odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 12th October 2026, ১২th October ২০২৬
অনলাইন কাজ ও বিনিয়োগের প্রলোভনে ২৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে উত্তরায় সিআইডির অভিযান।

নকল বিদেশি ওয়েবসাইটে অনলাইন চাকরির প্রতারণা, নারী গ্রেপ্তার

odhikarpatra | প্রকাশিত: ১১ October ২০২৬ ২৩:৫৭

odhikarpatra
প্রকাশিত: ১১ October ২০২৬ ২৩:৫৭

নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকার পত্র ডটকম

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের আদলে নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে অনলাইনভিত্তিক চাকরি ও অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগে প্রীয়ন্তী সরকার চিত্রা (২২) নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযোগ অনুযায়ী, এভাবে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২৪ লাখ ১৯ হাজার ১৯৯ টাকা হাতিয়ে নেয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

সিআইডি জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ৮ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে ওই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি রংপুর জেলার সাতগাড়া এলাকার বাসিন্দা।

যেভাবে শুরু হয় প্রতারণা

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী একজন ব্যবসায়ী। ২০২৫ সালের আগস্টে টেলিগ্রামের একটি আইডি থেকে তাঁর মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে অনলাইন পার্টটাইম চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি নকল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাঁকে একটি ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ইতিবাচক রেটিং ও ফিডব্যাক দেওয়ার কাজের কথা বলা হয়।

প্রতিদিন ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয়ের আশ্বাস পেয়ে ওই ব্যবসায়ী কাজ শুরু করেন। শুরুতে তাঁকে কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা পাঠানো হয়। এতে তাঁর বিশ্বাস অর্জন করে চক্রটি।

 বিনিয়োগের প্রলোভনে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা

পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীকে টেলিগ্রামের একটি গ্রুপে যুক্ত করা হয়। সেখানে প্রতিষ্ঠানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের বিপরীতে আকর্ষণীয় মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। গ্রুপে অন্য সদস্যদের বিনিয়োগের প্রমাণ হিসেবে ব্যাংকে টাকা জমার স্লিপের ছবি দেখানো হলে তিনি বিনিয়োগে আগ্রহী হন।

এজাহার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট ভুক্তভোগী তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে প্রথমে এক লাখ টাকা চক্রের দেওয়া একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করেন। পরে ওয়েবসাইটে নির্দিষ্টসংখ্যক ভিজিট সম্পন্ন করা, বিভিন্ন রাউন্ডে অংশ নেওয়া এবং অন্যান্য শর্ত পূরণের কথা বলে তাঁকে আরও অর্থ পাঠাতে প্ররোচিত করা হয়।

এভাবে একই দিনে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে মোট ২৪ লাখ ১৯ হাজার ১৯৯ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। চক্রটি অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করে। তবে প্রতিশ্রুত মুনাফা তো দূরের কথা, ভুক্তভোগী তাঁর মূলধনও ফেরত পাননি।

 টাকা ফেরত চাইলে বন্ধ করে দেয় যোগাযোগ

চক্রটি পরবর্তী সময়ে আরও টাকা দাবি করতে থাকলে ভুক্তভোগীর সন্দেহ হয়। তিনি বিনিয়োগের অর্থ ফেরত চাইলে তাঁকে নতুন করে টাকা পাঠানোর কথা বলা হয়। একপর্যায়ে চক্রের সদস্যরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আদালতের মাধ্যমে পল্টন থানায় মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ২; তারিখ ১ নভেম্বর ২০২৫। দণ্ডবিধির ৩৪, ১০৯, ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলাটি করা হয়।

 তদন্তে মিলেছে অর্থ লেনদেনের যোগসূত্র

সিআইডির তদন্তে ‘লিজা’ নাম ব্যবহারকারী এক সন্দেহভাজনের নির্দেশনার সঙ্গে অর্থ পাঠানোর সময়ের যোগসূত্র পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জন করে তাঁকে ধীরে ধীরে বেশি অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য গ্রেপ্তার প্রীয়ন্তী সরকার চিত্রার নামে নিবন্ধিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁকে পারিশ্রমিক পাঠানো হয়েছিল।

তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অর্থ পাঠানোর নির্দেশদাতা সম্পর্কে গ্রেপ্তার নারী সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে সিআইডির বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতারণার ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতা এবং অর্থের উৎস ও গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে তদন্ত চলছে।

একই মামলায় বিভিন্ন সময়ে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন আদালতে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে সিআইডি জানিয়েছে। তবে মামলার অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য আদালতের চূড়ান্ত রায়ের বিকল্প নয়।

 অনলাইন চাকরির নামে প্রতারণা থেকে বাঁচতে সতর্কতা

সিআইডি অনলাইনভিত্তিক চাকরি, বিভিন্ন টাস্ক সম্পন্ন করে আয়ের প্রলোভন এবং অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, কোনো অনলাইন কাজের জন্য অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে, কাজের পারিশ্রমিক পাওয়ার পর আরও বড় অঙ্কের টাকা জমা দিতে বলা হলে কিংবা টাকা তুলতে নতুন ফি বা বিনিয়োগের শর্ত দেওয়া হলে সতর্ক হওয়া জরুরি। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের ঠিকানা, নিবন্ধন ও যোগাযোগের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই না করে অর্থ পাঠানো উচিত নয়।

প্রতারণার শিকার হলে লেনদেনের রসিদ, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিবরণ, টেলিগ্রাম বা অন্যান্য মেসেজ এবং সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের তথ্য সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে।

অনলাইন আয়ের প্রলোভনে প্রথমে সামান্য অর্থ দিয়ে বিশ্বাস অর্জন, পরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা—এ ধরনের কৌশল সম্পর্কে সচেতন থাকাই আর্থিক ক্ষতি এড়ানোর অন্যতম উপায়।