্য। একটি শিশু যখন কথা বলতে গিয়ে আটকে যায়, আমরা কি ধৈর্য ধরে শুনি? যখন সে শব্দ ভুল বলে, আমরা কি তাকে সহযোগিতা করি? যখন সে ইশারায় কিছু বোঝাতে চায়, আমরা কি সেই ভাষাকে সম্মান করি? আর যখন সে বিদ্যালয়ে পড়তে বা লিখতে অসুবিধা অনুভব করে, আমরা কি তার শেখার প্রয়োজন খুঁজে দেখি?

আমাদের পরিবার, বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এসব প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। শিশুকে শুধু নির্দিষ্ট বয়সে নির্দিষ্ট সংখ্যক শব্দ উচ্চারণ করতে শেখানো শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। তার চিন্তা, আবেগ, মতামত ও প্রয়োজন প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাই বৃহত্তর উদ্দেশ্য। উন্নয়নের প্রকৃত পরিচয় বড় ভবন কিংবা প্রযুক্তিসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। যে সমাজ তার সবচেয়ে অসুবিধাগ্রস্ত শিশুটির যোগাযোগের পথও উন্মুক্ত করতে পারে, সেই সমাজই মানবিক অগ্রগতির দাবিদার।

আগামী প্রজন্মের জন্য তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—কোনো শিশুর ভাষাগত অসুবিধাকে তার মর্যাদা, শিক্ষা কিংবা সামাজিক অংশগ্রহণের বাধা হতে দেব না। শিশুকে কথা বলতে শেখানো আমাদের দায়িত্ব; কিন্তু তার কথা শোনার অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের সভ্যতার পরীক্ষা।

আগামীকাল পড়ুন: ঘরেই শিশুর ভাষা ও বাচন বিকাশে সহায়তা: বাংলাদেশের অভিভাবকদের জন্য সহজ স্পিচ থেরাপি ও অডিটরি ট্রেনিংয়ের কার্যকর কৌশল

লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com

, শিশুর ভাষা বিকাশ, কথা বলতে দেরি, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, কথা বলতে দেরি, অডিটরি ট্রেনিং, তোতলামি, ডিসলেক্সিয়া, বিকাশগত ভাষা প্রতিবন্ধকতা, অভিভাবকের করণীয়, শিশুর শ্রবণ পরীক্ষা, Speech Delay, Speech Disorder, Developmental Language Disorder, Early Childhood Intervention